নভেল করোনাভাইরাসের ভয়ংকর সংক্রমণের দিনগুলোও একসময় স্মৃতি হয়ে যাবে, দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। যেমন করে দুঃস্মৃতি হিসেবে এখনো উঠে আসে অ্যান্টোনাইন প্ল্লেগ, জাস্টিনিয়ান প্লেগ, ব্ল্যাক ডেথ, স্ক্যানিশ ফ্লু, কলেরা মহামারী কিংবা হালের এইচআইভি এইডসের দিনগুলো, কখনো সাহিত্যে, কখনো চিত্রশিল্পে, কখনো কেবলই অশ্রুসিক্ত কথনে, নভেল করোনাভাইরাসের দিনগুলোও উঠে আসবে একালের ও আগামীকালের পেইন্ট ব্রাশে, কলমে, সাইবার কথোপকথনে। সেসব চিত্রকর্মের নাম হবে হয়তো সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং, আইসোলেশন, সেল্ফ কোয়ারেন্টিন, ভেন্টিলেটর, এন৯৫ মাস্ক, গৃহবন্দি জীবন, উন্মাদ ট্রাম্ক, করোনাকালে মাস্কচোর, চালচোর চেয়ারম্যান, করোনায় নিহত পোশাক বালিকা কিংবা মোবাইল মর্চুয়ারি—ভ্রাম্যমাণ মর্গ।

চিত্রশিল্পের লাগাতার মহোৎসব যে জাদুঘরে, যেখানে মোনালিসার অবস্থান সেই ল্যুভ বন্ধ করে দেয়ার আগে প্যারিসের শিল্পী মাস্ক পরিহিত মোনালিসার ছবি এঁকেছেন। ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি ভারতেও সুযোগ বুঝে স্ট্রিট আর্টিস্টরা নেমে এসেছেন। নভেল করোনাভাইরাসের ভয়বহতা তাদের ব্রাশে উঠে আসছে দেয়ালে ও এমনকি পিচঢালা রাস্তায়। আমরা অপেক্ষায় থাকব, ঠিক আমরা নই, আমরা হয়তো করোনাকালের বলিও হয়ে যেতে পারি, সময় অপেক্ষায় থাকবে, জিজ্ঞেস করবে—করোনাকালের শিল্পীরা কী করেছেন?

এ প্রশ্ন আমরাও করি—বিশ্ব ব্যাধি প্লেগের সময় শিল্পীরা কী করেছেন? কিংবা স্কেনিশ ফ্লু ড্যান্সিং ডেথ কেমন দেখেছেন শিল্পীরা। সময় প্রশ্ন করবে: করোনাকালে শিল্পীরা কি সোস্যাল ডিস্ট্যান্স বিধান মেনে চলেছেন?

হয়তো শিল্পী জবাব দেবেন, শিল্পীরা তো সবসময় নিঃসঙ্গ। শিল্পকর্ম নিঃসঙ্গতার সৃষ্টি। শিল্পী নিজের ভেতর স্টুডিওতে নিঃসঙ্গ এবং এমনকি জনতার ভিড়েও নিঃসঙ্গ। এ লেখাটিতে পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর চারজন শিল্পী আলব্রেখট ডুবার, টিশ্যান, কারাভাজ্জিও ও রেমব্রান্ট কেমন করে বিশ্ব ব্যাধিতে সাড়া দিয়েছেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।


আলব্রেখট ডুরার (১৪৭১-১৫২৮)

