আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদানকে যদি এককথায় মূল্যায়ন করতে হয়, তবে বলতে হবে, বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের শরিকানা প্রতিষ্ঠা এবং এ বিষয়ে তার মনে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার ক্ষেত্রে যে দুজন মানুষ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন, তিনি তাদের অন্যতম। অন্যজন, বলা বাহুল্য, কাজী নজরুল ইসলাম। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তার সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে এবং নজরুল তার সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে এ দায়িত্ব পালন করেন। সাহিত্যবিশারদের দিক থেকে এ ছিল এক সচেতন প্রয়াস, একাগ্র সাধনা।
সাহিত্যবিশারদের আগে যারা প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুথি সংগ্রহ এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন, তাদের সবাই ছিলেন হিন্দু, উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চডিগ্রিধারী, আর তারা কেবল হিন্দু কবিদের রচিত বাংলা ও সংস্কৃত পুথিই সংগ্রহ করতেন। বস্তুত মুসলমানদের সাহিত্য সাধনার কোনো খবরই তখন অবধি তাদের জানা ছিল না। অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলায় মুসলমান সমাজ, বিশেষ করে তার সচ্ছল ও শিক্ষিত অংশটিও তখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তার নিজের বলে ভাবতে পারছে না। হিন্দুদের রচিত বইপুস্তক ও তাদের সম্পাদিত পত্রপত্রিকায় মুসলমান সমাজ ও জীবনের অনুপস্থিতি, উপরন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তাতে মুসলমান বিদ্বেষ প্রচার কিংবা মুসলমান শাসনামলের ইতিহাস বা ঐতিহাসিক চরিত্রের বিকৃত অথবা অশ্রদ্ধেয় উপস্থাপন এ বিচ্ছিন্নতার বোধকে আরো বাড়িয়ে দেয়। নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শিকড় তারা এ সময় বাংলার মাটিতে না খুঁজে কয়েকশ বছর আগের আরব ও ইরানের ইতিহাস ও উপকথার মধ্যে সন্ধান করতে থাকে। তাদের গৌরব ও গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় খলিফা হারুনার রশিদের আমলের বাগদাদ কিংবা মুসলমান শাসিত স্পেনের হূত মর্যাদা। মোটকথা, দেশ ও কাল চেতনাহীন এক ধরনের অতীতচারিতাই তাদের মনমানসকে আবিষ্ট করে রাখে। মুসলমান সমাজের মধ্যে যারা অভিজাত, নেতৃস্থানীয়, বাস করেন কলকাতায়, তাদের বিবেচনায় বাংলা বড়জোর বাংলাদেশের চাষাভুষো শ্রেণীর ভাষা। এ ভাষায় লেখালেখি বা সাহিত্যচর্চা, বক্তৃতা, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেও তারা লজ্জা বোধ করেন। উত্তর ভারতের খানদানি মুসলমানের ভাষা উর্দু আর সে ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতিতেই তারা প্রাণের আরাম খুঁজে পান। আর তাকেই নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি বলে মনে করেন। বলতে গেলে গত শতকের প্রায় বিশের দশক অবধি বাংলার আধুনিক অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমানদের এক বড় অংশ তাদের আত্মপ্রকাশের ভাষা কী হবে, বাংলা না উর্দু, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি। এমনকি অত্যুক্তি হবে না যদি বলি, সেই মানসিক দোলাচলেরই প্রভাব পড়ে আরো তিন দশক পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে গণপরিষদে পূর্ব বাংলার মুসলমান সদস্যদের অবস্থান ও তাদের কারো কারো বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদান বিচারে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি তথা ইতিহাসের উপরিউক্ত পটভূমিটি আমাদের মনে রাখতে হবে।