সূচনা
১৯৯৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রথমবারের মতো অস্ত্রশস্ত্র, ক্ষুদ্রাস্ত্র আর গোলাবারুদের বাণিজ্য মেলা ইনডেক্সের (ইন্টারন্যাশনাল ডিফেন্স এক্সিবিশন) আয়োজন করে। পৃথিবীর বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের প্রচারণা ও বিক্রির লক্ষ্যে যোগ দিয়েছিল এখানে। মেলায় যোগ দেয়ার জন্য কাস্টমস পেরুনোর সময় কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়েন জেনারেল মিখাইল কালাশনিকভ। আবুধাবির সদাসতর্ক কাস্টমস কর্মকর্তারা দুই বোতল ভদকা চিহ্নিত করে রাশান জেনারেলকে সেগুলো তার মালপত্র থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। পর্যটকদের আমিরাতে অ্যালকোহল আনা নিষেধ। তো রাশিয়ার বিখ্যাত রফতানি পণ্য ভদকার বোতল দুটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর পরই কেবল কালাশনিকভকে অস্ত্র মেলায় যোগ দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এখানে সারা দুনিয়া থেকে আসা অস্ত্র ক্রেতাদের সামনে রাশিয়ার সর্বসেরা রফতানি পণ্য কালাশনিকভ বিপণনের পেছনে সময়টুকু কাটান তিনি। পরিহাসের বিষয় হলো, কাস্টমস কর্মকর্তারা জেনারেলের কাছ থেকে অ্যালকোহল বাজেয়াপ্ত করলেও তাকে এবং অন্য অস্ত্র ব্যবসায়ীদের অ্যালকোহলের পক্ষে যতটা সম্ভব, তার চেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ আগ্নেয়াস্ত্রের প্রচারণা ও বিক্রির লক্ষ্যে দেশে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
এ রচনাটি একটি বন্দুকের। এমন একটি বন্দুক, যেটা কিনা এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে যে, এর উদ্ভাবকের নামে একটা ভদকার নাম রাখা হয়েছে। এটি এত প্রভাবশালী একটি বন্দুক যে, এর সুবিধা নিয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন সংগঠন ও ওয়েবসাইটের অস্তিত্বও রয়েছে। এমনই প্রতীকী একটা অস্ত্র, যাকে নিয়ে র্যাপ শিল্পীরা গান গান, শিল্পীরা তাদের কাজে একে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং বাবারা এর নামে ছেলেদের নাম রাখেন। আভতোমাত কালাশনিকভ কিংবা একে, এখানে প্রধানত যে নামে উল্লেখ করা হয়েছে— টি-শার্ট, কম্পিউটার গেমস, চলচ্চিত্র এমনকি বিভিন্ন গানে জায়গা করে নিয়েছে।
এমন অবস্থার কারণে বিস্মৃত হওয়া স্বাভাবিক যে, ‘একে’র বিখ্যাত হওয়ার কারণ মূলত এটা, যে কাজের জন্য নকশা করা হয়েছিল, সেই কাজটিই করে— হত্যা, পঙ্গু এবং আহত করে।
ছোটখাটো অস্ত্র, এম-সিক্সটিনের মতো রাইফেল আর উযি এবং সবার উপরে একের হামলায় হররোজ আনুমানিক আধা মিলিয়ন মানুষ প্রাণ খোয়ায়। এ মুহূর্তে পৃথিবীতে ৭০ থেকে ১০০ মিলিয়নের মতো একে রয়েছে বলে আনুমান করা হয় এবং আজো এর উত্পাদন অব্যাহত আছে। ১৯৪৭ সালে উদ্ভাবনের পর থেকে ৪০টিরও বেশি সশস্ত্র যুদ্ধে এ রাইফেল ব্যবহার হয়েছে।
একে ব্যবহার করা সহজ। তার মানে বাচ্চারাও কিংবা শিশু সৈনিক এটি হাতে নিয়ে গুলি করতে পারে।
এটি সর্বব্যাপী, কোনো কোনো দেশে স্রেফ মুরগির সমান দামেই মেলে। গাড়ি বা বাইসাইকেলের চেয়েও মামুলি এ জিনিস। বিরল ক্ষেত্রে জ্যাম লাগে এতে, পুরনো হয় না বা মরচে ধরে না, এমনকি মাটির নিচে চাপা দিলে কিংবা পানিতে ফেলে দিলেও। ভয়ঙ্কর মৃত্যু-মেশিনই রয়ে যায়, মিনিটে ৬ হাজার রাউন্ড হারে হুড়মুড় করে বুলেট উগরে দেয়। চিরকাল।
খ. একটি আইকনের জন্ম
‘মাতৃভূমি রক্ষায় এটি তৈরি করেছি আমি। এর পর ওরা অস্ত্রটি ছড়িয়ে দিয়েছে। সেটা আমি চেয়েছি বলে নয়। আমার ইচ্ছা মোতাবেক হয়নি সেটা। তার পর যেন বোতল থেকে বেরিয়ে পড়া দৈত্যের মতো হয়ে দাঁড়াল ব্যাপারটা। নিজের খেয়ালেই চলতে ফিরতে শুরু করল ওটা। আমি চাইনি এমন পথে।’
—মিখাইল কালাশনিকভ, সৈনিক ও উদ্ভাবক
ব্যাপারটা পরিহাসমূলক যে, দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রটির জন্মযন্ত্রণা শুরু হয়েছিল এর উদ্ভাবকের হাসপাতালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পাওয়া বুলেটের আঘাত ও গোলার ধাক্কা থেকে সেরে ওঠার সময়। তরুণ রাশান সৈনিক মিখাইল কালাশনিকভ ১৯৪১ সালে জার্মানদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর হয়ে ব্রিনাস্কের যুদ্ধে ট্যাংকচালকের দায়িত্ব পালন করার সময় চোট পান।
সম্ভবত সহকর্মীর একজন মেধাবী উদ্ভাবক হওয়ার কথাটা জানা থাকায় রাশান সৈন্যরা কালাশনিকভকে জার্মান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন করত। প্রতিপক্ষের এমপি ৪৪ রাইফেল এত কার্যকর কেন? যেখানে তাদের বন্দুকগুলো কথায় কথায় জ্যাম হয়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাটালিয়নই একটিমাত্র সচল রাইফেল তিনজন মিলে ভাগাভাগি করে ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছিল।
‘আহত অবস্থায় শুয়ে থাকার সময় শুনতে পেতাম যে, ছেলেরা জার্মান অস্ত্রশস্ত্র আমাদের চেয়ে উন্নত বলে অভিযোগ তুলছে,’ বলেছেন কালাশনিকভ। তিনি বলেন, ‘তো সাধারণ সৈনিকদের জন্য একটা কিছু উদ্ভাবনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম আমি— এমন একটা অস্ত্র, যেটা হবে সাধারণ, কঠিন এবং দুনিয়ার বাকি সব অস্ত্রের চেয়ে সেরা।’
জার্মানদের অস্ত্রশক্তির ব্যাপারে আচ্ছন্ন হয়ে সেরে ওঠা বাদে কিছুই করার না থাকায় আক্ষরিক অর্থেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই নকশা তৈরি করে চরম যুদ্ধাস্ত্রের উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ ফিরিয়েছিলেন কালাশনিকভ। এর পর একদল নকশাবিদ ও সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজ করেন, মস্কোতে সোভিয়েত মেইন মিলিটারি একাডেমির বিশেষজ্ঞরাও তার নকশা যাচাই করেন।
কালাশনিকভ ও তার বন্ধু জিনিয়া ক্রাভচেনকো মিলে একটি রেলওয়ে ওয়ার্কশপে ছয় মাস ধরে বন্দুকের নকশা নিয়ে কাজ করেন। জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের আগে এখানেই কাজ করতেন তিনি। রাশান অর্ডন্যান্স একাডেমিতে নকশা দাখিলের পর সোভিয়েত বিজ্ঞানী এএ ব্লাগোনতাভোভ ওদের প্রতিভা আন্দাজ করতে পেরে দলবলসহ রেড আর্মির প্রধান অর্ডন্যান্স ডিরেক্টরেটের সেন্ট্রাল রিসার্চ স্মল আর্মস রেঞ্জে তুলে নিয়ে আসেন তাদের। এখানে নিজেদের ধারণাকে আরো ধারালো করে তুলতে সক্ষম হন তারা। জাতীয় পর্যায়ে ভবিষ্যতের হ্যান্ড হেল্ড অস্ত্রের খোঁজে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল এবং কালাশনিকভ ও ক্রাভচেনকোকেই প্রধান প্রতিযোগী ধরে নেয়া হয়েছিল।
ড্রইংবোর্ডে ফেরা
প্রাথমিকভাবে কালাশনিকভের প্রথম নকশাগুলো নাকচ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে জার্মান রাইফেলকে প্রেরণা হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ড্রইংবোর্ডে ফিরে যাওয়ার পরেই তার নকশাগুলো দৃশ্যত আনুকূল্য পায়। কালাশনিকভ বরাবরই তার রাইফেলটা জার্মান এমপি-১৪’র আদলে তৈরির কথা অস্বীকার করেছেন। চেহারার দিকে থেকে রাইফেল দুটিকে এক রকম মনে হলেও ভেতরের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ কেউ এমনও মত দিয়েছেন, দক্ষতার কারণে নয় বরং যুদ্ধবীরের মর্যাদার কারণেই কালাশনিকভকে নকশা দলের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছিল— সোভিয়েত ইউনিয়নের বরাবরের প্রচারণা কৌশল।
আত্মজীবনী ফ্রম দ্য এলিয়েন ডোরস্টেপ টু দ্য ক্রেমলিন গেটস-এ কালাশনিকভ লিখেছেন, নকশার অনুমোদন পাওয়ার একমাত্র কারণ তার কাজে বাগড়া দেয়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তখন নাকি ছুটিতে ছিলেন। সুখিতস্কি নামে এক সামরিক গোয়েন্দা জোরালোভাবেই এ উদ্ভাবনের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘তাকে রাজি করানোর সব প্রয়াসই মাঠে মারা যায়। তিনি অবকাশে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব বলে স্থির করেছিলাম আমরা। এর পর টেকনিশিয়ানদের হাতে আমাদের ড্রইং তুলে দেই। অনেক আগেই আমাদের পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়ে কাজ শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন ওরা। ঝটপট কাজ সেরে ফেলেন তারা এবং শুরু হয় বৃহত্ আকারে উত্পাদনের কাজ। ছুটি শেষে কাজে যোগ দেয়ার পর ঊর্ধ্বতন সামরিক গোয়েন্দার হাতে চরম জিনিসটি উপহার হিসেবে তুলে দেয়া হয়েছিল।’
১৯৪৬ সালে কালাশনিকভের ১৯৪৪ সালের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নতুন আভতোমাত (স্বয়ংক্রিয়) রাইফেল ফিল্ড টেস্টে দুর্দান্ত ফল দেখিয়ে অবশেষে জাতীয় প্রতিযোগিতায় জিতে যায়। আভতোমাত কালাশনিকভের নকশা চূড়ান্ত হয় ১৯৪৭ সালে। সে কারণেই একে-৪৭ নাম।
উদ্ভাবন থেকে সম্প্রসারণ
১৯৪৯ সালেই একে-৪৭’র রাশিয়ার পদাতিক বাহিনীর রাইফেলে পরিণত হবে বলে ঐকমত্য হলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫১ সালের আগে সেনাবাহিনীতে পাইকারি বণ্টন শুরু করেনি। দক্ষিণ-পশ্চিম সোভিয়েত ইউনিয়নের ইযহেভস্ক ইযহেমাশ (সাবেক মোটর) ফ্যাক্টরিতে এবং পরে কালাশনিকভ (সোভিয়েত সেনাবাহিনীর জেনারেল ডিজাইনার অব স্মল আর্মস হিসেবে নতুন পদবি নিয়ে) কাছের যে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্লান্টে ঘাঁটি গেড়েছিলেন, সেখানে লাখ লাখ অস্ত্র উত্পাদন শুরু করেন। কালাশনিকভ লিখেছেন যে, ইযহেভস্ক কারখানা ১১ মিলিয়নেরও বেশি রাইফেল উত্পাদন করেছিল।
১৯৫৯ সাল নাগাদ ধাতব পাত থেকে ছাপ মারা যাবে, এমন সহজ নকশায় একে ৪৭-কে ফের আধুনিকায়ন করা হয়। একে-এম নামের অস্ত্রটিই (আধুনিকীকৃত বা উন্নত করা বোঝাতে এম) মিলিয়ন মিলিয়ন হারে উত্পাদন হয়। গ্যাংস্টার, সামরিক বাহিনীর লোকজন, চিত্র প্রযোজক ও র্যাপ শিল্পীরা আজ যাকে দৃশ্যত ভুলক্রমেই একে-৪৭ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন।
তা সত্ত্বেও একে ‘থলের বাইরে এসে যাওয়ার পর’ সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং অচিরেই বাস্তব ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশেই এর বিস্তার ছিল অনিবার্য। উত্পাদন ও কাজের সহজতার সঙ্গে জোরালো নির্ভরতা একে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, গেরিলা আন্দোলন, মাফিয়া ও গ্যাংস্টার নির্বিশেষে সবার পছন্দের অস্ত্রে পরিণত করেছে।
গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট বাঁধা অ-পশ্চিমা দেশগুলোতেই দ্রুত আবির্ভূত হয়েছিল অস্ত্রটা। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের বেশির ভাগ সময়জুড়ে অব্যাহত থাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের সামরিক সহায়তা কর্মসূচির অধীনে অসংখ্য দেশকে প্রায়ই বিনা পয়সায় হার্ডওয়্যার, নকশা এবং কারিগরিবিদ্যা জোগানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজমবিরোধী লড়াইয়ে এর মিত্রপক্ষকে অস্ত্র জোগানোর সময় কমিউনিস্টপন্থী, সমাজতন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নিকারাগুয়ার স্যান্দানিস্তা থেকে শুরু করে ভিয়েতনামের ভিয়েত কংদের হাতে ক্যান্ডির মতোই একে-৪৭ তুলে দেয়া হয়।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের দুই পক্ষের বাহিনী একের সম্ভাবনা টের পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশ আইনি-বেআইনি নকল তৈরি শুরু করে এবং সেগুলো আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিক্রি করতে থাকে। যেমন— ইসরায়েলের ৫.৫৬ গালি অ্যাসল্ট রাইফেলের একই রকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ইতালি এ নকশা ব্যবহার করে এর কুখ্যাত বেরেটা বের করেছে। চীন, ভারত, ইরান, পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ার নকল একে থাকার কথা আর আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে সেগুলো বিক্রি করার কথা সর্বজনবিদিত।
একটি কাল্টের জন্ম
ভিয়েতনাম সংঘাতের সময় কেবল সন্তোষজনক অস্ত্র হিসেবেই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও পৌরাণিক আইকন হিসেবেও রাইফেলটির নাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। রাইফেলটি সব ধরনের আবহাওয়া আর পরিস্থিতিতে কার্যকরী, তাই এ রকম হাজার হাজার রাইফেলের মালিক ‘ভিয়েত কং’রা মার্কিন সৈনিকদের ভয়ঙ্কর শত্রুতে পরিণত হয়।
যুদ্ধের প্রথম দিকের বছরগুলোয় অস্ত্রটির সুস্পষ্ট ভিন্ন ধরনের আউটলাইন— কলা আকৃতির ক্লিপসহ এবং গুলি করার সময় জানান দেয়া ‘পপ’ আওয়াজের মানে ছিল অল্প আলোয় বা বেশ দূর থেকেই ভিয়েত কংদের চোখে পড়বে। অবশ্য একসময় বহু মার্কিন সেনা তাদের নিজেদের কোল্ট এম-১৬ বাদ দিয়ে মৃত শত্রুদের কাছ থেকে একে-৪৭ হাত করে। ভিয়েতনামের আর্দ্র আবহাওয়ায় কোল্ট পরিষ্কার রাখা কঠিন ছিল। পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় অবস্থায় ট্রিগার টানলে জ্যাম লেগে যেতে পারত। একে-৪৭-এ সশস্ত্র থাকার কারণে সতীর্থ মার্কিন সেনাদের কাছে শত্রু হিসেবে ভুল করার ঝুঁকি ছিল, তবে বন্দুকের নির্ভরতার বিচারে ওই ঝুঁকি নেয়া যায় বলেই মনে করা হয়েছে। ব্যাপারটা পরিহাসময় যে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীই কিনা আমেরিকান অস্ত্র ফেলে সোভিয়েত প্রতিপক্ষের তৈরি শ্রেয়তর রাইফেল বেছে নিয়েছিল, যাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন করায় প্রয়াসী ছিল তারা।
তো অচিরেই ভিয়েতনাম বিরোধের দুই পক্ষই একে-৪৭ নিয়ে লড়াই করে বিরোধের পাশাপাশি পুঁজিবাদ ও কমিউনিজমের ধস্তাধস্তির প্রতীক হিসেবেও বন্দুকটির অবস্থান নিশ্চিত করে তুলছিল।
আজকের দিনে একই ধরনের প্রক্রিয়ার একটি ধারায় একে-৪৭ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের চেয়েও বেশি কিছুতে পরিণত হয়েছে। এর এবং আদি নকশার ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য বন্দুকের সর্বব্যাপিতার সঙ্গে সহজ ব্যবহারযোগ্যতার মানে হলো, কম্বোডিয়া থেকে ডিআর কঙ্গো অবধি যেখানেই লড়াই বা সহিংসতার অস্তিত্ব রয়েছে, একে-৪৭ কোথাও না কোথাও মিলবেই। যুদ্ধ ও সহিংসতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে এটি। আবার পরিহাসমূলকভাবে মর্যাদার প্রতীক এবং স্টাইলের উপকরণও।
খ. কালাশনিকভ শিল্পকলা
‘সংযমের দিক থেকে নকশাটা ব্যতিক্রমী। একটি কাঠি দিয়েও এটা সাফ করতে পারবেন আপনি। এ গ্রহের সবচেয়ে জঘন্য জিনিস এটা।’ গি মার্টিন, লেখক, স্টুডিও ৩৬০ ওয়েবসাইট।
যখন কোনো কিছুর নাম বা আকার ভিন্ন কোনো বস্তু বা ধারণার স্থান দখল করে নেয়, মূল জিনিসটার সঙ্গে যার খুবই শিথিল সম্পর্ক থাকে, তখনই আপনি বলতে পারবেন প্রতীকে পরিণত হয়েছে সেটা। সেই নাম বা ধারণাটি খোদ ওই বস্তুর চেয়ে বিশাল হয়ে ওঠে।
হুভার ও সার্চ ইঞ্জিন গুগলের পাশাপাশি একে-৪৭ তেমনই একটি জিনিস। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আবিষ্কৃত একটি রাশান রাইফেলের নামে নাম রাখার কথাটা না জেনেই কালাশনিকভ ভদকা পান আর র্যাপার একের গান শুনতে শুনতে দাবা খেলার সময় কালাশনিকভ চাল চালা সম্ভব— ‘এক আগ্রাসী আধুনিক দাবা খেলার সূচনা’।
সংঘাতের এলাকা থেকে দূরে নিজের গুণেই সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে কালাশনিকভ। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। কলা আকারের ক্লিপ আর ছোট কাঠ বা ধাতব বাট নিয়ে রাইফেলের আদলটাই এখন স্টাইল আইকনে পরিণত হয়েছে। ফল হচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছায়ামূর্তি; আউটলাইনের বেলায় অলক্ষুণে আকার কিংবা ছায়া হিসেবে ফেললেও নিমেষে চেনা যায়।
ভাষ্যকাররা মত দিয়েছেন যে, একে-৪৭’র নকশা কমিউনিস্ট প্রকল্প মাথায় রেখে তৈরি এর জন্মকালের রাজনৈতিক প্রতীক। খোদ নকশাটিই শ্রম ও উত্পাদনশীলতা তুলে ধরেছে। রাইফেলের সোজাসাপ্টা সংযোজন বোঝায় যে, বাবা ও স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা অবস্থায় নারী ও শিশুসহ স্বল্পদক্ষ শ্রমিকরাই এ অস্ত্র তৈরি করতে পারবে।
স্টুডিও ৩৬০’র ডিজাইন ইস্যুর ওপর ভাষ্যকার ও ঠাণ্ডা যুদ্ধ-বিষয়ক লেখক গি মার্টিন বলেছেন, ‘বন্দুকের নকশা এমনই হওয়া দরকার। নান্দনিক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী।’ একের অনন্য নকশার উদাহরণ হিসেবে মার্টিন রাইফেলটার আদি ক্লিপের কথা উল্লেখ করেছেন। বাঁকের মানে হলো, ম্যাগাজিন বুলেট ভর্তি থাকা অবস্থায় অল্প জায়গাই নষ্ট হয়; প্রচলিত ক্লিপের মতো অদক্ষভাবে পাশাপাশি থাকার বদলে বরং বাঁকের ভেতর ওগুলোর মাথা কাছাকাছি থাকে। এবং সর্বসেরা নকশা নিয়ে এর টিকে থাকার শক্তিতেই গুণ প্রকাশিত হয়েছে। আজো ১৯৪৭ সালের প্রটোটাইপের সামান্য অদলবদল নিয়েই তৈরি হচ্ছে এটি।
প্রভাব সৃষ্টিকারী নকশা
একে নিজ গুণেই প্রতীক হয়ে উঠলেও এটি আবার জনপ্রিয় অবস্থানগত কারণের পাশাপাশি কাজের সুবাদেও শিল্পকলা ও নকশার জগতে জায়গা করে নিয়েছে।
প্রভাবশালী নকশা-বিষয়ক ম্যাগাজিন আই-ডি একবার বন্দুকের নকশা নিয়ে আস্ত একটা সংখ্যাই বের করেছিল। কালাশনিকভ এবং এর অনুপ্রেরণায় তৈরি নানা অস্ত্রের ছবিতে ঠাসা ছিল সেটা। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রো-আমেরিকান সাংস্কৃতিক সাময়িকী চিমারেঙ্গা (শোনা ভাষায় সংগ্রাম) একজন বাদকের রাইফেলের কায়দায় গিটার ধরে রাখার ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল। একের সুপরিচিত ক্লিপকে ফটোশপের কল্যাণে অনায়াসে ইমেজের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে। একে রোজকার বিভিন্ন নকশায়ও বেশি হারে ঢুকে পড়েছে।
২০০৫ সালে ল্যাম্পের একটা সিরিজ চালু করেন ডিজাইনার ফিলিপে স্টারোক। মেঝে, ডেস্ক আর বেডসাইড মডেল হিসেবে বের হয়েছিল এগুলো। প্রতিটি ল্যাম্প প্রচলিত স্ট্যান্ডের বদলে একটা সোনার আস্তরণ দেয়া কিংবা স্প্রে করা বন্দুক ছিল। তার সবচেয়ে বিতর্কিত নকশাটি ছিল একে-অলা একটি টেবিল ল্যাম্প।
এ ল্যাম্পগুলো রাজনৈতিক প্রগতির নামে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান— ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
কিন্তু এটাই সব নয়। একের বুলেট ম্যাগাজিনের আদলে একটি এমপি-৩ নকশা করা হয়েছে। ৬০০ ডলার দামের ‘একে-এমপি জ্যুকবক্স’-এ ৯ হাজার গান ধরে এবং ক্যামোফ্লাজ ক্যারিং কেসে পাওয়া যায়। এটি অনায়াসে আবার রাইফেলের নিচেও জুড়ে দেয়া সম্ভব। ‘স্টেইনলেস স্টিলের কাঠামো এই নতুন প্লেয়ারকে বাইরের পরিবেশের পক্ষে দারুণ মানানসই করে তুলেছে,’ জানিয়েছে ওয়েবসাইটটি। ‘বিশ্ব শন্তির পক্ষে এটাই আমাদের প্রয়াস। আশা করা যায়, এখন থেকে বহু উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী গান আর অডিও বই শুনতে তাদের একে-৪৭ কাজে লাগাবে... ওদের আয়েশ করে পুরো ব্যাপারটাকে সহজভাবে নেয়া উচিত।’
খেলনার খদ্দেররাও শখ মেটাতে পারেন। অনলাইন বিপণি জেসাস ক্রাইস্ট সুপারস্টোর সাদা জোব্বা, সাদা দাড়ি আর নিজস্ব একে-৪৭সহ খুদে ক্রিশ্চান দেবতা বিক্রি করে থাকে। চাইলে সমানভাবে সশস্ত্র হিন্দু দেবতা কৃষ্ণ, ইসলামী আত্মঘাতী বোমারু, এমনকি দালাই লামাকেও কিনতে পারেন আপনি। অন্য এক অনলাইন বিপণি থেকে খেলনা ক্রেতারা দুটো খুদে প্লাস্টিকের একে-৪৭, অন্য দুটো মেশিন গান, একটি হেলমেট আর একটি খড়ের টুপির সমাহার ১২’’ ভিয়েত কং অস্ত্রের সেট কিনতে পারেন। সবচেয়ে কার্যকর ঘাতক যন্ত্রের ছেলে-বুড়ো সবার কাছে বিপুল চাহিদা থাকা খেলনা হয়ে ওঠাটা আমাদের উন্মত্ত বিশ্বেরই প্রতীক বহন করে।
কালাশনিকভ শিল্পকলা
ব্র্র্যান্ড হিসেবে শিল্পকলার বৃহত্তর জগতেও জোরালোভাবে একে-৪৭-কে তুলে ধরা হয়েছে। প্রায়ই স্বভাবতই এটি ভীতি ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
রাজনৈতিক ম্যুরালগুলোই এর সবচেয়ে বাঙ্ময় নজির। সারা উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং বিশেষ করে রাজধানী বেলফাস্টে কিছু দেয়াল প্রদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতিহাস তুলে ধরা জটিল বর্ণিল ছবিতে ভরা। উপদলীয় কোন্দলের দুই পক্ষেই বন্দুকটার ভয়ঙ্কর ছায়ার ব্যাপক অস্তিত্ব রয়েছে।
সত্তরের দশকে নিকারাগুয়ায় ম্যুরালগুলোই স্যান্দানিস্তা বিপ্লবীদের যোগাযোগের উপায় ছিল। একে-৪৭-এর উপস্থিতি ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে নিকারাগুয়ায় মার্কিন দখলদারীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জাতীয়বাতাবাদী নেতা অগাস্তো সিজার স্যান্দানোর ছায়ামূর্তির মতোই সাধারণ ছিল সেসবে। রাজধানী মানাগুয়ায় এক বিশাল বিপ্লবী মূর্তি আকাশের দিকে একে-৪৭ তাক করে থাকা এক অজ্ঞাত বিপ্লবীকে তুলে ধরেছে।
শিল্পীরা রাইফেলের প্রতীকী মর্যাদার কিছু ভাগ পাওয়ার আশাতেই এর নাম ব্যবহার করেছেন। যেমন— অন্যতম সুপরিচিত আধুুনিক অনলাইন ফটোগ্রাফ ম্যাগাজিনের নাম একে-৪৭।
ইংল্যান্ডের লন্ডনে একে-৪৭ নামে আত্মঘোষিত এক ‘শিল্পী-সন্ত্রাসী’ আধুনিক শিল্পীদের কাছে সুপরিচিত শিল্পকর্ম ‘অপহরণ’ করেন। ‘রাজনৈতিক-শিল্পকর্মের রসিকতার অংশ হিসেবে’ শিল্পী ট্রেসি এমিনের একটা কিছু কাজ আর গ্রাফিতি শিল্পী বানস্কির একটি ভাস্কর্য নিয়ে গেছেন তিনি। শিল্পী বলেছেন, ‘একে’ রাশিয়ান রাইফেলের কথা বোঝালেও তা আবার ‘আর্ট কায়দা’ও বোঝায়, নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদার নাম নিয়ে এক ধরনের রসিকতা।
চীনের বেইজিংয়ে আরেকজন গ্রাফিতি শিল্পী ঝাং দালি জরাজীর্ণ দালানকোঠার দেয়ালে ‘আমার জনগণ আর বদলে চলা পরিবেশের ভেতর সংলাপ’ শীর্ষক গ্রাফিতিতে একে-৪৭ নাম ব্যবহার করছেন।
সুর
সংগীতে বিশেষ করে ব্ল্যাক, র্যাপ ও তথাকথিত ‘গ্যাংস্তা’ সংগীতেও একে রাইফেল ব্যাপক বিস্তৃত এবং রাজনৈতিক ম্যুরালে এর আবির্ভাবের মতোই ওতপ্রোতভাবে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত।
একে এবং একে-৪৭ র্যাপসংগীতে এত বেশি বেশি দেখা যায় যে পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ‘র্যাপ ডিকশনারি’তে একটা সংজ্ঞা পেয়ে গেছে। কুখ্যাত ব্ল্যাক র্যাপ দল এসডব্লিউএ ফ্রিডম গট অ্যান একে নামে একটি গান বের করেছিল, পরে দা লেঞ্চ মব আবার নতুন করে গেয়েছে এটা—
Cause the bang-bang, buck-buck, boom-boom,
pow-pow
Used to be trick [but bitch-how ya like me know]
Cause the AK40 dick hold a 50 clip
and I’ll shoot till it’s empty bitch
That’s how you got filthy rich
I know the game, so I’m a do the same
Don’t like when I play the same way
and say- hey – freedom’s got an AK
আরেক র্যাপশিল্পী বোন থাগস এবং হারমোনি সাদা পুলিশ অফিসারদের উদ্দেশ করে সহিংস ভাষায় রাইফেলের কথা উল্লেখ করেছে: Krayzie Bone is stepping in with the ultimate jacking; with the AK Wish is buck, buck, buck blasting; ‘cause Layzie Bone is the No 1 Assassin.’ কখনো কখনো এসব বা অন্যান্য দলের ভিডিওতে বিভিন্ন অস্ত্র বা অন্ততপক্ষে সেগুলোর উল্লেখ থাকে। টেররা ফার্মা নামেও একটি ব্রিটিশ র্যাপগোষ্ঠী আছে। নিজেকে রিকোশে ক্লাশনিকফ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন এদের লিড গায়ক।
কিন্তু এ ধরনের সব গানবাজনায় একে বা অন্যান্য অস্ত্রের উল্লেখ গায়ক বা দলের শক্তি কিংবা কঠোরতা তুলে ধরে না। নিশ্চিতভাবেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর আবির্ভাব রাজনৈতিকও ছিল। যেমন— শ্বেতাঙ্গ র্যাপার এমিনেমের ২০০৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরোধী ভর্ত্সনা— তার এ-যাবত্কালের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত গান মোশ-এ এভাবে কালাশনিকভের কথা ব্যবহার করেছেন:
Let the President answer on high anarchy
Strap him with an AK-47, let him go
Fight his own war, let him impress Daddy
that way
No more blood for oil, we got our own battles
to fight on our soil.
নিঃসন্দেহে র্যাপসংগীত আর গ্যাং ভায়োলেন্স এবং একের ভূমিকা নিয়ে জোরালো বিতর্কই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ২০০৫ সালে লন্ডনে সো সলিড ক্রু র্যাপার মেগাম্যানকে লন্ডনে গোষ্ঠী প্ররোচিত হত্যাকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। বিচারের সময় গোয়েন্দারা জুরিদের জানিয়েছেন যে, তাদের অ্যালবামে মেগাম্যানের— আসল নাম কার্ল মরগান— নামে চলা বেশ কয়েকটি লিরিকসে নিচেরটিসহ অস্ত্র ও সহিংসতার প্রবল উল্লেখ ছিল:
It’s so easy to pull out your gut, rat-a-tat-tat,
lay three niggas on their back.
Everybody’s getting shot, everybody’s
running around the vlock with a Glock
cocked, and now the streets are hot.
বিবাদী বলেছেন যে, গানগুলো আসলে ঐক্য এবং সাবেক গ্যাংস্টারদের বৈধ হয়ে ওঠা নিয়ে ছিল। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য জায়গায় কৃষ্ণাঙ্গদের কারো কারো ভেতর ‘একে’ সহিংসতার সংস্কৃতির একটা অংশ। এটা লন্ডনে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের হাতে স্টিফেন লরেন্সের মতো তরুণ কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার অজুহাত কিংবা এমনকি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা সংস্কৃতি এবং কিছু পুলিশ অফিসারের এসব তরুণের বিরুদ্ধে কথিত সংস্কারও। অবশ্য অস্ত্র সংস্কৃতি ও সংগীতের মধ্যকার যোগাযোগ সেভাবে সমর্থিত নয়।
এখানে আসল কথা যা-ই হোক, এ ধরনের সংগীতে একের আবির্ভাব দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনে এর প্রভাবেরই আরেকটা লক্ষণ। সংগীত, শিল্পকর্ম, নকশা আর নিত্যকার ভাষায় একে রাইফেলের চেয়ে বেশি কিছুই বটে।
মিখাইল কালাশনিকভের কথা: ‘আমি শান্তিতেই ঘুমোই’
১৯১৯ সালের রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের পর পরই এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে মিখাইল কালাশনিকভের জন্ম। সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হওয়ার পর পরিবারটি খামারির অস্তিত্ব নিয়ে কোনোভাবে টিকেছিল। কালাশনিকভের দাবি অনুযায়ী, এটাই তাকে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে অনুপ্রাণিত করে। ‘তখন বালক ছিলাম আমি কিন্তু ভালোই কাস্তে চালাতে পারতাম,’ ২০০৩ সালে মার্কিন গার্ডিয়ান পত্রিকাকে বলেছিলেন তিনি।
বলা হয়েছে যে, পরিবারের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলতে গম পিষে ময়দা বানানোর একটি কাঠের জাঁতাকলসহ বিভিন্ন জিনিস উদ্ভাবন করেছিলেন কালাশনিকভ। দেশলাই কাঠি জ্বালানোর একটা খেলনা বন্দুকও নাকি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে তুর্কিস্তান-সাইবেরিয়া রেলওয়ের কর্মচারী হিসেবে মাতাই ট্রেন ডিপোতে শিক্ষানবিশির সময় কিয়েভে রেড আর্মির অধীনে কাজ করার জন্য তলব করা হয় কালাশনিকভকে। এখানেই তিনি তার নকশা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে আরো চোখা করে তোলেন। যেমন— ট্যাংক থেকে ছোড়া গোলার সংখ্যা গোনার জন্য একটি মেশিন তৈরি করেছিলেন তিনি।
এটা সুবিদিত যে, একের উদ্ভাবন থেকে তিনি এক রুবলও ফায়দা নেননি, বরং এর সৃষ্টিকে সোভিয়েত দায়িত্ব হিসেবেই দেখেছেন। তবে তাকে মর্যাদা, সিনিয়রিটি আর মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। ১৯৪৯ সালে তিনি ও তার নকশার সহকর্মীরা তাদের কাজের জন্য প্রথম শ্রেণীর স্তালিন পুরস্কার পান; ১৯৬৪ সালে তিনি পরিণত হন লেনিন পুরস্কারের অধিকারীতে। ১৯৫৮ ও ১৯৭৬ সালে তাকে হিরো অব দ্য সোভিয়েত লেবর পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৪ সালে কালাশনিকভ একে-৪৭ প্রস্তুতকারী ইযহেভস্ক অর্ডন্যান্স কারখানায় ফিরে যান এবং প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলিসনের কাছ থেকে ‘সার্ভিস টু দ্য মাদারল্যান্ড’ খেতাব লাভ করেন।
কালাশনিকভ বলেন, নিজের উদ্ভাবনের জন্য দুঃখ নয়, বরং গর্ববোধ করেন তিনি। তবে সন্ত্রাসীদের হাতে এর ব্যবহারে তিনি হতাশ। বছর পরিক্রমায় বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের দরকার ছিল এমন একটা জিনিস তৈরির দায়িত্বের কথাই বারবার বলেছেন তিনি। তবে ২০০২ সালে সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, ‘লোকে কাজে লাগাতে পারবে এবং কৃষকদের তাদের কাজে সাহায্য করবে এমন একটা মেশিন— যেমন লন মোয়ার— উদ্ভাবন করতেই’ বেশি পছন্দ করতেন।
কালাশনিকভ এমনসব সময়ের কথাও উল্লেখ করেছেন, যখন তার বন্দুক যে সোভিয়েত প্রকল্পের স্বার্থে নকশা করা হয়েছিল, যে উদ্দেশ্যে একে তৈরি করা হয়েছিল, তাকে বিকৃত করেছে। তার একটা নজির হলো, ১৯৯২ সালে কথিত রাশান সেনাবাহিনীর সহায়তায় নাগোর্নো কারাবাশে শত শত আজারবাইজানিকে হত্যার কাজে একের ব্যবহার।
প্রায় জীবনভর অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষা করতে গিয়ে কালাশনিকভ শেষজীবনে বলতে গেলে বধির হয়ে গিয়েছিলেন। ইযহেভস্ক কারখানার কাছেই থাকতেন তিনি। এখনো সেখানে একে-৪৭ তৈরি হচ্ছে।
গিডিয়ন বারোউজ রূপান্তর: শওকত হোসেন






