খিভায় এসে মনে হলো সময়ের পাতা উল্টে ইতিহাসের এক প্রাচীন অধ্যায়ে এসে পড়েছি, চলে গেছি কয়েক শতক আগের পৃথিবীতে। ঘরবাড়ি এত সাদামাটা, জীবন এত শ্লথ, মানুষ এত সরল যে, একে কোনো প্রাগৈতিহাসিক নগরী বললে ভুল বলা হবে না। ঘরবাড়ি প্রায় সবই একতলা, স্থাপত্য সৌন্দর্যহীন; মনে হয় ইটের বা মাটির বাক্স। যতটা সরল হতে পারে ঘরবাড়ি, ততটাই সরল। খিভা যখন পৌঁছেছি, তখন পড়ন্ত দুপুর, ইচান দুর্গে সূর্যের
সোনালি আভার উজ্জ্বল উদ্ভাসন। শহরটি দেখে প্রথমেই যা মনে হলো, তা হলো ধূসর অতীতের চিহ্নবাহী এক শহরে আমরা এসে পড়েছি, আধুনিক সভ্যতা থেকে বহুদূরে। খিভার খুব কাছেই তুর্কমেনিস্তান। এ সুপ্রাচীন নগরের নাম নিয়ে প্রচলিত কাহিনীর একটি হলো পর্যটকরা এখানকার একটি কূপের পানি পান করে আনন্দসূচক ‘খে ভাক’ (কী আনন্দ!) উচ্চারণ করত। ‘খে ভাক’ থেকেই খিভা। ইচান দুর্গের ভেতর এ সুমিষ্ট জলের কুয়াটি আজো রয়েছে। অন্য কাহিনীটি হলো, পারসি খরেজম থেকে তুর্কি ভাষায় খিভারেজম, যা থেকে খিভা, প্রাচীন ইতিহাসের প্রত্নসমৃদ্ধ জীবন্ত জাদুঘর!
খিভার প্রায় পুরোটা জুড়েই এক বিশাল দুর্গ, নাম তার ইচানকালা (কালা মানে দুর্গ)। অসংখ্য মাদ্রাসা, মসজিদ, ঘরবাড়ি, প্রাসাদ, উঠোন, হাটবাজার নিয়ে সে নিজেই পুরোদস্তুর স্বাবলম্বী এক শহর। যে কারণে ইচানকালাকে বলা হয়, ‘a city within a city’। খিভায় প্রবেশ করে আমাদের গাড়ি সোজা চলে এসেছে ইচানকালায়; দুর্গটি এতটাই জাঁদরেল যে, খিভার যেকোনো অংশে প্রবেশ করলেই দৈত্যাকার দুর্গটির কোনো না কোনো অংশ চোখে পড়ে। দিনের সূর্য মধ্যাকাশের সীমারেখা অতিক্রম করে হেলে পড়েছে পশ্চিমে, তার কিরণবিস্তারের ভেতর ধরা পড়া মানবিক স্থাপনাটি জ্বলছিল সোনালি উজ্জ্বলতায়। ধূসর মাটির রঙে রাঙানো উঁচু প্রাচীরের দুর্গটি পর্যটকের মুগ্ধতা কাড়বেই। পাশেই আরেকটি দুর্গ রয়েছে, তার নাম জানকালা। এ দুই দুর্গকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক খিভা নগরী। পর্যটকদের থাকার হোটেলগুলোও ইচানকালার আশপাশেই, অনেকগুলো আবার দুর্গের অতিকায় চৌহদ্দির ভেতরেই অবস্থিত।
পরিকল্পনা অনুসারে আমাদের হোটেলে ওঠার কথা, ইচানকালার দক্ষিণ পাশে ‘হোটেল খিভা’য় আমরা তাঁবু গাড়ি। হোটেলের জানালা দিয়ে দুর্গ প্রাচীর চোখে পড়ে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে ইচানকালার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে রইলাম। হোটেলে ব্যাগ রেখে, হাত-মুখ ধুয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি দুপুরের খাবার খেতে। এখানে কোন খাবার বিখ্যাত, খায়রুলের এমন প্রশ্নে পালোয়ান জানাল, পোলাও সবচেয়ে বিখ্যাত। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, ভারতবর্ষে পোলাও নিয়ে এসেছিল মোগলরা, যারা এ অঞ্চল থেকেই গিয়েছিল। আমরা যে রেস্তোরাঁয় গেলাম, সেটি খিভার কিছুটা বাইরে। পথঘাট প্রচণ্ড ধূলিময়, বাতাস শুষ্ক, তাপমাত্রা শীতল। বড় সড়কের পাশে যেমন মলিন সরাইখানা থাকে, আমাদের রেস্তোরাঁটিও তদ্রূপ। বাইরে যে দুটি গাড়ি পার্ক করে রাখা, সেগুলো ধূলির পুরো আস্তরে ঢাকা। আমাদের গাড়িটিকেও চেনা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে যতটা মলিন মনে হচ্ছিল, রেস্তোরাঁটির অভ্যন্তরভাগ তত মলিন নয়। বেশ বড়ই ভেতরটা, সস্তা চেয়ার-টেবিল পাতা। অন্য খাবার আছে, তবে প্রার্থিত পোলাও নেই, শেষ হয়ে গেছে। আমরা তখন নান রুটি আর গরুর মাংস বেছে নিই। যে যুবতী মেয়েটি খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল, তাকে অনায়াসে ঢাকার ছবিতে নায়িকা বানানো যায়। তার ছিপছিপে কাঠামো ঈর্ষা জাগাবে কিছুকাল আগের ঢাকাইয়া ছবির পৃথুলা নায়িকাদের।
কিছুটা ঠাণ্ডা রুটির সঙ্গে প্লেটভর্তি গরম মাংস এল, সঙ্গে পেঁয়াজ ও মোটা মরিচ। কোকা-কোলা সভ্যতার বিস্মৃত এ নগরীতেও বাজার খুঁজে পেয়েছে, পানীয় জলের পাশে সেও ঠাঁই নিল অক্লেশে। বোধকরি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলাম, নইলে কোলেস্টেরলের ভয়ে ভীত আমি বা খায়রুল এক প্লেট করে গো-মাংস উদরাস্ত করলাম কী প্রকারে? আমরা চেয়ার-টেবিলেই বসেছিলাম, কিন্তু একটি দল দেখি বড় খাটিয়ার ওপর পাতা নিচু টেবিলের চারপাশে পা মুড়ে বসে খাবার খাচ্ছে। একত্রে বসে ওইভাবে আহার গ্রহণ উজবেকদের একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি, যা তারা আজো অক্ষুণ্ন রেখেছে।
খাবারের বিল পরিশোধের সময়ে গ্রামীণ সুন্দরী মেয়েটির সঙ্গে আলাপ জমাই। আলাপের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভাষা। রসিক পালোয়ান দোভাষীর ভূমিকাটি নিলে আমার জন্য বিষয়টা সহজ হয়। সলজ্জ মেয়েটি বুঝে গেছে, তার সহজ শুভ্ররূপ আমাকে আকৃষ্ট করেছে। সে তখন আরো লাজুক হয়ে পড়ে, এমনিতেই সে ইংরেজি জানে না, উজবেক ভাষাও গুলিয়ে যায়। দোকানটির মালিক রাতে পোলাও পাওয়া যাবে বলে আমাদের অগ্রিম কমিটমেন্ট নিতে চায়। সেও বুঝে গেছে, পোলাও না হোক, যুবতীর টানে নিশ্চয়ই ভিনদেশীরা চলে আসবে তার রেস্তোরাঁয়।
ইচানকালার ভিত্তিপ্রস্তর দশম শতাব্দীতে স্থাপিত হলেও এখন যে স্থাপনাগুলো দেখা যায়, তা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে নির্মিত। সে সময়ে খিভা শাসন করেছে খিভার বিখ্যাত খান (Khanate) বংশ। বিশেষ ধরনের ইটের তৈরি ১০ মিটার উঁচু দুর্গ প্রাচীরের ভেতর অন্তত ৫০টি ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ২৫০টি বাড়ি রয়েছে। ৫০টি স্থাপনার অর্ধেকেরও বেশি মাদ্রাসা। মসজিদ আছে সাতটি, আর সমাধিস্থল চারটি। ইচানকালার চারদিকে চারটি বড় প্রবেশ ফটক, দুর্গের প্রবেশপথ যেমন হয়— মজবুত, যুদ্ধংদেহী, জমকালো ও প্রকাণ্ড, এগুলোও তেমনি। দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশের আগে আমরা একটি larger than life স্ট্যাচুর