এ বাংলা অঞ্চলটির, যা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত, ভৌগোলিক অবস্থানও ঐতিহাসিকভাবে বাঙালির জিনগত রূপ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির পূর্বাংশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পাহাড়ি অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত এ বাংলা অঞ্চলের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত অবস্থা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যার ছাপ পড়েছে বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্যেও।
জাতিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শারীরিক গঠন বা ফেনোটাইপের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বর্ণ তথা রেসের বিশ্লেষণ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয় ঔপনিবেশিক আমলে। ১৮৮৫ সালে হার্বার্ট রিজলির এথনোগ্রাফিক সার্ভে অব বেঙ্গলের মাধ্যমে বর্ণের ভিত্তিতে জাতিগত সমীক্ষা প্রশাসনিক রূপ লাভ করা শুরু করে এবং তা পূর্ণতা পায় ১৮৯২ সালে প্রকাশিত তার ট্রাইবস অ্যান্ড কাস্টস অব বেঙ্গল বইটির মাধ্যমে। রিজলি তার এ সমীক্ষায় নৃবৈজ্ঞানিক বা এথনোগ্রাফিক গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহারের দাবি তুললেও তা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি অপবিজ্ঞান। তিনি পুরো ভারতবর্ষের মানুষকে তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন বর্ণে শ্রেণীবিভক্ত করার চেষ্টা চালান। তার এ ছদ্মবিজ্ঞানের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোকেন্দ্রিক, বর্ণবাদী ধারণাগুলোকে বৈধতা দেয়া। তথাকথিত ‘আর্য’ জনগোষ্ঠীকে ভারতবর্ষের যাবতীয় জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার কর্ণধার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রকারান্তরে এ ঐতিহাসিক আর্যদের ইউরোপীয় মানুষের সঙ্গে একই জাতিভুক্ত করে ঔপনিবেশিক অবদমনকে নীতিগত সমর্থন দেয়াই ছিল রিজলির উদ্দেশ্য।
ফেনোটাইপ তথা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রচণ্ড রকমের বর্ণবাদী এথনোগ্রাফিক সমীক্ষা চালানোর কারণে রিজলি সমর্থনের চেয়ে সমালোচনাই পেয়েছেন বেশি। তবে এ কথা সত্য, বাংলা অঞ্চলের মূলধারার ইতিহাসে রিজলির ভূমিকা অনেক। তার এ বর্ণবাদী চিন্তা ব্যবহার করেই পরবর্তীকালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন রায় থেকে রমেশচন্দ্র মজুমদারদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদরা তাদের ইতিহাস রচনা করেছেন এবং কোনো না কোনো মাত্রায় রিজলির বর্ণবাদী চিন্তার ছাপ রয়ে গেছে তাদের লেখনীতে। রিজলি মনে করেছিলেন, বাঙালি জাতির মধ্যে দ্রাবিড়ীয় ও মোঙ্গলয়েড এ দুই বর্ণের মিশ্রণ ঘটেছে অর্থাৎ বাঙালি একটি সংকর জাতি। ‘সংকর’ জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় এর পর থেকেই যেন স্থায়ীভাবে জনপ্রিয় ধারার ইতিহাসচর্চা ও নৃবৈজ্ঞানিক চর্চায় গেঁথে যায়।
মূলধারার ইতিহাসের আলোচনা পর্যালোচনা সাধারণত ‘বাংলা’কে একটি অবিভক্ত ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিচার করে। সে কারণে ‘বাঙালি’ আবির্ভূত হয় একটি অখণ্ড ও একীভূত নৃভাষাতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবে, যারা উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের ‘বঙ্গ’ বা ‘বাংলা’ বা ‘বাঙ্গালাহ’ নামক স্থানে ঐতিহাসিকভাবে বসবাস করে আসছে। কিন্তু ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়েই বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আদিমকাল থেকে মধ্যযুগের একটা বড় সময় পর্যন্ত বাংলা যেমন কোনো একীভূত অঞ্চল ছিল না, তেমন বাঙালি ছিল না কোনো একক জাতিগোষ্ঠী, যা ছিল তা হলো পুণ্ড্র, রাঢ়, গৌড়, সমতট, হরিকেলের মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য, কৌম কিংবা জনপদ। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, এমন আঞ্চলিক ও কৌম চেতনাই পুরো প্রাচীন যুগ, এমনকি মধ্যযুগেরও একটা দীর্ঘ সময় ধরে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামোর রূপ নির্ধারণ করেছে। যার প্রভাব খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘বাঙালির’ নৃগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্যের ওপরও প্রভাব রেখেছে।
সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয়, প্রাক-দ্রাবিড়গোষ্ঠীর তথা অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর মানুষই বাংলা অঞ্চলের আদিম অধিবাসী। পরবর্তী সময়ে এসেছিল দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী এবং সর্বশেষে বৈদিক আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। এ ধরনের ইতিহাসচর্চার মধ্যেও রয়েছে এক প্রকারের প্রচ্ছন্ন বর্ণবাদ, যা ফুটে ওঠে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী অতুল সুরের লেখায়। তিনি মনে করতেন, যদিও বাঙালি একটি সংকর জাতি, তবু ‘উচ্চশ্রেণী’র বাঙালিদের মধ্যে আর্য উপাদান বেশি। অর্থাৎ বৈদিক ধর্মাবলম্বী আর্য ও তাদের মতো শারীরিক বৈশিষ্ট্যধারী মানুষের (যার অপবৈজ্ঞানিক বিবরণ অত্যন্ত গোলমেলে) সুস্পষ্টভাবে অন্যান্য নৃভাষাগোষ্ঠীর মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফেনোটাইপের ভিত্তিতে বর্ণ, জাতি ইত্যাদি নির্ধারণের চেষ্টা ঔপনিবেশিক যুগে শুরু হলেও তা বহাল থেকেছে বিশ শতকজুড়েই। এমনকি সেসব লেখার একটা বড় অংশ এখনো বিভিন্নভাবে চিন্তাচর্চায় মিশে আছে। বাঙালি জাতির নৃবৈজ্ঞানিক কিংবা জিনগত অধ্যয়নের পেছনে বেশির ভাগ সময়ই জড়িয়ে ছিল রাজনৈতিক অভিসন্ধি কিংবা বিশেষ জাতির (তা হোক বাস্তব কিংবা কাল্পনিক) শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা।
কিন্তু বাংলা অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের এ অঞ্চলে জাতিগত ইতিহাসের ব্যাপারে ভিন্ন তথ্য দেয়। সে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভৌগোলিক, পরিবেশগত, ধর্মীয় ও অন্যান্য নানা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, যার সবই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। সে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বোঝার আগে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে, ‘বাঙালি জাতি’র ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। আগেই বলেছি, অখণ্ড বাংলা অঞ্চল বলতে আমরা এখন যা বুঝি, তার কিছুই ছিল না। অখণ্ডতা নয়, বরং খণ্ড খণ্ড স্বাধীন অঞ্চল হিসেবে অসংখ্য রাজনৈতিক সত্তার অস্তিত্বই ছিল বাস্তবতা। তার পেছনে একটা বড় কারণ ছিল উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম উপমহাদেশের আর্যাবর্ত (আর্য জনগোষ্ঠীর বাসস্থান) থেকে বিশাল দূরত্ব। আর্যাবর্ত ছিল প্রাচীন উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থানের কেন্দ্রভূমি। এখানেই মৌর্য, গুপ্ত ও পাল সম্রাটদের রাজ্যের রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলো অবস্থিত ছিল এবং উপমহাদেশে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামোর সূত্রপাত বারবার এখান থেকেই হয়েছিল। বাংলা অঞ্চল ছিল এসব সাম্রাজ্যের একেবারে পূর্বপ্রান্তে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী অবস্থান এবং শক্তিশালী কৌম চেতনা, বাংলা অঞ্চলে ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রীকরণ রুখে দিয়েছিল বারবার। তার সঙ্গে আরো যুক্ত হয়েছিল ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ। আর্য জাতির উন্নাসিকতা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলা অঞ্চলে অবস্থান করা জনগোষ্ঠীগুলোকে নানা রকমের শ্লেষাত্মক ও অবমাননাকর নামে অভিহিত করেছিল। এ অঞ্চলে প্রবেশের পর আর্যাবর্তে ফেরত যেতে হলে একজন আর্যকে নিজের পবিত্রতা পুনরুদ্ধারে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হতো। ফলে পুরো প্রাচীনযুগ ধরেই বাংলায় আর্যকরণ ঘটেনি কিংবা ঘটলে তা ঘটেছে খুবই ধীর প্রক্রিয়ায়। ফলে বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্যে আর্য উপাদান যথেষ্টই কম।
আরো একটা বিষয় এখানে স্পষ্ট করা দরকার, তা হলো আর্যকরণের প্রক্রিয়া। অর্থাৎ আর্য জনগোষ্ঠীর আগমন ও বিস্তার পুরো বাংলা অঞ্চলে সমানভাবে হয়নি। তার একটা প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলার কৃষি ব্যবস্থার ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন তার পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখান, আর্যাবর্তের স্থায়ী কৃষি ব্যবস্থা পুরো বাংলায় বিস্তার করতে সমর্থ হয়নি। এমনকি তেরো শতকের শুরুতে তুর্কিদের আগমনের সময়ও পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ব্যাপক পার্থক্য। পশ্চিমা ও উত্তর বাংলায় যেখানে স্থায়ী কৃষির প্রচলন ছিল, পূর্ব বাংলায় তার বিপরীতে দেখা গেছে স্থানান্তর কৃষির প্রচলন। অর্থাৎ বাংলায় আর্যকরণের সূচনা পশ্চিম বাংলায় এবং তা খুব ধীরগতিতে পূর্বদিকে এগিয়েছে। সে কারণেই পশ্চিম বাংলার ব্রাহ্মণদের মধ্যে যেখানে আদি আর্যাবর্তের ‘বিশুদ্ধ’ আর্যগোষ্ঠীর দেখা মেলে, সেখানে কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের ব্রাহ্মণরা ছিল স্থানীয় মানুষ। কৃষি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাই জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারেও জানা সম্ভব।
এমনটা ঘটার একটা কারণ ভৌগোলিক। উত্তর ভারতের আদি আর্যাবর্তের সঙ্গে পশ্চিম বাংলার একটা ভৌগোলিক সংযোগ ও ধারাবাহিকতা রয়েছে, ফলে আর্যকরণ সেখানে ঘটা ছিল সহজতর। কিন্তু পূর্ব বাংলার সক্রিয় বদ্বীপ, জলাভূমি, প্লাবনভূমি, চর ইত্যাদির কারণে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির পরিবেশগত ও ভৌগোলিক ধারবাহিকতায় একটা ছেদ পড়ে, যা আর্য জনগোষ্ঠীর পূর্ব দিকে অভিগমনের গতিকে অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছিল। আরেকটা কারণ ছিল ধর্মীয়। বৈদিক বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র অনেক তীর্থস্থান ও ভৌগোলিক অঞ্চলের অবস্থান পশ্চিম বাংলায় থাকলেও তেমন কোনো সম্পর্ক পূর্ব বাংলার সঙ্গে ছিল না। পশ্চিমা বাংলার ভাগীরথী বা নবদ্বীপের সঙ্গে যেভাবে পবিত্রতার সম্পর্ক ছিল, পদ্মা বা যমুনার সঙ্গে তা ছিল না। বরং পূর্ব বাংলার নদীবিধৌত অঞ্চলের অধিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস থেকে ভাষা পর্যন্ত সবকিছুই ছিল আর্যদের কাছে অপবিত্র। ফলে আর্যকরণের যে বিবরণ এবং সংকর জাতি হিসেবে বাঙালির বিবর্তিত হওয়ার যে বিবরণ মূলধারার ইতিহাসে দেয়া হয়, তা পুরো বাংলা অঞ্চলের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে বাঙালি জাতি বলতে আমরা যা বুঝি, তার উৎপত্তিইবা কবে? প্রাচীন যুগে বাংলা বলে একক কোনো রাজনৈতিক সত্তা ছিল না। একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে এ অঞ্চলের উদ্ভব ঘটে মোগল আমলে, ‘সুবাহ বাংলা’ নামক প্রদেশ গঠনের মাধ্যমে (তাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল মোগলদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক একটা বিষয়)। কিন্তু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ইতিহাস খুব কম সময়েই নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত ইতিহাসের সঙ্গে তাল রেখে গড়ে ওঠে। বাঙালির ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। প্রাচীন যুগের বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, পুণ্ড্র বা রাঢ়ের মতো স্থানগুলোয় ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, ভাষাগোষ্ঠীর আগমন ঘটেছে। সে জনগোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি, চিন্তা, ভাষা, প্রযুক্তির মধ্যে যেমন বৈচিত্র্য ছিল, তেমনি বৈচিত্র্য ছিল তাদের শারীরিক গঠনেও।
রাধাকমল মুখোপাধ্যায় তার দ্য চেঞ্জিং ফেস অব বেঙ্গল বইটিতে বাংলা অঞ্চলের পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে পূর্ব বাংলার অঞ্চলগুলো ইতিহাসজুড়েই ছিল বিদ্রোহী ও শরণার্থীদের আবাসস্থল। এসব মানুষ উপমহাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত সাম্রজ্যবাদী শক্তিগুলোর কঠোর রাষ্ট্রকাঠামো, আমলাতন্ত্র, করের বোঝা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য পালিয়ে এসে বাংলা অঞ্চলের স্বাধীনচেতা সমাজ ব্যবস্থায় আশ্রয় খুঁজত। বাংলা অঞ্চল, বিশেষত পূর্ব বাংলা সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চল তার নদীবিধৌত দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন জায়গার নানা জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেছিল, যারা কঠোর রাষ্ট্রকাঠামোর সহিংসতা থেকে মুক্তি চেয়েছিল। ফলে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল অন্য নানা সংস্কৃতির মানুষ, যারা জাতিগতভাবেও ছিল বৈচিত্র্যময়।
ষোলো ও সতেরো শতকে বাংলার নদীপথের পরিবর্তন গতিশীল হয়ে উঠলে তা আর্থসামাজিক কাঠামোর বিন্যাসে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে এবং যথারীতি তার প্রভাব পড়ে জাতিগত বিন্যাসের ওপরও। গঙ্গা নদীর মূল স্রোতধারা হুগলি-ভাগীরথী নদী থেকে পূর্বের পদ্মা নদীতে স্থানান্তর হওয়ায় কৃষির ওপর তার প্রভাব পড়ে। শুরু হয় নতুন উদ্যমে কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং তা আকৃষ্ট করতে থাকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগসন্ধানী ও ভাগ্যান্বেষী মানুষকে। মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা, কৃষিকাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার কারণে নতুন করে আগমন ঘটে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের। তারা মিশে যেতে থাকে সমাজের মূলধারায়। বাড়তে থাকে জিনগত বৈচিত্র্য। মোদ্দাকথা বাঙালির জিনগত বা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের আলোচনায় বাঙালিকে ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়ে তাকে কোনো একক জাতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আধুনিককালের জাতিরাষ্ট্রের ধারণা বা জাতিগত পরিচয়ের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রাচীন ও মধ্যযুগের মানুষের পরিচয় সম্পর্কে চিন্তা করতে চাইলে তা বিভ্রান্তি ও অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে এখানকার মানুষ নিজেদের বাঙালি মনেই করত না, বরং বিবেচনা করত কোনো একটা গ্রামের সদস্য হিসেবে, কোনো একটা কৌমের সদস্য হিসেবে। যাদের ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সার্বিক সংস্কৃতির মধ্যে ঐক্যের চেয়ে বৈচিত্র্যই ছিল বেশি।
বাঙালির আদি সামাজিক বা রাজনৈতিক ইতিহাসের তথ্যসূত্রের কোনোটারই উৎস বাংলা অঞ্চলে নয়। বরং এ অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের ব্যাপারে আমরা যেসব তথ্য পাই, তার সবই আর্যবর্তের মানুষের মাধ্যমে লেখা। সেখানে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাই অনিবার্য একটা বিষয়। কিন্তু বিশ শতকের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও যেন সে বর্ণবাদী চিন্তার ছাপ একই রকম প্রবল রয়ে গেছে। কপাল ও নাকের দৈর্ঘ্য, গাত্রবর্ণের ধরন ও উচ্চতার মতো শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আর্যজাতি নিজেদের উচ্চ শ্রেণীর মানুষ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করত। ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিককালে একই পদ্ধতি ব্যবহার করে একাডেমিক ও সামাজিকভাবে চেষ্টা করা হয়েছে তথাকথিত উন্নত ইউরোপীয় জাতির সঙ্গে বাঙালি জাতির নির্দিষ্ট কিছু ‘বর্ণের’ মানুষের মিল খুঁজে বের করার।
কিন্তু নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদের জানায়, বাঙালির জাতিগত ইতিহাস আমরা এখন যেভাবে বিবেচনা ও রচনা করছি, ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়েই তেমনটা ছিল না। বাঙালি জাতি বলতে আমরা যে রকম একক একটা জাতিকে বুঝি, ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হওয়ার আগে সে রকম কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা বা জাতিগত পরিচয়ের অস্তিত্ব ছিল না। তাই বাঙালিকে যখন সংকর জাতি বলা হয়, তা একদিকে সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, বাংলা অঞ্চলে ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় ধরেই ছিল অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীন অস্তিত্ব ও বসবাস। যাদের ভাষা, সংস্কৃতির মতো বংশগত কাঠামোও ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর।





