পরিণত বয়সে—গোটা নব্বই পার হওয়ার পর—ফিদেল কাস্ত্রো সম্প্রতি বিগত হইয়াছেন। এই বিগতি অস্বাভাবিক ছিল না। খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে তিনি কাজের ক্ষমতা ছাড়িয়াছিলেন ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই আর বছর দেড়েক পর—২০০৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি—নামকাওয়াস্তে ক্ষমতাটাও তিনি হস্তান্তর করিলেন বিপ্লবের দ্বিতীয় প্রধান নেতা রাউল কাস্ত্রোর হাতে।

ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আরোহণ করিয়াছিলেন এই কার্যকর বিদায়টা লইবার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। এই অর্ধশত বছরের ঘটনাবলীকে আমরা একবাক্যে ‘বিপ্লব’ বলিয়া থাকি। এই ঘটনাবলী কি সত্যই সত্য বিপ্লব পদবাচ্য? এই প্রশ্ন অনেকেই উঠাইয়াছেন। ভবিষ্যতে আরো অনেকেই যে উঠাইবেন তাহাতে সংশয় নাই। তাহার সহিত আরো এক প্রশ্ন এখন যোগ হইতেছে। এই ‘বিপ্লব’ কি টিকিয়া থাকিবে? থাকিলে আর কতদিন? এই দুনিয়ায় জ্যোতিষী কিংবা ভবিষ্যদ্বক্তার অভাব নাই। তাঁহাদের অনেকেই এতদিন বলিতেছিলেন, না, টিকিবে না এই উপপ্লব। অবাক কাণ্ড! সোবিয়েত এয়ুনিয়ন কিংবা পূর্ব জার্মানির মতন অতিকায় হস্তীর পতনের পরও ক্ষুদ্র কুবা তেলাপোকার ন্যায় টিকিয়া আছে। আমরা সামান্য মানুষ, ভবিষ্যত বলিবার বিদ্যা আমাদের আয়ত্ত হয় নাই। আমরা শুদ্ধ দেখিতে পারি বিপ্লব এতদিন টিকিল কি করিয়া।

ইংরেজি আঠারো শতকের মাঝামাঝি তত্ত্বজ্ঞানী জাঁ-জাক রুশো একদিন কহিয়াছিলেন, ক্ষুদ্র দ্বীপ কর্সিকা একদিন সারা এয়ুরোপকে অবাক করিয়া দিবে। নাপোলেয়ন বোনাপার্ত—বলাবাহুল্য—কিছুদিনের মধ্যে ঐ নাচিজ দ্বীপেই জন্মিয়াছিলেন। ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মভূমি কুবা (ইংরেজি বুলিতে ‘কিউবা’) বিশ শতকে পৃথিবীকে আরও অবাক করিয়া দিয়াছে। এই নিবন্ধে আমরা কুবার বিপ্লবের কারণ বা ফলাফল দেখিব না। শুদ্ধ দেখিতেছি—কিভাবে এই ঘটনা সম্ভব হইল।

১

এয়ুরোপের ভদ্রলোক সমাজ যে মহাদেশকে ‘আমেরিকা’ নাম দিয়াছেন কুবা দেশটি তাহার মধ্যভাগে। স্পেনের পরম পরাক্রমশালী রাজা প্রায় চারিশত বছর এই দ্বীপের অধীশ্বর ছিলেন। শুদ্ধমাত্র একটি কথা মনে রাখিতে হইবে—স্পেনের হাতে পড়ার আগে এই অঞ্চল মোটেও জনশূন্য ছিল না। ঐ অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকটি জাতির নাম জানা যায়—যেমন, তাইনো, চিবোনি এবং গুয়ানাহাতাবে। গোটা উনিশ শতক জুড়িয়া স্পেনের বিরুদ্ধে যখন দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা জুড়িয়া স্বাধীনতার সংগ্রাম চলিতেছিল তখন উত্তরের প্রতিবেশী বড় দেশটি আরো শক্তিমান হইয়া উঠিতেছিল। ১৮১০ সালে স্পেনের উপনিবেশ মেহিকো (ইংরেজিতে ‘মেক্সিকো’) স্বাধীনতা লাভ করে। এইক্রমে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার প্রায় সব দেশ স্পেনের কব্জা হইতে মুক্ত হয়। মনে রাখিতে হইবে এই ঘটনার ৩০-৩৫ বছর আগে মহা ব্রিটেনের হাত হইতে তাহাদের কয়েকটি উপনিবেশ স্বাধীনতা পাইয়া ‘আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র’ নাম গ্রহণ করিয়াছিল।

