ঐতিহাসিক শিকড়টা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর সেক্ষেত্রে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই: আপনি জন্মেছেন অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারে, পড়াশোনা করেছেন ধনীদের ধর্মীয় স্কুলে এবং পরবর্তীতে আইন পড়েছেন। এ ধরনের পরিবেশে বড় হয়ে আপনি একজন রক্ষণশীল নেতা হতে পারতেন, তাই নয় কি?
অবশ্যই এমনটা হতে পারত, কারণ মানুষ তার গন্তব্যকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একজন মানুষ চারপাশের পরিবেশ, প্রতিকূলতা এবং সংগ্রামের সন্তান। সমস্যা মানুষকে সেভাবে পরিবর্তিত করে, যেভাবে একটা লেদ মেশিন এক টুকরো লোহাকে আকৃতি দেয়। আমি বলতে চাই, একজন মানুষ বিপ্লবী হিসেবে জন্ম নেয় না।
তাহলে আপনার মধ্যে বিপ্লবী মানসিকতা কীভাবে বিকশিত হলো?
আমি নিজেকে বিপ্লবী হিসেবে তৈরি করেছি। জীবনের বিভিন্ন বিষয় এক্ষেত্রে আমার ওপর প্রভাব রেখেছে। শুরুটা হয়েছিল সেই বাড়ি থেকে, যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল।
যে বাড়িতে জন্মেছিলেন, সেটার কথা মনে আছে?
সেটা ছিল স্প্যানিশ, আরো স্পষ্ট করে বললে গ্যালিসিয়ান স্থাপত্যরীতিতে তৈরি বাড়ি। এখানে বলে নেয়া দরকার যে, আমার বাবা ছিলেন একজন স্প্যানিশ, একজন গ্যালিসিয়ান। তার বাড়ি ছিল স্পেনের লুগো প্রদেশের লানসারা গ্রামে, ছিলেন এক গরিব কৃষকের সন্তান। গ্যালিসিয়ার রীতি ছিল গৃহপালিত পশুদের ঘরের নিচে রাখা। আমার বাড়িটিও গ্যালিসিয়ার নির্মাণরীতি দিয়ে অনুপ্রাণিত ছিল। এটা নির্মিত হয়েছিল কাঠের তৈরি খাম্বার ওপর। এই খাম্বাগুলো ছিল ছয় ফুট লম্বা, গ্যালিসিয়ায়ও ঠিক এভাবেই বাড়ি তৈরি হয়। মনে আছে আমার বয়স যখন তিন বা চার, তখন আমাদের বাড়ির নিচে গরুরা ঘুমাত। রাত নামলে তাদের নিয়ে আসা হতো এবং তারা বাসার নিচে ঘুমাত। এখানেই তাদের দুধ দোয়ানো এবং খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হতো। গ্যালিসিয়ার অনুকরণে বাড়ির নিচে শূকর ও পাখির জন্য ছোট্ট একটা খোঁয়াড়ও ছিল। মাঝে মধ্যে এতে মুরগি, হাঁস, টারকি, এমনকি কয়েকটা রাজহাঁস থাকত।
কোন পরিস্থিতিতে আপনার বাবা কিউবায় এসেছিলেন?
বাবা ছিলেন কৃষকের সন্তান, তারা একেবারেই গরিব ছিলেন। ১৯৯২ সালে আমি লানসারায় গিয়েছিলাম। বাবা সেখানে বাস করতেন। তিনি যে বাড়িতে জন্মেছিলেন, সেটা দেখেছি। সেটা ছিল একটা ছোট্ট ঘর, ৩০ ফুট লম্বা আর ১৮-২০ ফুট চওড়া। আশপাশ থেকে কুড়িয়ে আনা পাথর দিয়ে তৈরি বাড়ি, এ রকম পাথর সেখানে প্রচুর। গ্যালিসিয়ান কৃষকরা প্রথাগতভাবে এ রকম পাথর দিয়ে ঘর তৈরি করত। সেই ছোট্ট সাদাসিধে ঘরে পুরো পরিবার বাস করত এবং আমার ধারণা পশুরাও। শোয়ার ও খাওয়ার ঘর ছিল একই কক্ষে। এক গজ জমিও ছিল না। কৃষক পরিবারগুলো গ্রামে ছড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন জমির টুকরোগুলো চাষ করতেন।
বাবার বয়স যখন ১৬ বা ১৭, তখন তাকে স্পেনের সামরিক দায়িত্বের জন্য বাছাই করা হলো। দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের (শুরু হয়েছিল ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে) জন্য তিনি যখন কিউবায় পৌঁছেছিলেন, তখন তার বয়স কুড়ির বেশি। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কখন তিনি কিউবায় এসেছিলেন, তা সঠিকভাবে কেউ জানে না। বড় হওয়ার পরও আমি এসব নিয়ে কখনো বাবার সঙ্গে কথা বলিনি। বাবা মাঝে মধ্যে ডিনারের টেবিলে বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতেন, তিনি তার গল্প বলতেন। আমার বড় বোন অ্যাঞ্জেলিটা এবং তার পরের জন র্যামন, যারা এখনো বেঁচে আছেন, তারা হয়তো কিছু জানতে পারেন, কারণ তারা বাবার সঙ্গে আমার চেয়ে বেশি কথা বলতেন। এর পর আমি হাভানায় গেলাম স্কুলে পড়তে, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলাম, মনকাদা আক্রমণ সংঘটিত করলাম, জেল খাটলাম, শেষমেশ গ্রানমা অভিযানে নামলাম। এ সময়কালে আমার ছোট ভাইবোনরা বাড়িতে ছিল, তাই বাবার সঙ্গে তাদের অনেক কথা হতো। এ সময় বাবা তার জীবন নিয়ে আগের চেয়ে বেশি কথা বলতেন, কিন্তু সেসব কথা শোনার জন্য আমি সেখানে ছিলাম না।
তাদের মাধ্যমে আমি কিছু জিনিস শিখেছি। বিষয়টা ছিল এমন যে, গ্যালিসিয়ায় ধনীরা তাদের পরিবর্তে সেনাবাহিনীর কাজে টাকা দিয়ে স্থানীয় গরিব তরুণদের পাঠাত। আমার বাবা ছিলেন সেই গরিব তরুণদের একজন। এটা স্পষ্ট যে, আমার বাবা সেই গরিব কৃষকদের একজন, যাদের এভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল। আপনি নিশ্চয়ই জানেন সেসব যুদ্ধ কেমন ছিল।
বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে আপনার কোনো আলোচনার কথা স্মরণ আছে?
পিনারেজ দে মায়ারিতে কর্মজীবী পুরুষদের ক্যাম্পে যাওয়ার সময় আমি তাকে এসব বিষয়ে কিছু বলতে শুনেছিলাম। আমি ঘর ছাড়া অন্য কোথাও থাকতে পছন্দ করতাম। বাসা কর্তৃত্বের প্রদর্শক এবং এটা আমার মধ্যে ক্রোধের জন্ম দিত। আমার মধ্যকার বিপ্লবী চেতনা তখন মূর্ত হতে শুরু করেছে।
একেবারে কিশোর বয়সে স্পেনের যুদ্ধ (গৃহযুদ্ধ ১৯৩৬-৩৯) নিয়ে আগ্রহ আপনার পরবর্তীকালের বিকাশে কোনো ভূমিকা রেখেছে?
ওহ, হ্যাঁ। আন্তর্জাতিক ঘটনার গুরুত্ব তো থাকেই। কিন্তু সব কিশোরই যুদ্ধ পছন্দ করে। অন্য সবার মতো আমি ওয়েস্টার্ন সিনেমা ভালোবাসতাম এবং তার ওপর আমি সেগুলো সিরিয়াসভাবে গ্রহণ করতাম।
ওয়েস্টার্ন সিনেমা তো সে সময় খুব বর্ণবাদী ছিল, তাই না? ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে ছিল?
কাউবয়রা যে কৌশলগুলো ব্যবহার করত, আমরা সেগুলো খুব সিরিয়াসভাবে নিতাম। বালক বয়সে এটাই করতাম। তার পর পরিণত বয়সে সেগুলো দেখতাম কমেডি হিসেবে, হুইস্কির সেই লাল বোতল— সব আমার স্মরণ আছে। রিভলবারগুলোর গুলি কখনো শেষ হতো না, যদি না পরিচালক দরকারমতো শেষ করতেন। সে সময় মেশিনগান ছিল না, কিন্তু তার পরও দেখা যেত মুহুর্মুহু গুলি। আর দেখা যেত কাউকে ঘোড়ার পিঠে ধাওয়া করার সময় তার গুলি ফুরিয়ে গেলে তার সমানে গাছের ডাল হাতের কাছে পেয়ে যেত।
সব বালকই এসব সিনেমা দেখেছে।
আপনি সামরিক নেতা, যোদ্ধাদের পছন্দ করেন?
সব ছেলেই করে। পবিত্র ইতিহাস থেকেই এটা শুরু হয়। ওল্ড টেস্টামেন্ট যুদ্ধ আর অন্যান্য উত্তেজনাকর কর্মকাণ্ডে পূর্ণ: নুহের কিস্তি, মহাপ্লাবন, ৪০ দিনের বৃষ্টিপাত... এমনকি জেনেসিসে এমন বলা হয়েছে যে, বন্যার পর নুহ আঙ্গুর গাছ লাগিয়েছিলেন এবং মদ তৈরি করে একটু বেশি পান করে ফেলেছিলেন। এটা দেখে তার ছেলে কৌতুক করলে নুহ তাকে অভিশাপ দেন! নুহ ছেলেকে দাস এবং কালো বর্ণের অভিশাপ দেন! আমার মনে হয় এটার মতো বাইবেলের আরো কিছু বিষয় চার্চকে একদিন সংশোধন করতে হবে। কারণ এখন মনে হয় কালো হওয়াটা যেন ঈশ্বরের অভিশাপ... এবং নারী হওয়াটাও যেন অভিশাপ, একটা শাস্তি।
আপনি তাহলে ক্যাথলিক চার্চকে এটা সংশোধন করতে বলছেন?
না, আমি চার্চকে এসব সংশোধন করতে বা বিশ্বাসে পরিবর্তন আনতে বলছি না। দ্বিতীয় জন পল ছিলেন খুব সাহসী, দৃঢ়প্রত্যয়ী। তিনি বলেছিলেন, বিবর্তনের তত্ত্ব সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন নয়।
এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় আমি কার্ডিনাল এবং বিশপদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বিশ্বাস করি, দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে এবং জ্ঞানার্জন করেছে, তাদের উচিত নারীদের সম-অধিকার, দুনিয়ার বিভিন্ন সমস্যার জন্য তাদের দোষ না দেয়া, কালো হওয়াটা ঈশ্বরের শাস্তি, কারণ নুহের ছেলে পিতাকে নিয়ে সামান্য কৌতুক করেছিল— এমন সব ধারণা থেকে বের হয়ে আসা।
আপনি তো বাবার বিরুদ্ধেই প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন, তাই নয় কি?
আসলে আমি বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিনি। এটা কঠিন ছিল কারণ তিনি খুব চমত্কার মনের মানুষ। আমি কর্তৃত্বপরায়ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম।
আপনি কর্তৃত্বপরায়ণতা সহ্য করতে পারেন না?
সেটা একটা ইতিহাস। ব্যাপারটা এমন না যে, আমার বয়স যখন ১০ বা ১২, তখন আমার মধ্যকার বিদ্রোহী মনোভাব প্রস্ফুটিত হয়েছে। কারণ আমি আরো আগে, ছয় বা সাত বছর বয়স থেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠছিলাম।
বিরানে আপনার ছেলেবেলার যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্মৃতি স্মরণ আছে, সে সম্পর্কে বলুন...
আমি অনেক কিছু স্মরণ করতে পারি। তার মাঝে অনেক কিছু অবশ্যই আমার ওপর প্রভাব রেখেছে। তবে শিশুকালে মৃত্যু আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকেনি। যদিও তিন বছর হওয়ার আগেই আমার এক খালা আন্টোনিয়া সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। আমার পরিবারে নেমে আসা শোক, বড়দের মধ্যে বেদনার সেই মেঘ আমি স্মরণ করতে পারি। তিনি ছিলেন আমার মায়ের বোন এবং যে স্প্যানিয়ার্ডের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, তিনি বিরানে আমার বাবার সঙ্গে কাজ করতেন। তিনি একটা আখ খামারের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তার নাম ছিল সোটো। আখ ক্ষেতের কিছুটা নোংরা পথ দিয়ে আমরা তাদের কাঠের বাড়িটায় গিয়েছিলাম, নারীরা কাঁদছিলেন। কিন্তু এ ঘটনা আমার ওপর তেমন প্রভাব রাখেনি, কারণ আমি বুঝতাম না যে কী হচ্ছে, সে সময় মৃত্যু বিষয়টা বুঝতাম না।
প্রথমবারের মতো লোকোমোটিভ দেখার স্মৃতিও মনে আছে। একটা বাষ্প ইঞ্জিনের সবকিছুই চমত্কার— এর চাকা, শব্দ, শক্তি, বাঁশি। প্রক্রিয়াকরণের জন্য তারা আখ নিতে আসত। আমার মনে হতো এ রেলগাড়িগুলো দুর্দান্ত দানব।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বয়স নিশ্চিতভাবে সাত বা আট হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে আছে, তখন বিরানের মানুষ বারবেরান এবং কলারের উড়ান নিয়ে কথা বলত। বিরানে সবাই বলতেন, ‘বারবেরান এবং কলার এখান দিয়েই উড়ে গেছে।’ এরা ছিলেন দুজন স্প্যানিশ পাইলট, যারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মেক্সিকোর দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষমেশ বারবেরান এবং কলারের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের বিমান কোথায় বিধ্বস্ত হয়েছে, তা নিয়ে মানুষ এখনো তর্ক করে: পিনার দেল রিও এবং মেক্সিকোর মাঝে সাগরে নাকি ইউটাকান নাকি অন্য কোথাও। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আর কিছু জানা যায়নি। এ দুই ছোট্ট প্রপেলারের একটা বিমান নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। সেটা ছিল এমন একটা সময়, যখন বিমানচালনা ছিল একবারে শিশুকালে। ছোট্ট একটা বিমানে তারা হারিয়ে গিয়েছিলেন, তারা কয় ট্যাংক পেট্রল নিতে পেরেছিলেন, সেটা আমার জানা নেই। আর সে সময় এটাই ছিল একমাত্র উপায়। তারা আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, যাত্রা শুরু করেছিলেন স্পেন থেকে, তার পর কিউবায় পৌঁছেছিলেন। এখান থেকে মেক্সিকোর উদ্দেশে যাত্রা করেন, কিন্তু আর কখনো পৌঁছাননি।
ছোটবেলা থেকেই হারিকেন, সাইক্লোন দেখেছি। হারিকেনের বাতাস, জলস্তম্ভ এবং ভয়ানক গতির বাতাস। চার বা পাঁচ বছর বয়সে আমি একবার ভূমিকম্পও অনুভব করেছিলাম। আমাদের ঘর নড়ছিল, সবকিছু কাঁপছিল। এসব প্রাকৃতিক ঘটনা কোনো না কোনোভাবে আমার ওপর প্রভাব রেখেছিল।
আপনার ব্যক্তিত্ব বিকাশে আর কী কী বিষয় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন?
বিশেষ কিছু সুবিধা আর সামান্য একটু ভাগ্য। আমি ছিলাম একজন ভূস্বামীর ছেলে, নাতি না। আমি যদি কোনো ধনী পরিবারের নাতি হিসেবে জন্মাতাম, তাহলে আমার জন্মগত অভিজাতভাবে, আমার সব বন্ধু এবং সংস্কৃতি হতো অন্যদের চেয়ে উন্নত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার যেখানে জন্ম হয়েছিল, সেখানে আশপাশের সবাই ছিল গরিব, আমার সঙ্গীরা ছিল খামারের শ্রমিক বা একেবারে গরিব কৃষকের সন্তান। আমার মায়ের পরিবার ছিল দরিদ্র, গ্যালিসিয়া থেকে আসা আমার বাবার কাজিনরাও দরিদ্র ছিল। গ্যালিসিয়ায় আমার বাবার পরিবারও খুব গরিব ছিল।
কোনো সন্দেহ নেই, আমার জন্মস্থানই আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে। আমি বেড়ে উঠেছি নিচুতলার মানুষের মধ্যে। মনে পড়ে আখ ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অশিক্ষিত, বেকার মানুষদের কথা। তাদের কাছে এক ফোঁটা পানি, রাত বা দুপুরের খাবার এনে দেয়ার, আশ্রয় দেয়ার, পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেয়ার কেউ ছিল না। খালি পায়ে চলা সেই শিশুদের কথা আমি ভুলতে পারি না। যেসব শিশুর সঙ্গে বিরানে আমি খেলাধুলা করেছি, বড় হয়েছি, ঘুরে বেড়িয়েছি, তারা ছিল খুবই গরিব। তাদের কয়েকজনকে দুপুরবেলা আমার বাসায় বেঁচে যাওয়া খাবার একটা ক্যানে করে এনে দিতাম। তাদের সঙ্গে নদীর তীরে যেতাম, কখনো ঘোড়ায় চেপে, কখনো হেঁটে। আমার কুকুরটা সঙ্গে থাকত, যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতাম, পাথর ছুড়তাম, পাখি শিকার করতাম— এটা ছিল একটা ভয়ানক কাজ; কিন্তু তখন গুলতি ব্যবহার করাটা ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। অন্যদিকে সান্তিয়াগো এবং পরে হাভানায় আমি যে স্কুলে গিয়েছিলাম, সেগুলো ছিল ধনীদের স্কুল, সেখানে অবশ্যই ভূস্বামীদের সন্তানরাই যেত।
তাহলে আপনি ধনীদের ছেলেদের সঙ্গেও বড় হয়েছেন?
সেখানে ধনীদের সন্তানরা ছিল। অবশ্যই তারাও আমার বন্ধু ছিল। আমি তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম। কিন্তু আমি ঠিক তাদের সঙ্গে সেই বড়লোকি চালে ‘বাস’ করতাম না।
সেখানে স্কুলে মাথায় থাকত অন্যকিছু— ক্লাস, খেলাধুলা, ঘুরে বেড়ানো। খেলাধুলা আর পর্বতে চড়া ছিল আমার সবচেয়ে বড় শখ।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কখন গ্র্যাজুয়েট হলেন?
আইন স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট হই ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন আমার বয়স ২৪। ১৯৫২ সালের জুনের নির্বাচনে কংগ্রেসে হাভানার প্রতিনিধি হিসেবে আমি অংশ নিই। নিজের লড়াকু মনোভাব একজন ছাত্র হিসেবে সেই নির্বাচনে আমাকে লড়িয়েছিল। কিন্তু ১০ মার্চ বাতিস্তার ক্যুর মধ্য দিয়ে সব প্রত্যাহত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন কখন?
১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি। একজন ভূস্বামীর সন্তান হিসেবে আমার পক্ষে ষষ্ঠ গ্রেড পাস করা সহজ ছিল। তার পর আমি সপ্তম গ্রেড পাস করি এবং এর পর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রাক-স্কুল প্রিপারেটরি ইনস্টিটিউটে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করি। যেহেতু আমার বাবার টাকা ছিল, তাই স্কুল পাস করে হাভানায় যেতে পেরেছিলাম এবং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কি আপনার রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু?
হুঁ, ঠিক তাই। চারপাশের অনেক কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করলাম। আমার মধ্যে ছিল বিপ্লবী আবেগ আর নতুন নতুন ধারণা ও জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা। ছিল কৌতূহল আর প্রাণশক্তি।
অর্থনীতি এবং অন্যান্য দরকারি বিষয়ে অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও খুব দ্রুততম সময়ে আমি ‘ইউটোপীয় কমিউনিস্ট’-এ পরিণতি লাভ করা শুরু করলাম। এ রূপান্তরের ভিত্তি ছিল আমার জীবন, অভিজ্ঞতা এবং পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের প্রাথমিক পাঠ।
আপনাকে যদি বলি, বিশ্ববিদ্যালয়েই আমি বিপ্লবী হয়ে উঠেছিলাম, তাহলে সেটা হয়েছিল, কারণ আমি কিছু বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলাম। তবে এসব বই পড়ার আগেই পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে প্রশ্ন করা শুরু করেছিলাম।
ফিদেলের সাক্ষাৎকারভিত্তিক আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ’ (২০০৭) গ্রন্থের নির্বাচিত অংশ





