না, আবদুল কাদির নন বিমূর্ত। সৃজন সম্ভার, কর্মাবলিও তাঁর বিমূর্তকে করে না হাজির; গায় না সেই সাফাই। সবকিছুতেই তিনি মূর্ত, স্বাভাবিকতা-ব্যতিক্রমিতায় দোর্দণ্ডরূপে স্পষ্ট এবং বাঙময়ও। কিন্তু তাঁকে ঘিরে রচিত হয়েছে দুর্ভেদ্য এক বিমূর্ত দেয়াল। আড়ালে, আলোহীনতায় জন্ম নিয়েছে বিস্মরণ নামক এক বিষবৃক্ষ, যার সম্মোহনে বুঁদ হয়ে বিস্মরিত হচ্ছে আবদুল কাদিরের মতো ধীমান ব্যক্তিত্ব। বিস্মরণ না হলেও প্রাপ্য, বাস্তবে সেটাই হচ্ছে সম্পাদন। প্রতিষ্ঠান-সংগঠন, শিক্ষায়তন-গবেষণা, সরকারি-বেসরকারি, পারিবারিক-ব্যক্তিক কোথাও নেই তাঁর সরব কিংবা নীরব উপস্থিতি।

আবদুল কাদিরকে বিস্মরণের হেতু কি আমাদের সহজাত বিস্মরণ প্রবণতা? চিরায়ত মানসিকতা এবং ঐতিহ্যগতভাবে প্রাপ্ত চারিত্র্যেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কি এসবের মধ্য দিয়ে? যে মনীষা নানাভাবেই স্মরিত হওয়ার দাবিদার, বিশেষ মহিমা ও মর্যাদাপ্রাপ্তি যার ক্ষেত্রে ছিল অবধারিত, তাঁকে ভুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বেশক’টি বার্তা দেয়া হয়েছে বর্তমান ও নতুন প্রজন্মকে। এসব পর্যবেক্ষণ করলে যা প্রতীয়মান ও উন্মোচিত হয়, তার উপসংহার হলো, আমরা স্বাজাত্যবোধকে আমূলে ধারণ করতে পারিনি। আপন শিকড়ের প্রতি নিমগ্ন আত্ম তো নয়ই, সেই কসরতও নয় চর্চিত। কাদিরকে উপেক্ষা কিংবা বৃত্তবন্দি করে আমরা প্রকারান্তরে যে নিজেদের সত্তাকে আড়াল করছি, সেটাতেও নেই কোনো ধরনের হেলদোল কিংবা ন্যূনতম অনুধাবন। নজরুল, রোকেয়া, সিরাজীর মতো আমাদের জাতিসত্তার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে আরো প্রবলভাবে জানতে ও বুঝতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য ও অতুলনীয়, প্রাতিস্বিকও বটে। নজরুল বাঙালির চিন্তাচেতনায় নানাভাবে হাজির হয়েছে কাদিরের শ্রম-নিষ্ঠা-এষণা ও প্রগাঢ় প্রেমের বদৌলতে। নজরুল আমাদের দেশ-মাতৃকার জাতীয় কবি। স্বাধিকারের লড়াইয়ে, স্বাধীনতার আন্দোলনে, মুক্তির সংগ্রামে নজরুলের সৃষ্টি সম্ভার যেমন করেছে প্রণোদিত, দিয়েছে উজ্জীবনের মন্ত্র, তেমনি দিয়েছে পরম নির্ভরতা ও বৌদ্ধিক চালিকাশক্তি। ব্রিটিশ বিরোধিতা ও আমাদের স্বাজাত্যবোধ জাগ্রত হওয়ার কালে তাঁর লেখনী ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তি অন্বেষী মানুষের অনিবার্য উচ্চারণ-সাহসী এক ইশতেহার। নজরুল গবেষক কিংবা প্রেমীরা শুধু নন, নজরুল পড়ুয়াদের প্রায় সবাই জানেন, বোঝেন এবং মানেন যে, নজরুলের ধাত ছিল বাউণ্ডুলে। বাংলা ভাষার এ কবিপ্রবরকে জীবদ্দশায় তো বটেই একেবারে তরুণাবস্থায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখার পর পরই ‘বিদ্রোহী’র আখ্যা দেয়া হয় যেমন, তেমনি তার বাউণ্ডুলে পরিচিতিও দাঁড়িয়েছিল একই সময়ে, বাস্তবে ছিলেনও অবিকল। ১৯৪২ সালে আকস্মিকভাবে বাকশক্তি রহিত হওয়ায় ‘বাউণ্ডুলে’ বিদ্রোহীর বইপত্র-এখানে ওখানে প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত রচনারাজির সবই ছিল ছড়ানো-ছিটানো ও দুষ্প্রাপ্য অবস্থায়। আবদুল কাদিরই প্রথম এ অবস্থা থেকে নজরুল রচনাকে রক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং নজরুল রচনা সংগ্রহ ও সম্পাদনার আলোকে রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ নেন। অবশ্য এ কাজের আগেও আমরা পেয়েছি তাঁর নজরুল প্রীতির অনবদ্য সাক্ষাৎ। স্বাধীন বাংলাদেশে নয় শুধু, নজরুলের জন্মস্থান ওপার বাংলার পশ্চিমবঙ্গেও যেকোনো গবেষক-সুহূদ-শুভানুধ্যায়ীর আগেই তিনি শুরু করেছিলেন নজরুলচর্চা। আবদুল কাদির নজরুল রচনাবলি সংগ্রহ ও সম্পাদনার পাশাপাশি জীবনী রচনারও পথিকৃৎ। খোন্দকার সিরাজুল হক ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ চিন্তা ও সাহিত্যকর্ম’তে লিখেছেন, ‘‘নজরুল-রচনাবলী রচনার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘নজরুল-পরিচিতি’ নামে নজরুল বিষয়ক প্রবন্ধের একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। গ্রন্থটি শুরু হয়েছে তাঁর রচিত ‘কবির জীবনকথা’ দিয়ে। এ গ্রন্থে নজরুল-প্রতিভার বিভিন্ন দিক নিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে আবদুল কাদির, ইব্রাহীম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মুহম্মদ এনামুল হক, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, মুহম্মদ আবদুল হাই (১৯১৯-৬৯), আব্বাসউদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯), আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), সৈয়দ আলী আহসান, মুনীর চৌধুরী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’’

