দুইখানা বিছানা জুড়ে দিয়ে রচিত বর্গক্ষেত্র, তার চারদিকে চারখানা খুঁটি, মশারির একটির ভেতরে বাপ-মা, আরেকটিতে ভাই আর আমি। এইখানে অন্ধকারে আমি ঘুমোবার আগে গাইতাম ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল শান্ত অচঞ্চল ধ্রুবজ্যোতি’ আর ‘মুভি অব দ্য উইকে’ দেখা সিনেমা নিয়ে এন্তার মাথা ঘামাতাম। এই শোবার ঘরের দরজার ওপরে ছিল বক্স-রুম, সেখানে অপ্রয়োজনীয় তাবত জিনিস ডাঁই করে রাখা, তার ভেতরে আমার কাপড়ের পুতুল এবং তার পুতুলের সংসার রাখার স্যামসোনাইটের মেকআপ বক্সও ছিল। এই মেকআপবক্স তখন কনেদের ধরিয়ে দেয়া হতো, বিয়ের কয়েক দিন পরে এর ব্যবহার রদ হয়ে যেত এবং এটি ভরে উঠত এমন সব মনোহারি বাতিল সামগ্রীতে, যার মূল্য কল্পনাপ্রবণ মেয়েশিশুরা ছাড়া কেউ টের পেত না। যা-ই হোক, পুতুল আমাকে খেলতে দেয়া হয়নি, স্তন্যপানরত শিশুর কাছ থেকে স্তন ছাড়িয়ে নেবার চেয়েও নিষ্ঠুরতায় পুতুল ছাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল আমাকে— কী না, মেয়েশিশুকে পুতুল খেলতে দিলে সে সংসার ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাববে না। আমাদের বাকি খেলনা তালাবদ্ধ থাকত কাচের শোকেসে। সেই তালাবদ্ধ খেলনার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমাদের শৈশব পার হয়ে যাচ্ছিল, অনুনয় করলেও মা খুলত না। মসজিদের হুজুর এসে মৌলুদশরিফ পড়াবার সময় এই শোকেস তার নির্দেশে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেয়া হতো যেন বুতপূজার মনোভাব না আসে। যেমন আমাদের বাপ-মা, তেমন আমাদের সমাজ শাসক ও নির্দেশক। শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশে খেলার উপকারিতা নিয়ে এখন আমি ঢের লিখতে পারি কিন্তু লাভ কী?
আমার বইয়ের পাঁজা বন্ধ করে দিয়েছিল উত্তরের দেয়ালের ঘুলঘুলিগুলি। জানালায় রুচিহীন লাল-নীল-সাদা ডোরার পর্দা; যে লালখানা সুরকির, যে নীলখানা ইনডিগোর আর যে সাদাখানা প্রায় ক্রিমরঙা। লোকে বলত, ‘এসপি বাড়ি’, পুলিশ-দারোগা এদের বাড়িতে সচরাচর চুরি-ডাকাতি হতো না, তাই ভাড়া নিলে একদিক থেকে বেশ ঝক্কিহীন থাকা যেত, মা খুঁজে বের করেছিল সেই বাড়িটা। পশ্চিমে বিশাল বারান্দা— সেই বারান্দায় আমি দেখেছি গোলাপি লেন্টিকুলার মেঘ— মাদার অব পার্ল মেঘ আর গরমকালের সূর্য অস্ত যাওয়া, শুনেছি রেডিওতে বাজছে খুশিয়ালি সুরে কাজী আনোয়ার হোসেন আর আব্দুল আলীমের— ‘বেলা বয়ে যায়/ মধুমতী গাঁয়/ ওরে মন ছুটে চল চেনা ঠিকানায়’ কিংবা ‘পুওরম্যানস রফি’ খুরশিদ আলমের গলায় সিনেমার গান, কতবার শীতের ঝরা ধান আর শামুক খেয়ে তেলতেলে হওয়া হাঁসকে সেই বারান্দায় পালক ছাড়ানো হচ্ছে বলে কেঁদেছি, কত ভোর রাতে দেখেছি আকাশে নিস্তেজ চাঁদ আর দূরের মসজিদে হামদ গাইছে কেউ— ‘জগতে আল্লা ছাড়া কী আছে আর।’ বারান্দার কাছে একটা পোকাধরা কপিলা গাছ আর একটা বিলাতি গাব গাছ, উত্তর-পূর্বদিকে ছিল একটা অতিকায় নারকেল গাছ, যে গাছের পাতা দিয়ে সকালবেলা বেয়ে আসত পূবদিকের রোদ। এই বারান্দায় বাপ কাঁচাবাজার থেকে ঘাড়ে করে এনে আছড়ে ফেলত এক বোঝা আখ কিংবা এক কাঁদি ডাব অথবা তালশাঁস। গ্রীষ্মকালে আমাদের সেই বর্গাকার খাটের তলায় নীলচে ছায়ায় পাটের ছালার ওপর সারিবদ্ধ থাকত রাশি রাশি আম। নুন আর কাঁচামরিচ (সাথে কখনো কাসুন্দি) মিশিয়ে কালোজাম ঝাঁকানো হতো স্টিলের বাটিতে স্টিলের ঢাকনা দিয়ে, শব্দ হতো টিনের চালে ঝুপঝুপ শিলাবৃষ্টি পড়ার মতন। জাম ভর্তার রঙ গাঢ় বেগুনি। আমরা জাম খেয়ে খেয়ে বারান্দার বাইরে তাক করে থুঃ করতাম, পরখ করে দেখতাম কার জিভ কত বেশি বেগুনি। কানে পানি যেত আমার খুব, কানে পানি গেলে খালাদের কেউ তোয়ালে দিয়ে আমার মাথা মুড়ে ঝাঁকাত আর বলত, ‘দে জাম ঝাঁকাই।’ ঝাঁকুনি দিলেই তখন ফর্ম ভেঙে যেত, রঙ ছিটকে পড়ত এবং স্বাদ মিলমিশ হতো।
বারান্দা পেরিয়ে অদূরে অজস্র টিনের ঘরের ছাদে জ্বলজ্বল করত রোদ, কোনো একটা বাড়ির ছাদ ছিল ঢালাই, সেখানে বৃষ্টির পানি জমত বলে সুইচোর পাখি আসত, আসত তেলকাজলি, আসত খঞ্জনা। প্রচুর ভাতশালিকের বাসা ছিল কপিলা গাছে। কখনো পথ ভুলে কোথা থেকে এসে যেত শঙ্খশুভ্র পেঁচা, তাকে দাঁড়কাকের দল যেমন হেনস্তা করত, তা দেখলে বাংলা ভাষার যুযুধান কবিরা লজ্জা পাবেন। হেমন্তে ছাদগুলিতে শুকাতে দেয়া হতো লাল শালুতে শিমুল তুলা পুরে বানানো লেপ আর তার মার্কিন কাপড়ের ওয়াড়, ধুনকার নামত পথে পথে। সন্ধ্যায় কেউ কেউ ছাদে উঠে আড়বাঁশি বাজাত, ‘যারে ছেড়ে এলাআআআআআম কবরে সে কি আআআআআআবার আসবে ফিরে।’ শীতকালের বিধুর সন্ধ্যায় সেই টিনের ছাদগুলির ওপর দিয়ে উড়ত একরেখ লিকলিকে ধোঁয়া। বাড়িগুলির নাম ছিল বিচিত্র, তালগাছওয়ালা বাড়ি, ছাগলওয়ালা বাড়ি, বৌ-পিটাইন্যা বাড়ি, মাছের ভেড়িওয়ালা বাড়ি, ইমাম-বাড়ি, জাহাজমার্কা বাড়ি। অথচ খুঁজে দেখলে বাড়িগুলির নাম ‘কবিতা’, ‘কাকলি’, ‘কত কথা’ ইত্যাদি। আমাদের প্রধানতম পড়শি ছিল রাস্তার ঢালে দুইখানা করাতকল। করাতকলে আসা মৃত গাছের বিশাল কাণ্ড দেখে বাপ আর আমি হা-হুতাশ করতাম, কখনো পুঁটুলি করে আনতাম কাঠ চেরাইয়ের গুঁড়ো। সেই গুঁড়ো জ্বাল দেয়া শিরিষের আঠায় মিশিয়ে যে ক্বাথ হতো, তাই দিয়ে খেলাঘরের পেছনের পাহাড় বানানো যেত। শুকিয়ে গেলে সেই পাহাড়ে রঙ করে বানাতাম ঝরনা আর বনবীথি। অন্য পড়শিদের ভেতরে ছিল কচুরিপানা ফোটা এঁদো পুকুর, যাতে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকত— ‘বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক মিসেস অমুক।’ আর আমরা ইস্কুলের দিকে হেঁটে যাবার সময় হাসাহাসি করতাম যে স্ত্রীর বায়নার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে স্বামী অবশেষে এই ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘যাও যাও এইটা তোমার।’ অন্য পড়শিদের পরিচয় তাদের বাড়ির নামেই প্রকাশ, আর ছিল ‘বাপে খেদানো’ কর্নেল একজন। হেডমাস্টার কেউ কেউ। আমাদের এদের কারো সাথেই জলচল ছিল না, মায়ের অত উদ্বৃত্ত সময় ছিল না, ফলে আমাদের নাগরিক দারিদ্র্য আমাদের সাদা চোখে অদৃশ্য ছিল।
আমাদের বাড়িটাকে হাসিখুশি বাড়ি বললে খুব ভুল বলা হবে, আমার মা সে বাড়িতে প্রায়ই স্বগত আবৃত্তি করত, ‘মজিদ হইতে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর/ মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কতদূর।’ আমার দাদুমণি সে বাড়িতে ভাঙা রেডিও আঁকড়ে চিনচিনে গলায় গান গাইত, ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়/ দুখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়।’ খালি মেজ ফুপ্পি মনের সুখে বুকে বালিশ আঁকড়ে ‘কড়ি ও কোমল’ খুলে উপুড় হয়ে ফুপ্পাকে মিডল ইস্টে চিঠি লিখে পাঠাত— ‘অধরের কানে যেন অধরের ভাষা।’ আমাদের চেয়ে মেজ ফুপ্পিদের বাড়ির দশা তখন খারাপ ছিল, মানে অগোছালো, মানে কালো ট্রাংকবোঝাই, মানে মেঝেয় বড় বড় গর্ত। মেজ ফুপুর বাড়িতে গেলেই বরাদ্দ ছিল নরম একটু ঘেঁটে যাওয়া পোলাও, মাংসের চর্বিতে রাঁধা মাংস, যার রঙ কালচে আর দেশী মুরগির ডিমের কোর্মা। ছোট ফুপ্পি ওদের বাড়ি ফিরে এসে গল্প করত তরমুজের সাদাটুকু দিয়ে চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি খাওয়ার কথা— দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে কাঁঠালের ক্বাথে ফেলে খই আর মুড়ি খাওয়ার কথা— কাঁটাওয়ালা বাজনা গাছের চমত্কার তেলের কথা। কিন্তু আমরা গেলে সেইসব হতো না, অতিথি সত্কারের কিছু বাঁধা নিয়ম ছিল সেইসব বাড়িতে— ঘুরেফিরে সেই সবই পালিত হতো। ফুপ্পিদের বাড়িটার পেছনের দিকে অগোছালো মানিকদীতে তখনো ঘর ওঠেনি, ভিটেমাটি থেকে ঢাল নেমে গেছে চষা জমিতে আর তার ওপর সুজনি মেলে রেখেছে ঝিরিঝিরি সজিনা গাছের ছায়া। ঘুঘু ডাকত সেই বাড়িতে, মুরগি চরত। উদাসী বেলায় সেই বাড়ির পাছে আঙুল চালিয়ে চুল শুকাতে শুকাতে ছোট ফুপ্পিরা ধানক্ষেত পানিতে সয়লাব হয়ে গেলে ট্যাটা দিয়ে মেরে কুইচ্চ্যা খাওয়ার গল্প করত, মৃগী রোগীর কোমরে শেয়ালের দাঁত ঝুলিয়ে দেয়ার গল্প করত, গাঁয়ে নির্বোধ বৈদ্যরা জলাতঙ্ক রোগীকে রোগের উপশমে জলাতঙ্কগ্রস্ত কুকুরের যকৃত খেতে দিচ্ছে, সেইসব গল্পও করত। এইসব গল্পের আশপাশে লোলুপ আমি ঘুরে বেড়াতাম। ফুপ্পির আগের বাড়ি যেখানে ছিল, সেইসব নিচু নিচু হলদে রঙা কোয়ার্টারভরা জায়গার নাম ছিল ‘বালুরঘাট’, কী সুন্দর নাম। আধা-শহর এলাকাগুলিতে তখনো অতুল মাধুরী, তবে মনেপ্রাণে শহর হয়ে ওঠা মহল্লাগুলির চেহারা ছিল হাফ গেরস্ত টাইপ। আবাসিক এলাকায় তখন গজিয়ে উঠছে গার্মেন্ট। ইস্কুল অবশ্য তখনো সেইভাবে অলিগলিতে ছিল না। বাড়িগুলিতে তখনো টানা কার্নিশ থাকত, তাতে ঘুমাত হরেক রকমের বেড়াল (যার একটির নাম আমি দিয়েছিলাম ‘কনফুসিয়াস’, অত্যন্ত চিন্তক অথচ কুঁড়ে বেড়াল ছিল সে), যাদের গেরস্তবাড়ির নানান দৌরাত্ম্য সইতে হতো। সিমেন্টের সিঁড়িগুলি, তার সিমেন্টের রেলিং, সকাল থেকে সেইসব সিঁড়ি ভরে থাকত ভাত ফুটবার, ভুঁড়ি জ্বাল দেবার অথবা ময়লা ত্যানা সিদ্ধ দেবার গন্ধে। নিচতলায় অপরিসর খেলবার জায়গাটুকুতে ফলত ঢেঁড়স, মোরগ ফুল আর পেঁপে। নিষ্ফলা বা নিষ্পত্র কোনো কোনো গাছের শাখায় প্রচুর মাছি বসে থাকত। গুয়ের ট্যাংকের সিমেন্ট বাঁধাই চত্বরে আমরা দড়িলাফ খেলতাম। প্রায়ই কোনো না কোনো বাড়িতে স্টিলের থালাবাটি-গেলাস কিছু একটা ঝনঝনিয়ে পড়ে যেত। বুয়ার চিত্কৃত ফরিয়াদে কান পাতা দায় হতো। আর ছিল পাতিকাকের কা-কা।
মোড়ে মোড়ে ছিল অডিও-ভিডিও দোকান আর চেঁচিয়ে যাওয়া নাদিম-শ্রাবণের সৃষ্টিমালা, ছিল সবুজ রঙ করা সেকরার দোকান, ছিল প্লাস্টিকের পিরিচে ডিমেল কেক আর কোক বেচা মুদি দোকান, ছিল বেকারির সামনে কথোপকথনরত শ্রমিকরা, যাদের পা ঢেকে আছে এক হাঁটু ময়দায়, ছিল প্রাচীরঘেরা বটমলি স্কুলের পূবদিকটায় রক্তকাঞ্চন গাছের সারি (বসন্তকালে সেই গাছের ফুলের রঙ হতো আমাদের কালোজাম খাওয়ার পরের জিভের মতন), আর কনভেন্টের সামনে ময়লা ফেলবার জায়গাটুকুতে পরিত্যক্ত সফটেক্সের সামনে থমকে যাওয়া দর্শক পথিক, আর ময়লার চালচিত্র হিসেবে দেয়ালে অনবদ্য দেয়াললিখন— ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই।’ ছিল একটি খোলা পায়খানাওয়ালা বাড়িতে টাঙানো সাইনবোর্ড— ‘এই বাড়িতে শহীদ বরকতের মা থাকেন।’ ছিল খবরের কাগজ ফুটো করে মাথা সেঁধিয়ে ক্রন্দনরত শিশুদের কামাই করানো নাপিতের দোকান। আমার প্রাথমিক চুল কাটবার অভিজ্ঞতাও সেখানে। পরে কারো মনে হয়ে থাকবে হাটের মাঝখানে ক্ষৌরকারের হাতে মেয়েশিশুকে চুল কাটাতে নেই, পরে আমি যেতাম ‘কাওলুন’-এ। সেখানেও সিমেন্টের সিঁড়ি, সিঁড়িভর্তি ম্যাডোনা-রেখা-ডিম্পল কাপাডিয়া-ব্রুক শিল্ডস-ডায়নার বিশাল বিশাল পোস্টার। পার্লার বোঝাই অজানা ভাষায় কথা বলা ক্ষিপ্রভঙ্গির নাপতেনিতে আর হেয়ার স্প্রের তীব্র গন্ধে। কারো কারো ড্রয়ারে রোমেনা আফাজের বই। কারো কারো মুখে ঝোল-ভাত খাওয়ার গন্ধ। প্রত্যেকের মুখ লেপাপোছা নাশপাতির মতন নির্লোম, প্রত্যেকের চুল অনেক যত্নে পরিপাটি করা। এই রকমই কোনো একদিন মা আর জামাল-মামী আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে গেল সেখানে, কান ফুঁড়বার জন্য, ক্লাস ফাইভে পড়ি, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দেব, অথচ কান ফুটো করা নেই। ব্যথায় অস্থির হয়ে মনে হলো, এর মানে কী? পুতুল খেলতে দিল না, অথচ কান ফুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এই ঘটনার চৌদ্দ বছর পরে বুয়েটে পড়বার সময় দুই বান্ধবী তেমনি পাকড়াও করে নিয়ে গেল ভ্রু প্লাক করতে। আমি অসহ্য ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠে লাফ দিয়ে শুনতে পেলাম, অবিকল সেই ক্ষিপ্রভঙ্গির আরেকটি মেয়ে বলছে, ‘এক ভ্রু পেলাক করলেও যা, দুই ভ্রুও তাই দাম।’ এই যে চারপাশে এত নিখুঁত রচিত ভ্রুপল্লব মেয়েদের, এর পেছনে এমন ব্যথার ইতিহাস! (ব্যথা ততদিনে সয়ে নিতে শিখছি। সেই বর্গক্ষেত্র খাটে শুতাম যখন, তখন থেকে মায়েরা শেখাচ্ছে হিসু করবার সময় কেমন করে নিঃশব্দে করা যায়— একান্ত না পারলে জলের কল খুলে দিয়ে শব্দের আড়াল করতে হয়— কেমন করে ‘শরীর খারাপ’-এর পর খেলার মাঠ থেকে আর প্রিয়জনদের কোল থেকে সরে আসতে হয়।)
এইসব যখন ঘটমান ছিল, তখন আমার তেমন কোনো হেলদোল ছিল না, সৌন্দর্যসন্ধানী মন বারবার আঘাত পেত বলে আমি ব্যগ্র ছিলাম শ্রেয় জীবনের অন্বেষায়, বই ছিল সেই ল্যাবিরিন্থেও ভেতরে আসা একমাত্র আলোর ছটা। যখন পুরাঘটিত হয়ে গেল, তখন একদিন ওরহান পামুক তার ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’-এ দেখিয়ে দিলেন, আমাদের দৈনন্দিনের গল্পই সবচেয়ে আজব— আমাদের ড্রয়ারে পুরনো ওষুধের গন্ধ, আমাদের কাপড় কাচা সাবান বা দেশলাইয়ের প্যাকেজিং, আমাদের পরিচিত নদীপাড়ের রাস্তায় মাছ ভাজার সুবাস, স্টিমারঘাটের ভোঁ-ধ্বনি, আমাদের কবরখানা নিয়ে চলতি ভূতের গল্প, সন্ধ্যার রাস্তায় মানুষের কোলাহলই সবচেয়ে আদরণীয় প্রত্ন-জাদুঘরের উপাদান। তা আমাদের যাপিত জীবনকে ধারণ করে, আমাদের অমূল্য সময়কে ধারণ করে। আমরা আদর করে দাদিজানের যৌতুকের সিন্দুকও সংরক্ষণ করতে পারি না, মশার উপদ্রবে টিকতে পারি না, অথচ সাবেকি ফোর-পোস্টার বেড দূর করে দিয়েছি, আমরা সময় ধারণ করব কী করে? ছেঁড়া একপাটি পুরনো জুতোর জন্য সারাবেলা শোক করা সাজে না, কিন্তু আমি তো ভুলতে পারি না সেই চার খুঁটির সেই বিছানায় খুঁটির মাথায় দেয়া পেরেকগুলি, নিমকপারা কাটবার পেতলের সেই চাকা, কনে দেখতে আসা অভ্যাগতদের পরিবেশিত একখানা আস্ত সুপারি মিহি করে হাতে ধরে এমন করে কাটা যে, আস্ত দেখাবে অথচ ধরলেই ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে— কয়েক দশক আগে যেসব বাড়ির অন্ধকার বসার ঘরের কাচঘেরা আলমারিতে থাকত ঝিনুকে লেখা নাম, যেসব সোফাসেটের পায়া ছিল প্রাণীর থাবার মতন আকারের, কুশনকাভার ভার হয়ে রইত গৃহিণীর এম্ব্রয়ডারিতে, ধামরাইয়ের ঢেউ খেলানো মাটির টবে থাকত পাথরকুচি আর জানালায় কাচের বোতলে মানিপ্লান্ট— সেগুলিতে একটা অমূল্য জিনিস ছিল, তার নাম ক্যারেক্টার, তাকে বাংলায় বলা যেতে পারে চরিত্র। হস্তাক্ষরের মতন তা চিনিয়ে দিত গৃহবাসীর রুচি-অভিরুচি-জীবনচর্চাকে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের করে দেয়া-ছকে দেয়া গৃহসজ্জায় সেই ক্যারেক্টারটাই যে তলিয়ে যায়, ভেসে ওঠে না, জানিয়ে দেয় না, জানান দেয় না। মক্কেলকে বাতলে দেয়া আছে কালের ঢেউয়ে কোন দোলা লাগল (কিংবা তা সে নিজেই বের করে নিয়েছে), খদ্দেরকে বলে দেয়া আছে কিসের আড়ালে সে লুকোবে তার আপনার অবয়ব-আপনার পারঙ্গমতা বা অপারগতা। বুয়েটে স্থাপত্যের ক্লাসে শামসুল ওয়ারেস আমাদের বলেছিলেন, যে লাউ দিয়ে রাঁধা শোল মাছ খায়, সে নির্বিবাদে এবং কারো তোয়াক্কা না করে সর্বসমক্ষে শোল মাছ আর লাউ খেলে তাকেই বলে আধুনিকতা (যদিও এরপর আমার মনোভাব সেই পুতুল খেলতে দিচ্ছে না অথচ কান ফুটো করে দিচ্ছে মতন হয়েছে)।
আরেকটু পিছু হটে দেখি ‘মিস্টার ব্ল্যান্ডিংস বিল্ডস হিজ ড্রিম হাউজ’ নামে ক্যারি গ্রান্ট আর মারনা লয়ের একখানা সাদাকালো মুভি আছে। সেখানে মিসেস ব্ল্যান্ডিংসকে আর্কিটেক্ট বোঝায়, ‘তোমরা হলে আমেরিকার প্রাণভোমরা, তোমরা হলে ব্লু-বেরি পাইয়ের মতন আমেরিকান...’ আর মিসেস ব্ল্যান্ডিংস গিয়ে মিস্টার ব্ল্যান্ডিংসকে বোঝায়, ‘বুঝলে আমরা হলাম গিয়ে আমেরিকার প্রাণভোমরা, আমরা ব্লু-বেরি পাই!’ তারপর মেলে ধরে আর্কিটেক্টের করা জবরজং প্রাসাদোপম প্ল্যান। মিস্টার ব্ল্যান্ডিংস হতভম্ব মুখ করে প্ল্যানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমার পাউডারড উইগ কোথায় রাখব বলে দাও!’ ক্যারি গ্রান্টের দারুণ কমিক টাইমিংয়ের গুণে হেসে গড়িয়ে পড়েছি যখন দেখেছি। পরে মনে হয়েছে, সত্যিই তো, আমার বাড়ি কেন আরেকজন সাজিয়ে গুজিয়ে দেবে, কেন তার এমনি আস্পর্ধা? আমার বাড়ি কিনা আমার ভালোবাসার আধার, আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের স্মৃতির মিনার। যে শৈশব নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে গেছেন ভ্লাদিমির নবোকভ কিংবা মার্সেল প্রুস্ত কিংবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা বুদ্ধদেব বসু। যা আমার পায়ের ছাপের মতন, হস্তরেখা কিংবা টিপসইয়ের মতন একান্ত আমার, কেন তা সাজাবার ভার অন্যের? আমাকে যে যা-ই বলুক না কেন, আমার মতন করে কেউ তো আমাকে জানে না। জানে না কোন রঙ আমার মনে আনে বিচিত্র ভাবের ব্যঞ্জনা, কোনটি করে মেদুর, কোনটি চমকে দেয় আচমকা খুশিতে। সেই জানাটাই কেন ফুটে উঠবে না আমার বসবার ঘরে, শোবার ঘরে, করিডোরে কিংবা বারান্দায়? এবং জীবনযাপনে? দেয়ালের একটু আলোময় খোপ, জানালার চওড়া সিল, ছাদের চওড়া আলসে, বসে গল্পের বই পড়বার একটুখানি সিঁড়ি কিংবা ঘেরা বারান্দার থাম কিংবা থামটা ঘিরে রেঙ্গুন ক্রিপারের লতাটা... কোনটি যে আমাকে নিজের শৈশবের কাছে নিয়ে যাবে তা আমার চেয়ে ভালো আর কে-ই বা জানে? রঙচটা নীল দরজার যে পাল্লাটা খুলে গেলেই ছিল শৈশবের উঠান, সেই পাল্লাটার জন্য আমার চেয়ে বেশি মায়া আর কার হবে? তারজালি দেয়া মায়ের মিটসেফ কিংবা মেজ ফুপির কাঁটা ধরে বোনা কুরুশ কাঁটার লেসের ডয়লি কিংবা তিন প্রজন্ম আগের বিয়ের সিন্দুক, মিনিমালিজমের ঢেউয়ে সব ছাঁটাই-বাছাই হয়ে যাবার আগে, ‘মেলাবে-মিলিবে’-তে সব মিলিয়ে যাবার আগে এদের কাকে কাকে আঁকড়ে ধরব?
আবার পামুকে ফিরি। পামুক তার ‘ইস্তাম্বুল’ গ্রন্থে বড় সংরক্ত লেখনীতে লিখে গেছেন, কনরাড কিংবা নাইপলের মতন লেখকরা জগৎ ঘুরেছেন, ঘুরেছেন ভাষামালা, সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতি, দেশে দেশে তাদের দেশ ছিল, তারা সেই দেশ বুঝে নিয়েছেন, দেশান্তর তাদের কল্পনাকে বেগবান করেছে, তারা পুষ্টির সন্ধান করেছেন এক রকমের শিকড়হীনতা থেকে, শিকড় থেকে নয়। কিন্তু পামুক নিজে তার কল্পনার বেগের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করেছেন ‘চেনা মাটি-চেনা পাড়া-চেনা পথে কড়া নাড়া’র ওপর, সৃষ্টির জন্য তাকে বরং স্থাবর জীবন বেছে নিতে হয়েছে একই রাস্তা-বাড়ি-পথঘাটের চিত্রের ওপর, ইস্তাম্বুলই তাকে গড়েছে, ইস্তাম্বুলের বেদনা তার বেদনা হয়েছে, ইস্তাম্বুলের সাম্রাজ্যবিলয় এবং তার বিষাদ পামুকের বিষাদ হয়েছে। ইস্তাম্বুলের ঐশ্বর্যই পামুকে এসে ‘বিবিধ রতন’ হয়েছে।





