সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন সৈকত দে

[মহান গ্রিক পরিচালক থিওডোরাস এনজেলোপুলুসের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ এপ্রিল। প্রথম সিনেমার মুক্তি ১৯৭০ সালে, রিকনস্ট্রাকশন। মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি নিহত হওয়ার আগে তিনি সব মিলিয়ে দেড়খানা তথ্যচিত্র, একাধিক শর্টফিল্ম ও ১৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করে যেতে পেরেছিলেন। নিজের দেশ গ্রিস ও তার ইতিহাস, বিশ্বজুড়ে ভাসমান শরণার্থী মানুষ এবং নিজের ব্যক্তি ইতিহাসকে দেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা ছিল তার আরাধ্য। আসন্ন জন্মদিন উপলক্ষে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার অনূদিত হলো।

সাক্ষাৎকারটি ১৯৯০ সালে গেরাল্ড ও’গ্রাডি নেন।

আর এখানে সাক্ষাৎকারটি অনূদিত হয়েছে ড্যান ফাইনারু সম্পাদিত ‘ইন্টারভিউজ’ নামের থিও এনজেলোপুলুসের সাক্ষাৎকার সংকলন থেকে—অনুবাদক]

থিও এনজেলোপুলুস আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন গ্রিকে। 

সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ, দুপুরবেলা তার অফিসে বসেই কথা হচ্ছিল।

গ্রিক ফিল্ম সেন্টারের জর্জ কালোয়েরোপুলুস মধ্যবর্তী হিসেবে ছিলেন, পরে তিনি উত্তরগুলোর অনুলিখন করেন। আর স্টিভ ডান্ডোলোস আর স্তেফানোস পাপাজাচারিয়াস ইংরেজিতে অনুবাদ করেন গ্রিক থেকে।

 

প্রশ্ন: একুশ বছর সময়কালে আপনি আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। আপনার সিনেমাগুলো ইউরোপে আর জাপানে সাড়া ফেলেছে, অজস্র পুরস্কারও পেয়েছেন কিন্তু এখানে আমেরিকায় মাত্র অল্প কয়েকটাই দেখানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে আপনার সম্পূর্ণ রেট্রোসপেক্টিভ হয়ে গেল, তার আগে বিক্ষিপ্তভাবে দেখানো হয়েছিল। মাত্র এ মাসেই আপনার দুটো ফিল্ম—১৫ বছর আগের আর সদ্যনির্মিত—একসঙ্গে কমার্শিয়াল ডিস্ট্রিবিউশনে গেল। আন্তর্জাতিকভাবে এ মতটি প্রতিষ্ঠিত, আপনার অবস্থান আন্তনিওনি, মিজোগুচি ও তারকোভস্কির মতন মাস্টারদের সঙ্গে। তবুও মার্কিনি ফিল্ম ক্রিটিক, একাডেমিশিয়ান, সাধারণ দর্শকের কাছে আপনার কাজ একেবারেই অপরিচিত। আমাদের প্রথম কাজ হবে মার্কিনি মডেল থেকে আপনার কাজের ধরন কতটা আলাদা, সে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা। যদিও আমি জানি, এখানকার চল্লিশের দশক থেকে অদ্যাবধি জনপ্রিয় ধারার পরিচালক সম্পর্কে আপনি সম্যক অবগত। টিপিক্যাল মার্কিনি পরিচালকদের তুলনায় আপনার কাজের উদ্দেশ্য আর পদ্ধতি বিশদে জানতে আমার খুবই কৌতূহল হচ্ছে। আপনি হয়তো, আমি আশা করি, বলবেন ছয় বছরের ভেতর মাত্র তিনখানা ফিল্ম কেন নির্মাণ করলেন? ডেজ অব থার্টি সিক্স, দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স ও দ্য হান্টার্স—এ তিন ফিল্ম আপনার জন্ম থেকে শুরু করে গ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ২০টি বছরকে এক্সপ্লোর করতে চেয়েছে। কোনো আমেরিকান এ ধরনের কাজ করেননি। কেবল মাইক নিকলকে উদাহরণ হিসেবে নিন, তিনি প্রথমে এডোয়ার্ড আলবির নাটক অবলম্বনে একটা সিনেমা বানালেন, হু’জ অ্যাফ্রেইড অব ভার্জিনিয়া উল্ফ? আর তারপর জোসেফ হেলারের একটি উপন্যাস ক্যাচ-২২ নিয়ে, তার বাদে দ্য ডে অব দ্য ডলফিন। আপনি কি আমাদের দর্শকদের আপনার কাজের জন্য প্রস্তুত করে তুলবেন?&dquote;&dquote;

উত্তর: প্রথমত, আমি ভাবি না কেউই নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারবে যে আমেরিকান আর ইউরোপীয় ফিল্মের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য আছে। কিন্তু যেকোনো ক্ষেত্রেই, স্বাধীনতার প্রথম কয়েকটা বছরে, চুয়াল্লিশ থেকেই ধরা যাক, গ্রিসে একমাত্র আমেরিকান সিনেমাই সহজলভ্য ছিল। আর সে কারণেই আমার প্রজন্মের প্রথম দেখনসম্ভব ফিল্ম ছিল এসব। আমি জানি, সিনিয়ার পরিচালকরা যেমন আন্তনিওনি, ফেলিনি কিংবা ভিসকন্তি আমেরিকান সিনেমার চেয়ে ফরাসি সিনেমা দ্বারাই প্রভাবিত ছিলেন কিংবা আমার বলা উচিত, তারা দুই ধরনের ফিল্ম সম্পর্কেই সঠিক ধারণা নিয়ে ফিল্ম ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ভেবে দেখতে গেলে, আমেরিকান সিনেমার প্রভাব ইউরোপে প্রথমবারের মতো বোঝা গিয়েছিল যুদ্ধের পর। আমেরিকান সিনেমাগুলো ছিল গোয়েন্দা কাহিনীনির্ভর, মিউজিক্যালস কিংবা সামাজিক নাট্যধর্মিতা, মেলোড্রামায় ভর্তি। এক রকমের বিশেষ ন্যারেটিভে বলা তাদের গল্প বিশাল সাধারণ দর্শকের কাছে খুব আদর পেয়েছিল। যেমন ধরা যাক, প্রথম যুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম, নাম করে বললে আমার প্রজন্ম, হয়তো আমার পরের দুটি প্রজন্ম। যখন পঞ্চাশের শেষে ফ্রান্সে নিউ ওয়েভ বিস্ফোরণ ঘটাল, আমার মতো লোকেরা নতুন বিকল্পের সন্ধান পেল। যে ফিল্মটা আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটি হলো গোদারের ব্রেথলেস, একটা গোয়েন্দা গল্পের ছদ্মবেশে সম্পূর্ণ অন্যভাবে লেখা এক গল্প। জন হাস্টনের লেখার ধরনের সঙ্গে গোদারের লেখার ধরনের চমকপ্রদ ফারাক আছে। কিন্তু আমাদের জন্য গোদার একেবারে সঠিক উত্তেজক উপহার দেন ভিন্ন ধরনের ডিসকোর্স আবিষ্কারের মাধ্যমে। অবশ্যই তিনি পুরোপুরি মৌলিক ছিলেন না এবং তার রাস্তাও একমাত্র রাস্তা নয়। তার আগে ইতালিয়ান  নিওরিয়ালিজম ছিল, ভিন্ন ধরনের লেখার অ্যাপ্রোচ ছিল, যার সঙ্গে ‘টাইমিং’-এর একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে, আন্তনিওনির ফিল্মগুলোয় যেমন। আরো যোগ করা যায়, আমাদের মতো, যারা এর অনুসারী ছিলাম, জাপানি ফিল্মও আমাদের আগ্রহের সীমানায় ছিল। এসব ফিল্ম আমাদের সিনেমা রচনা ও নির্মাণের চিন্তার অনেক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। এসব উপলব্ধি ছাড়াই নিজেকে নানা রকম পছন্দে শামিল হতে দেখি, যদিও এ কথাটা বলতেই হবে, আমার প্রাথমিক বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে। সেজন্য বলা যায়, আমি সম্পূর্ণ আলাদা ডিসকোর্সের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। টেক্সটের প্রেমিক ছিলাম। আমি প্রধানত মহান ইউরোপীয় লেখকদের পড়েছিলাম, আমেরিকান লেখকদেরও ভালোভাবেই জানতাম। হুইটম্যান থেকে হেমিংওয়ে, স্টেইনব্যাক, ফকনার ও জন ডস পাসোস। এটা খুব ইন্টারেস্টিং যে আমেরিকান লেখকরা সবসময়ই ইউরোপীয়দের সঙ্গে একটা সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু সিনেমায় এটি ঘটেনি। ইউরোপীয় আর আমেরিকান সাহিত্য তাদের সিনেমার তুলনায় অনেক কাছাকাছি। অবশ্য গ্রিক সাহিত্য এবং বিশেষ করে গ্রিক ট্র্যাজেডি—থিয়েটার করতে গিয়ে পড়তে হয়—এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায় আমার ভেতরে। এসব অভিজ্ঞতার আলোয় কী, কোন কাজটা পছন্দ ভাবতে ভাবতে আমি সিদ্ধান্তে এলাম গল্প আর গল্প লেখার পদ্ধতি একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত বলে রাখি, অনেকবার লেখাটা শেষ অব্ধি হয়ে উঠেছে ফিল্মের গল্প। এ কারণেই যে গল্প আমি বলছি সেটি কেবল নয়, কেমন করে বলছি—দুটোই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অল্প আগে জন্মে যাওয়ার ফলে আমি ইতিহাসচিহ্নিত হয়ে পড়াটা এড়াতে পারিনি। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, আমার নিজের দেশের ইতিহাস। যুদ্ধের আগের স্বৈরতন্ত্র, তারপর যুদ্ধ শেষে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো—গৃহযুদ্ধ আর তারপর আরেকজন স্বৈরশাসক— নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতা থেকে রেহাই পাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। আমার ক্ষেত্রে &dquote;&dquote;ইতিহাস বুঝতেই আমি হয় ইতিহাসনির্ভর বা ইতিহাস বিষয়ে মন্তব্য করতে ফিল্ম বানাই। খুবই স্বাভাবিক আমার পক্ষে নিজের গল্প বলবার জন্য নিজের অতীতেই ডুব দেয়া, একটা স্থানিক গল্পের স্বার্থে। ’৬৭-’৭৪ গ্রিক স্বৈরশাসনের কঠিন বাস্তবতার ধাক্কা আমাকে আক্রান্ত করে। বাবার সঙ্গে থাকা ছোট এক ছেলে আমি। বাবাকে জেলে পোরা হলো, মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো, আরো নানা সব ব্যাপার। এসব ঘটনা আমার অস্তিত্বের দিকে ফিরে ফিরে আসে আর ব্যক্তিগত ইতিহাসটা দেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করবার উপাদান হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: আমাদের দর্শকরা ইঙ্গমার ব্যারিমানের কাজের সঙ্গে পরিচিত, আপনার মতোই যিনি নিজের চিত্রনাট্য নিজেই রচনা করেন। কিন্তু আপনি ঠিক তার মতই একজন নিয়মিত ক্যামেরাম্যানকে সঙ্গে রাখেন। আপনার ক্ষেত্রে গিয়র্গস আরভানিটিস—আপনার সব ফিল্মেই তিনি আছেন। আর একই কুশীলবের সঙ্গে কাজ করবার প্রবণতা আছে আপনার। আমি অনুভব করি, আপনাদের দুজনের কাজে একটা বড় ফারাক আছে। তিনি মনে হয় অভিনেতাদের ভেবেই চিত্রনাট্য লেখেন কিন্তু আপনি লেখেন না। আরো কথা হচ্ছে, যখন তার সিনেমাগুলোর বিষয় ব্যক্তিগত স্নায়ুচাপ, এমনকি স্নায়ুর অভ্যন্তরীণ অসুখ (আমি কিন্তু সমালোচনা করতে বলছি না এসব), তখন আপনার কাজের অধিকতর কেন্দ্র সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঘুরে বেড়ায় আপনার সব ফিল্ম—হোমার, এসকাইলাস, ইউরিপিদিস আর সোফাক্লেস এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নানা রেফারেন্স। ব্যারিমানের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে আপনি যদি আপনার কাজের পদ্ধতিটা বলতেন, তাহলে জানা জিনিসের মাধ্যমে আমরা অজানা জিনিসের জন্য প্রস্তুত হতে পারতাম, আমার মনে হয়।

উত্তর: আমি আমার কাজের সঙ্গে ব্যারিমানের কোনো মিল পাই না। আমার সিনেমা মনস্তাত্ত্বিক নয়, এটা হলো এপিক। ব্যক্তিমানুষকে এখানে সাইকোঅ্যানালিসিসের ভেতর ফেলা হয় না, বরং একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রাখি তাকে। আমার চরিত্ররা এপিক সিনেমার সব উপাদান উপলব্ধি করতে পারে। অথবা আমি এ-ও বলতে পারি, সেসব এপিক কবিতা, স্পষ্ট ব্যক্তিত্বের টিপিক্যাল উপস্থাপনা। হোমারে, অডিসিউসে চোখ বুজে থাকা এক লোক; একিলিস সাহসী, বন্ধুদের প্রতি বিশ্বস্ত—এসব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য একেবারেই পরিবর্তন হয় না। ব্রেখটের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার, চরিত্ররা জীবনের চেয়েও বড়, তারা ইতিহাস কিংবা চিন্তার বাহক হিসেবে কাজ করে। আমার চরিত্ররা অ্যানালিসিসের ভেতর পড়ে না, তারা ব্যারিমানের কাজের মতো মানসিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যায় না। তারা অনেক কোমল হূদয়, হারিয়ে যাওয়া জিনিস খোঁজে, আকাঙ্ক্ষা আর বাস্তবতার টানাটানিতে হারিয়ে যাওয়া সবকিছু। বেশিদিন আগের কথা নয়, দুনিয়ার ইতিহাস ছিল আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনো একভাবে দুনিয়া বদলে ফেলার আকাঙ্ক্ষা। এখন শতাব্দীর শেষে এসে আমরা বুঝতে পারছি, যা চেয়েছিলাম কখনই আসলে সেসব ঘটেনি এবং যেসব কারণে ওসব ঘটেনি, তা ব্যাখ্যা করবার ক্ষমতা আমার নেই। হয়তো সেই সময়ের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি দ্বারা কোনো কিছু পাল্টানো অসম্ভব ছিল। কিন্তু যেকোনোভাবেই হোক, আমরা আমাদের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাসহ রয়ে গেছি, অপূর্ণ স্বপ্নের ছাই নিয়ে। আমার শেষ তিন সিনেমা এ ছাইয়ের স্বাদের প্রতিফলন। ভবিষ্যতে কোনো একদিন স্বপ্ন পূর্ণ হবে—এ আশা রেখে যাওয়া পরের ডিসকোর্সের জন্য। আমার লেখাপত্তর আর ব্যারিমানের ভেতর কোনো সম্পর্ক নেই। তার ফিল্মে শক্তপোক্ত মেটাফিজিক্যাল এলিমেন্টস আছে, যা কিনা ঈশ্বরকে মান্য করা বা বাতিল করে দেয়া এক পিতৃপ্রতিম চরিত্র সন্ধান করে। আমার মতে, আমার কাজে সেই পিতৃপ্রতিম চরিত্র নিজে কোনো উদ্দেশ্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমার সিনেমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধান। আমার ফিল্মেরা তার মতো মেটাফিজিক্যাল নয়। সেসব একটা আশ্চর্য উপায়ে ব্যারিমানের চেয়ে বেশি অস্তিত্ববাদী। এটা সুনিশ্চিতভাবে ভয়েজ টু সাইথেরা, দ্য বি কিপার আর ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্টের ঘটনা।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনার ঐতিহাসিক ট্রিলজির ভেতর ডেজ অব থার্টি সিক্স, দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স ও দ্য হান্টার্সের মধ্যে দ্বিতীয় ছবিটা আবার মেগালেজ্যান্ড্রোস, যা কিনা আংশিকভাবে প্রকৃত ইতিহাসভিত্তিক। ১৮৭০ সালে ঘটা একটা ঘটনা। ম্যারাথন থেকে গ্রিক দস্যুরা একদল ইংরেজ পর্যটককে অপহরণ করেছিল, এ সিনেমাটি ইতিহাসের নানা উপাদান নিয়ে ভাবিত ছিল, এমনকি পরাবাস্তবতা নিয়েও। পনেরো শতকের একটা কিংবদন্তির পুনর্বয়ান ঘটায় সিনেমাটা। একটা দেশের অপেক্ষা থাকে, একজন মসীহা ধরনের মুক্তিদাতার। যখন তার উদয় ঘটল, দেখা গেল তিনি কিন্তু দানবে পরিণত হলেন। একই সময়ে সিনেমাটা আধুনিক স্বৈরশাসক বিষয়ে এক ধরনের এলিগরিক্যাল মেডিটেশন। এটা কি ঠিকভাবে বললে ভিন্ন পদ্ধতিতে ইতিহাসের অনুসরণ? বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার টানাপড়েন আপনার কাজের মূল কেন্দ্র? এ বিষয়ে কী ভাবেন?

উত্তর: মেগালেজ্যান্ড্রোস একটি দার্শনিক, রাজনৈতিক প্রতিবেদন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সমস্যা বিষয়ে আগের তিন ফিল্মে এসবের তিক্ত পরিণতি দেখিয়েছি। মানবিক আশা হিসেবে আমার আগের কাজে যা কিছুই চিহ্নিত হবে, মনে হচ্ছে এটাতে আমি সবকিছু সরিয়ে নিয়েছি, ভেতর থেকেই সরে যাওয়া, এ ঘটনা বেদনার। মেগালেজ্যান্ড্রোস পূর্ব ইউরোপের বিপর্যয়ের বহু আগেই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে মন্তব্য করেছিল এবং দুনিয়ার এই অংশে সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষার বিপর্যয়কে বিষয় করে এটা এক প্রফেটিক ফিল্ম। সে সময়ে আমি অন্যভাবে কথাগুলো বলতে পারিনি। আমাকে পুরাণের ফর্ম ব্যবহার করতে হয়েছিল। আমি অথেনটিক তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করতে চাইনি, কেননা তাহলে কাব্যিক ভাষা থেকে সিনেমাটা দূরে সরে যেত। আমি বিশ্বাস করি, একটি ফিল্ম অবশ্যই অন্য যেকোনো কিছুর আগে একটি কাব্যিক ঘটনা, নইলে এর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। যেসব পরিচালককে আমি ভালোবাসি, তাদের ক্ষেত্রে এটি সত্য। যেমন অসিমা (নাগিসা অসিমা) আর তাভিয়ানিস, তারাও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেন, বর্তমান সম্পর্কে বলবার দরকারে অতীতে চলে যান।

প্রশ্ন: আমার মনে হচ্ছে দুনিয়ার যেকোনো পরিচালকের চেয়ে আপনার ফিল্মের চরিত্ররা কেবল এক স্বতন্ত্র স্থান নয়, আলাদা সময়েরও অধিবাসী। প্রশ্নাতিরিক্তভাবেই আপনার চিত্রমালা গ্রিসের শরীরী উপস্থিতিতে স্পন্দিত হয়—পাথরের রাশি, রাস্তাঘাট, দেয়াল, ছাদ, আকাশ, বৃষ্টির ঝরে পড়া, কুয়াশা। স্থানের এ অনুভূতিটুকু আপনার সহমর্মীদের কাছে—যদি থাকেন তারা—পৌঁছে যায়। কিন্তু আমি ভাবছি সময় আর ইতিহাসের জন্য আপনার গহন অনুভবটুকুর কথা, এসবই আপনাকে আলাদা করেছে। আপনার প্রথম ফিল্ম রিকনস্ট্রাকশন ছিল একটি সত্যিকার খুনের ঘটনার পুনর্নিমাণ। পত্রপত্রিকার রেকর্ড আর কোর্টের রেকর্ডপত্র অবলম্বনে এবং এমনকি স্পাইরোস দ্য বি কিপারে গ্রিসের উত্তর থেকে দক্ষিণ অব্ধি ঘুরে বেড়াচ্ছে, নানা স্মৃতি নিজের মনে ফিরিয়ে আনছে, প্রায় সিনেমা ভেরিতের ফ্ল্যাশব্যাকের কায়দায়, তার জীবনের শুরুর দিনগুলোর দৃশ্যাবলি। আপনি মন জিনিসটাকে ইতিহাসের সুনির্দিষ্টতায় বেঁধে ফেলেছেন। এমনকি আপনি যদি এসবকে নতুন করে ফলিয়ে তোলা বলে চিহ্নিত করে তুলতে চান, দেখা যাচ্ছে আগের আমলের গ্রিক ইতিহাসের নায়কদের রেফারেন্স হিসেবে রেখে চরিত্রগুলোকে তৈরি করছেন ধারাবাহিকভাবেই, পরোক্ষভাবে ধ্রুপদী সাহিত্যেরও উল্লেখ থাকে, যা উপরে বললাম। আপনি কেমন করে ইতিহাসের এই তীক্ষ অনুভব ব্যাখ্যা করবেন? ফিল্মগুলোয় এ ‘তথ্যচিত্রমূলক হস্তক্ষেপ’ সম্পর্কেই-বা কী বলবেন?&dquote;&dquote;

উত্তর: আমি কিন্তু ইতিহাসের এ অনুভবটিকে ‘তথ্যচিত্রের হস্তক্ষেপ’ বলতে চাই না। আমি বরং ভাবতে চাই, এটি গ্রিক ঐতিহ্য। আমরা যদি গ্রিক ধ্রুপদী শিল্পের দিকে তাকাই, দেখব তাদের বেশির ভাগের কাজ প্রাচীন পুরাণ নিয়ে। আর এ পটভূমিতে ইতিহাস ধারাবাহিক পটভূমি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, অন্যান্য কেন্দ্রীয় বিবেচনা থেকে স্বাধীন হয়েই। আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে আমার সংযুক্ততার উৎস এ তথ্যটি, আমি একজন গ্রিক। ইতিহাস মিশে আছে আমার সার্বিক পরিমণ্ডলে। গ্রিক চিত্রমালা আর বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক। আর এ শতাব্দীতে গ্রিক সিনেমার সঙ্গে। অনেক বছর ধরেই আমার দেশে ইতিহাসের প্রতি প্রথাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ জন্মসম্ভব বলে মনে হয় না। সাধারণ ঐক্যই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্যতার দিক। কিন্তু চুয়াত্তরের স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর গ্রিসে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ফিল্মের বিস্ফোরণ ঘটল। এসব ফিল্ম অনেক বছর আগে থেকেই বানানো দরকার ছিল। আমি অবশ্যই নিছক আমার ফিল্মের কথাই বলছি না। কেননা এ অঞ্চলটি স্বৈরতন্ত্রের সময়ই আবিষ্কার করে দেখবার চেষ্টায় ছিলাম। আমি বোঝাতে চাইছি, সাধারণভাবে ওরা চলে যাবার পরেই কেবল গ্রিক সিনেমা এসব নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে এবং এরই মধ্যে অনেক দেরি ঘটে গেছে। একই সময়ে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে গ্রিক সিনেমা রিসোর্সের অভাবজনিত কারণে কমেডি কিংবা তারাখচিত ছিচকাঁদুনে ফিল্মনির্ভর ছিল। এভাবেই নিজেদের অঞ্চলে ব্যবহারের জন্য ছ্যাবলামি ধরনের ফিল্ম আর মেলোড্রামাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। অনেকদিনের মধ্যে একবার-দুবার দু-একটা ফিল্মের মধ্যে সত্যিকার ট্র্যাজেডির উপাদান ছিল, যেমন কাকোয়ান্নিসের স্টেলা, কন্দোরুসের ড্রাকোস লোককথার ওপর নির্ভর করে বানানো এবং ইতিহাসভিত্তিক ফিল্ম। আর একটু আগে বলা কন্দোরুসেরই পারানোমি। আমরা যদি সময় নিয়ে কথা বলা স্থির করি, আমাকে এই পুরো বিষয়কে দুই ভাগে ভাগ করতে হবে—ঐতিহাসিক সময় আর ‘টাইমিং’। সাধারণের সময়ের ভেতরের একটা নড়াচড়া ফ্ল্যাশব্যাকে দেখানো হয়, কাটের ভেতর দিয়ে ঐতিহাসিক সময়ে হাত দেয়া যায় না। একটা পুরনো আমলের আমেরিকান ফিল্মের কথা বলি, বানিয়েছিলেন লাজলো বেনেনডেক, বর্তমান সময় থেকে অতীতের মুভমেন্ট আলোর সামান্য পরিবর্তন সাধন করে একই স্পেসের মধ্যে দেখানো হয়েছিল। একটা সুইডিশ ফিল্ম—মিস জুলিতে সময় চরিত্রদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের ভেতর দিয়ে ঘোরাফেরা করেছে। অন্যদিক দিয়ে বললে, প্রত্যেক সময়ে তাদের মধ্যে কেউ অতীত থেকে কিছু একটা সংগ্রহ করে নিচ্ছে। আমি যা করেছিলাম তা ছিল সিনেমার ইতিহাসে অর্জিত প্রথম ঘটনা। আমার নিজের কাজ ছিল, আমরা যাকে বলি কালেকটিভ মেমোরি তা নিয়ে এবং সম্মিলিত ব্যক্তিগত স্মৃতির চেয়েও সম্মিলিত ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে, একই স্পেসে নানা সময়কে মেশানো, ফ্ল্যাশব্যাকের মধ্য দিয়ে সময়ের বদল দেখাইনি। এসব ঘটনা একজন মানুষের চেয়ে সামষ্টিক স্মৃতির প্রতিই মানানসই হবে এবং সেটি সুন্দরভাবে সম্ভব হয়েছিল কোনো ধরনের কাট ব্যবহার না করেই। একটা শটে তিন-চারটে আলাদা ঐতিহাসিক সময়খণ্ডকে পাশাপাশি রেখে বদলটা ঘটিয়েছিলাম। সময়ের একেবারে গভীরে ধারাবাহিক আর্তিভারাতুর ঝাঁপ দেয়া বলতে পারেন। উদাহরণ দিই আপনাকে। দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্সে  ট্রেন যখন ১৯৪০ চিহ্নিত বছরে ছুটছিল, একজন অভিনেতা এশিয়া মাইনর সম্পর্কে বলছিলেন যুদ্ধ শুরুর কথা। যখন ট্রেন থামল, অভিনেতা নামলেন এবং ক্যামেরার দিকে সোজা তাকিয়ে এশিয়া মাইনরের ১৯২২ সালে ঘটা যুদ্ধের কথা বলতে থাকলেন কিন্তু তিনি যখন ক্যামেরার দিকে চেয়ে এসব বলছিলেন, মুহূর্তটা হচ্ছে এখন; ‘এখন’ এই সময় হয়ে উঠছে যখন প্রত্যেকে ফিল্মটা দেখছে। এ পদ্ধতিতে তিনটি আলাদা ঐতিহাসিক সময় পরস্পর মিশ্রিত হয়ে গেছে। বর্তমান কাল, ১৯৪০ এবং ১৯২২। অন্য একটি দৃশ্যে দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্সের নতুন কুশীলবদের দেখা যায় ১৯৫২-এর রাস্তা ধরে হাঁটছেন, যতক্ষণ অবধি না তারা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। আর ঠিক এ সময়ে শটটা প্যানারোমিক হয়ে যাচ্ছে আর আমরা দেখছি একই শটে ১৯৪২ সালের জার্মান ভিন্টেজ গাড়ি এসে ঢুকছে। ভ্রাম্যমাণ অভিনেতা দল অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জায়গাটায় ক্যামেরা রিফোকাস করলে আমরা দেখতে পাচ্ছি জার্মান সৈন্যদের, দৃশ্যটিতে যেন কোনো ইন্টারাপশন ঘটেনি। এটা নানা রকম ঐতিহাসিক মুহূর্তের ধারাবাহিক ও দ্বান্দ্বিক উপস্থাপনা হয়ে উঠছে। কিন্তু দেখুন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়ার সম্পর্কে সম্পর্কিত হচ্ছে না। এসব কারণে দৃশ্যটি দেখার সময় অন্য এক অনুভূতি সিনেমাভাষার কারণেই একেবারে প্রথম অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়। আমি বলতে চাইছি, যে পদ্ধতিতে সময়কে ব্যবহার করি, সময়টা স্পেস আর স্পেসটা অদ্ভুতভাবে সময় হয়ে ওঠে। আমি জানি না, বোঝার মতো ভাষায় বলতে পারছি কিনা কিন্তু সময় আর স্থানের ভেতর এক ছন্দের অস্তিত্ব আছে, এ ধারাবাহিক ছন্দ ঘটনাগুলোর নানা রকম মাত্রা উপস্থিত করে পর্দায়।

প্রশ্ন: আপনার কাজগুলোর দৃশ্যায়নের চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করছে যে ব্যাপারগুলো, সেসব নিয়ে আলাপ তোলা যাক। যেমন লং টেক, ট্র্যাকিং শট, ৩৬০ সার্কুলার শট—এসব কৌশল দর্শককে সাহায্য করে কিংবা ‘তৈরি’ করে, যাতে তিনি ‘সত্য’ দৃশ্যটাকে তার সুনির্দিষ্ট সময়কালসহ দেখেন। আপনি এ বিষয়ে কী বলবেন, আপনার উদ্দেশ্য কী? সময় ও স্থানের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এসবের অথবা কোনো মিথস্ক্রিয়া? কিংবা আপনার কিছু ছবি বেশ দীর্ঘ এর সঙ্গে এসবের সম্পর্ক আছে, নাকি আপনার দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস-পরিপ্রেক্ষিতে সমসাময়িক চরিত্র স্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত?

উত্তর: আমার কাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উৎস দীর্ঘকাল ধরে ফিল্ম দেখা। বছরের পর বছর ধরে আমার চারপাশের সংখ্যাতীত ফিল্ম আমি দেখেছি, খুব ইন্টারেস্টিং জিনিসপত্র শুষে নিয়েছি। আর যখন পরে লেখালেখি আর সিনেমা বানাতে শুরু করলাম, সিনেমার উপরিতলে সবকিছু ফিরে এল এবং স্টাইলে পরিণত হলো। লেখাপত্র, ব্যক্তিগত লেখাপত্র, আমি যদি ব্যাখ্যা করে বলি, বলতে পারি লং শট,  সিকোয়েন্স শট সম্পর্কে আমার দুর্বলতার উৎস হচ্ছে সাধারণভাবে যাকে সমান্তরাল সম্পাদনা বলে, সেটিকে আমি প্রত্যাখ্যান করতে চাই। কারণ আমার বিশ্বাস এসব বানিয়ে তোলা, ফেনিয়ে তোলা ব্যাপার। ঐতিহাসিক কারণেই যারা এ ধরনের মন্তাজের আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের কাজ আমি সমর্থন করি, আইজেনস্টাইনের মতো কিন্তু এসব আমার ধরনের ফিল্ম নয়। একেবারে স্পষ্ট করে যদি বলি, আমার কাছে প্রতিটি দৃশ্য জ্যান্ত, তার নিজস্ব শ্বাস-স্পন্দনসহ, শ্বাসের ওঠানামা টের পাওয়া যায়। এটা এমন এক পদ্ধতি, যা কোনো রকম বাধা সহ্য করে না। প্রতিটি দৃশ্যের প্রাকৃতিক শুরু ও শেষ আছে। আজকালকার সিনেমায় তথাকথিত স্তব্ধ সময়ে—নীরবতা আর স্তব্ধতা—এসব বাতিল মাল। এই অনির্দিষ্ট সময় যা কিনা দুটো দৃশ্যে সম্পর্ক সাধন করে, বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমার জন্য এমনকি নীরবতাকেও সুরেলা বাঙ্ময় হয়ে উঠতে হয়, কাট কিংবা নিথর দৃশ্যে ফলিয়ে তোলা নয়, বরং দৃশ্যের ভেতরকার সুন্দর অক্ষুণ্ন রেখে। আমি দ্রুত আর মন্থর অভ্যন্তরীণ ছন্দ ব্যবহার করেছিলাম লং শটে, একটা উৎসবের উপাদানকে ফুটিয়ে তুলতে। 

মেগালেজ্যান্ড্রোসের গড়নটা হলো, বাইজেন্টিয়ান পূজাবিধির মতো। এখানে মঞ্চায়নের ধরনের উৎসবাদির উপাদান আছে, এসবকে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হতো। কোরিওগ্রাফি টার্মটা আমার সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। আমি এভাবে বলতে চাই না, কেননা মানুষের মুখের কোনো কোরিওগ্রাফি হয় না। ধারাবাহিক গতির মধ্যে স্থানের কোরিওগ্রাফি সম্ভব, যা এ স্থানকে সুরেলা একর্ডিয়নের মতো খুলতে ও বন্ধ করতে সাহায্য করে। সম্পাদনা অভ্যন্তরীণ জিনিস, একটা সিকোয়েন্সের হয়তো দশখানা শট দরকার প্রথাগত সম্পাদনা সিস্টেমে, এখন একটাতেই পেয়ে যাচ্ছি, যার ভেতর দশটাই আছে, কারণ সত্যি বলতে গেলে অনেক শটে কাটা হয়েছে এই পুরো ব্যাপারটা। আমি এসব করেছি তথাকথিত স্থবির সময়, নীরবতা বাদ না দিয়েই।

আমেরিকান মডেলের দিকে তাকান। প্রতিটা আলাদা দৃশ্যের জন্য তার নানা রকম অ্যাঙ্গেল লাগে। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটা শটের জন্য কেবল একটা অ্যাঙ্গেলই থাকবে। খেলাটার প্রাথমিক নিয়ম এটাই। কিছু ব্যাপার আমরা আলোচনা করিনি, সুনির্দিষ্ট শট ব্যবহারের পদ্ধতি। উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, আমার শেষ ছবিতে (ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট) ধর্ষণ দৃশ্যটি ফিক্সড শট, যেখানে দেখা দৃশ্যের চেয়ে শব্দের অধিকতর অর্থ আছে। এ দৃশ্যে শব্দ স্পেসকে অনেক বেশি ছন্দময় করে। ফিল্মের বহিরঙ্গে এ কারণে একটা নতুন অর্থের স্তর দাঁড় করায়।

এটা চিত্রকর্মের মতো, ফ্রেমের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না, বাইরেও কাজ করে যায়। দর্শককে সাজেশন দেয়ার শক্তিটা বহুমাত্রিকভাবে চর্চিত হয় কেবল দর্শকদের কল্পনাশক্তিকে মুক্ত করে দিতে, যাতে তারা ফিল্মের ভেতরে আরেকটা ফিল্ম নিজেদের জন্য তৈরি করে নিতে পারেন। দর্শকরা অস্তিত্বমান থাকেন নানা মাত্রায় এবং নিষ্ক্রিয় হন না কখনই, তারা পরিচালকের কল্পনার সঙ্গে নিজেদের কল্পনাটুকুও যোগ করে দেন। আপনি অবশ্যই জানবেন, গ্রিক ট্র্যাজেডির সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই মঞ্চের ওপর ঘটে, কখনই মঞ্চের পেছনে ঘটে না। আমার ক্ষেত্রে ক্যামেরা ভ্রমণের মাধ্যমে ট্র্যাকিং শট একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ স্পেস তৈরি করে। ফিল্মে তোলা জিনিসের দিকে তাক করে রাখা লেন্সের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে স্পেস সংকুচিত বা প্রসারিত হয়। একটা ধারাবাহিক গতি শটের অভ্যন্তরে দুর্দান্ত নমনীয়তা তৈরি করে, বয়ে চলা জলের গতির মতো।

দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স তোলার সময়ে ক্যামেরা সবসময়ই চলন্ত ট্র্যাকে ছিল, এমনকি গতিসঞ্চারে এটিকে ১০ সেন্টিমিটার নড়তে হলেও। ৩৬০ ডিগ্রি শট ফিল্মিংয়ের ভেতর বৃত্তের যে ধারণা রয়ে গেছে, তার অর্থবিস্তারে জোর দেয়ার জন্য ব্যবহার হয়েছে। মেগালেজ্যানড্রোসে ধরে নেয়াই ছিল যে বৃত্ত সব ফর্মের অংশ এবং এটি এসেছে প্রাচীন মঞ্চ ব্যবস্থাপনার বৃত্তাকার মঞ্চের ধারণা থেকে, যেখানে সব অভিনয় ঘটে। দেখুন, আজকের দিনে কেউ যখন সিনেমা বানানো শুরু করেন, সিনেমাই হচ্ছে তার শুরুর বিন্দু। আমার প্রজন্ম ভিন্নভাবে শুরু করেছিল। আমার বৃদ্ধি ঘটেছিল সাহিত্য প্রভাবিত হয়ে। আমি কবিতা আর ছোটগল্প লেখার মাধ্যমে শুরু করেছিলাম। আর তারপর সিনেমায় এসেছি। সুতরাং আমি ভিন্ন স্পেস দ্বারা প্রভাবিত, যেখানে লেখার কাজটা খেলার নির্ধারক নিয়ম। পর্যায়ক্রমিকভাবে আমি ব্যাপারটা সিনেমায় নিয়ে এসেছি।

প্রশ্ন: আপনার বাফেলো রেট্রোসপেক্টিভ শুরু হবে দ্য বি কিপার দিয়ে এবং আমি দুটো প্রশ্ন এই ফাঁকে সেরে রাখতে চাই। দুটোই আইকন বা ইমেজসংক্রান্ত। দ্য বি কিপার প্রথম ফিল্ম, যেখানে আপনি একজন আন্তর্জাতিক ‘নক্ষত্র’-কে ব্যবহার করলেন, মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানি খুবই আলাদা এক আইকন, অন্য অনেক কাজে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। আপনি এ আইকনকে কেমন করে বোঝেন এবং কেমন করে আপনি তাকে ব্যবহার করলেন আর পুনর্নির্মাণ ঘটালেন তার? আরেকটা প্রশ্ন লিখিত চিত্রনাট্য আর শুটিংয়ের সত্যিকার বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মিজ- অ- সিনের সব সম্ভাবনা—স্পাইরোসের বাড়ি, যে হোটেলে সে থাকে, তার বালকবেলার বাড়ি,  তার নিজস্ব গন্তব্য, জুকবক্স আর কোমল পানীয়ের দোকানের দৃশ্য দুটি না হয় বাদ দিলাম—সব মিলিয়ে এক মৌচাকের সম্ভাব্যতার দিকে নিয়ে যায় আমাদের। এসব কি আগে থেকে বানিয়ে রাখা অত্যন্ত জটিল আইকোনোগ্রাফিক উপস্থিতি, নাকি এটি সিনেমার সঙ্গেই ফলে উঠেছে এবং কীভাবে পদ্ধতিটা সম্ভব হয়ে উঠল?

উত্তর: মাস্ত্রোইয়ানিকে ব্যবহার করবার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আমি বরং চেয়েছিলাম তার দৃশ্যমান ইমেজ পাল্টে দিতে। আমি এমন একজন অভিনেতার সন্ধানে সচেষ্ট ছিলাম, যিনি সিনেমাটা নিজের কাঁধে বহন করতে সক্ষম। চরিত্রটি বিশিষ্টতার যেকোনো প্রকার দৃশ্যায়ন থেকে ছিন্নতা আর আন্তরিক নীরব অভিনয় দাবি করছিল। আমার মনে হয়, তাকে এতদিন ধরে যেভাবে দেখানো হচ্ছিল, তার ঠিক উল্টো। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যেকোনো অভিনেতা বা গ্রিসে যাকে ভালো করে চিনি, তিনি চরিত্রের ভারেই মারা পড়তেন। অন্যদিকে মাস্ত্রোইয়ানি ভালো অভিনেতা বলেই ছবিটা টেনে নিয়ে যাননি, বরং এ ভারকে ইমেজ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

কখনো কখনো আমার ফিল্মগুলো চিত্রনাট্যের অবিকল আয়না; অন্য সময়ে চিত্রনাট্য নোট আকারে থাকে এবং ছবি তোলার পদ্ধতি ইম্প্রোভাইজেশনের ওপর নির্ভর করে।  কোনো সময় কিছু ঘটনা আপনাকে ইম্প্রোভাইজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে, আবার আরেক সময় প্রবলভাবে চাইবেন লিখিত চিত্রনাট্যকেই অনুসরণ করতে। এটা সম্পূর্ণভাবে যেসব উপাদান নিয়ে কাজ করছেন, তার ওপর নির্ভর করে এবং সিনেমা বানানোর সময়ের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমি গিয়েছি, তা নানা রকম। খুব ভালো থেকে খুব খারাপ কিন্তু আমি যা করতে চেয়েছি তা থেকে কখনই পেছনে সরিনি। বলতে পারি, ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট চিত্রনাট্যের নিখুঁত প্রতিলিপি আর দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স শুরু হয়েছিল আমার নোট থেকে। ভয়েজ টু সাইথেরা মূল চিত্রনাট্য থেকে অনেক দূরের এবং দ্য বি কিপার খুব কাছের।

আমি চিত্রনাট্য লেখার সময় নানা মানুষজনের সঙ্গে কথা বলি লেখাটা নিয়ে, পিংপং খেলার মতো, যেখানে তারা শয়তানের উকিল কিংবা অনুঘটকের কাজ করে। চিত্রনাট্য লেখার সময় অন্য লোকদের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হয়ে ওঠে। এ ধারাবাহিক আবিষ্কারের ঘটনা তখনই ঘটে, যখন তাদের সঙ্গে কথা বলি। ভয়েজ টু সাইথেরা সমুদ্রের মাঝখানে ভাসমান ভেলায় দুটো বুড়ো মানুষের দৃশ্য দিয়ে শুরু করেছিলাম। ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্টের প্রথম দৃশ্য ছিল শহরটা কুয়াশায় প্রায় অদৃশ্য আর একটা হাত তাতে ডুবে যাচ্ছে।