১
ছোট একটা শহর ক...। সেখানেই আমাদের ছাউনি পড়েছিল। সবাই জানেন সেনাবাহিনীর একজন অফিসারের জীবনযাত্রাটা কেমন। সকালে ড্রিল আর ঘোড়দৌড়ের ক্লাস, তারপর রেজিমেন্ট কমান্ডারের বাড়িতে নয়তো কোনো একটা ইহুদি সরাইখানায় ডিনারের ব্যবস্থা। সন্ধ্যায় মদ আর তাসের আড্ডা। ক... শহরে একটা বাড়িও ছিল না, যা আমাদের কাছে অবারিত দ্বার। বিয়ের যুগ্যি বয়স হয়েছে, এমন মেয়ে পাওয়া যেত না একটিও। তাই একেকবার একেকজনের কোয়ার্টারে গিয়ে আমরা জুটতাম। আর সেখানে পরস্পরের ইউনিফর্ম ছাড়া কিছুই আমরা দেখতাম না।
আমাদের দলের মধ্যে শুধু একজন ছিল, যে সেনাবাহিনীর লোক নয়। বয়স তার প্রায় ৩৫ বছর— আমরা তো তাকে প্রায় প্রৌঢ় বলেই ধরে নিয়েছিলাম। আমাদের তুলনায় ওর একটা মস্ত প্রাধান্য ছিল— অভিজ্ঞতা। তাছাড়া লোকটার স্বাভাবিক গোমড়া মুখ, বদমেজাজি স্বভাব আর কড়া কড়া কথাবার্তার একটা তীব্র প্রভাব আমাদের কাঁচা মনের ওপর বেশ ছাপ ফেলেছিল। কী একটা রহস্যে তার জীবন ঘিরে ছিল। দেখে মনে হতো, লোকটা বুঝি রুশি কিন্তু নামটা ছিল আবার বিদেশী। একসময় সে নাকি ঘোড়সওয়ার বাহিনীতে কাজ করত— ছিল ভালোই। তা সত্ত্বেও কেন যে সে ঘোড়সওয়ার বাহিনী থেকে ইস্তফা দিয়ে এই একটা হতচ্ছাড়া খুদে শহরে এসে ডেরা বাঁধল, কেউ জানত না। দিন কাটাত সে একই সঙ্গে কৃপণের মতো, আবার দিলদরিয়ারও মতো। ঘোরাঘুরি করার বেলায় যেত পায়ে হেঁটে, পোশাক বলতে ছিল একটা পুরনো কালো ফ্রক কোট, কিন্তু আমাদের রেজিমেন্টের সব অফিসারের জন্যই তার বাড়িতে আতিথ্য ছিল অবারিত। একথা অবশ্য ঠিক যে, ডিনারে পদ থাকত মাত্র দুটি কি তিনটি— আর তা রান্না করত এক সাবেক সেপাই। অথচ টেবিলে কিন্তু শ্যাম্পেনের স্রোত বইত অফুরন্ত। কি তার আয়, কি-বা তার সম্পত্তি— এসব কেউ জানত না, জিজ্ঞেস করতেও সাহস হতো না। লোকটার বই ছিল প্রচুর, তার বেশির ভাগই সাময়িক পাঠ্যপুস্তক আর উপন্যাস। চাইলেই সে তা পড়তে দিত এবং কখনো ফেরত চাইত না। নিজেও সে কখনো বই ধার নিলে তা আর মালিককে ফেরত দিতে যেত না। কাজের মধ্যে তার কাজ ছিল কেবল পিস্তল চালানো। ওর ঘরের দেয়ালগুলো সব ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল বুলেটের ফুটোয়, মনে হতো যেন একেকটি মৌচাক। দরিদ্র যে কুঁড়েতে তার ডেরা ছিল, সেখানে ধনসম্পদ বলতে ছিল শুধু একরাশ পিস্তল। লক্ষ্যভেদে হাত ছিল তার খুব উঁচু দরের। সে যদি বলত, এসো মাথার টুপির ওপর পিয়ার ফল রেখে দাঁড়াও, ফল তাক করে গুলি চালাব, তাহলে মাথা পেতে দিতে ভয় করবে— এমন একটা লোকও আমাদের রেজিমেন্টে পাওয়া যেত না। আমাদের আলাপ-আলোচনার মধ্যে প্রায়ই উঠত ডুয়াল লড়াইয়ের কথা। অথচ সিলভিও (লোকটাকে এ নামেই চালানো যাক) কখনো তাতে যোগ দেয়নি। যদি জিজ্ঞেস করা যেত সে ডুয়াল লড়েছে কিনা, তাহলে রূঢ়ভাবে একটা ‘হ্যাঁ’ বলা ছাড়া আর কোনো কথায় সে যেত না। বোঝা যেত এ রকম প্রশ্ন তার পছন্দসই নয়। আমরা ধরে নিয়েছিলাম হয়তো তার মারাত্মক নিশানার কবলে প্রাণ দিয়েছে এমন কারো স্মৃতি তার বিবেকে বিঁধে আছে। ঘুণাক্ষরেও আমরা ভাবতে পারিনি যে তার মধ্যে কোনো রকম ভীরুতা সম্ভব। কিছু লোক আছে, যাদের মুখ দেখেই বলা যায় তা অসম্ভব। কিন্তু পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যাতে আমরা সবাই ভারি অবাক হয়ে গেলাম।
সিলভিওর বাড়িতে একদিন আমরা জন ১০-১২ অফিসার ডিনারে বসেছি। মদ্যপানও করা গিয়েছিল ঠিক অন্যান্য দিনের মতোই, অর্থাৎ প্রচুর পরিমাণে। ডিনারের পর গৃহস্বামীকে অনুরোধ করলাম তাস বাঁটতে। সিলভিওকে অনেকক্ষণ ধরেও রাজি করানো গেল না— তাস সে খুব কমই খেলত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেদিন সে তাস আনতে বলল, টেবিলের ওপর গোটা পঞ্চাশেক ১০ রুবল ছড়িয়ে দিয়ে তাস বাঁটা শুরু করল। আমরাও তাকে ঘিরে বসলাম, শুরু হলো খেলা। খেলার সময় একেবারে চুপ করে থাকাই ছিল সিলভিওর ধাত— তর্কও করত না, সাফাইও গাইত না। তাস বাঁটতে যদি কোনো ভুল হতো তাহলে সিলভিও হয় তত্ক্ষণাৎ দান শোধ করে দিত নয়তো বকেয়া হিসাব টুকে রাখত। এসব ব্যাপার আমাদের সবারই জানা ছিল— সিলভিওর নিজস্ব নিয়মকানুন মেনে চলতে আমরা আপত্তি করতাম না। কিন্তু আমাদের মধ্যে সেদিন অন্য রেজিমেন্ট থেকে সদ্য বদলি এক অফিসার ছিল। খেলতে খেলতে লোকটা অন্যমনস্কভাবে বাজির পরিমাণ ১ পয়েন্ট বাড়িয়ে দিল। সিলভিও তার অভ্যাসমাফিক