সোভিয়েত বইয়ের বাংলা অনুবাদ সাধারণভাবে তরুণদের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বামপন্থী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রতি একটা ভালোবাসা তৈরি করেছিল। তবে এ লেখায় দেখা যাবে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কেবল কমিউনিস্ট ছিল না, এর ছিল ঐতিহ্যবাহী রুশ জাতীয়তবাদী মূল্যবোধের গভীর শিকড়। তাই এসব সাহিত্য কেবল সাধারণ কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচার করত না, বরং একই সঙ্গে সেগুলো মানুষের মনে স্লাভোফিলিয়া বা রুশোফিলিয়া কিংবা রুশপ্রীতি সৃষ্টি করত। সৈয়দ মুজতবা আলী সম্ভবত সোভিয়েত বইয়ের আগমন প্রসঙ্গে প্রথম লিখেছিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকায়, তিনি ১৯৫১-৫২ সালে কলাম লিখতেন। সেখানেই সোভিয়েত বই সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, কম দামে পাওয়ায় সোভিয়েত বই পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলে, শুধু সস্তা দরের আমেরিকান পেপারব্যাক ছাড়া আর সব ইংরেজি বই বাজারছাড়া হওয়ার দশা হয়েছিল। এখানে তিনি শিশুদের বইয়ের কথা উল্লেখ করেননি। তবে তার এ বক্তব্য আমলে নিয়ে সোভিয়েত শিশুতোষ বই ছড়িয়ে দেয়ার পদ্ধতিটা বোঝা যায়।
মুজতবা আলী মতাদর্শিক উদ্দেশ্যটা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে মিশনারিদের বিনামূল্যে বাইবেল সরবরাহের সঙ্গে সোভিয়েত স্টাইলের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। মিশনারিরা মানুষকে বাইবেল পড়তে উত্সাহিত করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ বিনামূল্যের বাইবেল নিয়ে আগ্রহী ছিল না। যখন তারা বিনামূল্যের বাইবেল সরবরাহ বন্ধ করে মূল্য নিতে শুরু করল, তখনো মানুষ বাইবেল পড়েনি। দাম একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে। মুজতবা আলী লক্ষ করেছিলেন যে, রুশরা অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে বই সরবরাহ করত, যা পাঠকদের এসব বই কিনতে আগ্রহী করে তুলেছিল। তারা কিন্তু বিনামূল্যে বা খুব বেশি কম বা মূল্যে বই দেয়নি, এ রকম হলে বইয়ের অবমূল্যায়ন হতো। অন্যদিকে দিল্লির বই বিক্রেতারা মুজতবা আলীকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, তারা পশ্চিমের তুলনায় সোভিয়েতের বইয়ে অনেক বেশি কমিশন পেতেন। মুজতবা আলী তখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন।
বেশির ভাগ বই ছিল মার্ক্স, লেনিন ও স্ট্যালিনের (স্ট্যালিন তখন জীবিত) রাজনৈতিক লেখাজোকা। তবে তার মাঝেও কিছু ক্ল্যাসিক পাওয়া যেত। এ নিয়ে অভিযোগ ছিল মুজতবার, তিনি বলেছেন রাজনৈতিক বই আর ক্ল্যাসিকের অনুপাত ১০০: ১। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক ১০০ বই বিক্রির বিপরীতে উনিশ শতকের একটি রুশ ক্ল্যাসিক বিক্রি হতো। তিনি দেখেছিলেন লেরমনটোভের একটি বই পাওয়া যায় মাত্র দেড় টাকায়, যা যথেষ্ট লোভনীয়; কাগজ, বাঁধাই ও ছাপা সবই ছিল আকর্ষণীয়।
সোভিয়েত বইয়ের একজন উল্লেখযোগ্য বাংলা অনুবাদক অরুণ সোমের একটি সাক্ষাত্কার নিয়েছেন বর্তমান লেখক। অরুণ সোম এ সাক্ষাত্কারে নিশ্চিত করেছেন যে, শুরুর দিকে বেশির ভাগ সোভিয়েত বই ছিল মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাঠানো বইগুলোর একটা সামান্য অংশ থাকত ক্ল্যাসিক। কিন্তু ধীরে ধীরে উনিশ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের ক্ল্যাসিক ও শিশুসাহিত্যের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হয়। ১৯৮২ সালে রাদুগা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ উদ্যোগ শীর্ষে পৌঁছে। রুশ শব্দ রাদুগা অর্থ রংধনু। এমন নামকরণ করা হয়েছিল সম্ভবত লালের বাইরে অন্য রঙগুলোকেও স্বীকৃতি দেয়ার জন্য। এসব রঙ লালের সঙ্গে কোনো ঝামেলা ছাড়াই সমগ্রকে ধারণ করে অবস্থান করছে। রাদুগা ছিল সম্মতি আদায়ের একটি সামর্থ্যের প্রকাশ, ফলে হেজিমোনির সৃষ্টি। রাদুগা ছিল একটি রঙিন বিষয়, এখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তা করার একটি পরামর্শ ছিল। রাদুগা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৮২ সালে মূলত ক্ল্যাসিক ও শিশুসাহিত্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে।
সোভিয়েত আমলের কর্তৃত্ববাদী শাসন এক অর্থে জার আমলেরই ধারাবাহিকতা। ক্যাটরিনা ক্লার্ক (দ্য সোভিয়েত নভেল: হিস্ট্রি অ্যাজ রিচুয়াল) এ নিয়ে লিখেছেন:
রুশ সাহিত্যে যেকোনো প্রকাশভঙ্গিতেই মতবাদ কোনো অপরিচিত বিষয় নয়... মতাদর্শ সরকার ও সাহিত্যের মধ্যকার সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। জারের আমলের তুলনায় সোভিয়েত আমলে এ সম্পর্ক বেশ ভিন্ন চেহারা নেয়। যদিও বেশির ভাগ ভিন্নতার ব্যবধান মাত্র এক ডিগ্রি। উনিশ শতকের অনেক লেখক যেমন— গনশারভ, সেন্সর দলের হয়ে কাজ করতেন। দস্তয়ভস্কি ছিলেন জারের উপদেষ্টা পোবেদোনোসেত্সভের ঘনিষ্ঠ এবং ১৮৩০-এর দশকে তিনি এ কুখ্যাত বুলগেরিয়ান সরকারের চর হিসেবে কাজ করেছেন। এভাবে পুরনো সাম্রাজ্যে এমন অনেক লেখক ছিলেন, যারা সরকারি মতাদর্শ ধারণ করতেন এবং উনিশ শতকে সরকার নিজেই সাহিত্যে নজরদারি করত।
সোভিয়েত বইয়ে এক ধরনের পৌরাণিক গঠন ছিল। মহান বিপ্লব, মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ, জায়ান্ট লিপ ফরোয়ার্ড, কমিউনিজমের পথে বিষয়গুলো নিয়ে সেকুলার মিথ সোভিয়েত বইগুলোয় জায়গা পেত। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক রিয়েলিজম নতুন ধরনের লেখার জন্য জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিল। কমিউনিস্ট মতাদর্শের বজ্রমুষ্ঠি শিথিল হয়ে আসছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বীর পূজার যুগ; সাহসিকতা, ঝুঁকি গ্রহণ, ত্যাগ, অ্যাডভেঞ্চার, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম— এসবই ছিল সোভিয়েত সাহিত্যের মূল উপাদান। রূপকথা ও লোকগাথার অনুরূপ উপাদানের ওপর জোর দেয়া হয়েছিল, অনুকরণযোগ্য নায়কের আদর্শ তৈরি করা হচ্ছিল। সবকিছুই রাষ্ট্রের মতাদর্শিক ছাঁচের মধ্যে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ করেই জাতির আদর্শিক ডাকে শিশুদের রূপকথার জগৎ জেগে উঠল এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় মিথের পুরোভূমি হয়ে উঠল। এখানেই আমরা দেখতে পাই যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে শিশুসাহিত্যের বেশ কয়েক ধরনের কাজ ছিল। এটা মিথের একটা সংগ্রহশালা হিসেবে কাজ করেছে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের পরিণত দুনিয়ার জন্য কাজের। একই সঙ্গে এটা মতাদর্শিক শিক্ষা দেয়ার একটা কার্যকর সুপ্ত অস্ত্র হিসেবেও কাজ করেছে। বেন হেলম্যান উল্লেখ করেছেন:
১৯১৮ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রাভদায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘ভুলে যাওয়া অস্ত্র’। মাত্র তিন মাস আগে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করেছে। সমাজকে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে নতুন ছাঁচে গড়ে তোলার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবার ছিল শিশুসাহিত্যের পালা। মূল বক্তব্যটি লেনিন দিলেন; তিনি বলেছিলেন, ‘তরুণদের শিক্ষাদান, প্রশিক্ষণের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে তাদের কমিউনিস্ট নীতিতে শিক্ষিত করা।’ এল করমচি তার ‘ভুলে যাওয়া অস্ত্র’ প্রবন্ধে বলেছেন, নতুন মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিশুসাহিত্য এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

রূপকথা ও অন্যান্য শিশুসাহিত্যকে আকর্ষণীয় করতে দরকার হয় অলঙ্করণ। শুরু থেকেই শিশুদের জন্য গ্রাফিক আর্টের ব্যবহার ছিল সোভিয়েতের উল্লেখযোগ্য কৌশল। এভগেনি স্টেইনারের স্টোরিজ ফর দ্য লিটল কমরেডস মতাদর্শিকভাবে শিশুদের শিক্ষিত করতে সোভিয়েত ইউনিয়নে শুরুর দশকগুলোয় (১৯২০ ও ১৯৩০) ‘বৈপ্লবিক’ আর্টের ব্যবহার এবং সেসময় আগ্রসর শিল্প ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের মধ্যকার কৌতূহলোদ্দীপক মিলনকে অনুসন্ধান করেছে। অসাধারণ সব স্কেচ, চিত্রকর্ম, ছবি, অলঙ্করণ সোভিয়েত ইউনিয়নের শিশুতোষ ও বড়দের বই সজ্জিত করেছিল। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ইতিহাকে চিত্রিতরূপে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল শিশু এবং একই সঙ্গে বয়স্ক পাঠকদেরও সহজ বোধগম্যতা। এর একটা ভালো উদাহরণ, রুশ বিপ্লব কী ঘটেছিল? এটা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। রুশ বিপ্লব নিয়ে একটি কফি টেবিল বইঅ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি অব দ্য গ্রেট অক্টোবর সোস্যালিস্ট রেভল্যুশন: ১৯১৭ মান্থ বাই মান্থ গ্লসি পেপার ও রয়্যাল সাইজে প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮৭ সালে (রুশ বিপ্লবের ৭০তম বার্ষিকীতে)। এ বইয়ে সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করে শিশুদের আঁকা কিছু চিত্রকর্ম ব্যবহার করা হয়েছিল। সোভিয়েত প্রকাশনায় শিশুদের গভীর গুরুত্বের বিষয়টি এ উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়।
১৯৭৬ সালে উত্পল দত্তের নাটক লেনিন কোথায়? যাত্রা হিসেবেও মঞ্চায়িত হয়েছিল। এটি ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের আগের কয়েক মাসের ঘটনাবলি নিয়ে একটি রাজনৈতিক থ্রিলার। দত্ত এ নাটকে একটি দৃশ্য জুড়েছিলেন, যেখানে দেখানো হয়েছিল লেনিন রাজলিভে পলাতক এবং সেখানে তিনটি কৃষক সন্তানকে তিনি গল্প শোনাচ্ছেন। এখানে আবারো শিশুদের গুরুত্বটি ফুটে ওঠে, মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তেও লেনিন শিশুদের সময় দিচ্ছিলেন। পরবর্তীকালে পুলিশ যখন সেখানে অভিযান চালায়, তখন নাটকীয়ভাবে একটি শিশু লেনিনের জীবন বাঁচায়। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এখানে লেনিন ও শিশুদের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, যা সোভিয়েত সাহিত্য— বড়দের ফিকশন ও শিশুতোষ সাহিত্য উভয়কেই দারুণভাবে প্রেরণা দিয়েছে। ক্যাটেরিনা ক্লার্কের মতে, সোভিয়েত মিথ অব সাবজেক্টিভিটির মূল তৈরি করেছে দ্বৈত গঠন— এটা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা ও সচেতনতার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। উত্পল দত্তের নাটকেও সোভিয়েত সাহিত্যের এ রীতি ফুটে উঠেছে— শিশুরা এখানে স্বতঃস্ফূর্ততা আর লেনিন হচ্ছেন সচেতনতা। তবে যেমনই হোক, এ দ্বন্দ্বকে বাখতিনের ডায়ালজিক দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ এখানে ফলাফল সবসময়ই পূর্বনির্ধারিত থাকে, বরং একে বলা যায় সিউডো-ডায়ালজিক।
ক্লার্ক অস্ত্রোভস্কির উপন্যাসটিকে (ইস্পাত) ‘সোভিয়েত রিয়েলিজমের সর্বকালের একটি ক্ল্যাসিক’ বলে বিবেচনা করেন। বইটির বাংলা সংস্করণের পেছনের অংশে বলা আছে যে, বইটি ৪৮টি ভাষায় অনুবাদ এবং ৪২টি দেশে প্রকাশিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে বইটির ৪৯৫টি সংস্করণ হয়েছে, বিক্রি হয়েছে দেড় কোটি কপি। সোভিয়েতের তরুণ কমিউনিস্ট লিগের সদস্য বা কমসোমলদের ভোটে উপন্যাসটি সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। অস্ত্রোভস্কি তার উপন্যাসে কমসোমলের জয়গান করেছেন। বিপ্লবের পরের বছর ১৯১৮ সালের ২৯ অক্টোবর কমসোমল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কমসোমল ছিল সর্বরুশীয় আবশ্যিক সংগঠন। ১৪ থেকে ২৮ বছর বয়সী যে কেউ এ সংগঠনের সদস্য হতে পারতেন। অস্ত্রোভস্কির উপন্যাসটি কমসোমলের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম খণ্ড ১৯৩২ ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৩৪ সালে। এটা ছিল একটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস এবং মূল চরিত্র পাভেল কোরচাগিন ছিলেন অস্ত্রোভস্কি নিজেই। একজন শিশু হিসেবে কোরচাগিন ছিলেন কাঁচা, প্রকৃতির স্বাধীন শক্তি, এটা হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা। বড় হয়ে কোরচাগিন কমিউনিস্ট মতাদর্শের সংস্পর্শে আসেন। জীবনের বিভিন্ন পর্বে তিনি অনেকের দ্বারা বলশেভিক পথ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারেন, এভাবে সচেতনতার পথে তার যাত্রা চলে। এ উপন্যাসের সাফল্যের পেছনে বেশকিছু কারণ ছিল। অস্ত্রোভস্কি ও উপন্যাসের নায়ক কোরচাগিন উভয়ই প্রলেতারিয়েত। তারা বিপ্লবের সফল যাত্রাকে দেখিয়েছেন। ক্লার্ক এ উপন্যাসকে ‘স্ট্যালিনীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংজ্ঞাবাচক’ বলে বিবেচনা করেছেন। এটা ‘গৃহযুদ্ধের তত্ত্ব, সংগ্রাম, নায়কসুলভ বীরত্ব, বলশেভিক প্রতিজ্ঞার উপন্যাস এবং সর্বোপরি এ উপন্যাস বয়সের চাহিদা সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ এতে অনুসরণযোগ্য একজন নায়কের জীবন পাওয়া গেছে।’ ক্লার্কের কথায়, ‘কোরচাগিন সোভিয়েত সাহিত্যের নায়ক, অনুসরণীয় চরিত্র।... স্বতঃস্ফূতর্তা ও সচেতনতার শক্তির মধ্যে যে সমস্যাজনক দ্বন্দ্ব, তা প্রতীকীভাবে সমাধান করেছেন কোরচাগিন।’ তবে ক্লার্ক উপস্যাসের বিয়োগান্তক সমাপ্তিকে ধরতে পারেননি। বিপ্লব তার সন্তানদের খেয়ে ফেলে, ইতিহাসে বিভিন্ন বিপ্লব এর সাক্ষী দেবে।
বাঙালিরা এসব জানে। ইস্পাতের সাফল্যের পেছনে দুটো বিষয় ছিল। দুনিয়া কাঁপানো একটি বিপ্লবের সত্যিকার অভিজ্ঞতা এতে পাওয়া যায় (যা পাঠক অনুভব করতে পারেন)। আরেকটা হলো বিপ্লব তার অনুসারীদের কাছ থেকে যে বিরাট মূল্য গ্রহণ করে, তা এ বইয়ে দেখা যায়। বইটি বিশ শতকের বাঙালি পাঠকদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে গেছে। কারণ রক্তপাত, মৃত্যু ও উত্তপ্তকাল তাদের অপরিচিত নয়।
নির্দিষ্ট এজেন্ডাসহ শিশুদের জন্য নিয়মিত রূপকথা প্রকাশিত হতো। অন্যদিকে কীভাবে সন্তানদের মানুষ করতে হবে, সেটাকেও বৈজ্ঞানিক মার্ক্সবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞানে উন্নীত করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে একটি বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে ছেলেমেয়ে মানুষ করা প্রসঙ্গে। বইটির ইংরেজি সংস্করণের শিরোনাম কিন্তু আরো সিরিয়াস— ডায়ালগ অন এডুকেশন। বইটির লেখক অজ্ঞাত, তাই ধরে নেয়া যায় যে, এটা খোদ সোভিয়েত রাষ্ট্রের লেখা। আমরা জানি কেবল বইটির বাংলা অনুবাদকের নাম। বইটি অভিভাবকদের জন্য একটি ম্যানুয়াল, কিন্তু বিস্ময়করভাবে এতে দেখা যায় ঐতিহ্য, পিতৃতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও রুশ চেতনা। সমাজতান্ত্রিক ধারণাগুলো ঐতিহ্যের মূল্যের সঙ্গে মিশে গেছে। বইয়ের শুরুতেই আছে রুশ শিশুদের আঁকা কিছু চিত্রকর্ম, সঙ্গে সংক্ষিপ্ত একটা লেখায় অভিভাবক ও শিশুদের অতীত শিল্প ও দক্ষতা নিয়ে গৌরবান্বিত হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের সেরা সব বিষয়কে সংরক্ষণের পরামর্শও দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ বইয়ে বলা হয়েছে, ‘মাছের দরকার পানি, পাখির দরকার আকাশ, পশু-পাখির প্রয়োজন বন, পর্বত। আর মানুষের প্রয়োজন মাতৃভূমি।’ এখানে আমরা জাতীয়তাবাদের একটি দৃঢ় উপস্থিতি দেখি, যা আগে থেকেই ছিল। এ ম্যানুয়ালের অনত্র লেখা হয়েছে, ‘শিশুদের জন্য লেখা বইয়ে একজন ইতিবাচক নায়ক থাকা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা তাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।’ রূপকথাগুলো ছিল মূলত প্রশিক্ষণ, যেমন একটি মেয়ে শিশু সিনডারেলার কাহিনী থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। সিনডারেলা প্রচুর কাজ করত, কিন্তু তার পরও সে সুন্দর ছিল। এখানে সিনডারেলা প্রলেতারিয়েন আদর্শকে ধারণ করে, অর্থাৎ পরিশ্রমকে স্বাগত জানাতে হবে। অন্যদিকে সুখী সমাপ্তি সোভিয়েত কমিউনিজমের ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
অন্যদিকে, ছেলেমেয়ে মানুষ করা প্রসঙ্গে বইটিতে দেখা যায় লিঙ্গ স্টেরিওটাইপ। এখানে মা-দাদিরা মেয়েশিশুদের ঘরের কাজ শেখাচ্ছেন, অন্যদিকে বাবারা ছেলেদের শক্ত সমর্থ হওয়া শেখাচ্ছেন। এটা ঐতিহ্যবাহী পুরুষতান্ত্রিক রাশিয়া, যাকে শক্ত হতে হবে। জেন্ডার স্টেরিওটাইপ রাশিয়ায় গভীরভাবে বিস্তৃত। আমরা স্মরণ করতে পারি যে, রাশিয়ায় কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। মেয়েদের ভোটাধিকার দেয়া প্রথম রাষ্ট্রগুলোর একটি হলেও সোভিয়েত সমাজের ওপরের স্তরে খুব বেশি নারীকে দেখা যেত না।
ক্যাটেরিনা ক্লার্ক স্ট্যালিন জমানা নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন যে, সে সময় “সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাচীন ধারণার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। সামাজিক আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে সেগুলো রক্ষা করা হয়েছে। সোভিয়েত সমাজের নেতারা হয়ে ওঠেন পিতা (স্ট্যালিন হন কুলপতি); তৈরি হয় জাতীয় নায়ক, আদর্শ ‘পুত্র’; রাষ্ট্র হয়ে ওঠে পরিবার।” স্ট্যালিনের আমলে সমাজতান্ত্রিক পিতৃভূমির ডাকে স্পষ্টভাবে জাতীয়তাবাদের চিহ্ন দেখা যায়। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দশকের পর দশক ধরে সোভিয়েত প্রচারণামূলক সাহিত্যে সুপ্ত জাতীয়তাবাদের ধারা অপরিবর্তিত ছিল। ইস্পাতে দেখা যায়, পাভেল কোরচাগিন সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষদের সঙ্গে একটি সমাজ গড়ে তুলেছেন। এখানে সব নেতাই একজন পিতার বিকল্প। শিক্ষাগ্রহণকারী যেকোনো তরুণই পুত্র। এই শিক্ষার্থী পরিণত হতে হতে একসময় নিজেই পিতায় পরিণত হন। তখন তিনি নিজেই অন্যদের উত্সাহ দেন এবং কিংবদন্তি রেখে যান। এটাই পাভেলের চূড়ান্ত গন্তব্য।
সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার ইসলামী চরিত্র সোভিয়েত নীতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে একসময় সমাজতন্ত্রকে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। এটা ছিল মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি অংশ। কখনো কখনো এ কৌশল সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিণত হয়েছিল। কারোর মনে হতেই পারে যে, মধ্য এশিয়াকেন্দ্রিক ফিকশনগুলো (চিঙ্গিজ আইতমাতভের উপন্যাস) সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বাংলায় প্রকাশ করা হয়েছিল মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কৌশল হিসেবে। আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের অভাবে এটা বলা কঠিন যে, মধ্য এশিয়া-বিষয়ক বইগুলোর বাংলা অনুবাদ ইংরেজি অনুবাদের তুলনায় বেশি হয়েছিল কিনা। তা সত্ত্বেও বলা যায়, ইসলামী উপাদানযুক্ত কাহিনী নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানুষের কাছে পছন্দ হয়েছিল। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশিত সাহিত্য বাংলাদেশের পাঠকদের প্রিয় হলেও সেগুলোয় কদাচিৎ মুসলিম চরিত্র বা প্রেক্ষাপট দেখা যায়। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত রূপকথার সংকলন কোন সে দেশের কোন সাগরের পাড়ে গ্রন্থে মুসলিম সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে লেখা বেশকিছু গল্প দেখা যায়, যদিও গল্পগুলোর লেখক ছিলেন সোভিয়েত লেখকরাই। এ ধরনের গল্প পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় ছিল (মুসলিম উপাদান এখানে গল্প গ্রহণে পাঠকের মনোভাবকে বাধাগ্রস্ত করেনি), তবে পূর্বাংশে অধিকতর উত্সাহের সৃষ্টি করে থাকবে। সেখানে ততদিনে প্রেসিডেন্ট এরশাদ দেশকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছিল। কোন সে দেশের কোন সাগরের পারে রূপকথার সংকলনটিতে আলেক্সান্ডার কুপরিনের কিসমেৎ নামে একটি গল্প আছে, যা মধ্য এশিয়া থেকে অনেক দূরের একটি ইসলামী ভূখণ্ডের কাহিনী। এ গল্পে আছে সাগরতীর, সমুদ্রযাত্রা আর এক বাদশাহের গল্প। একজন মুসলিম বণিক এ গল্পের নায়ক। লিও তলস্তয়ের একটি গল্প আছে ন্যায়বিচারক নামে, যেটি রচিত হয়েছে আলজেরিয়ার প্রেক্ষাপটে। লেরমন্টোভের ‘আশিক কেরিব’ গল্পটিও এ সংকলনে স্থান পেয়েছে। গল্পটি একটি তুর্কি রূপকথা।
বাংলা অনুবাদ হওয়া সোভিয়েত রূপকথার ধারাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তারা রূপকথার চেয়ে লোককথাকে বেশি গুরুত্ব দিত। তারা অলৌকিক গল্পকে শক্তভাবে নিরুত্সাহিত করত। সোভিয়েত সাহিত্যে কোনো ভূতের গল্প পাওয়া যাবে না।
বিপ্লবের অব্যবহিত পরে, ১৯২০-এর দশকে রূপকথা সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছিল। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি বিভিন্ন কাজে লাগাতে রূপকথাকে পুনর্বহাল করা হয়। বিষয়টি মারিনা বালিনা তার পলিটিসাইজড ম্যাজিক গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। এ বইয়ে তিনি সোভিয়েত রিয়ালিজম ও রূপকথার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উই আর অ্যাগেইনস্ট দ্য ফেয়ারি টেল শিরোনামে একটি পলিমিক্যাল লেখা ১৯২৮ সালে যৌথভাবে রচনা করেছিলেন শিশুশিক্ষা বিষয়ে কাজ করা সোভিয়েত ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী। আরো বেশ কিছুদিন রূপকথা সোভিয়েত মতাদর্শের কাছে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে ছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নে শেষ পর্যন্ত রূপকথার পরিবর্তে লোককথা শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা বাংলা বইগুলোয় রূপকথা শিরোনামটি সতর্কভাবে এড়িয়ে চলা হতো। ফেয়ারিটেলের বাংলা হিসেবে ব্যবহূত রূপকথা শব্দটির পরিবর্তে লেখা হতো উপকথা। এটা ছিল লোককথার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা একটা নতুন অস্পষ্ট শব্দ।
১৯২০-এর দশকে সমালোচনা আর চাপের মধ্যে থাকা রূপকথা ১৯৩০-এর দশকে ফিরে আসে। তবে এজন্য তার নাম ও গঠনে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যেখানে লোককথা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হবে ম্যাক্সিম গোর্কির বইয়ের বাংলা অনুবাদের দিকে লক্ষ করলে। বইটির বাংলা শিরোনাম ছিল ইতালির রূপকথা কিন্তু বইটির ইংরেজি নাম টেলস অব ইটালি। এ রূপকথা শব্দটি ব্যবহার করা ছিল একটি কৌশলী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। টার্মটির সরলতা দিয়ে তরুণ পাঠক ও তাদের মা-বাবার বইয়ের তাকে প্রবেশই ছিল উদ্দেশ্য। গল্পগুলো ছিল মূলত তত্কালীন ইতালীয় শ্রমিকদের জীবন নিয়ে (১৯০৬ থেকে ১৯১৩ সময়কালে ইতালি অবস্থানকালে গোর্কি এগুলো লিখেছিলেন)। প্রথাগত রূপকথার সঙ্গে এসব গল্পের কোনো সম্পর্ক ছিল না। নামকরণের এ পরিবর্তন ছিল সোভিয়েতের কৌশলী রাজনীতির একটি উদাহরণ। ক্যাটেরিনা ক্লার্ক সোভিয়েত ইউনিয়নে রূপকথার রাজনৈতিক ব্যবহারকে একটি বাক্যে পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘নিজেদের নায়কোচিত বর্ণনায় দরকার হয় অবিশ্বাস্য কিছু বিষয়ের যেমন— রূপকথা।’
সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত প্রকাশনা শিল্প উন্নত মানের শিশুসাহিত্য তখনো অব্যাহতভাবে তৈরি করেছে, তা তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। তবে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়ার শিশুসাহিত্য টালমাটাল অবস্থায় আছে। মারিনা বালিনা তার রাশিয়ান চিলড্রেনস লিটারেচার অ্যান্ড কালচারে লিখেছেন, ‘সোভিয়েত আমলে রাষ্ট্র শিশুসাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অর্থ বরাদ্দ উধাও হলো, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত শিশু সংস্কৃতি হারিয়ে গেল। শিশুসাহিত্য প্রকাশ ও বিপননের অধিকার চলে গেল মুক্তবাজারের হাতে।’
শিশুসাহিত্য আর রাষ্ট্রের কোনো শক্তিশালী ইনস্টিটিউট নয়, এটা মেনে নিতে রাশিয়ার অভিভাবকদের কষ্ট হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচকরা নতুন শিশুসাহিত্যের অত্যন্ত নিম্নমান নিয়ে শঙ্কিত। তারা নিয়মিতভাবে সংবাদমাধ্যম ও জার্নালে এ বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
সোভিয়েত বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তা ও আবেদন কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেটা বলার জন্য সময়টা এখনো অনেক নবীন। তবে সোভিয়েত বুকস ইন বেঙ্গলি নামের ব্লগে সাধারণ পাঠকরা তাদের যে সরল ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাভাষী কয়েক প্রজন্মের পাঠকের সোভিয়েত বইয়ের প্রতি আকর্ষণের সাক্ষী। এমনকি এখন এটাও দেখা যাচ্ছে যে, অনেক সাইট এ ব্লগ থেকে বই চুরি করে অনেকে নিজেদের ডোমেইনে যুক্ত করে নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
বর্তমান গবেষক যখন তার বাসায় প্রথম ইন্টারনেট সংযোগ পেয়ে (তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) গুগলে গিয়ে প্রথম যে অনুসন্ধানটি করেছিলেন, তা হলো সেভোলোদ নেসতাইকো। এটা ২০০৫ সালের ঘটনা, নেসতাইকো তখনো জীবিত। কিন্তু তখন তার সম্পর্কে ইন্টারনেটে ইংরেজি ভাষায় একটি শব্দও ছিল না। উইকির প্রবন্ধটাও ছিল না। এটা ছিল সোভিয়েত বইয়ের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের সংযোগের মাত্রা।
রুশের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক অনেক পুরানো। এ সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে বাঙালি বিপ্লবীদের রুশ সহায়তা চাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা এখনও হয়নি। বাংলায় সোভিয়েত শিশুতোষ বই নিয়ে গবেষণা একটি বিরাট ক্ষেত্র। প্রথম প্রকাশের ইতিহাস কেমন ছিল? কীভাবে এটি বিকশিত হয়েছে? রুশ ভাষায় মূল রচনা প্রকাশের ইতিহাস কেমন ছিল? কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা কীভাবে অনুবাদের জন্য বই বাছাই করতেন?
আমরা দেখেছি, অনুবাদের জন্য বাছাইকৃত কিছু জনপ্রিয় বই আগেই সিনেমায় বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, যেমন— অ্যামফিবিয়ান ম্যান, টু টরিডোরস ফ্রম ভাসুকভকা, বয় বাই দ্য সি, লাইটস অন দ্য রিভার। এসব বই অনুবাদের পেছনে হয়তো তাদের সেলুলয়েডের সাফল্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
কমিউনিষ্ট মতাদর্শের বীজ বপনে সোভিয়েত বইয়ের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে জাতীয়তাবাদী স্রোত বয়ে চলেছিল যা আঁকবাঁকা পথ বেয়ে আজকের পুতিনের রাশিয়ায় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটিয়েছে সেটা নিয়েও যথেষ্ট চিন্তা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
লেখকের দ্য নেশন ইন ট্রান্সলেশন ইন দ্য সোভিয়েত বুকস ইন বেঙ্গলি ফর চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস শিরোনামের ইংরেজি প্রবন্ধের সংক্ষেপিত ভাষান্তর।
অনুবাদ : রশিদ আহমেদ





