১৮৪০ সালে নড়াইলের জমিদার কালী পোদ্দার তার আদরিণী মা যশোদা দেবীর গঙ্গাস্নানের অভিলাষ পূরণ করতে যশোরের মুড়লি থেকে কলকাতার কালীঘাট অবধি রাস্তা নির্মাণ করিয়েছিলেন, মায়ের গায়ে ছায়া লাগবে, সেই আশায় রাস্তার দুই ধারে লাগিয়েছিলেন দ্রুতবর্ধনশীল নানা জাতের গাছ। যশোর রোডের দুই পাশের গাছগুলো প্রায় ১৭০ বছরের পুরনো। এসব গাছের ক্যানপির নিচ দিয়েই ১৯৭১ সালে গেছে মৃত্যুপীড়িত লাখ লাখ শরণার্থীর মিছিল, বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে, ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর কথা মনে পড়েছে বারংবার, মনে পড়ছিল গাছগুলোর সঙ্গে অনেক ব্যক্তিগত লেনাদেনার কথা।

শৈশবে তেতলার বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে একটি গাছের গাঢ় কমলারঙা পাতা চিবিয়ে খেতাম আমি, সেই গাছের নাম জলপাই। এভাবে আরো একটি গাছের পাতা তার নিবিড় কমলা রঙ ঢুকিয়ে দিয়েছিল আমার চোখের কণিকায়। পেকে উঠলে পলাশ ফুলের মতো কমলা হয়ে ওঠে এসব গাছের পাতা। আমাদের আঁকবার খাতায় খুব জনপ্রিয় ছিল কলাগাছ, দোচালা বা চৌচালা ঘর এঁকে হাতপাখার মতন কলাগাছ পেছনে জুড়ে দিলেই হয়ে গেল গ্রামের দৃশ্য। তারপর একদিন পড়ে ফেললাম এমন একটি জাদু-গাছের কথা, যার কাছে যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যায়। নাম কল্পতরু বা কল্পদ্রুম। সচিত্র মহাভারতের গল্পগুলোয় ঋষিবালক আর ব্রহ্মচারীরা মিলে পরিচর্যা করছে আশ্রমের গাছ— ‘বালক-তরুর দল’, কিংবা গাছের ডালে শুকাচ্ছে তাদের ভেজা বল্কল। তারপর একদিন ইংরেজিতে ‘ট্রি অ্যাট মাই উইন্ডো’ পড়া, আর পড়া তার অপরূপ বাংলা ভাবানুবাদ ‘বাতায়নপাশে গুবাক তরুর সারি’, খুঁজো না তাহারে গগন আঁধারে মাটিতে পেলে না যাকে... এই লাইনে শরবিদ্ধ হয়ে যাওয়া। একদিন অভিমানের ভাষা খুঁজে পাওয়া ‘বিদায়-অভিশাপ’-এ দেবযানীর স্বরে—

‘সুন্দরী অরণ্যভূমি সহস্র বত্সর

দিয়েছে বল্লভ ছায়া পল্লব মর্মর,

শুনায়েছে বিহঙ্গ কূজন তারে আজি

এতই সহজে ছেড়ে যাবে? তরুরাজি

ম্লান হয়ে আছে যেন, হেরো আজিকার

বনচ্ছায়া গাঢ়তর শোকে অন্ধকার...’

এসবের ভেতরে আরো কত ছোট ছোট ঘটনা ঘটে গেছে গাছপালাকে কেন্দ্র করে। এই যেমন ছাদের আলসেয় গজিয়ে ওঠা নয়নতারার চারাটিকে তুলে এনে দইয়ের ভাঁড়ে পুঁতেছি, নয়নতারা ফুলের রঙ মাগরিবের আকাশের মতন বেগুনি। যেহেতু ‘পরিবেশ পরিচিতি’ বইখানা শিখিয়েছে গাছ মাটি থেকে খনিজ লবণ আর পানিযোগে নিজের আহার নিজেই তৈরি করে, আমার সকাতর মন বলল, আরেকটু সাহায্য করি, আমার প্রিয় নয়নতারাকে একটু বেশি করে খেতে দিই। সৈন্ধব লবণ ছাড়া তো বাড়িতে আর লবণ নেই, দিলাম ঢেলে তার কিছুটা আমার প্রিয় গাছের গোড়ায়। একদিনে মরে গেল চারাগাছটা। নাগরিক শিশু ধানগাছে তক্তা হয় কিনা জানে না, বিশাল একখানা বটগাছের ঝুরির মতন করে আখ নেমে আসে কিনা আখগাছ থেকে তাও জানে না, তার হাতে সন্ধ্যা আকাশরঙা নয়নতারার লবণসমাধি ঘটল, উভয়ার্থে, মানে চোখের নোনা জলও যোগ হয়েছিল তাতে। বিকেলে খেলতে গিয়ে মাটি খুঁড়ে মোরগজবা ফুলের কালো কালো বীজ পুঁতে দিতাম, গাছ গজাত।