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জন্ম ১৮৬১ সালের ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের বর্তমান পটিয়া উপজেলাধীন সুচক্রদণ্ডী গ্রামে, এক মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারে। তাদের আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল না হলেও পরিবারে লেখাপড়ার চল ছিল। ছিল বই ও পুথিপত্রের সংগ্রহ। বাল্যে পুথির প্রতি সাহিত্যবিশারদের আগ্রহ জন্মে সে সূত্রেই। এমনকি ওই বয়সেই তিনি জটিল কলমি-পুথি পড়তে শিখে যান। মুসলমান পরিবারের সন্তান হিসেবে আরবি ও ফারসি ভাষার সঙ্গে তার কিছুটা পরিচয় তো ছিলই। তারপর খুব সম্ভব বিদ্যালয়ে মৌলবি শিক্ষক না থাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে তাকে আরবির পরিবর্তে সংস্কৃত পড়তে হয়। সেদিক থেকে ঘটনাটা হয়তো কাকতালীয়ই। তবে এভাবে সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে পরিচয় পরবর্তীকালে তার জন্য পুথি তথা মধ্যযুগের সাহিত্য সম্পর্কে গবেষণার ক্ষেত্রে যে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া অবশ্য আইএ (তখন যাকে এফএ বলা হতো) ক্লাসের বেশি এগোয়নি। এমনকি শারীরিক অসুস্থতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়ও তিনি অংশ নিতে পারেননি। তবে ওই কলেজের ছাত্রাবস্থায়ই নিজ বাড়িতে থাকা পুথিগুলোর ভিত্তিতে তিনি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে ফেলেন। প্রবন্ধটি তিনি পাঠিয়ে দেন অক্ষয়চন্দ্র সরকার (১৮৪৬-১৯১৭) সম্পাদিত মাসিক পূর্ণিমায়। ‘অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী’ শিরোনামে প্রবন্ধটি ১৩০২ বঙ্গাব্দের মাঘ থেকে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যা পর্যন্ত মোট ১৮ কিস্তিতে ধারাবাহিকভাবে ওই পত্রিকায় প্রকাশ হয়। প্রবন্ধটি এবং হয়তো কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত আরো দু-একটি প্রবন্ধ সে সময় কবি নবীনচন্দ্র সেনের (১৮৪৭-১৯০৯) দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নবীন সেন তখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কলকাতায় কর্মরত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান। আপন জন্মভূমির এক মুসলমান যুবকের এ প্রতিভা বা গুণপনা দেখে তিনি যুগপৎ বিস্মিত ও মুগ্ধ হন, যার উল্লেখ করে তিনি পরে তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “সে [আবদুল করিম— মোশহা] মুসলমান, অথচ সংস্কৃতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়াছে। বাঙ্গালা ভাষা জলের মত লিখিতে পারে। কলিকাতায় থাকিতে মাসিক পত্রিকায় তাঁহার প্রবন্ধাদি দেখিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম যে, চট্টগ্রামের মুসলমানের মধ্যে এরূপ লেখক আছে।” নবীন সেন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই আবদুল করিমকে এ ব্যাপারে উত্সাহ দেন।
শুধু উত্সাহ দিয়েই নবীনচন্দ্র সেন ক্ষান্ত হননি। চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিব হিসেবে বদলি হয়ে আসার (১৮৯৭) পর তিনি আবদুল করিমকে খুঁজে বের করেন। আবদুল করিম তখন চট্টগ্রাম সাব-জজ আদালত থেকে বদলি হয়ে পটিয়ার দ্বিতীয় মুন্সেফ আদালতে কাজ করছেন। তার পদের নাম শিক্ষানবিশ কেরানি। নবীনচন্দ্র সেখান থেকে তাকে একই পদে কমিশনার অফিসে বদলি করে আনেন। মুন্সি আবদুল করিমের প্রতি নবীনচন্দ্রের এ ‘কৃপাদৃষ্টি’ কমিশনার অফিসের কিছু লোককে তার প্রতি ঈর্ষান্বিত করে তোলে। ঈর্ষা থেকে প্রতিহিংসা। আর তা চরিতার্থ করার একটা সুযোগও তারা পেয়ে গেলেন। কমিশনার অফিসে কর্মরত থাকাকালেই আবদুল করিমের নামে স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা জ্যোতিতে একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। তাতে পাঠকদের প্রতি ‘প্রাচীন গীত, পুঁথি, বারমাস্যা প্রভৃতি’ সংগ্রহ করে দেয়ার আবেদন জানিয়ে বলা হয়, যারা তা সংগ্রহ করে দেবেন, তাদের এক বছর বিনামূল্যে পত্রিকা দেয়া হবে। এদিকে একই পত্রিকায় ওই সময় কমিশনার অফিসের একটি গোপন সংবাদ প্রকাশ হয়। ষড়যন্ত্রকারীরা এ থেকে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেললেন কিংবা সেভাবে তা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করলেন। কমিশনারকে তারা বোঝাতে সমর্থ হলেন, অফিসের খবর করিমের মাধ্যমেই পত্রিকায় গেছে, আর নবীনচন্দ্র সেন ও আবদুল করিম উভয়েরই পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের দায়ে আবদুল করিম বরখাস্ত হলেন আর নবীনচন্দ্র সেনকে ময়মনসিংহে বদলি করা হলো। নবীনচন্দ্র সেন এ সময় আবদুল করিমকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন) গিয়ে চাকরি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবদুল করিমের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাতে রেঙ্গুনে একটি চাকরি জোটানো তার পক্ষে মোটেও কঠিন ছিল না। চট্টগ্রামসহ বাংলা মুলুকের অনেকেই সে সময় বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) নানা ধরনের চাকরি বা ব্যবসা করত। কিন্তু আবদুল করিম চট্টগ্রাম ছাড়লেন না। কিংবা আহমদ শরীফ যেমনটি বলেছেন, পরিবারের সম্মতি না থাকায় তার রেঙ্গুন যাওয়া হয়নি। ভাগ্যিস তিনি সেদিন রেঙ্গুন যাননি। গেলে তাতে তার জীবিকা সংস্থানের একটা নিশ্চিত ব্যবস্থা হয়তো হতো। কিন্তু এতে তার পুথি সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ সাময়িকভাবে হলেও ব্যাহত হতো। আর আমরা বঞ্চিত হতাম তার সাধনার ফসল, অন্তত তার একাংশ থেকে। জ্যোতি পত্রিকায় পুরনো পুথির জন্য আবেদন জানিয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ এবং সে ‘অপরাধে’ চাকরি খোয়ানোকে যদি আমরা সাহিত্য সাধনার জন্য তার প্রথম ত্যাগ হিসেবে গণ্য করি, তবে এ রেঙ্গুন না যাওয়াকে সাহিত্যবিশারদের দ্বিতীয় আত্মত্যাগ বলা যায়।
কমিশনার অফিসের চাকরিটা চলে যাওয়ার পর আবদুল করিম আনোয়ারা স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। একটানা পাঁচ বছর তিনি এ স্কুলে ছিলেন। এ স্কুলে কর্মরত থাকাকালে একজন নিষ্ঠাবান, আদর্শবাদী ও ছাত্রবত্সল শিক্ষক হিসেবে তিনি এলাকায় বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেন। পুথি সংগ্রাহক হিসেবে তার একনিষ্ঠ সাধনা ও পরিচিতিরও সূত্রপাত এ আনোয়ারায় অবস্থানকাল থেকেই। এ পর্যায়েই সুরেশচন্দ্র সমাজপতি (১৮৭০-১৯২১) সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকার পৌষ ও মাঘ ১৩০৭ সংখ্যায় প্রকাশ হয় তার ‘রাধিকার মানভঙ্গ’ প্রবন্ধটি। সাড়ে ৩০০ বছরেরও বেশি আগে রচিত কাব্যটির যে হাতে লেখা পুঁথির ভিত্তিতে সাহিত্যবিশারদ তার প্রবন্ধটি লেখেন, তাও ছিল প্রায় শত বছরের পুরনো। প্রবন্ধটি লেখার পরের বছরই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর (১৮৫৩-১৯৩১) মুখবন্ধসহ কাব্যটি প্রকাশ করে। তাতে আবদুল করিমের সাহিত্যানুরাগ ও সম্পাদনা দক্ষতার প্রশংসা করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লেখেন: “শ্রীআবদুল করিম চট্টগ্রামে একটি বাংলা বিদ্যালয়ের পণ্ডিত। তাঁহার সাংসারিক অবস্থা ভালো নহে। তথাপি