মানবসভ্যতার প্রায় সবটা জুড়েই রয়েছে যুদ্ধের ইতিহাস। মানুষের জানা ইতিহাসের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এমন কোনো সময় পাওয়া যাবে না, যখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধ চলমান ছিল। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ, দেশে দেশে যুদ্ধ। অনেক দেশ মিলেও যুদ্ধ হয়ে গেছে কয়েকবার। এর নাম দেয়া হয়েছে বিশ্বযুদ্ধ। পৃথিবীর সব যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি সত্যই পাওয়া যাবে। তা হলো, এসব যুদ্ধের প্রায় সবই ঘটেছে গোত্রপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানদের অহংকার, দম্ভ, ক্ষমতার লোভ কিংবা প্রতিহিংসার কারণে। এর সঙ্গে মানুষের শান্তি বা মঙ্গলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ছিল না কোনো শান্তির বার্তাও।

পৃথিবীতে অনেক সহিংসতা, যুদ্ধ ও প্রাণহানি ঘটেছে কেবল ধর্মীয় উন্মাদনার কারণেও। ধর্মের নামে মানুষে মানুষে হানাহানির নাম দেয়া হয়েছে ‘পবিত্র যুদ্ধ’। যুগের পর যুগব্যাপী চলমান এসব তথাকথিত ‘পবিত্র যুদ্ধে’ নিহত হয়েছে অগণিত মানুষ। আহত হয়েছে কত শত তার হিসাব নেই কারো কাছে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ অথবা ধর্মীয় উন্মাদনার যুদ্ধ, সব যুদ্ধেই প্রধান প্রতিপক্ষ মানুষ। মানুষই যুদ্ধ করেছে মানুষের বিরুদ্ধে। অথচ রাষ্ট্রনায়কদের প্রধান দায়িত্বই হলো মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বিঘ্ন ও নিষ্কণ্টক করা, জীবনমান উন্নত করা। আর মানুষের মধ্যে বিরাজমান অপরাধপ্রবণতা, অহংবোধ কিংবা ইহজাতিক লোভ-লালসামুক্ত করে বিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ধর্মের মূল লক্ষ্য। অন্তত ধর্মের ইতিহাস তারই সাক্ষ্য দেয়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স ও জার্মানির রাষ্ট্রনায়করা যখন সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তির প্রদর্শন করে যাচ্ছিলেন, তখন প্যারিসের একটি নীরব নির্জন বাড়িতে আপন মনে গবেষণা করে চলছেন একজন বিজ্ঞানী। দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন পরস্পরকে শত্রুজ্ঞান করে একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বদ্ধপরিকর, তখন এ বিজ্ঞানী দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মানবজাতির অভিন্ন শত্রুর সন্ধানে নিরন্তর গবেষণায় মগ্ন। এ বিজ্ঞানীর নাম লুই পাস্তুর।

লুই পাস্তুর যুদ্ধ করেছেন পৃথিবীর তাবৎ মানুষের এক অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে। মানবজাতির এ শত্রুকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। এদের চোখেও দেখা যায় না। এরা অনেক ধূর্ত। এ অদৃশ্য ধূর্ত শত্রু জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে সব মানুষকেই আক্রান্ত করে। এরা অনেক দ্রুতগামী হয়ে ওঠে সময় ও সুযোগ পেলে। এরা মহামারী তৈরি করে। আর এ মহামারীর কারণে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর জনমানবশূন্য হয়ে যায়। রাজায় রাজায় যুদ্ধে যত মানুষ মারা গিয়েছে এ পৃথিবীতে, এ অদৃশ্য শত্রুর কবলে পরে তার চেয়ে কম মানুষ মারা যায়নি।

