১.

গ্রামে তখনো বিদ্যুৎ বা পাকা রাস্তা পৌঁছেনি। মফস্বলের কলেজ থেকে সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে কুঁচে ধরা মুরগির মতো গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছি। রাশি রাশি রঙিন স্বপ্ন চেতনায় চকচক করছে। বিশাল কিছু একটা করে ফেলব; কিন্তু কী করব এবং সেটা কতটা বিশাল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজশাহী শহরে পা রাখি। সঙ্গে সহপাঠী আলিম ও নাজমুল। নাজমুলকে খোট্টা চাচা বলে ডাকি, কারণ তার চেহারায় ও চলাফেরায় অতি প্রাচীনপন্থী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। খোট্টা চাচার এলাকার বড় ভাই রবিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ্মখ্দুম হলের ৩১৭ নং রুমে থাকত। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বড় ভাই বাইরে আছে। কখন ফিরবে, সেটা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ সাধারণ মানুষের হাতে তখনো মোবাইল আসেনি।

হলের গেটে একটি মাত্র ফোনের ব্যবস্থা। কারো ফোন এলে ছাত্ররা সবাই মিলে চিত্কার করে সে বার্তা রিলে পাসের মতো কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিত। সবার উৎসাহী চিত্কারে পুরো হলে প্রাইভেসির দেউলিয়াত্ব প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

হলের সামনে বিশাল মাঠের মাঝখানে বিস্তৃত ঘাসের ওপর বসে পিথাগোরাসের গাণিতিক সূত্রগুলো ব্যবহার করে সমাধান বের করার চেষ্টা চলল। এক রবিন ভাইয়ের কাছে যে আমাদের তিনজনের স্থান সংকুলান হবে না, সেটা তার রুম দেখেই বোঝা যায়। খোট্টা চাচাকে রবিন ভাইয়ের প্রতীক্ষায় বসিয়ে রেখে আমি আর আলিম মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে বের হলাম।

পূর্ব পশ্চিম ঠিক রেখে হাঁটতে শুরু করলাম। গ্রাম্য পরিবেশ এবং দুই পায়ে ব্যথার অনুভূতি জানান দিল অনেক দূর চলে এসেছি। অসময়ের টিপটিপ বৃষ্টিতে শরীরের নোনা জল ধুয়ে যেতে শুরু করেছে। হোস্টেলে সিট পাওয়া কত কঠিন, বিষয়টি ততক্ষণে বুঝে গেছি।

আশাহত হয়ে ফেরার পথে পা বাড়িয়েছি, এমন সময় একটি উচ্চকিত কণ্ঠ এ..বা ভাতিজা.. বলে ডেকে উঠল। গ্রামের পথ দিয়ে অনেকদিন হেঁটে যেতে দেখেছি। কোন গ্রামে বাড়ি তখনো ঠাহর করতে পারিনি। অনেক পরে জেনেছিলাম লোকটির নাম মনতাজ। শহরে এসেছে রিকশা চালাতে। গ্রামের মাঠে এখন পানি। তাই গ্রামের অনেক মানুষই জীবিকা নির্বাহের এই প্রচলিত ও সহজলভ্য পথটি বেছে নেয়।

সংক্ষেপে ভোগান্তির বিষয়টি মনতাজকে অবগত করলাম। সে আমাদের অভয় দিয়ে তার রুম দেখিয়ে দিল। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে বলে রিকশায় যাত্রী নিয়ে চলে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃষ্টির উচ্ছ্বসিত প্রকোপ আমাদের মনতাজের রুমের দিকে নিয়ে গেল।

বড়সড় রুম। রুমজুড়ে খেজুর পাতার চাটাই বিছানো। চাটাইয়ের নিচে কয়েক বান্ডিল তাস উঁচু হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তেল চিটচিটে অনেকগুলো বালিশের উপস্থিতি গণরুমের বাসিন্দাদের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করে। চারপাশে বিড়ির মুড়ি পড়ে আছে। দেয়ালের রঙ দেখে যে কেউ তামাটে ডিসটেম্পার বলে ভুল বুঝতে পারে। দেয়ালের উপরের দিকে তামাটে রঙ কিছুটা হালকা হলেও মেঝের দিকে একেবারে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে। ডাক্তারদের সুবিধার জন্য রুমের একটা ছবি তুলে দেয়া যেত। ধূমপানের ফলে ফুসফুসের চেহারা কেমন হয়, তা এক্স-রে ছাড়াই রোগীদের দেখাতে পারত।

উত্কট গন্ধ অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। নিকোটিনের স্বর্গপুরীতে আমরা আলতো করে বসলাম যেন শরীরের পুরো ওজন পাটিতে না পড়ে। প্রাণপণে চাচ্ছিলাম কেউ যেন কারো মুখের দিকে না তাকাই। দীর্ঘ নীরবতায় আমরা একটানা বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ গুনে চলেছি। ২ ঘণ্টা নীরব কথোপকথনের দুটি শব্দই শুধু মনে পড়ে— চলো উঠি।

২.

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এক ছাত্রাবাসে সিট পেয়েছি। ভাগ্যগুণে তিনজন একই রুমে। মহোৎসবে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুঁ মারতে গেলাম। সবকিছুই বিশাল। রাস্তার দুই পাশের বিশাল বিশাল গাছ ছাউনি হয়ে রয়েছে। পরে জেনেছি এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড। সীমাহীন কৌতূহলে চারপাশ দেখছি। যুগলবন্দিদের দেখে মনে বাসনার উদয় হলো; ভর্তি হতে পারলে আমার পাশেও একদিন এমন কারো দ্রাবিড় সান্নিধ্য থাকবে...! দুজনে প্যারিস রোডে পাশাপাশি হাঁটব...। অনাগত প্রেয়সীর নরম হাতে বাদাম টিপে দেয়ার মিহি ছন্দ শ্রবণেন্দ্রিয়কে শিহরিত করে তুলছিল। 

কিছুটা শঙ্কা নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়লাম। বহিরাগত অ্যালাউ কিনা জানি না। জীবনে প্রথম এত বই একসঙ্গে দেখে আমার আবেগছটা তীব্র উচ্ছ্বাসে বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছি। প্রথমে দু-চারটি বই ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। পরে মনে হলো, এভাবে হবে না। পুরো লাইব্রেরি ঘুরতে শুরু করলাম। সব বইয়ের নামে অন্তত একবার চোখ বোলানো চাই। হঠাৎ থমকে গেলাম। সেলফের বিশেষ একটি জায়গায় আমার চোখ আটকে গেল। মনটা তোলপাড় করে উঠল। কয়েকবার ফিরে ফিরে তাকালাম। অবশেষে কিশমিশের মতো চুপসে যাওয়া মন নিয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এলাম।

অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, কিন্তু বিষয়টি কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারছি না। প্রচণ্ড অস্থিরতায় রাত কাটল। মনে মনে ঠিক করলাম আর কখনো সেখানে যাব না। পরের দিন অনেক চিন্তাভাবনার পর মনে হলো, বিষয়টি আর একবার যাচাই করা উচিত। হয়তো আমার দেখার ভুলও হতে পারে।

লাইব্রেরি নয়, আমি যেন একটি প্রাগৈতিহাসিক শ্মশানে ঢুকছি। সারি সারি বই যেন সাজানো মরদেহর স্তূপ; এক বীভৎস আয়োজন। সেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আমি ঘোরাফেরা করছি। সবকিছু যেন কুিসত দৃষ্টিতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের বিভ্রান্ত করতে আমি সেলফ থেকে বই নামিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা খোঁজার ভান করছি। মনে হচ্ছিল ওদিকে তাকালেই আমার সঙ্গে সঙ্গে সবাই সেখানে দেখবে এবং বিষয়টি জেনে যাবে।

আমি অনেকটা সময় নিয়ে ভয়ে ভয়ে আড়চোখে তাকালাম। আমার সব আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে গতকালের মতো আজো আমাকে প্রতিঘাত করল ‘বাস্টার্ড’। এটা আমার জন্য কত বড় অপমানের, সেটা কাউকে বোঝাতে পারব না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে হেঁটে চলা ক্ষুদ্র পিপীলিকার মতো প্যারিস রোড দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছি। নিজের ভেতরের তোলপাড় করা হাহাকার বাইরের সবকিছুকে খাঁখাঁ করে তুলেছে।

রুমে ফিরে ডিকশনারি বের করে বাস্টার্ডের বাংলা আভিধানিক অর্থ ও সিনোনেমগুলো দেখলাম। প্রত্যাশিতভাবে পূর্বের জানার সঙ্গে মিলে গেল। সান্ত্বনা পাওয়ার মতো কিছুই পেলাম না। গল্পচ্ছলে বন্ধুদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করলাম মানুষ কোন পরিস্থিতিতে, কখন বাস্টার্ড বলে গালি দেয়। সব গবেষণার ফল নিষ্ঠুরভাবে আমাকে উপহাস করল।

লাইব্রেরি ভবনের বিষয়টি ভুলে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছি। সপ্তাখানেক পরে কোন এক অমোঘ টানে আবার লাইব্রেরিতে ফিরে গেলাম। জিদের বশে সেই সেলফের দিকে একরোখা ভাব নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বইটির ঘাড় ধরে সেলফ থেকে টেনে নামালাম। টেবিলের ওপর মেলে ধরে বইটি পড়তে শুরু করি। কী আছে এর ভেতরে এবং কেন এই অপমানজনক নামকরণ আমাকে জানতেই হবে। অনেক দূর পড়ার পর আমার ভ্রমশুদ্ধি হলো। আসলে উত্তেজনার বশে তখনো আমি বাস্টার্ডই পড়ে চলেছি। ভ্রমশুদ্ধি ঘটলে বুঝলাম এটি বাস্টার্ড রাসেল নয়; এটি ছিল ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের জীবনী।

অমূল্য সম্পদের মতো মানুষ সারা জীবন নিজের নামটি বহন করে। কে জাতির মুখ উজ্জ্বল করল আর কে জাতিকে ডুবাল, সেটা কেবল মান দিয়েই চিহ্নিত থাকে। শত্রুরা নাম ধরে গালি দেয়, প্রেয়সী নাম ধরেই ডাকে। নিজের নামকে কলঙ্কিত অবস্থায় দেখতে কে-ই বা পছন্দ করে! বুক ভরা অক্সিজেন নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, পথের পাঁচালীতে অপুর মতো দুর্গার কলঙ্ককে পুকুরে ছুড়ে ফেলেছি। আজো অপরাধ মিশ্রিত ভালোবাসা অনুভব করি— মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল।