প্রত্যেক দিন ভোরে ভিনসেন্ট বেরিয়ে যেত এবং নতুন নতুন জায়গায় বসে একখানা করে ছবি শেষ করত। তারপর হোটেলে ফিরে সান্ধ্যভোজের পরই ঘুমিয়ে পড়ত।

কী আঁকছে, তার আঁকা ভালো হচ্ছে কি মন্দ হচ্ছে, সেদিকে ভিনসেন্টের কোনো নজর ছিল না। সে একমনে একটির পর একটি ছবি শেষ করে যাচ্ছিল।

একদিন প্রচণ্ড সূর্যতাপে বসে সে একটি শস্যক্ষেত্রের ছবি আঁকল। শেষে দ্রুত পদক্ষেপে সে বাড়ির দিকে রওনা হলো। কিছুদূরে একজন বয়স্ক ব্যক্তি ও একটি বালক যাচ্ছিল। সে শিগগিরই তাদের ধরে ফেলল। ভদ্রলোককে ভিনসেন্ট চিনত, কিন্তু তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। ভদ্রলোকের নাম রুলিন। ওর কাছে এসে সে বলল,

‘আজও ছবি এঁকে আনলেন নাকি?’

‘হ্যাঁ।’

ভিনসেন্ট ছবিটা ওকে দেখাল। খানিকটা দেখে ও বলল, ‘দেখুন মঁসিয়ে, আপনার আঁকা এ শস্যক্ষেত্রটা আমাদের পাশের শস্যক্ষেত্রের মতোই জীবন্ত মনে হচ্ছে।’

‘তাহলে এটা আপনার পছন্দ হয়েছে।’

‘তা বলতে পারি না, তবে ওটা দেখে আমি হূদয়ে একটা কিছু অনুভব করি।’

 

থিও আগের মতো টাকা ও রঙ পাঠিয়ে চলেছিল, কিন্তু ভিনসেন্ট ছবি আঁকার জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করায় টাকা-পয়সা অসময়ে ফুরিয়ে গিয়েছিল।

সোমবারে থিও প্রেরিত অর্থ পেয়ে সে এমন একটা জায়গা খুঁজে বের করল, যেখানে এক ফ্রাংক দিলে ভালো খাবার পাওয়া যায়। রেস্তোরাঁটা ছিল অদ্ভুত ধরনের।

মাসের প্রথম দিকে হোটেলের মালিক যে কেবল ঘরের ভাড়া তা নয়, তার আঁকা ছবিগুলো বারান্দায় রাখার জন্যও ভাড়া দাবি করল। মালিকের এই অসৎ ব্যবহারে সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো, কিন্তু পয়সা কম, অন্যত্র যাওয়া সম্ভব নয়। এদিকে শীতও এসে পড়েছে। তাকে একটা স্থায়ী আবাসন ও স্টুডিও এর মধ্যে খুঁজে বের করতেই হবে।

 

ভিনসেন্ট যে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছিল তার রঙ ছিল হলদে। সে যেন এই হলদে বাড়িটার প্রেমে পড়ে গেল। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যত কম সম্ভব খরচ করে টাকা বাঁচিয়ে তা দিয়ে ঘর দুুটো সাজাতে লাগল।

গগ্যাঁকে নিয়ে আসা যত সোজা ভেবেছিল, কার্যত তত সোজা ছিল না। থিও অবশ্য গগ্যাঁর ছবির বিনিময়ে মাসে ৫০ ফ্রাংক করে ভাতা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে যে আসবে তেমন ট্রেন ভাড়াও তার ছিল না। এ বিষয়ে তাদের তিনজনের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান চলতে লাগল।

ভিনসেন্ট নতুন উদ্যমে কাজ আরম্ভ করল। একদিন প্রাতে সে ইজেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল এবং একটি পাহাড়ের পাদদেশে এসে তার ইজেল স্থাপন করল। তারপর অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে চারদিকের দৃশ্য দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর প্যালেটে রঙ গুলে তুলিতে রঙ লাগিয়ে ছবি আঁকার জন্য প্রস্তুত হলো।

‘এত তাড়াতাড়ি কাজ আরম্ভ করবে ভিনসেন্ট? ’ পেছন থেকে কে যেন বলল।

ভিনসেন্ট ঝটিতে পেছনে ফিরল। ‘এত তাড়াতাড়ি কেন, সারা দিন তো পড়েই রয়েছে।’

অসামান্য এক সুন্দরী ভিনসেন্টকে নজর দিয়ে দেখছিল।

‘কে তুমি? কী নাম তোমার?’

