অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে তার জীবদ্দশায় একটি কথা প্রচলিত ছিল—সিমলায় গিয়ে মি. জ্যাকবের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা হচ্ছে ভারতে এসে তাজমহল না দেখার মতো। মানুষটি রহস্যময়, জাদুকর, হীরা ব্যবসায়ী ও গুপ্তচর। তিনি দুনিয়ার হীরা কেনাবেচার অন্যতম আলোচিত ঘটনার হোতা। ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে চলা গ্রেট গেমেও তার অংশগ্রহণ ছিল। যাদের সঙ্গেই তার দেখা হয়েছে, তাদের সবাই কমবেশি তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এই প্রভাবিত মানুষদের একজন ছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং। মানুষটাকে তিনি অমর করে রেখেছেন তার ক্ল্যাসিক উপন্যাস কিম-এ। মি. জ্যাকবের পুরো নাম আলেকজান্ডার ম্যালকম জ্যাকব। কিপলিং কিম উপন্যাসে তাকে বর্ণনা করেছেন লুর্গান সাহেব নামে, যাকে বলা হয়েছে ‘হিলার অব সিক পার্লস’।
জ্যাকবের উদ্ভব কুয়াশাচ্ছন্ন অতীত থেকে, তারপর তিনি হয়ে উঠলেন অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত এক হীরা ব্যবসায়ী, জাদুকর ও গুপ্তচর। তার জন্ম তুরস্কে, ১৮৪৯ সালে। অনেকে তাকে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সমাজের এক সেতুবন্ধ বলে গণ্য করেন। জ্যাকবের পরিচয় রহস্যাবৃত। ব্রিটিশরাজের বিভিন্ন পত্রিকা ও বইয়ে অনেক সময় জ্যাকবকে ছদ্মবেশী আরব জিনিয়াস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কেউ লিখেছেন, জ্যাকব বিশুদ্ধ পারসিক, গ্রিক, ইতালীয়, তুর্কি, জিপসি। এটা ঠিক, তার বেশভূষায় এসব পরিচয়েরই ছাপ খুঁজে পাওয়া যেত।
বেশির ভাগ সূত্রমতে, জ্যাকব ছিলেন ইহুদি। তার নামও সেই সাক্ষ্য দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন জ্যাকব পার্সি, কেউ বলেন খ্রিস্টান আবার কেউ মুসলিম। শোনা যায়, জীবনের শেষদিকে জ্যাকব নিজেকে বৌদ্ধ বলে দাবি করেছিলেন।
জ্যাকব ছিলেন কৌশলী ও ধূর্ত ব্যবসায়ী কিংবা কোনো ধনী বুড়ো জাদুকর, কারণ তিনি তার ক্রেতাকে একটি মূল্যবান রত্নের জন্য পুরো সিংহাসন ত্যাগ করতেও রাজি করিয়ে ফেলতে পারতেন!
জ্যাকব জীবন শুরু করেছিলেন কপর্দকশূন্য অবস্থায়, কিন্তু হয়ে গিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যান্টিক ডিলার। তার ক্রেতাদের মধ্যে ছিলেন ভারতের ভাইসরয়রা। বলা হয়, জ্যাকব তার কর্মজীবনে অন্তত ৫ কোটি পাউন্ড মূল্যমানের হীরা, অন্যান্য রত্ন, অলংকার ও অ্যান্টিকের কেনাবেচা করেছিলেন। জ্যাকবের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ঘটনা ছিল হায়দরাবাদের নিজামের কাছে দুনিয়ার অন্যতম বড় হীরা দি ইম্পেরিয়াল বিক্রি। এ গল্পের শুরুটা হয়েছিল আফ্রিকায়।
১৮৮৪ সালের কোনো একদিন আফ্রিকার কিম্বারলি খনিতে যথারীতি কাজ চলছিল। নজরদারি কর্মকর্তাদের একজনের হঠাৎ নজর গেল ডিম্বাকার একটি পাথরের দিকে, যার এক কোণে চিড় ধরা। হাতে নেয়ার পর তিনি পাথরখণ্ডটির ভেতরে থাকা ক্রিস্টালের ওজন ও অক্টাহেড্রাল আকার সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যান। হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝে ফেলেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অমসৃণ হীরকখণ্ডগুলোর একটি তার হাতে। সাধারণত হীরার খনিতে শ্রমিকদের কঠোরভাবে তল্লাশি করে সেখান থেকে বের করা হতো। কিন্তু কর্মকর্তারা পুরো দেহ তল্লাশি থেকে কিছুটা ছাড় পেতেন। আর সেই সুযোগে তিনি সেই হীরকখণ্ডটি গোপনে খনির বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর চার চোরাকারবারি দলের কাছে অমসৃণ ৪৫৭ ক্যারেট খণ্ডটি ৩ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দেন। এক রাতে জুয়া আর মদে চারজনের দুজন নিজেদের টাকা-পয়সা খুইয়ে ফেলেন। অন্য সদস্যরা খণ্ডটি কেপটাউনের এক ডিলারের কাছে ১৯ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দেন। শুল্ক এড়াতে হীরার খণ্ডটি তিনি পকেটে নিয়ে ইংল্যান্ডগামী জাহাজে ওঠেন। লন্ডনে পৌঁছে সেই ডিলার হাটন গার্ডেনের অলংকারের বাজারে ঘুরতে শুরু করলেন। নয় সদস্যের একটি সিন্ডিকেট হীরাটি ৪৫ হাজার পাউন্ডে কিনে নেয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে হীরকখণ্ডটির দাম বেড়ে গেল ১৫ গুণ। কিন্তু এটাও তার প্রকৃত মূল্যের সামান্য অংশ মাত্র। ১৮৯৭ সালের ৯ এপ্রিল নেদারল্যান্ডসের রানীর উপস্থিতিতে এম. বি. বারেন্ডজ নামের এক কারিগর বিশেষ এক ধরনের চাকা ব্যবহার করে হীরাটিকে আকৃতি দিতে শুরু করলেন। এ চাকাকে শক্ত করা হয়েছিল হীরার গুঁড়ো দিয়ে। হীরাটির মূল্য ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে এটি কাটার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বলা বাহুল্য, এর অক্টাহেড্রাল আকৃতি নিখুঁতভাবে রক্ষা করাটা খুব কঠিন কাজ ছিল। বারেন্ডেজ একনাগাড়ে চাকাটি সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা ঘোরাতে পারতেন, কারণ এর বেশি হলে পাথরটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যেত। এক বছরের বেশি সময় পর কোণ আকারের নীল রঙের হীরক উন্মোচন করেন। হীরাটির নাম তখন হয় দি ইম্পেরিয়াল। স্থানীয় এক সংবাদপত্র ঘোষণা করে, ‘দি ইম্পেরিয়ালে কোনো খুঁত নেই। এর রঙ পারফেক্ট (সাদা)। এটি দুনিয়ার সেই হীরাগুলোর একটি, যেগুলো রঙ, বিশুদ্ধতা, সৌন্দর্য আর কাটায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।’
দি ইম্পেরিয়াল অনেক ইউরোপীয় ক্রেতার দৃষ্টি কাড়ে। এর ক্রয়মূল্য হয়ে যায় ৩ থেকে ৮ লাখ পাউন্ড, বর্তমান বাজারে ৫ কোটি পাউন্ড। এর মাধ্যমে হীরাটি বাজারে আসা সবচেয়ে দামি রত্নপাথরে পরিণত হয়। দামের কারণে অনেক ক্রেতাই পিছিয়ে যান। তবে সবাই নয়, তাদেরই একজন আমাদের জ্যাকব। তখন ব্রিটিশরাজের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল সিমলা। জ্যাকবের বসবাস, ব্যবসা তখন এ শহরেই। সেই সুদূর ইউরোপ থেকে দি ইম্পেরিয়ালের খবর নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে এসে পৌঁছেছিল জ্যাকবের কানে। হীরার দামকে জ্যাকব সমস্যা হিসেবে না দেখে বরং সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
জ্যাকব কেন ইম্পেরিয়ালের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যকে সম্ভাবনা হিসেবে মনে করেছিলেন? কারণ জ্যাকব দেখেছেন ভারতের রাজরাজড়া একে অন্যের চেয়ে বড়, বিলাসবহুল প্রাসাদ, দামি রত্ন, বড় হারেম তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকতেন। তাই সিমলার নিজের দোকানে বসে জ্যাকব তৈরি করেন দুনিয়ার হীরা বিক্রির ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও দুঃসাহসী ঘটনার পরিকল্পনা। জ্যাকব তখন ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রধান রত্ন ও অলংকার বিক্রেতা। তখন প্রচলিত ছিল জ্যাকব নাকি আরব্য রজনীর আলাদিনের চেয়েও ধনী। এমনকি দিল্লির চাঁদনি চকের যে জহুরিরা কয়েকশ বছর ধরে মোগল দরবারের জন্য অলংকার তৈরি করেছেন, তারাও দাম, গুণমান ও ক্রেতাদের আভিজাত্যে জ্যাকবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন না।
দি ইম্পেরিয়াল হস্তগত করার পর জ্যাকব সেটি ষষ্ঠ নিজাম, আফিম আসক্ত মাহবুব আলী খানকে কিনতে রাজি করিয়েছিলেন। নিজামের কাছে জ্যাকব এ হীরাটি যে দামে বিক্রি করেছিলেন, তা ইতিহাসের একটি রেকর্ড। এ হীরা বিক্রি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মামলা চলেছিল কলকাতা হাইকোর্টে।
জ্যাকব হীরার প্রতি মাহবুব আলী খানের আসক্তির কথা জানতেন। আর মাহবুব ছিলেন জ্যাকবের নিয়মিত ক্রেতা। তাই দি ইম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডে থাকতেই তিনি সেটার একটা কাচের রেপ্লিকা তৈরি করে মাহবুবের কাছে হাজির হন। এটা ১৮৯১ সালের ঘটনা। জ্যাকবকে নিজামের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন তার গৃহাধ্যক্ষ অ্যালবার্ট আবিদ। এ আবিদ নিজেও ছিলেন জ্যাকবের মতো রত্ন ব্যবসায়ী ও ইহুদি। জ্যাকব আবিদকে ইম্পেরিয়ালের কথা জানান এবং এটা নিজামের কাছে বিক্রি করতে আবিদের সাহায্য চান। আবিদকে তিনি এর দাম বলেন ১ কোটি ২০ লাখ রুপি বা দেড় লাখ পাউন্ড। তখন পর্যন্ত ভারতে বিক্রি হওয়া সর্বোচ্চ দামের হীরাটি ছিল ৮০ লাখ পাউন্ডের। অর্থমূল্যটা আবিদকে চমকে দিয়েছিল। সে সময় এটা ছিল এক অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ। তবে এটা ছিল জ্যাকবের একটি কৌশল, তিনি এই অস্বাভাবিক দাম হেঁকে হীরাটির প্রতি নিজামের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সাধারণত মাহবুবকে কিছু বিক্রি করলে জ্যাকব আবিদকে ১০ শতাংশ কমিশন দিতেন। এবার জ্যাকব সরাসরি ৫ লাখ রুপি দেয়ার কথা দিলেন।
জ্যাকবের সম্মোহনী ক্ষমতায় আর রেপ্লিকা দেখে ইম্পেরিয়াল কিনতে রাজি হয়ে গেলেন মাহবুব। ঠিক হলো ৪৬ লাখ টাকায় নিজাম সেই হীরা জ্যাকবের কাছ থেকে কিনবেন। অর্ধেক টাকা তখনই জ্যাকবকে দিয়ে দেয়া হলো। টাকা জমা হলো ব্যাংকে, আর বাকি টাকা হীরা হাতে পাওয়ার পর। জ্যাকব তার এজেন্টের মাধ্যমে ২১ লাখ রুপি খরচ করে লন্ডন থেকে হীরাটি কিনে নেন।
জ্যাকব নিজামকে পারমর্শ দিয়েছিলেন তিনি যেন এ হীরা তার পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করেন, এতে দুনিয়ায় তার অন্য রকম ইমেজ সৃষ্টি হবে।
নিজামের অবশ্য একটি শর্ত ছিল, যাকে বলা হয় পাসান্দ ইয়া না পাসান্দ, মানে হীরাটি দেখার পর সেটা পছন্দ না হলে তিনি তা কিনবেন না। নিজাম ও জ্যাকবের মধ্যে দি ইম্পেরিয়াল কেনা নিয়ে এ সমঝোতার কথা প্রাসাদে থাকা গুপ্তচরদের মারফত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছে যায়। ব্রিটিশরা মাহবুবের বিলাসী জীবনের অপরিমিত ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, তারা চেয়েছিল তাকে এ হীরা কেনা থেকে বিরত রাখতে। নিজামের প্রধানমন্ত্রীও এ হীরা কেনার বিরুদ্ধে ছিলেন।
১৮৯১ সালের ২১ জুলাই জ্যাকব ইম্পেরিয়াল নিয়ে এলেন নিজামের কাছে। রুপার ট্রেতে সাজিয়ে লাল মখমলে ঢেকে তিনি নিজামের সামনে ইম্পেরিয়ালকে পেশ করলেন। কিন্তু এবার শুরু হলো বিরাট ঝামেলা। মাহবুব আলী খান হীরাটি হাতে নিয়ে কয়েকবার খুঁটিয়ে দেখলেন যে রেপ্লিকার চেয়ে এই মূল হীরা অনেক ছোট। তারপর বলে উঠলেন, না পাসান্দ, পছন্দ হয়নি। অর্থাৎ নিজাম দি ইম্পেরিয়াল কিনতে অস্বীকৃতি জানালেন। নিজামের কথা শুনে জ্যাকবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ডিল এক পলকে বাতিল!
এর পরের ইতিহাস বিতর্কিত ও কুয়াশাচ্ছন্ন। নিজামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জ্যাকব তার ব্যাংককে জানালেন, নিজাম হীরা কিনতে রাজি হয়েছেন, তার টাকা যেন লন্ডনে ট্রান্সফার করে দেয়া হয়। জ্যাকব পরবর্তীতে বলেছিলেন, নিজাম নিজে আবিদের মাধ্যমে তাকে জানিয়েছিলেন যে তার সেই না পাসান্দ বলাটা ছিল ব্রিটিশদের ধোঁকা দেয়ার কৌশল, আসলে তিনি হীরাটি কিনবেন। কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল নিজাম সত্যিই ইম্পেরিয়াল কিনতে রাজি নন এবং অগ্রিম দেয়া ২৩ লাখ টাকা জ্যাকবের কাছে ফেরত চাইলেন।
জ্যাকব টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং দাবি করলেন চুক্তি তো সম্পন্ন হয়ে গেছে। তিনি সেই টাকা আগেই ব্যাংক থেকে তুলে ফেলেছিলেন। জ্যাকব বরং হীরাটি কিনতে বাধ্য করতে নিজামের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিলেন কলকাতা হাইকোর্টে। জ্যাকব সে সময়ে ব্রিটিশ ভারতের সেরা উকিলদের নিয়োগ করেছিলেন। এ মামলা বহুদিন চলেছিল এবং শুধু ভারত নয়, সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোড়ন তুলেছিল। তদন্তের স্বার্থে আদালত নিজামকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান। ১৮৯১ সালের ৫ অক্টোবর তদন্ত কমিশন নিজামের প্রাসাদে গিয়ে সাক্ষাৎ করে এবং তার বয়ান নেয়। এই প্রথম কোনো ভারতীয় রাজা ব্রিটিশ আদালতের সামনে হাজিরা দিলেন এবং স্বভাবতই এটা ছিল নিজামের জন্য চরম অবমাননাকর। হায়দরাবাদে ইম্পেরিয়াল বা জ্যাকব ডায়মন্ড মানহুস বা অপয়া বলে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
১৮৯২ সালের ১১ মার্চ জ্যাকব বনাম নিজামের মামলায় বাদী ও বিবাদীর মধ্যে আদালতের বাইরে সমঝোতা হয়। মামলায় আদালত জ্যাকবকে প্রতারণার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন, কিন্তু হীরার জন্য বাকি অর্ধেক টাকা তিনি আর ফেরত পাননি। বরং সমঝোতার শর্ত হিসেবে হীরাটি তাকে মাহবুব আলী খানের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ দেয়া হয়।
হীরার দামের অর্ধেক টাকা না দিয়ে নিজাম মাহবুব জ্যাকব ডায়মন্ড পেয়ে গেলেন। কিন্তু এ হীরা নিয়ে তিনি কখনো শান্তি পাননি। মামলা শেষ হলে ক্ষুব্ধ মাহবুব আলী খান জ্যাকব ডায়মন্ডকে কলমের কালি মোছার কাপড়ে পেঁচিয়ে তা একটা পুরনো জুতার মধ্যে ভরে তার টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে দেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এ ড্রয়ার আর কখনো খুলবেন না। ১৯১১ সালে মাহবুবের পুত্র মীর ওসমান আলী খান পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ওসমানই ছিলেন হায়দরাবাদের শেষ নিজাম। তিনি ড্রয়ারে হীরাটি খুঁজে পান এবং এটাকে পেপারওয়েট হিসেবেই ব্যবহার করেন। গবেষক জন জুবরজিকি অবশ্য জুতার মধ্যে হীরা রাখার এ ঘটনাকে কিংবদন্তি কাহিনী হিসেবেই মনে করেন। তিনি তার দ্য মিস্টেরিয়াস মি. জ্যাকব: ডায়মন্ড মার্চেন্ট, ম্যাজিশিয়ান অ্যান্ড স্পাই গ্রন্থে লিখেছেন, হীরা হাতে পেয়ে মাহবুব আলী খান সেটাকে তিন বছর ব্যাংক অব বেঙ্গলে রাখেন এবং তিনি ব্যাংকে বলেছিলেন, তারা যেন হীরাটি বিক্রি করার ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু তিন বছরেও কেউ হীরাটি কেনেনি। ১৮৯৫ সালে হীরাটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা হয় এবং এখান থেকেই পরবর্তীতে মাহবুব আলী খানের পুত্র ওসমান হীরাটি নিজের হাতে নেন। জন জুবরজিকি তার বইয়ের শেষ অংশে এসে ব্যক্তিগত মত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তিনি এ হীরা বিতর্কে জ্যাকবের কথাই বিশ্বাস করেন। জন মনে করেন, সত্যি সত্যিই পরবর্তী সময়ে নিজাম মাহবুব আলী খান হীরা কিনতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু জ্যাকবের সঙ্গে তার এ চুক্তির কথা ফাঁস হয়ে গেলে তিনি সবকিছু অস্বীকার করেন।
নিজামের বিরুদ্ধে করা মামলাটি জ্যাকবের জীবনে কেয়ামত হিসেবে দেখা দেয়। উকিলের পেছনে তার সব টাকা ব্যয় হয়ে যায়। অন্যদিকে নিজামের সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটায় দেশীয় অন্য রাজারাও আর তার প্রতি সদয় ভাব দেখাননি। তার ক্রেতারা একে একে তাকে ছেড়ে যান। জ্যাকব তার সিমলার দোকানটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। শেষ জীবনটা তাকে ভবঘুরের মতো কাটাতে হয়েছিল।
জন জুবরজিকি মনে করেন, জ্যাকব কখনই অসৎ কিংবা লোভী ছিলেন না। রত্নের বেচাকেনাটা ছিল তার নেশা, তা সেটা ১০ রুপির নীলকান্তমণি হোক কিংবা দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান হীরা—এ কেনাবেচায় তিনি নিজেই সবসময় নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন। তিনি তার ক্রেতাদের ঘোল খাওয়াতে পছন্দ করতেন। এ রোমাঞ্চই জীবনের শেষবেলায় তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল।
দি ইম্পেরিয়াল বা জ্যাকব ডায়মন্ড এখন আছে মুম্বাইয়ে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সিন্দুকে। হীরাটির বর্তমান বাজারমূল্য ধরা হয় ৪০০ কোটি রুপি।
কিপলিং প্রথমবার সিমলা গিয়েছিলেন ১৮৮৩ সালের মে মাসে। গবেষকরা ধারণা করেন, এখানেই জ্যাকবের ম্যানশনে আয়োজিত কোনো পার্টিতে তার সঙ্গে কিপলিংয়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল। নিজের ওক প্যানেল করা ডাইনিং রুমে বসে জ্যাকব তার অতিথিদের প্রাচীন আরবি সাহিত্য থেকে গল্প শোনাতেন। আরবের জাদুবিদ্যা, রহস্য, আর রূপকথার জগৎ তিনি তার সামনে থাকা বিস্মিত শ্রোতাদের সামনে উন্মুক্ত করে দিতেন। অনেকে মনে করতেন ভারতের অধাত্ম্যবাদও অন্যদের চেয়ে ভালো জানতেন জ্যাকব।
জ্যাকবের বন্ধু ও ব্রিটিশ লেখক, সমালোচক ফ্রেডেরিখ হিথ স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘তিনি কেবল জহুরি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ব্যক্তিত্ব। জ্যাকব নিজে দামি রত্নের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিলেন। তার দোকানে আসতেন অনেক বিশিষ্ট অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, তারা সবসময়ই দেখতেন জ্যাকবের কাছে বলার জন্য নতুন কোনো গল্প আছেই।
বাইরের আচার-আচরণে জ্যাকব ছিলেন সন্ন্যাসীদের মতো, তিনি কখনো মদ্য পান করতেন না, ছিলেন কঠোরভাবে শাকাহারি এবং কখনো বিয়ে করেননি। তিনি কোনো অলংকার ব্যবহার করতেন না। তিনি তার টাকা-পয়সা ব্যাংকে না রেখে পুরনো বাক্সে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। সিমলার যেখানে জ্যাকবের দোকান ছিল, সেটি ছিল একটা মলের নিচের দিকে, আর তার দোকানের পাশ থেকে খাড়া সিঁড়ি নেমে গিয়েছিল নিচের দিকে আরেকটি বাজারে যাওয়ার জন্য। এ বাজার নিয়ে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, এ যেন আরব্য রজনীর কোনো বাজার।
জ্যাকব জাদুবিদ্যার চর্চা করতেন, তিনি মূল্যবান রত্নের ব্যবসায়ী ও অধ্যাত্মবাদী মানুষ। কিপলিং যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখনই জ্যাকব সিমলার বে-তাজ বাদশা। ভারতের ধনরত্ন দূর অতীত থেকেই দুনিয়ায় খ্যাত। মহাভারত, রামায়ণে পাওয়া যায় ধনরত্নের কথা। গোলকোণ্ডায় হীরার খনি আবিষ্কার হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে। তাই অনেক বছর আগে জ্যাকব যখন ভারতে রত্নের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বলা বাহুল্য তখন সেটা ছিল বেশ বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। ততদিনে অবশ্য গোলকোণ্ডার খনিতে আর হীরা নেই, কিন্তু ভারতে রত্নপাথরের কদর বা বাণিজ্য আগের মতোই সচল ছিল।
শোনা যায় হায়দরাবাদে নিজামের দরবারে নবিশি করে জ্যাকব কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে তিনি একটা হীরা কিনেছিলেন এবং সেই হীরা তিনি এক ইংরেজ সংগ্রাহকের কাছে ১০০ গুণ লাভে বিক্রি করেছিলেন। এতেই জ্যাকব আর পেছনে ফিরে তাকাননি। নিজামের দরবারে নবিশি ও কলকাতার একটি কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা জ্যাকবের এ ব্যবসায় কাজে এসেছিল।
রত্নের ব্যবসার কারণে আফগানিস্তান থেকে বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত জ্যাকবের অনেক এজেন্ট তৈরি হয়েছিল। তিনি যখন সিমলায় ব্যবসা শুরু করেন, তখন ব্রিটিশ ও জারের রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে আফগানিস্তানে রেষারেষি জমে উঠেছে। ইতিহাসে যা গ্রেট গেম নামে খ্যাত। এ সময় ব্রিটেন বহু গুপ্তচরকে তিব্বত, আফগানিস্তানে প্রেরণ করেছিল। তাদের নজরে আসে জ্যাকবের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশদের তরফ থেকে জ্যাকবকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়, তা গ্রেট গেম চলাকালে কোনো বিদেশীকে দেয়ার নজির বিরল। ব্রিটিশরা জ্যাকবকে কাবুলে তাদের বিশেষ অ্যাটাশে হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দেয়। তারা চেয়েছিল সেখানে যেন জ্যাকব তাদের ডি-ফ্যাক্টো এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। জ্যাকব তার এজেন্টদের ব্যবহার করে ব্রিটিশদের কতটা সহায়তা করতে পেরেছিল, তা অবশ্য জানা যায় না। তবে কাবুলে যাওয়ার সেই প্রস্তাব জ্যাকব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯২১ সালে জ্যাকব মারা যান। মৃত্যুর পর জ্যাকবের ঠাঁই হয়েছিল মুম্বাইয়ের ক্রিশ্চিয়ান সেমিট্রিতে। কয়েক বছর আগে কবরের জন্য নতুন জায়গা করতে গিয়ে সেমিট্রির কিছু অংশ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জ্যাকবের কবরটা সেখানেই ছিল। তাই আজ জ্যাকবের কবরের কোনো নিদর্শন আর টিকে নেই। মৃত্যুশয্যায় জ্যাকবের শেষ কথা ছিল—‘সিমলাকে আমার ভালোবাসা জানিও।’






