রেজা কিন ব্রিজে উঠছিল। এ সময় তার হাঁটার ধরন ও গতি খেয়াল রাখার প্রয়োজন নেই। জীবনে অসংখ্যবার ব্রিজের এই দক্ষিণ দিক থেকে উঠেছে সে। এদিকটা দক্ষিণ সুরমা। সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়। মূল শহরের উল্টো দিক। এদিকে রেল স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড আর বিভিন্ন চালানি মালের আড়ত। গত কয়েক বছরে এ পাশে ব্যাংক, ছোট হাসপাতাল ও ক্লিনিক, ট্রাভেল এজেন্সির অফিসও বসেছে।
সকালে কি বিকালে অথবা সন্ধ্যায় কি রাতে হেঁটে কি কারো মোটরবাইকে রেজার এ ব্রিজ পার হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও গনগনে দুপুরে সে শেষবার ব্রিজের উপরে উঠেছে অনেক দিন আগে। আজো এ সময়ে ফেরা হতো না। ট্রাভেল এজেন্সির কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় প্রায় নির্ভার রেজা ধীর পায়ে ব্রিজে ওঠার আগে উপরে তাকিয়েছে। লোহার গড়নের কোথায় ব্রিজ নির্মাতা কোম্পানির নাম ও সাল লেখা আছে, সে জানে। কিন্তু এখন দেখতে পেল না। চোখে রোদ লাগছে। সঙ্গে সাইড ব্যাগ নেই, তাই ছাতাও নেই। যদিও এমন রোদের ভেতরে হঠাত্ মেঘে ছেয়ে যেতে পারে দক্ষিণ সুরমার আকাশ। তারপর কয়েক মিনিটের একপশলা বৃষ্টি। বৈশাখের শেষ দিকে আকাশের এ চালচরিত্রের খবর সে জানে। সকালে উত্তর আকাশে সামান্য মেঘ ছিল। সে ভেবেছিল, সে মেঘই থাকবে, দুপুরের পরপর একটু বৃষ্টি হতে পারে।
রেজার তো জানা ছিল, জানা আছেও, ওই উপরে কোন জায়গায় ব্রিজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা। তা না দেখে সে ভাবে, তাহলে উল্টো পাশে। এখন তার হাঁটার ভঙ্গিটা খেয়াল করা যেতে পারে। একটু আগের অস্পষ্ট উদাসী রেজা হঠাত্ দুদিকে অনায়াসে হাত ছড়িয়ে বেশ সহজ। যেন নিজের অন্যমনস্কতায় সে যে একটু ঠিলে স্বভাবের হয়ে উঠেছিল, তা কাটল। একটু আগে খালাতো ভাইয়ের জন্যে ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়েছিল। সেখানে তার যে তত্পরতা ও ভঙ্গি ছিল, তা ফিরিয়ে এনেছে। ব্রিজের ঢাল থেকে ওঠার মুখে সে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু তার আগে সে সমানে তাকায়। তাতে তার আনমনা ভাব কেটে যায়। ওপার থেকে লোকজন আসছে একটু কম। প্রায় সবাই ডান দিকের রেলিংঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওপারের সার্কিট হাউজের দিকে কী যেন দেখে!