একটা চকখড়ি তুলে নিয়ে আঁকটা ঠিক করে নিল। অফিসারটি ভাবল বোধ হয় সিলভিওর ভুল হয়েছে, তাই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল। কিন্তু সিলভিও নীরবে খেলেই চলল। ধৈর্য হারিয়ে অফিসারটি বুরুশ দিয়ে স্কোরবোর্ড থেকে লেখাটা মুছে দিল। সিলভিও চক নিয়ে সংখ্যাটা আবার লিখে দিল নতুন করে। মদ, জুয়া আর সঙ্গীদের হাসির প্রভাবে অফিসারটি সহসা উত্তেজিত হয়ে ভাবল তাকে অপমান করা হয়েছে। টেবিল থেকে পিতলের একটি মোমদানি তুলে সে ছুড়ে মারল সিলভিওর দিকে। অল্পের জন্য সিলভিও এড়িয়ে গেল। কিন্তু আমাদের অস্বস্তির সীমা রইল না। ক্রোধে বিবর্ণ হয়ে সিলভিও উঠে দাঁড়াল। চোখ তার তখন জ্বলছে। বলল, ‘আপনার কপাল ভালো যে ঘটনাটা আর কোথাও না হয়ে আমার বাড়িতেই ঘটল। দয়া করে এবার পথ দেখুন।’
এর পরিণতি যে কোথায় গড়াবে, সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহমাত্র ছিল না, ধরে নিয়েছিলাম আমাদের নতুন সঙ্গীটির দফা শেষ। লোকটা যাওয়ার সময় বলে গেল, ব্যাংকার ভদ্রলোকটি যখনই বলবেন তখনই এ অপমানের জবাব দিতে সেও প্রস্তুত। খেলা আরো কিছুক্ষণ চলবে বটে কিন্তু আমরা টের পাচ্ছিলাম, গৃহস্বামী আর তাসে মন দিতে পারছে না। সুতরাং একে একে বিদায় নিয়ে আমরা যে যার কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিলাম। শিগগিরই যে ওকে খসতে হচ্ছে, তাই নিয়ে আলাপ চলল যেতে যেতে।
পরদিন ঘোড়দৌড়ের ক্লাসে আমরা বলাবলি করছি, বেচারা লেফটেন্যান্ট এখনো বেঁচে আছে কিনা। এমন সময় লেফটেন্যান্ট নিজেই এসে হাজির। সেই কথা ওকেও জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, সিলভিও এখনো তাকে কিছু জানায়নি। ব্যাপারটা আশ্চর্য লাগল। সিলভিওর বাড়িতে গিয়ে আমরা হানা দিলাম। দেখি ফটকের ওপর একটা টেক্কা বসিয়ে সে তাসটার ঠিক মধ্যিখানে গুলি করে চলেছে একটার পর একটা। আগের দিনের ঘটনার কথা মোটেই না তুলে সে ঠিক তার অভ্যাসমতোই আমাদের আমন্ত্রণ জানাল। এভাবেই তিনদিন কেটে গেল এবং লেফটেন্যান্ট বেঁচেই রইল। অবাক হয়ে আমরা বলাবলি করলাম, সিলভিও লড়তে চাইছে না, এ কি সম্ভব? কিন্তু সত্যিই সিলভিও লড়ল না। লেফটেন্যান্টের কাছ থেকে সামান্য একটু ক্ষমা প্রার্থনা আদায় করেই সে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিল।
জোয়ানদের কাছে এতে বোধ হয় সিলভিওর মর্যাদা অনেকটা খাটো হয়ে গিয়েছিল। সাহসের অভাব বস্তুটা তাদের কাছে ক্ষমার অযোগ্য এবং শ্রেষ্ঠ গুণ তাদের কাছে হলো নির্ভীকতা, হাজার পাপও তাতে ঢাকা পড়ে যাবে। ক্রমে অবশ্য লোকে ব্যাপারটা ভুলে যায় এবং সিলভিও তার আগের প্রতিষ্ঠা আবার ফিরে পায়।
শুধু আমি কখনো ওরকম করে ভাবতে পারি না। রোমান্টিক কল্পনার দিকে আমার স্বভাবতই একটা ঝোঁক আছে। লোকটার জীবন খানিকটা প্রহেলিকার মতো বলে এর আগে আমি ছিলাম তার সবচেয়ে বড় ভক্ত— ভেবে রেখেছিলাম লোকটা নিশ্চয়ই কোনো রহস্যময় কাহিনীর নায়ক। তার দিক থেকেও আমার জন্য একটা টান ছিল। অন্তত আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তার যা অভ্যাস, সে রকম ব্যঙ্গাত্মক ভাষা বিশেষ প্রয়োগ করত না, নানা বিষয়ে চমত্কার আলোচনা করত বেশ স্বচ্ছন্দে। কিন্তু সেদিনকার ওই দুর্ভাগ্য সন্ধ্যার কথা আমি কিছুতেই আর ভুলতে পারলাম না। লোকটা ইচ্ছে করেই তার মর্যাদা কলঙ্কমুক্ত করল না— একথা মনে থাকায় আমি তার কাছে আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারি না। তার চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা হতো। সিলভিও এটা নজর করেছিল এবং তার কারণও আন্দাজ করেছিল, কেননা বোকা সে নয়, অভিজ্ঞতাও কম নয় তার। বোধ হয় এতে ওর কষ্ট হতো। অন্তত একবার কি দুবার আমি বেশ টের পেয়েছিলাম, সে কথা বলার জন্য উশখুশ করছে। কিন্তু সে সুযোগ আমি তাকে দিইনি। আমার অনিচ্ছা দেখে সিলভিও তারপর আর কিছু বলেনি। এবং তার পর থেকে আমার সঙ্গীদের ছাড়া কখনো সিলভিওর সঙ্গে দেখা করিনি। আগে আমাদের দুজনের মধ্যে যে ধরনের অকপট আলাপ চলত, তা বন্ধ হয়ে যায়।
গ্রাম বা মফস্বল শহরের বাসিন্দাদের কাছে এমন কতগুলো উত্তেজনার খোরাক আছে, যা বড় বড় নগরের শহুরে দুলালদের পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব। যেমন ধরা যাক, চিঠি বিলির দিনটার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকা। মঙ্গলবার আর শুক্রবার— এ দুদিন রেজিমেন্টাল হেডকোয়ার্টার ভরে যেত অফিসারে— কারো টাকা আসবে, কারো চিঠি, কারো বা সংবাদপত্র। চিঠি আসামাত্র তত্ক্ষণাৎ তা ওখানেই খুলে পড়া হতো, খবরাখবর যা কিছু, সব তক্ষুনি পরস্পরকে জানিয়ে দেয়া হতো।
অফিস এলাকাটা ভরে উঠত বিপুল চঞ্চলতায়। সিলভিও এখানে প্রায়ই আসত, কারণ তার ডাকও বিলি হতো আমাদের রেজিমেন্ট মারফত। সেদিন একটা চিঠি পাওয়ামাত্র অধৈর্যের মতো সে তার সিলটা ছিঁড়ল। চিঠিটা পড়তে পড়তে চোখ দুটো তার জ্বলে উঠল। অফিসাররা নিজের নিজের চিঠিতে ডুবে ছিল— কিছুই লক্ষ করেনি। হঠাৎ শোনা গেল, সিলভিও চিত্কার করে বলছে, ‘অফিসার মশাইরা শুনুন, অবস্থাগতিকে অবিলম্বে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আজ রাত্রেই আমাকে যেতে হবে। তাই আজ শেষবারের মতো আমার ওখানে ডিনারে যেতে আপনারা যেন না করবেন না— এই অনুরোধ।’ আমার দিকে চেয়ে সে বলল, ‘তোমাকেও আসতেই হবে কিন্তু।’ এই বলে সে দ্রুত হেডকোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেল। আমরাও নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে যে যার পথ ধরলাম।
যথাসময়ে সিলভিওর বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, প্রায় গোটা রেজিমেন্টই এসে হাজির হয়েছে। তার জিনিসপত্র সব এরই মধ্যে বাঁধাছাঁদা সারা। নিঃসঙ্গ বুলেট-বিঁধা দেয়ালটা ছাড়া আর কিছুই পড়ে নেই। টেবিলে খেতে বসা গেল। গৃহস্বামীর মনে সেদিন ফুর্তি আর ধরছিল না। অতিথিদের মধ্যেও সে ফুর্তি সংক্রমিত হতে দেরি হলো না। সশব্দে বোতলের ছিপি খোলা হতে লাগল অনবরত, ফেনিয়ে উঠল মদ, হিসহিস শব্দ উঠতে থাকল গেলাসে গেলাসে, বিদায়ী বন্ধুটির জন্য চরম সৌভাগ্য আর শুভযাত্রার কামনা জ্ঞাপনে আমরা বিরাম মানছিলাম না। টেবিল ছেড়ে যখন ওঠা গেল, তখন বেশ রাত হয়েছে। যে যার টুপি নিয়ে বেরোনোর সময় সিলভিও একেক করে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদায় নিল। আমি চলে যাচ্ছিলাম, সিলিভিও হাত ধরে আমায় থামাল। মৃদুস্বরে সে বলল, ‘তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।’ আমি থেকে গেলাম।
অতিথিরা চলে গিয়েছিল। আছি শুধু আমরা দুজন। পরস্পরের মুখোমুখি বসে আমরা পাইপ ধরাতে লাগলাম নিঃশব্দে। সিলভিও কী যেন ভাবছিল— অল্প আগের দমকা ফুর্তির একটু ছিটেও যেন আর ওর মধ্যে নেই। থমথমে চেহারা, জ্বলজ্বলে চোখ, মুখ থেকে কড়া ধোঁয়া বের হচ্ছে— সব মিলিয়ে ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন আস্ত একটা দানব। কয়েক মিনিট এভাবে কাটার পর সিলভিও স্তব্ধতা ভেঙে বলল:
‘বোধ হয় আমাদের আর কখনো সাক্ষাৎ হবে না। বিদায় নেয়ার আগে তোমার সঙ্গে একটু কথা বলে যেতে চাই। তুমি বুঝতে পারো, অন্যে আমার সম্পর্কে কি ভাবছে না ভাবছে, তা নিয়ে আমি থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু তোমাকে আমার ভালো লাগে। আমার সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা নিয়ে তুমি থাকবে— একথা ভেবে আমার কষ্ট হবে।’
একটু থেমে সিলভিও তার পাইপের খোল ভর্তি করতে শুরু করল। কথা না বলে আমি চেয়ে রইলাম মাটির দিকে।
ও আবার বলতে লাগল, ‘তোমার হয়তো আশ্চর্য ঠেকেছে, ওই মাতাল লক্কা র...এর সঙ্গে কেন আমি লড়লাম না। এক্ষেত্রে হাতিয়ার বেছে নেয়ার অধিকার ছিল আমারই। সুতরাং নিশ্চয়ই মানবে যে লোকটার জান ছিল আমারই হাতে। আমার নিজের জীবনের দিক থেকে ভয়ের বেশি কিছু ছিল না। তবু যে আমি নিজেকে সংযত করে নিয়েছিলাম, সেটা আমার উদারতারই দরুন— এ রকম একটা ধারণা তুমি অনায়াসে করতে পারতে। কিন্তু তোমায় ঠকানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আসলে আমার জীবন মোটেই বিপন্ন হচ্ছে না— এই যদি হতো, তবে কখনই আমি লোকটাকে ক্ষমা করতাম না।’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম সিলভিওর দিকে। তার মুখে স্বীকারোক্তি শুনে আমি একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। সিলভিও বলে চলল:
‘হাঁ, আমার জীবন বিপন্ন করার কোনো অধিকার আমার নেই। ছয় বছর আগে আমার মুখের ওপর একজন থাপ্পড় মেরেছিল। আর আমার সে শত্রু এখনো বেঁচে।’
আমার কৌতূহলের সীমা-পরিসীমা ছিল না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘লড়লে না তার সঙ্গে? ঘটনাচক্রে ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে হয়েছিল বুঝি?’
সিলভিও বলল, ‘লড়েছিলাম বৈকি। আমাদের ডুয়ালের একটা স্মৃতিচিহ্নও আমার আছে।’
সিলভিও উঠে গিয়ে কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে বের করল একটা পাট করা লাল টুপি— তার সঙ্গে গিল্টি করা একটা ঝুঁটি লাগানো (ফরাসিরা যাকে বলে নড়হহবঃ ফব ঢ়ড়ষরপব বা পুলিশি ফেজ) সেই রকম। সিলভিও টুপিটা মাথায় দিতেই দেখা গেল কপালের ইঞ্চিখানেক উপরে তাতে বুলেটের একটা ছেদা।
সিলভিও বলে গেল, ‘তুমি জানো আমি একসময় ন... নম্বর ঘোড়সওয়ার দলে কাজ করতাম। আমার স্বভাব কী রকমের, তাও তোমার জানা। সবকিছুতেই পয়লা নম্বরের— এই হলো আমার অভ্যাস। আর জোয়ান বয়সে সেটিই ছিল আমার একমাত্র ধ্যান। আমাদের কালে হই-হাঙ্গামা করতে পারাই ছিল ফ্যাশন। আর আমাদের বাহিনীতে আমিই ছিলাম সবচেয়ে বেপরোয়া। মাতাল হতে পারা ছিল একটা গর্বের ব্যাপার। কবি দেনিস দাভিদভ যাকে অমর করে গেছেন সেই বিখ্যাত বুর্তসোভের চেয়েও আমি একবার আরো অনেক বেশি মদ টেনেছিলাম। আমাদের রেজিমেন্টে ডুয়াল লড়া হতো মিনিটে মিনিটে, আর তাতে আমি লড়ছি না কিংবা দোসর লড়িয়ে হিসেবে দাঁড়াচ্ছি না— এমন ডুয়াল প্রায় খুঁজেই পাওয়া যেত না। সঙ্গীরা আমাকে প্রায় পূজা করতে শুরু করেছিল। আর রেজিমেন্ট কমান্ডার যারা হরদম বদলি হয়ে আসত, তাদের চোখে আমি ছিলাম এক অপরিহার্য অভিশাপবিশেষ।’
‘বেশ নিশ্চিন্তে (কিংবা তেমন নিশ্চিন্তে বোধ হয় নয়) আমি আমার নামডাক উপভোগ করছি— এ সময় বড়লোকের এক পোলা এসে আমাদের রেজিমেন্টে ভর্তি হয়। লোকটা খুবই নামজাদা বংশের ছেলে (তার নাম আমি বলব না)। এমন চোখ ধাঁধানো একটা লোক আর ভাগ্যের এমন বরপুত্র আমি আর কোথাও দেখিনি। যৌবন, বুদ্ধি, রূপ, হুল্লোড়ে মেজাজ, অসম সাহস, নামজাদা বংশ আর অফুরন্ত টাকা, দুহাতে খরচ করেও যা বোধ হয় শেষ হবে না। সব কয়টি একত্রে কল্পনা করে দেখো, তাহলে বুঝবে আমাদের ওপর কী রকম প্রভাব সে ফেলেছিল। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে যশ আমার গেল টলে। আমার নামডাক শুনে সে প্রথমদিকে আমার সঙ্গে দোস্তি করতে এসেছিল। কিন্তু আমি গরজ না দেখাতে সেও এতটুকু আপসোস না করে ছাড়ান দেয়। লোকটার ওপর আমার একটা জাতক্রোধ জন্মে গিয়েছিল। রেজিমেন্টে আর নারীদের কাছ ওর খ্যাতি দেখে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। কী করে ওর সঙ্গে একটা ঝগড়া বাধাই, এই ছিল আমার চেষ্টা। কিন্তু আমি যেসব বাক্যবাণ নিক্ষেপ করতাম, ও তত্ক্ষণাৎ পাল্টা জবাবে তা এমনভাবে কাটান দিত যে, প্রত্যেকবারই আমার মনে হতো, ওর প্রত্যুক্তিগুলো সব আমার চেয়েও অনেক বেশি সতেজ আর সরস ও মজাদার। আমার কথায় থাকত বিষ, ওর কথায় থাকত রহস্য। একদিন এক পোলিশ জমিদারবাড়িতে নিমন্ত্রণ ছিল। ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার একটা হূদয়ঘটিত ব্যাপার চলছিল। বলনাচের সময় দেখলাম, লোকটা যেন উপস্থিত সব মেয়ের কাছেই, বিশেষ করে গৃহকর্ত্রীর একেবারে চোখের মণি হয়ে উঠেছে। ব্যাপার দেখে আমি লোকটার কানে কিছু অশ্লীল ইয়ার্কি ছাড়ি। ও লাল হয়ে উঠে ধা করে আমার মুখে একটা থাপ্পড় মেরে বসে। সঙ্গে সঙ্গে দুজনই তলোয়ারের হাতল চেপে ধরলাম। মেয়েদের মধ্যে মূর্ছা যাওয়া শুরু হয়ে গেল। জোর করে আমাদের ছাড়িয়ে দেয়া হলো। সেই রাত্রেই ডুয়াল লড়ব বলে আমরা চলে গেলাম।’
‘তখন ভোর হয় হয়। তিনজন দোসর সঙ্গে নিয়ে আমি যথাস্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম। শত্রুর প্রতীক্ষা করতে গিয়ে আমার ধৈর্য আর বাঁধ মানছিল না। সময়টা ছিল বসন্তকাল। সূর্য উঠল আগেই। চারদিক বেশ গরম হয়ে উঠেছে। এমন সময় দূরে দেখা গেল, ও হেঁটে আসছে। উর্দি চাপিয়েছে তলোয়ারের মাথায়। সঙ্গে একজন মাত্র দোসর। আমরা এগিয়ে গেলাম তার দিকে। চেরি ফলে ভর্তি টুপিটা হাতে ধরে আসছে সে। দোসররা ১২ পা জায়গা মেপে আমাদের তফাত করে দাঁড় করিয়ে দিলে। কানুনমাফিক আমারই আগে গুলি করার কথা। কিন্তু রাগে এমন বেসামাল বোধ হচ্ছিল নিজেকে, ভয় হলো হাত কেঁপে যাবে। তাই প্রথম গুলি করার পালা ওকেই ছেড়ে দিলাম। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু কিছুতেই তাতে রাজি হলো না। ঠিক হলো লটারি হবে। কপাল ওর চিরকালই সুপ্রসন্ন। লটারিতে প্রথম গুলির পালা পড়ল ওর ভাগ্যে। ও তাক করল কিন্তু গুলি ফসকে লাগল আমার টুপিতে। এবার আমার পালা। এতদিন পরে এবার ওর জান আমার মুঠোয়। আমি ওর দিকে তীক্ষ্ম চোখে চাইলাম, দেখতে চাইছিলাম সেখানে এতটুকু কোনো উদ্বেগ ছায়া ফেলেছে কিনা... ও কিন্তু অনায়াসে আমার পিস্তলের লক্ষ্যের সামনে দাঁড়িয়ে টুপি থেকে বেছে বেছে পাকা চেরি ফলগুলো খেতে শুরু করল, বিচিগুলো ছুড়ে ফেলতে লাগল প্রায় আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম ততদূর অবধি। ওর এই নিশ্চিন্ত ভাবটা আমায় ক্ষেপিয়ে তুলল। মনে হলো, লোকটা যখন তার জীবনটাকে মূল্যই দিচ্ছে না, তখন সে জীবন কেড়ে নিয়ে আমার লাভ কী? বীভত্স একটা চিন্তা পেয়ে বসল আমাকে। পিস্তল নামিয়ে বললাম, দেখছি তুমি ভারি ব্যস্ত। মরার কথা ভাবারও সময় নেই। তোমার প্রাতরাশের আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে আমি চাই না।’ ও বলল, ‘একটুও না, তোমার জন্য মোটেই আমার অসুবিধা হচ্ছে না। দয়া করে গুলি করেই ফেলো না। তবে তোমার যা ইচ্ছে। একটা গুলি তোমার পাওনা রইল, যখনই চাইবে আমি রাজি।’ আমি দোসরদের দিকে ফিরে বললাম, ‘আপাতত গুলি করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। ডুয়াল ওই অবস্থাতেই সেদিন শেষ হলো।’
‘সেনাদল থেকে ইস্তফা দিয়ে আমি এসে বসলাম এই ছোট শহরটায়। সেদিন থেকে প্রতিশোধ চিন্তা ছাড়া একটা দিনও আমার কাটেনি। এতদিনে আমার প্রতীক্ষা পূর্ণ হতে চলেছে...।’
সিলভিও তার পকেট থেকে আজ সকালে আসা চিঠিটা বের করে আমায় দিল। চিঠিতে মস্কো থেকে কে একজন (সম্ভবত তার উকিল) জানাচ্ছে যে, জনৈক ব্যক্তি নাকি শিগগিরই এক সুন্দরী তরুণীর পাণিগ্রহণ করবেন। সিলভিও বলল, ‘আন্দাজ করতে পেরেছ নিশ্চয়ই এই জনৈক ব্যক্তিটি কে? আমি মস্কো চললাম। চেরি খেতে খেতে নির্বিকারভাবে ও সেদিন মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতে পেরেছিল। এবার দেখা যাবে বিয়ের মুহূর্তে তেমনি নির্বিকারভাবে সে মরতে পারে কিনা।’
একথা বলে সিলভিও উঠে দাঁড়াল, টুপিটা ছুড়ে ফেলল মেঝের ওপর আর খাঁচায় পোরা বাঘের মতো ঘরময় পায়চারি করতে শুরু করল। পরস্পরবিরোধী আবেগের বিচিত্র আলোড়নে আলোড়িত হয়ে স্তব্ধের মতো দাঁড়িয়ে আমি তার কাহিনীটা শুনে গেলাম আগাগোড়া।
চাকর এসে খবর দিল ঘোড়া তৈরি হয়ে গেছে। সিলভিও আমার হাত চেপে ধরল আবেগভরে। আমরা পরস্পরকে চুম্বন করলাম। সিলভিও গাড়িতে উঠল। দুটি মুট তাতে আগেই চাপানো হয়েছে। একটাতে সিলভিওর পিস্তলগুলো, অন্যটায় তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। পরস্পরের কাছ থেকে আরেকদফা আমরা বিদায় নিলাম। ঘোড়া ছুটল কদমে।
২
কয়েক বছর কেটে গেছে। সংসারের চাপে আমি ক... জেলার দীনদরিদ্র একটা গ্রামে ডেরা নিতে বাধ্য হয়েছি। সম্পত্তির দেখাশোনায় জড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার দীর্ঘশ্বাস পড়ত সেই আগেকার হইহল্লা ভরা চিন্তাহীন জীবনটার জন্য। যে জিনিসটা এখানে আমার কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না, তা ওই শীত আর শরতের একান্ত নিঃসঙ্গ সন্ধ্যাগুলো। ডিনার খাওয়ার সময় পর্যন্ত আমি যে করেই হোক গায়ের মোড়লের সঙ্গে কথা বলে নয়তো কাজ তদারকের জন্য মহালের মধ্য দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বা নতুন চালু করা কোনো খামার ইত্যাদি দেখে সময় কাটাতে পারতাম। কিন্তু সন্ধ্যা নামতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমি যে নিজেকে নিয়ে কী করব তা ভেবে পেতাম না। বিভিন্ন দেরাজের তলা আর ভাঁড়ার হাতড়িয়ে যে কয়টি বই পেয়েছিলাম, তা এরই মধ্যে প্রায় মুখস্থ হয়ে এসেছিল। বাড়ির বৃদ্ধা দাসী কিরিলোভনা তার ঝুলি উজাড় করে একই কাহিনী বারবার শুনিয়েছে। মেয়েদের যেসব গানের আসর বসত, তা শুনে আমার মন শুধু বিষাদেই ভরে উঠত। হয়তো মদ খাওয়াই ধরতাম কিন্তু তাতে মাথা ধরত প্রচণ্ড। তাছাড়া শুধু নিঃসঙ্গতার হতভাগ্যে মাতাল হয়ে ওঠার কথা ভাবতে গেলে আমার বেশ ভয় করত— একথা খোলাখুলি স্বীকার করে নেয়াই ভালো। বলতে গেলে, এ রকম লোকেরা হয় সবচেয়ে জঘন্য ধরনের মাতাল— আমাদের জেলায় এ রকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমার দেখা আছে। এ ধরনের জন দু-তিন হতভাগাই ছিল আমার একমাত্র পড়শি। তাদের যা কিছু আলাপ সব হিক্কা আর দীর্ঘনিশ্বাসে ভরা। এ রকম সঙ্গীর চেয়ে নির্জনতা বরং সহনীয়।
চার ভার্স্ট দূরে ছিল কাউন্টেস শ্রীমতী ব...এর ফলাও সম্পত্তি। কিন্তু সেখানে গোমস্তা ছাড়া আর কেউ থাকত না। কাউন্টেস তার জমিদারিতে এসেছিলেন শুধু একবার, বিয়ের প্রথম বছরে; কিন্তু মাসখানেকের বেশি থাকেননি। আমার নির্জন বাসের দ্বিতীয় বসন্তকালে শোনা গেল, কাউন্টেস তার স্বামীসহ গ্রীষ্মে জমিদারি দেখতে আসবেন বলে মনস্থ করেছেন। জুনের শুরুতে তারা সত্যি সত্যি এলেন।
ধনী কোনো প্রতিবেশীর আগমন গ্রামবাসীর জীবনে একটা মস্ত ঘটনা। জমিদাররা আর তাদের বাড়ির লোকেরা এ ঘটনা নিয়ে দুই মাস আগে থেকে কথা বলতে শুরু করে এবং পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত তারা আলাপ চালিয়ে যায়। আমার নিজের কথাই যদি ধরি, তরুণী ও সুন্দরী এক প্রতিবেশী আসার খবরটা আমার ওপরও বেশ জোর ছাপ ফেলেছিল। তাকে দেখার জন্য আমার তর সইছিল না। ওরা আসার ঠিক পরের রোববারেই আমি ডিনারের পর ওদের গ্রামের দিকে রওনা দিলাম— ইচ্ছে ছিল হুজুরের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ও বিনীত দাসানুদাস বলে নিজের পরিচয় দিয়ে দাঁড়াব।
চাপরাশি আমাকে নিয়ে কাউন্টের পাঠকক্ষে বসিয়ে খবর দেয়ার জন্য চলে গেল। প্রশস্ত ঘরখানা রাজার হালে সাজানো। দেয়ালের সঙ্গে বইভরা অনেক আলমারি। প্রতিটি আলমারির ওপর ব্রোঞ্জের একেকটা আবক্ষ মূর্তি। শ্বেতপাথরে বাঁধানো অগ্নিকুণ্ডের ওপর মস্ত একটা আরশি। সবুজ কার্পেটে মেঝে ঢাকা, তার ওপর গালিচা বিছানো। আমার গরিব ডেরায় বিলাসের কোনো অবকাশ ছিল না। অন্যের ঐশ্বর্য দেখাও আমার অনেককাল বন্ধ। এর মধ্যে পড়ে তাই আমি খানিকটা জড়সড়র মতো স্নায়বিক উদ্বেগ নিয়ে কাউন্টের দর্শনের অপেক্ষা করছিলাম, ঠিক যেন মন্ত্রীর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করতে এসেছিল কোনো গ্রাম্য আবেদনকারী। দরজা খুলে ভেতরে যে এলেন, তার বয়স ৩২ বছর। চেহারা অতি সুশ্রী। কাউন্ট আমার দিকে যেন আন্তরিকতার সঙ্গে বন্ধুর মতো এগিয়ে এলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে আমার পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই তিনিই আমার নাম বললেন। দুজনে মিলে বসা গেল। কাউন্ট কথাবার্তা বলতে লাগলেন খুব সহজ সুরে, সৌজন্যের সঙ্গে। দীর্ঘকাল ধরে নিঃসঙ্গভাবে কাটানোর ফলে আমার মধ্যে যে সংকোচ এসে জমেছিল, এতে তা শিগগিরই কেটে গেল। বেশ স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে শুরু করেছি, এমন সময় হঠাৎ কাউন্টেস এলেন। সঙ্গে সঙ্গে আগের চেয়েও আরো বেশি বিব্রত লাগল নিজেকে। ভদ্রমহিলা সত্যিই এক রমণীয় সৃষ্টি। কাউন্ট আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি সহজ হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু যতই স্বচ্ছন্দ হতে যাই, ততই যেন ভেতরে ভেতরে বিব্রত হয়ে উঠতে থাকি। আমি যাতে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পাই এবং অপরিচিতদের সাহচর্যটুকু স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, সেজন্য তারা নিজেদের মধ্যে কথা শুরু করলেন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হলে লোকে যা করে তেমনিভাবে, বিশেষ কোনো সৌজন্যের আতিশয্য না দেখিয়ে। এরই মধ্যে আমি এদিক-ওদিক পায়চারি করতে করতে বইপত্তর, ছবিটবি দেখে বেড়াতে লাগলাম। ছবি সম্পর্কে আমার জ্ঞান সামান্যই, তবু আমার চোখ গিয়ে পড়ল একটার দিকে। ছবিটা ছিল সুইজারল্যান্ডের একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য, কিন্তু আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম ছবিটার জন্য তত নয়, ছবির মধ্যে একই জায়গায় দুটি বুলেটের গর্ত হয়ে আছে বলে।
‘খুব পাকা নিশানা’, আমি বললাম কাউন্টের দিকে চেয়ে।
কাউন্ট বললেন, ‘হ্যাঁ চমত্কার নিশানা। আপনিও কি ভালো গুলি করতে পারেন?’
বললাম, ‘পয়লা নম্বরের।’ আলাপ-আলোচনাটা যে অবশেষে আমার অতিপ্রিয় একটা বিষয়ে এসে পড়েছে, এতে খুশি হয়ে উঠেছিলাম। ‘তিরিশ পা দূর থেকে গুলি করলেও কোনো তাস আমার হাত ফসকাবে না! অবশ্য যেসব পিস্তলে আমার অভ্যেস তা-ই দিয়ে।’
‘সত্যি?’ ভয়ানক মনোযোগের ভাব নিয়ে কাউন্টেস জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিও তিরিশ পা দূরে তাস গুলি করতে পারো নাকি গো?’
কাউন্ট বললেন, ‘একদিন চেষ্টা করে দেখা যাবে। বয়সকালে আমিও নেহাত খারাপ নিশানদার ছিলাম না, কিন্তু এ চার বছরে আমি একবারও পিস্তাল হাতে নিইনি।’
আমি বললাম, “ওহ, তাহলে আমি বাজি রেখে বলতে পারি, হুজুর এখন কুড়ি পা দূরে তাসকেও গুলি করতে পারবে না— পিস্তল চালাতে হলে দৈনিক তালিম দিয়ে যেতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটা দেখেছি। আমাদের রেজিমেন্টের সেরা নিশানদারের একজন বলে আমার নাম ছিল। কিন্তু একবার গোটা একটা মাস আমাকে কাটাতে হয় পিস্তল না ছুঁয়ে। আমারটা মেরামত হচ্ছিল। তারপর জানেন হুজুর? আবার প্রথম গুলি চালানোর দিন পঁচিশ পা দূরের একটা বোতল মারতে গিয়ে চারবার ফসকালাম। আমাদের ক্যাপ্টেনের মুখ ছিল খুব তুখোড়, রসিকতাও করত খুব। সে বলল, ‘বোতল মারা তোমার সইবে না বন্ধ,ু তা সবাই দেখতে পাচ্ছে।’ আজ্ঞে না, দৈনিক অভ্যাসের ব্যাপারটা অবহেলা করা উচিত নয়, নইলে শিগগিরই দেখবেন আপনি সব ভুলে গেছেন। সবচেয়ে ভালো নিশানদার বলে আমি যাকে জানতাম, সে প্রতিদিন অভ্যেস করত, ডিনারের আগে অন্তত তিনবার করে সে গুলি ছুড়ত। ব্যাপারটা তার কাছে ছিল যেন ডিনারের আগে এক গ্লাস ভদকা খাওয়ার মতো নৈমিত্তিক ব্যাপার।”
কথা বলার মতো বিষয় পেয়েছি দেখে কাউন্ট আর কাউন্টেস খুশি হয়ে উঠলেন।
কাউন্ট বললেন, ‘আচ্ছা, গুলি ছুড়ত কেমন?’
“শুনবেন? তাহলে বলি। কখনো হয়তো দেখা গেল দেয়ালের ওপর একটা মাছি এসে বসেছে— কাউন্টেস, আপনি হাসছেন কিন্তু দিব্যি দিয়ে বলতে পারি সব সত্যি— যাহোক, দেখা গেল দেয়ালে একটা মাছি বসেছে, অমনি সে চিত্কার করে উঠত, ‘কুজকা, আমার পিস্তল!’ কুজকাও সঙ্গে সঙ্গে গুলিভর্তি পিস্তল নিয়ে এসে হাজির। ব্যস, অমনি গুম দেখা গেল মাছিটা একেবারে দেয়ালের সঙ্গে চ্যাপ্টে গেছে।’
‘সাবাস!’ কাউন্ট তারিফ করে উঠলেন, ‘কী নাম লোকটার?’
‘আজ্ঞে লোকটার নাম সিলভিও।’
‘সিলভিও?’ কাউন্ট লাফিয়ে উঠলেন চেঁচিয়ে, ‘আপনি কি সিলভিওকে চিনতেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার সঙ্গে ওর বেজায় বন্ধুত্ব ছিল। আমাদের রেজিমেন্টের সবাই তাকে দেখত ঘরের লোকের মতো। কিন্তু বছর পাঁচেক হলো, লোকটার কোনো খবর জানি না। তাহলে হুজুরও তাকে চিনতেন?’
‘হ্যাঁ, চিনতাম, খুব ভালো করেই চিনতাম। সে কি কখনো আপনাকে বলেনি... কিন্তু না বলাই সম্ভব... সে কি তার জীবনের খুব অদ্ভুত একটা ঘটনার কথা বলেছিল কখনো?’
‘সেই একটা জোয়ান চালবাজ তার মুখে যে থাপ্পড় মেরেছিল, আপনি কি তার কথা জিজ্ঞেস করছেন?’
‘সেই লোকটার নামটা সে কখনো বলেনি?’
আমি বললাম, ‘আজ্ঞে না, সে তা বলেনি।’ কিন্তু তার পরই হঠাৎ ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, ‘ওহ হো’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। ‘মাফ করবেন, আমার খেয়ালই হয়নি... সে কি আপনিই?’
‘আমিই।’ কাউন্ট বললেন, মুখটা তার তখন ভারি বিমর্ষ হয়ে গেছে।
‘আর ওই বুলেট-বেঁধা ছবিটা হলো আমাদের শেষ সাক্ষাতের স্মৃতিচিহ্ন।’ কাউন্টেস বলে উঠলেন, ‘মাগো! না বাপু, ও নিয়ে আর আলাপ তোলো না, তোমায় মিনতি করে বলছি। জানোই তো ঘটনাটার কথা শুনলে আমার বড় ভয় করে...।’
কাউন্ট বললেন, ‘হুঁ, কিন্তু আমি বলব, সবটা বলব। তিনি এইটুকু জানেন যে, আমি কেমন করে তার বন্ধুকে অপমান করেছিলাম। সিলভিও কেমন করে তার প্রতিশোধ নিল, সেটাও তিনি শুনে রাখুন।’
কাউন্ট একটি আরাম কেদারা টেনে আনলেন আমার জন্য। দারুণ কৌতূহল নিয়ে আমি শুনে গেলাম।
‘আমার বিয়ে হয় পাঁচ বছর আগে। ঞযব যড়হবু-সড়ড়হ-এর প্রথম মাসটা আমার এই গ্রামে কাটে। এ বাড়িতেই আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলো আমি পেয়েছি, আর পেয়েছি আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের একটি মুহূর্ত।’
‘একদিন সন্ধ্যায় আমরা দুজন একসঙ্গে ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে বেরিয়েছি। আমার স্ত্রীর ঘোড়াটা ছটফট করতে শুরু করেছিল। সে ভয় পেয়ে আমার হাতে লাগাম দিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে থাকে। ঘোড়ায় চেপে আমি চলে যাই আগে আগে। এসে দেখি বাড়ির আঙিনায় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম, পাঠকক্ষে কে একজন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটা তার নাম বলেনি, শুধু বলেছে আমার সঙ্গে নাকি তার কাজ আছে। এ ঘরটায় ঢুকে দেখলাম সন্ধ্যার ছায়ায় একটা লোক অগ্নিকুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক এখানটায়। লোকটার সর্বাঙ্গ ধুলায় ভরা, দাড়িগোঁফ কামানো হয়নি। আমি তার কাছে যেতে যেতে মনে করার চেষ্টা করছিলাম— কে হতে পারে।’ ‘চিনতে পারছ না কাউন্ট?’ লোকটা বলল কাঁপা কাঁপা গলায়। ‘সিলভিও!’ আমি চেঁচিয়ে উঠলাম এবং সত্যি কথা বলতে কি, টের পেলাম মাথার চুল আমার খাড়া হয়ে উঠেছে। ‘সিলভিওই বটে; এবার আমার গুলি করার পালা। পিস্তল খালি করার জন্য আমি এসেছি, তুমি তৈরি?’ ওর বুকপকেট থেকে একটি পিস্তল বেরিয়ে ছিল খানিকটা। আমি ১২ পা জায়গা মেপে গিয়ে দাঁড়ালাম ওই কোনটায়। বললাম একটু তাড়াতাড়ি করতে— আমার স্ত্রী আসার আগেই যেন গুলি হয়ে যায়। ও দেরি করতে লাগল। আলো চাইল। মোমবাতি নিয়ে আসা হলো। আমি দরজায় কুলুপ দিয়ে হুকুম দিলাম কাউকে যেন ভেতরে আসতে দেয়া না হয়। তারপর আবার অনুরোধ করলাম, ‘তাড়াতাড়ি গুলি করো।’ ও পিস্তলটা বের করে নিশানা করতে লাগল। একেকটা সেকেন্ড আমি গুনে চলেছি... ভাবছি শুধু আমার স্ত্রীর কথা... পুরো ১ মিনিট ধরে চলল এই ভয়ঙ্কর উদ্বেগের অবস্থা। হঠাৎ সিলভিও তার হাত নামিয়ে নিল। বলল, ‘দুঃখ হচ্ছে এই ভেবে যে, আমার পিস্তল ঠিক চেরির বিচি দিয়ে ভর্তি করা হয়নি। বুলেটগুলো অনেক কড়া চিজ কিন্তু কেবলই মনে হচ্ছে ব্যাপারটা ঠিক ডুয়াল হচ্ছে না, হচ্ছে হত্যা। নিরস্ত্র লোকের দিকে পিস্তল তাক করা আমার ধাত নয়। সবটাই আবার নতুন করে শুরু করা যাক, কে প্রথম গুলি করবে সেটা লটারি করা হোক।’ আমার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে... যতদূর মনে পড়ে আমি সায় দিইনি... শেষ পর্যন্ত আরেকটা পিস্তল গুলিভর্তি করা হলো, লটারির জন্য দুটো কাগজ ভাঁজ করে রাখা হলো ওর সেই টুপিটার মধ্যে, যেটাতে আমার গুলি গিয়ে বিঁধেছিল। এবং এবারো ভাগ্যমন্ত কাগজখানা আমারই কপালে পড়ল। ‘শয়তানের কপাল তোমার কাউন্ট’ লোকটা এমন একটা হাসি হেসে বলল, যা আমি কখনো ভুলব না। ‘আমায় কি যে পেয়ে বসেছিল, আমাকে দিয়ে গুলি করিয়ে নিতে ও কেমন করেই বা পারল, জানি না... কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুলি আমি করলাম, আর ওই ছবিটাতে গিয়ে সে গুলি লাগল।’ (বুলেট-বেঁধা ছবিটার দিকে কাউন্ট দেখালেন। কাউন্টের গাল দুটো উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। কাউন্টেসের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে তার গায়ের শালের চেয়েও বেশি। আমার মুখ দিয়েও একটা অস্ফুট ধ্বনি বেরিয়ে এল।)
কাউন্ট বলে চললেন, “আমি গুলি করলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, গুলিটা ফসকে গেল। তারপর সিলভিও... (সেই মুহূর্তে তার চেহারা হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর) সিলভিও নিশানা করতে শুরু করল আমার দিকে। হঠাৎ দরজা খুলে গেল। ছুটে এসে মাশা চিত্কার করতে করতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। মাশাকে দেখেই বোধ হয় বিচারবুদ্ধি ফিরে পেলাম। বললাম, ‘দেখছ না আমরা রহস্য করছি যে গো? এ কি চেহারা হয়েছে তোমার! যাও, এক গ্লাস জল খেয়ে ফিরে এসো। আমার পুরনো বন্ধু আর সঙ্গীর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।’ মাশা আমার কথায় ভরসা করতে পারছিল না। দুর্ধর্ষ সিলভিওর দিকে ফিরে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি বলুন আমার স্বামী যা বলছে, তা কি ঠিক? এ কি সত্যি যে, আপনারা দুজন শুধু রহস্যই করছেন?’ সিলভিও বলল, ‘সে সবসময়ই রহস্য করেন কাউন্টেস। একসময় আমার মুখে সে একটা থাপ্পড় কষেছিল নেহাত রহস্য করে, আমার টুপির মধ্য দিয়ে গুলি চালিয়েছিল, তাও রহস্য করে এবং এই মাত্র তার নিশানা ফসকে গেল, সেও রহস্য করেই। এবার আমারও একটু রহস্য করার ইচ্ছে হয়েছে’— একথা বলে সে আমার স্ত্রীর সামনেই আমার দিকে নিশানা করতে শুরু করল! মাশা গিয়ে ওর পা জড়িয়ে ধরল। উন্মাদের মতো আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘ছি ছি মাশা, উঠে এসো! আর তুমি— একজন হতভাগ্য নারীর প্রতি উপহাস করা বন্ধ করবে কি? তুমি গুলি করতে চাও কি চাও না?’ ‘চাই না,’ সিলভিও জবাব দিল, ‘আমি তৃপ্তি পেয়েছি। তোমার চোখে উদ্বেগ দেখতে চেয়েছিলাম, আতঙ্ক দেখতে চেয়েছিলাম, দেখলাম। তোমাকে দিয়ে ফের আমার দিকে গুলি ছুড়তে বাধ্য করলাম। আর কিছু আমি চাই না। এরপর আমার কথা তুমি আর কখনো ভুলতে পারবে না। এবার তোমার ধর্ম তোমার কাছে।’ একথা বলে সে চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছবিটার দিকে ফিরে তাকাল এবং প্রায় কোনো রকম নিশানা না করেই একটা গুলি করে অন্তর্ধান হলো। আমার স্ত্রী মূর্ছিত হয়ে পড়েছিল। চাকরবাকরদের কারো সাহস হয়নি ওকে আটকে রাখতে। ফ্যালফ্যাল করে ওরা শুধু চেয়েছিল লোকটার দিকে। সিলভিও বারান্দায় দাঁড়িয়ে কোচোয়ানকে হাঁক দিল এবং কী হলো তা বুঝে ওঠার আগেই চলে গেল।”
কাউন্ট আর কিছু বললেন না। যে গল্পের শুরুটা একদিন আমায় আলোড়িত করেছিল, তার শেষটা এভাবেই আবিষ্কার করা গেল। এ গল্পের নায়কের সঙ্গে আর কখনো আমার দেখা হয়নি। শোনা যায়, সিলভিও নাকি আলেক্সান্দর ইপসিলান্তি বিদ্রোহের মধ্যে একটা বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় এবং স্কুলিয়ানির যুদ্ধে মারা যায়।





