২০১৭ সালের পুলিৎজার বিজয়ী উপন্যাস ‘দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’-এর কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস ১৫ বছর বয়সী কিশোরী কোরা আশাবাদী কথাটার মানে জানে না। এ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় আছে কিনা, জানার জন্য অন্য মেয়েদের আশাবাদীর মানে জিজ্ঞেস করল। তাদের কেউই শব্দটি শোনেইনি। তখন কোরা নিজেই সিদ্ধান্ত নিল, আশাবাদী মানে চেষ্টা করা। আরো একজন ক্রীতদাস যুবক সিজার কোরার কাছে এগিয়ে এল। বলল, চলো উত্তরে পালিয়ে যাই।
কোরা বলল, না।
এটা ঠিক কোরা নয়, যেন তার দিদিমা বলছে, হোক ক্রীতদাসের জীবন, মরব এই মাটিতেই। কোরার মা এই ক্রীতদাস ভূমিতেই মেয়েকে পরিত্যাগ করে চলে যায়।
একসময় কোরাকেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়— পালিয়ে যাবে, উত্তরে মুক্তাঞ্চলে। কিন্তু কোন পথে?
পলায়নপর ক্রীতদাসরা উনিশ শতকের প্রথমার্ধে যে পথ বেছে নিয়েছে, সেই পথে, আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডে।
এ উপন্যাসটির রচয়িতা কলসন হোয়াইটহেড এখনো পঞ্চাশ হননি। তার জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৬৯ নিউইয়র্ক শহরে, বেড়ে ওঠেন ম্যানহাটনে। পড়াশোনা ও স্নাতক ডিগ্রি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রথম উপন্যাস ‘দি ইনটুইশনিস্ট’ ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত। তারপর জন হেনরি ডেজ (২০০১), অ্যাপেক্স হাইডস দ্য হার্ট (২০০৬), স্যাগ হারবার (২০০৯), জোন ওয়ান (২০১১), পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালে ‘দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’। ‘দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড’ ২০১৬-এর ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন পুরস্কার লাভ করে এবং ২০১৭ সালে পুলিৎজার।
তার একটি নন-ফিকশন গ্রন্থ রয়েছে ‘দ্য কলোমাস অব নিউইয়র্ক’ (২০০৩)। তিনি প্রিন্সটন, হিউস্টন, কলম্বিয়া ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল সাহিত্য পড়ান। ২০১৫-তে যোগ দিয়েছেন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে। কলসন দুই সন্তানের জনক। তার স্ত্রী পেশাগত লিটারেরি এজেন্ট।
আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড কোনো ভূতল মেট্রো, টিউব বা সাবওয়ে রেলওয়ে নয়। যদিও রেলরোড, স্টেশন, টিকিট এসব শব্দ এতে বহুল ব্যবহূত, কার্যত রেললাইন কিংবা ট্রেনের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত হয়।
উনিশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দী, আফ্রিকান আমেরিকান ক্রীতদাসরা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্য থেকে যে গোপন রুটের নেটওয়ার্ক ধরে স্বাধীন অঙ্গরাজ্য ও কানাডায় পালিয়ে গেছে, তা-ই আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড। নেটওয়ার্কের মধ্যে বহুসংখ্যক সেফ হাউজ ছিল, যা ক্রীতদাসদের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপদ আশ্রয়। পালাতে সাহায্য করতেন অ্যাবলিশনিস্টরা (যারা দাস প্রথার বিলুপ্তি চাইতেন) আর বিভিন্ন ধরনের সহানুভূতিশীল মিত্র। অ্যাবলিশনিস্টদের মধ্যে সাদা ও কালো মানুষ ছিলেন, ক্রীতদাস ও মুক্ত মানুষ ছিলেন, যারা পলাতক দাসদের সাহায্য করেছেন। ধরা পড়া থেকে রক্ষা করেছেন। প্রথম দিককার একটি প্রধান পালানোর পথ ছিল ফ্লোরিডার দিকে, বেশ কয়েকটি রুট ধরে মেক্সিকো যাওয়া যেত। এই কাল্পনিক রেলরোড ধরে ১৮৫০ সালের মধ্যে আনুমানিক ১ লাখ ক্রীতদাস পালিয়েছে।
পলায়নরত দাসরা ধরা পড়লে ১৭৯৩ সালের ফিউজিটিভ স্লেইভ অ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতো। এমন মামলার সংখ্যা পাঁচ হাজারের ওপরে। তবে স্বাধীন অঙ্গরাজ্য ও সেখানকার নাগরিকরা ফেডারেল আইন হিসেবে এর অস্তিত্ব স্বীকার করলেও প্রয়োগ করতেন না। এ আইনে সন্দেহভাজন ক্রীতদাস নিজের প্রতিরক্ষার জন্য আদালতে লড়তে পারতেন না। আদালত যদি রায় দিতেন যে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ক্রীতদাস, তাহলে বিচারককে ১০ ডলার পারিশ্রমিক দেয়া হতো আর সন্দেহভাজন ব্যক্তি সাধারণ স্বাধীন মানুষ সাব্যস্ত হলে বিচারক পেতেন ৫ ডলার। এ ছিল ঘুষ দিয়ে রায় কেনার মতো অবস্থা। হেরিয়েট টাবম্যান নামের এক নারী ৭০ জন ক্রীতদাসকে মুক্ত করে তাদের নিরাপদ রাজ্য ও কানাডায় নিয়ে যান। হেরিয়েট টাবম্যানকে বলা হতো ক্রীতদাসদের মোজেস। রিলিজিয়াস সোসাইটি অব ফ্রেন্ডসের অ্যাবলিশনিস্ট লেডি কফিন ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন দুই হাজার ক্রীতদাসকে স্বাধীন হতে সাহায্য করেন।
আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের অর্থবোধক কিছু শব্দ
এজেন্ট বা শেপার্ড: যারা ক্রীতদাসদের রেলরোডের সন্ধান দিতেন।
কন্ডাক্টর: যারা পালানোর পথে গাইড হিসেবে কাজ করতেন।
স্টেশন: পালানোর পথে লুকোনোর জায়গা।
স্টেশনমাস্টার: যিনি পলায়নরত ক্রীতদাসদের নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছেন।
প্যাসেঞ্জার কিংবা কার্গো: যারা মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে গেছেন।
সেফ হোম: পথিমধ্যে নিরাপদ কোনো আশ্রয়স্থল।
স্টকহোল্ডার: রেলরোডকে পুঁজি করে যারা পয়সা কামাতেন।
ফ্রিডম ট্রেন: রেলরোড।
হেভেন কিংবা প্রমিজড ল্যান্ড: কানাডা।
উইলিয়াম স্টিলকে বলা হয় আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের জনক। তিনি শত শত ক্রীতদাসের মুক্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেন এবং কোনো কোনো মাসে ৬০ জনও এ রেলরোড দিয়ে পাচার করতে সমর্থ হন। তাদের অনেককে তিনি তার ফিলাডেলফিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছেন। যারা পালিয়ে গেছে এবং যারা রয়ে গেছে, তাদের মধ্যকার সেতুবন্ধ হিসেবে উইলিয়াম স্টিল কাজ করতেন। তিনি অনেক ক্রীতদাসের জবানি লিপিবদ্ধ করেন। ১৮৭২ সালে তিনি ‘দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড: অথেনটিক ন্যারেটিভস অ্যান্ড ফাস্টহ্যান্ড অ্যাকাউন্টস’ প্রকাশ করেন। এটি দাসমুক্তির ইতিহাসের একটি আকর গ্রন্থ। ১৮৬৫-এর ৬ ডিসেম্বরের ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ হয়।
কলসন হোয়াইটহেড এ রেলরোডকে বাস্তব রেলরোড বিবেচনা করে দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড উপন্যাসটি রচনা করেছেন। ২০১৬-তে প্রকাশিত উপন্যাসটি একালের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
স্লেইভ স্টেট ও ফ্রি স্টেট
যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঙ্গরাজ্যে দাসপ্রথার বৈধতার আইনগত বিধান প্রণীত ছিল, সেগুলোই স্লেইভ স্টেট আর যেসব অঙ্গরাজ্যে নিষিদ্ধ ছিল কিংবা যেসব রাজ্য থেকে পর্যায়ক্রমে দাসপ্রথা উঠিয়ে নেয়া হচ্ছিল, সেগুলো ফ্রি স্টেট। সুতরাং ক্রীতদাস পালানোর পরিকল্পনার সময় ফ্রি স্টেট বা মুক্ত রাজ্যগুলোর নাম মাথায় রাখত।
যে ১৩টি ব্রিটিশ কলোনি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যাত্রা শুরু, তার প্রতিটিতে দাসপ্রথা বহাল ছিল। পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক বিস্তার ও নতুন রাজ্যের সৃষ্টিতে বর্তমানে অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০।
১৮১২ সালের আগের স্লেইভ স্টেটগুলো হচ্ছে— জর্জিয়া, ডেলাওয়ার, ম্যারিল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, কেন্টাকি, টেনেসি ও লুইজিয়ানা। আর ফ্রি স্টেটগুলো হচ্ছে— নিউজার্সি, পেনসিলভানিয়া, কানেক্টিকাট, ম্যাসাচুসেটস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউইয়র্ক, রোড আইল্যান্ড, ভারমন্ট এবং ওহাইয়ো।
১৮১২ সালের পর যে অঙ্গরাজ্যগুলো ফ্রি স্টেট ঘোষিত হয়, সেগুলো হচ্ছে— ইন্ডিয়ানা, ইলিনয়, মেইন, মিশিগান, আইওয়া, উইসকনসিন, ক্যালিফোর্নিয়া, মিনেসোটা, ওরেগন, কানসাস এবং সর্বশেষে ১৮৮৪ সালে নেভাদা।
অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে লেখক
আমার বয়স তখন ১৪ বছর। স্থানীয় লাইব্রেরিতে ১৮৫১ সালে ভোটাধিকার কনভেনশনে দেয়া সোজর্নার ট্রুথের (কৃষ্ণাঙ্গ নারী নেত্রী, জন্ম: ১৭৯৭, মৃত্যু: ১৮৮৩) দেয়া ভাষণ ‘আমি কি নারী নই?’ পড়লাম। ৩০ বছর দাসত্বের পর তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী হয়ে ওঠেন। দাসত্ব ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং নারীর অধিকারের পক্ষে। তার লেখা আমার ভেতর কিছু একটা জাগিয়ে তুলল, আর তা আমি ভুলতে পারলাম না, বিশেষ করে শেষ অনুচ্ছেদটি:
‘প্রথম নারী ঈশ্বরকে যদি এতটা শক্তিশালী করে তোলা হয় যে, তিনি পৃথিবীটা পুরোপুরি উল্টে দিতে পারবেন, তাহলে এ (ক্রীতদাস) নারীরা পৃথিবীকে আবার উল্টে দিয়ে ঠিক অবস্থানে নিয়ে আসতে পারবেন।’
সেদিন আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার যাত্রা শুরু। দশকের পর দশক ধরে আমি এখনো ক্রীতদাসের বিবরণ, তাদের ইতিহাস, উপন্যাস পড়ে চলেছি। আর তাই আমাকে প্রতিদিন দিচ্ছে আমার পূর্বপুরুষদের উত্তাপ।
আমি যখন কলসন হোয়াইটহেডের উপন্যাস দি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের অগ্রিম কপি পাই, তখন আমি ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে। আমি কলসনের কোনো লেখা আগে পড়িনি (তার প্রকাশিত উপন্যাস পাঁচটি, দুটি নন-ফিকশন এবং তিনি পুলিৎজারের ফাইনালিস্ট), কিন্তু বইটি সম্পর্কে আমি শুনেছি। ১৬ বছর বয়সী একটি মেয়ের চোখে ইতিহাস যেমন করে ধরা পড়েছে এবং তাতে সময়ের যে প্রতিসরণ হয়েছে, তা-ই আমাকে বইটি পড়তে আগ্রহী করে তোলে।
উপন্যাসের সূচনা বাক্যটিই আমার হূিপণ্ডে মোচড় দেয়: উত্তরে পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে সিজার কোরাকে যখন প্রথম বলল, সে জবাব দিল, না।
আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, তুমি আমাকে পাঠক হিসেবে পাবে। কোরা আসলে কোন বিষয়ে না বলছে এবং কেন? সিজার কে? আর তাকে কতবার বলতে হবে! আমি সবকিছু জানতে চাই। আমি দেখলাম কোরা তৃতীয় প্রজন্মের একজন ক্রীতদাস বালিকা, এই চাষাবাদের খামারেই তার দাদির মৃত্যু হয়েছে। আর এখানেই তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখান থেকে চলে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু সিজার তাকে এটা ভাবাচ্ছে। সে তাকে একটি সত্যিকার ট্রেনের দিকে নিয়ে যায়, যে ট্রেন মাটির নিচ দিয়ে চলে, আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে, যে ট্রেন তাদের জর্জিয়াতে একটি নতুন জীবনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখানে আমি থামলাম।
আমি হেরিয়েট টাবম্যানের লেখায় অনেক দিন ধরে মুগ্ধ। আমি জানি উনিশ শতকের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের কথা; গোপন রুট ও গোপন বাড়িঘরের একটি নেটওয়ার্ক, আর তা ক্রীতদাসের উত্তরে পালিয়ে যাওয়ার পথ— এর সঙ্গে বাস্তব ট্রেনের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু কলসন এমনভাবে ব্যাপারটা গড়ে তুলেছেন, আমার মনে হয়েছে, আমি স্পষ্টভাবেই ট্রেন দেখতে পাচ্ছি। তার বয়ান এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে সৃষ্টি করা যে, আমি যা জানি, তা ভুল কিনা, আমাকে বারবার দেখে নিতে হয়েছে।
আমি যখন পড়ছিলাম কোরার যে অনুভূতি, সেটা ছিল আমারই, দাসত্বের আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ফেলেছে, তারপর আগন্তুকদের মহিমা ও দয়া বারবার বিস্মিত করেছে। এ মেয়েটিকে সাহায্য করার জন্য অন্যরা বারবার নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। আমি ভেবেছি আসল শক্তিটা কোথায়? ও প্রান্তে তার জন্য কী নিষ্ঠুরতা অপেক্ষা করছে, তা না জেনে কোরা চলছে কেমন করে? আমি এক বসায় বইটি শেষ করতে পারিনি, আমাকে থামতে হয়েছে। যেটুকু পড়েছি, তা প্রক্রিয়াজাত করতে হয়েছে, ক্রোধ ও কান্না সামাল দিতে হয়েছে, তারপর আবার কাহিনীতে ফিরে গেছি।
কোরা ফিকশনের একটি চরিত্র— কিন্তু তার অডেসি— সত্যিকারের এক নায়িকার সফর, যা আমাকে অতীত বুঝতে সাহায্য করেছে। আর আমরা কেমন আছি, তাও বুঝিয়েছে। ভালো সাহিত্য তো শেষ পর্যন্ত তা-ই করে। কী চিন্তা করতে হবে, কী অনুভব করতে হবে ভালো সাহিত্য তা বলে দেয় না। পাঠকের মনে একটি পরিসর তৈরি করে দেয়, যেখানে এসব ব্যাপার ঘটে। শেষ পৃষ্ঠা উল্টানোর পর সঙ্গে সঙ্গেই জেনে যাই, আমি এমন একটা কিছু পড়েছি, যা আমাকে ছেড়ে যাবে না। এটা আমার অপরাহ বুক ক্লাবের জন্য অবশ্যই নির্বাচিত, এ নিয়ে লেখকের সঙ্গে বসার দরকার নেই।
অপরাহ উইনফ্রে: আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডে সত্যিকার ট্রেন, কন্ডাক্টর, স্টেশন, টানেল এসব নিয়ে আসার ধারণা আপনি কেমন করে পেলেন?
কলসন হোয়াইটহেড: বহু মানুষ যখন প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ের কথা শোনে, ধরে নেয় এটা বাস্তবের সাবওয়ে (টিউব কিংবা ভূতল মেট্রোরেল) ট্রেন ব্যবস্থা। কিন্তু যখন জানতে পারে ব্যাপারটা তা নয়, তারা খানিকটা নিরাশ হয়ে পড়ে। তাই আমি ভাবলাম অসুবিধে কী, এটাই হোক না সত্যিকারের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন নেটওয়ার্ক, এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে যায়, প্রতিটি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যখন যায়, বিভিন্ন ধরনের সুযোগ ও বিপদের মধ্য দিয়ে এগোয়।
অপরাহ: আপনার বইয়ে এমন একটা কিছুর ওপর মনোযোগ দিয়েছেন, যা আমাকে টনি মরিসনের ‘বিলাভড’ উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে ক্রীতদাসরা তাদের আঙ্গিনা ছেড়ে যেতে রাজি নয়। তার পরও শেষ পর্যন্ত তাদের পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি নিজেকে সে প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে দেখি, সঠিক সময়ই আমার জন্ম হয়েছে। কোরা যা করতে পেরেছে, আমি পারতাম না। আমি কখনো সেই আঙ্গিনা ছেড়ে বের হতাম না। আমার সে সাহস ছিল না।
কলসন: আমি দেখতে চেয়েছিলাম একটি চরিত্র যখন কেবল প্লানটেশন খামারের ট্র্যাজেডিটাই জানে, কেমন করে সে নিজের প্রথম পদক্ষেপটি নেয়। আর একবার এ পদক্ষেপ নেয়া হয়ে গেলে একজন এ যাত্রায় কেমন করে এগোবে যদি ধরা না পড়ে, নিহত না হয় তাহলে। বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে— পথ দেখানোর জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণ চাঁদের রাত পর্যন্ত, নির্ভর করতে হবে সম্পূর্ণ অচেনা আগন্তুকের ওপর। যে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।
অপরাহ: আপনার আগের কোনো বই তো বর্ণ কিংবা দাসপ্রথা নিয়ে নয়। এবার তাহলে কেন?
কলসন: বহু বছর আমার মনে হয়েছে, দাসপ্রথা নিয়ে লেখার জন্য আমি প্রস্তুত নই। বিষয়টি ব্যাপক, আমি চাইনি গুবলেট পাকিয়ে ফেলি। আমি জানি, কাহিনী বস্তুনিষ্ঠ করার জন্য কোরা ও অন্যান্য চরিত্রকে ভয়ঙ্কর সব ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে হতো। আমাকে জানতে হয়েছে, যেন আমি সঠিকভাবে লিখতে পারি। সে কারণে এটা শুরু করতেই আমার ১৬ বছর কেটে যায়।
অপরাহ: ১৬ বছর?
কলসন: কাহিনীর যখন অঙ্কুরোদ্গম ঘটছিল, আমি অন্যান্য বই লিখি। আমি ভাবতে থাকি, মনে হয় তখনো পর্যাপ্ত জানা হয়নি যে আমি কাহিনীর প্রতি সুবিচার করতে পারব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে শুরু করতে হয়েছে।
অপরাহ: ক্রীতদাস প্রভুরা শাস্তি দেয়ার যেসব পদ্ধতি কল্পনা করেছে এবং এ বইয়ের অনেককে যা সইতে হয়েছে, তাতে ক্রীতদাসদের নিয়ে বিস্তারিত লেখার জন্য আপনাকে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে অনেক পড়তে হয়েছে...।
কলসন: হ্যাঁ, আমি কোথাও অতিরঞ্জন কিছু করিনি। ১৯৩০-এর দশকে সরকার ৮০-৯০ বছর বয়স্ক ক্রীতদাসদের সাক্ষাত্কার নেয়ার জন্য লেখকদের টাকা দিয়েছে। আমি সেসব বিবরণ পড়েছি। ব্যাপারটা বিস্ময়কর নয়, আমি বুঝতে পেরেছি ক্রীতদাস প্রভুদের অনেকেই ছিল মর্ষকামী, মানুষকে আঘাত করার শাস্তি দেয়ার সৃজনশীল পদ্ধতি বের করতে তারা অনেক সময় কাটিয়েছে।
অপরাহ: আর সেসব শাস্তি তো অনেক সময় প্রদর্শনী হিসেবে বিনোদনের জন্য করা হতো। আপনার পড়া কোনো নির্দিষ্ট বাস্তব গল্প থেকে কি কোরা চরিত্রটি উঠে এসেছে?
কলসন: কোরা প্লানটেশন খামার ছেড়ে পালিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড ধরে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এবং তারপর উত্তর ক্যারোলাইনায় চলে এসেছে। গোটা সময়টা একটা চিলেকোঠায় লুকিয়ে ছিল, সে ধরা পড়বে না এবং তাকে ফিরিয়ে আনা হবে না— এটা কখনো বিশ্বাস করেনি। হেরিয়েট জ্যাকবস থেকে কোরার অনুপ্রেরণা।
অপরাহ: হেরিয়েট জ্যাকবসের ‘ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব আ স্লেইভ গার্ল’?
কলসন: হ্যাঁ, হেরিয়েট জ্যাকবস তার নির্মম মালিকের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তার দিদিমার খুপড়ির ওপর হামাগুড়ি দিয়ে থাকা যায়— এমন একটি জায়গায় সাত বছর কাটিয়ে দিয়েছেন— তিনি অপেক্ষায় ছিলেন একটি নৌকা এসে তাকে উত্তরে নিয়ে যাবে। আমি লিন্ডা ব্রেন্টের কথা ভাবি, এটাই হেরিয়েটের ছদ্মনাম— যখন ঝুঁকিবহুল পরিস্থিতিতে কোরাকে স্থাপন করার কথা মনে হয়। আবার সেখান থেকে তার উত্তরণও।
অপরাহ: মনে আছে আমি যখন বিলাভড সিনেমাটিকে তুলে ধরি, একজন আফ্রিকান-আমেরিকান সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, দাসত্ব নিয়ে আরো একটা গল্পের কী দরকার? আমি তাকে বলেছি, আপনি কয়টা দেখেছেন?
