যে দুটো চিত্রকর্মের কথা এখানে আলোচিত হবে তার প্রথমটা অসম্পূর্ণ; দ্বিতীয়টা শিরোনামহীন। দুটোর বহিরঙ্গ যা-ই হোক, এদের অন্তর্নিহিত অর্থে দুটো মহামারীর কথা আছে, যা এদের শিল্পীদেরও অকালে কেড়ে নিয়েছে। প্রথম চিত্রকর্মটি মাত্র ২৮ বছর বয়সে স্প্যানিশ ফ্লুতে প্রাণ হারানো অস্ট্রীয় অভিব্যক্তিবাদী শিল্পী এগন শিলার ‘পরিবার’ বা ‘উবু হওয়া দম্পতি’ (১৯১৮); আর দ্বিতীয়টি ৩৭ বছর বয়সে এইডসে মারা যাওয়া মার্কিন শিল্পী ডেভিড ভয়নারোভিচের শিরোনামহীন একটি ছবি যা ‘পতনশীল মোষ’ (১৯৮৮-৮৯) নামে পরিচিত।
স্প্যানিশ ফ্লুর
কাছে নীরব
আত্মসমর্পণ
১৮৯০ সালে
অস্ট্রিয়ার তুলন
শহরে জন্মানো
এগন শিলা
১৬ বছর
বয়সে ভিয়েনার
স্কুল অব
আর্টস অ্যান্ড
ক্রাফটসে পড়তে
যান। সেখানে
তার মূল
শিক্ষক শিল্পী
ক্রিশ্চিয়ান গ্রিপেনকার্লের
কঠোর নিয়মনিষ্ঠ
শিক্ষণ পদ্ধতি
আর রক্ষণশীল
অঙ্কন রীতিতে
ক্ষুব্ধ ও
হতাশ হয়ে
তিন বছর
পর স্কুল
ত্যাগ করেন।
এ স্কুলের
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
ছিলেন প্রখ্যাত
প্রতীকীবাদী শিল্পী
ও ভিয়েনাকেন্দ্রিক
আভা-গাঁর্দ
আন্দোলনের অন্যতম
গুস্তাফ ক্লিম?ত,
যিনি তরুণ
শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা
করতেন। শিলা
তার সঙ্গে
যোগাযোগ করলে
ক্লিম্ত তাকে
শিল্পের দুনিয়ায়
টিকে থাকতে
সাহায্য করেন।
এ পর্যায়ে
শিলার কর্মে
ক্লিম্ত ও
ককস্কার এবং
আভা-গাঁর্দ
আন্দোলনের প্রভাব
থাকলেও পরে
তিনি নিজস্ব
শিল্পরীতি গড়ে
তুলতে সক্ষম
হন। মাত্র
১৮ বছর
বয়সে শিলা
প্রথম চিত্র
প্রদর্শনী করেন।
তার চিত্রকর্ম
অন্তর্নিহিত শক্তি,
অপরিশীলিত যৌনতা,
আত্মপ্রতিকৃতি, বিশেষত
নগ্ন আত্মপ্রতিকৃতির
জন্য আলোচিত।
তার শিল্পকর্মে
মোচড়ানো দেহাকৃতি
আর অভিব্যক্তিপূর্ণ
রেখার উপস্থিতি
তাকে অভিব্যক্তিবাদী
শিল্পীদের মধ্যে
অন্যতম করে
তুলেছে। ক্লিমতের
মৃত্যুর পর
মাত্র ২৮
বছর বয়সে
শিলা অস্ট্রিয়ার
আভা-গাঁর্দ
আন্দোলনের পুরোধায়
পরিণত হন।
বিশাল স্টুডিওর
মালিক শিলা
নতুন নতুন
প্রদর্শনীর আয়োজন
করেন, ইডিথ
হা?র্মসকে
বিয়ে করেন,
বড় সিরিজ
আঁকার প্রস্তুতি
নেন। ঠিক
এ সময়
ইউরোপে স্প্যানিশ
ফ্লুর মহামারী
আঘাত হানে।
এগন শিলার
‘পরিবার’
এমন একটা
চিত্রকর্ম, যার
একীভূত কম্পোজিশন
আর ভারসাম্য
তার শেষের
দিকের অঙ্কনশৈলীর
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ধারণা করা
হয়, ছবির
কেন্দ্রে শিল্পী
স্বয়ং নিজেকে
এঁকেছেন, সামনে
আছেন তার
স্ত্রী ইডিথ
হা?র্মস,
আর একেবারে
সামনে তাদের
অজাত সন্তান।
শিলার অন্য
সব ছবিতে
চরিত্রগুলোর যে
অস্বাভাবিক অঙ্গসংস্থান,
ক্রোধ আর
ক্ষোভের অভিব্যক্তি
দেখা যায়,
এ ছবিতে
চরিত্রগুলো ঠিক
তার উল্টো।
এখানে উবু
হয়ে বসা
চরিত্রগুলো শান্ত,
যাদের দেখে
দর্শকের মনে
হবে, তারা
এক অবশ্যম্ভাবী
করুণ পরিণতি
মেনে নিয়ে
তার জন্য
অপেক্ষা করছেন।
১৯১৮-২০
সালে বিশ্বব্যাপী
স্প্যানিশ ফ্লু
মহামারীতে প্রায়
পাঁচ কোটি
মানুষ প্রাণ
হারায়, যাদের
মধ্যে ছয়
মাসের গর্ভবতী
ইডিথ হা?র্মসও
ছিলেন। ইডিথের
মৃত্যুর মাত্র
তিনদিন পরে
শিলা নিজেও
একই রোগে
প্রাণ হারান।
শিল্পী সম্ভবত
বুঝতে পেরেছিলেন
যে তিনি,
তার স্ত্রী
আর তাদের
অনাগত সন্তান
কেউই এ
মহামারীর হাত
থেকে রেহাই
পাবেন না।
তাই নির্মোহভাবে
নিজেই নিজেদের
মৃত্যু পরোয়ানা
এঁকে গেছেন।
ছবির পুরুষটি
অপেক্ষাকৃত শীর্ণকায়,
দৃষ্টি সামনের
দিকে নিবদ্ধ।
তার অভিব্যক্তিতে
উদ্বেগ নেই,
আতঙ্ক নেই।
মনে হয়
তিনি যেন
কোনো কিছুর
জন্য অপেক্ষা
করছেন। তার
ডান হাত
দিয়ে বাম
কাঁধ চুলকাচ্ছেন,
আর বাঁ
হাত বাম
হাঁটুর ওপর
দিয়ে ঝুলিয়ে
রাখা। তার
গায়ের রঙ
হলেদেটে এবং
জায়গায় জায়গায়
লাল রঙের
ছোপ রয়েছে।
ছবির এলো
চুলের সুন্দরী
নারীর গায়ের
রঙ গোলাপি
হলেও তাতে
লাল রঙের
ছোপ আছে।
তার দৃষ্টি
একটু বামে
নিচের দিকে
নিবদ্ধ। তার
অভিব্যক্তি উদ্বেগহীন
শান্ত সমর্পণের।
ছবির শিশুটি
দুই হাতে
একটা বালিশ
আঁকড়ে ধরে
একেবারে বাঁয়ে
ঊর্ধ্বমুখে কৌতূহলী
দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে। তার
গায়ের রঙ
সাদাটে গোলাপি।
শিশুটির গায়ে
কিছু একটা
জড়ানো আছে,
কিন্তু নারী-পুরুষ
উভয়ে নগ্নদেহী।
কোনো চরিত্রের
পায়ের পাতা
দেখা যাচ্ছে
না। ছবিটির
পটভূমি অস্পষ্ট।
মোটামুটি ধারণা
করা যায়,
পরিবারটি ধাপবিশিষ্ট
আসনে অথবা
ভাঁজ করা
কম্বলের ওপর
বসে আছে।
পটভূমিতে গাঢ়
বাদামি, লাল
আর ধূসর
রঙের সঙ্গে
হালকা সবুজ
আর নীল
রঙ ব্যবহার
করা হয়েছে।
অবসন্নতা, অপ্রতিরোধ্য
কিছুর প্রতি
আত্মসমর্পণ, অবমাননা
আর সব
হারানোর বেদনা
সবকিছু যেন
একসঙ্গে ছবিটিতে
মূর্ত হয়ে
ওঠে। চরিত্রগুলোর
পেশির পরস্ফূিটনে
এখানকার দর্শকের
মনে এসএম
সুলতানের কথা
আসবে। ছবিতে
নারী আর
শিশুটি মিলে
পুরুষটির দুই
পায়ের মাঝে
একটা ডিমের
আকৃতির রূপ
নেয়। যেন
পুরুষটি ডিমের
ভেতরে থাকা
নতুন প্রাণের
মতো মা
ও শিশুকে
নিরাপদে ধারণ
করে আছেন,
কিন্তু তাতেও
বাকি দুটো
চরিত্র গুরুত্ব
হারায় না।
এখানে প্রত্যেকটি
চরিত্র দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে
স্পষ্ট ও
পরিপূর্ণ, এবং
তাদের প্রত্যেকের
নিজস্ব স্পেস
আছে। পুরুষ
চরিত্রটি তার
পেছনের অন্ধকার-অস্পষ্ট
পটভূমির সঙ্গে
গা মেলানো,
কিন্তু তাতে
অন্য চরিত্রগুলোর
সঙ্গে তার
সংহতি বিনষ্ট
হয় না।
‘পরিবার’
শিলার দুরূহতম
সৃষ্টিকর্মের একটি।
এটি শতবর্ষ
আগের মহামারীর
নির্মমতা ও
মানুষের করুণ
পরিণতির সার্থক
উপস্থাপন।
অপ্রতিরোধ্য এইডস
বিষয়ে সতর্কবার্তা
ডেভিড ভয়নারোভিচের
পতনশীল মোষের
ফটো মন্তাজটি
গত শতাব্দীর
আশির দশকে
এইডসসৃষ্ট সংকটকালের
এক রূঢ়
চিত্রায়ণ। ছবিতে
দেখা যায়,
এক পাল
মোষ খাড়া
পাহাড়ের ঢাল
থেকে ঝাঁপিয়ে
পড়ছে। এটা
স্পষ্ট নয়
যে মোষগুলো
কি আত্মহত্যা
করছে নাকি
কোনো কিছু
তাদের তাড়িয়ে
এখানে এনেছে।
এটাও বোঝার
উপায় নেই,
মোষগুলো অত
ওপরে কী
করে গেল।
সাদা-কালো
চিত্রকর্মটি আসলে
ওয়াশিংটন ডিসির
এক জাদুঘরে
রাখা স্থানীয়
ইন্ডিয়ানদের মোষ
শিকারের প্রাচীন
পদ্ধতির ওপর
করা এক
ডায়ারামার (ধারাবাহিক
চিত্র) একটি
ছবি থেকে
নেয়া। এখানে
কমপক্ষে চারটি
মোষকে দেখা
যায়, যার
প্রথমটি মাথা
উল্টে পড়ে
গেছে, দ্বিতীয়টি
মাথা নিচু
করে ঢালে
গড়িয়ে পড়ছে,
তৃতীয়ট্রি শরীরের
বেশির ভাগ
উঁচু পাড়
থেকে ঝুলে
পড়েছে আর
চতুর্থটি পাড়
থেকে উপত্যকার
দিকে ঝুঁকে
আছে। এর
পটভূমিতে ঘোলাটে
আকাশ, দূরে
আবছা পর্বতমালার
রেখা, উপত্যকায়
পাহাড়ি নদী
ও উল্টো
দিকের পর্বত
সারির পাদদেশ
দেখা যাচ্ছে।
মোষদের এমন
করুণ পরিণতি
খুব স্পষ্টভাবে
হতাশা আর
অবশ্যম্ভাবী ভয়াবহ
নিয়তির সরাসরি
বার্তা দেয়।
চিত্রকর্মটি সেই
সময়ের, যখন
ভয়নারোভিচের নিজেরই
এইচআইভি পজিটিভ
ধরা পড়েছে।
মোষের মতো
শক্তিশালী প্রাণীর
এ অসহায়,
নির্মম পরিণতি
এইডসের বিরুদ্ধে
প্রাগ্রসর মানুষের
অসহায়ত্বকে কেবল
ফুটিয়ে তোলে
না, সম্ভবত
তার সঙ্গে
আরেক নির্মম
ইতিহাসকেও নতুন
করে সামনে
নিয়ে আসে।
উনিশ শতকে
আমেরিকায় একটা
কথা প্রচলিত
ছিল, ‘যতগুলো
পারো মোষ
হত্যা করো!
একেকটা মৃত
মোষ মানে
একেকটা ইন্ডিয়ান
নিপাত গেল!’
‘বাফেলো’
বিল কোডি
নামের এক
ভাড়াটে শিকারি
একাই মাত্র
দুই বছরে
চার হাজার
মোষ হত্যা
করেছিলেন। ইউরোপীয়
সেটেলারদের বিরুদ্ধে
স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের
প্রতিরোধকে চূর্ণ
করে দেয়ার
জন্য এ
মোষ হত্যাযজ্ঞ
আয়োজন করা
হয়েছিল। কিছু
কিছু সরকারি
কর্মকর্তা পর্যন্ত
এ হত্যাযজ্ঞের
পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।
বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে
থাকা সমতলের
ইন্ডিয়ানদের নির্মূল
করার জন্য
মোষ নির্মূল
করা দরকারি
ছিল। কারণ
মোষ ছিল
সমতলের ইন্ডিয়ানদের
জীবিকা আর
খাদ্যের উৎস।
ভয়নারোভিচের ছবি
যেন বলতে
চায়, উনিশ
শতকের মোষ
হত্যাযজ্ঞ যেমন
সমতলের ইন্ডিয়ানদের
প্রায় নির্মূল
করে দিয়েছিল,
বিশ শতকের
এইডসও তেমনি
মানবজাতিকে প্রায়
নির্মূল করে
দিতে পারে।
কোনো কোনো
চিত্র সমালোচকের
মতে, এটি
আসলে রোনাল্ড
রিগানের দুর্নীতি
ও জরাগ্রস্ত
সময়ের প্রতিরূপ,
যেখানে শক্তিশালী
আমেরিকান জাতিকে
আত্মহননের নিমিত্তে
তাদের রাষ্ট্রপতি
এক খাড়া
পাহাড়ের ঢালের
মুখে এনে
হাজির করেছেন।
চিত্রকর্মটি আসলে
কী বোঝায়,
সেটা বুঝতে
গেলে খোদ
শিল্পীর জীবনেতিহাস
ফিরে দেখার
অবকাশ রয়েছে।
১৯৫৪ সালে
জন্মানো ভয়নারোভিচের
বয়স যখন
মাত্র দুই,
তখন তার
মা-বাবার
ছাড়াছাড়ি হয়ে
যায়। ফলে
শিশুকালে তাকে
প্রায়ই নির্মম
যৌন নির্যাতনের
শিকার হতে
হয়েছে। কৈশোরে
নিউইয়র্কের টাইম
স্কয়ারের রাস্তায়
তাকে পতিতাবৃত্তি
পর্যন্ত অবলম্বন
করতে হয়েছে।
তার সৌভাগ্য
যে তিনি
ম্যানহাটানের হাইস্কুল
অব মিউজিক
অ্যান্ড আর্টে
পড়াশোনা শেষ
করার সুযোগ
পেয়েছিলেন। কিছুদিন
নিউইয়র্কের বাইরে
কাটানোর পর
সত্তরের দশকের
শেষ দিকে
যখন আবার
ফিরে আসেন,
তখন তিনি
আভা-গাঁর্দ
ধারার মিশ্র
শিল্প মাধ্যমের
সবচেয়ে সম্ভাবনাময়
শিল্পী। ভয়নারোভিচ
কেবল চিত্রকর
নন, তিনি
আলোকচিত্রী, লেখক,
চলচ্চিত্র নির্মাতা,
অভিনেতা, গীতিকার,
গায়ক এবং
অতি অবশ্যই
এইডস অ্যাক্টিভিস্ট।
ব্যক্তিগত জীবনাচরণে
তিনি সমকামী
ছিলেন। ১৯৮৭
সালে তার
দীর্ঘদিনের পরামর্শক
ও প্রেমিক
আলোকচিত্রী পিটার
হুজার এইডসে
মারা যান।
এ সময়
তার নিজেরও
এইচআইভি-পজিটিভ
ধরা পড়ে।
হুজারের মৃত্যুতে
তার কাজে
রাজনৈতিক বিষয়াবলি
আরো স্পষ্টভাবে
ফুটে উঠতে
থাকে, বিশেষত
সামাজিক ও
আইনগত অবিচার,
অসংগতি, রাজনৈতিক
সক্রিয়তা ইত্যাদি।
এসব কাজের
মাঝে এইডসের
মহামারীর সতর্কতাও
নিবেশিতভাবে ছিল।
এইডস মহামারীসংক্রান্ত
রাজনৈতিক ও
সামাজিক বিষয়াবলি
নিয়ে তিনি
অনেক বইও
লিখেছেন।
ভয়নারোভিচ নিজের
অবশ্যম্ভাবী পরিণতির
কথা জানতেন,
কিন্তু হাল
ছেড়ে দেননি।
তাই ১৯৯২
সালে এইডসে
মারা যাওয়ার
আগ পর্যন্ত
তিনি এইডস
বিষয়ে সচেতনতা
সৃষ্টিতে নানা
মাধ্যমে কাজ
করে গেছেন।
পতনশীলের মোষের
চিত্রকর্মটিকে তাই
এইডসের মহামারীতে
মানুষের করুণ
পরিণতির ব্যাপারে
এক সতর্কবার্তা
হিসেবে ধরা
অমূলক হয়
না।
জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ: লেখক, প্রকৌশলী





