লে. জেনারেল মিখাইল টিমোফিয়েভিচ কালাশনিকভ শেষ পর্যন্ত তাঁর আবিষ্কারটির জন্য কষ্টই পেয়েছেন। তিনি বুঝতে পারেননি তাঁর আবিষ্কার সন্ত্রাসীদের প্রিয় অস্ত্র হয়ে উঠবে— তাদের হাতে ঝরে পড়বে লাখো জীবন।

এই কষ্ট পেয়েছেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। একসময় এটি বেশ রটে গিয়েছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে আণবিক বোমার বিস্ফোরণে দুই লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই আণবিক বোমার প্রধান কারিগর আইনস্টাইন। আসলে যে ম্যানহাটন প্রজেক্ট আণবিক বোমা বানায়, তাতে আইনস্টাইনকেও নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা বারবার এ জার্মান নাগরিকের ব্যাপারে আপত্তি জানায়। তবে বহু বছর আগে ব-সপ২ তত্ত্বে আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, কোনো বস্তুর অণুর ভেতর যে শক্তি লুকিয়ে থাকে, তা মুক্ত করতে পারলে ভয়ঙ্কর শক্তির সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা এই মন্ত্র কাজে লাগায়। ওদিকে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন হিটলার আণবিক বোমা বানাচ্ছে। আমেরিকা যদি বসে থাকে, তাহলে হিটলার সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে। এই হচ্ছে আণবিক বোমার পেছনে আইনস্টাইনের পরোক্ষ ভূমিকা। আইনস্টাইন নিজের এ ভূমিকার কথা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন: ‘এমন হবে যদি জানতাম, তাহলে আমি ঘড়ি মেরামতকারী মিস্ত্রি হতাম।’

একে-৪৭ হয়ে উঠেছে বিপ্লবের প্রতীক— প্যালেস্টাইন, অ্যাঙ্গোলা, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, আফগানিস্তান— আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া সর্বত্রই মুক্তিকামী মানুষ মনে করে শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। আর বিপ্লবের অস্ত্র মানেই একে-৪৭’।

&dquote;নিজেররবার্ট ফিস্ক ২০০১ সালে একবার বয়োবৃদ্ধ কালাশনিকভকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার আবিষ্কার করা অস্ত্রে এত যে রক্তপাত, ছিন্নভিন্ন এত যে মরদেহ, তা আপনি কেমন করে যৌক্তিকীকরণ করবেন?

টি-৩৮ ট্যাংকের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জার্মান শেল তার ট্যাংককে আঘাত করে। তার পিঠ ও ঘাড়ে মারাত্মক জখম হয়। কালাশনিকভ রবার্ট ফিস্ককে বলেন, ‘আমি তখন হাসপাতালে, আমার পাশের বেডের একজন আহত সৈনিক আমাকে বলল, আমাদের দু’তিন সৈন্যকে কেন একটি অস্ত্র ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়, আর জার্মানদের হাতে হাতে অটোমেটিক অস্ত্র? কাজেই আমি একটি অস্ত্রের ডিজাইন করলাম। আমি নিজে সৈনিক। আমি সৈনিকের জন্য মেশিনগান বানালাম। এর নাম হলো আভতোমাত কালাশনিকোভা— কালাশনিকভের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। ১৯৭৪-এ দেয়া সেই নাম এখনো আছে। দেখুন, একপক্ষ চায় অস্ত্রের সাহায্যে স্বাধীন হতে। আমি মনে করি, শেষ পর্যন্ত শুভই টিকে থাকে। আপনি হয়তো বেঁচে থেকে তা দেখে যাবেন। তবে তা ঘটবে আমার মৃত্যুর পর। তবে একটা সময় আসবে, যখন আমার এই অস্ত্রের আর ব্যবহার হবে না কিংবা ব্যবহারের প্রয়োজনও হবে না।

একে-৪৭ একটি মিথের মর্যাদা পেয়ে গেছে। ‘যখন আমার সঙ্গে মোজাম্বিকের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেখা, তিনি আমাকে তার দেশের পতাকা উপহার দিলেন। এতে কালাশনিকভ সাব-মেশিনগানের ছবি। তিনি বললেন, স্বাধীনতার সৈনিকরা তাদের বাড়ি ফিরে গিয়ে তাদের ছেলেদের নাম রেখেছেন ‘কালাশ’। এটি কেবল সামরিক সাফল্য নয়, এটি অনেক বড় সম্মান। যখন মিখাইল কালাশনিকভের নামে কারো নামকরণ করা হয়, এটি অনেক সম্মানের ব্যাপার। এমনকি লেবানিজ হিজবুল্লাহ বিপ্লবীরা তাদের ব্যানারে একে-৪৭-এর ছবি ব্যবহার করেছে, তাদের মতে ঋজু রাইফেলটি একক, যা আল্লাহর একত্ববাদই প্রকাশ করে।

কালাশনিকভ রবার্ট ফিস্ককে বলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল এই অস্ত্র দিয়ে আমার মাতৃভূমির সীমান্ত রক্ষা করা। এই অস্ত্র যে পৃথিবীতে খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে, এটি আমার কোনো অপরাধ নয়। অনেক সংকটাপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহার হচ্ছে। এর অপব্যবহারের জন্য দোষী হতে পারে সেসব দেশের নীতিমালা, অস্ত্রের ডিজাইনার নয়। পুরুষ মানুষের কাজ তার পরিবার, সন্তান ও স্ত্রীকে রক্ষা করা। এই অস্ত্রের ডিজাইন করার ব্যাপারটি ছাড়াও আমি তিনটি বই লিখেছি আমাদের তরুণদের জন্য, যাতে তারা পরিবার, মুরব্বিজন ও ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে।’

২০০৯ সালে ইভান এগোরোভকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন: আমি একে-৪৭ আবিষ্কার করেছিলাম আমার দেশকে রক্ষা করার জন্য। বছরের পর বছর আমাকে রাশিয়ার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। একবার কেবল এক ছুটিতে আমার স্ত্রীকে নিয়ে বুলগেরিয়ার গোল্ডেন স্যান্ডস রিসোর্টে গিয়েছিলাম, সেখানে আমি আমার নিজের নামও বলতে পারিনি। নব্বইয়ের দশকে আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র রফতানি প্রতিষ্ঠান রসোবোরোনএক্সপোর্ট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপদেষ্টা হিসেবে আমি অনেক দেশে গিয়েছি, অস্ত্র প্রদর্শনী দেখেছি, অতি সাম্প্রতিককালের অস্ত্রও এখন আমার কাছে আছে। আমি মনে করি না একে-৪৭ সবচেয়ে ভালো অ্যাসল্ট রাইফেল। এ কথা আমি বারবার বলেছি ভালোর সীমা তো আকাশ।

অস্ত্রের জগতে সবাই সবাইকে চেনে এবং একজন অন্যজনের পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে। বিখ্যাত এম-১৬ রাইফেলের ডিজাইনার ইউজিন স্টোনারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমার একে-৪৭ তারটার চেয়ে কিছুটা ভালো— এই উপহাস করলাম। জবাবে তিনি বললেন, সে আমলের ৫ কিলোগ্রাম প্রটোটাইপ অস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে পেন্টাগনের জন্য প্রয়োজনীয় ২ হাজার ৮০০ গ্রাম অস্ত্রের ডিজাইন আমি দিতে পারব কিনা তার সন্দেহ রয়েছে। আমি ও স্টোনার যখন মেরিন কোর ঘাঁটিতে হাজির হলাম, ঘাঁটির কমান্ডার জেনারেল কোফিল্ড স্বীকার করলেন, ‘যুদ্ধ করতে হলে, কালাশনিকভ সাহেব, আমি আপনারটাই পছন্দ করব। ভিয়েতনামে আমি ইউনিট কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছি, আমি সবসময় আপনারটাই পেতে চেয়েছি। তবে যেহেতু এটির শব্দ ও গুলির প্রক্ষেপণ এম-১৬ থেকে ভিন্ন, আমি একে-৪৭ হাতে নিইনি। কারণ আমার হাতের বন্দুকের ভিন্ন শব্দের কারণে আমার সৈনিকরা ভাববে আমাকে ভিয়েতনামের সৈন্যরা আক্রমণ করেছে। কাজেই আমি কেবল আপনার ওই মাস্টার পিসের ওপর চোখ মেলে তাকিয়ে রয়েছি।’

মোজাম্বিকের স্বাধীনতার ইতিহাস তাকে আনন্দিত করে। আবার জাতিগত দ্বন্দ্বে হত্যার জন্য ব্যবহূত কানাশনিকভ রাইফেল তাকে ব্যথিতও করে। তিনি স্পষ্ট করে আবার বলেন, আমার দেশকে রক্ষা করার জন্য আমি একে-৪৭ আবিষ্কার করেছিলাম। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দায় রাজনীতিবিদের। আমরা তিনজনই ইউজিন স্টোনার, উজিয়েল গল ও আমি ফ্যাসিস্টদের দমন করতে কাজ করেছি। কিন্তু এম-১৬-এর বুলেট হত্যা করে ভিয়েতনামিদের, যারা তাদের দেশকে একতাবদ্ধ করতে চেয়েছে। উজিয়েল বলেছেন, কালাশনিকভের রাইফেল দিয়ে কী হবে, প্যালেস্টাইনে শান্তির সম্ভাবনা তার কাছে অতি ক্ষীণ মনে হয়।

গুজব রটেছিল মিখাইল কালাশনিকভ মুসলমান হয়ে যাচ্ছেন। এটি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে চলে আসার সময় বিদায় নিচ্ছি। এমন সময় একজন সৌদি আরবীয় মেজর খুব আবেগভরা কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, কালাশনিকভ সাহেব কখনো কি আপনার ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা মনে হয়েছে? খ্রিস্টানদের চোখে আপনি পাপী। পৃথিবীতে হাজার হাজার মৃত্যুর দায় আপনার। কিন্তু ইসলাম ধর্মে পরিস্থিতিটি একেবারে ভিন্ন। কোনো রকম বিব্রত না হয়ে আমি বলেছিলাম, বিষয়টি আমি বিবেচনা করব। একই সঙ্গে একটি পুরনো রুশ প্রবচনও মনে করিয়ে দিয়েছি, বিশ্বাসের পরিবর্তন শার্ট পরিবর্তনের মতো এত সহজ নয়।’

বিশ্বজুড়ে এককালে পরিচিত কালাশনিকভ ব্যক্তিগতভাবে সাদাসিধে মানুষ, সেলিব্রিটি হাবভাব নেই, আগে যেমন ছিলেন, তেমনই রয়ে গেছেন। কেবল কাজ করে যাচ্ছেন। ‘যখন দেখি বিন লাদেনের হাতে একে-৪৭, আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার কী করার আছে! সন্ত্রাসীরা কেউ বোকা নয়, তারা শ্রেষ্ঠটাই বেছে নেয়।’

তিনি বলেন, মানুষের প্রয়োজন এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার বরং ভালো ছিল, যা কৃষকের কাজে লাগত, যেমন ঘাস কাটার যন্ত্র— লন মোয়ার।

অনুবাদ: ইবনে মোতালিব