উনিশ শতক ফুরাইতে না ফুরাইতে এই নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রটাই এয়ুরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া উঠিল। পররাজ্য গ্রাস করিতে সেও উদ্যত হইল। ১৮৯৮ সালের এক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের হাত হইতে চারিশত বত্সরের পুরানা উপনিবেশ কুবা দখল করিয়া লয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে পুয়ের্তোরিকো দ্বীপ, ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জ এবং গুয়াম। যুক্তরাষ্ট্র হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ দখল করিয়াছিল এই বছরেই। এই দখলী সম্পত্তির মধ্যে কয়েকটিকে পরে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা দেয়। ‘কুবা’ সীমিত স্বাধীনতা লাভ করে গোটা চারি বত্সর পর—১৯০২ সালে। ফিলিপিন দ্বীপপুঞ্জ ‘স্বাধীনতা’ লাভ করে ১৯৪৬ সালে। বাকি দেশগুলি এখনও স্বাধীন হয় নাই। কুবায় যে বত্সর বিপ্লব শুরু হইল সে বত্সর—মানে মাত্র ১৯৫৯ সালে—হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।

আমরা আগেই দেখিয়াছি চারি বত্সর ধরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দখলে থাকার পর কুবা স্বাধীনতা লাভ করে। তবে ১৯০২ সালের স্বাধীনতার সহিত যুক্তরাষ্ট্র কিছু শর্তও জুড়িয়া দিয়াছিল। এইসব শর্ত অনুসারে—ইচ্ছা করিলে তাঁহারা যে কোন সময় কুবার শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করিতে পারিবেন। গুয়ানতানামো উপসাগর নামক এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকিয়া গিয়াছিল সেই শর্তের অংশ অনুসারেই। সেখানে আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং আইন-বহির্ভূত একটি বন্দীশালা রহিয়াছে। এই বন্দীশালা জগত জুড়িয়া মার্কিন সাম্রাজ্যের মর্যাদার প্রতীক। এই বন্দীশালার পাশেই তো কুবা—এ কথা না বলিলেও চলিবে।

১৯০২ হইতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ‘নয়া উপনিবেশ’ কুবায় এক ধরণের গণতন্ত্র বজায় ছিল। সেই গণতন্ত্র অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত শাসকরাই দেশ শাসন করিতেন। এই ধাঁচার এক শাসকের নাম আন্তনিয়ো মাচাদো। ১৯৩৩ সালে এই ভদ্রলোকের হাত হইতে ক্ষমতা গ্রহণ করেন আরেক সামরিক শাসক। নাম ফুলজেনসিও বাতিস্তা। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর সিনিয়র সার্জেন্ট। পরে কর্নেল পদ গ্রহণ করিয়া এক সামরিক অভ্যুত্থান বলে বাতিস্তা দেশের সর্বময় ক্ষমতা নিজ হাতে গ্রহণ করেন। এটা ১৯৫২ সালের ঘটনা।

ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁহার ভাই রাউল কাস্ত্রো ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তারিখে দেশের পূর্বভাগের এক প্রদেশে মনকাদা নামক সেনানিবাসে সশস্ত্র হামলা চালাইতে গিয়াছিলেন। সেই দিনের স্মৃতি হইতেই কাস্ত্রোর দলের নাম দাঁড়াইয়াছিল ২৬ জুলাই আন্দোলন। সেই দিনের আন্দোলন কিন্তু সফল হয় নাই। তাঁহাদের অনেকেই আহত ও নিহত হইলেন। দুই ভাই পরাজিত হইয়া বন্দীত্ববরণ করেন। বিচারে কাস্ত্রোর ২৭ বছর ও তাঁহার সহযোদ্ধাদের নানা মেয়াদী কারাদণ্ড হয়। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া কাস্ত্রো যে জবানবন্দি উচ্চারণ করিয়াছিলেন তাহাতে দাবি করা হইয়াছিল, আজ তোমরা আমাকে যতই অপরাধী সাব্যস্ত করো না কেন, আমি কিন্তু অপরাধী নই, দেশকে স্বৈরশাসনমুক্ত করিতেই আমি অস্ত্রধারণ করিয়াছিলাম। বলিলেন (হিস্পানি ভাষায়), ‘লা ইস্তোরিয়া মে আবসোলবেরা’ অর্থাত্ ইতিহাস আমাকে মুক্ত করিবে।

১৯৫৩ সাল বড় একটা সুসময় ছিল না। ঐ বছরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রজাতন্ত্রী সরকার উত্খাত করিয়া সেদেশে রাজতান্ত্রিক সরকার স্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫০ সালে কোরিয়া উপদ্বীপে যে যুদ্ধ শুরু করিয়াছিল ১৯৫৩ সালে তাহার একপ্রকার শেষ হয়। ঐ দিকে পূর্ব এয়ুরোপে জোসেফ স্তালিন পরলোকে গমন করেন। জানা যায়, ঐ বছরই রুশরা হাইড্রোজেন বানাইতে শিখিয়া গিয়াছে। ১৯৫০ সালের পর খোদ মার্কিনদেশেই স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়। চার্লি চ্যাপলিন আর বের্টোল্ট ব্রেখটের মতন মনীষীও মার্কিনদেশ ত্যাগে বাধ্য হইলেন সেই সময়ই। ঐদেশে ইহাকে বলা হয় ম্যাকার্থির জমানা।

কাস্ত্রো ভাইয়ের দল তখন কারাগারে সাজা খাটিতেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্য আমেরিকায় গুয়াতেমালা নামক ক্ষুদ্র দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করিল ১৯৫৪ সালে। ঘটনাচক্রে দক্ষিণের আর্হেন্তিনা দেশ হইতে আগত ডাক্তার আর্নেস্তো গেভারা (ওরফে চে গেভারা) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫৪ সাল অবিস্মরণীয় আরও অনেক কারণে। সে বছর ভিয়েতনামে ফরাশি দখলদাররা পরাজিত হইলে পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই হারানো জায়গা দখল করে। ভিয়েতনাম দুইভাগে ভাগ হয়। শুরু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এদিকে উত্তর আফ্রিকায় আলজিরিয়া ফরাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করিয়া দেয়। মিশরে গামাল আবদেল নাসের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন।

পরের বছর—১৯৫৫ সালের মে—নাগাদ কাস্ত্রো ভাইয়েরা কারাগার হইতে ছাড়া পাইলেন দেশের অন্তর্গত জনমতের চাপে। দ্বীপ ছাড়িয়া তাঁহারা মেহিকো গমন করেন। সেখানেই অন্যান্যের মধ্যে ডাক্তার গেভারার সহিত তাঁহাদের দেখা হইয়াছিল। ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কাস্ত্রো ও তাঁহার ২৬ জুলাই আন্দোলনের ৮২ জন যোদ্ধা কুবার উদ্দেশে পাড়ি জমাইলেন। তাঁহাদের বাহক নৌকাটির নাম ছিল ‘গ্রানমা’। দ্বীপে নামিতেই তাঁহারা বাতিস্তার বাহিনীর সাক্ষাত্ পাইয়াছিলেন। সেই সংঘর্ষে অনেকেই নিহত হইলেন। যাঁহারা প্রাণে বাঁচিয়া গেলেন তাঁহারা দীর্ঘ দুই বছর জঙ্গলের মধ্যে লুকাইয়া থাকিলেন। দেশে তখন গণ আন্দোলন শুরু হইয়া গিয়াছিল। এই সশস্ত্র সংগ্রাম ও গণ আন্দোলন—বিশেষ করিয়া কৃষকদের সহযোগিতা ও শ্রমিক শ্রেণীর ধর্মঘট—মিলিয়া বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটায়। ১৯৫৯ সালের ৮ জানুয়ারি কাস্ত্রো কুবার রাজধানী শহর লা হাবানায় হাজির হইলেন। বিপ্লব মাত্র শুরু হইল।

২

১৯৫৯ সালের গোড়ার দিকে বাতিস্তা ও তাহার সহযোগী উচ্চ পর্যায়ের আমলা কর্মচারীরা দেশত্যাগে বাধ্য হইয়াছিলেন। একই সাথে এতদিন যাঁহারা বিদেশে নির্বাসিত ছিলেন তাঁহারাও একে একে দেশে ফিরিতে লাগিলেন। ক্ষমতায় বসিবার সঙ্গেই কাস্ত্রো কৃষি সংস্কারের আইন ঘোষণা করিলেন। তাহাতে তাঁহার জনসমর্থন বৃদ্ধি পাইল। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইয়া উঠিল শত্রুভাবাপন্ন।

কাস্ত্রো সরকার একাধিক মার্কিন কোম্পানির দখলী জমি জাতীয়করণ শুরু করিলেন। ১৯৬০ সালের জানুয়ারি নাগাদ মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের আহ্বানে মার্কিন আইনসভা কুবা হইতে প্রধান রপ্তানি পণ্য চিনি আমদানি প্রথমে সীমিত করিলেন। মনে রাখিতে হইবে কুবার বৈদেশিক মুদ্রার আশি শতাংশ আসিত চিনি রপ্তানির আয় হইতে। অতয়েব কুবাও বাধ্য হইয়া রাশিয়া হইতে তেল আমদানি শুরু করিল। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন তেল শোধনাগারগুলি প্রতিশোধস্বরূপ কুবায় আমদানি করা রুশ তেলশোধনে অস্বীকৃতি জানাইলে ১৯৬০ সালের জুন নাগাদ কাস্ত্রো এই সকল কোম্পানিও জাতীয়করণ করিলেন। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র চিনি আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করিয়া দিল। কাস্ত্রো পাল্টাপাল্টি মার্কিন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা আর আখ-খামার বন্ধ করিয়া দিলেন। এটা আগস্ট মাসের কথা। সেপ্টেম্বর নাগাদ মার্কিন ব্যাংকগুলির ব্যবসায়ও বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল। বিপ্লব চলিতে শুরু করিল।

ততক্ষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি কুবার পুরাতন শাসক শ্রেণীর লোকজন দেশত্যাগ করিতে শুরু করিয়াছে। এখানে একটা উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে—দেখা গিয়াছে ১৯৬১ সালের মধ্যেই হাবানা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৬০ ভাগ শিক্ষক কুবা ছাড়িয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি এলাকায় চলিয়া আসিয়াছিলেন। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে বিপ্লবের বয়স মাত্র দুই বছর চারি মাস হইয়াছে। ঐমাসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবর্তনায় কিছু দেশত্যাগী কুবানো কুবায় হামলা চালায়। যে এলাকা দিয়া তাহারা কুবায় নামিতে চাহিয়াছিলেন তাহার নামটা বেশ—শুয়োর উপসাগার (হিস্পানিতে প্লায়া হিরন)। এই অভিযান ব্যর্থ হয়। খোদ কাস্ত্রো এই হামলাকারীদের মুখোমুখি যুদ্ধ করেন। প্রায় ১২০০ হামলাকারী জীবিত বন্দী হয়। কাস্ত্রো উহাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নাই। অনেকেই বলিয়া থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি কেনেডি নিহত হইয়াছিলেন এই অভিযান ব্যর্থ হওয়ার কারণেই।

মার্কিন আক্রমণের আশংকা হইতে আত্মরক্ষার তাগিদে কুবা সোবিয়েত রাশিয়ার সাহায্য প্রার্থনা করিলে রাশিয়া কুবায় কিছু পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসাইতে রাজি হয়। মার্কিনদেশ তখন কুবার চারদিকে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এই সংকট ‘কুবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’ নামে খ্যাতি অর্জন করিয়াছে। শেষমেশ এই সংকটের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক হইতে তাহাদের ক্ষেপণাস্ত্র সরাইয়া লইবার বিনিময়ে সোবিয়েত দেশকে কুবা হইতে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সরাইতে বাধ্য করে। পৃথিবী একটা পরমাণু যুদ্ধ হইতে আপাতত রক্ষা পায়। ইহার পর মার্কিন দেশ আর কুবা আক্রমণ করে নাই।

কিন্তু তাহারা অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত রাখে। অব্যাহত রাখে কুবার নেতাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র। এই দুষ্কর্মে তাহাদের দুই প্রধান সহযোগী। এক নম্বরে দেশত্যাগী কুবানো লোকের দল। স্মর্তব্য এই যে কুবা হইতে সে দেশের জনসংখ্যার প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ এখন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। দুই নম্বরে মার্কিন পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য প্রচারযন্ত্র। পঞ্চাশ বছরেও এই অবরোধ বন্ধ হয় নাই। কুবার বিপ্লব এইভাবেই সারা দুনিয়ার নিপীড়িত জাতির প্রতিনিধি হইয়া উঠিয়াছে। ইতিহাস ফিদেল কাস্ত্রোকে বীরের তকমা পরাইয়া দিয়াছে। কে বলিবে, ইতিহাস তাঁহাকে দায়মুক্ত করে নাই? ১৯৫৯ হইতে ২০১৬—এই সাতান্ন বছরে কুবা যে আদৌ টিকিয়া থাকিতে পারিয়াছে ইহাই তাঁহাকে পহিলা দফা দায়মুক্তি দিয়াছে।

টিকিয়া থাকাই কিন্তু ইতিহাসে শেষ কথা নহে। ক্ষুদ্র কুবা শুদ্ধ টিকিয়াই থাকে নাই, এঙ্গোলার মতন দেশের স্বাধীনতা বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য প্রায় দুই হাজার কুবানো সৈনিক প্রাণদানও করিয়াছে। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘কুয়িতো কুয়ানাবালে’ নামক এক জায়গার যুদ্ধে কুবার সেনারা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদীদের পরাজিত করে। তাহাতে শুদ্ধ এঙ্গোলা রক্ষা পায় নাই, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের পরাজয়ও সূচিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন মান্ডেলা ১৯৯১ সালে কারাগার হইতে মুক্তি পাইয়া প্রথমে যে দেশে বেড়াইতে গিয়াছিলেন তাহার নাম কুবা। মান্ডেলা বলিয়াছিলেন, কুবার কাছে মানবজাতির অনেক ঋণ। সেই ঋণ অপরিশোধ্য।

৩০ নভেম্বর ২০১৬