বিজ্ঞানীরা দেখেছেন কোনো জাতিই বিশুদ্ধ একক নয়, বাঙালিও নয়। বাঙালির ইতিহাস শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নয়, বরং অনেক জাতি, অসংখ্য ভাষা, নানা সংস্কৃতি ও বহু রক্তধারার দীর্ঘ মিথষ্ক্রিয়া। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার এ বদ্বীপ অঞ্চলে নানা দিক থেকে জনস্রোত এসেছে—কেউ জীবিকার সন্ধানে, কেউ বাণিজ্যের স্রোতে, কেউ সামরিক বিজয়ের লক্ষ্যে, আবার কেউ স্থায়ী আবাস গড়ে তুলতে। এ দীর্ঘ যাত্রাপথেই বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক, বিদেশী জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান, আন্তঃবিবাহ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে আজকের বাঙালি জাতিসত্তা। তাই বাঙালিকে কোনো একক বংশ, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বা রক্তধারার উত্তরসূরি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বহু স্রোতের মিলনে গড়ে ওঠা এটি এক মানবসমাজ, যার শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় সে বহুমাত্রিক উত্তরাধিকারের স্পষ্ট ছাপ রয়ে গেছে।
ঋগ্বেদে ‘ঐতিরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে প্রথম ‘বঙ্গ’ নামে একটি দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারত ও রামায়ণেও বঙ্গ নামে একটি জনপদের উল্লেখ রয়েছে। মোগল আমলে এ অঞ্চল ‘সুবা বাঙলা’ নামে পরিচিত হয়েছে। সম্রাট আকবরের প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে প্রথম ‘বাঙলা’ বা ‘বাঙ্গালা’ নামটি ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে আল যুক্ত হয়ে বঙ্গাল বা বাঙ্গালের উৎপত্তি। মধ্যযুগে ইউরোপীয় পর্যটকরা তাদের বিবরণীতে এ ভূখণ্ডের নাম হিসেবে ‘Bengala’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মোগল শাসনামলের সুবা বাংলা ব্রিটিশ শাসনামলে এসে বেঙ্গল প্রভিন্স বা বাংলা প্রদেশে পরিণত হয়। এভাবেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকের শাসনকালে এ ভূখণ্ডের নামের পরিবর্তন হয়েছে।
আর্যদের আগমন
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে উত্তর ভারতের গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে আর্যরা। আর্যদের আগমনের আগে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও মোঙ্গলীয় নরগোষ্ঠীর বসবাস ছিল এদেশে। তারাই ছিল এ ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র। কিন্তু আর্যভাষী জনগোষ্ঠীর আগমনের পর সংঘাতের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সহাবস্থান, কৃষি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন ঘটে। বাংলাকে তুলনামূলক প্রশাসনিক কাঠামোয় যারা শাসন করেছেন তাদের বড় অংশই বিদেশী। এর শুরুটা বলা যায় দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেনদের আমলে।
দক্ষিণ ভারতীয় সেন শাসক
দীর্ঘ সময় বংশানুক্রমিক বাংলাকে শাসন করা শাসক গোষ্ঠীদের মধ্যে সেন রাজবংশই ছিল প্রথম। সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে। পাল রাজাদের শাসনামলেই সেনরা বাংলা ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং পালদের অধীনে তারা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে পাল শাসনের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেনরা বাংলার সিংহাসন অধিকার করে নেয়। সামন্ত সেনের হাত ধরে বাংলায় সেন শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। নবম-দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে সেনরা বাংলায় তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। দীর্ঘকাল বাংলায় বসবাসের ফলে সেন রাজাদের সঙ্গে আগত অনেক দক্ষিণ ভারতীয় জন ও সাংস্কৃতিক উপাদান বাংলায় যুক্ত হয়ে যায়।
সেনরা কৌলিন্য প্রথা চালু করেন, যাতে সমাজ কয়েকটি দৃশ্যমান শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ প্রথা পরবর্তীকালে সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়েছিল এবং বাংলার সামাজিক কাঠামোকে দীর্ঘকাল প্রভাবিত করেছিল। সেন শাসকেরা ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ফলে এ সময় সংস্কৃত ভাষা ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করে।