তিনি সাহিত্য সেবায় অকাতরে পরিশ্রম করিয়া থাকেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁহার প্রগাঢ় অনুরাগের প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারা যায় না।... তিনি এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদন-কার্যে যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহূদয়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাংলায় কেন, সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর মিলে না। এক-একবার মনে হয় যেন কোনো জর্মান এডিটর এই গ্রন্থ সম্পাদন করিয়াছেন। একখানি পুথি দেখিয়া কোনো গ্রন্থ ছাপানো বড়োই কঠিন। একখানি আদর্শ হইতে কোনো গ্রন্থ প্রচার করিতে গেলে ফটোগ্রাফই উত্তম। কিন্তু গরিব বাংলা স্কুলের পণ্ডিত ফটোগ্রাফের খরচ কোথায় পাইবে। তাই সে চক্ষু এবং অঙ্গুলি দ্বারা ফটোগ্রাফের কার্য করিয়াছে, যেখানে যেমন অক্ষর ছিল, ঠিক তেমনি তুলিয়াছে।”
মনে রাখতে হবে, কোনো রকম প্রশিক্ষণ বা পূর্বাভিজ্ঞতা ছাড়াই আবদুল করিম পুথি সম্পাদনায় এ দক্ষতার পরিচয় দেন। এমনকি এ কাজে তাকে পরামর্শ বা নির্দেশনা দেয়ারও কেউ ছিল না। তবে তার এ যোগ্যতা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো পণ্ডিতের প্রশংসা বা স্বীকৃতি অর্জন করলেও পুথি সংগ্রহের ব্যাপারে তাদের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়ে তিনি ব্যর্থ হন। কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি সে সময় পুথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছ থেকে একটা আর্থিক বরাদ্দ পেয়েছিল। আর সোসাইটির তরফে এ কাজের দায়িত্বে ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। মনে হয় আবদুল করিম সেটা জানতেন। তার সংগৃহীত রাধিকার মানভঙ্গ পুথিটি প্রকাশের জন্য ছাপাখানায় থাকা অবস্থায়ই তিনি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে পুথি সংগ্রহের কাজে অর্থ সাহায্য চেয়ে একটি চিঠি লেখেন। কিন্তু দূর মফস্বলবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে বা সনদের মানদণ্ডে স্বল্পশিক্ষিত একজন পুথি সংগ্রাহকের এ আবেদন সেদিন হয়তো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বা এশিয়াটিক সোসাইটির কাছে গুরুত্ব পায়নি।

আনোয়ারা স্কুলে শিক্ষকতাকালেই আবদুল করিমআনোয়ারা ও তার আশপাশ এলাকা থেকে বেশকিছু পুরনো ও দুর্লভ পুথি সংগ্রহ করে ফেলেন। আর সেসব পুথি নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধ কলকাতার বিভিন্ন সাময়িক পত্রে প্রকাশ হওয়ার ফলে তিনি বিদ্বত্সমাজের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এ সময় তার আবিষ্কৃত পুথিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আলাওলের (১৬০৭-৮০) পদ্মাবতী। পদ্মাবতীর মূল বা সবচেয়ে পুরনো এ পুথি আবিষ্কার তার উপলব্ধির ক্ষেত্রে নাড়া দেয়ার পাশাপাশি তার জীবনের জন্য ছিল যাকে বলে মোড় ফেরানো ঘটনা। এক চাষীর বাড়ি থেকে পাওয়া পুথিটি তার সামনে যে সত্যটি স্পষ্ট করে তোলে তা হলো, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদেরও একটা অবদান আছে, আর তা মোটেও অবহেলা বা খাটো করে দেখার মতো নয়।
আনোয়ারা স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি যে আবার চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন এবং সেখানকার বিভাগীয় স্কুল ইন্সপেক্টরের অফিসে কেরানি পদে যোগ দেন, তার পেছনে শহরবাসের ইচ্ছা নয়, মূলত জীবিকার নিশ্চয়তা ও অবসর জীবনের নিরাপত্তা ভাবনাই কাজ করেছিল বলে মনে হয়। তার সাধনাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ আর্থিক নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাটুকুর প্রয়োজন তিনি হয়তো বোধ করেছিলেন। ফলে তার গুণমুগ্ধ ও ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস গ্রন্থের লেখক আবদুল করিম (১৮৬৩-১৯৪৩), যিনি তখন চট্টগ্রামের বিভাগীয় ইন্সপেক্টর অব স্কুল পদে কর্মরত ছিলেন, তিনি যখন সাহিত্যবিশারদকে তার অফিসে একটা চাকরি দিতে চাইলেন, তিনি সেধে আসা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা উচিত মনে করেননি। তারপর একটানা ২৮ বছর ওই একই অফিসে একই পদে (দ্বিতীয় কেরানি) চাকরি করে ১৯৩৪ সালে তিনি অবসরে যান। তাকে দু-দুবার প্রধান করণিকের পদে প্রমোশন দিতে চাওয়া হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ তার মনে হয়েছিল, ওই পদের কর্মভার তার সাহিত্য সাধনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটাবে। হয়তো সেই একই রকম বিবেচনা থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে এর গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব পেয়েও তা গ্রহণ করেননি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও যে ১৯ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন, চট্টগ্রামেই বাস করেছেন। বিশেষ আমন্ত্রণক্রমে সভা-সম্মেলন বা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বারকয়েক কলকাতা, ঢাকা বা কুমিল্লায় যাতায়াত করা ছাড়া চট্টগ্রামের বাইরে তেমন পা রাখেননি। চট্টগ্রামেও তিনি শহরে নয়, বাস করতেন নিজ গ্রামে। চাকরিজীবনে দশটা-পাঁচটা অফিসের ফাইল ওয়ার্ক করে বাকি সময়ে তিনি গবেষণা, সম্পাদনা ও লেখালেখির কাজ করতেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের অবদান আবিষ্কার তার পুথি সংগ্রহ ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করলেও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কখনই এ ব্যাপারে হিন্দু-মুসলমান ভেদ-বিচার করেননি। তার পুথি সংগ্রহ ও পুথি পরিচিতি রচনার সূচনা হিন্দু রচিত পুথি দিয়ে। আর বাংলাদেশে তিনিই প্রথম, যিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব কবির রচিত পুথি সংগ্রহ, সম্পাদনা ও তার পরিচিতি রচনা করেছেন। বাংলা ভাষার মধ্যযুগের সব মুসলমান কবি এবং অনেক হিন্দু কবি আসলে সাহিত্যবিশারদেরই আবিষ্কার। প্রসঙ্গত, এখানে দু-একটি তথ্যের উল্লেখ প্রয়োজনীয় মনে করি। ১৮৯৪ সালে কলকাতায় সারস্বত সাধনার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ। প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারিত হয় বাংলা পুথি সংগ্রহ ও তার বিবরণী প্রকাশ। তার আগেই ১৮৯১ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে সংস্কৃত পুথি সংগ্রহের দায়িত্ব দিলে তিনি সংস্কৃতের পাশাপাশি বাংলা পুথি সংগ্রহেও উদ্যোগী হন। প্রায় একই সময়ে এ কাজে ব্রতী হন দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) ও নগেন্দ্রনাথ বসু (১৮৬৬-১৯৩৮)। দীনেশচন্দ্র তার বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের (১৯০১) ভূমিকায় জানিয়েছেন, তখন পর্যন্ত নগেন্দ্রনাথের সংগ্রহে প্রায় এক হাজার বাংলা পুথি ছিল। আর আনিসুজ্জামানের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলা পুথি সংগ্রহের ইতিহাসে নগেন্দ্রনাথের পরই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের স্থান। তবে সংখ্যার দিক থেকে সাহিত্যবিশারদের পুথির সংগ্রহ নগেন্দ্রনাথ বসুকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ৬০ বছরের একাগ্র সাধনা ও কঠিন পরিশ্রমে তিনি আড়াই হাজারেরও বেশি পুথি সংগ্রহ করেন। তার এ সংগ্রহ বা আবিষ্কারের ফলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নতুন করে লেখার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদান নিয়ে তারপর যত ইতিহাস বা আলোচনা গ্রন্থ রচিত ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সংগ্রহ বা আবিষ্কারই হলো তার ভিত্তি। সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যায় তার পুথির বিবরণ প্রকাশের পর ১৩২০ ও ১৩২১ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ দুই খণ্ডে ‘বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ নামে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। তাতে প্রায় ৬০০ পুথির বিবরণ সংকলিত হয়েছে (যার মধ্যে পাঁচ শতাধিক সাহিত্যবিশারদের নিজেরই সংগৃহীত)। পুথিগুলোর বিবরণ দিতে গিয়ে সাহিত্যবিশারদ যে দক্ষতা বা নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন— যেভাবে পুথির নাম, রচয়িতার নাম, অনুলেখকের নাম ও পরিচয়, আকার, পৃষ্ঠাসংখ্যা, ভণিতা, আরম্ভ ও শেষ (প্রাপ্ত অসম্পূর্ণ পুথির ক্ষেত্রে তা কোথায় কীভাবে খণ্ডিত), মোটকথা প্রাসঙ্গিক ও সম্ভব যাবতীয় তথ্য প্রদান করেছেন, তা দেখে সত্যি বিস্মিত হতে হয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তার লিখিত এ পুথির বিবরণ আজো অপরিহার্য আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেন থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের পরবর্তী সব ইতিহাসকারই তার এ বিবরণ ব্যবহার করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে যুগ্মভাবে লেখা ড. মুহম্মদ এনামুল হকের আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য (১৯৩৫) বইটিরও অনেক তথ্যের উত্স আসলে সাহিত্যবিশারদের সংগৃহীত পুথি। বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণের তৃতীয় একটি খণ্ডও সাহিত্যবিশারদ প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু তা প্রকাশের ব্যাপারে যোগাযোগ করেও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি সাড়া পাননি। সওগাত পত্রিকার পাঁচটি সংখ্যায় (আশ্বিন-চৈত্র ১৩২৬) মাত্র ৩৮ খানা পুথির বিবরণ প্রকাশের পর অজ্ঞাত কারণে তা আর ছাপা হয়নি।
যে সময়ে ও যে অবস্থার মধ্যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এ পুথি সংগ্রহের কাজটি করেছেন, তাতে কাজটা যে সহজসাধ্য ছিল না, সেটা আমরা নিশ্চয় অনুমান করতে পারি। কিন্তু সে যে তার জন্য কত বড় কঠিনের সাধনা ছিল, তা কল্পনা করাও আজ আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। তার জন্য সেদিনের সামাজিক বাস্তবতাটা আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। এ বিষয়ে ব্যোমকেশ মুস্তফীর (১৮৬৮-১৯১৬) দেয়া বিবরণটি আমরা এখানে উদ্ধৃত করতে পারি: “সর্বাপেক্ষা তাঁহাকে [আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ — মোশহা] যে উত্পীড়ন সহ্য করিতে হইয়াছে, তাহা যেমন অদ্ভুত, তেমনি বিস্ময়কর। তিনি মুসলমান, কোন হিন্দুর আঙ্গিনায় তাঁহার প্রবেশাধিকার নাই, কিন্তু হিন্দুর ঘরে পুথি আছে শুনিয়া তিনি ভিখারীর মত তাঁহার দ্বারে গিয়া পুথি দেখিতে চাহিয়াছেন। পুথি সরস্বতী পূজার দিন পূজিত হয়; অতএব মুসলমানকে ছুঁইতে দেওয়া হইবে না বলিয়া অনেকে তাঁহাকে দেখিতেও দেন নাই। অনেকে তাঁহার কাকুতি-মিনতিতে নরম হইয়া নিজে পুথি খুলিয়া পাতা উল্টাইয়া দেখাইয়াছেন, মুনশী সাহেব দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া হস্তস্পর্শ না করিয়া কেবল চোখে দেখিয়া নোট করিয়া সেই সকল পুথির বিবরণ লিখিয়া আনিয়াছেন।”
লেখকজীবনের প্রায় শুরু থেকেই সাহিত্যবিশারদের লেখা কলকাতার নামিদামি পত্রিকায় প্রকাশ হতে থাকে। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির পরিচয় ছিল সেকালে একজন কঠোরমনা সম্পাদক হিসেবে। তার সম্পাদিত পত্রিকা সাহিত্যের তিনি ছিলেন একজন নিয়মিত লেখক। ১৩০৭ থেকে ১৩২৬ বঙ্গাব্দের মধ্যে তার মোট ২৭টি প্রবন্ধ এ পত্রিকায় প্রকাশ হয়। এর মধ্যে কেবল ১৩১০ সালে এক বছরেই প্রকাশ হয় নয়টি প্রবন্ধ। বলা বাহুল্য, চট্টগ্রাম থেকে ডাকযোগে কলকাতায় সাহিত্যবিশারদ তার লেখা পাঠাতেন। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি তার প্রবন্ধের এতই অনুরাগী ছিলেন যে, কখনো লেখা পেতে দেরি হলে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন। জানা যায়, চিঠি লিখে এমনকি টেলিগ্রাম করেও তিনি তাকে লেখার জন্য তাগিদ দিতেন। কখনো কখনো একই মাসে ৮-১০টি পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে, বিভিন্ন সময়ে সব মিলিয়ে মোট ১১৪টি পত্রিকায় সাহিত্যবিশারদের লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ হয়। এর মধ্যে ৯৯টি পত্রিকার নামের একটি তালিকা দিয়েছেন আজহারউদ্দীন খান সাহিত্যবিশারদকে নিয়ে লেখা তার গ্রন্থ মাঘনিশীথের কোকিলে (১৯৮৬)। সাময়িকপত্রে প্রকাশিত সাহিত্যবিশারদের প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০০-এর বেশি বৈ কম হবে না। যদিও আহমদ শরীফ এমন ৪০৯টি ও আজহারউদ্দীন খান ৪৮৫টির মতো রচনার নাম দিতে পেরেছেন। তার অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। যেসব পত্রিকায় তার প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল, সেগুলোও এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে তার সংগৃহীত যে নয়টি পুথি প্রকাশ হয়েছিল, তার ব্যয়ভার বহন করেছিলেন মুর্শিদাবাদের লালগোলার বিদ্যোত্সাহী জমিদার ও সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়। আলাওলের পদ্মাবতীর পুথিটিরও অর্ধাংশ সম্পাদনার পর তিনি তা প্রকাশের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় আর্থিক আনুকূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সাহিত্য পরিষৎ তা প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে বিশ্বভারতীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি নিরাশ হন। দেশ বিভাগের পর সাহিত্যবিশারদ তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকেও পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের জন্য বছরের পর বছর নানা মহলে আবেদন-নিবেদন ও চেষ্টা-তদবির করে ব্যর্থ হন। জীবত্কালে তিনি তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ আবিষ্কারের মুদ্রিত রূপ দেখে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর ১৯৭৭ সালে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে, তাও পুথিটির প্রাপ্ত এক-তৃতীয়াংশ মাত্র প্রকাশ করা সম্ভব হয় (বাকি অংশ বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে জমা থাকা অবস্থায় চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে)। এর আগে ১৯২৪ সালে তার সম্পাদিত ভবানী দাসের ‘গোপীচন্দ্রের গান’ বা ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’ পুথিটি কলকাতা থেকে দীনেশচন্দ্র সেন ও অন্য দুজনের নামে প্রকাশ হয়েছিল। এসব নিয়ে সাহিত্যবিশারদের মনে গভীর বেদনা বা অভিমান ছিল। ছিল হতাশাও। হয়তো সেই হতাশা থেকেই পরবর্তী সময়ে তিনি পুথি সম্পাদনার ব্যাপারে তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পরিবর্তে এ সময় তিনি প্রবন্ধ রচনায়ই সবটা মনোনিবেশ করেন। এমনকি স্বহস্তে দৌলত কাজীর (আনু. ১৬০০-৩৮) সতীময়ন-লোরচন্দ্রানী ও দৌলতউজির বাহরাম খানের (১৬শ শতাব্দী) লায়লী-মজনুর প্রতিলিপি তৈরি করেও প্রকাশক পাবেন না ভেবে আর সম্পাদনার কাজে অগ্রসর হননি।