এক টুকরো গেওয়া কাঠ থেকে ঘষে ঘষে পেন্সিল বানানোর চেষ্টা করত আমাদের নির্মলদা, ওর হয়তো ধারণা হয়ে থাকবে, কাঠের টুকরো ঘষতে ঘষতেই ভেতর থেকে পেন্সিলের শিষ বের হয়ে আসবে।

তখনকার বিটিভিতে ‘মাটি ও মানুষ’ বেশ প্রসিদ্ধ অনুষ্ঠান, সেখানে দেখে দেখে কাজি পেয়ারার চাষ করছে নানী, এত আদরে যে আমরা ঠাট্টা করে পেয়ারাগাছগুলোকে কাজিমামা ডাকি, কাকে ঠোকরাবে বলে পুরনো শাড়ি দিয়ে ঢাকা গাছ। ছাদে আরো ছিল থানকুনি, বাসক, আনারস, পেঁপে, ঝিঙে, ধনেপাতা, লালশাক, পুঁইশাক, লাউশাক।

স্কুলের কথা মনে পড়লেই আমার মনে পড়ে বিশাল দেবদারুবীথি, মেহগনি-সেগুন-আম-কাঁঠাল-বকুলের প্রগাঢ় ছায়া। প্রকাণ্ড মেঘশিরীষ গাছের ছায়া যেন কুরুশকাটায় বোনা লেসের মতন বিছিয়ে থাকত আমাদের খেলার মাঠে। পাঁচ-ছয়জন মিলেও বেড় দিতে পারতাম না গাছগুলোর কাণ্ড। আর ছিল ক্যানাফুলের কেয়ারি, রাস্না ঝোলানো বেগনি ফুলের গাছ, ছিল লাল লাল ফল ভরা কুঁচফলের গাছ। ক্যাথলিক স্কুলের চিরকুমারীরা যত দেশে যেতেন, হাতে করে নিয়ে আসতেন রকমারি গাছ, দক্ষিণ আফ্রিকার গাছ, ক্যারিবীয় গাছ, মেক্সিকো কিংবা ব্রাজিলের গাছ। কলেজে ছাতিমফুলের মদির গন্ধ, শিশুগাছের ছায়া, কেয়াগাছের কাঁটালো বিশাল ঝোপ। টবে শতমূলী আর ইঞ্চিলতা। সর্বজয়ার সারি। একসময় এ মেয়ে স্কুলের চৌহদ্দিতে ছিল কেবল কাঁটাঝোপের বেড়া।

ভারী বিশ্বাসের আবহাওয়া ছিল নিশ্চয়ই। বড় যত্নে আমাদের পড়ানো হয়েছিল গ্রিনহাউজ ইফেক্টের কথা, বনায়ন ধ্বংস করে নিজের এবং নিজ সন্তানের মুখে বিষবড়ি তুলে দেয়ার দীর্ঘ ইতিহাসের কথা, ওজোন স্তরে ফুটো হওয়ার কথা, অ্যাসিড-বৃষ্টি হওয়ার কথা। এসব শুনতে শুনতে রীতিমতো কান্না এসে যেত আমাদের চোখে, মাতা-ধরিত্রীর প্রতি স্নেহে-করুণায়-দায়িত্ববান ভালোবাসায় কত কী প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মনে মনে, সুগন্ধি মাখব না, ফ্রিজ ব্যবহার করব না, এয়ারকুলার তো নয়ই— বেনাঘাস ভিজিয়ে পর্দা বানিয়ে দক্ষিণের জানালায় মেলে দিলেই হবে ইত্যাদি।

টিএসসির মোড়ের সুবিপুল গাছগুলোর নাম গগনশিরীষ, শিখিয়েছিলেন দ্বিজেন কাকা (দ্বিজেন শর্মা)। গাছ নিজেই তদ্দিনে চিহ্ন। স্মৃতিসৌধের নীলগিরি গাছগুলোর শাদা বাকলে কত লোকে কাঁটাকম্পাসে খোদাই করে লিখে গেছে ‘শাহানা + ইলিয়াছ’... সেই দাগ উঠে গেছে ২০ ফুট ওপরে, সেই শাহানা আর সেই ইলিয়াছ কি এখনো হাত ধরাধরি করে গাছের ছায়ায় মাখে উদ্বৃত্ত ভালোবাসা?

