অনুবাদ: তাসনীম আলম
[ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবীশের জন্ম ১৯৪১ সালে। শৈশবেই লেবাননে শরণার্থী হন তিনি। শান্তিচুক্তির পর দেশে ফেরেন। রাশিয়ায় পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে যোগ দেন পিএলও পার্টিতে। আল ফজর পত্রিকাসহ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। আরববিশ্বের বাইরেও দারবীশ বিপুলভাবে জনপ্রিয়। ৯ আগস্ট ২০০৮ সালে দারবীশ মারা যান।]
বাবা! আমি ইউসুফ
বাবা! আমি ইউসুফ।
ভাইয়েরা আমাকে একটুও ভালোবাসে না বাবা, চায় না আমাকে ওদের সাথে রাখতে।
পাথর মারে, অপমান করে কথা বলে।
তারা আমাকে মেরে ফেলতে চায়
তোমার ঘরের দরজা বন্ধ করে ওরা আমাকে বাইরে ফেলে রাখতে চাইছে।
আমার ভূমি থেকে আমাকে বিতাড়িত করতে চায়
বিষাক্ত করতে চায় আমার বাগান
বাবা! ওরা যে আমার খেলনাগুলোও ভেঙে ফেলে
যখন মৃদুমন্দ বাতাস আমার চুলে হুটোপুটি খায়
ভীষণ হিংসায় ওরা যেন জ্বলেপুড়ে যায়।
রাগে জ্বলে ওঠে আমার প্রতি, রেগে যায় তোমার প্রতিও। বাবা! তুমি বলে দাও কী করব ওদের সাথে।
প্রজাপতিরা আমার কাঁধে ওড়াউড়ি করে, গমের পাকা শিষ আমার দিকে দুলে আসে বা পাখিরা আমার হাতে এসে বসে।
বাবা, তুমি বলে দাও কী করব আমি? এবং কেন আমাকেই?
তুমি আমার নাম রেখেছ ইউসুফ, আর তারা আমাকে কুয়োতে ছুড়ে ফেলেছে, আর দোষারোপ করেছে নেকড়েকে। অথচ নেকড়েরা আমার ভাইদের চেয়ে মানবিক।
বাবা! আমি তাহলে কি কোনো ভুল করেছি স্বপ্ন দেখে, যে স্বপ্নে আমি দেখেছিলাম ১১টি তারা, সূর্য এবং নক্ষত্র, আমাকে সেজদা করছে?
কিছুই আমাকে বিস্মিত করে না
এক বাসযাত্রী বলল, কিছুই আমাকে বিস্মিত করে না
রেডিও, সকালের পেপার, এমনকি পাহাড় চূড়ার ভবনও। আমি শুধু কাঁদতে চাই
বাসচালক বলল, অপেক্ষা করুন আগে গন্তব্যে পৌঁছি, তারপর যত ইচ্ছা কাঁদবেন।
এক নারী বলল, আমারো একি অবস্থা। কোনো কিছুই আমাকে অবাক করে না।
আমি আমার সন্তানকে কবরের দিকে নিয়ে গেছি, সে খুব আনন্দের সাথে এটা গ্রহণ করেছে আর বিদায় না জানিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলল, আমাকেও কোনো কিছু বিস্মিত করে না।
পুরাতত্ত্ব পড়েছি আমি কিন্তু পাথরে আমার কোনো ঠিকানা পাইনি। সত্যিই কি আমি যা, তাই?
এক সৈনিক বলল, আমিও তাই। কোনো কিছু আমাকেও বিস্মিত করে না।
এক ভূতকে পাহারা দিই সারাক্ষণ অথচ সেই আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।
এবার রেগে যায় বাসচালক, আমরা শেষ স্টপেজের একদম কাছেই চলে এসেছি
এবার নামার জন্য প্রস্তুতি নেন সবাই
সবাই চিত্কার করে বলে, আমরা দেখতে চাই এই স্টেশনের পরে কী, তাই এগিয়ে যান।
আমি এবার কথা বলি, এখানেই নামিয়ে দিন আমাকে।
আমি তাদের মতোই, কোনো কিছুই আমাকে বিস্মিত করে না।
কিন্তু আমি সফরে সফরে ভীষণ ক্লান্ত।
আইডি কার্ড
নিবন্ধিত করুন
আমি আরব
আমার পরিচয়পত্র নম্বর ৫০,০০০
আটটি সন্তান আমার
গ্রীষ্মের পরেই নবম সন্তান হবে
এতে কি আপনারা রাগান্বিত?
নিবন্ধিত করুন
আরব
আমি একটি পাথুরে ভূমিতে কাজ করি আমার সংগ্রামী বন্ধুদের সাথে
সাথে আমার আট সন্তানও।
আমি তাদের জন্য রুটি জোগাড় করি
পোশাক আর খাতাপত্রও
ওই পাথুরে ভূমি থেকেই
এক মুঠো খাবারের জন্য আপনাদের দুয়ারে যাই না তবু
আপনাদের প্রাসাদোপম ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকে তুচ্ছও ভাবি না
এসব কি আপনাদের রাগান্বিত করে?
নিবন্ধিত করুন
আরব
একটি নাম যার সাথে কোনো সম্মানজনক উপাধি নেই।
নিজ দেশে যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট একজন
তবে বেঁচে আছে ক্রোধ নিয়ে
এ ভূমিতে আমার শিকড় গেঁঁথে আছে
কালের শুরুর আগে থেকে
যুগের সূচনার পূর্বে
জায়তুন আর জোয়ান লতাগুল্ম সৃষ্টির পূর্ব থেকে
ঘাসের জন্মেরও আগে
আমার বাবা কৃষক পরিবারের
কোনো বনেদি বংশীয় নয়
আমার দাদাও ছিলেন কৃষক
বংশ-পরিচয়হীন।
পড়ালেখা শেখানোর আগে তিনি আমাকে সূর্যালোকের পাঠ দিয়েছেন
আমার ঘরটি পাহারাদারের কুঁড়েঘরের মতো
ছন ও বাঁশের তৈরি।
আমার এমন ঘর দেখে কি খুশি হন আপনারা?
কোনো ভদ্র নাম নয়
লিখুন
আরব
আমার চুলের রঙ কালো
আমার চোখ বাদামি
আমার বৈশিষ্ট্য হলো
মাথায় জড়ানো কুফিয়াহর উপরে একটি ব্যান্ড বাঁধা
পাথরের মতো শক্ত হাত আমার
যে এ হাতে হাত মিলাবে, তার হাতে ফোসকা পড়বে
আমার ঠিকানা একটি অখ্যাত গ্রাম
নামহীন সব রাস্তা
এখানকার সব মানুষ কৃষক শ্রমিক
আর কমিউনিজম নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী।
এসব কি আপনাদের রাগান্বিত করে?
নিবন্ধিত করুন:
আরব
আপনারা আমাদের পূর্বপুরুষের বাগান চুরি করেছেন
আর যে জমি আমি চাষ করতাম আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে।
আমার নাতি-নাতনিদের জন্য পাথুরে জমি ছাড়া কিছুই রাখেননি।
শোনা যাচ্ছে আপনাদের সরকার নাকি এইটুকুও দখল করে নিচ্ছে?
নিবন্ধিত করুন, তাহলে
১ নম্বর পৃষ্ঠার উপরে,
আমি কাউকে ঘৃণা করি না
কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষও নেই
কিন্তু আমি যদি ক্ষুধার্ত হই
আমি আক্রমণকারীর মাংস খেতে পারি
আমার ক্ষুধার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন
আর আমার ক্রোধের বিষয়েও।
[মূল আরবি থেকে অনূদিত]