তুর্কি আগমন
১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমণ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় তুর্কি শাসনের সূচনা হয়। এ অভিযানের ফলে সেন রাজবংশের পতন ঘটে এবং মধ্যযুগে বাংলায় মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। তুর্কি শাসনামলের শুরু থেকেই তারা মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ নির্মাণে মনোযোগ দেন। এছাড়া সুফি সাধক, ধর্মপ্রচারক ও ওলামাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। পাশাপাশি বাংলা ও ফারসি ভাষার সাহিত্য এবং কবিদের রাজদরবারে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। তুর্কি শাসকদের মধ্যে এদেশের সম্পদ লুট করে নিজ দেশে পাচার করার প্রবণতা দেখা যায়নি। বরং তারা শুরু থেকেই এ দেশকে নিজেদের স্থায়ী আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে এশিয়া এবং ইউরোপের সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে তুর্কিদের মধ্যে। আধুনিক তুর্কিদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করলে মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জিনগত মিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। আর বাংলা অঞ্চলে তুর্কিদের স্থায়ী বসবাসের ফলে তুর্কি ভাষা, সংস্কৃতি ও জিনগত বৈশিষ্ট্য স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে মিশ্রিত হয়।
আরবদের আগমন
৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষে আরবদের আগমনের সূচনা হয়। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তারা প্রধানত উপকূলীয় বন্দর যেমন চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁ অঞ্চলে যাতায়াত করতেন। বাংলা অঞ্চল থেকে সুতি কাপড়, মসলিন, চাল ও অন্যান্য মূল্যবান রত্ন সংগ্রহ করতেন। বাণিজ্যের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে ইসলামের বাণী পৌঁছানোও তাদের অন্যতম কাজ ছিল। এ বণিকদের সততা ও ধর্মপরায়ণতা বাংলার জনগণকে খুব সহজেই প্রভাবিত করে এবং ব্যাপক হারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। ফলে আরবীয়রা অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
আরবদের বসবাসের আরেকটি তরঙ্গ লক্ষ করা যায় ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে হজরত শাহজালালের (রা.) আগমনের পর। শাহজালাল (রা.) তার সঙ্গে ৩৬০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে এসেছিলেন। তার সঙ্গীরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট অঞ্চলে এসে পৌঁছলে তৎকালীন সিলেটের হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দ পথিমধ্যে তাদের বাধা প্রদান করেন। শাহজালাল (র.) তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে সেসব বাধা অতিক্রম করেন, ফলে গৌড় গোবিন্দ রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। অতঃপর শাহজালালের (রা.) সঙ্গীরা সেখানেই বসবাস শুরু করেন। তারা যখন সিলেটে এসেছিলেন, তখন মাত্র এক ঘর মুসলমান ছিল সমগ্র অঞ্চলে। ধীরে ধীরে তাদের প্রভাবে সিলেট অঞ্চলে ইসলামের বিকাশ ঘটতে শুরু করে।
আফগান শাসন
১৫৩৮ সালে শের শাহ সুরির বাংলা অভিযানের মধ্য দিয়ে বাংলায় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আফগানদের জিনগত বৈশিষ্ট্যে মূলত তুর্কি ও মধ্য এশীয় বংশধারার আধিপত্য রয়েছে। আফগানরা বাংলায় শুরু থেকেই স্থায়ীভাবে আবাস গড়ে তোলে এবং স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে মিশে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়। অনেকেই স্থানীয় নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফলে আফগান বংশধররাও ধীরে ধীরে বাঙালি সমাজের অংশ হয়ে ওঠেন। ধর্মীয় দিক থেকে আফগানরা ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিল। তাই তারা বহু মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
মোগল শাসন
মধ্য এশিয়ার ফরগনা রাজ্যের অধিপতি এবং তুর্কি-মোঙ্গলীয় বংশোদ্ভূত জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবরের ভারত আক্রমণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ইতিহাসে মোগল রাজত্বের সূচনা হয়। বংশপরম্পরায় আকবর যখন সিংহাসনে আসীন, তিনি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য বাংলা অঞ্চলকে মোগল পতাকাতলে নিয়ে আসেন। মোগলদের জীবনধারায় মধ্য এশীয় সংস্কৃতি ও আরবি-ফারসি ভাষার প্রাধান্য দেখা যায়, যা বাঙালিদের জীবনে রেখাপাত করে। মোগলদের আগে এ ভূখণ্ডের জনগণের মধ্যে স্থাপত্য-চিত্রকলার প্রতি লক্ষণীয় আগ্রহ দেখা যায়নি।

বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাকারী বখতিয়ার খলজির মুদ্রা
মোগলরা স্থাপত্য ও চিত্রকলাকে ব্যাপক প্রসারিত করে। দীর্ঘকাল মোগল শাসনাধীন থাকার ফলে বাঙালি সংস্কৃতিতে পারস্যের কৃষ্টি, প্রশাসন ও রীতিনীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পর্তুগিজদের আগমন
ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনকারী প্রথম ইউরোপীয় জাতি ছিল পর্তুগিজরা। নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে সমুদ্রাভিযানে বের হয়ে পথ হারিয়ে ১৪৯৮ সালের ২০ মে ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছান পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা। পরবর্তী সময়ে তার আবিষ্কার করা পথ দিয়েই অসংখ্য পর্তুগিজ বণিক ভারতে আসেন। প্রথম দিকে গোয়া, দমন, দিউ, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে তারা। ১৫২৮ সালের দিকে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করার অনুমতি পায়। স্থানীয় চাটগাঁইয়ারা আগত এ পর্তুগিজদের ‘ফিরিঙ্গি’ বলে ডাকত।

ঔপনিবেশিক আমলে চট্টগ্রামে নির্মিত পর্তুগিজদের প্রশাসনিক দুর্গ
পর্তুগিজরা তাদের সঙ্গে করে বিদেশী ফুল, ফল যেমন কাজুবাদাম, পেঁপে, আনারস, কামরাঙা, পেয়ারা, গোলআলু প্রভৃতি নিয়ে এসেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বাঙালির জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। আগমনের প্রথম দিক থেকেই পর্তুগিজরা স্থানীয় নারীদের সঙ্গে বিয়েতে আপত্তি করেনি। বরং পর্তুগিজ গভর্নর আলফোনসো ডি আলবুকার্ক ভারতে পর্তুগিজদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তার জন্য ভারতীয়দের সঙ্গে বিয়ে করতে উৎসাহিত করতেন। পর্তুগিজ পুরুষ ও ভারতীয় নারীদের বিবাহের মাধ্যমে একটি নতুন প্রজন্মের উদ্ভব হয়, যারা ‘লুসো-ইন্ডিয়ান’ নামে পরিচিত হয়। এ ‘লুসো-ইন্ডিয়ান’রা পরে এদেশের জনস্রোতে মিশে যায় এবং পর্তুগিজ অনেক শব্দ যেমন চাবি, বালতি, পেরেক, আলপিন ও আরো অনেক শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে যোগ হয়েছে। এভাবেই পর্তুগিজদের জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির অনেক কিছুই বাঙালিদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। বাঙালিদের মধ্যে পর্তুগিজ বংশ পদবিও পাওয়া যায়।
আরাকানিদের আগমন
ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরাকান তথা ম্রাক উ রাজবংশের দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল। ১৬৬৬ সালে মোগলদের হাতে আরাকান বাহিনী পরাজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চল তাদের দখলে বা প্রভাবাধীন ছিল। ফলে এই অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যে তার ছাপ আজও দৃশ্যমান।
১৪০৬ সালে আরাকানরাজ মিন সাউ মুন বা নরমিখলা নিজ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পালিয়ে এসে বাংলায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই প্রথম আরাকানিরা বাংলা ভূখণ্ডে বসবাসের উদ্দেশ্যে আগমন করে। নরমিখলার সঙ্গে তার পরিবার ও কিছুসংখ্যক অনুচরও এসেছিল। তারা ১৪০৬-৩০ পর্যন্ত বাংলায় অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের অসংখ্য লোকজন চাকরির জন্য আরাকান গমন করেছে। এতে উভয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে।
ব্রিটিশ শাসন