কলসন: আসলে দাসত্ব কেমন ছিল, কত নির্মম প্রহসন আর এখনো এর কী প্রভাব, আমরা জানি না, বুঝিও না। দাস হওয়ার মানে ঈশ্বর যত বছর না সুযোগ দিচ্ছেন, পরিবারের সদস্য যারা, তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আর সুযোগ নেই। তার মানে মাঠ থেকে তুলো তুলে ফিরে এসে দেখলেন আপনার ছেলেমেয়েরা চলে গেছে, স্বামী চলে গেছে, মাও নেই। তার মানে আপনি হচ্ছেন দ্রব্যসামগ্রী, সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি হয়ে যাবেন, আপনার মূল্য কেবল আবাদি অর্থনীতিতে জোগান দেয়া অব্যাহত রাখা।
অপরাহ: এতসব নির্মমতার পরও আমি এ বই থেকে সাহসের অনুপ্রেরণা বা এমন এক অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে এসেছি যে, ক্রীতদাস হতে সাহস লাগে। মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিভে যায়নি। চেষ্টা করার লড়াই করার আকাঙ্ক্ষা বিলুপ্ত হয়নি। আমি ভেবেছি, ওহ! আমি তো এখান থেকেই উঠে এসেছি, এরাই আমার মানুষ। এ গল্প আমাকে সাহস দিয়েছে, আরো কেন্দ্রীভূত করেছে। আপনার তো দুটি সন্তান— একটি ছেলে, একটি মেয়ে। আপনি বিশেষ করে তাদের জন্যই কি বইটি লিখেছেন?
কলসন: হ্যাঁ। তাদের বয়স এগারো ও তিন বছর। আমি যদি বাবা না হতাম তাহলে এ রকম একটি বই লিখতাম না। বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তান— ক্রীতদাস প্রথার নির্মম বাস্তবতাকে আরো অনুধাবন করিয়েছে— পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। অন্যদিকে আমি যখন আমাদের ইতিহাস নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি, আশা আমাকে ফিরিয়ে আনে, আমার সন্তানদের জন্য নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে।
কলসন বচন
* দানব হচ্ছে একজন মানুষ, যে ভান করা থামিয়ে দিয়েছে।
* যেভাবেই হোক আমরা অন্য মানুষদের দেখি না, তাদের আমরা দানব বানিয়ে ফেলি।
* পৃথিবীতে যদি ন্যায়বিচার থাকত তাহলে আমেরিকার অস্তিত্ব থাকত না; কারণ এ রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে খুন, চুরি ও নির্দয়তা।
* আফ্রিকানদের নয়, যখন সাদাদের কাঁধে জোয়াল দেয়া হয় দাসত্ব একটি পাপ। সব মানুষই সমান হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে, যতক্ষণ না আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে তুমি মানুষ নও।
* ব্যর্থতাই অভিব্যক্তির পথ দেখায়, শুদ্ধতায় উন্নয়নের কোনো প্রণোদনা থাকে না, কোনো কিছু সম্পূর্ণ শুদ্ধ নয়।
* একটি সমাজ তার প্রয়োজন অনুযায়ী নায়ক উৎপাদন করে।
* যন্ত্রণা শেষ করে দেয়া যায়। কিন্তু দুঃখবোধকে কিছু করা যায় না, তবে ড্রাগ কিছু সময়ের জন্য এর মুখ বন্ধ করে দেয়।
* তুমি অন্ধকারে কতক্ষণ হারিয়েছিলে, তা বোঝার একমাত্র উপায় অন্ধকার থেকে রক্ষা পাওয়া।
* অর্থহীন সত্যের চেয়ে কখনো কখনো অর্থপূর্ণ বিভ্রম ভালো।
* পৃথিবীতে বহুকিছু আছে, যা মৃত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তবুও তারা হাঁটে।
* চোরাই পথে মানুষ এনে চোরাই জমিতে কাজে লাগানো— এটা এমন এক ইঞ্জিন, যা কখনো থামে না; এর ক্ষুধার্ত বয়লার কেবল রক্ত খায়।
* সাদারা এ জমিতে এল, নতুন করে শুরু করবে, প্রভুদের স্বৈরাচার থেকে পালাতে, আগের দাসরা যেমন পালিয়ে গেছে। এখন যা স্বৈরাচার মনে হয়, কালোদের বেলায় তা মনে হয়নি।
* দুর্ভোগেরও একটি শৃঙ্খলা আছে, একটি দুর্ভোগ অন্যটিতে ঢোকানো, আর তোমার কাজ হচ্ছে দুর্ভোগের ট্র্যাকে থাকা।