প্রবল ধর্মবিশ্বাসী ও ঈশ্বরবিশ্বাসী চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর আলব্রেখট ডুরার পঞ্চদশ শতাব্দীতে জোর দিয়ে বলেছেন, অবশ্যই শিল্পকলার ভিত্তি হবে বিজ্ঞান, বিশেষ করে গণিত। কারণ এটিই সবচেয়ে যথার্থ, সবচেয়ে যৌক্তিক ও বিজ্ঞানের চিত্রে প্রদর্শনযোগ্য। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন, ‘চিত্রশিল্পের সঠিক ভিত্তি যেহেতু জ্যামিতি, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেসব তরুণ চিত্রকলা শিখতে আগ্রহী তাদের জ্যামিতির মৌলিক বিষয় ও নীতিমালা শেখাব।’ একই সঙ্গে যিশু খ্রিস্টের কাছে তিনি প্রার্থনা করেছেন: আমাদের সাহায্য করো, যাতে তোমার ঘর শনাক্ত করতে পারি, যাতে পৃথিবীর উন্মত্ততা আমাদের প্রলুব্ধ না করে, যাতে তোমার আশীর্বাদ থেকে আমরা সরে না পড়ি।

ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই তিনি ইতালির তিন প্রধান শিল্পী রাফায়েল, জিওভানি বেলিনি ও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি একই সঙ্গে ঈশ্বর ও বিজ্ঞানে আস্থা নিয়ে সৃষ্টিশীল জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি মনে করতেন, ঈশ্বর শিল্পীকে তার আদেশ পালনের জন্য বেছে নেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, চিত্রশিল্প বিজ্ঞানের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে।

রেনেসাঁ চিত্রকলার ছিটেফোঁটা কেবল জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে প্রবেশ করেছে। কিন্তু আলব্রেখট ডুরার রেনেসাঁ চিত্রকলার মৌল বিষয়টি ‘পার্সপেক্টিভ অ্যান্ড প্রোপোরশন’-প্রেক্ষাপট ও অনুপাত তুলে এনে ছবির পরিসরকে যৌক্তিক করে তুললেন। সঙ্গে যোগ করলেন ইতালির রঙ ও সৌন্দর্য এবং মহান শিল্পীদের অন্তর্গত মানবিকতা। জার্মান রিয়েলিস্টিক ধারার সঙ্গে ইতালির সৌন্দর্য মিলে সৃষ্টি করল নতুন এক উত্তর ইউরোপীয় আর্ট।

তারই কথা: আমার বয়স যতই বেড়েছে ততই আমি প্রকৃতির যে স্বাভাবিক ফর্ম, তা ধরে রাখার তাগিদ অনুভব করেছি। প্রকৃতি সরল আর সরলতাই শিল্পের সবচেয়ে মহান অলংকার।

দ্য ফোর হর্সম্যান অব দি অ্যাপোক্যালিপস: ১৪৯৮ সালের এ শিল্পকর্ম আলব্রেখট ডুরারের একটি উডকাট। সম্ভবত নাশপাতি কাঠের ব্ল্লকে বাইবেলের বুক অব বেভেলেশন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অ্যাপোক্যালিপস সিরিজের ১৫টি শিল্পকর্ম সম্কন্ন করেছেন। এ ১৫টির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত দ্য ফোর হর্সম্যান অব দি অ্যাপোক্যালিপস। এ ছবিতে দেখা যায়, মৃত্যু ও তার তিন সহযোগী পৃথিবীর ওপর ভয়ংকর তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।


১৪৪৭ সালে ইতালির জেনোয়া থেকে আসা এক জাহাজ রুশ ক্রিমিয়া থেকে ইউরোপে ভয়াবহ প্ল্লেগ নিয়ে আসে। এরপর কয়েক বছরে ইউরোপের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের প্ল্লেগে মৃত্যু ঘটে। তারপর বারবার প্ল্লেগ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ফিরে আসে। এ বিউবোনিক প্ল্লেগ ডুরারকেও ভীষণ বিচলিত করে। ডুরার ১৪৯৪-৯৫ সালে ইতালি সফর করেন। সে সময় অনেকে সন্দিহান ছিলেন ১৫০০ সালেই কেয়ামত ঘটবে। ডুরার মানবতা বিধ্বংসী তিনটি অপশক্তির দিকে নজর দিয়েছেন: মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও যুব্ধ। তার ছবিতে পাণ্ডুর অশ্ব মৃত্যুর প্রতিবিম্ব, দাঁড়িপাল্ল্লায় দুর্ভিক্ষ, তরবারিতে যুদ্ধ এবং বন্দুক ও মুকুটে ঘাতক মহামারী, ছবির নিচে বাম দিকে নরকের হাঁ করা মুখ নিহতদের টেনে নেবে।

৩৮.৮দ্ধ২৯.১ সেন্টিমিটার মাপের ছবিটি রয়েছে নিউইয়র্কের দ্য মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্টে।

টিশ্যান (১৪৯০-১৫৭৬)

রঙের জাদুকর টিশ্যানের হাতে স্লিপিং ভেনাস কিংবা ভেনাস অব উরবিনোসহ আরো অনেক অনিন্দসুন্দর নারীর ছবি আঁকা হয়েছে। তার রঙের জাদু নিয়ে চিত্রসমঝদাররা অনেক প্রশংসা করলেও তিনি বলছেন: ‘উজ্জ্বল রঙ নয়, ভালো ড্রয়িংই সুন্দর ফিগার তৈরি করে। রঙ নিয়ে তার অনেক কথা: (ক) ভালো পেইন্টারের মাত্র তিনটি রঙ প্রয়োজন—কালো, সাদা ও লাল। (খ) সব পেইন্টারেরই রঙ লাগানোর মেধা থাকে না। আসলে সমস্যার মুখোমুখি হলে অনেক পেইন্টার হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি চাপ সহ্য করতে পারেন না। প্রয়োজনীয় মেধার ঘাটতি থাকা শিল্পী কেবল ছবির ফর্ম নষ্ট করতে পারেন। পোর্ট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ, পুরাণ ও ধর্মীয় বিষয়ের ছবি আঁকায় তার অবস্থান এতটাই উঁচুতে ছিল যে তার সমকালীন কেউ কেউ দান্তের প্যারাদিসোর শেষ পঙিক্তটি তার ওপর প্রয়োগ করেন: দ্য সান এমিডস্ট স্মল স্টারস।


পরিণত শিল্পী টিশ্যান যখন বলেন, ‘আমি মনে করি, পেইন্টিং সম্কর্কে কিছু শিখতে শুরু করেছি’, তখন বুঝিয়ে দেন, শেখার দিগন্ত অনিঃশেষ এবং একই সঙ্গে অনেক শিল্পীর আত্মম্ভরিতাকে ধুলায় মিশিয়ে দেন।

ষোড়শ শতাব্দীর ভেনেশিয়ান স্কুলের প্রধান শিল্পী ইতালির রেনেসাঁর অন্যতম চরিত্র তিজিয়ানো ভেসেল্লি (কিংবা ভেসেল্লিও) ইউরোপে যার পরিচিতি টিশ্যান, তার পেইন্ট ব্রাশ সম্কর্কে বলা হয়, টিশ্যানের হাতে যখন ব্রাশ তা আপনাতেই অনুভূতিপ্রবণ হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, শিল্পীকে তার অবজেক্টের নির্যাস অবশ্যই পেতে হবে। শিল্পী যা আঁকছেন তাতে বস্তুর চরিত্র ও আবেগের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।

নারীর সৌন্দর্য ও আবেগ এবং পরিপূর্ণ শরীর সম্কর্কে টিশ্যানের চেয়ে ভালো ধারণা আর কে দেবে? তার হাতে আঁকা কয়টি অবিস্মরণীয় নারী চিত্র সে সাক্ষ্য দেবে। টিশ্যান প্রায় ৬০ বছর শিল্পকলার ভেনেশিয়ান ধারার অবিসংবাদিত প্রধান ছিলেন। পরিণত বয়সে তিনি ওভিদের রচনা ধরে শুরু করলেন তার পয়েজি সিরিজ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভেনাস অ্যান্ড এডোনিস, ডায়ানা, ডায়ানা অ্যান্ড অ্যাকটেয়ন, ডায়ানা অ্যান্ড ক্যালিস্তো পার্সেউস অ্যান্ড অ্যান্ড্রেমিডা, দ্য রেইপ অব ইউরোপা; অসমাপ্ত রয়ে যায় দ্য ডেথ অব অ্যাকটেয়ন। টিশ্যানের কমবেশি ১০০ ছবির কোনো হদিস নেই।

পিয়েতা: ভেনিসের গ্যালারি দেল আকাদেমিয়ায় ১৫৭৬ সালে আঁকা অসমাপ্ত ছবিটির অবস্থান। সে সময় প্ল্লেগ ইতালির স্বাভাবিক জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। ছবিটি অসমাপ্ত রেখেই টিশ্যান অসুস্থ পড়েন, প্রথমে জ্বর, সেই বছরই ২৭ আগস্ট প্ল্লেগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তার ছবিটির অসম্কূর্ণ অংশ সমাপ্ত করেন পালমা জিওভানি। টিশ্যান চেয়েছিলেন, চিত্রকর্মটি তার কবরের ওপর টাঙানো থাকুক। প্লেগ ভেনিস শহরকে তছনছ করে ফেলেছে। ছবিতে টিশ্যান নিজেকে এঁকেছেন পর্যদুস্ত একজন অর্ধনগ্ন মানুষ। তিনি প্রার্থনা করছেন। তার পাশে প্রার্থনারত তার পুত্র ওরাজিও। প্ল্লেগ ওরাজিওকেও নিষ্কৃতি দেয়নি। তারও মৃত্যু হয় এ ঘাতক ব্যাধিতে।


টিশ্যানের মৃত্যুর পর ছবিটি তার স্টুডিওতেই ছিল। ১৮১৪ সাল থেকে বর্তমান অবস্থানে।

কারাভাজ্জিও (১৫৭১-১৬১০)

কারাভাজ্জিত যখন ক্যানভাসের ওপর ব্রাশ চালাতে শুরু করলেন, আধুনিক পেইন্টিংয়ের যুগ শুরু হয়ে গেল। চিত্রকলার ইতিহাস তিনিই প্রথম শিল্পী, যিনি সরাসরি নিজের জীবনের বিষয় নিয়ে ছবি এঁকেছেন।

মৃত্যুর পর ৪০০ বছর পেরিয়ে গেছে, অনেক অপরাধকর্ম এমনকি খুনের মতো গর্হিত কাজ করার পরও চিত্রশিল্পী হিসেবে কারাভাজ্জিও যেমন সমাদৃত ছিলেন, এখনো সেই মর্যাদায় ভাটা পড়েনি, বরং নতুন করে বারবার আবিষ্কৃত হচ্ছেন এ দুঃসাহসী শিল্পী। তার মূল নাম চাপা পড়ে গেছে, জন্মশহর কারাভাজ্জিও অমর হয়ে গেছে তার নাম হিসেবে। ইতালিয়ান ব্যারোক ধারার এ শিল্পী ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, ফ্লেমিশ, ডাচ ও স্ক্যানিশ শিল্পীদের ওপর জোর প্রভাব ফেলেছেন। মিলানের কাছাকাছি কারাভাজ্জিও নামের ছোট শহরেও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। অল্প বয়সের ব্যবধানে প্লেগ শিল্পী কারাভাজ্জিওর স্বজনদের কেড়ে নেয়, একই দিনে মৃত্যু হয় পিতা ও পিতামহের। তিনি অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়েন, গ্রেফতার হন, কারাগারে যাবেন, রোমান গার্ডের ওপর পাথর ছুড়ে মারেন, ছাড়া পান, আবার অপরাধ, পরিকল্পিতভাবেই হোক কি আকস্মিকভাবে ঘটুক, খুনের কথা নিজেই স্বীকার করেন। বিভিন্ন স্থানে কাটে তার পলাতক জীবন, গ্রেফতার হন এবং মৃত্যুর আগে জেলখানা থেকে পলায়ন করেন এবং ছদ্মবেশে রোম চলে আসেন।


ডেথ অব আ ভার্জিন: আধো অন্ধকারে ভার্জিনের মৃত্যু, ছবিটি প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরে। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছবি হলেও ধর্মীয় গোষ্ঠী ছবিটি পছন্দ করেনি। তাদের কাছে খবর ছিল যে শিল্পী এ ছবির জন্য একজন যৌনকর্মীকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছেন—এটি অবশ্যই ধর্মের অবমাননা, পচন বিলম্বিত করতে মরদেহ ধোয়ানোর জন্য যে তরল ব্যবহার করা হয়—তার্পিন মেশানো পানি তিনি রঙে ব্যবহার করেছেন। ধর্মীয় ব্যাখ্যাদাতারা জানালেন, এ ছবি পুনরুজ্জীবনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ১৬০৫-১০ মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আঁকেন ডেভিড উইথ দ্য হেড অব গোলিয়াথ।

সেভেন ওয়ার্কস অব মার্সি: কারাভাজ্জিওর চিত্রকর্মটি ১৬০৭ সালে আঁকা। এতে একই সঙ্গে প্ল্লেগের ভয়াবহতা ও সংকটকালে মানবিকতা তিনি তুলে ধরেছেন। রাতের বেলা সমাহিত করার জন্য প্ল্লেগে প্রাণ হারানো একজনকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, একজন ধর্মযাজক পথ দেখানোর বাতি ধরে আছেন। শবাধার থেকে বেরিয়ে আছে মৃত মানুষ পায়ের পাতা। জিওভানি বোকাচিত্ত প্লেগ মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি লিখেছেন, প্রতিদিন ভোর হতেই দেখা যেত, রাস্তায় অনেক মানুষের মরদেহ পড়ে আছে। তাদের একত্র করে রাতের আঁধারে প্ল্লেগ পিটে (প্লেগে মৃত মানুষ সমাহিত করার গর্ত) ছুড়ে ফেলা হতো। লাশের ওপর লাশ, সেসব গণকবর পরে আবিষ্কৃতও হয়েছে।

কারাভাজ্জিও নেপলসের একটি চার্চের জন্য সাতটি পৃথক প্যানেলে ছবিটি করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পরে সাতটি একত্র করে চার্চের বেদির ওপর স্থাপন করেন। যে সাতটি কাজ এ ছবিতে তিনি তুলে এনেছেন সেগুলো হচ্ছে:

১. মৃতকে দাফন করা: ছবিতে দুজন মরদেহ নিয়ে যাচ্ছে।

২. কারাবন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ: একজন নারী কারাবন্দি পুরুষকে দেখতে গেছেন।

৩. ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো: সে নারী স্তন খুলে তাকে দুধ পান করাচ্ছেন। এটি ধ্রুপদ রোমান বদান্যতা।

৪. গৃহহীনকে আশ্রয়: একজন তীর্থযাত্রী সরাইখানায় আশ্রয় চাইছেন।


৫. নগ্নকে বস্ত্র দান: সাধু মার্টিন নগ্ন ভিক্ষুকে তার কাপড়ের অর্ধেক দিয়ে দিচ্ছেন।

৬. অসুস্থ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ: সাধু মার্টিন পঙ্গু ভিক্ষুককে আশ্বস্ত করছেন।

৭. তৃষ্ণার্তকে পানি দান: স্যামসন একটি গাধার চোয়াল থেকে পানি শুষে নিচ্ছেন।

কারাভাজ্জিওর এ চিত্রকর্ম ভয়ংকর দুর্যোগের দিনে মানবকল্যাণের একটি পূর্ণ চিত্র।

রেমব্রান্ট (১৬০৬-৬৯)

ছবি আঁকা শিখতে হলে কাকে গুরু মানবেন? রেমব্রান্ট বলেছেন, কেবল একমাত্র গুরু প্রকৃতি। তিনি আরো বলেছেন, পেইন্টিং হচ্ছে প্রকৃতির দৌহিত্র, এর সঙ্গে ঈশ্বরের সম্কর্ক। কিংবা একটি পেইন্টিংকে তখনই সমাপ্ত বলা যায়, যখন এর ওপর ঈশ্বরের ছায়া পড়ে। চিত্র সমালোচকদের জন্য রেমব্রান্ট: পেইন্টিং নাকে শোঁকার জন্য নয়। নতুন শিল্পীদের জন্য তার কথা: যা জানো তার চর্চা করতে থাকো, এটাই তোমার কাছে স্কষ্ট করে দেবে, তুমি কী জানো না।

