জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
দ্বিতীয় অধ্যায়
অনুবাদকরা ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ
(দ্বিতীয়াংশ)
এক প্রজন্ম পরে শ্রদ্ধেয় বিডি (আনুমানিক ৬৭৩-৭৩৫ খৃ.) লাতিন ভাষায় Historia ecclesiastica gentis Anglorum (ইংরেজ জাতির যাজকীয় ইতিহাস) এবং আরো কিছু পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা লিখলেন। অনুবাদক হিসেবেও তিনি স্মরণীয়, আর সেই খবর আমরা জানতে পারি তাঁর এক শিষ্যের একটি রচনার মাধ্যমে, যার শিরোনাম— “বিডি’র মৃত্যু সম্পর্কে কাথবার্ট-এর চিঠি” (Epistola de obitu Bedae)। সেখানে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে উইলবার্ট নামের তরুণ একজন লিপিকরের কাছে বিডি একটি অনুবাদ মুখে মুখে বলে গেছেন— এমন বিবরণ আছে:
“সে সময়ে উল্লেখযোগ্য দুটো কাজ ছিল, যা তিনি শেষ করে যেতে চাইছিলেন: ১. সন্ত জনের সুসমাচার— যেটা তিনি চার্চের বিশেষ সুবিধার্থে আমাদের মাতৃভাষায় রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন একেবারে শুরু থেকে, ‘কিন্তু এত লোকের মধ্যে তাহাতে কী হইবে?’ পর্যন্ত (যোহন ১:১ থেকে ৬:৯)— এবং ২. বিশ্বের বিস্ময়গুলো নিয়ে বিশপ ইসিডোরের বই (Liber Rotarum বা De natura rerum)।”
মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বিডির এই ডিক্টেশন দেয়ার ঘটনাটির একটি চিত্র আঁকেন একজন এবং ১৯০২ সালে জেমস ডয়েল পেনরোয় সেটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। বিডি ইংরেজিতে যা কিছু লিখে থাকতে পারতেন বলে দাবি করা হয়, তার কিছুই আমাদের কাছে এসে না পৌঁছলেও তাঁকে একজন বড় মাপের এবং ‘সন্দেহাতীতভাবে ইংরেজ’ লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় টেক্সটগুলো অনুবাদে ইংরেজি ব্যবহার করার জোরালো আবেদন জানানোর মাধ্যমে তিনি ‘স্বদেশী ভাষার প্রবক্তা’ হিসেবে অবদান রেখে গেছেন। পরবর্তীকালে ললার্ডরাও—যাঁরা বিশ্বাস করতেন বিডি স্বদেশী ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেছিলেন—তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ওয়াইক্লিফের বাইবেলের সাধারণ মুখবন্ধে সেই অনুবাদ সম্পর্কে তাঁরা উল্লেখ করে গেছেন।
লুটতরাজমূলক হামলা হিসেবেই মূলত ভাইকিং আগ্রাসনগুলো শুরু হয়েছিল এবং তা প্রায় ৩০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ইংল্যান্ডে নর্সমেন বা উত্তরের মানুষদের বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেসব হামলার অবসান ঘটে। অ্যাংলো-স্যাক্সনরা যাদেরকে ‘ডেইন’ বলত, সেই উত্তরের মানুষগুলোর একটি সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল প্রাচীন ইংরেজি বিকাশের ওপর। যেসব স্থানের নাম ‘by’-দিয়ে শেষ হয় (যেমন Derby), ‘sky’, ‘skein’ ইত্যাদির মতো প্রায় ৯০০ শব্দ তারাই নিয়ে এসেছিল। তবে সেই উত্তুরে আগ্রাসনের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াটিও যে একই রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল, সেটাও স্বীকার করতে হবে।
একমাত্র যে ইংরেজ রাজা ‘মহান’ অভিধায় অভিহিত, সেই আলফ্রেড (৮৪৯-৯৯) রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষাপ্রেমী হিসেবে তাঁর গুণাবলি ও দক্ষতার জন্য একইভাবে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। যখন তিনি ৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ওয়েসেক্সের রাজা হন, তখন দেশের প্রায় অর্ধেক অংশ ডেইনদের দখলে। তাদের বিরুদ্ধে তিনি দু-দুটো রণাঙ্গনে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তার একটি রাজনৈতিক, আরেকটি সাংস্কৃতিক। সামরিক বিজয়ের ফলে দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং শত্রুপক্ষ দেশের উত্তরাঞ্চলে সরে যায়। পরে যা অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজ্য হিসেবে আবির্ভূত হবে— সেটি একতাবদ্ধ হয়।
আলফ্রেড এটি বুঝতে পারেন যে, ভাইকিংরা মঠগুলো ধ্বংস করে ফেলায় বিদ্যাচর্চার অবক্ষয় ঘটেছে। অন্যদিকে বিদ্যাচর্চার ভাষা হিসেবে লাতিনের প্রাধান্য ইংরেজির একটি প্রমিত রূপের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করেছে। ইংরেজিকে বিদ্যাচর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানোর একটি বাহন হিসেবেই গ্রহণ করা শুধু নয়, ভাষাটির বিকাশ সাধনের একটি সুযোগ হিসেবেও আলফ্রেড এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগালেন এবং সেটাকে তাঁর খুব বড় একটি কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর সামরিক অভিযানগুলো যেমন ইংরেজ জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, ঠিক তেমনি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডও ইংরেজি ভাষাটিকে বাঁচাল এবং তাঁর প্রজাদের সাক্ষরতা বৃদ্ধি করল। জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিণত হওয়া প্রথম রাজন্য আলফ্রেড, ‘(ইংরেজি) ভাষার মাধ্যমে সঞ্চারিত ইংরেজত্বের একটি অংশভাগী বোধ’ সৃষ্টি করার মাধ্যমে দক্ষিণের ইংরেজিভাষী জাতিগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হলেন।
এক হিসাবে একটু বেশি বয়েসেই রাজা আলফ্রেড লাতিন শিখলেন, যাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো অনুুবাদ করতে অথবা করাতে পারেন। তাঁর বয়স তখন ৪০ বছর। তাঁর যাত্রারম্ভ হলো Cura Pastoralis বা Regula Pastoralis (Pastoral Care) দিয়ে। অগাস্টাসের মিশনের সূত্রপাতকারী হিসেবে গ্রেগরি বিশেষ আগ্রহের পাত্র ছিলেন। তাঁর Pastoral Care—আলফ্রেড যেটাকে ‘Shephard’s Book’ বলতেন—যাজকদের জন্য একটি মানসম্পন্ন ম্যানুয়াল হিসেবে বিবেচিত হতো। এ কাজটির ভূমিকাতেই আলফ্রেড বর্ণনা করেছেন কেন তিনি এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন:
‘তখন আমার মনে পড়ে গেল কীভাবে হিব্রু ভাষায় প্রথম আইন পাওয়া গিয়েছিল এবং তারপর গ্রিসের লোকজন তা শেখার পর কীভবে পুরোটাই এবং অন্যান্য গ্রন্থও তাদের ভাষায় অনুবাদ করে ফেলল। আর ঠিক একইভাবে রোমকরাও সেসব শিখে নিয়ে কীভাবে বিদ্বান ব্যাখ্যাতা বা দোভাষীদের মাধ্যমে সেগুলো সব অনুবাদ করে ফেলল। [...] আমাদেরও উচিত, যে ভাষা আমরা সবাই বুঝতে পারি, সে ভাষায় বিশেষ কিছু বই অনুবাদ করা, যেগুলো সব মানুষের জানা দরকার; আমাদের উচিত ভাষাটিকে বিন্যস্ত করা [...] যাতে ইংরেজদের স্বাধীন মানুষগুলোর মধ্যে যারা তরুণ [...] তারা ইংরেজি লেখা ভালো করে পড়তে পারে।’
রাজা আলফ্রেড, অন্যান্য গ্রন্থের সঙ্গে বিডির Historia ecclesiastica ও বেয়েয়ািসের De consolatione Philosophae (The Consolation of Philosophy) অনুবাদ করালেন এবং তাঁর অনুবাদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত একটি ‘আইন গ্রন্থ’ বা Dooms ও Anglo-Saxon Chronicle অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেন।
এভাবে আলফ্রেডের কল্যাণে রীতিসিদ্ধ হয়ে অনুবাদ ইংরেজির অবস্থান বা মর্যাদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করল এবং ভাষাটি লাতিনের—তখনো হীনতর কিন্তু তার পরও একটি লাগসই—বিকল্প হিসেবে পরিগণিত হলো। আর এটাই ‘ইংরেজির বিকাশে অনুবাদের নিরন্তর প্রভাবের প্রারম্ভ’ সূচিত করল। আলফ্রেড অনুবাদগুলোর কপি বিলি করার প্রথাও প্রবর্তন করলেন, আর তার মাধ্যমে তিনি সারা দেশে ইংরেজির একটি বিশেষ রূপ বা প্রকার ব্যবহারের পক্ষে তাঁর সমর্থন প্রকাশ করলেন, যা ছিল ভাষাটির একটি প্রমিত রূপের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক সমর্থন।
(ক্রমশ)






