‘এখন থেকে আমার আনন্দগুলোকে খুঁজতে এসো না, যদি আসো তাহলে তোমরা চরমভাবে দুঃখিত হবে’—এটাই ছিল বাবার প্রতি আমার সর্বশেষ আকুতি। কথাগুলো আমি বরাবরের মতো বাবাকে সরাসরি বলতে পারিনি, কথাগুলো বলতে হয়েছে আমার জন্য নির্ধারিত মইটি ব্যবহার করে। আমার মা। আমার মা-ই হচ্ছে আমার মই। বাবা পর্যন্ত পৌঁছানোর মই। আমি মইটি হারাতে বসেছি। হয়তো বাবা পর্যন্ত আর কোনোদিনই পৌঁছানো হবে না আমার। হয়তো মা পর্যন্তও না। হয়তো কোনোদিনই পৌঁছানো হবে না সাত বছর বয়সী একমাত্র বোন পর্যন্ত।
হিসাব করলে এ মুহূর্তে আমার বয়স ১৬ বছর ৭ মাস ২১ দিন কয়েক ঘণ্টা প্রায়, আর জন্মক্ষণ অনুযায়ী আরো ৯ মাস ১১ দিন যোগ করে নিতে হবে এবং বাস্তবতা হলো, আজ আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে, যে বাড়ির একচ্ছত্র অধিপতি আমার বাবা। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে কবিতা পড়ার অপরাধে, বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে কবিতা লেখার অপরাধে। বলা যেতে পারে, আমিই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছি কবিতা লিখবার স্বাধীনতা না পাবার জন্য। বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছি কবিতা পড়তে পারার অধিকার হারানোর কারণে। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে বা আমিই বের হয়ে যাচ্ছি—এর জন্য কে দোষী, এটা নির্ণয়ে পৃথিবীর ব্যস্ত হয়ে উঠবার কোনো কারণ অন্তত আমি খুঁজে পাচ্ছি না। পৃথিবী, তুমি বরং তোমার প্রতি ক্রমশ নির্দয় হয়ে ওঠা তোমার উত্তর-অধিবাসীদের সামলাতে সচেষ্ট হও, যারা তোমার যোনিপথে প্রতিদিন প্রবেশ করাচ্ছে অপূর্ণ গমের গুচ্ছ গুচ্ছ শিষ। আচ্ছা পৃথিবীর লিঙ্গ কী? স্ত্রী না পুং?
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবার সময়টা খুবই পিচ্ছিল। জানি সময়টাকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারব না আমি। সেটার সক্ষমতাও আমার নেই। বাবাও সময়টাকে ধরে রাখতে পারবে না বা রাখতে চাইবে না। আজ থেকে নিজেকে অন্য নামে ডাকব আমি। আজ থেকে আমার ভেতর অন্য কেউ বাস করা আরম্ভ করবে, যে আমার ফেলে যাওয়া ১৭ বছরকে আমলে নেবে না। আমার বাবা আজ থেকে আমাকে তার সন্তান পরিচয় থেকে বঞ্চিত করবে। আজ থেকে আমি আমার মাকে মা বলে ডাকতে পারব না, কারণ বিবাহসূত্রে আমার মায়ের একচ্ছত্র মালিক আমার বাবা। আমি এও জানি, আমার বাবা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আমার একমাত্র বোন আমার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখতে চাইলেও পারবে না, কারণ তার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমার বাবাই তার একমাত্র অভিভাবক। অবশ্য বিয়ে হবার পর তার অভিভাবক হবে তার স্বামী। জীবন পাল্টে ফেলার এই দিনে আমি তোমাকে (বাবা) কথা দিচ্ছি—‘আমি কোনোদিনই তোমাদের আগামী দিনের জীবনযাপনকে হিংস্র পশুর মতো আঁচড় কাটব না।’
সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমি ঘড়ির দিকে তাকাইনি। তাকাব কীভাবে? কোনোকালেই ঘড়ি বলে আমার কিছু ছিল না, যেমন বাড়ি বলেও কিছু ছিল না আমার। আমার বাবার একটা বাড়ি আছে, আমার বাবার একটা ঘড়িও ছিল, ক্যাসিও ঘড়ি, ওয়াটার প্রুফ। ডিজিটাল। বাবা ঘড়িটা কিনেছিলেন যখন আমি সবে ওয়ান-টু-থ্রি পড়তে শিখেছিলাম। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমি একবারও পেছন ফিরে আমার বাবার বাড়ির দিকে তাকাইনি। আমার বাবার ঘড়িটা অনেকদিন আগেই পানিতে ডুবে মরে গেছিল। আমার ১৭ বছরের অতীত ঠিকানা মুছে ফেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম আমার নতুন ঠিকানার খোঁজে। বেরিয়েই একটা সিগারেটের মুখে আগুন দিলাম, দ্রুতগতির পায়ের তালে তালে সিগারেটটাও আমার শ্বাসের সঙ্গে দৌড়াচ্ছিল। কোথায় যাব আমি? নিশ্চিত না কোথায় যাব। দেখি কোথায় যাওয়া যায়। সত্যিকার অর্থে আমার যাবার কোনো জায়গা নেই। কে আমাকে গ্রহণ করবে? একজন মানুষের কবিতা পড়াকে সহ্য করতে পারছে না কেউ। একজন কবিকে কবিতা লিখতে দেবার স্বাধীনতা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তাকে গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করছে। আমার মনে হয়, বাবা আমাকে ভয় পাচ্ছে, আমাকে ভয় পাওয়া মানে আমার কবিতা পড়াকে ভয় পাওয়া। সুস্পষ্ট করেই বলি, বাবা আমার কবিতা লেখাকেই ভয় পাচ্ছে, ভয় পাচ্ছে ১৭ বছর বয়সকে। পৃথিবীর সমস্ত বাবা এ বয়সটাকে ভয় পেয়ে এসেছে, ভয় পেয়েই যাবে যতদিন বাবা নামক পরাধীন তাঁবু টানানো থাকবে পৃথিবীর বুকে। আমার কাছে বাবা একটা রাষ্ট্র আর মা হচ্ছে দেশ।
সাদার ভেতর কালো স্ট্রাইপের একটা সুতি শার্ট আর গ্যাবাডিন প্যান্টে খুব হালকা বোধ করছি আমি। সিগারেটটাকে টান দিচ্ছিলাম আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীটাকে বিশেষ কায়দায় উড়িয়ে দিচ্ছিলাম, সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দেয়া এক ধরনের শিল্পের মধ্যে পড়ে, শিল্পটা আমি নিবিড় প্র্যাকটিসের মাধ্যমে আয়ত্তে এনেছি। শুরুর দিকে ধোঁয়া গিলে ফেলতাম, কাশি আসত, এখন একটুও ভেতরের দিকে না নিয়ে পুরোটাই উড়িয়ে দিই—উড়িয়ে দেবার ভেতর অন্য ধরনের মজা কাজ করে। প্রশ্ন হলো, কোথায় যাব আমি? কেউ আমাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য না। আমার নাম ভোটার লিস্টে এখনো ওঠেনি। রাষ্ট্র কি আমাকে আশ্রয় দেবে না? আমার কোনো সার্টিফিকেট নেই। কিছু পড়াশোনা আছে আর আছে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ১৭ বছরের একটা উর্বর শরীর। পৃথিবীর সব রাষ্ট্র এ বয়সকে সবসময় ভয় পেয়ে এসেছে।
— ‘হ্যালো, তুই কই?’ ‘বাড়ি আমারে বাইর কইরা দিছে’
—‘মানে আমার সন্দেহটারে তুই আনুষ্ঠানিক রূপ দিলি, তুই কই এহন?’
—‘শাহবাগের দিকে আইতাসি’
—‘আয়’
সাকল্যে ঋদ্ধির সঙ্গে এইটুকুই হলো কথাবার্তা। বেশি কথা বলা যাবে না। ইচ্ছা থাকলেও না। ব্যালান্স নেই। ঋদ্ধি? ঋদ্ধি হলো কবিতাকে ভালোবাসা একটা মেয়ে, যে মেয়ে সিগারেট খায়। ঋদ্ধি? ঋদ্ধি হলো আমার কবিতাকে অকাতরে ভালোবেসে ফেলা একটা মেয়ে, যে জিনস ও ফতুয়া পরে, যে মেয়ে সিগারেটও খায়। খারাপ লাগল? আচ্ছা ঋদ্ধি হলো আমার কাছে আমার কবিতার বিনিময়ে তার ভার্জিনিটি নিঃশর্তে আমার হাতে তুলে দেয়া বড়লোকের একমাত্র মেয়ে, যে সিগারেট খায়, জিনস ও ফতুয়া পরে। এর চাইতে ভালো করে বলতে পারব না। আচ্ছা কবিতা কি একটা সামাজিক ব্যাধি? ভাবতে থাকুন, ভেবে বলুন, প্লিজ। আপনাদের ভাবনা কি কখনই সে পর্যন্ত পৌঁছে না যে কেন একজন মানুষকে কবিতা পড়ার দায়ে তার অতীত মুছে ফেলতে বাধ্য করা হবে! সন্দেহাতীতভাবে ঘটে যাওয়া এ সত্যগুলোই বলতে এসেছি আমার কবিতার মাধ্যমে। এও বলতে এসেছি যে আমি এখন থেকে আমার কবিতা বেচেই খাব। বহুবিধ খাবারের দিকেই আমার ঝোঁক। আজিজের অন্তরা থেকে আরম্ভ করে এ সমাজের সমস্ত নোংরা ময়লা আবর্জনা গিলে খাব আমি। কেন? শার্ট-গেঞ্জির দোকানগুলো যখন বইয়ের দোকানগুলোকে নিয়মিত রেপ করে চলেছিল তখন, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? ওহ! বই পড়লে আপনাদের অনেক সমস্যা, তাই না?
—‘কই রে? শাহবাগ আসতে তোর এতক্ষণ লাগে, শালা।’ ঋদ্ধির ফোন। এই মেয়ে আমাকে মাঝে মাঝে শালা বলেও সম্বোধন করে, আপত্তি আছে? আমার নেই।
শাহবাগ যেতে তো এত সময় লাগার কথা নয়! শাহবাগ কি ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে? আমার বাবার বাড়ির মালিক আমাকে ছুড়ে ফেলেছে অন্ধকার গলিপথে, সেখান থেকে শাহবাগ যেতে এত দেরি হচ্ছে? মাত্র ১ ঘণ্টার পথ যেতে কয়েক যুগ ধরে হাঁটা লাগছে? তবে কি কেউ সামনে এগোনোর রাস্তাটাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডাস্টার দিয়ে মুছে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ক্রমাগত বর্ষণে আমার পাঁজর ডুবে গেছে ময়লার ভাগাড়ে। বুঝতে পারছি আমার জুতোর ভেতর ঢুকে পড়ছে অসংখ্য ধারালো বালি। আমার পায়ের পাতা রক্তে লাল হচ্ছে। হাতের সিগারেটটাও এতক্ষণে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের জালে আটকা পড়েছে। নিজেকে চিনতে পারছি না আমি। গমের আটার মতো শরীরের রঙের সঙ্গে নিয়ন আলো মিশে আমার একটা আর্যমার্কা আর্কিটাইপ পরিচয় তৈরি করেছে। ত্বক স্পর্শ করেও কোনো ধরনের সাড়া পাচ্ছি না। আমি সজ্ঞান নাকি অচেতন, সেটাও বুঝতে পারছি না। এ মুহূর্তে কোথায় আমি? শাহবাগ কতদূরে? আমার ভেতর অসংখ্য শব্দ ভিড় করছে, বোবা শব্দ, দৃষ্টিযুক্ত ব্যাখ্যাতীত কিছু শব্দ। ঋদ্ধির বুকে মুখ রেখে আজ আমি কবিতা লিখব, যে কবিতা কোনো কবি কোনোদিন লেখেনি। আচমকা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো আচরণ করতে থাকলাম আমি, বাতাসের দিকে অসংখ্য গালির তীর ছুড়ে মারতে থাকলাম। একনাগাড়ে চিৎকার করে বলতে থাকলাম ঋদ্ধি, ঋদ্ধি? বাবা নামক রাষ্ট্র আমাকে কবিতা পড়তে দেবে না, বাবা নামক রাষ্ট্র আমাকে কবিতা লিখতেও দেবে না। ঋদ্ধি, ঋদ্ধি! তুই আমার রাষ্ট্র হবি? তুই আমার রাষ্ট্র হবি? তুই আমার...
তুই আমার রাষ্ট্র হবি? ঋদ্ধি!
ঠিক বলতে পারব না, আমার ঘুম ভাঙল নাকি জ্ঞান ফিরল। যাই হোক, চোখ খোলার আগেই বুঝতে পারলাম মাড়ের মতো গাঢ় জমাট বাঁধা কোনো কিছুর ওপর শুয়ে আছি আমি। দ্রুত ভেবে নেবার চেষ্টা করলাম, আমি আসলে কোথায়? বাবা নামক রাষ্ট্র আমাকে তার বাড়ি থেকে বের করে দেবার পর আমি রাস্তায় নেমে একটা সিগারেট হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঋদ্ধিকে ২০ সেকেন্ডের মতো সময়কালের একটা কল দিয়েছিলাম। আমার শাহবাগ যাবার কথা ছিল। তবে কি আমি ঋদ্ধির বুকের কাদার ওপর শুয়ে আছি? না, তাও না। ওর বুক আমার চেনা। তাহলে? আঁতকে উঠলাম আমি। লক্ষ করলাম আমার এতদিনের পরিচিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আমার ইচ্ছানুযায়ী নড়ছে না। এই যে আমি এই মুহূর্তে আমার বাম হাতটাকে নিয়ে যেতে চাইছি কপালের দিকে, পারছি না। মনে হচ্ছে বাম কপালে একটা ব্যথার পাহাড় এসে চেপে বসেছে। সেটাকে সরাতে হবে কিন্তু কিছুতেই পারছি না। ইনফ্যাক্ট ইচ্ছা থাকলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আমার কথামতো কাজ করতে পারছে না। কে এদের দখল নিল? আমার ভেতর এক ধরনের শঙ্কা অন্ধকার ঘরে এঁটে থাকা ছিটকিনির মতো চেপে বসতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু না, সাহস হারালে চলবে না। শঙ্কাগুলো আপাতত সরিয়ে রেখে ব্রেনের নিউরনগুলোকে হূদয়ের হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে থাকলাম আমি। এই তো, এই তো নিউরনগুলো খেলতে আরম্ভ করেছে। যতদূর মনে পড়ছে, গত রাতে আমি নেশা করিনি। তাহলে? অবশেষে আমার চোখজোড়ার দ্বারস্থ হলাম। চোখ খুলতেই আমার সামনে যে দৃশ্য আছড়ে পড়ল, সেটা আমার কাছে একেবারেই অপরিচিত। এ দৃশ্য আমি মাঝে মাঝে সিনেমায় দেখেছি, সেটাও বিপরীত প্রান্ত থেকে। যেটাকে গাঢ় মাড় ভেবেছিলাম, সেটা মাড় কিন্তু মাড়ের রঙ তো সাদাটে। এর অর্থ হচ্ছে আমি রক্তের মাড়ের ওপর শুয়ে আছি। ভয়ে জমাটবদ্ধ গুমোট একটা ঘর। ঘরটা দুলছে? না, আমিই দুলছি মনে হচ্ছে, মানে ব্যালান্স রাখতে পারার সামর্থ্য হারিয়েছি আমি। এই অন্ধকার ঘরে আমি একা, যার তিনদিকে দেয়াল, যেটা চোখবিহীন। ঘরটির একদিকে লোহার শিক এবং লোহার শিক দিয়ে বানানো একটা দরজা। সেই দিক দিয়েই একটু আলো সবার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে আমার অপটিক নার্ভকে উত্তেজিত করছে। শরীরের প্রায় সব জায়গা থেকে ব্যথারা উপচে পড়ছে ভাত রান্নার হাঁড়ি থেকে যেভাবে গলদ্ঘর্ম ফেনারা উপচে পড়ে ঠিক সেভাবে। খুব চেষ্টা করলাম উঠে দাঁড়ানোর জন্য। উঠে দাঁড়ানোও এক ধরনের প্রতিবাদ। হঠাৎ একটা কর্কশ কণ্ঠ লাল কাপড়ের খোঁজে ছুটে আসা ষাঁড়ের মতো আমার দিকে তেড়ে এল।
—‘এই শুয়োরের বাচ্চা এদিকে আয়,’ এই বলেই তালা খুলে খপ করে আমার শার্টের কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে আমাকে বের করে আনল এবং পেশ করল একটা টেবিলের সামনে। তীব্র ব্যথার ঝাঁকুনির ভেতরেও আমার মনে হলো অনেক খাকি পোশাক রঙ পাল্টালেও স্বভাব পাল্টাতে পারেনি এখনো।
