দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রোববার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৯৫৭
কিউবার তরুণসমাজের বিদ্রোহী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বেঁচে আছেন এবং দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের সিয়েররা মায়েস্ত্রার বন্ধুর, প্রায় দুর্ভেদ্য সুরক্ষিত দুর্গে সাফল্যের সঙ্গেই লড়াই করে যাচ্ছেন।
প্রেসিডেন্ট ফুলজেনিশিও বাতিস্তার সেনাবাহিনীর সেরা অংশটি রয়েছে এই এলাকার আশপাশে। কিন্তু সেনাবাহিনীর লোকজন জেনারেল বাতিস্তার কিউবার নেতা ও স্বৈরাচার হিসেবে তার দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর জীবনে মোকাবেলা করা এ-যাবত্কালের ভয়ঙ্করতম প্রতিপক্ষকে ধ্বংসের এক ব্যর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
ফিদেল কাস্ত্রো বেঁচে আছেন এবং কিউবাতেই আছেন— এটাই তার প্রথম নিশ্চিত খবর। খবরের কাগজের কথা দূরে থাক, এই লেখক ছাড়া বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কেউই সেনর কাস্ত্রোর দেখা পায়নি। হাভানার কেউ, এমনকি তথ্য জোগানোর মতো সূত্র থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগে জানতে পারবে না যে সত্যিই সিয়েররা মায়েস্ত্রাতেই আছেন ফিদেল কাস্ত্রো।
গোটা কিউবাজুড়েই জেনারেল বাতিস্তার বিরুদ্ধে এক ভয়ানক বিরোধ দানা বেঁধে উঠছে। কোনো দিক থেকেই তা বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় পৌঁছেনি। সিয়েররা মায়েস্ত্রার বিদ্রোহীরা বেরিয়ে আসতে পারছে না। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং পুলিশ বাহিনী রয়েছে প্রেসিডেন্ট বাতিস্তার পেছনে এবং তার প্রেসিডেন্ট থাকার এখনো অবশিষ্ট দুই বছর টিকে থাকার মতো সক্ষমতা থাকার কথা।
সত্যিকারের ভয়ঙ্কর ঝুঁকি
সিয়েররা মায়েস্ত্রায় ঢুকে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে গিয়ে হাভানা ও ওরিয়েন্তে প্রদেশের কয়েক ডজন নারী-পুরুষ সত্যিকার অর্থেই ভীষণ ঝুঁকি নিয়েছিল। এ রচনায় তাদের অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, নইলে কারো পরিচয় বের করা গেলে যথারীতি নির্যাতনের পর তার প্রাণ কেড়ে নেয়া হবে। সেজন্যই এখানে কোনো নাম ব্যবহার করা হয়নি।
অবস্থার বিচারে জেনারেল বাতিস্তা কাস্ত্রোর বিদ্রোহ দমনের আশা করতে পারেন না। তিনি কেবল এটুকু আশা করতে পারেন যে, সেনাবাহিনীর কোনো একটা দল এই তরুণ বিদ্রোহী নেতা ও তাঁর বাহিনীর নাগাল পাওয়ার পর তাঁদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে। যদি তেমন কিছু হয়ও, সেটা ১ মার্চের আগে ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, যখন বর্তমান সাংবিধানিক নিশ্চয়তার স্থাগিতাদেশ প্রত্যাহূত হওয়ার কথা রয়েছে।
কঠোর সেন্সরশিপের কারণে হাভানা ও অন্যান্য কিউবান শহর বিস্ময়কর সব গুজবে গমগম করছিল, তার একটা ছিল— সরকারের অবিরাম উসকে দেয়া ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর গুজব। কেবল তাঁর সঙ্গে যারা লড়াই করেছে, আর যাদের বিশ্বাস ও আশা ছিল, তারাই জানত বা ভেবেছিল যে তিনি বেঁচে আছেন; ওয়াকিবহালদের সংখ্যা ছিল খুবই কম আর ওদের জানার বিষয়টা প্রকাশ পেলে ভয়ঙ্কর জীবনাশঙ্কায় ছিল ওরা।
এমন পরিস্থিতিতেই লেখক ৯ ফেব্রুয়ারি আসলে কী ঘটছে, জানার প্রয়াসে হাভানায় গেছেন। কিউবান সাংবাদিকদের মতো বিদেশী সাংবাদিকদের বেলায়ও সেন্সরশিপ প্রযোজ্য ছিল। সবাই এমনকি যারা বিশ্বাস করতে চেয়েছিল, বারবার জানতে চাইছিল: ‘ফিদেল বেঁচে আছেন কিনা, বেঁচে আছেন দেখাতে কেন তিনি কিছু করছেন না বা বলছেন না?’ ২ ডিসেম্বর থেকে একদম নীরব হয়ে গেছেন তিনি কিংবা মারা গেছেন।
পরে যেমন জানতে পারি, সেনর কাস্ত্রো নতুন করে তাঁর বাহিনী সংগঠিত ও শক্তিশালী করে তোলা এবং সিয়েররা মায়েস্ত্রা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার অপেক্ষা করছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমার হাজির হওয়ার সঙ্গে এটা মিলে গিয়েছিল এবং এক বিশ্বস্ত সূত্রের কাছে কোনো একজন বিদেশী সাংবাদিকের আগমন প্রত্যাশার খবর পাঠিয়েছিলেন তিনি। আমি পৌঁছানোমাত্র কন্ট্যাক্ট সেটা জেনে গিয়েছিল এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সে। অবরোধকালীন পরিস্থিতির কারণে তাকে এমন কেউ হওয়ার দরকার ছিল, যে কিনা সত্যিকার খবর জোগাড় করে কিউবার বাইরে গিয়ে লিখতে পারবে।
বাস্তবে সেনাবাহিনী সুরক্ষিত চৌকি আর সেনাবাহিনীর কলামে সিয়েররা ঘিরে ফেলেছিল, প্রত্যেকটা পথ ছিল কড়া পাহারায়। হাভানায় পৌঁছানো ঘন ঘন সংঘাত আর সরকারি বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির খবর সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল।
সাক্ষাত্কারের ব্যবস্থা
প্রথম সমস্যা ছিল সরকারি রোড ব্লক পেরিয়ে জাম্পিং প্লেস হওয়ার মতো কাছের কোনো শহরে পৌঁছানো। ১৫ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার বিকালে সেনর কাস্ত্রোর কন্ট্যাক্ট হাভানায় সিয়েররায় পরের রাতেই সাক্ষাতের সময় স্থির হওয়ার আর আমাকে যাতে খুব বেশি পাহাড় বাইতে না হয়, সেজন্য সেনর কাস্ত্রো ও তাঁর লোকজনের রেঞ্জের সীমানার দিকে কিছুটা এগিয়ে আসার ঝুঁকি নেয়ার খবর নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। ওখানে কোনো রাস্তা ছিল না আর আমাদের দেখা করার নির্ধারিত জায়গায় কোনো ঘোড়ার যাওয়ার উপায় ছিল না।
সময়মতো হাভানা থেকে ওরিয়েন্তে (৫০০ মাইলেরও বেশি দূর) যাওয়ার মানে ছিল সারা রাত এবং পরদিন ভোর পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যেন শনিবার সিয়েররার পথে নামার জন্য তৈরি থাকা যায়।
ওরিয়েন্তেতে সেনাবাহিনীর রোড ব্লক পেরোনোর পরিকল্পনাটা ছিল সহজ আর কার্যকরও। ‘ক্যামোফ্লাজ’ হিসেবে গাড়িতে আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েছিলাম আমরা। কিউবায় তখন পর্যটন মৌসুমের তুঙ্গাবস্থা, তো আর কোনো কিছুই মধ্যবয়সী একজোড়া আমেরিকান টুরিস্টের কিউবার সবচেয়ে সুন্দর ও উর্বর প্রদেশের ভেতর দিয়ে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চলার মতো নিরীহ ঠেকত না। আমার স্ত্রীর দিকে এক নজর তাকিয়ে মুহূর্তের দ্বিধায় ভুগেছে প্রহরীরা, তার পর বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছে আমাদের। প্রশ্ন করা হলে একটা গল্পও তৈরি ছিল ওদের জন্য।
এভাবে সিয়েররার বাইরে সেনর কাস্ত্রোর প্রতি সহানুভূতিশীল এক লোকের বাড়িতে পৌঁছলাম। ওখানেই উষ্ণ আতিথেয়তায় আমার স্ত্রীর থাকার কথা ছিল; কোনো প্রশ্ন উচ্চারিত হয়নি। হাভানায় ‘মাছ শিকারে যাওয়ার জন্য’ কেনা পোশাক পরলাম আমি, হাভানার পাহাড়-পর্বতের শীতল হাওয়ার পক্ষে উষ্ণ আর কামোফ্লাজের জন্য গাঢ়।
মধ্যরাতে কাস্ত্রোর স্কাউটদের সঙ্গে মিলিত হতে আমাদের যে পথে যাওয়ার কথা, ঠিক সেখানেই একটা জিপে চারজন সরকারি সৈন্যের একটা টহলদলকে বসানো হয়েছে। তাছাড়া বিকালে সিয়েররায় ভীষণ বৃষ্টি হয়েছে, ফলে পথঘাট পরিণত হয়েছে জলায়। অন্যরা তাকে বোঝাল যে, ফিদেল কাস্ত্রো যেকোনো মূল্যেই আমাকে ওখানে চান এবং কাজটা করতেই হবে।
অনীহার সঙ্গে রাজি হলো কুরিয়ার। ওরিয়েন্তের সমতলজুড়ে আখ আর ধানক্ষেতের বিস্তার এবং এ ধরনের খামারগুলো অগুনতি মেঠোপথে ভরা। কুরিয়ার এলাকার প্রতিটি ইঞ্চি চেনে, সে হিসাব করে দেখল ঘুরপথে গেলেই আমাদের যথেষ্ট কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারবে।
একটা আর্মি রোড ব্লক পার হওয়ার কথা ছিল আমাদের, তার পর সেনা টহলের অবিরাম ঝুঁকি থাকার কথা, তো বিশ্বাসযোগ্য একটা কাহিনী তৈরি রাখা দরকার ছিল। আমি যেন এক বিন্দু স্প্যানিশ না জানা এক আমেরিকান সুগার প্লান্টার, একটা গ্রামে একটা প্লান্টেশন দেখতে যাচ্ছি। তরুণদের একজন ইংরেজি জানত, সেই আমার ‘দোভাষী’। অন্যরাও একই ধরনের গল্প ফেঁদে রেখেছিল।
যাত্রা শুরুর আগে ওদের একজন এক তাড়া নোট দেখিয়েছিল আমাকে (কিউবান পেসো পুরোপুরি মার্কিন ডলারের মতোই একই আকার ও মূল্যমানের), যার পরিমাণ আনুমানিক ৪০০ পেসো ছিল, সেনর কাস্ত্রোর কাছে পাঠানো হচ্ছিল ওগুলো। তল্লাশি চালানো হলে এক ‘ধনী’ আমেরিকান প্লান্টারের সঙ্গের দলটার কাছে টাকা থাকাটা স্বাভাবিকই দেখাবে।
আমাদের পথরোধ করা হলে কিছুক্ষণ সন্দিহান দেখালেও আমাদের কাহিনী সেনাপ্রহরীকে সন্তুষ্ট করল। তার পর শুরু হলো আখগাছ আর ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে, নদী পেরিয়ে গাড়ি ড্রাইভিংয়ের পালা, যা কেবল জিপের পক্ষেই সামাল দেয়া সম্ভব। একটা অংশে সরকারি বাহিনী কড়া টহল দেয়ার কথা জানাল কুরিয়ার, কিন্তু কপাল ভালো ছিল আমাদের, আমরা কাউকে দেখিনি। অবশেষে মাইলের পর মাইল কাদা ভেঙে আর আগে বাড়ার জো রইল না।
ততক্ষণে মাঝরাত হয়ে গেছে, এ সময়েই কাস্ত্রোর স্কাউটদের দেখা করার কথা ছিল আমাদের সঙ্গে। কিন্তু আগে আমাদের কিছুটা পথ হাঁটতে হলো, খুবই কষ্টকর ছিল সেটা। অবশেষে রাস্তা থেকে সরে এসে টিলার পাশ ঘেঁষে পিছলে নেমে এলাম, এখানে প্রায় পূর্ণচাঁদের নিচে গাঢ় বাদাম একটা ঝরনা সব কাদা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেদের একজন পা হড়কে বরফ-শীতল পানিতে পড়ে যায়। প্রায় হাঁটু সমান পানি ভেঙে এগিয়ে গেলাম আমি, না পড়ে সেটা করা যথেষ্ট কঠিন ছিল। ৫০ গজ আগে বাড়ার পর অন্যদিকের ঢালটাই ছিল মিলিত হওয়ার জায়গা।
ওখানে টহল ছিল না
ওখানে টহল ছিল না। আমরা তিনজন অপেক্ষা করার সময় ওদের দুজন কোথাও স্কাউটদের ফেলে এসেছি কিনা দেখতে গেল, কিন্তু ১৫ মিনিটের মধ্যেই হতাশ হয়ে ফিরে এলো ওরা। আমরা আরো খানিকটা আগে বাড়তে পারি, পরামর্শ দিল কুরিয়ার এবং কোথায় যেতে হবে না জেনেই পথ দেখাল সে। সেনর কাস্ত্রোর লোকদের একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংকেত ছিল: আমি দুবার টানা, চাপা কোমল বেসুরো শিসের শব্দ শুনতে পাব। ওদের একজন চেষ্টা চালিয়ে গেল, কিন্তু লাভ হলো না।
কিছুক্ষণ বাদে হাল ছেড়ে দিলাম। জোরালো চাঁদের আলোর কারণে পুরোটা সময় আড়ালে ছিলাম আমরা আর চারপাশে সেনাদল থাকার কথা জানা ছিল।
বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে গাছ আর ঝোঁপের একটা জটলায় থামলাম আমরা, পায়ের নিচের জমিন ভীষণ পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত, সপসপে। এখানে কিছু সময় শলাপরামর্শ করলাম। কুরিয়ার আর কাস্ত্রোর সঙ্গে আগে লড়াই করা এক তরুণ পাহাড়ের ওদিকে গিয়ে বিদ্রোহী বাহিনীর কারো দেখা পায় কিনা দেখতে যাওয়ার কথা বলল।
কাদায় জবুথবু হয়ে বসে আমাদের তিনজনকে অপেক্ষা করতে হলো, বলতে গেলে ২ ঘণ্টারও বেশি কষ্টকর অপেক্ষা, কথা বলার বা নড়াচড়ার সাহস হচ্ছিল না, একটু ঘুমিয়ে নেয়ার চেষ্টায় হাঁটুতে মাথা গুঁজে ছিলাম, আর জীবনের আশ মিটিয়ে উত্সবে মেতে ওঠা মশার ঝাঁকের ওপর বিরক্ত বোধ করছিলাম।
অবশেষে একটা সতর্ক, স্বাগত সূচক দ্বৈত শিসের আওয়াজ পেলাম। আমাদের একজনও একইভাবে সাড়া দিল। ঘন কুয়াশায় মিলিত হতে যাওয়া দুটো দলের মতো, আমরা একসঙ্গে না হওয়া পর্যন্ত কিছুক্ষণ চালু রাখতে হলো কাজটা। আমাদের দলের একজন একটা অ্যাডভান্স পেট্রলের দেখা পেয়েছিল, পাহাড়ের একটা চৌকিতে আমাদের নিয়ে যেতে ওর সঙ্গে এক স্কাউট হাজির হয়েছিল।
স্কাউট ছিল পাহাড়ের এক স্কোয়ার্টার, আমাদের যেভাবে সে দ্রুত, নির্ভুলভাবে ক্ষেত-খামার পেরিয়ে খাড়া পাহাড় বেয়ে কাদা ভেঙে নিয়ে চলছিল, তাতে করে প্রতিটি ইঞ্চি নখদর্পণে থাকার দরকার ছিল তার।
শেষতক পায়ের নিচের জমিন সহসা প্রীতিকরভাবে সমান হয়েই ফের ঢালু হলো। থেমে সতর্কভাবে শিস বাজাল স্কাউট। সাড়া মিলল। সংক্ষিপ্ত কথা হলো, তার পর ইশারায় এগিয়ে যেতে বলা হলো আমাদের, পিছলে নেমে এলাম ঘন বনে। পানি-ঝরা পাতা আর বাকল, ঘন গাছপালা, পায়ের নিচের কাদা, চাঁদের আলো, এসবই কিউবার চেয়ে বরং বেশি করে ব্রাজিলের মতো একটা ট্রপিক্যাল বনের ভাব দিচ্ছিল।
ভোরের সাক্ষাৎ
কিছুটা দূরে শিবির ফেলেছিলেন সেনর কাস্ত্রো। একজন সৈনিক আমাদের আসার খবর দিতে আর আমরা তার সঙ্গে দেখা করতে যাব, নাকি তিনি আসবেন জানতে এগিয়ে গেল। পরে সুখবর নিয়ে ফিরে এল সে, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ভোরের দিকে আসবেন ফিদেল কাস্ত্রো। কেউ একজন কয়েকটা সোডা ক্র্যাকার দিল আমাকে, ভালোই স্বাদ ছিল ওগুলোর। অন্য একজন জমিনে একটা কম্বল বিছিয়ে দিল। বিরাট বিলাসিতা মনে হলো সেটাকে। কিছু দেখার পক্ষে ভীষণ অন্ধকার ছিল জঙ্গলটা।
যত দূর সম্ভব নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম আমরা। একজন আমাকে তার ভাইয়ের দোকান ধ্বংস করে সরকারি বাহিনী ভাইকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে হত্যা করতে দেখার কথা বলল। ‘এখন দুনিয়ার অন্য কোথাও থাকার চেয়ে বরং ফিদেলের পক্ষে লড়াই করতে এখানেই থাকতে চাই’— বলল সে।
ভোর হতে তখনো ২ ঘণ্টা বাকি ছিল। কম্বলটা ঘুমানো সম্ভব করে তুলেছিল।
আলো ফোটার পর ওদের বয়স কত কম বুঝতে পারলাম। অনুসারীদের মতে, সেনর কাস্ত্রোর বয়স ৩০ বছর, তবে টুয়েন্টি সিক্সথ অব জুলাই মুভমেন্টের পক্ষে বয়স্কই। পাঁচমিশালি অস্ত্রশস্ত্র আর উর্দি এবং এমনকি কয়েকটা বেসামরিক পোশাকের একটা প্রদর্শনী ছিল সেটা। আমার দেখা রাইফেল আর একটা মেশিনগান ছিল আমেরিকান— বাতিল মডেলের।
এ দলের ক্যাপ্টেন ছিল কালো গোঁফওয়ালা, সদাপ্রস্তুত, বুদ্ধিদীপ্ত হাসি এবং প্রচারমুখী একজন সুঠামদেহী নিগ্রো। আমি যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম কেবল সেই নিজের নাম বলেছিল— হুয়ান আলমেইদা, ‘৮২ জনের একজন’।
বিদ্রোহের রসদ
আমরা সিয়েররার যে অংশে ছিলাম, সেখানে কোনো খাদ্য উত্পন্ন হতো না। ‘কখনো খাই, কখনো খাই না’— বলেছিল এক বিদ্রোহী। সব মিলিয়ে ভালোই স্বাস্থ্য বজায় রেখেছিল ওরা। সমর্থকরা খাবার পাঠায়; কৃষকরা বিশ্বস্ত কুরিয়ারদের বাইরে গিয়ে রসদপত্র কিনে আনতে দেয়, দোকানিরা বিরাট ঝুঁকি নিয়েই সরকারের নির্দেশ অমান্য করে সেসব বিক্রি করে।
ফিদেল কাস্ত্রোর ছোট ভাই রাউল ছোটখাটো এবং প্রীতিকর, অন্য লোকজনের সঙ্গে শিবিরে হাজির হলেন এবং কয়েক মিনিট পরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন স্বয়ং ফিদেল। দৈহিক গড়ন আর ব্যক্তিত্বের বিচারে প্রথম দেখায় তাঁকে যেভাবে নেবে কেউ, দেখার মতো পুরুষ ছিলেন তিনি— শক্তিমান, ছয় ফুট উঁচু, জলপাইয়ের মতো গায়ের রঙ, পূর্ণাঙ্গ চেহারা, ছাড়া ছাড়া দাড়ি। জলপাই সবুজ ফ্যাটিগ ইউনিফর্ম পরেছিলেন তিনি, হাতে টেলিস্কোপিকসাইটঅলা একটা রাইফেল ছিল, দারুণ গর্বিত ছিলেন ওটা নিয়ে। মনে হলো, তাঁর লোকজনের ৫০টিরও বেশি আছে এই জিনিস। বললেন, সৈনিকরা তাঁকে ভয় পায়।
‘এই বন্দুক দিয়ে হাজার গজ দূর থেকেও গুলি করতে পারি ওদের’— বললেন তিনি।
কিছু সাধারণ আলাপচারিতার পর আমার কম্বলের কাছে ফিরে এসে বসলাম আমরা। কেউ একজন টমেটো জুস, ক্র্যাকার দিয়ে বানানো হ্যাম স্যান্ডউইচ আর কফির টিন নিয়ে এল। উপলক্ষকে সম্মান জানিয়ে সেনর কাস্ত্রো হাভানা সিগারের একটা বাক্স খুললেন। পরের ৩টি ঘণ্টা আলাপের সময়টুকু ওখানেই বসেছিলাম।
কোনো সময়ই কেউ ফিসফিসানি ছাড়া কথা বলতে পারছিল না। আমাদের চারপাশে সরকারি বাহিনীর বিভিন্ন কলামের আনাগোনা চলছে, বললেন সেনর কাস্ত্রো। তাঁকে ও তাঁর বাহিনীকে পাকড়াও করাই তাদের একমাত্র আশা।
মানুষটার ব্যক্তিত্ব প্রশ্নাতীত। তাঁর লোকজন যে তাঁকে সমীহ করে এবং কেন গোটা কিউবার তরুণ সমাজের কল্পনাকে ধারণ করছেন, বোঝা যাচ্ছিল পরিষ্কার। শিক্ষিত, নিবেদিতপ্রাণ ফ্যানাটিক, আদর্শবাদী, সাহসী এবং নেতৃত্বের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের একজন মানুষ।
৮২ জনের বাহিনী সংগঠিত হলো
কেমন করে প্রথমে তাঁর সাথের ৮২ জনের অল্প কয়েকজনকে সমবেত করেছিলেন, জেনারেল বাতিস্তার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ক্ষেপিয়ে তোলার পর ওরিয়েন্তের অন্যান্য অঞ্চল থেকে তরুণরা হাজির হওয়ার সময় সরকারি বাহিনীকে কিভাবে ঠেকিয়ে রেখেছেন, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদ সংগ্রহ এবং তার পর গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে হামলা আর আক্রমণ চালিয়েছেন, সেই কাহিনী উন্মোচিত হওয়ার সময় তিনি যে এখন দুর্জেয়, সেই অনুভূতিই হবে কারো। হয়তো তিনি তা নন কিন্তু অনুসারীদের মনে এ বিশ্বাসই জাগিয়ে তোলেন তিনি।
বহু লড়াই করেছে ওরা, সেনাবাহিনীর ওপর বিপুল ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছে— বললেন সেনর কাস্ত্রো। সরকারি বিমানগুলো উড়ে এসে রোজই বোমা বর্ষণ করে। আসলে ঠিক ৯টার সময় একটা প্লেন ঠিকই উড়ে গিয়েছিল। বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল; শাদা শার্ট পরা একজনকে ঝটপট আড়াল করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু প্লেনটা পাহাড়ের আরো উঁচুতে বোমা ফেলতে চলে গেছে।
চমত্কার বক্তা কাস্ত্রো। তাঁর বাদামি চোখজোড়া ঝিলিক মারছিল; আগ্রহী চেহারা শ্রোতার দিকে বাড়িয়ে দেয়া, ফিসফিস কণ্ঠস্বর যেন কোনো মঞ্চনাটক নাটকীয়তার সাবলীল বোধ জাগিয়ে তুলছে।
‘৬৯ দিন ধরে লড়ছি আমরা এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী,’ বললেন সেনর কাস্ত্রো। ‘সৈনিকরা বাজেভাবে লড়ছে, ওদের মনোবল খুব নিচু আর আমাদের জন্য তো এর চেয়ে ভালো হতে পারে না। অনেককে হত্যা করছি আমরা, কিন্তু ওরা যুদ্ধ করতে চায় না, আর এই জাতীয় পাহাড়ি এলাকার যুদ্ধ কীভাবে করতে হয়, তাও জানে না। আমরা জানি।’
‘এখানে কিউবার মানুষ রেডিওতে আলজেরিয়ার সম্পর্কে সব জানতে পারে কিন্তু আমাদের ব্যাপারে একটা শব্দও শুনতে পায় না, একটা অক্ষরও পড়তে পারে না, সেন্সরশিপ এর তারিফ পাওয়ার যোগ্য। আপনি সবার আগে বলতে যাচ্ছেন তাদের। গোটা দ্বীপে সমর্থক আছে আমার। সবসেরা লোকজন, বিশেষ করে সব তরুণই আছে আমাদের সঙ্গে। কিউবার মানুষ আর যা-ই হোক নিপীড়ন মেনে নেবে না।’
সিয়েররায় একটা বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার প্রকাশিত খবর সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম তাঁকে।
‘এখনই নয়,’ জবাব দিলেন তিনি। ‘সঠিক সময় হয়নি। উপযুক্ত মুহূর্তেই নিজেকে সামনে নিয়ে আসব আমি। দেরি হওয়ায় বরং এর প্রভাবই বাড়বে, কারণ এখন সবাই আমাদের নিয়েই কথা বলছে। নিজেদের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত।
‘তাড়াহুড়োর কিছু নেই। কিউবা যুদ্ধকালীন অবস্থায় আছে, কিন্তু বাতিস্তা সেটা গোপন করে রেখেছেন। একজন স্বৈরাচারকে নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসেবেই তুলে ধরতে হয়, নইলে যে পতন ঘটবে। আমরা দেখিয়ে দিচ্ছি যে, তিনি অক্ষম।’
তিনি বললেন, সরকার একই রকম তিক্ততার সঙ্গে কেবল তার বিরুদ্ধেই নয়, বরং কিউবার জনগণের বিরুদ্ধেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জোগানো অস্ত্র ব্যবহার করছে।
‘ওদের বারুকা, মর্টার, মেশিন গান, প্লেন আর বোমা আছে’— বললেন তিনি। ‘কিন্তু সিয়েররায় এখানে আমরা নিরাপদ; আমাদের ধরতে হলে এখানে আসতেই হবে ওদের, কিন্তু সেটা তারা পারবে না।’
কিছু ইংরেজি জানেন সেনর কাস্ত্রো কিন্তু স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতেই পছন্দ করেন, অসাধারণ ক্ষমতায় সেটা করেছেন তিনি। সামরিক নয় বরং তিনি রাজনৈতিকমনস্ক। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, সংবিধানের পুনর্বহালের প্রয়োজনীয়তা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জোরালো মতামত রয়েছে তাঁর। অর্থনীতির ব্যাপারেও তাঁর ধারণাগুলো জোরালো। তবে কোনো অর্থনীতিবিদ সেগুলোকে দুর্বল বিবেচনা করবেন।
টুয়েন্টি সিক্সথ অব জুলাই মুভমেন্ট জাতীয়তাবাদ, উপনিবেশবাদ বিরোধিতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কথা বলে। সেনর কাস্ত্রোকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি জবাব দিলেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আমেরিকান জনগণের প্রতি আমাদের কোনো বৈরিতা নেই।’
‘সবার উপরে’ বললেন তিনি, ‘আমরা একটি গণতান্ত্রিক কিউবা আর স্বৈরাচারের অবসানের লক্ষ্যে লড়াই করছি। আমরা সামরিক বাহিনীর বিরোধী নই। সেজন্যই আমরা সৈনিক বন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। সুতরাং সেনাবাহিনীর প্রতি কোনো রকম ঘৃণা নেই, কারণ আমরা জানি লোকগুলো ভালো আর অফিসারদের অনেকেও তা-ই।
‘মাঠে আমাদের বিরুদ্ধে বাতিস্তার তিন হাজার লোক আছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের কতজন সেটা আপনাকে বলব না। ২০০ জনের একেকটি কলাম নিয়ে কাজ করেন তিনি, আমরা সেখানে ১০ থেকে ৪০ জনের একেকটি দল এবং আমরাই জিতছি। এটা সময়ের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ আর সময় আমাদের পক্ষে।’
অর্থায়নের ব্যাপারে আস্থাশীল
তিনি যে গুয়াজিরোদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছেন, সেটা দেখাতে একজনকে ‘নগদ টাকা’ নিয়ে আসতে বললেন। একজন সৈনিক গাঢ় বাদামি কাপড়ে মোড়ানো একটা বান্ডিল নিয়ে এল। সেনর কাস্ত্রো খুললেন ওটা। অন্তত চার ফুট উঁচু পেসোর একটা স্তূপ ছিল, প্রায় ৪ হাজার ডলার হবে— বললেন তিনি। সেসঙ্গে আরো বললেন যে, প্রয়োজনীয় সব টাকাই আছে তার কাছে এবং আরো জোগাড় করতে পারবেন।
‘সৈন্যরা বাতিস্তার জন্য মাসে ৭২ ডলারের বিনিময়ে কেন মারা যাবে?’ প্রশ্ন করলেন তিনি। ‘আমরা যখন জিতব, মাসে ওদের ১০০ ডলার দেব। ওরা স্বাধীন গণতান্ত্রিক কিউবার সেবা করবে।
‘আমি সবসময়ই সামনের কাতারে আছি,’ বললেন তিনি। বাকিরা নিশ্চিত করল সেটা। ব্যাপারটা এ রকম হওয়ায় সেনাবাহিনী হয়তো শেষে তাঁর নাগাল পেতেও পারে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে প্রায় অপরাজেয় বলেই মনে হলো।
‘আমরা কোথায় আছি ওরা জানে’, বিদায় জানাতে দলটা উঠে দাঁড়ানোর সময় বললেন তিনি, ‘কিন্তু আমরাও সবসময় জানি ওরা কোথায় আছে। এখানে আসতে গিয়ে দারুণ ঝুঁকি নিয়েছেন আপনি, তবে আমরা পুরো এলাকা কাভার করে রেখেছি আর আপনাকে নিরাপদেই বের করে দেব।’
তা-ই করেছিল ওরা। প্রকাশ্য দিনের আলোতেই কাদাময় জমিনের ওপর দিয়ে পেছন রাস্তা দিয়ে আগাগোড়া গা-ঢাকা দিয়ে বের হয়ে এলাম আমরা। রাস্তাবিহীন বনজঙ্গল আর ক্ষেতের ওপর দিয়ে বাড়ি ফেরা পায়রার মতোই এগিয়ে চলছিল স্কাউট, সিয়েররার সীমানায় সরাসরি এক কৃষকের বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে। ওখানে কিছু সময় পেছনের কামরায় গা-ঢাকা দিয়েছিলাম আমরা, এদিকে কেউ একজন একটা ঘোড়া ধার করে এনে জিপের খোঁজে গেল, সারা রাত লুকানো ওটা।
দারুণ সন্দিহান এক সেনাপ্রহরীর একটা রোড ব্লক পেরোতে হলো, আমাদের অন্তরাত্মা উড়ে যাওয়া দশা হয়েছিল, কিন্তু আমাদের যেতে দিয়েছে সে।
এর পর দাড়িগোঁফ কামিয়ে ফের আমেরিকান টুরিস্টের মতো চেহারা নিয়ে ‘ক্যামোফ্লাজ’ হিসেবে আমার স্ত্রীসহ রোড ব্লক পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৗঁছাতে এবং এর পর হাভানার পথ ধরতে আমাদের কোনো সমস্যাই হয়নি। সবাই জানত আমরা মাছ শিকারে উইকএন্ডে বাইরে গিয়েছিলাম, তো নিউইয়র্কের পথে প্লেন ধরার সময় কেউ আমাদের বিরক্ত করেনি।
[ঈষৎ সংক্ষেপিত]
হার্বার্ট এল. ম্যাথুজ ও রূপান্তর: শওকত হোসেন