প্রাচীন পুথির প্রতি আকর্ষণের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়েও আগ্রহ বা নেশা সাহিত্যবিশারদের মধ্যে প্রায় গোড়া থেকেই দেখা যায়। তা হলো সাময়িকপত্র পাঠ ও সংগ্রহ। স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই সাপ্তাহিক ও মাসিক মিলিয়ে ১০টির মতো পত্রিকার গ্রাহক হয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে ইংরেজি পত্রিকাও ছিল। কর্মজীবনে প্রায় ৪০টি পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। লেখক হিসেবে এবং এমনিতেও তিনি অনেক পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যা পেতেন। এছাড়া আরো নানা উপায়ে তিনি পত্রিকা সংগ্রহ করতেন। তার আগ্রহের কথা জেনে গুণমুগ্ধ সম্পাদকদের কেউ কেউ তাদের অফিসে জমা বা সংগ্রহের পত্রিকাও তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সাময়িকপত্র পাঠ ও সংগ্রহের এ নেশা তার আজীবন বজায় ছিল। নিজের সম্পর্কে তিনি বলতেন ‘পত্রিকাকীট’। দেশ ও সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে তার জানাশোনার উত্স ছিল এসব পত্রিকা; তার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর যার নিশ্চিত প্রভাব পড়েছে। শৈশবে ও ছাত্রজীবনে যে পরিবেশে তিনি বাস করেছেন, তারপর চাকরিজীবনে এবং লেখক ও গবেষক হিসেবে যাদের সান্নিধ্য ও পৃষ্ঠপোষকতা তিনি লাভ করেছেন, তার মানস গঠনে সে পরিবেশ, সান্নিধ্য ও গুণগ্রাহিতাও কমবেশি ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হয়। বিভিন্ন সময়ে লেখা তার প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সভা-সম্মেলন-সংবর্ধনায় দেয়া লিখিত অভিভাষণ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের যে উদার, অসাম্প্রদায়িক, বিশ্লেষণী ও বাস্তববাদী মনোভঙ্গির পরিচয় দেয়, তার সমকালে তার তুল্য উদাহরণ বেশি পাওয়া যায় না। বলা বাহুল্য, যা একটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয় হতে পারে। আমি এখানে গবেষক বা সাহিত্য সাধক হিসেবে তার অবদানের আলোচনায়ই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছি।
সাহিত্যবিশারদ দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে আপন গ্রামের বাড়িতে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগ পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। রাজধানী কলকাতা বা ঢাকা থেকে বহুদূরে নিভৃত পল্লীর পর্ণকুটিরে কেরোসিন কুপির আলোয় বসে তিনি বছরের পর বছর একাকী যে সাধনা করে গেছেন, তার সঙ্গে তুলনায় আমাদের আজকের অনেক যূথবদ্ধ বা সংগঠিত আলোক-উত্সবকে নিতান্তই ম্লান ও নিষ্ফল বলে মনে হয় নাকি?
সহায়ক বই
আহমদ শরীফ, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (ঢাকা: ১৯৮২)
আবদুল করিম, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ: জীবন ও কর্ম (ঢাকা: ১৯৯৪)
আজহারউদ্দীন খান, মাঘনিশীথের কোকিল (কলকাতা: ১৯৮৬)
ভুঁইয়া ইকবাল (সম্পা.), নির্বাচিত রচনা: আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (ঢাকা : ১৯৯৪)
লেখক: মোরশেদ শফিউল হাসান
প্রাবন্ধিক ও গবেষক