‘আমি মায়া, তোমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু।’

‘তুমি আমার নাম জানলে কী করে? আমি কি তোমাকে আগে দেখেছি?’

‘না, কিন্তু আমি তোমাকে বহুবার দেখেছি।’

‘তুমি বোধহয় ভুল করেছ।’

‘জগতে কেবল একজন ভিনসেন্ট ভ্যান গগই থাকতে পারে। আমার কোনো ভুল হয়নি।’

ভিনসেন্ট জানতে পারল যে, আট বছর আগে সে যখন বোরিনেজে ছিল, তখনই সে তাকে প্রথম দেখে এবং তার প্রেমে পড়ে যায়। এর পর থেকে মায়া তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছে।

ভিনসেন্ট বলল, ‘দেখো, আমি আজ অসুস্থ, আমার মাড়িতে ঘা হয়েছে। দাঁত বাঁধানো। চুলগুলো রোদে পুড়ে গেছে। সিফিলিস রোগীর মতো আমার চোখ দুটো লাল। মুখের হাড় বেরিয়ে পড়েছে। আমি অত্যন্ত কুিসত। আমার স্নায়ু শিথিল হয়ে পড়েছে, সৃজন করায় ক্ষমতাহীন আমি। আমার সারা দেহে বিষ। তুমি কেমন করে এমন একটি মানুষকে ভালোবাসবে?’

‘তুমি কুিসত নও ভিনসেন্ট। তুমি সুন্দর। তোমার দেহের ওপর তুমি নিপীড়ন ও অত্যাচার চালিয়েছ, কিন্তু আত্মার কোনো অনিষ্ট করতে পারোনি।’

‘তুমি কি অনেক দিন থেকে আর্লসে আছ?’

‘না, আমি তোমার সঙ্গে প্যারিস থেকে এসেছি।’

ভিনসেন্ট লাফ দিয়ে উঠে পড়ল।

‘তুমি প্রতারক, তুমি আমাকে উপহাস করতে এসেছ। কেউ আমার অতীত তোমাকে বলেছে, তাই শুনিয়ে তুমি আমাকে বোকা বানাতে এসেছ। যাও... চলে যাও। আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।’

‘আমি প্রতারক নই প্রিয়তম। আমি তোমার জীবনের একমাত্র সত্য বস্তু। তুমি আমার প্রেমকে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না।’

‘মিথ্যা কথা। তুমি আমাকে ভালোবাস না। আমার সঙ্গে তুমি খেলতে এসেছ।’

মায়া গভীরভাবে ভিনসেন্টকে চুম্বন করল। ‘এবার বিশ্বাস হয়েছে?’

‘মেয়েরা আমাকে কোনো দিন ভালোবাসেনি।’

         ‘প্রেম করাই তোমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তোমার অন্য কাজও আছে।’ ‘কাজ? ছবি আঁকা? ও কেউ চায় না। কেউ আমাকে একবারও বলে না প্রশংসার বাণী।’

‘একদিন সারা বিশ্ব বলবে ভিনসেন্ট।’

ভিনসেন্ট শুয়ে শুয়ে বলে চলল নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা, প্রেম ও পীড়নের কথা। বলতে বলতে উত্তেজনা ও অবসাদে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

 

তারপর বসন্তকাল এল। গাছে গাছে পুষ্পসম্ভার ঝলমল করতে লাগল। সবুজ শোভায় চারদিক শোভিত হলো। ভিনসেন্ট আবার ইজেল কাঁধে নিয়ে গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়ল। গগ্যাঁর ঘরের ছয়টি দেয়ালে সূর্যমুখীর ছয়টি ছবি রাখতে হবে। নানা স্থান থেকে সে ছবি আঁকতে লাগল। এরই ফাঁকে নিজের ঘরটাকে আবার হলদে রঙ করে নিল। এসব করতে করতে গ্রীষ্মকাল এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে এল সেই মারাত্মক হাওয়া।

এবং তার সঙ্গে এল পল গগ্যাঁ।

তখনো ভিনসেন্টের ঘুম ভাঙেনি। পল এসে তার ঘুম ভাঙাল, তাকে দেখে ভিনসেন্ট আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে উঠল। সে তাকে নিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দিল। তার জিনিসপত্র খুলতে সাহায্য করল এবং প্যারিসের সংবাদ জানতে চাইল। কয়েক ঘণ্টা ধরে তারা গভীর আবেগের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

‘আজ তুমি কাজ করবে, গগ্যাঁ?’

‘আমি কি একটা দানব যে, সারা রাত জেগে এসে এক্ষুনি রঙতুলি নিয়ে বসে ছবি আঁকতে আরম্ভ করতে পারব?’

‘আমি জানতে চাইছিলাম।’

‘তাহলে বোকার মতো প্রশ্ন করো না।’

‘তবে আমারও ছুটি। চলো, শহর দেখে আসি।’

কিছুক্ষণ ঘুরে বাড়ি চলে এল খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে।

‘তুমি তো ভালো রান্না করতে পারো, তাই না গগ্যাঁ?

‘চমত্কার রান্না জানি। নাবিক ছিলাম কিনা।’

‘বেশ, ভবিষ্যতে তুমিই হবে রাঁধুনি। তবে তোমার সম্মানার্থে আজ রাতের রান্না আমিই করছি।’

সে রাতের স্যুপ কিন্তু গগ্যাঁ খেতে পারল না।

‘কি যে রেঁধেছ ভিনসেন্ট, অখাদ্য, ঠিক তোমার প্যালেটের মতো।’

‘কেন? আমার ছবির রঙের কী হয়েছে?’

‘তোমার ছবির সঙ্গে তোমার প্রকৃতির কোনো যোগ নেই। তুমি এ পদ্ধতি ছেড়ে দাও।’

ভিনসেন্ট তার স্যুপের বাটি সরিয়ে রাখল।

‘একবার দেখেই সমালোচনা করো না।’

‘তুমি তো অন্ধ নও, বেশ তুমিই দেখো। ওই হলদে রঙটা ভয়ানকভাবে খাপছাড়া হয়েছে।’

ভিনসেন্ট সূর্যমুখী ফুল আঁকা ছবিগুলোর দিকে তাকাল।

‘কেবল ওই কি ত্রুটি?’

‘না। সমালোচনা করার অনেক কিছু রয়েছে।’

‘যেমন।’

‘যেমন সামঞ্জস্য। তাছাড়া ওগুলো একঘেয়ে আর অসম্পূর্ণ।’

‘মিথ্যা কথা;

‘আরে উত্তেজিত হয়ো না, ভিনসেন্ট। আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়, অভিজ্ঞ, আমার কথা শোনো।’

‘দুঃখিত পল। আমাকে তুমি সাহায্য করবে তা-ই আমি চাই।’

‘তাহলে আমার কথা শোনো। মন থেকে সব জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে ফেলো। তুমি অযথাই মেসিওনিয়ার ও মন্টিসেলিকে অনুকরণ করে চলেছ। ওরা অপদার্থ। ওদের প্রশংসা করলে ভালো ছবি তুমি কোনো দিন আঁকতে পারবে না।’

‘মন্টিসেলি তো একজন প্রসিদ্ধ শিল্পী ছিলেন। রঙ সম্পর্কে তার জ্ঞান অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

‘ও একটা বোকা মাতাল।’

ক্রুদ্ধভাবে ভিনসেন্ট উঠে দাঁড়াল।

‘সাবধান ও কথা বলো না। ওকে আমি ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। আবার যদি বলো...’

ভিনসেন্ট শেষ করতে পারল না। উঠে গিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।

 

পরের দিন দুজনেই ঝগড়ার কথা ভুলে একসঙ্গে বসে কফি খেল, স্ব স্ব নির্বাচিত স্থানে ছবি আঁকার জন্য চলে গেল। রাতে পরিশ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে ভিনসেন্ট দেখতে পেল গগ্যাঁ এরই মধ্যে সান্ধ্যভোজ প্রস্তুত করছে। সে মৃদুকণ্ঠেই কথা বলতে আরম্ভ করল, কিন্তু কথা প্রসঙ্গে এসে পড়ল চিত্রশিল্প ও শিল্পীদের কথা। তার পরই ঝগড়া আরম্ভ হয়ে গেল।

‘ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে আমি ছবি আঁকতে চাই না। চাই না বলেই আমি আর্লসে এসেছি।’

‘যেসব ছবি তুমি এঁকেছ, তা প্রকৃতিরই প্রতিলিপি। নিজের মন থেকে তোমাকে ছবি আঁকা শিখতে হবে।’

‘নিজের মন থেকে ছবি আঁকা! হা ভগবান!’

‘আর একটা কথা, স্যুরাট বলেছে পেইন্টিং হচ্ছে ভাবাত্মক, তা তুমি মনে রেখো। সেখানে তোমার ওই গল্প বলার বা উপদেশ দেয়ার কোনো স্থান নেই।’

‘কী বলছ সব পাগলের মতো!’

‘উপদেশ যদি দিতেই চাও, তবে তুমি আবার ধর্মযাজক হও গিয়ে। চিত্রাঙ্কন হচ্ছে রঙ, রেখা আর রূপ নিয়ে। সেখানে অন্য কিছু নেই। শিল্পী প্রকৃতিতে কেবল অলঙ্কার পরাতে পারে, ব্যস, আর কিছু নয়।’

‘মণ্ডন শিল্প’ ভিনসেন্ট গর্জে উঠল। ‘প্রকৃতি থেকে যদি তুমি এই মাত্র পাও, তবে তুমি আমার স্টক এক্সচেঞ্জে ফিরে যাও।’

‘তা তুমি কী আবিষ্কার করো শুনি?’

‘আমি পাই গতি, পাই জীবনের ছন্দ।’

‘তাহলে আমাদের দূরত্ব অনেক।’

‘আমি যখন সূর্য আঁকি, তখন মানুষকে আমি অনুভব করাতে চাই তার তীব্র গতি। যখন শস্যক্ষেত্রের ছবি আঁকি, তখন চাই যে মানুষ উপলব্ধি করুক শস্যকণিকার মধ্যে সুপ্ত রয়েছে যে প্রাণশক্তি তাকে।’

‘ভিনসেন্ট তোমাকে তো আমি কতবার বলেছি যে, চিত্রশিল্পীর কোনো মতবাদ থাকা উচিত নয়।’

‘ওই যে অদূরের দৃশ্যাঙ্কনটির কথাই ধরো না কেন, গগ্যাঁ। চেয়ে দেখো, মনে হবে ওগুলো যেন তোমার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। আমি যখন মানুষের পোর্ট্রেট আঁকি, আমি দেখাতে চাই তার জীবনের গতিকে— সুখ-দুঃখের ছন্দকে।’

‘কী বলতে চাও তুমি?’

‘শুনবে গগ্যাঁ, শোনো তবে। ক্ষেত্রের শস্য, গিরি-নদীর জল, আঙ্গুরের রস এবং মানুষের জীবন— সবকিছু এক ও অভিন্ন। জীবনের একমাত্র ঐক্য হচ্ছে ছন্দের ঐক্য। যে ছন্দে আমরা— মানুষ, গিরিপথ, কর্ষিত ক্ষেত্র, গৃহ, ঘোড়া আর সূর্য— সবাই নৃত্য করি। তোমার মধ্যে যা আছে, তা ওই আঙ্গুরেও বর্তমান— কারণ তোমরা অভিন্ন। যে জাগতিক ছন্দের ফলে আমরা সবাই চলি, সেই ছন্দকে যখন তুমি অনুভব করো, তখন কেবল তুমি জীবনকে বুঝতে পারো। তা-ই একমাত্র ভগবান!’ কথা বলতে বলতে ভিনসেন্ট উত্তেজনায় কাঁপছিল। ক্ষণপরে দুজনে মদ্যপান করার জন্য বেরিয়ে পড়ল এবং র্যাচেলদের ওখানে গিয়ে উপস্থিত হলো।

এমনিভাবে তাদের দিন কাটতে লাগল— কখনো বিবাদ করে, কখনো ভাব করে। এর মধ্যে গ্রীষ্মকাল এসে পড়ল। বনভূমি পত্র-পুষ্পে শোভিত হয়ে উঠল। দুজনেই একান্তভাবে ছবি আঁকতে লাগল। মিস্ট্রলের ফলে বাইরে বসে ছবি আঁকার ব্যাঘাত হতে লাগল। সুতরাং ঘরেই তাদের বসে থাকতে হতো। সেই সময় মাঝে মাঝে গগ্যাঁ ভিনসেন্টকে রাগাত। ক্রমে মিস্ট্রল কমে এল। সবাই আবার বাইরে বেরুতে লাগল। গগ্যাঁ ও ভিনসেন্টও আবার ছবি আঁকার জন্য বাইরে বেরুতে লাগল।

সারা দিন ছবি এঁকে, সারা রাত ঝগড়া করে, না খেয়ে ওদের মেজাজ ক্রমেই চড়তি হতে লাগল। গগ্যাঁ ভিনসেন্টের একটা পোর্ট্রেট আঁকল, আর ভিনসেন্ট আঁকল লাঙলের ছবি। ভিনসেন্ট ভালো করে পোর্ট্রেটটি দেখল। গগ্যাঁ তাকে কী চোখে দেখে, সে যেন তা বুঝতে পারল। ‘নিশ্চয় এটা আমার প্রতিকৃতি’, সে বলল, ‘কিন্তু এটা পাগল আমির ছবি!’

সেদিন সন্ধ্যায় দুজনে মিলে ক্যাফেতে গেল। ভিনসেন্ট মদ দেয়ার জন্য আদেশ করল। ভিনসেন্ট অকস্মাৎ মদসুদ্ধ গ্লাসটা গগ্যাঁর কপাল বরাবর ছুড়ে মারল। গগ্যাঁ মাথা সরিয়ে নেয়ায় আঘাত থেকে বেঁচে গেল। সে ঝটিতে উঠে পড়ে ভিনসেন্টকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল।

ভিনসেন্ট ঘুমিয়ে পড়ল।

পরের দিন প্রাতে ভিনসেন্ট শান্তভাবে বলল, ‘গতকাল রাতে তোমাকে অপমান করেছিলাম বলে আমার যেন কেমন মনে পড়ছে।’

‘আমি খুশি মনে ও সর্বান্তকরণে তোমাকে ক্ষমা করেছি ভিনসেন্ট’— গগ্যাঁ বলল, ‘কিন্তু গতকালের ব্যাপার তো আবারো ঘটতে পারে। আমাকে আঘাত করলে আমিও হয়তো জ্ঞান হারিয়ে প্রত্যাঘাত করতে পারি। সুতরাং তোমার ভাইকে চিঠি লিখেছি যে, আমি এখান থেকে চলে যাব।’

‘না না পল, তা হবে না। তোমার জন্য আমি এই হলদে বাড়ি তৈরি করলাম আর তা তুমি ছেড়ে চলে যাবে। সে হতে পারে না।’

সারা দিন ধরে তুমুল তর্ক চলল। গগ্যাঁকে ধরে রাখার জন্য ভিনসেন্ট বহু যুক্তি দেখাল। গগ্যাঁ তা খণ্ডন করতে লাগল। ভিনসেন্ট অনুরোধ করল, নানা মিষ্ট কথা বলল, অভিসম্পাত দিল, ভয় দেখাল, এমনকি অশ্রু বিসর্জন করল। রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাধা দেয়ার শক্তিও যেন গগ্যাঁর হ্রাস পেল। প্রত্যেকটি ঘর যেন উত্তেজনায় পূর্ণ হয়ে ছিল। গগ্যাঁ ঘুমাতে পারল না। ভোরের দিকে তার কেমন তন্দ্রা এল। অকস্মাৎ একটা অস্বাভাবিক অনুভূতিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। ভিনসেন্ট অন্ধকারে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

‘ব্যাপার কী?’ কঠিন স্বরে সে জিজ্ঞাসা করল।

ভিনসেন্ট সেখান থেকে চলে গেল। পরের দিনও তেমনিভাবে গগ্যাঁর ঘুম ভেঙে গেল। দ্বিপ্রাহরিক আহারের সময় উভয়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে গেল। পরে অবশ্য কয়েক দিন ভিনসেন্ট শান্ত হয়ে রইল। এর মধ্যে একদিন গগ্যাঁকে নিয়ে পার্কে গেল। পরে গগ্যাঁ তাকে নিয়ে র্যাচেলের ওখানে গেল। গগ্যাঁ সেই বারবনিতা গৃহের একটি মেয়েকে নিয়ে উপরে চলে গেল। ঘরে ঢুকে ভিনসেন্টকে তার সঙ্গে যাওয়ার আহ্বান জানাল।

‘তবে তোমার কানটা আমাকে দাও।’

‘বেশ দেব।’

কতক্ষণ পরে গগ্যাঁ নেমে এল। দুজনে হলদে বাড়িতে ফিরে এল। গগ্যাঁ রাতের খাওয়া শেষ করে পথে নেমে পড়ল। কিছুক্ষণ পরেই সে শুনতে পেল অতি পরিচিত পদশব্দ— হ্রস্ব, দ্রুত, অস্বাভাবিক। গগ্যাঁ ঘুরে দাঁড়াল, দেখল ভিনসেন্ট একটা খোলা ক্ষুর নিয়ে এগিয়ে আসছে। গগ্যাঁ সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল।

গগ্যাঁ একটা হোটেলে ঘর ভাড়া করে দরজায় খিল এঁটে ঘুমিয়ে পড়ল।

ভিনসেন্ট বাড়ি ফিরে ক্ষুর দিয়ে ডান কানটা কেটে ফেলল। তারপর ক্ষুরটা ফেলে দিয়ে তোয়ালে দিয়ে কাটা জায়গাটা বাঁধল। মাটি থেকে কানটা তুলে ধুয়ে নিয়ে সেটা কাগজ দিয়ে মুড়ে র্যাচেলের ওখানে গিয়ে হাজির হলো।

‘তোমার জন্য উপহার এনেছি র্যাচেল।’

‘চমত্কার! কী এনেছ, দেখি।’

‘এই নাও।’

প্যাকটা খুলেই র্যাচেল ভয়ে চিত্কার করে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। সেখান থেকে বেরিয়ে ভিনসেন্ট বাড়ি ফিরে এল। তারপর ঘরের দোর বন্ধ করে দিল।

পরের দিন প্রাতে গগ্যাঁ যখন হলদে বাড়ির দোরগোড়ায় এল, দেখে সেখানে ছোটখাটো একটা ভিড় হয়েছে। রুলিন হতাশায় হাত-পা নাড়ছে।

‘বন্ধুকে কী করেছেন মঁসিয়ে?’ কঠিন স্বরে একজন বন্ধু বলল।

‘জানি না।’

‘জানি না... নিশ্চয় জানেন... ও মারা গেছে।’

যারা সেখানে সমবেত হয়েছিল, তাদের দৃষ্টিবাণে গগ্যাঁ অসোয়াস্তি অনুভব করতে লাগল।

‘চলুন, উপরে যাই। সেখানে সব বুঝিয়ে বলব।’ গগ্যাঁ বলল।

ঘরে ঢুকে গগ্যাঁ ধীরে ধীরে ভিনসেন্টের নিশ্চল দেহে হাত রাখল, উষ্ণতা অনুভব করল দেহের। সঙ্গে সঙ্গে তার দেহেও এল যেন একটা নতুন উদ্দীপনার স্রোত।

‘দয়া করে একে বাঁচিয়ে তুলুন মঁসিয়ে,’ নিম্নকণ্ঠে সে পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে বলল, ‘ও যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে, বলবেন প্যারিস চলে গেছি। আমাকে দেখলে ওর অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে।’

পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ডাক্তার ও একটা গাড়ি ডাকতে পাঠালেন। তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে চললেন। রুলিন হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে চলল।

আর্লসের হাসপাতালের ডাক্তার ফেলিক্স রে ভিনসেন্টের ক্ষতের চিকিৎসা শুরু করলেন।

বিকালের দিকে ডাক্তার যখন ভিনসেন্টের নাড়ি দেখছিলেন, তখন তার ঘুম ভেঙে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে পরে ডাক্তারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। কতক্ষণ পরে জানতে চাইল, সে কোথায় আছে।

‘হাসপাতালে’— ডাক্তার বললেন, ‘কানের ক্ষত চিকিৎসার জন্য আপনাকে এখানে আনা হয়েছে।’

‘হুঁ, মনে পড়েছে। আমার বন্ধু কোথায়?’

‘সে প্যারিস চলে গেছে।’

‘ওহ্।’

তিন সপ্তাহ পরে সে আবার সুস্থবোধ করল। কিন্তু এখন আর তার পক্ষে শহরে বেরুনো সম্ভবপর নয়। কোনো রেস্তোরাঁয় তাকে ঢুকতে দেয়া হয় না। ছোট ছেলেরা দেখলে পেছনে ছুটে টিটকারি দিতে থাকে। তারা চিত্কার করে বলে, ‘তোমার আরেকটা কান আমাদের দিয়ে দাও।’

একদিন তাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে ভিনসেন্ট অসহ্য ক্রোধে ঘর থেকে ইজেল চেয়ার, টেবিল, ছবি, আয়না প্রভৃতি ছুড়ে মারতে লাগল। তারপর উত্তেজিত অবস্থায় জানালার ধারে আসতেই জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে গেল।

ডাক্তার আগেই থিওকে সব অবস্থা লিখেছিলেন এবং টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সে টাকা পাঠিয়ে দিল। টাকা পেয়ে ডাক্তার ভিনসেন্টকে নিয়ে সেন্ট রেমির বাতুলাশ্রমের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

[আরভিং স্টোনের লাস্ট ফর লাইফ-এর অনুবাদ জীবন তৃষা’র আর্ল পর্বের সংক্ষিপ্ত অংশ]