অনুবাদ: ইবনে মোতালিব

সিল্ক রুটের দেশগুলো (ইংরেজি হরফের ক্রমানুসারে)

আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বাংলাদেশ, বেলারুশ, ভুটান, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রুনাই, বুলগেরিয়া, কম্বোডিয়া, চীন, ক্রোয়েশিয়া, চেক রিপাবলিক, মিসর, এস্তোনিয়া, ইথিওপিয়া, জর্জিয়া, হাঙ্গেরি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কোরিয়া, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লাটভিয়া, লেবানন, লিথুয়ানিয়া, মেসিডোনিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মলডোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, মিয়ানমার, নেপাল, নিউজিল্যান্ড, ওমান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড, কাতার, রোমানিয়া, রাশিয়া, সৌদি আরব, সার্বিয়া, সিঙ্গাপুর, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, শ্রীলংকা, সিরিয়া, তাজিকিস্তান, থাইল্যান্ড, পূর্ব তিমুর, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান, ইউক্রেন, ইউএই ও উজবেকিস্তান।

সিল্ক রুট বা সিল্ক রোড কিছুটা বাস্তব, কিছুটা কল্পনার। তবে যোগাযোগ বিপ্লব ও কিং মু, ক্যান ইং, ফা-হিয়েন, তামিম ইবন্ বাহার, মার্কো পলো, ইবন্ বতুতা, রুই গঞ্জালেস, জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবুর, রালফ ফিচ, মা হুয়ান প্রমুখ পরিব্রাজকের জীবন পণ করা অভিযান চীনের দুই দিকেই সিল্ক রুটের বেড় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সিল্ক রুট বৃত্ত থেকে তুলে এনে ক’জন কবির কবিতা অনুবাদ করা হলো—

 

বেলারুশ

ইয়াকুব কোলাস (জন্ম ১৮৮২-মৃত্যু ১৯৫৬)। সেই বৃহৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রলেতারিয়েত কবি। তিনি বেলারুশের জনতার কবি।

 

কবিতা,

আমার কাছে আসার পথ কেমন করে খুঁজে পাও?

আমার মতো ভালো আলবেনিয়ান জানতেন না

অ্যারাগন ভাষার মতো করে তিনি চিঠি লিখেন,

কোনো কমা নেই, যতিচিহ্ন নেই

আমার বাবা যৌবনে সাগর চষে বেড়িয়েছে,

কিন্তু তুমি এসেছ পাকা রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে

আমাদের এই নীরব পাথরের শহরে, ১৬ নম্বরে।

জীবনে আমি অনেক কিছু ভালোবেসেছি, ঘৃণা করেছি।

অনেক সমস্যার জন্য আমি আছি ‘খোলা শহর’।

কিন্তু, যা-ই হোক

রাত করে বাড়ি ফেরা যুবকের মতো

রাতের সফরে ক্লান্ত ও ভেঙে পড়েছ

এখানেও আমি তোমার কাছেই ফিরে আসছি

আরো একটি দুঃসাহসিক কাজের পর ক্লান্ত

আর তুমি

আমার বিরুদ্ধে আমার বিশ্বাসঘাতকতা তুলে ধরে

আমার মাথায় আস্তে টোকা দাও

আমার শেষ গন্তব্য—কবিতা।

 

বাহরাইন

কাসিম হাদ্দাদ (জন্ম ১৯৪৮)। আধুনিক ধারার আরবি কবিতার জন্য তিনি নিজ দেশ বাহরাইন ও আরব বিশ্বে সুপরিচিত। তার কবিতা জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার গ্রন্থসংখ্যা ২০টি, এর মধ্যে ১৬টি কবিতার। ২০০৭ সালে ‘লায়লা-মজনুন’ পুনর্লিখন করতে গিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। তার ছেলে মোহাম্মদ হাদ্দাদ বাহরাইনের একজন শীর্ষস্থানীয় সুরকার।

 &dquote;&dquote;

তরুণী রাত্রির পঙিক্তমালা

আমরা কোনো দ্বীপ নই

অবশ্য যারা সমুদ্র থেকে আমাদের দেখছে

তাদের কথা আলাদা।

***

আমি ভালোবাসার কথা লিখি

যেভাবে একটি শিশু পূর্ণবয়স্ক-জীবন

সম্পর্কে তার ধারণাকে আঁকে।

***

একটি অসম্ভব স্বপ্ন

বরং ঘন ঘন মতিবিভ্রমের চেয়ে

বেশি দয়ালু।

***

জানালায় টেনে দেয়া পর্দা

একজন আর্দালি, যিনি তার সুলতানের চেয়ে

বেশি ক্ষমতাশালী

***

তিনি এখন ক্ষমা প্রার্থনা করছেন

তার কারণ এই নয় যে তিনি একজন শত্রু

কারণ তিনি শত্রুর চেহারাটা দেখিয়ে ফেলেছেন।

***

এই নারী রাষ্ট্রের মতো

সে মেকআপ নিয়ে

আয়নার সঙ্গে কথা বলে

কখনো মানুষের কথা শোনে না।

***

ভবিষ্যেক বলা হয়

অতীতের ঠিক উল্টো

আমরা রয়েছি অন্তহীন বর্তমানে।

***

আমার গ্রহণ করার স্বাধীনতা নেই

আমার বিরোধিতা করার স্বাধীনতা আছে।

***

রাত্রি

তুমি একা নও

অসংখ্য তপস্বীও রয়েছেন।

মিসর

হাফেজ ইব্রাহিম (জন্ম ১৮৭১-মৃত্যু ১৯৩২), মিসরের জনপ্রিয় কবি। তিনি ‘নীল নদের কবি’ এবং ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নীল নদের তীরে আসিত্তত জেলার দাইরুত গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের মা-বাবাহারা বালক। একসময় দরিদ্র চাচার কুটির ছেড়ে আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় ঘুমাতেন। ১৯১৯-এ বিপ্লবী নেতা মুহাম্মদ আবু শাদির সান্নিধ্যে এসে তিনি পথের দিশা পেলেন। তার বিখ্যাত কবিতা: ‘মিসর তার নিজের কথা বলছে’, ‘রক্তের ওপর রক্ত ঢেলে তারা তোমাকে সাজিয়েছে’, ‘ও প্রভু ও ইমাম’, ‘প্রেসিডেন্টকে বলুন, ঈশ্বর তার রাষ্ট্রের জীবন বাড়িয়ে দিয়েছেন’। তিনি ভিক্টর হুগোর লে মিজারেবল অনুবাদ করেছেন।

 

সব মানুষ দাঁড়িয়েছিল

আমি নিজেই কেমনল করে আমার আনন্দের ভিত্তি তৈরি করি

তা দেখার জন্য সব মানুষ দাঁড়িয়েছিল

আমাদের প্রতিযোগিতার সময়

পিরামিড নির্মাতারা শুরুতে আমাকে হতবাক করে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষে আমি গৌরবের মুকুট

আর মধ্যপ্রাচ্যের সব অর্জন আমার নেকলেসের মুক্তো

একদিন আমার যদি মৃত্যু হয়

মধ্যপ্রাচ্যকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখবে না

আমি মুক্ত, আমি শেকল ভেঙে ফেলেছি, কেটেছি দাসত্বের

শৃঙ্খল-আমি শত্রুর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত

তোমরা কি দেখেছ কখন আমার জীবন ভেঙেছি

এখনো আমার শীর্ষে ওঠা হয়নি

যখন আমার নিজের সিংহই এখনো দাস

তাদের সিংহ মুক্ত করে দেয়াটা কি ঠিক হলো?

 &dquote;&dquote;

আল্লাহ আমার দিকে তাকিয়ে আমার সন্তানদের চেয়েছেন

কাজেই তারা হেইও জোরে সামনে এগিয়েছে

আমার শ্রেষ্ঠ মানুষের কাছে আমি আনন্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি

আজ আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো, জ্ঞান ও সদাচারের ওপর

আমার দেশকে দাঁড় করিয়ে দাও। কারণ জ্ঞান একা শক্তিশালী নয়

আমার এমন এক পরিস্থিতি এড়িয়ে যাই, যেখানে বিশ্বাসের বিরোধ ক্ষতিকর। কাজেই শক্ত ও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াও, তৈরি হও।

 

 

 

ইসরায়েল/ফিলিস্তিন

র্যাচেল সেলা (জন্ম ১৮৯০-মৃত্যু ১৯৩১)। হিব্রু ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি। জারশাসিত রাশিয়ার সারাতোভে ইহুদি ধর্মযাজক পরিবারের এগারতম কন্যাসন্তান। তার শৈশবে পরিবারটি প্রথমে ইউক্রেনে বসতি স্থাপন করে, তারপর চলে আসে ফিলিস্তিনে। তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন ১৫ বছর বয়সে। যুবক সালমান রুভাসভ তাকে মুগ্ধ করে, তাকে নিয়ে অনেক কবিতা লেখেন। তার সঙ্গে র্যাচেলের বিয়ে হয়নি; তিনিই ইসরায়েলের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট সালমান শাজার। তিনি প্যারিসে পড়াশোনা করেন। তেলআবিবে ফিরে এসে হিব্রু ও ফ্রেঞ্চ শিখিয়ে জীবনধারণ করেন। যক্ষ্মাক্রান্ত হয়ে একটি স্বাস্থ্যনিবাসে দীর্ঘ সময় কাটান, সেখানেই তার মৃত্যু হয়, ৪১ বছর বয়সে। তার অনেক কবিতা ইসরায়েলের স্কুল ও কলেজে পাঠ্য। তার লেখা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইসরায়েলের টাকায় র্যাচেলের ছবি মুদ্রিত হয়েছে।

 

কেবল মৃতরাই মরবে না

আমার জন্য একমাত্র তারাই আছে, বিশ্বস্ত এখনো

মৃত্যুর সবচেয়ে ধারালো ছুরিও তাদের হত্যা করতে পারবে না।

 

মহাসড়কের বাঁকে, যখন দিন শেষে হয়ে আসে

তারা নীরবে আমাকে ঘিরে ধরে, নীরবে আমার পথে যায়

আমাদের সত্যিকারের চুক্তি আছে, সময় এ বন্ধন ছিঁড়তে পারে না

যা ছিল আমার চিরদিনের অধিকার, কেবল তাই হারিয়েছে।

 

আমার জমিনের প্রতি

আমি তোমাকে আমার জমিন সাধতে পারি না

প্রশংসায় কিংবা বীরত্বের কাজে;

রাস্তায় আমি একটা গাছ লাগিয়ে ছিলাম

যে রাস্তা জর্ডানের দিকে গেছে।

একটি সরু পথ মাঠের ভেতর দিয়ে গেছে

আমার পা সে পথে নত হয়।

 

শিশু মাকে যে উপহার দেয়,

আমি জানি কত সাধারণ সে উপহার;

এক গৌরবের দিনে আনন্দের কান্না

উজ্জ্বল হয়ে যখন সূর্য আলো ছড়ায়,

আর তোমার জন্য গোপন অশ্রু ঝরায়

তুমি যে জীর্ণ পোশাক পড়েছ, তা দেখে।

 

পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও বেলারুশ

অ্যাডাম মিকিভিচ। পোলিশ কবি, নাট্যকার, অনুবাদক, অধ্যাপক (জন্ম ১৭৯৮-মৃত্যু ১৮৫৫)। তিনি পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও বেলারুশের জাতীয় কবি। ছাত্রাবস্থায় গোপন ছাত্র সংগঠন করে রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করার অভিযোগে জেল খেটেছেন। পরে প্যারিসে চলে যান। ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে ফ্রান্সের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করার জন্য কনস্টান্টিনোপলে চলে আসেন। ক্লান্ত অবস্থায় এখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

 

শুভরাত্রি

শুভরাত্রি! আজ আমাদের আর কোনো আনন্দ নয়

ফেরেশতারা তোমাকে তাদের আনন্দের নীল ডানায় গুটিয়ে ফেলুক

শুভরাত্রি! কষ্টের কান্নার পর তোমার চোখ স্বাভাবিক হোক

শুভরাত্রি! আজ তোমার হূদয়ের আবেগ ঘুমিয়ে থাকুক।

 

শুভরাত্রি! অন্তরঙ্গ জবাবের মুহূর্তগুলোকে

মুগ্ধ করা, শান্ত করা সংগীত চারদিক ঘিরে রাখুক

তুমি যখন গভীর ঘুমে সুরটা তোমার কানে বাজুক

আমার চিত্রকল্প তোমার ঘুমঘুমে চোখে আনন্দ দিক।

 

শুভরাত্রি। ফিরে যাও! তোমার দৃষ্টি পড়ুক আমার ওপর

আর একবার শুভরাত্রি—সব ঠিকঠাক কিনা তুড়ি বাজিয়ে যাও

তোমার বুকটা আমাকে বাড়িয়ে দাও, একটি চুম্বন-শুভরাত্রি জানাই

শুভরাত্রি। তুমি চলে গেছ, তুমি আর কিছু চাও না

বিষণ্ন তালাবদ্ধ দরজার চাবির ছিদ্রপথে তোমাকে শুভরাত্রি!

পুনরায় ‘শুভরাত্রি’! আমি তোমাকে কখনো ঘুমোতে দেব না।

 

চীন

গু চেঙ্গ (জেন্ম ১৯৫৬-মৃত্যু ১৯৯৩), আধুনিক চাইনিজ কবি। প্রভাবশালী পার্টি মেম্বারের পুত্র। এক সময় পিতা ও পার্টির বিরোধিতা করে দেশ ছাড়েন। নিউজিল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন। কবিতা তাকে আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটিতে পরিণত করে। কিন্তু তার একটি অপকীর্তি কীর্তিকে ছাপিয়ে যায়। তিনি কুড়ালের আঘাতে স্ত্রী জিই ই-কে হত্যা করেন। অতঃপর নিজেও গলায় ফাঁস লাগান।

 

একটি প্রজন্ম

নিকষ কালো রাত আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে

এ চোখ দিয়ে আমি আলো খুঁজে বেড়াই।

 

মৃত্যু

মৃত্যু একটি তুচ্ছ প্রক্রিয়া মাত্র

জীবনে ছোট্ট একটি আঁচড়

এতে কোনো দাগও পড়ে না

আর প্রক্রিয়াটি শেষ হলে রোগী শান্ত, অসাধারণ