এগিয়ে অন্তত একটা জুতসই পজিশন নেয়ার আগে রেজার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, সবাই কী দেখছে! তবু সে ব্রিজের পুব দিকের পাশঘেঁষে উঁকি দেয়। বাঁয়ে তাকায়। বাঁধাই করা পাড়ের একেবারে নিচের দিকে একটা মোটরবাইক পড়ে আছে। পাশে উপুড় হয়ে আছে একজন। তার মাথার কাছে আরেকজন তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে।
একবার রেজা এটুকু দেখে, বাকিটা অনুমান করার চেষ্টা করে। যদিও মূল পরিস্থিতির সে বুঝতে পারছে না কিছু। এ জায়গা থেকে এতটা দূরে সে কেন কী ঘটেছে ঠিকঠাক অনুমানেও আনতে পারছে না। রেজা মাথা ঘোরায়। নদীর তলদেশে তাকায়। ডানে-বাঁয়ে দেখে। তার পেছনের দিকেও অনেকে দাঁড়িয়ে, রেলিংঘেঁষে তার ডান ও বাঁয়ে দাঁড়িয়ে অগণিত। প্রত্যেকের সামনেই ব্রিজের কাঠামোর বিশাল বিশাল পাত, উপরের দিকে উঠে গেছে। নিচে শুকনো সুরমা। নদীর তলানিতে ক্ষীণধারার স্রোত। পুব থেকে পশ্চিমে পানি নেমে যাচ্ছে ধীরে। ব্রিজের এতটাই নিচে পানি যে, তার মনে হচ্ছে, অনেক অনেক উঁচুতে সে দাঁড়িয়ে আছে।
রেজা সরে আসে। তার পাশ থেকে দ্রুত একটা রিকশা নেমে গেল। রিকশাওয়ালা পেছন দিকে পা চালানো রেজাকে কিছু একটা বলে। তখন উল্টো দিক থেকে একজন রিকশাওয়ালাকে এ ভিড়ে এত জোরে কেন চালাচ্ছে, তার কি ব্রেক নেই— এ কথা ঝাঁজের সঙ্গে জানতে চায়। এসব রেজার কানের দুপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। আশপাশে কী ঘটছে, সেদিকে খেয়াল নেই। কারণ রেলিং থেকে সরে আসার সময় মোটরবাইকটার দিকে তাকিয়ে তার কেন যেন মনে হয়েছিল, ওটা কাহিরের। যদিও পরমুহূর্তে সে সন্দেহ খারিজ করে দেয়। সে সরে এসেছে। সামনে এগোবে।
রেজা ব্রিজের দক্ষিণ দিকের ঢালের সামান্যই উঠেছে। এরপর সমতল। অর্থাত্ মাঝখানের জায়গা। তারপর ওপারে নামার ঢাল। তা অনেক দীর্ঘ। সে সামনে হাঁটে। ডানের রেলিংয়ের গায়ে অসংখ্য মানুষ। সামনে থেকে একটা মোটরবাইক আসে। হিরো হোন্ডা। লাল রঙের। সে মোটরবাইক সম্পর্কে এর বেশি জানে না। চালাতেও পারে না। ওই মোটরবাইকের সঙ্গে কাহিরেরটার মিল আছে। একই রকম একটা মোটরবাইক নিচে পড়ে আছে। এমন মোটরবাইক এ শহরে কয়েকশ আছে। কিন্তু পাশ থেকে ধীরে যাওয়া মোটরবাইকের পেছনের ক্যারিয়ারে পেঁচানো লাল ইলাস্টিকের দড়ি দেখে রেজার মনে হয়, ও দুটো একই। নিচেরটাও তাই। ওটা কাহিরেরটা না তো? যদিও সঙ্গে সঙ্গে তা খারিজ করে দেয়, পেছনের ক্যারিয়ারে অমন ইলাস্টিকের দড়িও আছে কয়েকশ বাইকের। এটা বাইকের শহর। এত মোটরবাইক দেশের আর কোনো শহরে চলে না। খোদ রাজধানীতেও মনে হয় না। তাই নিচে নদীর পাড় বাঁধানো পাথরের ওপর একটা মোটরবাইক পড়ে থাকতে দেখে, সেটাই কাহিরের— এ ভাবনা সে উড়িয়ে দিতে চায়।