সমুখে এসে কৌতূহল নিয়ে দাঁড়াই। এটি উজবেকিস্তানের সুবিখ্যাত কবি আল-খোরেজমির মূর্তি। কবিকে বড় সম্মান দিয়েছে এ জাতি। পেছনেই মুহাম্মদ আমিন খান মাদ্রাসা। কাছেই একটি বিলবোর্ডে মধ্যযুগের সুপরিচিত বাণিজ্যপথ সিল্ক রুটের মানচিত্র আঁকা। আমরা দুর্গে প্রবেশ করি এর সবচেয়ে বৃহৎ দরজা Ota Darvoza দিয়ে। তবে কি দরওয়াজা শব্দটি এ অঞ্চল থেকেই এসেছে? পর্যটকদের প্রবেশের এটিই প্রধান দরজা। পশ্চিমমুখী প্রবেশ দুয়ারে পড়ন্ত আলো এসে পড়েছে, আর তা দিয়ে বেরিয়ে আসছে এক বিবাহ মিছিল। সমুখেই বর-কনে, তাদের সঙ্গেই একদল নারী, পেছনে কয়েকটি ছোট দলে বিভক্ত বর-বধূ অনুগামী আত্মীয়-অতিথিবর্গ। ফটকের মুখটায় বর-বধূর ছবি তুলছিল প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান। অমন লোভনীয় দৃশ্য আমাকেও টানে, আমিও ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে যাই। অবাক হয়ে লক্ষ করি, কোনো বিরক্তি বা উষ্মা নয়, তারা হাসিমুখে তাকিয়ে আছে আমার ক্যামেরার দিকে। প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যানের ছবি তোলা শেষ হলেও আমার ছবি তোলার সুবিধার্থে পোজ দিয়ে আছে। বধূটি পরে আছে ধবধবে সাদা রঙের বহুকুঁচির ভাঁজতোলা, ফোলানো বিয়ের গাউন, যেমনটি পরিধান করে খ্রিস্টান ধর্মমতে বিয়ে করা বধূরা। বর পরিধান করেছে খ্রিস্টান বিয়েতে বর যে পোশাক পরিধান করে, তাই। উজবেকিস্তানের ৯০ ভাগ মানুষই মুসলমান, কিন্তু বর-বধূর বিয়ের পোশাক খ্রিস্টানদের অনুরূপ।
দুর্গের প্রবেশপথে আমার ও খায়রুলের জন্য দুটি টিকিট কিনল পালোয়ান। বিদেশীদের টিকিট কিনেই প্রবেশ করতে হবে, আর আমরা যে বিদেশী, তা শনাক্ত করে প্রতিটি উজবেক। ঢুকতে না ঢুকতেই আরেক বিবাহ দল, সামনে শুভ্র গাউনের সুন্দরী বধূ, পাশে তার পশ্চিমা পোশাকে ধোপদুরস্ত বর, পেছনে প্রথমে মেয়ের দল, পরে ছেলের দল। আমি চলমান আনন্দ ঢলটির ছবি তুলতে থাকি, প্রথমে বর-বধূ, পরে যুবতী নারীদের। এক বিদেশীর ছবি তোলা দেখে তারা কেবল কৌতূহলী নয়, হাস্যোজ্জ্বল ও দারুণ অতিথিপরায়ণ ভঙ্গি করে। তারা চলতে চলতেই আমার ক্যামেরার দিকে তাদের অনুপম মুখশ্রী সব বাগিয়ে ধরল, যেন এক চিত্রপরিচালক তার পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য নায়িকামুখ নির্বাচন করছে। মেয়েরা পেরিয়ে যেতেই এল ছেলের দল, তারা নিজেরাই দৌড়ে এসে আমার ও খায়রুলের সঙ্গে ছবি তুলতে লাগল। মোবাইল ফোন পৃথিবীর সব প্রান্তেই বোধকরি পৌঁছে গেছে, এদের হাতেও তা শোভা পাচ্ছিল। এদের অতিথিপ্রিয়তা ও আগ্রহ দেখে আমরা হতবাক। এখানকার মানুষের আচরণ যতই দেখছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি, মুগ্ধ হচ্ছি। এক পাশে উঁচু দেয়াল, অন্য পাশে মসজিদ, দূর প্রান্তে এক উঁচু মিনার, এমনি এক ইট বিছানো পথ ধরে হাঁটি। তখনই দেখতে পাই বিবাহ ঢলের তৃতীয় আনন্দবাহী দলটিকে। অভিজ্ঞতা আগের মতোই, মুগ্ধ হই!
যতই সমুখে এগোই, ততই দুর্গটির রহস্যপর্দা-আব্রু উন্মোচিত নারীর মতো একটু একটু করে খুলে যায়। দূরের মিনারটি কাছে আসে, প্রতিভাত হয় আরেকটি মিনার। এটি দুর্গের সবচেয়ে মোটাদেহ মিনার, নাম Kalta Minor। এর গাত্র বর্ণিল মোজাইক পাথরে ঢাকা, চূড়া হালকা ও ঘন নীল রঙের পাথরে দারুণ কারুকার্যময়। একটি মাদ্রাসা পেরিয়ে দেখা মেলে আরেকটি মাদ্রাসার। মসজিদগুলো চেনা যায় তাদের ডোমাকৃতি চূড়া আর মিনার দেখে, আর মাদ্রাসাগুলো চেনা যায় তাদের বিশাল আকারের উঁচু দরজা দেখে। তাসখন্দে যেমন দেখেছি, মাদ্রাসার দরজাগুলোও রঙিন পাথরে কারুকার্যখচিত, সেখানেও হালকা ও ঘন নীল রঙের প্রাধান্য। আগে যে শুনেছি, ইচানকালা নগরীর ভেতর আরেক নগরী, তাই ক্রমেই পরস্ফুিট হচ্ছিল। মসজিদগুলোয় নামাজ পড়া হলেও (অবশ্য সবগুলোয় নয়, এদের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রদর্শনই বেশি মূল্যবান) মাদ্রাসাগুলোর কোনোটিই সচল নয়, এর অনেকগুলো রূপান্তর করা হয়েছে জাদুঘরে। দুর্গের পথে পথে বিভিন্ন হস্তশিল্প, বেশির ভাগই মেয়েদের পুঁতির মালা ও পাথুরে অলঙ্কার, পশমি টুপি, সিরামিকের নকশা করা প্লেট, পুতুল ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব দোকানিই নারী, মাদ্রাসারূপী জাদুঘরগুলোর দায়িত্বও নারীদের ওপরই। দেখে মনে হবে, নারী স্থানে প্রবেশ করেছি। তারা খুব বিনয়ী, দ্রব্যসম্ভারের দিকে আহ্বান জানালেও কেনার জন্য চাপপ্রয়োগ নেই। আমরা অবশ্য কিছুই কিনি না, কেননা দিনের আলো ফুরিয়ে আসার আগে যতটা সম্ভব চিত্রধারণ করতে চাই, তাতে দুর্গ, মিনার, দরজা যেমন ঠাঁই পায়, তেমনি ঠাঁই পায় ওইসব নারীর সহাস্য উপস্থিতি। বিনয়ী এসব নারীকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বললে তারা বুকের বাম পাশে হাত ভাঁজ করে রেখে সমুখের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’।
পড়ন্ত বিকালের সোনারঙ আলো পড়ে ইচানকালা তার ঐতিহাসিক সব গম্বুজ ও ডোম, উঁচু দেয়াল ও প্রাঙ্গণ সোনারঙ ধারণ করেছে। সূর্যের বদান্যতায় দারুণ সব ছবি ওঠে ক্যামেরায়, চোখের কর্নিয়ায়ও অপরূপ সৌন্দর্যের দ্যুতি, মগজের অযুত-নিযুত স্নায়ুকোষে ইতিহাসের বিচিত্র চিত্র ধারিত। Polvon Kori বা পুবের পথ হঠাৎই সরু ও নিচু হয়ে গেলে বুঝি দুর্গের ভূমি পূর্ণ সমতল নয়, বরং তার রহস্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূমির বক্রতা। পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলে একটি সুড়ঙ্গপথ খুঁজে পাই, যার অন্য প্রান্তে গিয়ে বুঝতে পারি, ইচানকালার একটি সীমানা পেরিয়ে এসেছি, এটি পূর্বের দরজা। দুর্গের বাইরে খিভার মলিন দরিদ্র জনপদ, নগর নয়, আধো গ্রামীণ চেহারার বিষণ্ন বদন ঝুলিয়ে রেখেছে। সুড়ঙ্গপথে ফিরে এসে দুটি প্রাচীন স্থাপনার, দুটি মুখোমুখি মাদ্রাসা, যেখানে যায় সেটি একটি দুর্গ অভ্যন্তরস্থ আবাসিক এলাকা, এ স্থান দিয়ে সহজেই যে কেউ ইচানকালায় প্রবেশ করতে পারে। এরপর একটি দরজা দিয়ে যেখানে প্রবেশ করি, সেরূপ কোনো স্থানে এ জীবদ্দশায় আমি বা খায়রুল কখনই প্রবেশ করিনি। এর নাম শুনে কেঁপে উঠি। এর কথা আরব্য রজনীতে পড়েছি, কখনো দেখতে পাব ভাবিনি।
ছোট গেট দিয়ে ঢুকলে একটি বড় প্রাঙ্গণ, তার চতুষ্পার্শ্বে টানা দোতলা দালান। নিচে কয়েকটি ঘর প্রাঙ্গণের কিছুটা ভেতরে চলে এসেছে, ঘরগুলো ও দালানে প্রাচীন স্থাপত্যের ছাপ। যে বয়সী
ভদ্রমহিলা আমাদের ভেতরে ঢোকার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, তিনি জানালেন, এটি একটি হারেম। খিভার শাসক আল্লাহ কুলি খানের হারেম Tash Hauli। তার ছিল চার বিবি ও ৪০ উপপত্নী। ইসলামে যেহেতু একসঙ্গে চার বিবির অধিক রাখা হারাম, তাই তিনি হেরেমে চার বিবির অধিক রাখেননি, ধর্ম পালন করেছেন! (?) বাকি ৪০ জনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিবিদের সমান্তরাল হলেও তারা বিবির মর্যাদা পায়নি, রক্ষিতা হয়েই শাসকের দেহক্ষুধা মেটাতে হয়েছে। তবে কোনো বিবি তালাকপ্রাপ্ত হলে রক্ষিতাদের কেউ কেউ বিবির স্ট্যাটাস পেয়েছেন। দোতলার ওই বৃহৎ ঘরগুলোয় টানা বিছানায় রক্ষিতারা একত্রে ঘুমাত। কেবল ডাক পড়লেই তাদের যেতে হতো নিচের নিভৃত ঘরে। বয়সী মহিলাটি আমাদের তালা খুলে এমনই একটি কক্ষ দেখালেন। বেশ ছোটই কামরাটি, এক পাশে রমণলীলার জন্য অপরিসর বিছানা, সমুখে আমিরের বসার জন্য একটি বাদশাহী চেয়ার, ছোট টেবিলে পানপাত্র ও সোরাহি, আমিরের জোব্বাটোব্বা ঝুলিয়ে রাখার আলনা, এ পাশে কিছু আসবাব, পোশাক রাখার আলমারি, কিছু তৈজসপত্র প্রভৃতি রয়েছে। কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া সেসব প্রণয়লীলা কল্পনায় ভেসে আসতেই মনে পড়ে, নারীকে ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছু ভাবেনি এসব পুরুষ শাসক, ধর্মের দোহাই দিয়ে অকাতরে অধর্মের কাজ করে গেছে, ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে স্থানীয় সুন্দরী যাকেই নজরে পড়েছে, তাকেই তুলে এনেছে মিলনশয্যায়। এদের যৌন সক্ষমতা আরব্য রজনীর মতো কল্পপ্রায়, কামনা সমুদ্রের মতো বিস্তৃত, অনাচার পাহাড়ের মতো উঁচু, জাগতিক সৌভাগ্য জ্যোত্স্নার মতো চরাচরব্যাপী।
আল্লার দাসের (আল্লা কুলি) হারেম থেকে বেরিয়ে আমরা কয়েকটি মাদ্রাসা যেগুলো পরিণত হয়েছে অপরিণত জাদুঘরে, সেগুলো ঘুরে দেখি। বয়স্কা বিগতা যৌবনা রমণীরা আমাদের ঘুরিয়ে দেখান ছোট ছোট কক্ষে রাখা বিবিধ ঐতিহাসিক বা প্রতীকী বস্তুসম্ভার। অনেক জাদুঘরেই ভিউকার্ড, ছবি, খিভার ইতিহাসসমৃদ্ধ ইংরেজি পুস্তক বিক্রি হচ্ছে। একটি জাদুঘরে ইবনে বতুতা লিখিত Kanun পুস্তকটি দেখতে পাই।
দিনের শেষ আলোয় কয়েকজন সুন্দরী ললনার সঙ্গে আলাপ জমাই। তারা সানন্দে আমার সঙ্গে ছবি তোলে, খায়রুল এসব ব্যাপারে একটু লাজুক, সে সরে থাকে। বাতচিত হয় আমাদের দোভাষী রসিকজন পালোয়ানের সৌজন্যে, ছবি সে-ই তুলে দেয়। খায়রুলের সঙ্গেই তার জমে বেশি। ইচান দুর্গে ক্রমেই দিন ফুরিয়ে আসে, কমে আসে দিনের আলো। আমরা তিনজন— খায়রুল, পালোয়ান ও আমি যতটা সম্ভব দিনের আলো থাকতে থাকতে দুর্গের স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার চেষ্টা করি। প্রথমে যাই একটি সুপ্রাচীন মসজিদ (Djuma Mosque) চত্বরে, যার ছাদ মাথায় তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কারুকার্যখচিত কাঠের খুঁটি, সিমেন্টের প্রাঙ্গণে তারা এক ছায়াময় জ্যামিতি তৈরি করেছে। সেখানে কাঠের নিচু বেঞ্চ রয়েছে, যেখানে বসে জিরানো যায়। জুমা মসজিদটি অষ্টাদশ শতকে নির্মিত, তবে এর অনেক দরজা ও খুঁটিতে চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের তারিখ উত্কলিত, যা থেকে বোঝা যায়, এটি বারবার নির্মিত হয়েছে পুরনো ধ্বংসাবশেষের ওপরে। খুঁটিগুলোর কারুকাজ খোরেজম প্রদেশের শ্রেষ্ঠ কাঠশিল্পীদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে। চারদিক থেকে প্রবেশযোগ্য জুমা মসজিদের নীলরঙা সুদৃশ্য মিনারটি ৫১ মিটার উঁচু।
এরপর আমরা প্রবেশ করি একটি মাদ্রাসার ভেতর, যা এখন পেইন্টিং মিউজিয়াম। এখানকার মাদ্রাসাগুলোর সমুখে একটি প্রকাণ্ড কারুকার্যময় দরজা থাকে, অনেকটা সিংহ দরজার মতো। দুর্গের প্রবেশপথে যেমন কিছু কক্ষ থাকে, তেমনি অপরিসর কক্ষে পুরনো চিত্রমালা প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরটির তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত আছেন দুজন নারী, একজন মধ্যবয়সী, অন্যজন যুবতী। বয়সের কারণে দ্বিতীয়া অধিকতর মনোলোভা হলেও বয়সী নারীর রূপে একটা আভিজাত্য ফুটে রয়েছে। বয়সী রমণী আমাদের কাছে জাদুঘরের টিকিট বিক্রি করেন ২ হাজার সুম নিয়ে, যা দিয়ে আমরা তার ভাষ্যমতে, আরো তিনটি জাদুঘর দেখতে পারব। টাকার অংক কম বলে আমরা গা করি না, কিনে নিই। সে কিছু ভিউকার্ড দেখায়, যদি আমরা কিনি। ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখিয়ে তাকে নিরুৎসাহিত করি। সে আমাদের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরিয়ে দেখায়। বয়সী রমণীর নাম কারিমা, যুবতীর নাম জুমরাট। দুজনই এখানকার ঐতিহ্য মেনে ভারি অতিথিবান্ধব, ভারি আমুদে। রসিক পালোয়ান তাদের সঙ্গে আমার ছবি তুলে দেয়। যুবতী রমণীর চারটি দাঁত স্বর্ণ দিয়ে বাঁধানো, পালোয়ান চাইছিল, ছবিতে যুবতীর মুক্তো হাসির সঙ্গে যেন সোনালি হাসিও যুক্ত হয়। আর এটা করতে গিয়ে সে নিজেই এত বেশি হাসছিল যে, হাত কেঁপে উঠে প্রতিটি ছবি ঝাপসা হয়ে যায়— হাসি ঝাপসা, অবয়ব ঝাপসা। তবে মনের ছবিটি ঝাপসা হলো না। সত্যি ভারি বন্ধুত্বপূর্ণ এ দেশের মানুষ। ছবির জাদুঘর থেকে বেরিয়ে আমরা প্রবেশ করি সংগীত জাদুঘরে। উজবেকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সব বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনীতে রাখা। সুরপাগল হাতে এককালে মুখরিত প্রাণহীন সেসব যন্ত্রে বহুকাল সুর তোলেনি কেউ!
দুর্গ অভ্যন্তরস্থ সাতটি মসজিদের ভেতর সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য জুমা মসজিদ। আরেকটি মসজিদ দেখতে দক্ষিণগামী সড়ক ধরি। সড়কটির নাম বুখারা সড়ক। সড়কের একপাশে দেয়ালঘেঁষে হস্তশিল্পসামগ্রীর ছোট ছোট দোকান, অন্য পাশে বিবিধ স্থাপনা। সেখানে রুটি বানাচ্ছিল দুই রমণী, সন্ধ্যার আহারের আয়োজন। হলুদ কোট পরিহিতা এক প্রখর দোকানির সঙ্গে পালোয়ান আমার ছবি তুলে দেয়, মেয়েটি তার বান্ধবীসহ পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। ধন্যবাদ দেয়ার সময় তাকে বলি, গুজাল, অর্থাৎ সুন্দর!
আমরা হাঁটছিলাম, একটি মসজিদের সমুখের প্রাঙ্গণের প্রবেশদ্বারের বাঁকানো খিলানের নিচে দাঁড়ালে অনেক মিনার, গম্বুজ, সৌধের চূড়া চোখে পড়ে। ইচানকালায় যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই অনেক পুরাকীর্তির ও রকম অতীতের প্রত্নজাগানিয়া স্থাপত্য সৌন্দর্যের সমাবেশ! সামান্য দক্ষিণে একটি সরু পথ নেমে গেছে নিচে। উঁচু স্থান থেকে সড়ক শীর্ষে দৃষ্টিনন্দন মিনারের ছবি তুলছিলাম, তখনই কথা হয় এক পর্যটক দম্পতির সঙ্গে, তারা রাশিয়া থেকে এসেছে। তাদের এই প্রথম দেখি তা নয়, প্রথম দেখেছিলাম তাসখন্দ বিমানবন্দরে, পরে উরগেনচ বিমানবন্দরেও, অর্থাৎ আমরা একই প্লেনে চড়ে এসেছি। এরাও আমাদের মতোই কাল বুখারা যাবে, আমরা একত্রে যেতে পারি কিনা পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, গন্তব্য এক হলেও আমাদের বাহন ও ভ্রমণ ভিন্ন।
আবদুর রাসুলবাই মসজিদের পেছনে একটি সমাধিস্থল। স্টিমার ঘাটে যেভাবে বক্স জড়ো করে রাখা হয়, কবরগুলোও তেমনি গায়ে গায়ে লাগানো, একটির ওপরে আরেকটি। কাদের কবর সেগুলো? শাসক পরিবারের সদস্যরা তো আছেই, সেখানে রয়েছে সে আমলের বিখ্যাত মানুষ— সভাসদ, সেনাপতি, কবি, স্থপতি, মন্ত্রী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, বিদ্বান— কত বিচিত্র পেশার সফল মানুষ। খুব কাছে না গেলে তাদের নামও পাঠ করা যায় না। মানুষের অমরত্বের বাসনা কত ভঙ্গুর!
ভারি মন নিয় হাঁটি আর জগতের অনিত্যতা অনুধাবন করার চেষ্টা করি। সমুখেই একটি রেস্তোরাঁ। ঢুকে বুঝি, এটি একটি হোটেলও, নাম হোটেল খিভাক (Hotel Kheivak)। ওই নামের সুমিষ্ট জলের কুয়াটি রয়েছে দুর্গের উত্তর পাশের প্রবেশদ্বারের কাছে। পর্যটকরা দুর্গের ভেতরেই থাকা পছন্দ করে। ঢুকে কাউন্টারে যে ধবধবে ফর্সা একহারা লম্বা রমণীকে দেখি, তাকে দেখে কে বলবে সে ইউরোপীয় নয়। ভাবলাম, কোনো ইউরোপীয় দম্পতি এখানে হোটেল চালাচ্ছে। পরে সমুখের রেস্তোরাঁর চেয়ারে আমরা যখন পানীয়র তৃষ্ণায় বসেছি, সেই রমণী এসে অর্ডার নিয়ে গেল। পালোয়ানের সঙ্গে তার কথাবার্তা শুনে বুঝি, সে উজবেক মেয়ে, যার প্রপিতামহী বা প্রমাতামহীরা বহু প্রজন্ম আগে এ দুর্গের ভেতরেই হয়তো ভিন্ন ভূমিকায় ছিলেন। যুবতীর নাম কারিনা। কারিনা? হিন্দি সিনেমার কারিনা খিভায় কী করে এল? তখনই জানতে পারি, এখানকার লোকেরা হিন্দি সিনেমা দেখে। হিন্দি সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের খুব পছন্দ করে তারা, এতটাই যে, ছেলেদের নাম শাহরুখ বা সালমান, আর মেয়েদের নাম কারিনা কিংবা দীপিকা রাখে।
কফিপান শেষে আমরা ফের বুখারা সড়কে। বর্তমানের এ ঘরবাড়ি, পরিত্যক্ত মাদ্রাসা বা মসজিদ দেখে অতীতের জীবন অনুধাবন করা কঠিন। পুবের সড়কের উত্তর পাশে একটি বড় প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াই। জানতে পারি, এখানে গানের আসর বসে। সবচেয়ে বড় আসরটি বসে প্রতি বছর ২১ মার্চ, যেদিন উজবেকদের নওরোজ বা নববর্ষের শুরু।
আমি চতুষ্পার্শ্বের ইতিহাস ও বায়ুমণ্ডলে মাথা তুলে দাঁড়ানো অজস্র প্রাচীন স্থাপত্যের ছবি তুলে চলি। বিবিধ কৌণিক অবস্থান থেকে বহুবিধ প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সেসব সৌধনির্মাণ! ভাবি, কী অনন্য ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি অনন্যসাধারণ এক ভূগোলে। সাম্প্রতিক কালে ঘষামাজা করা চকচকে স্থাপনাগুলো যে প্রচুর পর্যটক টানবে, সন্দেহ নেই। পর্যটক যদিও রোমাঞ্চিত হয় স্থাপনার প্রত্নমূল্য দেখে, বাহারি আধুনিকতা দেখে নয়, তবু মহাকালের পৃষ্ঠায় কতকাল দাঁড়িয়ে থাকতে পারে একেকটি মানবীয় নির্মাণ? তারও আয়ুষ্কাল আছে। খিভায় নির্মিত অনেক দুর্গ, প্রাসাদ ধূলিতে মিশে গেছে। মহাকাল বড় নির্মম!






