১৭ এপ্রিল, ২০১৪— লাতিন আমেরিকার প্রধান কণ্ঠস্বর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস প্রয়াত হলেন, তখন তাঁর বয়স ৮৭ বছর। তাঁর চেয়ে আট মাসের বড় দুনিয়া কাঁপানো এক ক্যারিবিয়ান, কিউবান রেভ্যুলুশনের প্রধান স্থপতি ফিদেল কাস্ত্রো সাদা ও হলুদ ফুলের নৈবেদ্য পাঠালেন বন্ধুর জন্য। তাতে লেখা— ‘টু অ্যা ডিয়ার ফ্রেন্ড।’

১৯৫৯ সালে বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো যখন কিউবার শাসনভার গ্রহণ করলেন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন। বিপ্লব দিয়ে তাঁদের সাড়ে পাঁচ দশকের দীর্ঘ ও ‘বিতর্কিত’ বন্ধুত্বের সূচনা। কাস্ত্রোর মতো দাড়িওয়ালা যে বিপ্লবীরা একনায়ক বাতিস্তার পতন ঘটিয়েছেন, সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের সাক্ষাত্কার নিতে ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে হাজির হলেন। মানসিক ঐক্য বন্ধুত্ব স্থাপন ও রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে— ফিদেল ও গ্যাবোর ক্ষেত্রে এই মানসিক ঐক্য কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন রয়েই গেছে। আরেক লাতিন আমেরিকান, একদা ফিদেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারিয়ো বার্গাস য়োসা এ বন্ধুত্বকে বরাবরই বাঁকা চোখে দেখেছেন এবং দুজনের পারস্পরিক স্বার্থের বন্ধুত্ব বলে মনে করেছেন।

মার্কেস একসময় কিউবার বার্তা সংস্থা প্রেনসা ল্যাটিনার বোগোটা ও নিউইয়র্ক অফিসে কাজ করেছেন। সে সময় ফিদেলের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া নিউইয়র্কে এ চাকরিটি পাওয়ার কথা নয়।

মার্কেসের মৃত্যুর পর কিউবা সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো ফিদেলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের কথা বারবার প্রচার করেছে। আমৃত্যু ফিদেলের সঙ্গে গ্যাবোর বন্ধুত্বের তীব্রতা একই রকম ছিল— এ দাবি কিউবার। কিন্তু একনায়কের সঙ্গে বন্ধুত্ব বেমানান ও অসমীচীন বলে গ্যাবোর অনেক বন্ধু মনে করতেন। বাস্তবে দুজনের মধ্যে মতৈক্য যেমন ছিল, মতানৈক্যও কম ছিল না। দুটির বাড়াবাড়ি রকমের বর্ণনা গণমাধ্যমে এসেছে। ফিদেল একবার বলেছেন, তাঁর ভেতরে রয়েছে শিশুর ভালোত্ব— দ্য গুডনেস অব অ্যা চাইল্ড।

ফিদেল তাঁকে অত্যন্ত মেধাবীও মনে করতেন। তাঁর ভাষায়, গ্যাবো একজন মহাবৈশ্বিক মেধাবী— কসমিক ট্যালেন্ট। তিনি আরো বলেছেন, গ্যাবো হচ্ছেন ‘আগামীকালের মানুষ’। ‘তাঁকে ধন্যবাদ দিই কারণ সে কথা বলার জন্য তিনি এ জীবনযাপন করেছেন।’

২০০৮ সালে গ্যাবো ও তাঁর স্ত্রী মার্সিডিজকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় তিনি বলেছেন, “দশক দশক ধরে লালিত সম্পর্কের ফলই হচ্ছে ‘আমাদের বন্ধুত্ব’— এটা গড়ে উঠেছে শত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে, যা আমার জন্য ছিল বড়ই আনন্দের।”

হাভানায় গ্যাবোর একটি থাকার জায়গা ছিল, যেখানে মধ্যরাতে একটুখানি আলাপ জমাতে ফিদেল মাঝে মধ্যে ঢুঁ মারতেন।

গ্যাবো কথনপ্রিয় ফিদেল কাস্ত্রোর ক্রিয়াপদের প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মোহিত করার শক্তির প্রশংসা করেছেন।

মার্কেজ বলেন, যখন ফিদেল কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তিনি কথা বলেই বিশ্রাম নিতেন। দুজনের সম্পর্কের নৈকট্য তাঁর ব্যাপারে অন্য লেখকদের সন্দিহান করে তুলেছিল।

একটি কিউবান ফেরি হাইজ্যাক করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথে জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। হাইজ্যাকাররা ধরা পড়ে, ২০০৩ সালের ১১ এপ্রিল হাভানায় তাদের ফাঁসি দেয়া হয়। এই ফাঁসি রদ করার জন্য ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’-বিরোধীরা আবেদন জানান, ক্যাপিটাল পানিশমেন্টবিরোধী মার্কেসকেও হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন। মার্কিন কথাসাহিত্যিক সুসান স্যানটা মার্কেসের নিষ্ক্রিয়তার নিন্দা করেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে মার্কেসের সখ্যও অনেকে ভালোভাবে নেননি। মার্কেস ১৯৯৪ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর দূত হিসেবে ক্লিনটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অভিবাসন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন; সন্ত্রাস দমনে কিউবার সহযোগিতার আশ্বাস-সংবলিত ফিদেল কাস্ত্রোর পত্র ক্লিনটনের কাছে হস্তান্তর করেছেন।

মারিও বার্গাস য়োসা আরো এক ধাপ এগিয়ে মার্কেসকে বলেছেন ‘রাজগণিকা’। য়োসার মন্তব্যটি আক্রোশজনিত বলেই মনে করা হয়— এর আগে নারীঘটিত বিবাদে য়োসা মার্কেসকে ঘুষি মেরে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। ১৯৫৩-এর জুলাই বিপ্লবের (২৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট বাতিস্তাকে উত্খাতের ব্যর্থ উদ্যোগ) অপরাধে ফিদেল যখন বিচারের মুখোমুখি, তিনি আদালতকে বলেছেন, ‘আপনারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেন, এতে কিছুই এসে যায় না। ইতিহাস আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করবে।’

এই বিপ্লবীর মৃত্যুসংবাদ শুনে মারিও বার্গাস য়োসা বললেন, কোনো ইতিহাসই তাঁকে নির্দোষ বলবে না। তিনি আশা করেন, কিউবার এই একনায়কের মৃত্যু কিউবাকে উন্মুক্ত করতে পারে, সহিষ্ণুতা ও গণতন্ত্র অর্জিত হতে পারে।

‘সেই বিষাদময় ৯ এপ্রিল, ১৯৪৮ গ্যাবো আর আমি— দুজনেই বোগোটায় ছিলাম— সেদিন গাইতান নিহত হন। আমাদের দুজনের একই বয়স— ২১ বছর; আমরা একই বিষয়ের সাক্ষী, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমাদের পাঠ্যবিষয় একই— আইন। আমরা এভাবেই ভেবেছি। আমরা একজন অন্যজন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমরা কে তাও কেউ জানতেন না, এমনকি আমরাও আমাদের চিনতাম না।’

কলম্বিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা ১৯৪৮-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। তারই জেতার সম্ভাবনা ছিল। তাতে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যেত কমিউনিস্টদের হাতে। হুয়ান সিয়েরা নামের একজন ঘাতকের গুলিতে তিনি নিহত হন। জনতা তাত্ক্ষণিকভাবে সিয়েরাকে হত্যা করে। ফলে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন করা যায়নি। তবে সাধারণ বিশ্বাস এবং গাইতানের মেয়ে গ্লোরিয়া গাইতানের দৃঢ় বিশ্বাস, হত্যাকাণ্ডটি সিআইএ ঘটিয়েছে। গাইতান হত্যাকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট সহিংসতায় পরবর্তী ১০ বছরে (কলম্বিয়ার লা ভায়োলেন্সিয়া যুগ) তিন লাখ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। গাইতান হত্যাকাণ্ডের জন্য কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মারিয়ানো পেরেজ সরকারকেও দায়ী করা হয়। কিন্তু সরকারের পুলিশ বিভাগের রেকর্ড করা হয় ফিদেল কাস্ত্রো গাইতানের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এককভাবে তাঁকে হত্যা করেন। ঘটনার দুদিন আগেও ফিদেল গাইতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

‘প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর কিউবার দূরপ্রাচ্যে বিরান যাওয়ার আগক্ষণে কিউবাতে আমি আর গ্যাবো কথা বলছিলাম। সেখানে আমার জন্ম ১৩ আগস্ট, ১৯২৬। আমাদের দুজনের সাক্ষাৎ অন্তরঙ্গ পারিবারিক পুনর্মিলনীর মতো মনে হয়েছে। গ্যাবোর  কিছু বন্ধু এবং বিপ্লবের ক’জন কমরেড সেই জমায়েতে ছিল, আমরা পুরনো স্মৃতি তুলে এনে ভাগাভাগি করেছি, মজার গল্প করেছি।’

এ রচনায় ‘আমি’ ফিদেল কাস্ত্রো স্বয়ং। এটি তাঁর সাহিত্যঘেঁষা লেখালেখির অন্যতম প্রধান, তাঁর প্রিয় বন্ধু গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে নিয়ে লেখা একমাত্র রচনা। অ্যাঞ্জেল এস্তেবাচ ও স্তেফানি প্যানিচেল্লি দুজনের বন্ধুত্ব নিয়ে দুই শতাধিক পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন: ফিদেল অ্যান্ড গ্যাবো: অ্যা পোর্ট্রেট অব দ্য লিজেন্ডারি ফ্রেন্ডশিপ বিটুইন ফিদেল কাস্ত্রো অ্যান্ড গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। অবশ্য গ্রন্থটি যত না তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে, বরং পৃথকভাবে তাদের শৈশব, যৌবন, বিপ্লব, সৃষ্টিশীলতা, কীর্তি নিয়ে রচিত। বিভিন্ন অধ্যায়ে দুজনের চিন্তার ঐক্য নিয়ে একটি সেতুবন্ধ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

কিউবার হলগিন প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম বিরান, এখানে ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রো জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পিতার ৯৩ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ইক্ষু খামার ছিল। গ্রামটি নাইপ পবর্তমালার পাদদেশে।

নিউইয়র্ক টাইমসের ১৯৫৯ সালের ১৯ অক্টোবরের একটি ছোট্ট সংবাদ:

প্রধানমন্ত্রী ফিদেল কাস্ত্রোর বড় ভাই র্যামন কাস্ত্রো পিতার কাছ থেকে যে জমি পেয়েছিলেন, তা-সহ র্যামনের ২১ হাজার ৬৫০ একর খামারের প্রায় সবটাই কৃষি সংস্কারের আওতায় ইনস্টিটিউট অব অ্যাগ্রারিয়ান রিফর্ম বাজেয়াপ্ত করে নিজ দখলে নিয়ে নিয়েছে।

১৯৫৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ফিদেল ও গ্যাবোর প্রথম দেখা। দ্বিতীয় দেখা ১৯৬০ সালে। বাতিস্তার অনাচার ও নির্যাতন উদ্ঘাটনে অপারেশন ট্রুথ চালু হওয়ার পর সাংবাদিক হিসেবে মার্কেস হাজির হয়েই আরেকজন সাংবাদিক প্লিনিও মেন্দোজার মুখে ফিদেল কাস্ত্রোর প্রশংসা শুনলেন। ফিদেল এসে তাঁদের প্রথম জিজ্ঞেস করেছেন— ‘আপনারা খেয়েছেন?’

ফিদেল নিশ্চয়ই সবার জন্য খাবারের নিশ্চয়তা দিতে চেয়েছেন। সে কারণেই ক্ষমতাসীন ফিদেলের মৌলিক কর্মসূচি ছিল কৃষি সংস্কার, যার অন্যতম উপাদান ছিল ভূমিবণ্টন। ফিদেল কাস্ত্রো আমাদের জনদরদি বাম রাজনীতিবিদদের অনেককেই স্পর্শ করেছিলেন। ভূমি সংস্কার দাবিনামার প্লাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা কথা বলতেন। বহু বছরের লেজুড়বৃত্তি তাদের দাবিনামা থেকে গণমানুষের কল্যাণকে যেমন সরিয়ে নিয়েছে, তেমনি তাদের গণবক্তৃতা থেকে হারিয়ে গেছেন চে গুয়েভারা ও ফিদেল কাস্ত্রো।

কেবলই একনায়ক, কেবলই স্বৈরাচার হলে ৫০ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা যায় না— একটি মেয়াদই অনেকের পূর্ণ করা হয় না। ফিদেল কাস্ত্রো পেরেছেন।

কাস্ত্রোর প্রতি সমর্থনের কারণে মার্কেস যুক্তরাষ্ট্রে আসার ভিসা পাচ্ছিলেন না। ক্লিনটনের হস্তক্ষেপে সে সমস্যা মিটে যায়। তিনি যখন ক্লিনটনের সঙ্গে খাবার গ্রহণ করছিলেন, তিনি ক্লিনটনকে বললেন, আপনি আর ফিদেল যদি মুখোমুখি বসতেন তাহলে সমস্যাগুলো মিটে যেত।

 

পাদটীকা: ফিদেল গ্যাবোর বন্ধুত্বে কোনো রোমাঞ্চ ছিল না।