যদিও ভেতরে ভেতরে রেজা খানিকটা তালগোল পাকিয়েছে। নিচের মোটরবাইকের পাশের লোকটাকে সে মৃত ভাবছে। ভাবছে মানুষটা পড়েছে ওই মোটরবাইকের সঙ্গে। তাকে টেনে সরিয়ে দেখছে পাশেরজন। তার কাছে কাহিরের ফোন নম্বর আছে, কিন্তু সে কাহিরকে ফোন করছে না। আর এতদিন ধরে চলা, এ ব্রিজের দুই পাশের রেলিং দেখে তার একবারও মনে হচ্ছে না, এখানে অ্যাকসিডেন্ট হলে কারো মোটরবাইকসহ নিচে পড়ার কোনো সুযোগ আছে, যদি কেউ তুলে উঁচু করে ফেলে না দেয়।
হঠাত্ পরিস্থিতির চাপে রেজা খেইও হারিয়েছে খানিকটা। এটা তার পুরনো সমস্যা। যেকোনো পরিস্থিতিতে তার ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগে। এখন অন্তত একটা বিষয় সে খানিকটা স্থির করেছে, একপলক দেখায় সে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। আবার দেখতে হবে। ব্রিজের ওদিকটায় আরেকটু নিচে নেমে রেলিংয়ের পাশঘেঁষে দাঁড়ালে সে বুঝতে পারবে।
কাহিরকে ফোন করার জন্য রেজা ফোন হাতে নেয়। নেটওয়ার্ক বিজি। ফোনটা পকেটে রাখে। এগিয়ে যায়। এ পাশে কোথাও উঁকি দেয়ার মতো জায়গা ফাঁকা নেই। তবু এক-দুজনের গাঘেঁষে দাঁড়ায়, উঁকি দিয়ে দেখতে চেষ্টা করে। জুত করতে না পেরে আরো একটু সামনে এগিয়ে সে নিজেকে সার বাঁধা মানুষের ফাঁকে গলিয়ে দেয়। হুঁ, এবার দেখতে পাচ্ছে। এ জায়গা থেকে দূরত্বও কম। সে পাশেরজনের কাছে জানতে চাইল, ‘ভাই, কীতা হইচে?’ লোকটা জানে না। রেজা একটু উদ্বিগ্ন। এ মোটরবাইকটা মনে হয় কাহিরের। কিন্তু পাশে যে লোকটি পড়ে আছে, সে কাহিরের চেয়ে গায়ে পাতলা আর লম্বা। যদিও পরনে কাপড় প্রায় এক। কাহির সাদা শার্ট আর হালকা নীলচে জিন্সের প্যান্ট পরে ছিল। এ লোকটিও প্রায় তাই। পরনে সাদা শার্ট আর গাঢ় নীল জিন্সের প্যান্ট। কিন্তু কাহিরের চেয়ে লম্বা। অন্তত ৪০ ফুট ওপর থেকেও রেজা নিশ্চিত।
রেজা এবার দুজন মানুষের ফাঁক গলে সুবিধামতো দাঁড়াতে পারে। নিচে তাকায়। উপুড় লোকটাকে ধরে পাশের লোকটা টানছে। তুলতে চেষ্টা করছে। লোকটা তবু উপুড় হয়ে আছে। যে টানছে, হাত ধরে, মাথার দিকে, তার শরীরের চলন একটু অস্বাভাবিক। লোকটা বেশ দুর্বল। মোটরবাইকটা পড়ে থাকা লোকটার মাথার দিকে। সেটাও আহত, ঘাড় বেঁকে এক পাশে পড়ে আছে।
রেজা নিচ থেকে চোখ তুলে রেলিংয়ের এদিকে-ওদিকে তাকায়। নদীর উত্তর পাড়ে, ব্রিজের নিচে নদীর পাড় বেয়ে যে স্টিলের রেলিং, সেখানে সার দিয়ে মানুষ দাঁড়ানো। সবাই নিচে দেখছে। ওই জায়গায় মাত্র দুজন মানুষ। কেউ নেমে আহত অথবা নিহত লোকটাকে উদ্ধার করছে না। রেজা এসব ভাবতেই তার থেকে দুজনের পরে একজন বেশ উঁচু গলায় বলে, অ্যাক্টিং শুরু হইচে, অ্যাক্টিং! বলেই লোকটা সরে যায়।
রেজা অবাক! চোখ একটু বড় হয় তার। কানও যেন খাড়া। কী বলল লোকটা? কথাটা সে আবার শুনতে চায়। এতদিন এতবার এ ব্রিজ হেঁটে পার হয়েছে সে, কোনোদিন ব্রিজের নিচে এমন অ্যাক্টিং দেখেনি। বর্ষায় নদী প্রায় কানায় কানায় ভরা থাকে, তখন বছরের প্রায় সাত-আট মাস পাড় এমন উদোম হয়ে থাকে না। তখন এ দৃশ্য দেখা অসম্ভব। বাকি সময়ে কখনো এমন কিছু দেখেনি। রেজা ভাবে, কোনো নাট্যদল নদীতীরে নাটক করছে? এ সময়ে? না, দুপুরবেলা নাটক করার সময় নয়।
রেজা লোকটাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে চায়। অথচ সে নেমে গেছে। রেজা বিড়বিড় করে, ‘কী কয়, ইতা কীতা নাটক-ওটক করার সময় নি বা!’ অস্ফুট পাশের লোকটিকে শুনিয়ে। সে লোকটিও রেজার কথার উত্তর দেয় একইভাবে নিচে তাকিয়ে, ‘ওই ঠেলাঅলা পাবলিকের কতা শুনোইন কেনে? অরা তো কততা অ উ কইব (কত কিছু বলবে)।’ রেজা চলে যাওয়া লোকটার পেছনের দিকে দেখে। সম্ভবত একটা রিকশা ঠেলে তুলতে ব্রিজের মাঝখানের সমতল জায়গা পর্যন্ত উঠেছিল। অথবা ওপার থেকে এসে এপারে নেমে যাচ্ছে।
রেজা এতক্ষণে নিশ্চিত, নিচে পড়ে থাকা লোকটা কাহির নয়। পাশের কথা শোনার ফাঁকে সে নিচে তাকিয়ে বিভিন্নভাবে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছিল, সে চেষ্টায় সফল। নিশ্চিত হতে পেরেছে। পাশের দুর্বল লোকটি একবার তাকে টেনে একটু ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করলে সে বুঝেছে, ওই দীর্ঘ হাত কোনোভাবেই কাহিরের হতে পারে না। তাছাড়া এই আধঘণ্টা আগে দেখা মানুষটার পরনের প্যান্ট এভাবে বদলে গেল। হতে পারে না।
রেজা ট্রাভেল এজেন্সি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ওপাশে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে দাঁড়িয়ে রেল স্টেশনের উল্টো দিকে নেসারের সঙ্গে দেখা করতে যাবে কিনা ভাবছিল। নেসার ওখানে আছে। বিজিত আসবে। সেজন্য ফোন বের করেছে। নেসার বা বিজিতকে ফোন করবে। ঠিক সে সময় ওই এটিএমের ভেতর থেকে কাহির বের হলো। রেজা অবাক। এখানে কাহির?
কাহির জানাল, অফিসের কাজে। এখানের এক আড়তদার টাকা দেবে অফিসকে। সেই টাকা নিয়ে যাবে ব্রিজের ওপারের এবি ব্যাংকে। সেখানে টাকা দিয়ে যাবে অফিসে, তালতলায়। অর্থাত্ কাহিরের কাজ এখন ব্রিজের এপার থেকে ওপারে যাওয়া। তালতলাও কাছেই। এজন্য তার মোটরবাইক না হলেও চলে। কিন্তু তাতে কাজ দ্রুত হবে। অফিস একটু বাদে তাকে আম্বরখানায়ও পাঠাতে পারে। তাছাড়া মোটরবাইক একবার যার সঙ্গী হয়, সে পারে তো থুথু ফেলতেও ওটা সঙ্গে নিয়ে যায়। রেজা এ কথা কাহিরকে বলেছেও। কাহির অনেকদিন ধরে রেজাকে বলছে, সে কেন একটা কেনে না। রেজা কিনবে না। তার মধ্যপ্রদেশ বাড়ন্ত! এরপর মোটরবাইক হলে হাঁটা বন্ধ হবে, শরীর তখন আর কন্ট্রোলে থাকবে না। এ নিয়ে কাহির হেসেছে, এ বয়সেই রেজা একটু ফুলে গেছে। তবু কাহিরের গোঁ যায়নি। আজো তাই ছিল, এমনকি কাহির তাকে মোটরবাইকটা কেনার জন্যও বলেছে। এতে রেজা অবাক হয়ে কাহিরের মুখে তাকায়। কাহির তখন বাইকটার ওপর বসা। রেজা বাইকটাও দেখে। কাহির জানায়, তার লন্ডনি বড়ভাই বলেছে, এ বাইকে যা দাম পাবি, তার সঙ্গে বাকিটা লাগিয়ে তাকে ডিস্ক ব্রেকের হোন্ডা সিবি ট্রিগার কিনে দেবে। সে রেজা কিনলে অন্তত ১০ হাজার কমে ছাড়বে। রেজা হেসেছিল। তখন বাইকের মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে যেতে কাহির বলেছে, ‘যাই বস, কাম আছে। মনে রাখোইন যেন।’ রেজা হাসতে হাসতে বলেছে, ‘ইতা কইও না, আমার ই প্যাট কমত নায় নি।’
কাহির ব্রিজে উঠে গেল। রেজা তখন এটিএম বুথের সামনে দাঁড়িয়ে। নেসারকে ফোন করল। সে আর বিজিত বেরিয়ে গেছে। এখন নয়াব্রিজের ওপর। লালবাজার আসছে। রেজা ওখানেই আসুক। রেজার মন খারাপ হলো একটু। সে কাহিরের সঙ্গে কথা বলার সময় নেসারকে ফোন করলে কাহিরের সঙ্গেই যেতে পারত। যাক, এটুকু পথ। ব্রিজ পার হয়ে সামনে ডানে জেলা পরিষদ, তার পরই লালবাজার।
রেজা ব্রিজে উঠেছিল। আনমনে। এসব ভাবতে ভাবতে। একাকী আর নিঃসঙ্গ। এ মুহূর্তে তার কোনো কাজ নেই। হাত দুটো দুপাশে দুলিয়ে সে যেভাবে হাঁটে, পেটটা একটু সামনে, ব্রিজের উপরের দিকে উঠতে দেখলে মনে হবে তার একটু কষ্টই হচ্ছে, সেই ভঙ্গিতে চকিতে ডান দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, ব্রিজের ওপর দিয়ে চলা সব মানুষ ডান দিকে ঝুঁকে আছে। যদিও এর ভেতরে যারা রিকশায় এপার-ওপার হচ্ছে, পেছনে ঠেলাওয়ালাসহ রিকশায় বসা সেই সওয়ারি এপার থেকে গেলে ডান দিকে, ওপার থেকে এলে বাম দিকে দেখছিল। তারা ঠিক দেখতে পারছিল না, বুঝতেও পারছিল না, কী ঘটেছে। রেজা আনমনা স্বভাবের কারণে অথবা নেসার আর বিজিতের সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কারো কাছে জানতেও চায়নি, কী ঘটেছে।
এইমাত্র পাশের লোকটিই তাকে তা জানায়, যদিও তাকে নয়, ওই লোক কথাটা বলছে তার সঙ্গের লোকটাকে, ‘ব্রিজের উপর দিয়া মোটরসাইকেল শুদ্ধা ফালাই দিচে!’
‘কীতা কও!’
‘হয়। ওউটা ওউতো হুনলাম। ওউ ব্যাটা কইল।’
রেজা সচকিত। জানার জন্য উদগ্রীব! ঘটনা কী?
নিচের লোকটা সত্যি কাহির না তো? তা-ইবা কী করে হয়?
রেজা ওই লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাই, কীতা হইচে?’
লোকটার চোখ ব্রিজের নিচে। তাই স্বাভাবিক। রেজার জিজ্ঞাসায় ফিরল না। এমনকি সে আগের দুজনের চেয়ে বেশি জানেও না। অথবা যা জানে বলেছে। এ নিয়ে নতুন কিছু আর বলার নেই। তারা দুজনই দর্শক। রেজা লোকটার দিকে আরেকবার অসহায় করুণ চোখে তাকায়। আবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, হ্যাঁ, সঙ্গে সঙ্গেই নিচে তাকায়, শুয়ে থাকা ওই লোকটা কাহির নয়, এই এখন তার পাশের লোকটি ওই শরীরটাকে আবারো উল্টানোর চেষ্টা করলে সে নিশ্চিত হয়।
রেজা দেখে, এত উঁচু থেকে ফেলে দেয়ার পরও মুখ ও মাথা অবিকৃত। কিছুই থেতলে যায়নি। তবে যে দুর্বল শরীরের লোকটি তাকে উল্টানোর চেষ্টা করছে, লোকটির ডান হাত ধরে, সে হাতটা প্রায় উল্টে গেছে মনে হচ্ছে। মোটরবাইকের উপরে থাকা অবস্থায় পড়েছে, তাহলে কোমরের হাড় ভাঙা সারা। কোমরের হাড়! মানুষটাই বেঁচে নেই, তার আবার কোমরের হাড়! আচ্ছা, আছে কি নেই, পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা লোকগুলোর কেউ নেমে লোকটাকে হাসপাতালে নেয় না কেন? এটা কি সার্কাস! নাকি কেউ ফোনে অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছে। তাই ভালো। ব্রিজের গোড়ায় দুই পারেই পুলিশ থাকে সবসময়, এখন তারা কই। যা-ই হোক, রেজা ভাবে, লোকটাকে হাসপাতালে নেয়া দরকার। সে এখানে আর দাঁড়াবে না। নিচের দিকে যাবে। পুলিশকে বলবে।
এ সময় রেজার ডান দিকের দুজনের পরে চিকন শরীরের লম্বা লোকটি বলে, ‘অ্যাক্টিং ভালাউ শুরু হইছে!’
অ্যাক্টিং। কিসের নাটক। কথাটা এ নিয়ে দ্বিতীয়বার শুনল। আগেরবার ভেবেছিল, হয়তো কোনো নাটকের দলের কাজ।
লোকটি বলে চলে, ‘যারে ফেলাইছোন তার খোঁজ নাই, আরেকজন পড়া মানুষ হাইজে (সেজেছে)!’
আরেকজন সেজেছে?
রেজা নিচ থেকে মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু তার কথার পরের অংশ শুনে রেলিংয়ের পাশ থেকে সরে আসে। তার পেছনে প্রায় গাঘেঁষে দাঁড়ানো একজনকে সরিয়ে এগিয়ে যায় ওই লোকটির কাছে।
তারপর যা জানে: কিছুক্ষণ আগে একজন মোটরবাইকে যাচ্ছিল। তাকে এখানে ঘিরে ধরেছিল তিনজনে। সব ছিনতাইকারী (রেজা ভাবে, এই দুপুরে এত লোকের ভেতরে ছিনতাই!)। ব্রিজের উপরের মানুষজন ভেবেছে, মনে হয় মারামারি। আসলে তা নয়। একজনকে তিনজনে মারছিল। তার কাছে ছিল টাকা। ওরা জানত। লোকটা টাকা দেবে না। ওরা নেবে। এ নিয়ে প্রায় মারামারির মতো হতে হতে ওই দলে আরো দুজন এসে তাকে মোটরবাইকে বসা অবস্থায় নিচে ফেলে দেয়। ব্রিজের রেলিংয়ের একেবারে কাছে এনে ফেলার সময় একজন তার প্যান্টের পকেট থেকে ১ লাখ টাকার বান্ডিলটা নিয়ে নেয়।
