কম্বোডিয়ার সঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমসের সাবেক প্রতিবেদক সিডনি শনবার্গের নাম চিরদিন জাড়িয়ে থাকবে এবং সেটার উপযুক্ত কারণও আছে। ১৯৭৫ সালে তিনি খেমাররুজ কর্তৃক নমপেন দখলের বিবরণী দিয়েছিলেন। সে সময় সেখানে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল ডিথ প্রানের সঙ্গে, দুজনের মধ্যে দারুণ এক পেশাদার এবং ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়। ডিথ প্রানকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে অস্কারজয়ী সিনেমা ‘দ্য কিলিং ফিল্ডস’ নির্মিত হয়েছিল।
খেমাররুজের নিষ্ঠুর শাসন থেকে ডিথ প্রান বেঁচে যাওয়ার পর আবার একসময় তার দেখা হয় শনবার্গের সঙ্গে। শনবার্গ তাকে নিউইয়র্ক টাইমসে আলোকচিত্রীর কাজ পেতে সহায়তা করেন। ২০১৩ সালে শনবার্গ নমপেনে গিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে খেমাররুজের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। গত
শনিবার (৯ জুলাই, ২০১৬) ৮২ বছর বয়সে যখন এ বিখ্যাত প্রতিবেদক মারা গেলেন, তখন তার স্মরণে টাইমসের শিরোনাম ছিল : ‘১৯৭০-এর দশকে কম্বোডিয়ায় সন্ত্রাসের বিবরণ প্রকাশ করা টাইমসের সাবেক প্রতিবেদক।’
তবে এই অবিচুয়ারিতে শনবার্গের আরেক প্রিয় দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি: সে দেশটির নাম বাংলাদেশ। নমপেনে তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়া অভিজ্ঞতা-ডিথ প্রানের সঙ্গে পুলিত্জার জেতা-সিনেমা থেকে বিখ্যাত হওয়ার আগে, শনবার্গ দিল্লিতে নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সাল থেকে তরুণ রিপোর্টার হিসেবে শনবার্গ এ পত্রিকায় সার্বক্ষণিক কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে যোগ দেন বিদেশ বিভাগে। তখন তার বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই। ঠিক হলো যে, তিনি পোলান্ডে গিয়ে কাজ শুরু করবেন, কিন্তু তার পর শেষমেশ তার গন্তব্য হলো ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় তার কাজ নিয়ে টাইমস কেবল একটি বাক্য খরচ করেছে: ‘তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ১৩ দিনের যুদ্ধ কাভার করেছেন।’
যুদ্ধটা ছিল, অতি অবশ্যই বাংলাদেশকে নিয়ে, দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশ, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরিপ্রেক্ষিতে নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’, বিপুল সহিংসতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন শুরু হয়েছিল। এ হত্যালীলার ব্যক্তিগত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ছিল শনবার্গের, তার পত্রিকায় এ বিষয়ে একের পর এক প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন তিনি। এতে তখন পাকিস্তানি ও ভারতীয়— উভয় কর্তৃপক্ষই ক্ষুব্ধ হয়। পাকিস্তান তাদের সহিংস দমন আড়াল করতে চাইছিল আর ভারতীয়রা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের সমর্থন পুরো বিশ্বকে জানাতে চাইছিল না। শনবার্গ কাউকেই ছাড়ছিলেন না। গ্যারি ব্যাস তার দুর্দান্ত বই ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ একজন ভারতীয় কর্মকর্তার কথা লিখেছেন, যিনি শনবার্গের মতো ‘সত্-অভিপ্রায়’ বিশিষ্ট সংবাদকর্মীকে কীভাবে ‘মোকাবেলা’ করা যায়, তা নিয়ে বিস্মিত ছিলেন।
পাকিস্তান সে রকম কূটনীতি প্রদর্শন করতে পারেনি। শনবার্গকে দুবার বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয়া হয়, প্রথমবার ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ নাগাদ। তখনো ঢাকায় পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হয়নি। এর কয়েক মাস পর আবার তিনি বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, ফলে ধর্ম দাঁড়িয়ে যায় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভারতের ঘনিষ্ঠ অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু হিন্দুরা তীব্র আক্রমণের নিশানায় পরিণত হন। ব্যাসকে শনবার্গ বলেন, ‘এটা ছিল একটা গণহত্যা’, স্মৃতিচারণ করে শনবার্গ বলছিলেন কীভাবে পাকিস্তানিরা হিন্দুদের ঘর আলাদা করেছিল। শনবার্গ তার প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন হলোকাস্টের মতো পাকিস্তানি সেনারা শহরে হিন্দুদের দোকানের ওপর হলুদ রঙ দিয়ে ‘এইচ’ অক্ষরটি এঁকে দিয়েছিল। শনবার্গ অনেক মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। যারা বলছিলেন, পাকিস্তানি সেনারা এসে চিৎকার করে জানতে চাইত, ‘এখানে কোনো হিন্দু আছে?’ এবং হিন্দুদের পেলে সেনারা তাদের হত্যা করত। ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত সহিংসতা এখনো বাংলাদেশে মহামারীর মতো ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে এ মাসে ঢাকার একটি বেকারিতে আইএসআইএস-অনুপ্রাণিত হামলায় অমুসলিমদের মুসলমানদের থেকে পৃথক করা হয় হত্যা করার উদ্দেশ্যে।
শনবার্গ যখন ঢাকায় ছিলেন না, তখন তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের স্রোত কাভার করছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ হচ্ছে বাংলা ভাষা অধ্যুষিত অঞ্চল, যা দেশভাগের পর ভারতের অংশ হিসেবেই রয়ে যায়। ভারতীয়রা তাকে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ দেখার অনুমতি দিয়েছিল। মুক্তিবাহিনী ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বাহিনী। ব্যাসের বইয়ের সবচেয়ে মর্মভেদী অংশের একটি ছিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে একটি অভিযানে শনবার্গের সঙ্গী হওয়ার স্মৃতিচারণ। এই উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ছিলেন তরুণ এবং তাদের অনেকে খালি পায়েই লড়ছিলেন। যখন তারা কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাকে দেখতে পায়, তখন তারা তাদের ওপর গুলি চালানোর আগে শনবার্গকে নিচু হতে বলে। ‘আমার যতটুকু মনে আছে যে, তাদের গুলি একজনকে আঘাত করল। লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল। যখন কাউকে গুলি করবেন প্রথমে তার শরীরটা একটু উপরে উঠে যাবে এবং তার পর নেমে আসবে। এক্ষেত্রে তেমনটাই হয়েছিল’, শনবার্গ বলছিলেন ব্যাসকে। ‘আমি বুঝতে পারছিলাম তারা আমাকে ব্যাপারগুলো দেখাতে চেয়েছে... তারা যে তাদের যুদ্ধ চালাচ্ছে, এটাই তারা আমাকে দেখাতে চাইছিল।’ শনবার্গ শেষমেশ মুক্তিযোদ্ধাদের বললেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে।’ ১৯৭১ সালের শেষ দিকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধের কিছু দিন পরই শনবার্গ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাড়ি জমান। তখন ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছিল।
গত বছর রিপোর্টের কাজে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। সময়টা ছিল ইসলামিস্টদের হাতে বেকারির ঘটনার এলাকাতেই একজন ইতালীয় নাগরিক খুন হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে— সে সময় বিদেশীদের ওপর কয়েক দফা হামলা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপকের সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়েছিল, তিনি আমাকে মার্কিন সিনেটর টেড কেনেডির লাগানো একটি গাছ দেখালেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্য কেনেডির সমর্থন ২০০৯ সালে তার মৃত্যুর পর দুনিয়ায় তেমন আলোচনায় আসেনি। গাছটা আজ বিরাট আকৃতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ম্যাসাকারের একটি স্থান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেদিন যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, তখন সেটা ছিল একেবারে নীরব ও শন্তিপূর্ণ। গাছটি সংগ্রামের একটি শাণিত স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে এবং মৃতদের উদ্দেশে অল্প কয়েকটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভের একটি।
বাংলাদেশের জন্য শনবার্গের অবদান চোখে দেখা কঠিন, কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার প্রতিবেদনগুলো, সেকালের অন্য সাহসী সাংবাদিকদের কাজের মতো, নিপীড়িত বাংলাদেশীদের কণ্ঠকে বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশীরা তাকে ভোলেনি। দেশটির অন্যতম বৃহত্ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে— শনবার্গ ‘পাকিস্তানিদের নৃশংসতাকে বিশ্বের সামনে প্রথম প্রকাশ করেছেন।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টিদের একজন মফিদুল হক শনবার্গের ৩৬টি প্রতিবেদন বাংলায় অনুবাদ করে ১৯৯৫ সালে ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ: নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান’ শিরোনামে বই আকারে প্রকাশ করেন। শনবার্গ বইয়ের একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ তার ‘মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী বন্ধু’দের তালিকা তৈরি করে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এ কাজের জন্য তৈরি কমিটিতে মফিদুল হকও ছিলেন। হক জানান, সম্মাননা গ্রহণের জন্য শনবার্গকেও ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল; কিন্তু হার্টের অস্ত্রোপচারের কারণে তিনি আসতে পারেননি। পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তাকারী বাংলাদেশীদের বিচারকাজেও শনবার্গের প্রতিবেদনগুলো ব্যবহূত হয়েছে। মফিদুল হকের কথায়, কম্বোডিয়ার কাজের জন্য শনবার্গ যে প্রশংসা পেয়েছেন, সিনেমা হয়েছে— তাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতা নিয়ে তিনি যে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন সেটা আড়াল হয়ে গেছে।
এক ই-মেইলে মফিদুল হক লিখেছেন, ‘কম্বোডিয়ায় শনবার্গের কাজ খুব আলোচিত হয়েছে সিনেমাটার (দ্য কিলিং ফিল্ডস) জন্য। কম্বোডিয়ার কাজের জন্য তিনি পুলিত্জার পুরস্কারও পেয়েছেন। অন্যদিকে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে এক বিস্মৃত অধ্যায় হয়ে গেছে। এখানে কোনো পুলিত্জার নেই কিংবা বৈশ্বিক দর্শকদের জন্য কোনো সিনেমাও হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ কখনো সিডনি শনবার্গকে ভুলতে পারে না। তিনি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের অংশ এবং যত দিন ইতিহাস থাকবে, তত দিন তিনি জীবিত থাকবেন।
জো ফ্রিম্যান : মিয়ানমারভিত্তিক সাংবাদিক। কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নমপেন পোস্ট, ফরেন পলিসি এবং দ্য নিক্কেই রিভিউতে নিয়মিত তার লেখা প্রকাশিত হয়।