তখনকার যুগে মনে করা হতো, ঈশ্বর মানুষের অপকর্মে বিরক্ত হয়ে শাস্তিস্বরূপ মহামারী পাঠিয়ে থাকেন এ পৃথিবীর মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য। ধারণা করা হতো, রোগ হলো মানুষের পাপের কারণে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে অনিবার্য শাস্তি। আর মহামারী হলো কোনো এলাকার সম্মিলিত মানবগোষ্ঠী দ্বারা সংঘটিত অপকর্মের জন্য ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত শাস্তি। এ শাস্তি অলৌকিকভাবে আসে অদৃশ্যলোক থেকে। এ অপবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লুই পাস্তুর ঋজু হয়ে দাঁড়ালেন। দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, মহামারী কোনো অলৌকিক শাস্তি নয়। এক ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব এর জন্য দায়ী। অতিক্ষুদ্র বলে এদের ডাকা হয় জীবাণু নামে। শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকুল, এমনকি উদ্ভিদও এ জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি খাদ্যদ্রব্য ও নানা দ্রব্যসামগ্রী পচনের পেছনেও দায়ী জীবাণু। এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুই মহামারীর প্রধান কারণ। মহামারী থেকে বাঁচতে হলে এদের হটাতে হবে সবার আগে। কেউ শুনল তার কথা, অনেকেই শুনল না। অনেকে বিরোধিতাও করতে লাগল। তাতে কিছু যায় আসে না। সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ক্ষুদ্র জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন লুই পাস্তুর।

লুই পাস্তুরের জন্ম ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ফ্রান্সের ডোলেতে। বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবেন এমন কোনো ধারণা ছোটবেলায় তার ছিল কিনা তা জানা যায় না। তবে জানা যায়, বালক বয়সে তার একটা বড় গুণ ছিল ছবি আঁকা। ছবি আঁকায় পারদর্শী এ সাধারণ মানের ছাত্রটি রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক পাস করে অধ্যাপনার দায়িত্ব নিলেন। প্রেম করে বিয়ে করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার মেয়েকে। অল্পদিনেই সুখের সংসারে ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম হলো। কিন্তু মাত্র নয় বছর বয়সে ভীষণ আদরের মেয়েটি মারা গেল প্রাণঘাতী টাইফয়েড জ্বরে। পাঁচ-পাঁচটি সন্তানের তিনটিই অকালে মারা গেল। নিদারুণ কষ্ট বুকে নিয়ে তিনি রোগবালাইয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে লাগলেন। আবিষ্কার করলেন রেশমের পোকা, ফলের রসে তৈরি মদ পচে যাওয়া, ভেড়ার পাল দলবেঁধে মরে যাওয়া, আর মানুষের নানা অসুখবিসুখ যেন একই সুুতায় বাঁধা। লুই পাস্তুর জানালেন, এদের সবার পেছনেই রয়েছে সেই অদৃশ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুর হাত। এসব জীবাণু এক মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষে, কিংবা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে কীভাবে ছড়ায়, সে তথ্যও জানালেন। জানালেন জামাকাপড় থেকে বাসনকোসন পরিষ্কার রাখা কেন গুরুত্বপূর্ণ সে তথ্যও। হাত-পা একটু ভালো করে ধুয়ে নিলে অনেক রোগবালাই কাছেই আসতে পারে না, এ তথ্যও তারই দেয়া।

লুই পাস্তুর আমাদের জানালেন, কেবল ফলের রসই নয়, যেকোনো দ্রব্যাদি পচনের পেছনেও রয়েছে জীবাণু। কোনোভাবে এসব দ্রব্যাদি থেকে জীবাণুকে আলাদা করা গেলে কিংবা জীবাণু যাতে দ্রব্যসামগ্রীকে আক্রমণ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে পারলে তা আর নষ্ট হবে না। তিনি আবিষ্কার করলেন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করা যায়। যেমন দুধ বা অন্য কোনো তরল পদার্থকে অল্প তাপে নির্দিষ্ট সময় উত্তপ্ত করে জীবাণুমুক্ত করে বায়ুহীন অবস্থায় রাখলে তা আর জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হবে না। খাদ্যদ্রব্যকে জীবাণুমুক্ত রাখার এ পদ্ধতিটিকে আমরা এখন পাস্তুরিতকরণ বলি। এর আগে তিনি আবিষ্কার করলেন রেশম পোকার মড়ক দূরীকরণ।

পাস্তুর ততদিনে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। ফ্রান্সের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের বিজ্ঞানী মহলেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পরেছে। অন্য সব বিখ্যাত মানুষের মতো তার জীবনে বিখ্যাত হওয়ার কোনো আলামত ছিল না বালক বয়সে। সাধারণ ঘরের সাধারণ মানের একজন বালক ছিলেন তিনি। দরিদ্র পিতা ট্যানারিতে চাকরি করে কোনো রকমের সংসারের ভরণপোষণ করতেন। স্কুলের ফলাফলও ছিল সাধারণ মানের। কিন্তু এ সাধারণ মানের একজন ছাত্রই পরবর্তী সমেয় অসাধারণ হয়ে উঠেছেন নিজ কর্মগুণে।

