বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড, ১৯৮৭) প্রকাশের পর গ্রন্থটির অধ্যায় বিন্যাস ও উপস্থাপনা সাহিত্য সমালোচক-গবেষক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া উৎপাদন করেছিল; বাংলা ভাষার পাশাপাশি সাহিত্যের ওপর মাত্র চারটি অধ্যায়, অন্যদিকে পাঁচটি অধ্যায় বাংলার ভূগোল, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, শিল্পকলা ও ধর্মজীবন-বিষয়ক। অধিকন্তু ষষ্ঠ অধ্যায়টির শিরোনাম ‘বাংলা ব্যতীত অপরাপর ভাষার সাহিত্যচর্চা’। সাহিত্যের পাটাতনে ‘বাংলানামা’ লেখার এ প্রচেষ্টা যেমন পেয়েছিল সাধুবাদ তেমনি পেয়েছিল নিন্দুকের তীক্ষ বাণ। ধান ভানতে শিবের গীত—এ ধরনের তুলনা করতেও অনেকে সংকোচ বোধ করেননি। বিষয়টি সম্পাদক প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের দৃষ্টি এড়ায়নি। গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডের (পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী কালপর্ব) ভূমিকাতে বিষয়টিকে পাঠক সমীপে তুলে ধরেন। প্রায় দুই দশক পর তিনি লিখেছিলেন:

...যেখানে লেখার কথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, সেখানে কেন বঙ্গদেশের ইতিহাস আর অপ্রয়োজনীয়—এবং অনধিকার—প্রয়াস? প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি, তবে হয়তো তা বোধগম্য হয়নি অথবা সমালোচকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমরা অনুভব করেছি যে সমসাময়িক দেশীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভবপর নয়।

শুধু সাফাই গাওয়া নয়, বরং উপর্যুক্ত ভাবনার যৌক্তিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে। দুটি ভাগে বিভক্ত ৬৪০ পৃষ্ঠায় উপস্থাপিত ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম ভাগের ছয়টি অধ্যায় দেশ, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম, শিল্পকলা, স্থাপত্য, সংগীত ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ সম্বন্ধীয়—উল্লেখ্য, পৃষ্ঠার গণনায় যা ৩০০।

ইউসুফ-জোলেখা কিংবা কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের আলোচনায় আমার এ দীর্ঘ ভণিতা পাঠককুলের বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে; কেউ কেউ ‘নাই কাজ তো খই ভাজ’ বলতে পারেন। কিন্তু সাহিত্যকে রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক আয়নাঘরে না দেখলে হতে পারে তা অন্ধের হাতি দেখার মতোই।

আমার মতো ইতিহাসের দুর্বল পাঠক যখন সাহিত্যের লেখক তখন মান্যবর আনিসুজ্জামানের উপর্যুক্ত ভাবনাকেই এ নিবন্ধের তাত্ত্বিক পরিসর ধরে ভাবা শ্রেয়। এখানে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা কাব্যের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরাই আমার মনজিলে মকসুদ।

বাংলা ভাষায় রচিত ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্যটি বাইবেলে বর্ণিত ‘প্যারবল’ (নৈতিক কাহিনী), আল কোরানের পয়গম্বর ইউসুফের জীবনের ট্র্যাজেডি, জুলেখার প্রণয় উপজীব্য করে রচিত। মহাকবি ফেরদৌসি কিংবা কবি মোল্লা আবদুর রহমান জামিও অনুরূপ কাব্যগ্রস্থ রচনা করেছিলেন। বাংলা ভাষায় সগীরের পদাংক অনুসরণ করেছিলেন আবদুল হাকিম ও শাহ গরীবুল্লাহ।

সমসাময়িক আরবি-ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাস গ্রন্থাদি কিংবা নিজের লেখাতেই কবি পরিচয়, রচনাকাল, পৃষ্ঠপোষক সুলতানের বিস্তারিত তথ্য না থাকায় কবির আত্মবৃত্তান্ত, সমকালীন কালক্রম নির্ধারণ প্রক্রিয়াটি নানা মুনির নানা মতে পরিপূর্ণ। কেবল রাজবন্দনার নিম্নোক্ত শ্লোকগুলোই গবেষকদের অন্ধের যষ্টি:

 

তিরতিএ পরনাম করোঁ রাজ্যক ঈশ্বর।
বাঘে ছাগে পানি খাএ নিভয় নিভর।।
রাজ রাজস্বর মৈদ্ধে ধার্মিক পণ্ডিত।
দেব অবতার নির্প জগত বিদিত।।
মহা নরপতি গ্যেছ পিরথিম্বীর সার।
ঠাই ঠাই ইচ্ছে রাজা আপনা বিজএ।
পুত্র সিস্য হন্তে তিঁহ মাগে পরাজয়এ।।
মহাজন বাক্য ইহ পূরণ করি আ।
লইলেন্ত রাজ্যপাট বংগাল গৌড়ি আ।।

 

এর পরের পঙিক্তমালায় পৃষ্ঠপোষক শাসকের বন্দনা উপস্থাপিত হয়েছে আষাঢ়ে বর্ষার ধারায়। শেষ চার লাইনে কবির আনুগত্যের সদয় স্বীকারোক্তি:

 

জাবত জীবন দেখিলুঁই কাম।

তান ভক্তি বিনা ধিক নাহি আর ধাম।।

মোহাম্মদ ছগীর তান আজ্ঞাক অধীন।

তাহন আছুক জস ভুবন এ তিন।।

 

উপর্যুক্ত ‘রাজবন্দনা’য় কবি সগীরের পৃষ্ঠপোষক শাসকের পরিচয় উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলা পুঁথিবিশারদ মুহম্মদ এনামুল হকের (যিনি ইউসুফ-জোলেখা কাব্যটির আদর্শ পাঠ প্রদান এবং গ্রন্থ হিসেবে টীকা-টিপ্পনীসহ প্রকাশ করেছেন) ভাষায়:

...কবি অতি চমত্কারভাবে...‘গ্যেছ’ বাদশাহের বন্দনা করিতেছেন, সেই বাদশাহ বাহুবলে পিতার কাছ হইতে বাংলা ও গৌড়ের সিংহাসন কাড়িয়া লইয়াছিলেন। কবি যেন বলিতে চাহিতেছেন, তাহার প্রশংসিত বাদশাহের কাছ হইতে বাদশাহের পিতা পরাজয় কামনা করিয়াছিলেন—পুত্রের হাতে পরাজিত হইয়া পিতা যেন গৌরব বোধ করিয়াছিলেন।

এনামুল হকের সিদ্ধান্ত হলো বাদশাহ ‘গ্যেছ’ এবং ইলিয়াস শাহি বংশের সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ (১৩৭৭-১৪১০) অভিন্ন ব্যক্তি। কেননা তিনি পিতা সিকান্দার শাহের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন, যার প্রমাণ মুদ্রা সাক্ষ্যেও পাওয়া যায়। মুদ্রাবিদ নলিনীকান্ত ভট্টশালীর কয়েন্স অ্যান্ড ক্রনোলজি অব দি আরলি ইনডিপেনডেন্ট সুলতানস অব বেঙ্গল (১৯২২) গ্রন্থটিতে উপস্থাপিত সিকান্দার শাহ এবং তদ্বীয় পুত্র গিয়াসুদ্দিনের একই মুদ্রা সময়ের প্রকাশ করে।

পিতার জীবদ্দশাতেই গিয়াসুদ্দিন সোনারগাঁও, ফতেহাবাদ, চাটগাঁও ও মুয়াজ্জামাবাদ টাঁকশাল থেকে মুদ্রা ইস্যু করেছিলেন। বহুভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উপসংহারও অনেকটাই এনামুল হকের অনুরণন। তবে তার সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলো কাব্যের বিষয়বস্তু, কাব্য প্রকাশের ভঙ্গি এবং ভাষারীতি। শহীদুল্লাহর মতে, কবির অস্তিত্ব এবং উপস্থাপিত ভাষা পঞ্চদশ শতাব্দীর আগের।

ইলিয়াস শাহি বংশের শাসক গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ ছাড়াও বাংলার ইতিহাসে একই নামে আরো তিনজন সুলতানের সন্ধান পাওয়া যায়:

১. গিয়াসুদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৫৫-৬০) ২. গিয়াসুদ্দিন জালাল শাহ (১৫৬০-৬৩) ৩. গিয়াসুদ্দিন (১৫৬৩-৬৪)। তারা সবাই সুর বংশীয় সুলতান এবং ষোড়শ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ঐতিহাসিক চরিত্র। উল্লেখ্য, সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের সাহিত্য অনুরাগ ও পৃষ্ঠপোষকতা ইতিহাসে সুবিদিত। মৈথিল কবি বিদ্যাপতিও গিয়াসুদ্দিনের প্রশংসা করে বলেছেন, “মহলম জুগপতি চিরে জিব জীবথু/ গ্যাসদীন সুরতান।” বাংলার সীমান্তবর্তী মিথিলা কিংবা ভারতীয় উপদ্বীপের সীমানা ছাড়িয়ে পারস্যের সাহিত্যজগতেও সুলতান গিয়াসুদ্দিনের সাহিত্য অনুরাগের খবরে পৌঁছেছিল। কবি হাফিজ লিখেছিলেন:

 

ভারতের তোতা হবে মিষ্ট মুখ সকল-ই

ফারসির মিছরী যবে বাঙ্গালায় চলিছে।

হে হাফিজ! গিয়াসুদ্দিন শাহের সভার বাসনা

ছেড়ো না, কাজ তোমারি কাঁদা-কাটায় চলিছে।

 

সাহিত্যের সূত্র ধরে ইতিহাসের চরিত্রের কাল-পাত্র অনুসন্ধানের পথ পরিত্যাগ করে কিছুটা বৃহৎ স্থানিক ও কালিক পরিসরে শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা কাব্যগ্রন্থকে বিবেচনা করা যেতে পারে। চতুর্দশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে সোনারগাঁয় ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লির তুঘলকি শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এটিকে সমগ্র বাংলা ভূখণ্ডে (সাতগাঁ, সোনারগাঁ ও লখনৌতি) একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সুলতানি শাসনের রূপ দেন। বাংলার ইতিহাসের সাধারণ পাঠক কিংবা বিজ্ঞ গবেষক ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ কালপর্বটিকে স্বাধীন সুলতানি আমলের দুই শতাব্দী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ সময় দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ এবং বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার প্রচেষ্টায় স্থানীয় রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে নানা বাঁকবদল দেখা যায়। মধ্য এশিয়া থেকে আসা তুর্কি সেনাপতি ও তাদের উত্তরসূরি ইলিয়াস শাহি, হোসেন শাহি সুলতানরা বুঝতে পেরেছিলেন যে স্থানীয় জনগণের সমর্থন ছাড়া দিল্লির আক্রমণ প্রতিহত করা অসম্ভব। প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর নানা স্তরে স্থানীয় বাংলাভাষীয় জনগোষ্ঠীর নিয়োগ, বাংলা ভাষায় রচিত নানাবিধ সাহিত্যকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা, শিল্প ও স্থাপত্যে স্থানীয় দেশজ উপাদান ও ভাবনার প্রতিফলন—শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা এবং উদারতার প্রমাণ। দিল্লি বাংলার ক্রমাগত লড়াইকে রাজনীতির খোলসে দুই রাজার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বলা যায়। কিন্তু পাশাপাশি বাংলার সুলতানদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মন জয়ের প্রচেষ্টাকেও বিবেচনায় রাখা দরকার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলার শাসক ও জনগণ এ দুই বর্গের মধ্যে দুটি পার্থক্য অত্যন্ত দৃশ্যমান—ভাষাগত ও ধর্মীয়। তুর্কি-মধ্য এশীয় অঞ্চল থেকে আসা সুলতানদের ধর্মের বচন আরবি এবং প্রশাসনিক ভাষা ফরাসি; ধর্ম পরিচয় হলো একত্ববাদী ইসলাম। অন্যদিকে জনগণের সিংহভাগ ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুসারী এবং ধর্মের বচন সংস্কৃত ভাষায়। ব্রাহ্মণ ছাড়া বাকিরা দৈনন্দিন জীবনে ভাব বিনিময় করে বাংলায়।

স্বাধীন সুলতানি আমলে রাজকার্যের বচন ছিল আরবি-ফার্সি। প্রাপ্ত মুদ্রা ও লেখমালা এ সিদ্ধান্তের সমর্থন করে। রাজা গণেশের পুত্র মহেন্দ্রদেব ও দনুজমর্দ্দনদেবের মুদ্রা ছাড়া এ সময়ে সকল মুদ্রায় ব্যবহার হয়েছে আরবি ভাষা। লেখমালায় আরবি ও ফারসি উভয় ভাষারই ব্যবহার লক্ষণীয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলায় আসা চৈনিক কূটনৈতিক দোভাষী মাহুয়ান সংকলিত বিবরণে উল্লেখ আছে: ‘সর্বজনীন ব্যবহূত ভাষা হচ্ছে পাং-কি-লী (বাংলা); তবে কেউ কেউ পা-এন-সি (ফারসি) ও বলে থাকে।’ এই মন্তব্য ইঙ্গিত করছে যে শাসকদের ভাষা রপ্ত করার প্রক্রিয়া স্থানীয় জনগণের মাঝে ক্রিয়াশীল ছিল। জনমানুষের ভাষা দরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় কাব্য সাহিত্যে রূপান্তর হচ্ছিল। ভাষার যোগাযোগকে ‘মিথস্ক্রিয়া’ বা ‘আদান-প্রদান’ যা-ই আখ্যা দেয়া হোক না কেন তা দুই গোষ্ঠীর নৈকট্য ও দূরত্ব লাঘবের প্রয়াসেরই ফসল। অভিবাসী, সৈনিক, সেনাপতি—আমির যারা ক্ষমতা কাঠামোর উপরিতলাভুক্ত—সবাই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। এদের পদাংক অনুসরণ করে বাংলায় অভিবাসন করেছেন সুফি, আলেম, মাশায়েখ যারা মূলত ধর্ম প্রচারক। আরবি কোরআন-সুন্নাহর ভাষা, অভিবাসীরা ফারসিতেও দক্ষ। ধর্ম প্রচার কিংবা জনসমর্থন আদায়ে—যে উদ্দেশ্যই হোক না কেন—সৃষ্টি হতে থাকল আরব-তুরান-ইরানে প্রচলিত নানাবিধ কাব্য কাহিনীর বাংলা ভাষায় রূপান্তর। কেবল অনুবাদ কাব্য নয়, কাহিনীতে সংযোজন, ভৌগোলিক কাঠামোর স্থানীয় চরিত্র স্ফুটন কিংবা স্থানীয় পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও রূপক ব্যবহার হতে লাগল। আরবের মরুভূমি, মরূদ্যান, খেজুর গাছ কিংবা তুর্কিস্তানের পাহাড়ি দৃশ্যপট পাল্টে হয়ে গেল বাংলার নদী, গ্রাম, বটবৃক্ষ কিংবা সুপারি-পানের উপমায়।

ইতিহাসবিদ অসীম রায় দি ইসলামিক সিনক্রিটিসটিক ট্র্যাডিশন ইন বেঙ্গল (১৯৮৩) গ্রন্থে এ রূপান্তর প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করলেন ‘গ্রেট ট্র্যাডিশন’ ও ‘লিটল ট্র্যাডিশন’-এর তাত্ত্বিক কাঠামোয়। কাব্যগ্রন্থের বিষয়বস্তু বৃহৎ সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু দেশজ সংস্কৃতির আলখেল্লায় উপস্থাপিত, যেখানে ইসলাম ধর্মের নানা চরিত্রের রূপক তুলনা স্থানীয় পৌরাণিক চরিত্রের সঙ্গে। ইউসুফ-জোলেখা কাব্যগ্রন্থটি এ প্রক্রিয়ার প্রথম দৃষ্টান্ত; যার অনুগামী হয়েছে রসূল বিজয়, সায়াত্নামা, গুলে বকাওলী, সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামান, লাইলী-মজনু ইত্যাদি। তালিকাটি দীর্ঘ না করে তত্ত্বের কাঠামো ও গভীর বেড়াজাল এরিয়ে লেখাটির যবনিকা টানতে চাই কবি ভণিতার ছয় লাইন উদ্ধৃত করে:

কিতাব কোরান মাঝে দেখিলুঁ বিশেষ।

ইছুফ জলিখা কথা অমিয় অশেষ।।

কহিব কিতাব চাহি সুধারস পুরি।

শুনহ ভকত জন শ্রুতিঘট ভরি।।

দোষ খেম, গুণ ধর রসিক সুজন।

মোহাম্মদ ছগীর ভনে প্রেমক বচন।।

 

কবির আবেগি স্বীকারোক্তি হলো ‘কিতাব কোরান’ থেকেই তিনি এই কাব্যের মূল কাহিনী নিয়েছেন। কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে যে কবি সেখানে সংযোজন করেছেন অনেক কিছু। জন্ম দিয়েছেন নতুন চরিত্র, তুলে এনেছেন স্থানীয় সংস্কৃতি, জল-জমিন কিংবা বাদ্যযন্ত্র, নৃত্য; যার দৃষ্টান্ত দেখা যায় ইউসুফের ভাই ইবন আমিনের সঙ্গে বিধু প্রভার বিয়ে অংশে। যেখানে বিধু প্রভা ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ ‘স্বয়ম্বর’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত। আজিজ মিসির ও জোলেখার বিয়ের দৃশ্যায়নে ব্যবহূত পোশাক ও অলংকারের কাব্যিক উপস্থাপনায় পাওয়া যায় স্থানীয় লোকজ উপাদানের আলামত। আরবি-ফারসিভাষী মধ্য এশিয়া কিংবা আরবের সমাজ ও মনোজগতে যেগুলোর অনেক কিছুই দেখা যায় না। এ যেন সাহিত্যের খোলসে রাজ-রাজড়ার ইতিহাস, ক্ষমতার লড়াই, রাজকর্মের কৌশলের চালচ্চিত্র, ধর্ম সংস্কৃতির পরিবর্তন ইত্যাদি নানা মোচড়। তাই গল্পের ইতি টানতে চাই কবি সগীরের শব্দগুচ্ছ দিয়ে “দোষ খেম, গুণ ধর রসিক সুজন”। অনাহূত ভাবনা ও বিভিন্ন সুতার বুননের জন্য পাঠকের দরবারে এই মিনতি আমারও।

 

সহায়ক গ্রন্থতালিকা

১.   আনিসুজ্জামান (সম্পাদিত), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৮ (প্রথম প্রকাশ ১৯৮৭)।

২.   আনিসুজ্জামান (সম্পাদিত), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৮।

৩. আবদুল মমিন চৌধুরী (সম্পাদিত), বাংলাদেশের ইতিহাস সুলতানি ও মোগল আমল (আনু. ১২০০-১৮০০ সা. অব্দ)। প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০২০।

৪.   আবদুল করিম, বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাস (মোকাদ্দেসুর রহমান অনূদিত), ঢাকা: বাংলা একাডেমি ১৯৯০।

৫. মুহম্মদ এনামুল হক (সম্পাদিত), ইউসুফ-জোলেখা, ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২।

৬. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (সম্পাদিত), মুহম্মদ এনামুল হক স্মারকগ্রন্থ, ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৮৫।

৭.   মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা-সাহিত্য, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৮)।

৮. আজহার ইসলাম, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মুসলিম কবি, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯২।

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: sahidul.hasan@du.ac.bd