মিরপুর রোডের সড়কবিভক্তির উচ্ছল গাছগুলো অনেকবার দিনযাপনের বেদম গ্লানি মোচন করেছে মনে আছে, তেমনি মনে আছে তখনো আধাশহুরে মিরপুরের সেসব তালগাছের সারির কথা আর মাদারফুলের বেড়ার কথা। তখনো প্রচুর কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু ফুটত বসন্ত আর শরতে।

আরবান প্ল্যানিং আর আরবান ডিজাইনের ক্লাসে শহর আর সবুজের দ্বন্দ্ব নিয়ে, সমাধান নিয়ে অনেক কথা বলাবলি হতো, সবুজহীন নগরে বেড়ে ওঠার কুফল, নাগরিক দারিদ্র্যের ক্রূর রূপ, গ্রামীণ দারিদ্র্যের ওপর ঘেরাটোপের মতন তবুও আছে ছায়া সুনিবিড় মায়া— লজ্জা নিবারণের ডুমুর পাতার মতন। তখনো সুন্দরবনের দিকে কোনো সরকার হাত বাড়াতে পারে, তা আমাদের অসাধ্য ছিল ভাবা। পুরো ভূপৃষ্ঠ শান বাঁধানো চত্বর করে দিয়ে আর প্লাজা নাম দিয়ে ঢেকে দিয়ে, সব জলাভূমি অধিগ্রহণ করে পরবর্তীতে ছাদ-বাগানের আদিখ্যেতা দেখানোর সেই শুরু কেবল, অবিশ্বাস্য গতিতে শহুরে বা গ্রামীণ যাবতীয় শ্যামলিমা গলাধঃকরণের শুরু। এমন একটি রাষ্ট্র এবং সমাজ আমরা আমাদের সন্তানদের সামনে উপস্থিত করে চলেছি, যেখানে মুনাফা ছাড়া আর কিছুই প্রয়োজনীয় নয়। যেখানে অঢেল টাকা থাকাটাই শেষ কথা, যেনতেন প্রকারেণ, বাকি আর সব ভাবালুতা। নিজের বাড়ির গাছ যথেচ্ছ কাটা দিয়ে শুরু, নিজের দেশের গাছ যদৃচ্ছাক্রমে কাটা দিয়েই এর শেষ দৃশ্য রচিত হবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে!

বাঘ এসে জনপদে মানুষ শিকার করেছে বলে এখন সাব্যস্ত হতে পারে গুলি করে সব বাঘ মেরে ফেলার কথা আর সুন্দরবন মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার কথা। গাছগুলো মৃত এবং বিপজ্জনক কিনা, এই সমীক্ষায় না গিয়ে শুধুই সড়কের পাশে প্রাচীন গাছের ডাল ঝড়ে পড়ে যেতে পারে বলে দিয়ে গাছগুলো কেটে ফেলার পক্ষে যুক্তি দেয়া যেতে পারে। হায়, কত অনায়াসে! প্রকৃতির প্রতি, গাছপালার প্রতি, জলাভূমি এবং তৃণভূমির প্রতি সেনসিটিভিটি ছাড়াই কয়েকটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, এদের হাত থেকে আমাদের এ ছোট্ট দেশের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের নিষ্কৃতি নেই। শতবর্ষী গাছ কেটে চারাগাছ লাগালেই যে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে না, তা মূর্খদের কে বোঝাবে! ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট চাইলেই গজানো যায় না, অরণ্য বিলোপ করার সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব রয়েছে, ঘূর্ণিঝড় যখন ধেয়ে আসবে উপকূলবর্তী গ্রামগুলোয়, তখন দেয়াল তুলে সেই ঝড় দমানো যাবে না, কল্যাণীয়া সুন্দরবনকেই দরকার হবে ঝড়ের তীব্রতা রোধে, দরকার হবে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঝোপ, প্রতিটি জীবকে, যাদের সঙ্গে মানুষের জীবন এবং তার অস্তিত্ব কোনো না কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। পরিবেশবাদীদের বিলাপ ছাড়া এসব কথা আর কিছু মনে হয় না।