কিন্তু তার এ পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না কোনোমতেই। জীবনকে বাঁচানোর যুদ্ধটা মানুষ মারার যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী। এ যুদ্ধের একজন সৈনিকের জীবন তাই অন্য যেকোনো সৈনিকের চেয়ে হাজার গুণ কঠিন সংগ্রামমুখর। পাস্তুরের জীবন সে কথারই সাক্ষ্য দেয়।

পাগলা কুকুরে কামড়ালে জলাতঙ্ক রোগ হয়, এ কথা সবারই জানা। কিন্তু এ রোগ সারবে কী করে, সে কথা কেউ জানত না তখনো। একবার এক বালককে কুকুরে কামড়াল। বালকটির মা-বাবা লুই পাস্তুরের বাড়িতে এসে সন্তানের প্রাণভিক্ষা চাইলেন। যেকোনো মূল্যে তার ছেলেকে বাঁচাতে হবে। পাস্তুর প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন।

কিন্তু বিজ্ঞানের পথ কঠিন। তার স্বদেশী বিজ্ঞানী ও চিকিত্করা তার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। একজন রসায়ন বিজ্ঞানী কী করে মানুষের চিকিৎসা করবেন! এটা অনুচিত, এটা অন্যায়। ছেলেটি যদি মারা যায়, এর দায় কে নেবে? সাফ জানিয়ে দেয়া হলো, ছেলেটির মৃত্যু হলে এর সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে তাকে। কারাদণ্ড কিংবা অন্য যেকোনো দণ্ড। লুই পাস্তুরের প্রিয়তমা স্ত্রীও সম্ভাব্য দণ্ডভয়ে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। স্বামীকে বারণ করলেন মৃদুস্বরে। কিন্তু দৃঢ়প্রত্যয়ী পাস্তুর এগিয়ে চললেন একাই। নিজের জীবনকে বাজি রেখে অন্যের জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠলেন এবং সফল হলেন। জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করলেন তিনি।

রোগীর চিকিৎসা করার আগে-পরে ডাক্তার ও নার্সদের হাত এবং যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করা দরকার। কেন দরকার সে তথ্য পাস্তুরেরই দেয়া। লুই পাস্তুরের আবিষ্কারের কারণে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে জলাতঙ্ক রোগ। গুটিবসন্ত, জলবসন্ত রোগে এখন আর কেউ মারা যায় না।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনাগত কালের মানুষের নিরাপত্তার জন্য আর নাম না জানা সব জীবাণুদের শায়েস্তা করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি ইনস্টিটিউট। পাস্তুর ইনস্টিটিউট এর নাম। ১৮৮৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। লুই পাস্তুর বলেন, ‘বিজ্ঞানের কোনো দেশ নেই, জ্ঞান হলো মানবতার সম্পদ, যা সারা পৃথিবীকে আলোকিত করে।’ ১৮৯৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মহান এ বিজ্ঞানীর মৃত্যু হলে পাস্তুর ইনস্টিটিউশন চত্বরেই তাকে সমাহিত করা হয়।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পাস্তুর ইনস্টিটিউট মানুষের অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ করে চলেছে। জীবন বাঁচানোর এ যুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি সফলও হয়েছে অনেকবার। ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, যক্ষ্মা, পলিমাইলিটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, পীতজ্বর, প্লেগের মতো মরণ ব্যাধী রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছে। স্বীকৃতিস্বরূপ কমপক্ষে ১০ জন বিজ্ঞানী পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। শেষ হওয়ারও নয়। পৃথিবী এখন আবার নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে নতুন এক জীবাণু দ্বারা। এর নাম কভিড-১৯। এর বহুল প্রচলিত নাম নভেল করোনাভাইরাস। পৃথিবীজুড়ে এখন নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। ক্ষতিকর এ ভাইরাসকে পরাজিত করার জন্য দেশে দেশে অসংখ্য গবেষক-বিজ্ঞানী প্রাণান্ত যুদ্ধ করে চলেছেন নীরবে নিভৃতে। এখনো সফলতা আসেনি হয়তো। তবে আমি নিশ্চিত, একদিন সাফল্য আসবেই। চলমান এ যুদ্ধের সব বীর সেনানীর জন্য আগ্রিম শুভেচ্ছা এবং অফুরান ভালোবাসা।

 

সফিক ইসলাম: শিক্ষক, লেখক ও গবেষক