মানুষের জন্মের মতো মৃত্যুও সত্য। অবধারিত মৃত্যু যখন স্বাভাবিক হয়, তখন সেই মৃত্যুকে মানুষ কবুল করে নেয়। কিন্তু যে মৃত্যু অনির্বচনীয় কিংবা গণ হয়, তাকে মেনে নেয়া বাস্তবে কঠিন। মানব প্রকৃতিতে মহামারী এসেছে কালে কালে। অজানা রোগেই প্রাণ সংহার অগণিত মানুষের। এমন অস্তিত্বের সংকট মানুষ বারবার কাটিয়ে উঠেছে। মানুষ জয় করেছে জীবন। প্রাণ প্রকৃতি! ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী হয় ১৩৪৭ সালে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামের মহামারীর ভয়াবহ প্রকোপ ছিল টানা প্রায় চার বছর। কিন্তু বারবার গোটা ইউরোপকে পোহাতে হয় প্লেগের ৩০০ বছরের দুর্বিষহ জীবন। সমুদ্রের নাবিক থেকে ছড়ানো সেই মহামারীতে প্রাণ যায় সাড়ে সাত কোটির অধিক মানুষের! শুধু ভেনিসে মারা যায় এক লাখ মানুষ! মানুষের সেই অসহায় মৃত্যুর চিহ্ন নানাভাবে এসেছে শিল্প, সাহিত্যে ও লেখায়। মহামারী ভয়াবহ পরিস্থিতি মানুষকে নতুন চিন্তা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আর নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। নির্মম অভিজ্ঞতায় মানুষ খুঁজেছে
নব-উত্থানের মানবিকতায়! সেই ভয়াবহ চিহ্নগুলো কেমন?
ইতালির
দুজন বিখ্যাত কবি ও লেখক ফ্রান্সিকো পেত্রার্ক ও জিওভান্নি বোক্কাচিও সেবার ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়
ব্ল্যাক ডেথ খ্যাত প্লেগ থেকে। মৃত্যুর ভয়াবহতা নিয়ে লিখেন তারা। তাদের একটি বইতে ব্যবহার হয় গিলেস লি মুসিসের শিল্পকর্ম। সেই শিল্পকর্মটির নাম ‘ডেকামেরন’ বা ‘অজানা’! এতে
দেখা যায় অজানা মৃত্যুর অমোঘ ইতিহাস। শিল্পকর্মে দেখা যায়, একদল অসহায় মানুষ লাশ আর লাশ নিয়ে ছুটছে। একদল লাশ দাফন করছে। একদল অপেক্ষা করছে। একদল রোগী বহন করছে! একদল কবর খুঁড়ছে! ক্যানভাসে এমন দৃশ্যেরই সমান্তরাল সাযুজ্য! দেখা যায় মানুষের বিমূর্ত অবয়বে মানবিক বিপর্যয়ের সেই করুণ দৃশ্য কতটা নির্মম। শিল্পের কাজ ইতিহাসের নতুন রেখা নির্মাণ। সময় আর বাস্তবতা ধরা। রঙ তার উজ্জ্বল সাক্ষী! সেই ক্ষেত্রে ‘অজানা’ নামের শিল্পকর্মটি কালের এক ঐতিহাসিক চিহ্ন! মানুষ যখন তার সংকটের ক্ষত চিহ্ন দেখতে পায়, তখন শিল্পে সেটা নতুর আকার রূপে জায়মান হয়! গিলেসের শিল্পকর্মটিও তাই। কারণ ইতালির শিল্পকলার রেনেসাঁর সেখানেই। মহাকবি দান্তের এলেগরিতেও ছবিটির ব্যবহার হয়। মনে রাখা দরকার, শিল্পের এলিগরি তত্ত্বের মূল কথা, ঘটনাকে বড় ক্যানভাসে বাস্তব-দুনিয়ার দশা তুলে ধরা। ফরাসি শিল্প সমালোচকরা এমন মৃত্যুকে বলেছেন ‘ডান্স ম্যাকাব্রে’। কথাটার বাংলা দাঁড়ায়, ‘মৃত্যুর
নৃত্য’! সেই
ক্ষেত্রে ‘অজানা’ নামের এই মিনিয়েচার ব্ল্যাক ডেথের ইতিহাসের অমূল্য এক দলিল!
২.
মহামারী
প্রথম বিপর্যয় ঘটে ব্যক্তির অজানা মৃত্যু দিয়ে। কিন্তু বড় বিপর্যয় ঘটে মানুষের সামাজিক বন্ধনের। এ বিপর্যয় ঘটে অভাবনীয় মৃত্যুর ভয় থেকে। জীবনের স্বাভাবিক অস্তিত্ব ব্যাহত হওয়ার ভেতর দিয়ে। মানব ব্যবস্থা হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। সহজভাবে বললে, প্রাণের সঙ্গে প্রকৃতির যে সম্বন্ধ তার বিচ্ছেদের ফলে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ! অনির্বচনীয় বিমারের সঙ্গে যুক্ত হয় খাদ্যাভাব। চলমান জীবন চরমভাবে অকূলস্থ হয়। মানবসভ্যতা থমকে যায়। ভেঙে পড়ে। বদলে যায় মানবসভ্যতার খোলনলচে। সবচেয়ে বিপদ চিকিৎসা কাঠামোর বিপর্যয়! ইউরোপে নানা সময়ে প্লেগের মহামারী ছিল ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতোই। ছোঁয়াচে রোগের ফলে রোগী থেকে চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়া এক স্বাভাবিক ঘটনাই। ধারণা করা হয়, সপ্তদশ শতাব্দীতে প্লেগের প্রাদুর্ভাবে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হান্স হলবেইন আর তাইতিয়ান মারা গেছেন। সে সময়ে আঁকা পল ফার্স্টের একটি শিল্পকর্ম এখন কিংবদন্তি হয়ে আছে। জার্মান শিল্পী পল এক ডাক্তারকে প্রতীকী করে পুরো সময়ের এক ভয়ংকর চিত্র উপস্থাপন করেছেন।
কী আছে সেই শিল্পকর্মে?
পল
ফার্স্টের শিল্পকর্মটির নাম ‘দের ডক্টর স্নোবেল ভন রোম’। বাংলায় কথাটার অর্থ দাঁড়ায় ‘রোম থেকে ফিরছেন ডাক্তার’। শিল্পকর্মটির মাধ্যম এচিং। পলের শিল্পকর্মে দেখা যায়, ওভারকোট গায়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন চিকিৎসক। মুখে পাখির মতো ঠোঁটযুক্ত মুখোশ। মুখোশের মাথার ঠোঁট এমন, যাতে কর্পূর কিংবা অন্য প্রতিরোধক কিছু রাখা যায়। মুখোশের ওপর দুটো ছিদ্র, যা দেখতে কাচের চশমার মতো! লম্বা চঞ্চুরটি নাকের ডগা থেকে সামনের দিকে ঝোঁকা! মুখোশের ফাঁকে মিটিমিটি একটি চোখ। মাথায় প্রশস্ত হ্যাটের মতো টুপি। পায়ে বুট। ওভারকোটটি নিত্য পোশাকের ওপরে পরা। বস্তুত এটি ছিল সপ্তদশ শতাব্দীতে পারি আর রোমের চিকিৎসকদের বর্ম। শিল্পকর্মের ক্যানভাসে দেখা যাচ্ছে, বিমূর্ত অবয়বের লোকটিকে শিশুরা পালাচ্ছে। পল প্রতীকী এক চিকিৎসকের ইমেজে সেই সময়ের নিদারুণ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেননা শিল্পে অবয়বের আকার মানুষ আর তার অসহায়ত্বের। কিন্তু অতি অস্তিত্বের ভেতর মৃত্যুর অন্য চেহার হাজির। শিল্প দর্শন বলে, আকারমাত্রই মূর্তের প্রতীক। অবয়বের আকার অন্য আকারে নিলে হয় বিমূর্ত। ফলে কিংবদন্তি এ শিল্পকর্ম বাস্তবের ভিন্ন বিমূর্ত বাস্তব, যা জীবন কিংবা মৃত্যুর প্রতীকী বাস্তব। বলা চলে, বাস্তবের বিমূর্ত রূপের ভয়ংকর সুন্দর শিল্প!
৩.
প্রকৃতির
বিন্যাসকে মেনে নেয়াই মানুষের প্রথম স্বাধীনতা। কিন্তু অপক্ষমতা আর খবরদারির ভেতর দিয়ে শুরু হয় মানুষ সঙ্গে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব! কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিক বলেন, প্রকৃতির বিন্যাসের মধ্যে মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপেই প্রকৃতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে! প্রকৃতি তাই দুর্মর শাসকে পরিণত হয়। আর শাসনের প্রতিফল আছে। প্রকৃতির প্রদত্ত অজানা মহামারী তার একটি। অনিরাময় রোগে এমন অগণিত মৃত্যু মানুষের মনে কী রূপ প্রভাব ফেলেছে, সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত শিল্পী আরনল্ড বাকলিনের একটি শিল্পকর্ম তার বেহতর উদাহরণ! ১৮৮৯ সালে আঁকা তার শিল্পকর্মটির নাম ‘প্লেগ’!
দেখতে খুব বেদনাদায়ক চিত্রকর্ম এটি! পুরো ক্যানভাসজুড়ে আছে বিধ্বস্ত প্লেগ আক্রান্ত এক নগরী। নৈঃশব্দ্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে দালানকোঠা। মাঝখানে ফাঁকা রাস্তা। তার ভয়ংকর এক বাদুড় পিঠে মৃত্যুরূপী অবয়ব। যেন সেটা বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে শহরজুড়ে। নিচে নানা রঙের পোশাক পরিহিত শবদেহ। বাকলিন খুব সুচারুরূপে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছেন শিল্পকর্মে। ছবির অগ্রভাগে মৃত নারীর গায়ে সুন্দর স্বর্ণসূচিকর্মযুক্ত পোশাক। দেখে মনে হতে পারে, রাস্তায় সুন্দর ধনী নারীদের লাশ পড়ে আছে! শিল্পকর্মে সৌন্দর্যের সঙ্গে মৃত্যুর বৈপরীত্য হাজির করেছেন বাকলিন! প্রশ্ন হচ্ছে, এমন দৃশ্য হাজির করার তাত্ত্বিক ভিত কী?
পশ্চিমা
দুনিয়ার বাকলিন প্রতীকবাদী শিল্পী হিসেবে পরিচিত! কিন্তু ‘প্লেগ’ শিল্পকর্মে একই সঙ্গে বেদনাদায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া নারী আর কিম্ভুতকিমাকার বাদুড়ের পিঠে মৃত্যুদূতের উপস্থিতি সমান বৈপরীত্যের! বাকলিন প্রভাবিত হয়েছিলেন বাসনাবাদ বা রোমান্টিসিজমের! ফলে তিনি শহরের প্রথাগত রীতি, মূল্যবোধ আর আবেগকে ফুটিয়ে তুলেছেন; যে ধ্বংসস্তূপে প্রোথিত হয়ে আছে বাস্তব প্রকৃতির সঙ্গে বিজ্ঞানের ধারণাগত নির্মাণ। যুক্তি আর কার্যকারণের আবেগেই নির্ধারিত হয়ে আছে সমাজের বাস্তব আচরণ। যেন প্রতীকী মৃত্যুকেই ডেকে আনছে বাস্তব সমাজ ব্যবস্থা! যা ভয়ংকর দৃশ্যে সৌন্দর্যের আদর্শকেই প্রতীকী রূপ হাজির করে; যেন মৃত্যু হাজির হয়েছে প্রকৃতি আর বাস্তব দশার বিপরীতে! শহর সেখানে মৃত্যুদূতের করতলে জনমানবহীন নিরাকারের আকার বলেই প্রতীয়মান!
ঐতিহাসিকভাবে
প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা মহামারী নতুন কিছু নয়। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগেও মহামারীতে চীনের একটি প্রাগৈতিহাসিক গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, যেখানে লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়; প্রত্নতাত্ত্বিকরা যার নাম দিয়েছিলেন ‘হামিন মঙ্গা’। এথেন্স আর স্পার্টার যুদ্ধের পর আড়াই হাজার বছর আগের মহামারীর কথা গ্রিক থুসিদিদেসের ইতিহাসে গ্রন্থিত আছে। প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী এ মহামারীতে আনুমানিক এক কোটি লোক প্রাণ হারায়। কিন্তু প্রকৃতিগত মহামারী শেষ কথা নয়। যতদিন প্রকৃতিতে প্রাণ আছে, ততদিন মানুষ টিকে থাকবে! দুর্যোগ আর বিপর্যয় কাটিয়ে মানুষের টিকে থাকাও শেষ কথা নয়। যেকোনো মহামারীর পর বিধ্বস্ত নগরে নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। নতুন চিন্তা, নতুন আবিষ্কার, নতুন শিল্প, নতুন সাহিত্য, নতুন দর্শন আর নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। তবে সত্য এই, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যাচিত সমন্বয়ই নতুন প্রতীতির জন্ম দেবে; যা ব্যাহত হলে প্রকৃতি রূঢ়ভাবে ফেরত দেবে। মানবিক বিপর্যয় ঠেককাতে আপাতত সেটাই স্মর্তব্য!
সাখাওয়াত
টিপু: কবি, প্রাবন্ধিক





