১. অভাজন

ব্যক্তিগত গল্প দিয়েই শুরু করছি। বছর দুয়েক আগের কথা। গ্রীষ্মের ছুটিতে সামার স্কুলে এসেছে ছেলেমেয়েরা, ইউরোপের নানান দেশ থেকে— রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও চীন থেকে। ইংরেজি ক্লাসে আমি তাদেরকে বললাম, ‘যদি’ দিয়ে একটি তালেবর লোকের জীবনের ঘটনা আরেকভাবে লেখো। ছেলেমেয়েরা জাস্টিন টিম্বারলেক, রিহানা, কেটি পেরিকে নিয়ে লিখে খাতা ভরিয়ে ফেলছে, দুটি রুশ বালক লিখেছে, ‘আলেক্সান্দর পুশকিন যদি তার স্ত্রীকে এমন ভালো না বাসতেন...’। আমরা বাক্যহারা হয়ে স্বীকার করলাম, স্বদেশ যদি এমন করে ঐশ্বর্যবান করে তোলে, তবে লোকে কি না করতে পারে! একটি শিশু কি বিপুল উত্তরাধিকার নিয়েই না বড় হতে পারে!

 

২. রুশ দেশের কথা আর উপকথা

মাতৃস্তন্য ছাড়ার পরের শক্ত খাবারের মতন করে আমাদের জীবনে এসেছিল তারা, ঝাঁকে ঝাঁকে উজ্জ্বল মানসবলাকা, অক্ষর পরিচয়ের পরে পড়ার বিমল আনন্দ যখন আমাদের মনের আকাশে ঊষার রেখার মতন ফুটি ফুটি করছে, তখন ভাষায়-আঙ্গিকে-রঙে-রেখায়-পুষ্টিতে আমাদের শিশুমন ঝলমলিয়ে দেয়ার জন্য এসেছিল তারা। ননী ভৌমিক, অরুণ সোম, নীরেন্দ্রনাথ রায়, হায়াত মামুদ, দ্বিজেন শর্মা, বিজয় পাল, ফলগু কর, সমর সেন, রেখা চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণিমা মিত্র... এমনই কিছু অনলস অনুবাদকের হাত ধরে আমাদের শৈশবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা। সোভিয়েত যুগে অনূদিত বাংলা বই। ‘অজানি দেশের না-জানি কী’রা। তারা অল্প দূরের, নাকি অনেক দূরের? টাকু-মাকু গড়িয়ে গেলেই কি একসময় সোনার সুতো গিয়ে থামে তাদের রাজ্যে? 

 

বরফঘেরা এক দেশ, বরফ গলতে শুরু করলে পাখির ডাক শুরু হয়, বসন্ত মানে সেখানে নতুন প্রাণের সূচনা, তামাটে মাটিতে কচি ঘাস। গ্রীষ্ম সেখানে সোহাগী। ঘড়ির কাঁটায় রাত দুপুর দেখালেও যেখানে দুই দিগন্তে সোনার কাঠি রুপার কাঠির মতন জেগে থাকে গোলাপি রেখা। একটি সূর্যাস্তের চিহ্ন, আরেকটি সূর্যোদয়ের। গ্রীষ্মকালে রুশ দেশের উত্তরে রাত্রি হয় না— লোকেরা সেই গোলাপি প্রায়ান্ধকারে দত্যি-দানোর গল্প বলে। বাবা-ইয়াগা ডাইনির গল্প। অদেখা জন্তু-জানোয়ারের গল্প। খনি শ্রমিকদের দেখা মণি-রত্নের গল্প। কথা বলা মাছের গল্প। গিরগিটি হয়ে যাওয়া মায়া যুবতীর গল্প। তৈগা বনে তুষারের ঝড়। স্তেপসের আদিগন্ত প্রান্তর। মাঝখানে নীল আয়নার মতো উজ্জ্বল হ্রদ-সরোবর। দীর্ঘ নদীমালা, আমুর, লেনা, ইনিসি। আর অনতিদূরে সুবিশাল মেরু মহাসাগর। আশ্চর্য এক দেশের গল্প বলে বইগুলো। গল্পগুলো কেবল আনন্দের নয়, কেবল হাসির নয়; ব্যথিতের, তিতিক্ষুর, আর্তের, অপেক্ষমাণের গল্প সেসব। এখনকার কালের মতন আপনাকে ভালোবেসে কেঁদে-কঁকিয়ে কাটানোর মতন মানুষ নয় তারা, আগের কালের লোক, যারা আদর্শের জন্য— কিছু সত্যের জন্য— কিছু অর্জনের জন্য— কিছু বিশ্বাসের জন্য জীবনকে তুচ্ছ করে ফেলতে পারত। জীবনের বিপুল অশ্রুবিথারের সামান্য আভাস দিয়ে যায় তারা। ইঙ্গিত দিয়ে যায় যে, মানুষের জয় হবে শেষ পর্যন্ত।  মানুষগুলো, দানোগুলো, জীবনগুলো যে দেশের, সেই দেশের নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে দেশ ধূলিমলিনের, উনুনের ওপর প্রায় চড়ে বসা শীতার্তের, তামা গালাইকর ভূমিদাসের, সামোভারে জল ফোটার শব্দনিবিড় গেরস্থালীর, কালো রুটি আর নুন খাওয়া নিপীড়িত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত-অভাজনের। বাংলাদেশের অজস্র শিশুর শৈশব তৈরি করে দিয়েছে সেই দেশের শিশুসাহিত্য, রূপকথা ও কিশোর সাহিত্য। পরিণত বয়স্ককেও মুগ্ধ করে রেখেছে মায়ামন্ত্রে।

 

৩. পিঠে-পুলি-সরুচাকলি

সোভিয়েত আমলের এ বইগুলো নিয়ে আসলে ছোট করে কিছু লেখা কষ্টকর। একে তো ভালোবাসার বিষয় নিয়ে মানুষ কম করে কিছু বলতে পারে না, তার ওপর এ তো সাহিত্যযজ্ঞ। এর শুরুর ইতিহাসটুকু অরুণ সোমের ভাষ্যে এ রকম—

“১৯৩১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সমিতির উদ্যোগে বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় সোভিয়েত সাহিত্যের এবং রুশ ভাষায় বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ— মূলত মানববিদ্যা সংক্রান্ত এবং সর্বোপরি ভাবাদর্শগত গ্রন্থাদি প্রচারের উদ্দেশ্যে মস্কোয় ‘বিদেশী শ্রমজীবীদের প্রকাশন সমিতি’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে সংস্থাটি নাম বদল করে ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ এবং ১৯৬৩ সাল থেকে ‘প্রগতি প্রকাশন’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্য এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থাদির অনুবাদ ছাড়াও সোভিয়েত তথা রুশ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচারও ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ এবং ‘প্রগতি’র অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত অনুবাদের অন্তত এক-চতুর্থাংশ হত সোভিয়েত ও রুশ সাহিত্যের; আবার তার সিংহভাগ ছিল শিশু ও কিশোর সাহিত্যের, যেহেতু শিশু ও কিশোর মনে নির্দিষ্ট কোন ভাবাদর্শ গাঁথা হয়ে গেলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সুদূরপ্রসারী হওয়া খুবই সম্ভব। প্রকাশের তৃতীয় স্থানে থাকত রুশ ও সোভিয়েত ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদ।

বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে— তখনও অনুবাদ সাহিত্যের এই প্রকাশালয়টি ‘বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়’ নামে পরিচিত— সেই সময় সেখানে স্থায়ী বাংলা বিভাগ গড়ে উঠেছিল। ‘প্রগতি’ ততদিনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রকাশনালয়ে পরিণত হয়। পৃথিবীর ৫৬টি ভাষায় অনুবাদ সাহিত্য প্রকাশিত হত এখান থেকে। বছরে মুদ্রণসংখ্যা ১ কোটি ছাপিয়ে গিয়েছিল। ‘প্রগতি’র প্রকাশিত বইগুলি তাদের বিষয়বৈচিত্র্য, মুদ্রণ পারিপাট্য, নজরকাড়া অলংকরণ এবং সুলভ মূল্যের জন্য তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতে, বিশেষত ভারতের মতো দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এক সময় সর্বস্তরের পাঠকমহলে সেগুলি ব্যাপক প্রচার লাভ করে। রুশ তথা সোভিয়েত সাহিত্য ও সংস্কৃতি দেখতে দেখতে দুনিয়ার ব্যাপক পাঠক সম্প্রদায়ের প্রাণের সম্পদ ও আকর্ষণের বস্তুতে পরিণত হয়। ...আশির দশকে ‘প্রগতি’র অগ্রগতি এতদূর হয়েছিল যে বিশেষভাবে গল্প, উপন্যাস এবং শিশু ও কিশোর সাহিত্য অনুবাদের জন্য ১৯৮২ সালে ‘রাদুগা’ নামে পৃথক আরও একটি প্রকাশন সংস্থা গঠিত হয়...

মস্কোয় অনুবাদচর্চার যখন রমরমা চলছে ঠিক তখনই ঘটে গেল সেই আকস্মিক অঘটন। আকস্মিক বলা ঠিক হবে না— ১৯৮৫ সালে দেশে ‘পেরেস্ত্রৈকা’ ঘোষিত হওয়ার ফলে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। চূড়ান্ত বিপর্যয়ের জন্য আরও ছয় বছর প্রতীক্ষা করতে হল। ‘প্রগতি’র দীর্ঘ ছয় দশকের ইমারত তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল। ১৯৯১ সালে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে আমূল সংস্কার ঘোষিত হল, তার ফলে রাষ্ট্রের তরফ থেকে সোভিয়েত ভাবাদর্শ এবং রুশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রচারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেল। দ্বিতীয়ত, বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’র মতো প্রকাশালয় একেবারেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল না— যে রাষ্ট্রীয় অনুদান ও সরকারি ভর্তুকিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলি চলত, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলনের ফলে একসময় তা বন্ধ হয়ে গেল।”

মস্কোভিত্তিক সোভিয়েত প্রকাশন প্রগতি, রামধনু, রাদুগার উদ্যোগে রুশ সাহিত্যের সোনালি-রুপালি যুগের রত্নাবলির হদিশ মিলেছিল আমাদের, ষাট-সত্তরের দশকে যারা শৈশব কাটিয়েছি। কী সব নাম বইয়ের— ‘অন্বিষ্ট হূদয় অপচিত হূদপিণ্ড’, ‘শুক্লা যামিনী’, ‘পৃথিবীর পথে’, ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’, ‘মানুষ কী করে বড় হল’, ‘পিঠে হল ভাজা, বেড়ালের নাক বোঁচা’।

সুবর্ণ যুগের তলস্তয়, পুশকিন, চেখভ, গোগল, দস্তয়ভস্কি, তুর্গেনিভ থেকে রৌপ্য যুগের গোর্কি, মায়াকভস্কি, আখমাতোভা, কুপরিন, সায়েন্স ফিকশনকে কতটা মানবিক করে লেখা যায়, তার নিদর্শন বেলিয়ায়েভ— কে পৌঁঁছেননি আমাদের কাছে? বালক বয়সকে আদর্শিক ভিত্তি দেয়ার ব্যাপারে সচেষ্ট বেশির ভাগ বই, লেনিনের জয়গান, খেটে খাওয়া মানুষের জয়গাথা— শুধু এইটুকুতে তো থেমে ছিল না বইগুলো। আদর্শ বিতরণ অন্যতম উদ্দেশ্য হলেও বইগুলোয় জীবনের গতি ছিল সাবলীল, সর্বগ্রাসী। কিরগিজিয়ার, উরাল পর্বতমালার, ইউক্রেনের, স্তেপসের, তাজিক রূপকথা, লোককথা কী আসেনি অনূদিত হয়ে। বড় বড় রুশ সাহিত্যিকের সবাই শিশুসাহিত্যে কিছু না কিছু কাজ করে গেছেন।

 

৪. ছেঁড়া পাতা

গালিনা দেমিকিনার বই ‘বনের গান’। বেলোভেজস্কায়া পুশ্চা নামের একটি সংরক্ষিত বনের আশ্চর্য রোমশ ধূসর প্রাণী চুচা, হাতের পাতায় তার স্থান হয়, সেই প্রাণীটি মানুষের ভাষা বলতে পারে আধো আধো... মানুষের কাছে এসে খাঁচাবন্দি হয়ে সে দুদিন কিছুই খায় না, তারপর একদিন দেখা যায় দুধ খেয়ে তার গোঁফ ভিজে জবজবে। ঝড়বৃষ্টির একটি দিনে সে মানুষটিকে স্পষ্ট ডাকে— ‘খ্মা... মা’। বনের হিংস্র প্রাণী হত্যার আওয়াজে অভিমানে সে মানুষকে ছেড়ে চলে যায় বনে, যেখানে আখরোটের ঝোপ, রজনের গন্ধ, ঝরা পাতা, পচা কাদা আর জলাভূমির গন্ধ, লম্বাঠুঁটো স্নাইপ আর বুনোহাঁস, বনমোরগের ডাক, লালচে হরিণ যেখানে নুন চেটে খেতে আসে। বন গান গায়—

‘আমার আছে বেরি লাল লাল,

লালচে কাঠবেড়াল।

আছে শত নদীনালা,

এসে দেখো তার তরঙ্গমালা।

পুকুরে আছে মাছেদের পোনা,

তীরে এসে জল খায় হরিণের ছানা...

আছে মিষ্টি মিষ্টি বেরি,

সবুজ ঘাস আর অ্যাশের বন!’

এ গান যেখানে সত্য, (এই এতগুলো বছর পরে, এই হাজার হাজার মাইল দূরে) সেখানে আজ বয়ে চলে পশুর নদী। মানুষ তাকে হত্যা করতে সমুদ্যত। প্রিয় প্রাণী চুচা হারিয়ে যাওয়ার পর মানুষ তাকে খুঁজতে গেছিল অরণ্যে, সেখানে বৃহৎ বন তখনো মাথার ওপরে চারদিকে প্রতিধ্বনি হয়ে গেয়ে চলেছে— ‘আমি বাতাস, আমি ডাল, বাঁচব চিরদিন,/ আমি সবুজ, আমি পূর্ণ, আমি স্বাধীন।’ বলুন তো, এমন গল্প যে পড়ে শৈশবে, সে কি পৃথিবীকে ভালো না বেসে পারে?

‘পিতা ও পুত্র’ ভেরা পানোভার বই। শিশুর চোখে দেখা যুদ্ধে শহীদ বাপের বিধবা স্ত্রী, যুবতী মা জীবনের নিয়মে আরেকটি যুবা পুরুষকে পরবর্তীতে বিয়ে করেন। শিশু দেখে সকালবেলা বাসি চুলের বিনুনি খুলে দিতে দিতে মা আরেকটি পুরুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাসছেন। শিশু দেখে, সেই সংসারে মায়ের আরেকটি সন্তান আসার পরে তার নিজের স্থান সংকুচিত হয়ে গেল। মা আগের পক্ষের সন্তানকে আত্মীয়পরিজনের কাছে রেখে পাড়ি দিচ্ছে আরেক জীবনে, কিন্তু নতুন বাপের মন মুচড়ে উঠে বলছে— এ অন্যায়, এ ঘোর অন্যায়, একলাফে নেমে সে তুলে আনছে বয়স্কের মান-অভিমানময় তিক্ত অশ্রু মোচন করতে থাকা সেই সন্তানকে। 

উভচর মানুষকে ভুলতে পারে এমন পাঠক আমি দেখিনি কখনো। যেমন ভোলা যায় না এর রচয়িতা আলেক্সান্দর বেলিয়ায়েভকে। হূদয়ে কাব্য না থাকলে নাকি মানুষ গণিত ভালোবাসতে পারে না, বেলিয়ায়েভ জীবন দিয়ে হয়তো হূদয়ের সেই কাব্যকে সত্য করে গেছেন, আমার কাছে এ লেখক ডিডেলাসের পুত্র ইকারুসের মতন, মোমের ডানায় করে সূর্য অব্দি যাওয়া লেখক।

যক্ষ্মা রোগে ভুগতে ভুগতে রোগশয্যায় তিনি পড়ে ফেলেছিলেন এইচ জি ওয়েলস আর জুল ভার্ন, সেই পাঠ থেকে একদিন বেরিয়ে এসেছিল ‘উভচর মানুষ’-এর মতন কালজয়ী রচনা। দরিয়ার দানো ইকথিয়ান্ডর হারিয়ে যাওয়ার পরে তার সত্যিকারের বাপ যখন সমুদ্রতীরে খ্যাপার মতন চেঁচিয়ে বেড়াত ‘বেটা আমার!’, তখন আমাদের চোখ উপচে উঠত জলে। ইকথিয়ান্ডরের ফুসফুস হাঙরের, অথচ হূদয় দিয়েছিল সে ডাঙার মেয়ে গুত্তিয়েরেকে। মেয়েটিকে সে পায় না, তার বিয়ে হয়ে যায় অভব্য স্বার্থান্ধ একটি ইতর মানুষের সঙ্গে। এই লোকটিকেও ধরা দেয় ইকথিয়ান্ডর। শেষ অব্দি সে মুক্তি পেয়ে ফিরে যায় মহাসাগরে। প্রেম আছে, বিজ্ঞান আছে, পরাজয় আছে, আর আছে মানুষ। মানুষই সোভিয়েত সাহিত্যের শেষ গন্তব্য।

‘মালাকাইটের ঝাঁপি’ খুলে বসলে হারিয়ে যেতে হয়। উরাল পর্বতমালার খনি শ্রমিকদের মাঝে প্রচলিত উপকথা, পাভেল বাঝোভ এর সংগ্রাহক। পাঠকের কাছে এ বই চলচ্চিত্রের মতন। কুলোকে বলে, রুশ সাহিত্যের একটি বিশাল অংশ অচিকিত্স্য এবং ব্যর্থ প্রেমের উপাখ্যান। লোককথায়ও এর ছায়া পড়েছে বহুবার। তামা পাহাড়ের ঠাকরুন ভালোবেসেছে খনির মজুরকে, ঠাকরুন খনির মণিমাণিক্যের সব খবর জানে, সুস্বাস্থ্য-রূপ এবং আসন্ন ধনপ্রাপ্তির লোভকে ডিঙিয়ে সেই খনি মজুর ফিরে আসে গেরস্তঘরের প্রেমিকার কাছে। বিবাহসূত্রে সেই প্রেমিকা পায় এক ঝাঁপি গহনা, ঠাকরুনের নিশানা। স্তেপান যেখানে তামা পাহাড়ের ঠাকরুনকে দেখতে পায়, সেখানে অজস্র গিরগিটি, ‘কোনোটা সবুজ, কোনোটা ফিকে নীল, এমনকি গাঢ় নীল। কেউ কেউ মাটি বা বালি রঙের, মাঝে মাঝে সোনালি ছিটে। কতকগুলো জ্বলজ্বল করছে যেন কাচ কি অভ্র, কেউ কেউ আবার ঘাসের মতো ম্যাড়মেড়ে।’ উপকথায় এক অদ্ভুত বুড়ির কথা আছে, তার চোখ দুটি যুবতীর। আগুন অঙ্গার হয়ে উঠলে সেখান থেকে পাক দিয়ে বের হয় আগুনি-নাচুনি, যেন জ্যান্ত পুতুল, সাদা দাঁত, লালচে চুল, হাতে নীল রুমাল, অঙ্গারের ওপর পাক দিয়ে নেচে নেচে প্যাঁচা ডেকে উঠলে যে অদৃশ্য হয়ে যায়। ঘাসের মাঠে হালকা পায়ে এগিয়ে আসে একটি মেয়ে, তার ডান দিকে ভাসে সোনালি মেঘ আর বাম দিকে কালো। সত্য-মিথ্যা সবই ঘুলায়ে দেয়ার মতন জাদুর গল্প সব।

মার বাইজিয়েভের গল্প ‘হাসি’, ধূসর একটি বাড়িতে মরতে বসা বুড়ি স্বপ্ন দেখে— সে আর তার স্বামী বিস্তীর্ণ স্তেপভূমিতে খড়ের গাদায় শুয়ে আছে। তার গায়ে সদ্য কাটা তাজা ঘাসের গন্ধ, বুকে স্বামীর আদরের হাতখানি ফেলা, কালো চুল ঢেকে আছে তার নগ্নতা। মাথার ওপর বেজায় নীল আকাশ। দিগন্তে দুটি স্ফটিকস্বচ্ছ তারা, তাদের দুই ছেলে হাসান আর হোসেন, স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে মারা গেছে। এবার তারারা ছোট শিশু হয়ে নেমে এল ঘাসের মাঠে, আলোয় ছোটাছুটি করছে তারা, শিশুাদের ফরসা পাছা আর গোড়ালি ঝলক দিচ্ছে। বুড়ি বহুকাল হয় মৃত্যুকে অনিবার্য ও অপরিহার্য জেনে এসেছে, সে নিজেই অপেক্ষমাণ এই মৃত্যুর,  এই সুখস্বপ্ন তাকে অক্লেশে মৃত্যুর বাড়িয়ে দেয়া হাতে হাত রাখতে শিখিয়ে দেয়, যেন মৃত্যু সমাপ্তি নয়, পরিতোষ।

 

৫. বড় বেদনার মতো

পাভেলের মাকে মনে আছে, গোর্কির ‘মা’? প্রেম পায়নি জীবনে, হবু স্বামী পানশালার অন্ধকার দেয়ালের সঙ্গে জুতে তার স্তন পিষতে পিষতে ঘোষণা দিয়েছিল ‘ঘটক যাবে’, প্রেমহীন বয়ে যাচ্ছিল তার বিবাহ, বৈধব্য, বিচ্ছেদ। ছেলের প্রথম সোহাগের ডাকে কেমন করে উদ্গত হয়েছিল তার আকুলতা, কেমন করে বৃহত্তর মহত্তর জীবন ডাক দিয়েছিল তার সামান্য অপরিসর জীবনে, তার কান্নাটুকু ভারি চেনা আমাদের।

‘ছোট্ট গোল রুটি, চলছে গুটি গুটি’ সেই যে ময়দার রুটি, যাকে কেউ পেল না। সেই যে বাজে লোক দব্রিন্যা, যার কালো রক্ত মাতা ধরিত্রীও শুষে নেয় না। ‘ইয়েমেল্ল্যা’ কিংবা ‘ইভান’ অলস বলে, বোকা বলে ভাইদের গঞ্জনা খায় অথচ এই পৃথিবীর জাদুজগৎ তাদের খুঁজে পায়— ‘সিভকা বুর্কা জাদুকা লেড়কা চেকনাই ঘোড়া’ সামনে এসে দাঁড়ায়। কারা ছিল এই সভায় গুলবাজ। কারা নাচুনে। কারা গপ্পী? ঝলমলে বাজ? ভাসিলিসা? কারা ধুঁকছিল অন্ধকারে? কারা কাশছিল স্যাঁতসেঁতে ঘরে? কারা গাইছিল ফসল কাটার গান? কারা চাপা পড়ে গেল খনির অন্ধকারে? কারা দিয়েছিল হাতছানি? শিশুর জগেক কত মাত্রায় ঋদ্ধ করা যায়, বয়স্কের জগতের কত কিছু সেখানে অসমোসিস হয়ে ঢুকতে পায়, বয়স্কের তিক্ত-রিক্ত জগৎও কত পাওয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠতে পারে, তার অনন্য নমুনা এই অনুবাদ সাহিত্যমালা। আমাদের দুর্লভ ভাগ্য, আমরা সোভিয়েত আমলের রৌদ্ররেখায় গা সেঁকতে পেরেছিলাম।