১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিতে ভারতবর্ষে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাণিজ্যের ক্রমাগত উন্নতি ও প্রসারে ধীরে ধীরে কোম্পানি ভারতের শাসনকার্যে মনোনিবেশ করতে শুরু করে। ১৭৬৫ সালে তারা বাংলার দিউয়ানি লাভ করতে সমর্থ হয়। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা বণিকরা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজন। কিন্তু কোম্পানির প্রতি অবিশ্বাস ও জনরোষের ফলে ১৮৫৮ সালের মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এ ঘটনা ব্রিটিশরাজের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। ফলে কোম্পানির শাসনের অবসান করে সরাসরি ভারতের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় ব্রিটিশরাজ। প্রায় ২৫০ বছর ধরে প্রজন্মান্তরে ব্রিটিশ কর্মকর্তা-কর্মচরীরা ভারতে অবস্থান করেছে। এ দীর্ঘ সময়ে খুব কম সংখ্যক ব্রিটিশই তাদের পরিবার পরিজনদের সঙ্গে রাখতে পারতেন। বাংলায় তাদের জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখার জন্য অনেকের মধ্যেই দাসী বা রক্ষিতা রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আবার এর মধ্যে একটি অংশ এদেশীয় নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরিবারও গড়ে তোলেন। এ রকম ব্রিটিশ পুরুষ ও ভারতীয় নারীর বিবাহের ফলে একটি নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি হয়, যারা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বা ইঙ্গ-ভারতীয় নামে পরিচিত হয়। এ প্রজন্ম বাঙালি ও ব্রিটিশ সংস্কৃতির সমন্বয়ে নতুন একটি মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দেয়। ভিন্ন দুই জাতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ নতুন প্রজন্ম পরবর্তী সময়ে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
শাসন করা ছাড়াও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বহু জাতির আগমন ঘটেছে, যারা বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেছে এবং পরবর্তী সময়ে বাঙালি সমাজের অংশ হয়ে গিয়েছে। ফলে বাঙালির রক্তেও মিশে গেছে এসব বিচিত্র নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব।

ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ চিত্রে বাঙালির প্রতিচ্ছবি
গ্রিকদের আগমন
বাংলাদেশে আসা ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে গ্রিকরাই ছিল সর্বশেষ জাতি। সতেরো-উনিশ শতকের দিকে গ্রিক বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশে সর্বশেষে এলেও ভারত ভূমিতে বহু আগেই এসেছিল গ্রিক জাতি। দিগ্বিজয়ী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে ভারত আক্রমণ করেন এবং এ অঞ্চলে প্রথম গ্রিকদের প্রবেশ ঘটে। তবে আলেকজান্ডারের এ অভিযানকালে বাংলার ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যের পরাক্রমশালী ও বিশাল সৈন্যবাহিনীর ভয়ে গ্রিক বাহিনী বাংলায় প্রবেশ করতে সাহস করেনি। আঠারো শতকে এসে গ্রিকরা মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পাট, লবণ, চুন ও অন্যান্য ছোটখাটো ব্যবসা করত।
অত্র অঞ্চলে থাকাকালে যেসব গ্রিক মৃত্যুবরণ করেছিল, তাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অবস্থিত। সৌধটি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি নির্মিত হয়েছিল এবং নকশাগত দিক থেকে একে অনেকটাই প্রাচীন গ্রিক মন্দিরের মতো দেখায়। এছাড়া ঢাকায় চকবাজারের মুকিম কাটরা রোডের পাশে একটি অর্থোডক্স গির্জাও নির্মাণ করেছিল গ্রিকরা। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে গির্জাটি ধসে পড়লে পরিত্যক্ত জমিতে ব্রিটিশ সরকার একটি মেডিকেল কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বর্তমানে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ নামে সর্বজনবিদিত।
বর্তমান লেখার বিবরণীটি পূর্ণাঙ্গ নয়। তবে বাংলার ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক গঠনে যে বহু ভিনদেশী জনস্রোতের ভূমিকা রয়েছে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাহ্যিক সাংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব অনেকটাই স্পষ্ট। বাঙালির জিনগত গঠনে তাদের ভূমিকা কেমন তা সামনের দিনে অরো উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে আসবে নিশ্চয়ই।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা





