সালভাদর আয়েন্দে ১৯৫২, ১৯৫৮ এবং ১৯৬৪তে চিলির প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচন করে পরাস্ত হন। ১৯৬৪-এর নির্বাচনের আগে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। পাবলো নেরুদা তার আত্মস্মৃতিতে লিখেছেন: ‘কমিউনিস্টবিরোধী পত্রপত্রিকা, খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশন এমনকি পথসভায় এ মিথ্যা বারবার প্রচার হয়েছিল— যদি কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসে, তাহলে প্রথমেই তারা ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসিনীদের হত্যা করবে এবং সমস্ত গির্জা ধ্বংস করে দেবে।
ফিদেল কাস্ত্রোর মতো দাড়িওয়ালা কমিউনিস্টরা তাদের তীক্ষ বেয়নেটের ডগা ছোট ছোট ছেলেমেয়ের বুকে বসিয়ে তাদের হত্যা করে তবেই নতুন সাম্যবাদী সমাজ গড়বে। দরকার হলে মা-বাবার কাছ থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে ধরে নিয়ে এসে তাদের সাইবেরিয়ার ‘লেবার ক্যাম্পে’ পাঠানো হবে মানুষ হওয়ার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ধরনের নানা মিথ্যা প্রচারে মানুষের গায়ের লোম আতঙ্কে খাড়া হয়ে উঠেছিল। এর অনেক পরে আমেরিকার সিনেটের এক বিশেষ সভায় সাক্ষ্য দেয়ার সময় আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, সিআইএ চিলির নির্বাচনে আয়েন্দেকে হারানোর জন্য ২০ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল।
পাবলো নেরুদাকে কাস্ত্রো কতটা আলোড়িত করেছেন তার একটি অনুচ্ছেদ সে সাক্ষ্য দেয়:
যেদিন কিউবা বিপ্লবের সাফল্যের সংবাদ এসে পৌঁছল, সেদিন লাখ লাখ দক্ষিণ আমেরিকান ঘুম ভেঙে চমকে জেগে উঠেছিল। তারা সেদিন বিশ্বাস করতে পারেনি যে, একটি মহাদেশ তাদের বেঁচে থাকার সব ‘আশা’ হারিয়েও আবার ‘আশা’র মধ্যেই বেঁচে রয়েছে। কোথাকার কে এক কিউবান ছোকরা, যার নাম ফিদেল কাস্ত্রো, সে নাকি ‘আশা’র চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করিয়ে তাকে তার টেবিলের ওপর এনে বসিয়েছে, যে টেবিল নাকি আমেরিকার লাখো মানুষের বিলাসবহুল ঘরকে সাজিয়ে রাখে।
পাবলো নেরুদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালভাদর আয়েন্দে ১৯৭০-এর নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির এদুয়ার্দো ফ্রেয়িকে পরাস্ত করে যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, সাফল্যে পিলসুজ হাতে তখন দীপ্যমান কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো। তাহলে সাফল্য চিলিতেও আসবে। কিন্তু আয়েন্দে তো ষড়যন্ত্রের দরজা বন্ধ করতে পারেননি। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জেনারেল পিনোশে সেনা অভ্যুত্থান ঘটালেন, আক্রান্ত হলো প্রেসিডেন্ট ভবন। একে৪৭ নল ঘুরিয়ে আয়েন্দে মৃত্যুকেই বেছে নিলেন।
আনাতোলি কালাশনিকভ রাইফেলটি সালভাদর আয়েন্দেকে উপহার দিয়েছিলেন বিপ্লবের স্বপ্নপুরুষ ফিদেল কাস্ত্রো। রাইফেলের ওপর সোনালি পাতে খোদাই করা ছিল: To my good friend Salvador from Fidel, who by different means tries to achieve the same goals.
পাবলো নেরুদার ভেনিজুয়েলায় ফিদেলকে দেয়া গণসংবর্ধনাটি দেখেছিলেন। দেশটি কিউবার স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেগবান করতে অনেক সাহার্য করেছে। ফিদেল এলেন সে দেশের জনতার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে। নেরুদা লিখেছেন:
‘... সেদিন ভেনিজুয়েলায় ফিদেল কাস্ত্রোকে ভেনিজুয়েলার জনতা যে সংবর্ধনা জানিয়েছিল, তা আজো আমার কাছে অবিশ্বাস্য এক স্বপ্নের মতো মনে হয়। কারাকাসের এল সিলেন্সিওতে দুই লাখের ওপর সমবেত মানুষ, যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। সেখানে ফিদেল প্রায় ৪ ঘণ্টা বক্তৃতা করলেন। অবাক বিস্ময়ে দেখেছিলাম মানুষগুলো স্থানুর মতো বসে সেই অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা শুনছে। আমাদের সবার কাছে ফিদেলের সেদিনের বক্তৃতা বহু রহস্যই উদ্ঘাটন করেছিল। ফিদেলের দিকে তাকিয়ে সেদিন আমার মনে হয়েছিল, লাতিন আমেরিকায় নবযুগের সূত্রপাত হলো।
অনেক নামকরা রাজনৈতিক নেতার বা কর্মীর বক্তৃতা শোনার সময় লক্ষ করেছি, তারা খেই হারিয়ে ফেলেন অথবা প্রকৃত ভাবার্থবোধক শব্দকে ঠিক সময়মতো সাজাতে পারেন না বা তার ব্যবহারে তারা অপটু। অনেক সময় তাদের বক্তৃতার মূলবস্তু ঠিক থাকলেও বারবার একই শব্দের প্রয়োগে তার মূল্যায়নে ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু ফিদেলের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তার ভাষায়, প্রতিটি শব্দেই তাজা-টাটকা ভাব, নীতিমূলক হলেও স্বাভাবিক। শুনতে শুনতে সেদিন মনে হয়েছিল, তার কথা আমাদের শোনানোর সময় ফিদেল নিজেও যেন একজন ছাত্রের মতো জ্ঞান আহরণ করছেন।’
পাবলো নেরুদা ফিদেলের যে বক্তৃতার কথা বলছেন, সেটি ১৯৫৯ সালের জানুয়ারির। ফিদেল কাস্ত্রোর বয়স তখন ৩৩ বছর। আর পাবলো নেরুদার তখন ৫৫। ফিদেল নেরুদার চেয়ে ২২ বছরের ছোট।
সে সময় ফিদেল কাস্ত্রো ভেনিজুয়েলা সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গিয়ে পাবলো নেরুদার সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় ফিদেলের জন্য মানুষের ভালোবাসা নেরুদাকে আপ্লুত করেছিল, কিন্তু আতঙ্কিত করেছিল অনেককেই— তাদের একজন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রমুলো বেতানকুর্ত— তিনি পরদিন থেকে নিজ দেশে ফিদেলভক্ত যাকেই পেয়েছেন তার ওপর চালিয়েছেন অকথ্য নির্যাতন ও অপ্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা।
এ জনসভার এক সপ্তাহ পর কিউবা দূতাবাসে নেরুদার একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। দূতাবাসের দোতলার একটি ঘরে ফিদেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘরের অবস্থা দেখে নেরুদার মনে হয়, এটি কোনো ভৃত্য কিংবা মালির ঘর। অগোছালো বিছানার চাদর অবিন্যস্ত— মনে হয় যেন কেউ এই মাত্র বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে। তিনি ভাবছিলেন, এরপর নিশ্চয়ই তাকে সুন্দর সাজানো ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তিনি বিপ্লবী ফিদেলের দেখা পাবেন। কিন্তু সুদীর্ঘ, সুদর্শন ফিদেল সেখানেই আবির্ভূত হলেন।
‘আমাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে ফিদেল প্রশ্ন করলেন, “কেমন আছেন পাবলো?”
শিশুসুলভ তার গলার স্বরে আমি চমকে উঠেছিলাম। সেদিন তার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিল, একটি কিশোর বালক যার সদ্য ওঠা গোঁফ-দাড়ি আর কোমলতা ছাড়িয়ে যেন হঠাত্ই তার দুটো পা লম্বায় খুব বড় হয়ে গেছে।’
সঙ্গত কারণেই খবরের কাগজের ফটোগ্রাফার তাদের পিছু নিয়েছেন। কিন্তু পাবলোকে বিস্মিত করে ফিদেল ক্যামেরাম্যানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ধাক্কা মেরে তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। হতবুদ্ধি ক্যামেরাম্যানের হাত থেকে পড়ে যাওয়া ক্যামেরা তুলে তিনি বিছানায় ছুড়ে ফেলেন।
‘সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় আমার দৃষ্টির সামনে দুটি দৃশ্য কেবলই ঘোরাফেরা করছিল। একটি হচ্ছে একজন ভয়ার্ত, আতঙ্কিত প্রেস ফটোগ্রাফারের মুখ আর অন্যটি একজন গেরিলা যোদ্ধার সদাসতর্ক দৃষ্টি ও ক্ষিপ্রতা।
ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে সেই আমার প্রথম সাক্ষাত্। আমার কাছে আজো যে বিষয়টি খুবই আশ্চর্যের মনে হয় সেটি হচ্ছে, আমাদের সাক্ষাত্কারের মধ্যে কী এমন গোপনীয়তা ছিল, যার জন্য সেই ফটোগ্রাফারের সঙ্গে ফিদেল অমন একটা রূঢ় ব্যবহার করেছিলেন।’
টীকা: ব্যবহূত উদ্ধৃতিগুলো ভবানী প্রসাদ দত্তের অনুবাদে অনুস্মৃতি গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।
ফিদেল ও পাবলোর এ সাক্ষাতের ঘটনাটির ক’দিন পরই ১৯৫৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফিদেল কিউবা প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।