আবদুল কাদিরকে আমরা যদি শুধু নজরুল রচনাবলির প্রথম সম্পাদক হিসেবে মূল্যায়ন করি, তাহলে তাঁকে খণ্ডিতরূপে করা হবে হাজির। কারণ নজরুল সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে কাদির ক্ষুদ্র পরিসরে, সংক্ষিপ্ত আকারে নজরুল গবেষণায় তাত্পর্যপূর্ণ সবিশেষ মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি নজরুলকে কোন বিবেচনার আলোকে কতটা করেছিলেন ধারণ, এ নির্যাসকথনে হয় স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন :

০১. নজরুলের শিল্প-শক্তির সর্বোত্তম বিকাশ গীতি সৃষ্টিতে। তাঁর কবিতায় নব্য প্রতীকবাদ, প্যান-ইসলামবাদ, সমাজতন্ত্রবাদ প্রভৃতি পাঁচ মিশেলীর সাক্ষাৎ মিললেও তিনি নিঃসন্দেহে বাঙলার প্রথম জাতীয় গণতান্ত্রিক কবি। [‘নজরুলের জীবন ও সাহিত্য’, পৃ. ৩০]

০২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে নজরুল যখন কলকাতায় আসেন, তখন খেলাফত আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া তাঁহার মনে পূর্ণভাবে কার্যকর হইয়াছিল। সেকালের বহু চিন্তাশীল মুসলমানের মতন নজরুলও তাই প্যান-ইসলামের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁহার বহু রচনায় সুস্পষ্ট হইয়া আছে। অবশ্য একথা সত্য যে, খেলাফত যুগের বিশিষ্ট আবহাওয়ায় নজরুলের আবির্ভাব হইলেও খেলাফত-পরবর্তী যুগের চিন্তাসম্পদই তাঁহার রচিত সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য। [‘নজরুল-কাব্যলোক’, পৃ. ৪৬-৪৭]

০৩. বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আত্মিক জীবনের দুর্গতি নজরুলের মনে সঞ্চার করেছিল তীব্র বেদনা- বোধ; তাই ইকবালের মতো তিনিও চেয়েছিলেন সকল সামাজিক কুসংস্কার ও আধ্যাত্মিক অচলায়তনের বেড়াজাল থেকে আশু অব্যাহতি। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশ্ব-মুসলিমের পশ্চাদপসারণ লক্ষ করে তাঁর মনে হয়েছিল যে, এই অধোগতি প্রতিরোধ করতে হলে চাই বৃহতের সাধনা। [‘নজরুলের সাহিত্যের একদিক’, পৃ.৯৬]

কাদিরের নজরুল মূল্যায়ন বিশেষ অভিনিবেশের দাবি রাখে। কারণ পরবর্তী নজরুল গবেষকরা কাদির সংগৃহীত-সম্পাদিত তথ্য-উপাত্ত থেকেই পেয়েছেন নজরুলচর্চার আকর অমেয়।

নজরুলের কর্মযোগ সম্পাদনায়ও কাদির ‘সম্পাদকের নিবেদন’ অংশে যে অভিমত রেখেছেন এবং সম্পাদনায় গৃহীত পন্থার যৌক্তিকতা উপস্থাপন করেছেন, তাও নজরুলচর্চায় বিশেষ গুরুত্ববহ। আবদুল কাদির ‘নজরুল রচনাবলী’র ভূমিকা অংশে সেসবই স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন :

০১. এই খণ্ডে [১ম খণ্ড] নজরুল ইসলামের সাহিত্য-জীবনের প্রথম যুগের- সেই যুগে তাঁর অন্তরে দেশাত্মবোধ ছিল প্রধানতম প্রেরণা— সকল রচনা সংগ্রথিত হয়েছে। নজরুলের দেশাত্মবোধের স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা নানাজনে নানাভাবে করেছেন। রাজনীতিক পরাধীনতা ও অর্থনীতিক পরবশতা থেকে তিনি দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীণ মুক্তি চেয়েছিলেন; তার পথও তিনি নির্দেশ করেছিলেন; কেউ ভেবেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা— কারণ তিনি ‘চিত্তনামা’ লিখেছিলেন; কেউ ভেবেছিলেন প্যান-ইসলামিজম— কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন; আবার কেউ ভেবেছেন মাহাত্মা গান্ধীর চরকা তত্ত্ব— কারণ তিনি গান্ধীজীকে তাঁর রচিত ‘চরকার গান’ শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছিলেন। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে, এসব ভাবনার কোনটাই সত্যের সম্পূর্ণ স্বরূপ উদ্ঘাটনের সহায় নয়। প্রকৃতপক্ষে নজরুল তাঁর সাহিত্য-জীবনের প্রথম যুগে ছিলেন কামালপন্থী— কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই তিনি ভেবেছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সর্বাপেক্ষা সমীচীন পথ।

০২. এই খণ্ডে [২য় খণ্ড] নজরুল ইসলামের সাহিত্য-জীবনের দ্বিতীয় যুগের রচনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নজরুল তাঁর সাহিত্য-জীবনের দ্বিতীয় যুগের সূচনায় যে মতবাদের প্রবক্তা হন, তা প্রত্যক্ষত গণতান্ত্রিক সমাজবাদ (ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম)। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের প্রতি নজরুলের মনের প্রগাঢ় অনুরাগ তাঁর ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’ ও ‘ফণি-মনসা’র বহু কবিতা গানে সুপরস্ফুিট। তাঁর ‘মৃত্যু-ক্ষুধা’ উপন্যাসের ‘আনসার’-চরিত্র এই আদর্শবাদের আলোকে বিকশিত।

০৩. এই খণ্ড [৩য় খণ্ড] নজরুল ইসলামের সাহিত্য জীবনের তৃতীয় যুগের প্রায় সমুদয় রচনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নজরুল তাঁর সাহিত্য-জীবনের তৃতীয় যুগে প্রধানত গীতিকার ও সুরস্রষ্টারূপেই প্রথিত-কীর্তি ও প্রতিষ্ঠাপন্ন। রোমান্টিক কবিকৃতির সকল লক্ষণ তাঁর এ যুগের সাহিত্য সৃষ্টিতে সুস্পষ্ট। বঞ্চনাহত অরণ্যের আন্দোলক ও উন্মত্ত সমুদ্রের ঊর্মিলতা নজরুলের কাব্যে যেমন বাঙময়, মিলনের উদ্দাম ও বিরহের ব্যাকুল বেদনা তাঁর প্রেমের গানে তেমনি ব্যঞ্জনাময়। তাঁর দেশাত্মবোধ ও ভক্তিভাবমূলক গানগুলোতেও প্রকৃতিপ্রেম ও প্রতীতি অভূতপূর্ব চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ ও সৌন্দর্যময়। তাই অনবদ্য সৃষ্টির দিক দিয়ে নজরুলের শিল্পী জীবনের দ্বিতীয় যুগকে যদি বলা হয় তাঁর কাব্য-সাধনার শ্রেষ্ঠ যুগ, তা হলে এই তৃতীয় যুগকে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে তাঁর সঙ্গীত সাধনার শ্রেষ্ঠ যুগ।

০৪. নজরুল ইসলামের সাহিত্য-জীবনের চতুর্থ যুগের প্রায় সমুদয় রচনা এই খণ্ডে [৪র্থ খণ্ড] অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নজরুলের কবি জীবনের চতুর্থ স্তরে ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা ও মরমীয়া গান এক বিশেষ স্থান ও মহিমা লাভ করেছে। এই যুগের একটি কবিতায় তিনি বলেছেন:

         আল্লা পরম প্রিয়তম মোর, আল্লা তো দূরে নয়;

         নিত্য আমারে জড়াইয়া থাকে পরম সে প্রেমময়।

আধ্যাত্মিকতার স্তরে উত্তীর্ণ হ’য়ে নজরুল এ-সব কথা বলেছেন, তার অন্তর্গূঢ় রস-রহস্য পৃথিবীর একমাত্র মর্মবাদী সুফি সাধকরাই উপলব্ধি করতে পারেন— সাধারণ মানুষেরা সেই বাণীর রসে আপ্লুত হলেও তার রহস্য অনুধাবন করতে অক্ষম। নজরুল সাহিত্যের চতুর্থ স্তরে এ অন্তর্জ্যোতিদীপ্ত আধ্যাত্মিকতাই পেয়েছে প্রাধান্য অথবা বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত ধর্মের ও ধর্ম সংস্কারের নানারূপ ও রীতির আশ্রয়ে এ আধ্যাত্মিকতার অভিব্যক্তি হয়েছে জনমন-রঞ্জনের পরম উপযোগী। অথচ ধর্মীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে আহরিত উপমা, রূপক ও চিত্রকল্পের সুমিত ব্যবহারে সম্পূর্ণ শিল্পসম্মত ও রসোত্তীর্ণ।

আবদুল কাদিরের জীবন ও কর্মযোগ বিচারে আমরা যদি কেবল নজরুলচর্চায় তাঁকে সীমাবদ্ধ করি, তবে তা কোনোভাবেই হবে না সমীচীন। কারণ নজরুলচর্চা, নজরুল রচনাবলি সম্পাদনা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও একমাত্র নয়। তিনি নানামুখী সৃজন ও মননধর্মী কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে সর্বদা রেখেছিলেন দীপ্যমান। সৃজনধর্মী লেখালেখির বাইরে নজরুলচর্চায় তিনি যেমন গভীরভাবে নিমগ্ন ছিলেন, তেমনি পত্র-পত্রিকা সম্পাদনায় ছিলেন তরুণ বয়স থেকেই উৎসাহী, উদ্যমী ও নিবেদিত প্রাণ। সম্পাদক কাদিরকে আমরা যে পাই নানাভাবে, পত্র-পত্রিকা থেকে খ্যাতিমান লেখক-কবি-সাহিত্যিকের রচনাবলির সম্পাদকরূপে, একজীবনের নানা বাঁকে বাঁকে, তাতে উন্মোচিত যে, তাঁর ভেতরে সব সময়ে প্রবলভাবে বিরাজমান ছিল তার সম্পাদকীয় সত্তা। সম্পাদক হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়েই রেখেছেন তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও সম্পাদকীয়তার ঐশ্বর্যমণ্ডিত গুণাবলির পরশ।

আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘জয়তী’ সম্পর্কে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘‘বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার মুখপত্র ‘কল্লোল’ বেরিয়েছিল ১৩৩০-এর বৈশাখে আর বেঁচে ছিল সাত বছর। ‘জয়তী’ বের হলো বৈশাখ ১৩৩৭ থেকে অর্থাৎ ‘কল্লোল’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। কাজেই ‘কল্লোল’-এর কিছুটা সুর ‘জয়তী’তেও প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। এমন কি কল্লোল গোষ্ঠীর কারো কারো যেমন অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রবোধ সান্ন্যাল প্রভৃতির লেখাও জয়তীতে স্থান পেতে লাগল। প্রবীণদের মধ্যে জয়তীতে লেখা দিয়েছেন প্রমথ চৌধুরী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায় প্রমুখ। আর ঢাকা [মুসলিম] সাহিত্য সমাজকে কেন্দ্র করে যাঁরা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন— যেমন, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আনওয়ারুল কাদীর প্রভৃতিও লিখতে লাগলেন ‘জয়তী’তে নিয়মিত। আর প্রতি সংখ্যায় নজরুল তো আছেনই।’’

মহৎ মনীষাচর্চায় ব্যাপৃত হওয়ার আগেই আমরা দেখি আবদুল কাদিরের সৃজনচর্চার উন্মেষ ঘটেছে। এবং শুধু উন্মেষ নয়, সেখানেও তিনি সমীহ ও স্বাতন্ত্রিকতার নজির রাখতে হয়েছেন সমর্থ।

আবদুল কাদিরের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিলরুবা’ প্রকাশিত হয় ১৩৪০ বঙ্গাব্দে। এ কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিমত হলো, ‘‘তোমার ‘দিলরুবা’ বইখানি পড়ে খুশী হলুম। ভাষা এবং ছন্দে তোমার প্রভাব অপ্রতিহত। তোমার বলিষ্ঠ লেখনীর গতিবেগ কোথাও ক্লান্ত হয় না। বাংলার কবি সভায় তোমার আসনের অধিকার অসংশয়িত। বিষয় অনুসারে যে কবিতায় তুমি মাঝে মাঝে আরবী পারসী শব্দ ব্যবহার করেছ আমার কানে তা অসঙ্গত বোধ হয় নি।’’

রবীন্দ্রনাথের সপ্রশংস মন্তব্য, সাধুবাদ ও অভিনন্দনবার্তার পাশাপাশি আবদুল কাদির পেয়েছেন মোহিতলাল মজুমদারের সূক্ষ সমালোচনা ও সতর্ক অভিনন্দন। আবদুল কাদিরের ‘দিলরুবা’ কাব্যগ্রন্থ ও চন্দ্রা কবিতাটি পাঠ করে মোহিতলাল মজুমদার এক চিঠিতে বলেন: তোমার [দিলরুবা] কাব্যখানিতে সুর এবং ভাষা দুইই আছে রূপরস বিহ্বলতা তোমার কবিতার একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। এই লক্ষণ তোমার অনেক কবিতাতেই আছে এবং এই রস বিহ্বলতার জন্য তোমার ভাষায় ও ছন্দধ্বনিতে একটি আবেগ মধুর আকুতি-রসাবেগের প্রলাপ-গুঞ্জন ভাসিয়া ওঠে। তোমার অন্যত্র প্রকাশিত ‘চন্দ্রা’ কবিতাটি এই জন্যই আমার খুব ভাল লাগিয়াছিল। তোমার কবিতায় যে লক্ষণগুলির কথা বলিয়াছি, তাহা সামান্য লক্ষণ নহে। উহা যদি রক্ষা করিতে ও নির্দোষ করিয়া তুলিতে পার, তবেই তোমার কাব্যসাধনা সার্থক হবে।

প্রথম কাব্যগ্রন্থেই আবদুল কাদির বিদ্বৎসমাজের প্রায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণে এবং ইতিবাচক অভিঘাতে সমর্থ হলেও তাঁর কাব্যপ্রতিভার হিরণ্ময় প্রকাশ থাকেনি অব্যাহত। ব্যক্তি পর্যায়েই হয়তো সীমিত হয়ে পড়ে তাঁর কবিতাচর্চা, যদিও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে মেলেনি গবেষণা, যুক্তিনিষ্ঠ কোনো কার্যকারণ কিংবা আমলে নেয়ার মতো কোনো মতামত। তিনি মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে নেন, এবং সেখানেও রাখেন অসামান্য প্রতিভার ঈর্ষণীয় স্বাক্ষর। মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো দীপ্তি ছড়িয়েও আবদুল কাদিরের কবিতার প্রিয়প্রাঙ্গণ থেকে তল্পিতল্পাসমেত সটকে বা ছিটকে পড়া, ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে মোটেই রহস্যময় ও অমীমাংসিত নয়। কারণ তিনি কবিতা থেকে ছুটি নিলেও লেখালেখির জগৎ থেকে নেননি নির্বাসন। কাদিরের কবি প্রতিভা সুপ্তভাবে হলেও সর্বদাই যে জাগরিত ছিল, তার সাক্ষ্যও অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হয়েছে তিন দশকের অধিক সময় পরে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্যগন্থে। ‘উত্তর বসন্ত’ নামের এ কাব্য প্রয়াস ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে লাভ করে সে সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সম্মাননা আদমজী পুরস্কার।

আবদুল কাদির ছাত্র হিসেবে ছিলেন ভীষণ মেধাবী। অথচ তাঁর পক্ষে বিএ পাস করা ‘সম্ভব হয়নি’। এখানে ‘সম্ভব হয়নি’ শব্দদ্বয়কে উদ্ধরণ চিহ্নে করা হয়েছে বন্দি। কারণ বিএ পাস করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, বাক্যটা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। যিনি এসএসসি পরীক্ষায় পাঁচটি বিষয়ে লেটারসহ উত্তীর্ণ হন, তার পক্ষে বিএ পাস করা কি অসম্ভব? ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে আইএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অংক, অর্থনীতি, ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে বিএ পড়তে থাকেন। কিন্তু বিএতে ভর্তি হয়ে কিছুদিন অধ্যয়নই করেন, পড়াশোনা নিয়মিত রাখা, সময় অনুযায়ী পরীক্ষা দেয়া তার পক্ষে হয়ে ওঠেনি আর সম্ভবপর। কারণ কাব্যচর্চা ও পত্র-পত্রিকা প্রকাশনায় তিনি সম্পূর্ণরূপে মনোযোগী হয়ে যান ছাত্রাবস্থাতেই। এ ব্যাপারটি একেবার সরলীকরণ না করে যদি দেখি একটু খতিয়ে, তাহলে কাদিরের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও গন্তব্যমুখ হবে ধোঁয়াশামুক্ত ও স্পষ্ট। লেখালেখির ভুবনই যে, তাঁর অভীষ্ট ক্ষেত্র সেটা তখন শুধু প্রকাশিত হয়নি, দৃঢ়ভাবেই আওয়াজ দিয়েছে আগমনবার্তার। কাদির ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রাবস্থাতেই যুক্ত হয়েছেন, মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে। এ গোষ্ঠীর সবচেয়ে অনুজ সদস্য হয়েও তিনি পালন করেছেন অগ্রজ সমতুল ভূমিকা। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র শিখার ছিলেন লেখক-প্রকাশক। শিখা গোষ্ঠীর সান্নিধ্যে এসেই তিনি নির্বাচন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তাঁর আগামীর গতায়াত। আড়াল বা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে শ্রেণীকক্ষের পাঠগ্রহণ ও প্রস্তুতি। কাদিরের লেখক সত্তা-সম্পাদকীয় স্বরূপ এবং সংগ্রাহকের শ্রম-কৌশল ও ধীশক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি তারুণ্যের প্রারম্ভেই স্থির করতে পেরেছিলেন আগামীর করণীয়। এ কারণে একাডেমিক পাঠকে তিনি একপ্রকার ছুটি দিয়ে উৎসর্গীকৃত হয়েছিলেন লেখালেখি ও সম্পাদকীয়তার যুদ্ধে।

আবদুল কাদির নানাভাবে স্বাক্ষর রেখেছেন বিরলপ্রজ কর্মযোগের। একটা বৃত্তে নয়, নানা বৃত্তে নিজেকে ধরেছেন মেলে এবং করেছেন প্রস্ফুটিত। শেষাবধি তিনি লেখালেখি করতে চেয়েছেন এবং তাতেই রেখেছেন অমেয় প্রত্যয় ও প্রতীতি। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করি, তার বহুধা বিভক্ত কাজের উত্কর্ষ।

কাদির বিএ ক্লাসে পাঠকালেই পল্লীগানের প্রতি আকৃষ্ট হন। রচনা করেন— ‘বাঙলার লোকসঙ্গীত’, (শিখা, চৈত্র ১৩৩৩), ‘বাঙলার পল্লী— সঙ্গীতে লীলা-বাদ’ (কল্লোল ফাল্গুন ১৩৩৫), ও বাঙলার পল্লীগানে বৌদ্ধসাধনা ও ইসলাম’ (বিচিত্রা, চৈত্র ১৩৩৫)। এ প্রবন্ধের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা আমাদের কাছে অনেক বেশি তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। যখন প্রতিভাত হয়, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন (১৯০৪-১৯৮৭)-এর হারামণির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে। তুলনামূলক এ পাঠ কাদিরের অনন্য উচ্চতাকে করে অধিকতর উচ্চকিত।

আবদুল কাদিরকে রক্ষণশীলতার তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার সূক্ষ প্রচেষ্টা নয় গরহাজির। অথচ তিনি কেমন ছিলেন, তা দিদারুল আলমকে লিখিত একপত্রে ধরা পড়েছে। তিনি লিখেছেন: ‘সওগাত’ ‘মোহাম্মদী’ কেউ আমাদের মতের পরিপোষক নয়। শিখা’র দল তাঁরা radical বটে কিন্তু তাঁদের অনেকেই আমাদের মত নিতে পারবেন না। আমি আংশিক আবদুল ওদুদের পন্থী। আবদুল ওদুদ সাহেব সম্বন্ধে বড় কথা এই যে তাঁর কোন Political মতামত নেই— সাহিত্য সমাজ সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। তারপর তাঁরা অতিমাত্রায় সমাজ হিতৈষী। তাঁরা যে Programme নিয়েছেন তা মেনে চলে গোটা সমাজকে তোলা যায় না।। একটা class মাত্র হবে। এতে প্রত্যেক মানুষের কল্যাণ কোথায়?

আবদুল কাদিরের একটি অসাধারণ কাজ হলো, জীবনীগ্রন্থ কাজী আবদুল ওদুদ। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘এক অসাধারণ লেখকের জীবন ও চিন্তার সঙ্গে এ যুগের পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার আদি ও প্রথম প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। আবদুল ওদুদের বিচিত্র সাহিত্যকর্মের দীর্ঘতর আলোচনা অন্যরা নিশ্চয়ই করবেন। কিন্তু আবদুল কাদিরের বইটি এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে পথিকৃতের মর্যাদা পাবে। আবদুল ওদুদের ছাত্র আর সহকর্মীদের মধ্যে যারা বেঁচে আছেন, তার মধ্যে আবদুল ওদুদ সম্পর্কে লেখার যোগ্যতম ব্যক্তি যে আবদুল কাদির, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

এ গন্থের বিশেষ দিক হলো, ওদুদ ও কাদির কোথায় কতখানি ফারাক আর সাদৃশ্যপূর্ণ তার স্বরূপ ও নিদর্শন পাওয়া যায়। কাদির লিখেছেন,

০১. তিনি [কাজী আবদুল ওদুদ] জনতার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন নি; কিন্তু জনতার সুখ-দুঃখ অভাব অভিযোগ আশা-আকাঙ্ক্ষা অন্তরের গভীরে অনুভব করবার তাগিদ কতখানি এবং সেই অনুভব তাঁর সাহিত্যে কাঙ্ক্ষিত সার্থক রূপ কতখানি লাভ করেছে, সে কথা নিজে কোথাও খুলে বলেননি। তাঁর প্রিয় আদর্শ হয়েছেন গ্যেটে— বিপ্লবের মত্ততায় ক্ষুব্ধ ও অভিজাততন্ত্রের মহিমায় মুগ্ধ গ্যেটে। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ-নীতিকে তিনি ‘খুব কাজের’ ভেবেছেন; কিন্তু সত্যার্থী ও সত্যাগ্রহী হওয়ার দুরূহ পথে চলতে গিয়ে স্বয়ং গান্ধীজী যেখানে বারবার দুর্বলতার শিকার হয়েছেন, সেখানে বুভুক্ষ, বিবস্ত্র অশিক্ষিত শোষিত সাধারণ মানুষের কাছে সেই দুঃসাধ্য সাধনার বাণী ‘সৌখিন ভাবুকতা’ ছাড়া আর কি হতে পারে? জনতার প্রাথমিক প্রয়োজন আহার বস্ত্র বাসস্থান ও শিক্ষার আলোক; তারপর আসবে তার জ্ঞানে ও মননে সমৃদ্ধ হওয়ার সমস্যা। এ-অবস্থায় আবদুল ওদুদ নির্দেশ করেছেন কোন প্রশস্ত পথ? [পৃ. ৪১-৪২]

০২. ১৮৩১ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর তারিখে রামমোহন ভারতের বিচার পদ্ধতি সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরে আদালতের সরকারী ভাষা ফারসীর পরিবর্তে ইংরেজী করার প্রস্তাব দেন। সেই মাসেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বোর্ড অব কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট তাঁকে ব্রিটিশ দরবারে নিয়ে যান এবং মহামান্য নৃপতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। রামমোহন ১৮ই এপ্রিল তারিখে লন্ডন গমনের পর থেকে যখন এরূপ নানাকাজে ব্যস্ত, সেসময় ভারতবর্ষে চলেছে বিষম আলোড়ন— সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী মে মাসে বালাকোর্টের যুদ্ধে এবং তিতুমীর ১৯শে নভেম্বর নারিকেলবাড়িয়ার যুদ্ধে নিহত হন। ভারতের হিন্দু-রাজনীতি ও মুসলিম-রাজনীতি তখন দুই সুস্পষ্ট স্বতন্ত্র ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে— এই দুই পরস্পরবিরোধী ধারার কোন প্রকার সঙ্গমসাধনের অভিপ্রায় বা চিন্তা রামমোহনের কোন কার্যে বা কল্পনায় রেখাপাতও করেনি। ফলে তাঁর প্রবর্তিত বাংলার জাগরণ প্রকৃতিগতভাবেই রয়ে গেল বর্ণহিন্দুর জাগরণ— তা এদেশের মুসলিম-মানসে কোন সাড়া জাগাবে দূরের কথা, নিম্নবর্গের অস্পৃশ্য হিন্দুদের চিত্তেও কোন প্রভাব বিস্তার করেনি। কিন্তু আশ্চর্য যে, আবদুল ওদুদের সদাজাগ্রত দৃষ্টিও এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির দিকে আকৃষ্ট হয় নি। [পৃ. ৫৬]

০৩. কিন্তু একালের বাংলার নব-জাগরণের দুই শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র সমাজের নিচের তলার গণ-মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের কথা কিছুমাত্র ভেবেছিলেন কি না, সেকথা আবদুল ওদুদের বক্তৃতায়ও নেই। তাতে মনে হয়, দেবেন্দ্রনাথের ‘আত্মপ্রত্যয়-সিদ্ধ জ্ঞানোজ্জ্বলিত বিশুদ্ধ হূদয়ের ভিত্তিভূমিতে’ ব্রহ্ম-সাধনা অথবা কেশবচন্দ্রের প্রগলভা ভক্তির বশে ‘সন্ন্যাস’ গ্রহণ তত্কালীন সুশিক্ষিত সঙ্গতিপন্ন ‘সুখী’ শ্রেণীর আধ্যাত্মিক ভাব-বিলাস ছাড়া আর কিছু বলে এদেশের শোষিত মেহনতী জনসাধারণ স্বভাবতই ভাবতে পারে নি। [পৃ. ৫৮]

আবদুল কাদিরকে যারা কোনো প্রকারের চাপানউতোর দিয়ে আড়াল বা খারিজ করে দিতে চান বা দিয়ে রেখেছেন, তাদের জন্য তার এ পত্রপাঠ জরুরি। দিদারুল আলমকে লেখা এক পত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ কেউ আমাদের মতের পরিপোষক নয়। ‘শিখা’র দল তাঁরা radical বটে কিন্তু তাঁদের অনেকেই আমাদের মত নিতে পারবেন না। আমি আংশিক আবদুল ওদুদের পন্থী। আবদুল ওদুদ সাহেব সম্বন্ধে সবচেয়ে বড় কথা এই যে তাঁর কোন political মতামত নেই ‘সাহিত্য-সমাজ’ সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। তারপর তাঁরা অতিমাত্রায় সমাজ হিতৈষী। তাঁরা যে সব programme নিয়েছেন তা মেনে চলে গোটা সমাজকে তোলা যায় না। একটা class মাত্র হবে। এতে প্রত্যেক মানুষের কল্যাণ কোথায়?”

আবদুল কাদির জীবনভর সাহিত্যসংলগ্ন থেকেছেন, প্রগতিপন্থার পথে থেকেছেন। তাঁর সম্পাদকীয় বোধ দেয় এ কথার নিঃশঙ্ক সাক্ষ্য। নজরুল, রোকেয়া, সিরাজীর স্বদেশে কাদিরকে বিস্মরণে রেখে তাঁদের স্বপ্ন-আদর্শ ও সৌন্দর্যচর্চা আদৌ সম্ভব কিনা এই প্রশ্নের সুরাহা জরুরি ও অবশ্যম্ভাবী।