—‘স্যার, এই শুয়োরের বাচ্চা গতকাল রাত সাড়ে ১২টার দিকে মত্স্য ভবনের মোড়ে শাহবাগের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে মাতলামি করতেছিল। স্যার, এই শালা কি কচ্ছিল জানেন? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করতেছিল। আর কচ্ছিল ওর বাপ নাকি ওর রাষ্ট্র ছিল, রিধি না কি একটা নাম কইয়া চিৎকার করতেছিল, রিধি না সিধিরে ওর রাষ্ট্র বানাইতে চাইছিল, স্যার দ্যাখেন শালার কত বড় সাহস। দেশের নাম পাল্টাইয়া একবার ওর বাপ বানাইছে, একবার রিধি না সিধি বানাইছে। স্যার, ওরে ফিফটি ফোরে চালান কইরা দ্যান।’ আমি লক্ষ করলাম, একনাগাড়ে কথাগুলো বলতে গিয়ে বেচারি হাঁপিয়ে উঠেছে। তার দুই ঠোঁটের কোনা চুইয়ে থুতু বের হচ্ছে অনবরত। তার এই বাড়তি খাটুনি খানিকটা আরাম দিচ্ছে আমাকে।
—‘লতিফ! তুমি চুপ করবে?’ স্যার নামক মানুষটি কানে ধরা মোবাইলটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকালেন, যিনি এতক্ষণ বকবকানির একটা শব্দকেও নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি, যার বুকে একটা নামফলক। টেবিলে পিতলের একটি তকতকে প্লেটে লেখা— অফিসার, ইন-চার্জ।
—‘নাম কী?’ ধীরস্থির অফিসার আমার দিকে তাকালেন এবং আমাকে তার টেবিলের বিপরীতে টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ারে বসতে বললেন। আমার ভেতরে ব্যথার তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আমি স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। চেয়ারে বসতে গিয়ে টের পেলাম অনুভূতিরা বিদ্রোহ করল আরেকবার। ওদেরই বা দোষ কী? অফিসার আবারো জিজ্ঞেস করলেন—
—‘কী করেন?’ আমি মনে মনে বললাম, এই তো অফিসার এবার আমার টেরিটোরিতে ঢুকছেন আপনি, আসুন, আসুন। আমার ভেতর থেকে ভয়ডর উবে যাচ্ছে। যাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়, বাবা যাদের অস্বীকার করে, তাদের ভয় থাকতে নেই, যারা কবিতা লেখে, যাদের বয়স ১৭, তাদের ভয় থাকলে চলবে কীভাবে?
—‘কবিতা লিখি।’ অফিসারের দিকে সরাসরি আমার দৃষ্টি যতটা সম্ভব স্থির রেখে শব্দ দুটো উচ্চারণ করলাম আমি। সরাসরি কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বললে যে কেউ সমীহ করে, কেউ কেউ ভড়কেও যায়, সে ডাক্তার হোক বা আইনবিদ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থানার এই ঘরে শকুন ওড়া নীরবতা খেলা করল। দম হারানো বাতাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া সম্ভবত তিনটা পাখাসহ একটা ফ্যান হাঁসফাঁস করে যাচ্ছে রঙচটা সিলিংয়ে।
—‘কবিতা!’ অফিসারের কণ্ঠে জিজ্ঞাসা না বিস্ময়, সেটা ঠাহর করতে পারলাম না। আমি বুঝে উঠবার চেষ্টা করতেই তিনি আবার বলে উঠলেন,
—‘বাহ, দারুণ ব্যাপার, তো আপনি এত রাত্রে ওখানে কী করছিলেন? আপনি আপনার নামঠিকানা কিছুই বলছিলেন না দেখে আপনাকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।’
আমি অফিসারকে পড়বার চেষ্টা অব্যাহত রাখলাম। বুঝবার চেষ্টা করলাম তিনি কি আমার প্রতি সদয় আচরণের দিকে এগোচ্ছেন, না তার মনে অন্য কোনো ধান্দা কাজ করছে, মানে মামলাটামলা দেয়ার ধান্দা। যতটুকু পড়তে পারলাম, তাতে মনে হচ্ছে তিনি আমাকে নিয়ে এক ধরনের খেলায় মেতে উঠেছেন।
—‘না, বলুন ইচ্ছামতো মেরে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে, হয়তো জেলেও পাঠানো হবে, পাঠান,’ বললাম আমি। আমার মনে হলো, এই খেলায় আরেকটু এগোনো যায়। অনেকটা শ্লেষ মেশানো টোনে কথাগুলো বললাম এবং প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম। প্রতিক্রিয়া খুব খারাপ হতে পারে আবার স্বাভাবিকও হতে পারে।
—‘আরে না না। উল্টো আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। খামোখা কবি সাহেবকে ধরে এনেছে এরা। আপনাকে জেলে দেব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। শুধু আপনার নাম, বাড়ির ঠিকানা, বাবার নাম বলুন।’
—‘কাল পর্যন্ত আমার একটা নাম ছিল, বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেবার পর আমি এখন অবধি আমার নাম রাখিনি আর কোনোকালেই আমার বাড়ি ছিল না—আমি আমার বাবার বাড়িতে থাকতাম, তাই ঠিকানা বলব না। বাবার নামও বলব না, বাবা আমাকে অস্বীকার করেছেন। আর কিছু?’ ফুটবল খেলার চৌকস স্ট্রাইকারের মতো আমি কথাগুলো বলে চললাম। দেখি কী রিঅ্যাকশন আসে? নরমালি রেগে যাবার কথা। সম্বোধন যেহেতু আপনি পর্যন্ত উঠে এসেছে, সেক্ষেত্রে একটা চান্স নিয়ে দেখাই যাক না! প্রয়োজনে পলিসি পাল্টানো যাবে। শরীর দখল করে নেয়া ব্যথাটা ধীরে ধীরে আলাপচারিতার ভেতর দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে।
—‘কবি, তারপর আবার কম বয়সী কবি। সাংঘাতিক! আচ্ছা ঠিক আছে আপনার নতুন নামটাই বলুন।’
কী বলব আমি? বেশ ভাবনায় পড়ে গেলাম। একটা নাম তো বলতেই হবে। তাছাড়া অফিসার ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।
—‘নী-লা-দ্রী, নীলাদ্রী’ কিছু না ভেবেই ফস করে বলে ফেললাম। বলেই নামটা পছন্দ হয়ে গেল আমার নিজেরই। আগের নামে কিছু কবিতা লিখেছিলাম, সেগুলোর একটাও কোথাও প্রকাশের জন্য দেয়া হয়নি। কী যায় আসে তাতে? এখন থেকে এই নামেই পরিচিত হব আমি। এই নামেই লিখব কবিতা। তবে কোনোদিন ভোটার লিস্টে নিজের নাম লিখব না। ভোটও দেব না।
—‘তো কবি নীলাদ্রী সাহেব, এখানে একটা স্বাক্ষর দিতে হবে যে।’ বলেই রেজিস্টার খাতা এবং একটা কলম এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি লক্ষ করলাম, খাতা এগিয়ে দিতে দিতে অল্প বয়সী অফিসারের হালকা গোঁফের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অল্প আঁচে সেকে নেয়া রুটির মতো মুখটা হাসিতে ভরে উঠছে। আধা ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানেই আমি দেখলাম অনেক খাকি পোশাক রঙ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেতরটাও পাল্টে ফেলেছে। অফিসারকে আমার পছন্দ হয়ে গেল।
খাতাটা টেনে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করলাম, জীবনের প্রথম স্বাক্ষর, এ মুহূর্তে নীলাদ্রী নামে একজন কবির জন্ম হলো। রাষ্ট্রের খাতায় স্বাক্ষর করে জন্ম হলো এক কবির, যার বয়স ১৭ বছর কিছুদিন।
—‘কবি নীলাদ্রী, এ মুহূর্ত থেকে আপনি মুক্ত। তবে সাবধান, আর কোনোদিন যেন এখানে আসতে না হয় আপনাকে। আর বাবার সাথে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলুন। আপনার বয়স কম। কবিতা লিখবেন ভালো কথা। লিখুন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে কেন? আর বাবা রাগ করেছেন, দেখবেন কয়েকদিনের ভেতর রাগ কমে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। বুঝেছেন?’
অফিসারের মুখের হাসিটা মুক্ত পায়রার মতো উড়ে বেড়াতে লাগল থানার অবিশ্বাসী ঘরটার ভেতর। আমাকেও ছুঁয়ে গেল। মনে মনে বললাম, আমি আবার এখানে আসব অফিসার। আর আমার বাবার সঙ্গে কোনো কিছুই সহজে মিটবে না। কারণ বাবা একজন ‘রাষ্ট্র’।
—‘দাঁড়ান দাঁড়ান।’ চেয়ার থেকে উঠে অভ্যাসবশত আমার চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে থানার কবরের মতো ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসার আগেই অফিসারের ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ালাম। তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছু না বলেই।
—‘এই নিন আপনার মোবাইল। মানিব্যাগটাও নিন। টাকা-পয়সা তো কিছু দেখছি না এর ভেতর,’ বলেই নিজের মানিব্যাগটা বের করলেন, সুন্দর চেহারার একটা ১ হাজার টাকার নোট বেরিয়ে এলে টাকাটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি, বললেন—
—‘এই নিন, বাড়ি যেতে তো টাকা লাগবে নাকি? রাখুন এটা।’ নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে সেটাও এগিয়ে দিয়ে বললেন—
—‘কার্ডটা রাখুন, প্রয়োজন হলে ফোন দেবেন।’ আমি হাত বাড়িয়ে শুধু কার্ডটা নিলাম।
—‘আরে নিন নিন, টাকাটা নিন, বাড়ি যেতে টাকা লাগবে তো!’ বলেই আমার ব্যথাক্লান্ত ঘাড়ে হাতটা রাখলেন। তীব্র ব্যথার ভেতরেও হাতটাকে আমার কাছে একজন ফেরেশতার হাত বলে মনে হলো।
—‘নিতে পারি এক শর্তে, যদি আপনি এটা নেন।’ বলেই আমি আমার শার্টের পকেট থেকে ঘাম এবং রক্তভেজা ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে অফিসারের দিকে এগিয়ে ধরলাম।
—‘কী, এটা কী?’ উৎসাহ চেপে রেখে বললেন অফিসার। অফিসারদের বেশি উৎসাহ দেখাতে নেই।
—‘কবিতা, আমার লেখা সর্বশেষ কবিতা। এ কবিতার বিনিময়ে আমি আপনার কাছ থেকে টাকাটা নিতে পারি।’ মনে মনে ভাবলাম, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে টাকাটা আমার ভীষণ প্রয়োজন।
—‘আরে দারুণ তো, দিন দিন।’ এই বলে আমার হাত থেকে ভাঁজ করা পৃষ্ঠার সঙ্গে লেগে থাকা কবিতার পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিলেন অফিসার। মনে হচ্ছে এতটা মজা তিনি আর কোনোদিনই পাননি। নতুন জন্ম নিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি, যার নাম নীলাদ্রী।
বাবা নামক রাষ্ট্র—আমার হাতে কলম আছে আর বুকে আছে ভাষার জন্য জীবনদানের শক্তি, আছে যুদ্ধের ইতিহাস, জয়ের আনন্দ। সেসব নিয়েই আমি কবিতা লিখব। বাবা, আমি তোমার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাছে আমার লেখা সেই সব কবিতা এভাবেই বেচব। তোমার হাত-পা-মুখ আমার কবিতা কিনে নেবে এবং নিয়মিত পড়বে।
ব্যালান্সহীন জিপির সিমসহ সস্তা মোবাইলটার গলা টিপে ধরতেই ইঁদুরের মতো শব্দ করে চালু হলো নেটওয়ার্ক। মেসেজ ঢোকার পরিচিত টোন শুনতে পেলাম আমি। মোবাইলের ফাটা পর্দায় ভেসে উঠল, ‘কোথায় তুই? আমি তোর জন্য সারা রাত জাদুঘরের গেটে বসে আছি।’ ঋদ্ধি! কান্না লুকানো লাগল না। হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝাঁক বৃষ্টি এসে জেঁকে ধরল আমাকে। আমি হাঁটতে লাগলাম। এই বৃষ্টি আমার শরীরের সমস্ত ব্যথা, কালচে রক্তের দাগ, আমার অপেক্ষায় ঋদ্ধির জন্য আমার কান্না মুছে দিয়ে আমাকে পৌঁছে দেবে কাঙ্ক্ষিত শাহবাগ পর্যন্ত, যেখানে আমার জন্য অপেক্ষায় আছে ঋদ্ধি, আমার প্রেমিকা, আমার হবু রাষ্ট্র, সে আমাকে কবিতা চাষ করবার জন্য দেবে অবারিত ভূমি।






