একটি অতি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া, ডাঙা বা জলে ভেসে থাকা উদ্ভিদ, বিশালাকার বটবৃক্ষ, ডানা মেলা পাখি কিংবা আমাদের মতো মানুষ, পৃথিবীর সব প্রাণের মৌলিক ভাষা কিন্তু একই, তা লিখিত রয়েছে সব জীবের ডিএনএতে থাকা সে একই বিশ্বজনীন বর্ণমালায়।

মানবদেহের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন (৩২০ কোটি) বেস পেয়ার বা রাসায়নিক অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত ডিএনএ কেবল কোনো জৈবিক নির্দেশচিত্র নয়। এটি মানবজাতির সুপ্রাচীন ইতিহাস, হাজার হাজার বছরের লড়াই, প্রতিকূল প্রকৃতিকে জয় করার অভিযোজন এবং ভৌগোলিক স্থানান্তরের (মাইগ্রেশন) এক অনন্য মহাকাব্যিক দলিল। প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে মানুষের টিকে থাকার অবিশ্বাস্য গল্প এবং বিবর্তনের প্রতিটি স্বাক্ষর সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর কোড হিসেবে মুদ্রিত হয়ে আছে এ বিশাল ডিএনএ অনুক্রমের ভেতরেই। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ ও পপুলেশন জিনোমিকসের বৈপ্লবিক অগ্রগতি অতীতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস অনুসন্ধান এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্য উন্মোচনে সম্পূর্ণ নতুন এক বিজ্ঞানভিত্তিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় গড়ে ওঠা উর্বর বাংলা অঞ্চল প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ছিল মানব স্থানান্তরের এক অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বজুড়ে খ্যাত ঐতিহাসিক সিল্ক রুট এবং এর সামুদ্রিক শাখা কেবল রেশম, মসলা কিংবা পণ্যের বাণিজ্যপথ ছিল না। এটি ছিল দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন এবং জিন আদান-প্রদানের (জিন ফ্লো) এক অন্যতম আন্তর্জাতিক মাধ্যম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলা অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন সিল্ক রুটের স্থল ও জল উভয় পথেরই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট। হাজার বছর ধরে এ পথ দিয়ে মধ্য এশিয়া, পারস্য, চীন, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী, পরিব্রাজক, ধর্মীয় গুরু ও অভিবাসীরা বাংলায় এসেছেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জিনগতভাবে মিশ্রিত হয়েছেন।

এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো পপুলেশন জিনোমিকস ও বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিল্ক রুট বা রেশমপথের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাঙালির বহুস্তরীয় জিনগত স্বাতন্ত্র্য বিশ্লেষণ করা। প্রাগৈতিহাসিক দক্ষিণ এশীয় ভিত্তি, সিল্ক রুটবাহিত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জিনপ্রবাহ এবং স্তেপ-সংক্রান্ত ইন্দো-আর্য উপাদানের মেলবন্ধনে গঠিত বাঙালির অনন্য ‘জেনেটিক মোজাইক’ পর্যালোচনা করাই এ লেখার মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি হাজার বছরের পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এ জৈবিক অভিযোজন কীভাবে আধুনিক জনস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসায় (প্রিসিশন মেডিসিন) দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, তাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

আফ্রিকার ইভ থেকে বরফ যুগ: বাঙালির জিনোমে প্রাগৈতিহাসিক বিবর্তনের ছাপ

আমরা জানি, ডিএনএ হলো মানবদেহের গঠন ও জীবনযাত্রার মূল নির্দেশিকা, যা একই সঙ্গে মানবজাতির সুপ্রাচীন পরিভ্রমণ, প্রাগৈতিহাসিক বিবর্তন ও টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য মহাকাব্যিক দলিল। বিখ্যাত জেনেটিক ইতিহাসবিদ ড. স্পেন্সার ওয়েলসের মতে, প্রত্যেক মানুষের ডিএনএ একটি অনন্য গ্রন্থ, যেখানে লিখিত ইতিহাসে স্থান না পাওয়া অসংখ্য মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প সংরক্ষিত রয়েছে। আধুনিক পপুলেশন জিনোমিকস নিশ্চিত করেছে, আধুনিক মানবজাতির সব মাতৃকুলের আদি উৎস প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকায় নিহিত ছিল, যা মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ তত্ত্ব নামে পরিচিত। যেহেতু কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই প্রায় সম্পূর্ণরূপে মাতৃসূত্র ধরে বংশানুক্রমে স্থানান্তর হয়, তাই বাঙালি নারীর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএতেও এ বিশ্বজনীন আফ্রিকান উৎসের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর মুদ্রিত রয়েছে। তবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাতৃকুলে এক অনন্য স্বাতন্ত্র্য পরিলক্ষিত হয়। উত্তর বা পশ্চিম ভারতের নারীদের তুলনায় বাঙালি নারীদের মধ্যে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বংশগতির নির্দেশক ‘D’ ও ‘G’ হ্যাপ্লোগ্রুপের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বেশি। এটি প্রমাণ করে যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বঙ্গ ভূখণ্ডে পূর্ব দিক থেকে আসা জনগোষ্ঠীর এক ধারাবাহিক ও সক্রিয় জিনপ্রবাহ বিদ্যমান ছিল।

a1

নিয়ান্ডারথাল নারীর খুলি, ছবি: জন নাকাতা

আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর ইউরেশিয়া অঞ্চলে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে বরফ যুগের বিলুপ্ত মানব প্রজাতি নিয়ান্ডারথালদের, যারা প্রায় ১ লাখ ২০ থেকে ৩৫ হাজার বছর আগে এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্যালিওজেনেটিকস বা জীবাশ্ম বংশানুবিজ্ঞানের রূপকার এবং ২০২২ সালে শারীরবিদ্যায় নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সভান্তে প্যাবো নিয়ান্ডারথাল মানবের সুনির্দিষ্ট জিনোম অনুক্রম নির্ণয় করেন এবং দেনিসোভা নামক সম্পূর্ণ নতুন এক প্রাচীন হোমিনিনের উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। তার যুগান্তকারী গবেষণা প্রমাণ করে যে প্রায় ৫০-৭০ হাজার বছর আগে ইউরেশিয়ায় আধুনিক মানুষের সঙ্গে এসব বিলুপ্ত হোমিনিনের সংকরায়ণ ঘটেছিল। ফলে আফ্রিকাবহির্ভূত অন্যান্য ইউরেশীয় জনগোষ্ঠীর মতো গড় বাঙালির ডিএনএ তেও প্রায় দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ অনুক্রম স্থান করে নিয়েছে। সুপ্রাচীনকালের এ নিয়ান্ডারথাল জিনোম বাঙালির শরীরে কেবল প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি হিসেবে টিকে নেই, বরং এটি মানুষের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, ত্বকের বর্ণ, চুল ও স্নায়বিক বৈশিষ্ট্যের মতো অনুভূতির বাহক দৈহিক বা শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যগুলোকে রূপ দান করছে। একই সঙ্গে নিয়ান্ডারথালদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া টোল-লাইক রিসেপ্টর (টিএলআর) জিনগুলো প্রাচীনকালে এশীয় অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এ অতিসক্রিয় অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটির কারণেই বাঙালিদের মধ্যে সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস কিংবা ক্রোন’স ডিজিজের মতো জটিল অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেছে, যা প্রমাণ করে প্রাগৈতিহাসিক কালের এ ডিএনএ-প্রবাহ আজও বাঙালির শারীরবিদ্যায় এক বাস্তব সত্য।

সিল্ক রুট ও ভৌগোলিক ট্রানজিট: বাঙালির ত্রিমাত্রিক জিনগত মোজাইক

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর উর্বর অববাহিকায় অবস্থিত বাংলা ভূখণ্ড ঐতিহাসিকভাবে কেবল এক প্রাচুর্যময় কৃষি অঞ্চলই ছিল না, বরং এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করার এক প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক ট্রানজিট পয়েন্ট। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সিল্ক রুটের স্থল ও সামুদ্রিক নেটওয়ার্কে বিদেশী রেশম ও মসলার পাশাপাশি বাংলার সমৃদ্ধ অর্জনকৃতি ঢাকার মসলিন বিশ্ববাজারে আদান-প্রদান হতো। বাণিজ্যের এ করিডোর একই সঙ্গে অবাধ মানব স্থানান্তর ও জিনপ্রবাহের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিচিত্র জনস্রোত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বঙ্গ ভূখণ্ডে সমবেত হয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গেছে, যা বাঙালির জিনোমে গড়ে তুলেছে এক বহুস্তরীয় ঐতিহ্য।

a2

দক্ষিণ ভারতের আদিবাসী

ছবি: আসলান পাহাড়ি (থ্রেড)

পপুলেশন জিনোমিকসে সাম্প্রতিক বিস্তৃত অটোসোমাল ডিএনএ, ওয়াই-ক্রোমোজোম মার্কার ও মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বাঙালির জিনগত স্বাতন্ত্র্য প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট পূর্বপুরুষের বংশগতির ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধনে গঠিত। এর প্রথম ও মূল ভিত্তিটি হলো সুপ্রাচীন দক্ষিণ এশীয় বংশগতি, যা মূলত প্রাগৈতিহাসিক দক্ষিণ ভারতীয় শিকারি সংগ্রাহক গোষ্ঠী এবং ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতাসংলগ্ন জনপদের জিনের সংমিশ্রণ। এটি গড় বাঙালির ডিএনএতে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ স্থান দখল করে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগ ও লৌহ যুগের শুরুতে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করা স্তেপ চারণজীবীদের থেকে প্রাপ্ত প্রায় ১০-১৫ শতাংশ ইন্দো-আর্য উপাদান, যা পুরুষদের ওয়াই-ক্রোমোজোমের ‘R1a-Z93’ হ্যাপ্লোগ্রুপের বিস্তারের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়।

তবে বাঙালির ডিএনএকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও অনন্যভাবে পৃথক করেছে এর তৃতীয় উপাদানটি, যা মূলত ঐতিহাসিক সিল্ক রুটেরই সরাসরি অবদান। বিভিন্ন জিনোমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাঙালির ডিএনএতে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জিনের উপস্থিতি রয়েছে। সিল্ক রুটের উপকূলীয় ও নদীপথ ব্যবহার করে আসা তিব্বতি-বর্মণভাষী জনগোষ্ঠী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় (অস্ট্রো-এশিয়াটিক) মানুষের দীর্ঘমেয়াদি চলাচলের কারণে পুরুষদের ওয়াই ক্রোমোজোমের ‘হ্যাপ্লোগ্রুপ O’ এবং নারীদের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর ‘D’ও ‘G’ হ্যাপ্লোগ্রুপ বাঙালির জিনতত্ত্বে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য ইন্দো-আর্যভাষী পপুলেশনের মধ্যে যেখানে পূর্ব এশীয় জিনগত প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য, সেখানে সমতল ভূমির বাঙালির ডিএনএতে এ লক্ষণীয় উপস্থিতি আমাদের অত্যন্ত স্বাতন্ত্র্যসূচক পরিচয় দান করেছে। বিপরীত পক্ষে বাংলার প্রাচীন আদিবাসী বা উপজাতি গোষ্ঠীগুলো (যেমন সাঁওতাল) দীর্ঘকাল ধরে নিজ নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে রক্ষণশীল অন্তর্বিবাহ (Endogamy) প্রথা বজায় রাখায় তাদের আদি জিনগত বৈশিষ্ট্য অবিকৃত রয়ে গেছে এবং তাদের ডিএনএ সমতল ভূমির মিশ্র বাঙালির চেয়ে কম বৈচিত্র্যময়। ভৌগোলিক অবস্থান ও সিল্ক রুটের মহাকাব্যিক ট্রানজিট হিসেবে বাংলার এ ঐতিহাসিক ভূমিকাই মূলত বাঙালির রক্তপ্রবাহে গড়ে তুলেছে বিশ্বখ্যাত এক ‘জেনেটিক মোজাইক’।

জিন সংস্কৃতি সমবায় ও জৈবিক অভিযোজন: ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র জিনগত রূপরেখা

মানুষের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস ও ভৌগোলিক পরিবেশ কেবল কোনো মানবসমাজ গড়ে তোলে না। বরং হাজার হাজার বছর ধরে তা মানবদেহের ডিএনএতে গভীর অভিযোজনগত পরিবর্তন তৈরি করে, যাকে বিজ্ঞান ও পপুলেশন জিনোমিকসের ভাষায় বলা হয় ‘জিন সংস্কৃতি সমবায়’। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের নদীমাতৃক পরিবেশ, পলিমাটির উর্বরতা ও ধানের সহজলভ্যতা বাঙালির চিরন্তন ভাতনির্ভর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করে দিয়েছিল। হাজার বছর ধরে প্রতিদিন প্রধান খাদ্য হিসেবে ভাত গ্রহণের ফলে বাঙালির লালায় অ্যামাইলেজ এনজাইম উৎপাদনকারী AMY1 জিনের বহুল উপস্থিতি ও অনুলিপি তৈরি হয়েছে, যা শর্করাজাতীয় খাবারকে দ্রুত ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তর করে শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। পাশাপাশি ভাত থেকে ইথানল মেটাবলিজমের সঙ্গে যুক্ত ALDH2 জিনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা প্রমাণ করে যে ‘ভাতে বাঙালি’ কোনো লোকজ গল্প নয়, বরং এটি বাঙালির ডিএনএতে সংরক্ষিত দীর্ঘ প্রাকৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত রূপ।

a3

ফ্রান্সিস ক্রিকের আঁকা ডাবল হেলিক্স ডিএনএর পেন্সিল স্কেচ

ছবি: ওয়েলকাম কালেকশন

একইভাবে ‘মাছে বাঙালি’ সংস্কৃতির সুগভীর নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির জিনোমে সক্রিয় FADS2 জিনের এক অনন্য রূপের মধ্যে। নদীমাতৃক বাংলায় বঙ্গোপসাগর ও সুবিশাল নদ-নদী থেকে আহরিত সুস্বাদু জাতীয় মাছ ইলিশসহ বিভিন্ন তাজা মাছ ছিল বহুকাল ধরে বাঙালির প্রোটিন ও ফ্যাট গ্রহণের প্রধান উৎস। বিশেষ করে ইলিশের মতো তেলের মাছে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, যেমন ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ বিদ্যমান। বাঙালির ডিএনএতে FADS2 জিনের উচ্চ সক্রিয়তা মাছে থাকা এসব স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিডের বিপাক বা মেটাবলিজমকে ত্বরান্বিত করে শরীরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছে। এ ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড মানবদেহে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, মস্তিষ্কের স্নায়বিক সুস্থতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন দূর করে এবং চোখের রেটিনাসহ সমগ্র কোষের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে চমৎকার ভূমিকা পালন করে।

তবে আধুনিক যুগে কায়িক শ্রমের অভাব ও নগরায়ণের প্রভাবে এ সুপ্রাচীন জিনগত কাঠামোর অন্য পিঠও প্রকাশ হচ্ছে। বাঙালিদের মধ্যে স্থূলতার ঝুঁকি সৃষ্টিকারী FTO জিনের সংবেদনশীল রূপ বহনের হার প্রায় ৩২ শতাংশ, যা শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া কেবল শর্করাভিত্তিক খাদ্য গ্রহণের ফলে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এভাবে শতাব্দী ধরে নদী, পলিমাটি, ইলিশ মাছ ও ডিএনএর জটিল রসায়নে গড়ে ওঠা এ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র সংস্কৃতি কেবল একটি জাতির পরিচয় নয়, বরং তা বিশ্বের বিজ্ঞান মঞ্চে মানুষের বিবর্তন ও পরিবেশগত অভিযোজনের এক অপরূপ মহাকাব্যিক গল্প বলে চলেছে।

জেনেটিক স্বাতন্ত্র্য থেকে আধুনিক চিকিৎসা: জাতীয় জিনোম গবেষণার গুরুত্ব

বাঙালি জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক একক বা ‘এথনোজেনেসিস’ কোনো আকস্মিক জাদুকরি ঘটনা বা একক কোনো উৎস থেকে তৈরি হয়নি। প্রাগৈতিহাসিক প্রাক-দক্ষিণ এশীয় ভিত্তি, ঐতিহাসিক সিল্ক রুটবাহিত পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জিনের লক্ষণীয় প্রবাহ এবং স্তেপ-সংক্রান্ত ইন্দো-আর্য উপাদানের শতাব্দীপ্রাচীন মেলবন্ধনে বাঙালির রক্তপ্রবাহে গড়ে উঠেছে এক সুসংহত ও বহুস্তরীয় ‘জেনেটিক মোজাইক’। সিল্ক রুটের প্রাচীন বাণিজ্যিক ক্যানভাসে বাংলা যেমন স্থলপথ ও জলপথের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল, তেমনি বাঙালির ডিএনএ অণুও হয়ে উঠেছে ইউরেশীয় মানবজাতির স্থানান্তরের এক বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক আর্কাইভ বা পরাবাস্তব ক্যানভাস। তবে বাঙালির এ সুনির্দিষ্ট ও অনন্য জিনগত স্বাতন্ত্র্য উন্মোচনের প্রয়োজনীয়তা কেবল প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস বা নৃতাত্ত্বিক কৌতূহল মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আধুনিক জনস্বাস্থ্য, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভবিষ্যতের উন্নত রূপরেখা তৈরিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

দক্ষিণ এশীয় ও পূর্ব এশীয় জিনের এ অভূতপূর্ব মিশ্রণের কারণে বাঙালিদের বিপাকীয় ব্যাধি (যেমন টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ) এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রতি সংবেদনশীলতা বিশ্বের অন্যান্য পপুলেশনের চেয়ে কিছুটা ভিন্নতর। যেমন গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী BRCA1 জিনের মিউটেশন দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে সাধারণ মানুষের চেয়ে ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি দেখা যায়। এ কারণেই বাণিজ্যিক ডিএনএ স্ক্রিনিং এবং পপুলেশন জিনোমিকস প্রয়োগ করে সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়া এখন সময়ের দাবি। বিবাহের পূর্বে কিংবা সন্তান ধারণের আগে জিনোম স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার মতো মারাত্মক বংশগত রোগের ঝুঁকি শতভাগ এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তির জেনেটিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে তার শরীরে কোন ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ফার্মাকোজেনোমিকস’ ও ‘সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা’ ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালুর বড় পথ উন্মোচন হয়েছে।

ভবিষ্যতে বাঙালির জিনোম গবেষণাকে আরো সুসংহত ও বেগবান করতে কিছু সুনির্দিষ্ট জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি: (১) জাতীয় জিনোম প্রজেক্ট প্রণয়ন: ২০২১ সালের বাংলাদেশ জিনোম স্টাডিতে এক হাজার জনের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে ১১টি অনন্য স্থানভিত্তিক জেনেটিক ক্লাস্টার চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে সার্বিক বাঙালির জিনোমিক বৈচিত্র্য গভীরভাবে অনুধাবন করা ও দেশীয় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিস্তৃত পরিসরে ‘জাতীয় জিনোম প্রকল্প’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

(২) প্রাচীন ডিএনএ (aDNA) গবেষণার বিস্তার: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন মানবদেহাবশেষের ডিএনএ বা aDNA গবেষণার মাধ্যমে সিল্ক রুট ধরে আসা পরিযায়নের নির্ভুল সময়রেখা পুনর্গঠন সম্ভব।

পরিশেষে, মানব ইতিহাসের লিখিত দলিলগুলো প্রায়ই বিজয়ী কিংবা শাসক মহলের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাবিত ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু এ বদ্বীপের কোটি মানুষের ডিএনএতে সুসংরক্ষিত সংকেতগুলো সম্পূর্ণ অকৃত্রিম, স্বতঃস্ফূর্ত ও নিরপেক্ষ। বিখ্যাত জিনগত ইতিহাসবিদ ড. স্পেন্সার ওয়েলসের ভাষায়, আমাদের ডিএনএ হলো প্রতিটি মানুষের ভেতরে সংরক্ষিত এক অনন্য গ্রন্থ, যা লিখিত ইতিহাসে ঠাঁই না পাওয়া কোটি সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সত্য গল্প তুলে ধরে। তাই বাঙালি জাতির সুগভীর সুপ্রাচীন ইতিহাস, সহজাত শক্তি ও সহনশীলতা, এমনকি এর সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্রকে সঠিকভাবে উন্মোচন করতে হলে আমাদের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জিনোম ডিকোড বা সিকোয়েন্সিং করা অত্যন্ত জরুরি। সুপ্রাচীন সিল্ক রুটের বাণিজ্যধারা ও প্রাগৈতিহাসিক পথচলা থেকে সংগৃহীত এ জৈবিক উত্তরাধিকার আমাদের রক্তপ্রবাহে যে অনন্য স্বাতন্ত্র্য বুনে দিয়েছে, তা ঐতিহ্যের গর্ব। ভবিষ্যতের আধুনিক বিজ্ঞান, জিনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জিনোম প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের এ অনন্য প্রাগৈতিহাসিক মেলবন্ধনকে কাজে লাগিয়ে আমরা কেবল অতীত ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করব না; বরং এক সুস্থ, বৈষম্যহীন ও স্বাবলম্বী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব।

ড. তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক

ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই); ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, ফুলব্রাইট, বাংলাদেশ ও বিশ্ববিজ্ঞান একাডেমি