আচ্ছা, এ পর্যন্ত জানা গেল। এর সঙ্গে অ্যাক্টিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এ একেবারে ছিনতাই।
ওই লোকটি কাহির নয়। কাহিরের সঙ্গেও ওই কাজ করতে পারত। এমনকি যদি ওই মোটরসাইকেলে রেজা থাকত। ফেলে দিতে পারত তাকেও।
এ সময় আগের নিচের উদ্ধারকারী লোকটির কোনো একটা ভঙ্গি দেখে সবাই হইহই করে উঠল রেজাও তাকায়। দেখতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। তবু দেখা যায়। সেই দুর্বল লোকটা ঘাড় মটকে কাত হয়ে থাকা মোটরবাইকটার ওপর বসেছে। হ্যান্ডেল না ধরেই যেন চালাচ্ছে, এমন ভঙ্গি করছে।
এখান থেকে শোনা যাচ্ছে না। হয়তো মুখে ঘো-ঘো ভুম-ভুম ঘোত্-ঘোত্ ধ্বনিও তুলছে। তাহলে এ নিয়ে অ্যাক্টিং। একটা মৃত মানুষের শরীরের পাশে। ওই লোকটা সেই ছিনতাইকারীদের কেউ। এ কি কোনো খেলা। এতক্ষণ এ ব্যস্ত মহানগরীতে বিখ্যাত এক ব্রিজের নিচে সার্কিট হাউজের সামনে এমন দৃশ্য সম্ভব!
রেজা বিড়বিড় করে, মানুষ সব অমানুষ। পাবলিক পারেও। সে আর দেখবে না। নিচে যাবে। যদিও এ মুহূর্তগুলোয় এই দেখার সময় ভেতরে ভেতরে তার এক অদ্ভুত অবস্থা! সে শুয়ে থাকা লোকটির জায়গায় কাহিরকে দেখে, এমনকি সেখানে নিজেকেও। হতেও পারত। ওরা তো জানতে পারত, কাহিরের কাছেও টাকা আছে। ওপারের আড়ত থেকে এই একটু আগে নিয়েছে। সে টাকাসহ প্রায় ব্রিজের গোড়ায় এটিএম বুথের সামনে তার সঙ্গে কথাও বলেছে। কিন্তু এই কটা টাকা। এমন টাকা আজকাল অনেকের পকেটেই থাকে।
তখন সেই লোকটি আরো যা জানায়, কেন অ্যাক্টিং মনে হচ্ছে না? যে লোকটাকে ফেলেছিল, সে তো মনে হয় মরেছে। তাকে ফেলার পরপর ওই ছিনতাইকারীরা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। আর সেই লোকটাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। যেভাবে পড়েছে, মাথা তো শেষ। তারপর এই নিচের হেরোইনখোররা এ লোকটার পড়ার জায়গায় একজন শুয়ে অ্যাক্টিং করছে। ওই যে পাশে আসল পড়া লোকটার রক্ত।
রেজা পাশের লোকটার কাছে জানতে চায়, ‘অ্যাক্টিং করে কেনে?’
‘আরে বাই কীতা কউন! ব্রিজভর্তি ওই হেরোইনখোর লোক। অ্যাক্টিং দেখায়া যদি পকেট মারা যায়।’
এদিকে রক্ত শোনার পর রেজার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। বুকে জল নেই। গলা শুকায়। কী বলে? তাহলে যাকে ফেলেছে, সে কাহির হতে পারে। কাহিরই। আর কেউ না। সে চেহারার বর্ণনা জিজ্ঞাসা করে। আশপাশে কেউ বলতে পারে না। তবে একজন জানায়, সাদা শার্ট ছিল। নিচেও তো সাদা শার্টেরই একজন!
তাহলে, রেজা ভাবে, কাহির... এই যে কাহির চলে এল তার কাছ থেকে। ওই মোটরবাইকটাই। রেজা কাহিরকে ফোন করার জন্য প্যান্টের পকেটে হাত দেয়। মোবাইলটা নেই!






