গল্পটা আজিজুল হক ও হেম চন্দ্র বোসের। এ দুজনই আধুনিক ফনেরসিকের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য, হক-বোসের নাম কজনেরই জানা আছে।

অপরাধীকে পাকড়াও করতে মানুষ যুগে যুগে নানা ধরনের ফন্দিফিকিরি করেছে। লেখার ধরন, কথা বলার ধরন, আঙুলের ছাপ প্রভৃতি দিয়ে বিভিন্ন সময় অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়েছে। আমেরিকার আলোচিত সন্ত্রাসী উনাবোম্বারকে তার লেখা দিয়ে শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে আমাদের এ গল্প আঙুলের ছাপ নিয়ে।

আঙুলের ছাপ যা তথ্য দেয়, তার চেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা তদন্তকারীর জন্য রেখে যায়। কার ছাপ? পুরুষ না নারীর? মানুষটার বয়স কেমন? কেমন তার গায়ের রঙ? লম্বা না খাটো? যা হোক, ২০১৫ সালে অপরাধ নৃতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়। দুজন ভারতীয় বিজ্ঞানী জেসমিন কউর ডাল ও অনুপ কুমার কাপুর দাবি করেন, আঙুলের ছাপে থাকা রেখার ঘনত্ব পরীক্ষা করে পুরুষ না মহিলার হাতের ছাপ, সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ আবিষ্কারের ১২০ বছর আগে দুজন ভারতীয় কেবল যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছিলেন তাই নয়, বরং ফরেনসিক বিজ্ঞানেরই জন্ম দিয়েছিলেন। এটা সেই গল্প; এখানে খলনায়কই স্মরণীয় হয়ে আছে, কিন্তু নায়কদের নাম হারিয়ে গেছে। আরো অনেক গল্পের মতো এরও শুরু হয়েছিল যুদ্ধের মাধ্যমে।

১৮৫৩ সালের গ্রীষ্মকাল। দুনিয়ার বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলো ক্রাইমিয়ায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ঠিক একই সময় বোম্বাইয়ের বোরিবান্দারে বিরাট ভিড় জমে গেছে এক আশ্চর্য বস্তু দেখার জন্য। সেই আশ্চর্য বস্তুটা হচ্ছে আগ গাড়ি বা আগুন গাড়ি। মানে হচ্ছে, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের রেলগাড়ি। দিনটা ছিল ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল। স্থানীয়দের বিস্ময় কাটছিল না— ঘোড়া বা বলদ ছাড়া কীভাবে কোনো গাড়ি চলতে পারে, সেটা তাদের মাথায় আসছিল না। অনেকে ভেবেছিলেন, শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা অদৃশ্য দানব দিয়ে এ গাড়ি টেনে নেয়। অনেকে নারকেল নিয়ে এসেছিলেন আগুন গাড়িকে উৎসর্গ করতে। ১৪টি কামরাভর্তি শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষদের দিয়ে ভারতবর্ষের বুকে প্রথমবারের মতো বাষ্পীয় রেলগাড়ির চাকা ঘুরল। লন্ডন ইলাস্ট্রেটেড নিউজ তাদের প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে পলাশীর চেয়ে বড় বিজয় বলে অভিহিত করেছিল।

ভারতবর্ষ ততদিনে ইংরেজ তরুণদের ভাগ্যান্বেষণের উর্বরভূমি হয়ে উঠেছে। স্টিলের ট্রাংক হাতে নিয়ে ভারতের উপকূলে পা রাখলেন উইলিয়াম জেমস হারশেল। তিনি বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন লেখক হিসেবে যোগ দেন। হেইলবুরিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কলেজ থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। উইলিয়াম তার দেশের জীবনকে বিদায় দিয়ে এসেছিলেন। বাংলাই হয়ে উঠেছিল তার বাড়িঘর।

১৯৫৮ সালের গ্রীষ্ম। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে রুশ সাম্রাজ্য হেরে গেছে। মঙ্গল পাণ্ডে ততদিনে আত্মাহুতি দিয়েছেন। ভারতের তখনকার অরাজক পরিস্থিতিতে উইলিয়াম হতাশ। বাংলাও হতাশ। নীল চাষের আঘাতে বাংলার মানুষ ও মাটি তখন রিক্ত, নিঃস্ব। সিপাহি বিদ্রোহে ভারতীয় সিপাহিরা অনেক জায়গায় ইংরেজ নারী-শিশু ও সেনাদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল। এসব খবর লন্ডনে পৌঁছার পর রানী থেকে লেখক চার্লস ডিকেন্স সবাই ভারতীয়দের রক্ত চাইলেন। লক্ষেৗতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল লরেন্সের অফিসের স্টাফদের বর্বর হত্যাকাণ্ড কোম্পানিকে চমকে দিয়েছিল। ইংরেজদের তরফ থেকে কেউ কেউ ভারতীয় সিপাহিদের জীবন্ত চামড়া তুলে নেয়া, লোহার দণ্ড ঢুকিয়ে হত্যা করা বা পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেন। তাদের কথা ছিল, এমন বর্বরতা চালানো অপরাধীদের শুধু ফাঁসিতে ঝোলানো যথেষ্ট শাস্তি নয়।

সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির হাত থেকে ভারতবর্ষের ক্ষমতা চলে গেল সরাসরি ব্রিটিজ রাজের হাতে। হুগলির জঙ্গীপুর সাবডিভিশনের দায়িত্ব পেলেন উইলিয়াম জেমস হারশেল। পাঁচ বছর তিনি বাংলায় কাজ করেন। তবে সিপাহি বিদ্রোহ দমনের পর স্থানীয়রা আর ব্রিটিশদের বিশ্বাস করত না। উভয়ের সম্পর্কে অবিশ্বাসের একটি ছায়া গজিয়ে উঠেছিল। বিশেষত ছোট ব্যবসায়ী, কৃষকরা ব্রিটিশদের সঙ্গে অসহযোগিতার নীতি নিয়েছিল। তাই এ রকম পরিবেশে হারশেল তার জীবনের সবেচেয়ে কঠিন সময়টা পার করছিলেন। উচ্চপদে কাজ করেও নিজের জীবনে তেমন কোনো অর্জন নেই। হারশেলের জন্ম হয়েছিল বিখ্যাত এক জ্যোতির্বিদের পরিবারে। ইউরেনাসের আবিষ্কারক উইলিয়াম হারশেল ছিলেন উইলিয়ামের পিতামহ ও পিতামহের নামেই তার নাম রাখা হয়েছিল। এবার বাংলায় এসে হারশেল নিশ্চয়ই জ্যোতির্বিদ্যা ছেড়ে একাকী জীবন কাটাতে ভারতে আসার সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস করছিলেন। হেইলবুরিতে তার এক সহপাঠীকে নিজের কর্মক্ষেত্রের হতাশাজনক পরিস্থিতি নিয়ে চিঠি লিখলেন। তার বন্ধু সান্ত্বনা দিয়ে জবাব লিখলেন। বন্ধুর সান্ত্বনা কাজে লেগেছিল। কিছুদিন পরই হারশেল দুনিয়াজুড়ে তার এক কাজ দিয়ে বিখ্যাত হয়ে উঠলেন।

১৮৫৮ সালের জুলাইয়ের একদিন জঙ্গীপুরের একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য জমা পড়া দরপত্রগুলো পরীক্ষা করছিলেন হারশেল। বাছাই শেষে নিস্তা গ্রামের রজ্যধর কোনাইকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চুক্তিপত্র তৈরির সময় হঠাৎই হারশেলের মনে পড়ে তার ছোটবেলার এক প্রিয় লেখক টমাস বিউইকের কথা। এই টমাস তার বইয়ে নকশার অংশ হিসেবে নিজের বৃদ্ধাঙুলের ছাপ দিতেন। এটাই হারশেলের মাথায় যুগান্তকারী এক ধারণা আনে। হারশেল কোনাইকে বলেন যে, চুক্তিপত্রে তাকে আঙুলের ছাপ দিতে হবে। হারশেলের উদ্দেশ্য ছিল এ ছাপের মাধ্যমে কোনাইয়ের পরিচয় শনাক্ত ও কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। নিজের আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে হারশেল বুঝেছিলেন যে, আঙুলের ছাপ জাল স্বাক্ষরের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণিক। ব্যক্তি শনাক্তের জন্য এ অনন্য পদ্ধতিটির যাত্রা হলো হারশেলের হাত ধরে।

১৯১১ সাল। ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। গ্যালটন ততদিনে মৃত। এবারের গল্পের নায়ক দুজন বাঙালি সাব-ইন্সপেক্টর।

১৮৫৮ সাল থেকে পরবর্তী শতক পর্যন্ত বাংলায় অভূতপূর্ব বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। সিপাহি বিদ্রোহের পর বাংলা আরেকটি বিদ্রোহ প্রত্যক্ষ করেছে আর তা হলো নীল বিদ্রোহ। আরো ছিল একটি সাইক্লোন ও তিনটি দুর্ভিক্ষ। এ সময়ে বাংলায় বিপুল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। স্মরণীয় কিছু সাহিত্য ও লেখকের জন্ম এ কালপর্বে। সরকারি চাকরিতেও এ সময় স্থানীয়রা জায়গা করে নিতে শুরু করে।

সময় ১৮৯১। বাংলার পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল তখন এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি। আইসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পার করে ফেলেছেন ১৮ বছর। তিনি ছিলেন ভালো পড়ুয়া মানুষ এবং তিনি মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার জন্য একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হারশেলের কাজ ও সরকারের কাছে রাখা প্রস্তাব সম্পর্কে জানতেন। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে সরকারের কাছে লেখা এক চিঠিতে হারশেল বন্দিদের শনাক্তকরণ ও অন্যান্য কাজে আঙুলের ছাপ ব্যবহার চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৮৭৭ সালে তিনি একই চিঠি বাংলার জেল ইন্সপেক্টরের কাছেও পাঠিয়েছিলেন। নীল বিদ্রোহের ডামাডোলে সরকার নতুন কোনো বিতর্কে হাওয়া দিতে চায়নি। তাই হারশেলের প্রস্তাব সেভাবে কার্যকর হয়নি। হেনরি এবার ভাবলেন হারশেলের পরিকল্পনাকে কার্যকর করার কথা। তিনি নতুন বিভাগে এ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করলেন। কাজের জন্য তিনি কয়েকজন মেধাবী মুখ খুঁজছিলেন। এজন্য তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে চিঠি লিখলেন। মূল শর্ত ছিল, প্রার্থীকে অবশ্যই গণিতের জাহাজ হতে হবে। প্রেসিডেন্সির অধ্যক্ষের মাথায় শুধু একটি নামই ছিল— আজিজুল হক।

ফলে আজিজুল হক বাংলার পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরি পেলেন। তাকে অ্যানথ্রোপোমেট্রিক বিভাগ গড়ে তোলার দায়িত্ব দেয়া হলো। মাথা বিচ্ছিন্ন করে খুলনায় এক দরিদ্র মুসলিমের ছেলে খুন হয়। এটাই ছিল বাংলার পুলিশের শনাক্তকরণ বিভাগের প্রথম কাজ। ১৮৭২ সালে খুলনায় জন্ম নেয়া আজিজুলের পছন্দ ছিল কেবল দুটি জিনিস— সংখ্যা ও খাদ্য। ছোটবেলায় বাংলার বিক্ষুব্ধ সময়ে খাবারের চাহিদা মেটানো কঠিন ছিল। এ নিয়ে তাদের পরিবারে সমস্যা ছিল। তার পেটুক স্বভাবের জন্য আজিজুলের বড় ভাই তাকে নিয়মিতভাবে হেনস্তা করতেন। তাই ১২ বছর বয়সেই আজিজুল বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। হুগলির একটি ট্রেনে তিনি চেপে বসেন। এক হিন্দু পরিবারে আজিজুলের আশ্রয় জোটে। সেই পরিবারটি তাদের সন্তানদের সঙ্গেই আজিজুলকে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ দিয়েছিল। সে সময়কার বর্ণ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এ ঘটনা ছিল বিস্ময়কর। শিগগিরই গণিতে আজিজুলের প্রতিভার কথা মানুষের মুখে মুখে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল। গৃহকর্তা আজিজুলের প্রতিভাকে পানিতে ফেলতে চাইলেন না। তিনি আজিজুলের লেখাপড়ার সুবন্দোবস্ত করেন। আজিজুল একসময় প্রেসিডেন্সিতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান। তারপর এক রোমাঞ্চকর দুনিয়া তার সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।

আজিজুলের সঙ্গে অ্যানথ্রোপোমেট্রিক বিভাগে আরো একজন তরুণ সাব-ইন্সপেক্টর যোগ দেন, তার নাম হেম চন্দ্র বোস। হক-বোস জুটিই কিছুদিন পর ফরেনসিক বিজ্ঞানের পাতায় এডওয়ার্ড হেনরির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার ক্ষেত্রে বাটালি হিসেবে কাজ করেছেন। তবে এজন্য অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এ সাফল্যের জন্য দুনিয়ায় আরো অনেকেই কাজ করছিলেন। কিন্তু সফল হয়েছিলেন কেবল হক ও বসু।

ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে ১০ হাজার মাইল দূরে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুন আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়র্স থেকে ৩০০ মাইল দূরে নেকোচিয়া নামের একটি ছোট গ্রামে দুটি শিশুকে বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছিলেন ইন্সপেক্টর আলভারেজ। এই আলভারেজকে আঙুলের ছাপ নেয়া বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিলেন হুয়ান ভুসেটিস। ঘটনাস্থলে গিয়ে আলভারেজ দরজার চৌকাঠে রক্তমাখা আঙুলের ছাপ দেখতে পান। আলভারেজ এ ছাপ নিয়ে পুলিশ স্টেশনে পরীক্ষা করে রক্ত হিম করা তথ্য পান, আঙুলের ছাপ শিশু দুটির বাবা ফ্রান্সিসকা রোসার। সন্তানদের হত্যার দায়ে রোসার ফাঁসি হয়ে যায়। ইতিহাসে আলভারেজই প্রথম আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে কোনো খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করলেন। তবে একটি মামলার সমাধান একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নিশ্চয়ই যথেষ্ট নয়। কিন্তু আলভারেজ ও ভুসেটিস সে রকম কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগোলেন না। এখানেই আঙুলের ছাপ নিয়ে একটি পদ্ধতি গড়ে তোলায় হাল ধরলেন হেনরি।

ভারতীয় জাদুকরদের সাহায্য নিয়ে হেনরি আঙুলের ছাপের একটি বিন্যাস, শ্রেণী বিভাগ তৈরি করলেন, যাতে অপরাধীদের শনাক্তকরণ সহজ হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে কাজ করা ফ্রান্সিস গ্যালটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আঙুলের ছাপ বিষয়ে আরো জানাবোঝার জন্য হেনরি ১৮৯৩ সালে লন্ডনে যান। গ্যালটন তখন আঙুলের ছাপ নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই নিজের জ্ঞানকে উদারহস্তে হেনরিকে সরবরাহ করলেন। ট্রাংকভর্তি গ্যালটনের কাজ নিয়ে হেনরি খুশি মনে ভারতে এলেন। এবার ঘটনাস্থল কলকাতা। হেনরি ছিলেন হক-বোসের ইংরেজ কর্তা। তাকে খুশি করতে দুজনই তাদের কর্তার নিয়ে আসা গ্যালটনের কাজগুলো পড়াশোনা করতে শুরু করলেন। হক শিগগিরই গ্যালটনের বর্ণিত ছিদ্র ও পাকগুলোর নকশা বুঝে ফেললেন। এরপর ছিল কিছু গণিতের রহস্য, প্রিয় বিষয় চলে আসায় হক প্রবল উৎসাহে কাজ চালিয়ে গেলেন। এক বছরের মধ্যে তিনি আঙুলের ছাপের শিরার সংখ্যা ও বিস্তার থেকে ছিদ্র ও পাকগুলোর পার্থক্য করার গাণিতিক নিয়ম ও সূত্র আবিষ্কার করলেন। হকের সূত্র ব্যবহার করে কোনো আঙুলের ছাপকে ১০ অংকের একটি সংখ্যায় রূপান্তর করে নির্দিষ্ট একটি বিভাগে ফেলতে পারে। অন্যদিকে বোস ব্যস্ত ছিলেন একটা ভিন্ন ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে, যেমন— ঠিকভাবে ছাপ না পড়ায় আবছা হয়ে থাকা বা অল্প কিছু শিরা থাকলে সেখানে কী করতে হবে। এছাড়া কিছু ভিন্ন ধরনের ছাপের তালিকাই তিনি তৈরি করছিলেন। হক তার গাণিতিক সূত্রের সহজ রূপ বের করলেন। এটা এতটাই সহজ ছিল যে, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো মূলনীতি ছাড়াই এক লাখ ছাপের শ্রেণীবিন্যাস করতে পারবেন।

১৮৯৫ সাল নাগাদ হক ও বোস তাদের পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তারা তাদের পদ্ধতি দিয়ে হাতের ছাপের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে কারো পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হন। হেনরি আনন্দচিত্তে সে বছরই তাদের সাফল্যের কথা গ্যালটনকে চিঠি লিখে জানালেন। হেনরি অবশ্য প্রশাসনের কাছে গ্যালটনের চেয়ে বেঙ্গল পুলিশ মেথড অব ফিঙ্গারপ্রিন্টকে অধিকতর কার্যকর বলে প্রচার করলেন। তার অনুরোধে ভারত সরকার দুই পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করে। এ মূল্যায়ন কমিটিতে ছিলেন মেজর জেনারেল অব দ্য সার্ভেয়ার জেনারেল অব ইন্ডিয়া সি স্ট্রাহান ও প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ অ্যালেক্স পেডলার। এ কমিটি হক, বোস ও হেনরির সঙ্গে বেশ অনেকটা সময় কাটালেন। হক তার পদ্ধতির বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন। কমিটির সদস্যরা পুরো বিষয়টি বুঝে নিয়ে এবং নমুনা পরীক্ষা করে যখন একদিনের মধ্যেই ফলাফল হাতে পেলেন, তখন তারা হকের ওপর দারুণ সন্তুষ্ট। এ কমিটির ইতিবাচক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ভাইসরয় এলগিনের অফিস ১৮৯৭ সালের ১২ জুন একটি আদেশে ভারতজুড়ে আঙুলের ছাপের ব্যবহার শুরুর কথা বলেন। মূলত অপরাধীদের রেকর্ড শ্রেণীবিন্যাস ও শনাক্ত করতেই এ পদ্ধতি ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হয়। হক-বোস শ্রেণীবিন্যাসকরণ পদ্ধতি পুরো ভারতে ইতিবাচক সাড়া পেল। অনেকে অবশ্য অবজ্ঞার সুরে একে ‘দ্য হেনরি ক্ল্যাসিফিকেশন’ নামে ডাকত। হেনরি এবার চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দৃষ্টি দিলেন তার নিজের দেশের দিকে।

১৮৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের ৬৯তম সাধারণ সভা ডোভারে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে হেনরি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘ক্ল্যাসিফিকেশন অ্যান্ড ইউজেজ অব ফিঙ্গারপ্রিন্টস’। প্রবন্ধটি সম্মেলনে আলোচনার ঝড় তুলল। ব্রিটেনের আইডেন্টিফিকেশন অব ক্রিমিনালস কমিটি আরো অনুসন্ধানের জন্য হেনরির পদ্ধতির ওপর পরীক্ষা শুরু করে দিল।

নতুন শতাব্দীর শুরুতে হেনরির আকাঙ্ক্ষিত খবরটি কলকাতায় এসে পৌঁছল। হেনরি মেথড কমিটির কাছ থেকে ইতিবাচক রিভিউ পেয়েছে। ভারত সরকার হেনরির প্রবন্ধটি বই আকারে ছাপিয়ে পুরো দেশে বিতরণের নির্দেশ জারি করে। রাইটার্সের অ্যানথ্রোপোমেট্রিক বিভাগেই পৃথিবীর প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং ব্যুরো চালু হয়।

এ স্বীকৃতি আবিষ্কারের পেছনে থাকা সব মানুষের জন্য আনন্দ সংবাদ হতে পারত, কিন্তু তা না হয়ে হক ও বোসের কাছে এটা বিশ্বাসঘাতকতার এক চরম উদাহরণ হয়ে থাকল। হক আর বোসকে বাদ দিয়ে তাদের ‘বন্ধু ও পথপ্রদর্শক’ এডওয়ার্ড হেনরি নিজে এ প্রযুক্তি আবিষ্কারের কৃতিত্ব এককভাবে নিয়ে নিলেন। হক ও বোসের অবদানের কথা একটি লাইনেও লেখা হলো না। মনে হলো, যেন হক আর বোস নামে কেউ কখনো ছিলেনই না। অ্যাসেসমেন্ট কমিটির প্রধান লর্ড বেলপ যখন জিজ্ঞাসা করেন যে, এ প্রযুক্তি তার নিজের একার আবিষ্কার কিনা, তখন হেনরি ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন।

হক ও বোস এ বিশ্বাসঘাতকতায় ক্রুদ্ধ হলেও বাইরে বাইরে তারা শান্ত ভাব দেখাচ্ছিলেন। বিষটা তারা পান করে নিয়েছিলেন, কাউকে বুঝতে দেননি। ঔপনিবেশিক শাসনে স্থানীয়রা নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছিল। হক আর বোসের গল্পটাও তাই। হক ও বোস তাদের এই তরুণ বয়সেই এ বঞ্চনার স্বাদ পেয়েছিলেন। নিশ্চিতভাবেই বোসের চেয়ে হকের কষ্টটা অনেক বেশি ছিল। দুনিয়া, পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেই নিজেকে গড়ে তোলা মানুষটি যেভাবে বঞ্চিত হলেন, সেটা তাকে আর যে কারো চেয়ে বেশি কষ্ট দেবে, এটাই স্বাভাবিক। আঙুলের ছাপের শ্রেণীকরণ বিদ্যা এখন আর তাদের হাতে নেই। সেটা চলে গেছে অনেক দূরে। হক এ বিদ্যা বাদ দিয়ে তার পুলিশি কাজে মন দিলেন। কিন্তু বোস ছিলেন একরোখা। তিনি আবার এ বিদ্যায় মন দিলেন। তিনি আঙুলের ছাপকে টেলিগ্রাফিক সংকেতে রূপান্তরের কাজ শুরু করলেন, যেন বিভিন্ন দেশের পুলিশ বিভাগ নিজেদের মধ্যে কোনো অপরাধীর হাতের ছাপ তারবার্তার মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে আদান-প্রদান করতে পারে।

হক ও বসুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিখ্যাত হয়ে ওঠা হেনরি ইংল্যান্ডে উচ্চপদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। তাকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অপরাধী তদন্ত বিভাগের প্রধান করা হয়। দায়িত্ব নিয়ে হেনরি ব্রিটেনের প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার পুলিশের আঙুলের ছাপ শ্রেণীকরণ পদ্ধতি এবার বৈশ্বিকভাবে বারটিলনের পদ্ধতির জায়গা নিয়ে নিল। আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম হয় হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম। তারপর প্রায় শতাব্দীকাল ধরে হক-বোসের অবদান কোথাও আলোচিত হয়নি। বিজয়ীর লেখা ইতিহাস বিজিত মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে সবসময় ঘটনা সে রকম থাকে না।

বর্তমান সহস্রাব্দের শুরুতে মানুষ পিসিআর ও ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিংয়ের যুগে প্রবেশ করেছে। জিএস সোধি ও জাসজিৎ কউর নামের দুজন বিজ্ঞানী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আঙুলের ছাপ-সংক্রান্ত ইতিহাসে হক ও বসুর নাম প্রতিষ্ঠা করতে পদক্ষেপ নেন। ২০০৯ সালে ব্রিটেনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি সোধি ও জাসজিতের আবেদন গ্রহণ করেন। সোসাইটি এক্ষেত্রে হক ও বসুকে পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের নামে একটি উদ্ভাবনী অ্যাওয়ার্ড চালু করে। এই স্বীকৃতিটা নিশ্চয়ই তাত্পর্যপূর্ণ কিন্তু তাদের অবদান ছিল আরো বেশি।

পশ্চিমা দুনিয়াজুড়ে যখন ফিঙ্গারপ্রিন্টিং ব্যুরো স্থাপিত হতে শুরু করে, তখনো বাংলার ব্যুরোটিই সংশ্লিষ্ট গবেষণায় এগিয়ে ছিল। নানা দুর্দশা আর বেদনায় আক্রান্ত বাংলার জন্য সে যুগে আনন্দ সংবাদ বোধহয় এই এগিয়ে থাকাতে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুই ভাগ করলেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলো। মানুষের বেদনা আর হক-বসুর ব্যক্তিগত বেদনা যেন মিলেমিশে গিয়েছিল। বসু রাইটার্সে তার পুরনো ছোট অফিসে ফিরে গেলেন। যত দিন গেল তার গবেষণা বিকশিত হতে শুরু করল। তিনি একের পর এক অমূল্য আবিষ্কার করতে লাগলেন। এগুলোর প্রথমটি ছিল আঙুলের ছাপকে টেলিগ্রাফে প্রেরণের যুগান্তকারী পদ্ধতি। এই আবিষ্কার দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আঙুলের ছাপ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে জাদুকরী সাফল্য নিয়ে এল। তদন্তের সময় ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা বিপুল ভূমিকা রাখল। কলকাতা ব্যুরো তত্ক্ষণাৎ তার এই আবিষ্কার দেশের মধ্যে অন্যান্য ব্যুরোর সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহার করা শুরু করে।

অন্যদিকে হক তখনো প্রতারিত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি বয়ে চলেছেন। তিনি তার অতীত মুছে ফেলতে বাংলা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ট্রান্সফার হয়ে চলে গেলেন বিহারে। আর বসু তখন টেলিগ্রাফিক কোড নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বইটির নাম হিন্টস অন ফিঙ্গারপ্রিন্টস উইথ আ কোড ফর ফিঙ্গারপ্রিন্টস। এ বইটি ছিল দারুণ কার্যকরী, তাই ব্রিটিশরাও বইটির গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়। বসু উল্লেখ করেছিলেন যে, তার এই কাজ বিশেষভাবে কাজে লাগবে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের। বসু স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কাছ থেকে তার কাজের স্বীকৃতি পেতেই বোধহয় এমনটা বলেছিলেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তখন দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে খ্যাত। প্রতারিত হওয়ার পর তখন ১৭ বছর কেটে গেছে। বসু হয়তো সেই হেনরিকে ততদিনে ক্ষমা করেছেন। তাই এবার ব্রিটিশরাজের কাছে কাজের স্বীকৃতি চাইলেন। কিন্তু না ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের অধীনস্থদের প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে তখনো প্রস্তুত নন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলল। ১৯২১ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড কোনো আগ্রহ দেখায়নি, তারপর একদিন তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা চার্লস স্টকলি কলিন্স বসুর কাজের বিষয়েই একটি বই লিখে ফেললেন, নাম দিলেন আ টেলিগ্রাফিক কোড ফর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ফর্মুলা। কলিন্স দাবি করলেন এই টেলিগ্রাফিক কোড তিনি ১৯১৪ সালেই আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু এত দিন লিখিত আকারে প্রকাশ করেননি। ভাগ্য আবারো বসুকে নিয়ে খেলল। কলিন্স তার বইয়ে আগে প্রকাশিত বসুর বই ও এত দিন ভারতীয় পুলিশের ব্যবহার করা টেলিগ্রাফিক কেসগুলোকে উল্লেখ করলেন না। অথচ পুলিশ ও গোয়েন্দাদের মধ্যে বসুর বই এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তারা বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের দাবি করেছিলেন। অথচ দুনিয়া একজন সেরা আঙুলের ছাপ বিশেষজ্ঞ ও টেলিগ্রাফিক কোডের আবিষ্কারক হিসেবে সুপারিনটেনডেন্ট কলিন্সকেই মনে রেখেছে। বসুর আবিষ্কার করা টেলিগ্রাফিক কোড ভারতে ব্যবহার হচ্ছিল সেই ১৯১৬ সাল থেকে। কিন্তু হেনরির মতো এবার বসুর কৃতিত্ব ছিনতাই করলেন কলিন্স, অর্থাৎ আবারো বঞ্চিত হলেন বসু।

অন্যদিকে আজিজুল হক তখন বিহারে পদোন্নতি পেয়েছেন। সে সময় ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল। গান্ধীর নাম মানুষের মুখে মুখে। চম্পারণে গান্ধীর সত্যাগ্রহ হকের মনে দাগ কাটে। জাতীয়তাবাদী আবেগ তার মনে প্রবল বেগে বইতে শুরু করে। নিজের আবিষ্কারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তিনি মনকে শক্ত করেন। ব্রিটিশ সরকার তখন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তাদের দক্ষ ভারতীয় কর্মকর্তাদের কোনোভাবেই চটাতে চাইছিল না। ১৯২৪ সালে হক ও বসুকে যথাক্রমে খান বাহাদুর ও রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ সময় আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। হক ও বসুর সঙ্গে প্রতারণা করা এডওয়ার্ড হেনরি আজিজুল হককে একটি চিঠি পাঠান। ২০ বছরের বিচ্ছেদ আর ঘৃণার দেয়াল ভেঙে হেনরি খান বাহাদুর উপাধি পাওয়ায় আজিজুলকে অভিনন্দন জানান। তিনি চিঠিতে আরো প্রত্যাশা করেছিলেন হক যেন উপাধির সঙ্গে সঙ্গে কিছু জমির জায়গিরও পায়। তবে বসুর জন্য হেনরি কোনো চিঠি পাঠাননি। হেনরির কথায় উৎসাহিত হয়ে ও নিজের কম বেতন ও পেনশনের কথা মাথায় রেখে হক আঙুলের ছাপ বিজ্ঞানে তার অবদানের জন্য বিহার ও ওড়িশার গভর্নরের কাছে জায়গির পেতে আবেদন করেন। সোধি ও কউর জাতীয় আর্কাইভ থেকে এ-সংক্রান্ত দলিলপত্র খুঁজে পেয়েছেন। তবে এবার হক আগের চেয়েও বেশি অপমানিত হন।

নিজের পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করতে হক যখন জায়গির পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছিলেন, বসু তখনো তার গবেষণা অব্যাহত রাখেন। মাঠে পরীক্ষা করে তিনি তার টেলিগ্রাফিক কোড ব্যবস্থার কিছু সমস্যা দেখতে পান। হকের করা ১০ ডিজিটের শ্রেণীবিন্যাসকে তিনি নতুন চেহারা দেন। তিনি ১০ ডিজিটকে এক ডিজিটে নিয়ে আসেন, যা টেলিগ্রাফিক ট্রান্সমিশনকে আরো সহজ করে। একই সঙ্গে এর ফলে অপরাধ সংগঠনস্থলে পাওয়া আঙুলের ছাপকে দ্রুত বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়। জার্মানির মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখায়। ১৯২৫ সালের জুনে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ প্রদর্শনীতে জার্মান ও ইউরোপীয় পুলিশ কর্মকর্তারা ভারতীয় পুলিশদের সঙ্গে পরিচিত ও বসুর কাজ সম্পর্কে অবগত হন। সে বছরের সেপ্টেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সেফটি জার্নালে বসুর কাজের প্রশংসা ও উল্লেখ করা হয়। তাকে পুলিশ এক্সিবিশন কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য করা হয়। পরের বছর বসু একক ডিজিট শ্রেণীবিন্যাস পদ্ধতি নিয়ে তার বই প্রকাশ করেন, যার নাম ফিঙ্গারপ্রিন্ট কম্প্যানিয়ন।

ঠিক একই সময়ে জায়গিরের জন্য খান বাহাদুর হক আরেক দফা হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন। বিহার ও ওড়িশায় এমন কোনো সরকারি জমি ছিল না, যা হককে জায়গির হিসেবে দেয়া যায়। আরো হতাশাজনক বিষয় ছিল চিঠি পাঠালেও প্রকাশ্য কোনো বক্তৃতা বা বইয়ে হেনরি হকের অবদানের কথা স্বীকার করেননি। এরই মধ্যে গোয়েন্দা দপ্তরের পরিচালক হককে বিশেষ উপাধি দেয়া এবং তার কাজের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এত বছর পর হক কেন বিশেষ সম্মান ও সুবিধা চাইছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এই বিতর্ক সমাধানের জন্য হকের কাজের বিষয়ে হেনরির মত চাওয়া হয়।

বসুর এক ডিজিট কোড নিয়েও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ঝামেলা শুরু করে। তারা সেই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ছিল না, যেখানে বসুর প্রশংসা করা হয়েছিল। তারা কলিন্সের দেয়া সমাধান সূত্র অনুসারে বসুর কাজ পরীক্ষা করে সেটা বাতিল করে। তবে কয়েক বছরের মধ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কম্প্যানিয়ন বইটি ইয়ার্ডের লাইব্রেরিতে জায়গা করে নেয়। মজার ব্যাপার হলো এ বইয়ের শুরুতে বাংলার পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল জে ই আর্মস্ট্রংয়ের একটি মন্তব্য যুক্ত ছিল, যেখানে তিনি বলেছেন, ‘আঙুলের ছাপ বিজ্ঞানে রায় বাহাদুর বসু যদি এই আবিষ্কার করে থাকেন এবং আমার বিশ্বাস তিনি করেছেন, তাহলে এটি হবে তার শ্রেষ্ঠ অর্জন।’ ১৯২৯ সালে বাংলার সরকার ও ভারতের গোয়েন্দা ব্যুরো বসুকে ১০ হাজার রুপি সম্মানী দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভারত সরকার আপত্তি তোলে। কারণ হেনরি আগে শুধু হকের কথা উল্লেখ করেছেন, বসুর নয়। আবারো মতামতের জন্য হেনরির শরণাপন্ন হলো সরকার। হেনরি বসুর অবদানকে প্রশংসাসহকারে উদ্ধৃত করলেন।

১৯৩৫ সালে আজিজুল হক মতিহারিতে তার বাসায় মারা যান। তবে অবসর নেয়ার পর হেম চন্দ্র বসুর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, তা জানা যায় না। উইলিয়াম হারশেল, ফ্রান্সিস গ্যালটন ও এডওয়ার্ড হেনরি অনেক স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন, কিন্তু আজিজুল হক ও হেম চন্দ্র বসুর ভাগ্যে সেটা জোটেনি।

আনন্দ রঙ্গনাথন ও শীতল রঙ্গনাথন রচিত প্রবন্ধ অবলম্বনে