যেসব বড় শিল্পীর সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে রেমব্রান্টের নাম উচ্চারিত হয়, তারা ইতালির। রেমব্রেন্ট ডাচ; হল্যান্ডের মানুষ।

চিত্রশিল্পের ইতিহাসের দিকে যাদের নজর, তারা খুব ভালোভাবেই জানেন, সপ্তদশ শতাব্দীর ‘ডাচ গোল্ডেন এজ’-এর স্রষ্টাদের নাম বলতে শুরু করলেই রেমব্রান্টের নাম এসে যায় এবং প্রায় সবাই সেই সোনালি যুগে আঁকা নাইট ওয়াচ চিত্রটির উদাহরণ দেন। অথচ এ ছবির জন্য তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। সচ্ছল পরিবার থেকে আসা একটু বেহিসেবি গোছের এ শিল্পী দেউলিয়া হয়ে গেলেন, বাড়ি বিক্রি করলেন, পারিবারিক অশান্তিও তাকে ছাড়ল না। সেই নাইট ওয়াচ-এর দাম এখন কত মিলিয়ন ডলার হবে তা গবেষণার বিষয়।

পোর্ট্রেট অব হেন্ড্রিকে স্টোফেলস: হেড্রিকে স্টোফেলসের পোর্ট্রেট রেমব্র্যান্ট এঁকেছেন ১৬৫৪ সালে। ১০২ঢ৮৩.৭ সেন্টিমিটার মাপের ক্যানভাসের ওপর তেলরঙের এ চিত্রকর্ম লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে রয়েছে।

এ পোর্ট্রেট মনে করিয়ে দেয় ১৬৬৩ সালের আমস্টারডামের ভয়াবহ প্ল্লেগের কথা। রেমব্র্যান্টের একসময়কার গৃহকর্মী, পরবর্তী সময়ে প্রণয়িনী ও মিউজ হেন্ড্রিকে স্টোফেলস প্ল্লেগ আক্রান্ত হয়ে ২১ জুলাই ১৬৬৩ মারা যান।

১৬৫৪ সালের পর গর্ভে রেমব্রান্টের কন্যাসন্তান কর্নেলিয়া জন্মগ্রহণ করে। রেমব্রান্টের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক চুক্তির কারণে তার পক্ষে পুনরায় বিয়ে করা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শর্ত ছিল স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় বিয়ে করলে তার অর্জিত সম্কদ বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে, অন্যদিকে তার তখনকার প্রেমিকা বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে মামলাও করেন। হেন্ড্রিকে স্টোফেলসের সঙ্গে তার বিয়ে না হলেও আমৃত্যু শিল্পীর সঙ্গেই বসবাস করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষিত রেমব্রান্টকে রক্ষা করেন।

প্ল্লেগ, ফ্লু অন্যান্য মহামারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। স্মরণীয় চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তোনিও জাঞ্চির দ্য ভার্জিন অ্যাপিয়ার্স টু দ্য প্ল্লেগ ভিক্টিমস (১৬৬৬), ক্যাটেরিনা জুলিয়ানিসের টাইম অ্যান্ড ডেথ বিফার ১৭২৭, পিটার ব্রুগেল দি এল্ডারের ট্রয়াম্ক অব ডেথ, হ্যান্স হলকিনের ড্যান্স অব ডেথ জেরার্ড ফন হনথর্স্টের সেন্ট সেবাস্টিয়ান, এদর্ভাদ মুঞ্চের পোর্ট্রেট আফটার দ্য স্ক্যানিশ ফ্লু, গুস্তাভ ক্লিমতের দ্য কিস, আর্নল্ড বকলিনের প্লেগ।

এভাবেই আগামী শতকে এবং আগামী সহস্রাব্দে আলোচিত হবে ২০২০-এর করোনাদিনের চিত্রকলা।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক