উত্তরবঙ্গের বিস্তৃত ভূগোলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পাঁকে উন্মূল ক’জন ব্যক্তিমানুষের গল্প লিখেছেন শওকত আলী তার উপন্যাস ‘উত্তরের খেপ (১৯৯২)’-এ। আমরা জানি, যমুনা নদীর পশ্চিম এবং পদ্মা নদীর উত্তরে অবস্থিত বিশাল এলাকা ‘উত্তরবঙ্গ’ হিসেবে পরিচিত। এখানে নদী ভাঙে অপরিণামদর্শিতায়, খরায় পুড়ে যায় জমিন, প্রচণ্ড তাপে ঘূর্ণিঝড় ওঠে, নদীর বুক থেকে হঠাত্ জাগে হাতিশুরা, আদিগন্ত ফসলের মাঠে অসীম শূন্যতা খেলা করে, ক্লান্ত দুপুরে ডেকে ওঠে উদাস ঘুঘু, ‘গাংচিলের চিত্কার কুয়াশার পর্দা ফুঁড়ে বেরোয়’। এর আগেও শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন (১৯৮৪)’ উপন্যাসে আমরা উত্তরের এই বিশাল জনপদের প্রান্তিক মানুষদের গল্প পেয়েছি। এখন থেকে প্রায় ৮০০-৯০০ বছর আগের ইতিহাস আশ্রয় করে লেখা হয়েছিল ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’। তখন বাংলায় বিচ্ছিন্নভাবে আরবীয় বণিকরা আসছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে। তার কিছুদিন পর বাংলা আক্রমণ করবে তুর্কিরা, তারা ছিন্নভিন্ন করে দেবে উত্তর জনপদ এবং অত্যাচারী শাসক সেন রাজবংশ রণে ভঙ্গ দেবে। সেই একই ভূখণ্ডের প্রাকৃতজনদের শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার গল্প, তত্পরবর্তী যন্ত্রণা এবং তাদের টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প ‘উত্তরের খেপ’ উপন্যাসে আবারো আমাদের শোনালেন শওকত আলী। তবে এবার প্রেক্ষাপট সমসাময়িক— ১৯৪৭-এর দেশভাগ, দেশভাগের যন্ত্রণা, বাঙালির জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা। এ প্রেক্ষাপটে উত্তর জনপদের ক’জন উন্মূল, পরাজিত মানুষের অনিঃশেষ ব্যক্তিগত যাত্রার গল্প ‘উত্তরের খেপ’।
উত্তরবঙ্গের মূলত সৈয়দপুর ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে ‘উত্তরের খেপ’-এ কাজ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের এ এলাকাটা গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থে যে, সীমান্তবর্তিতার কারণে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মস্ত বড় অভিঘাতটা এখানেই এসে লেগেছিল। বিহার, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, মালদা প্রভৃতি এলাকা থেকে পূর্ব পকিস্তান নামের তত্কালীন ভিন্ন এক ভূখণ্ডে বিহারি ও বাঙালি মুসলমানদের মস্ত বড় একটা অভিবাসন ঘটে। এমন অভিবাসনের পেছনের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল ধর্মীয় উন্মাদনা। এ কথা সবার জানা। নিজের জীবনের মূল্যে যারা এই ওলটপালট প্রত্যক্ষ করেছেন তারা জানেন যে, জন্মভূমি থেকে একবার উন্মূল হয়ে পড়লে মানুষের জীবন ভেসে যায় কোথায়, তা সে নিজেও আর বুঝতে পারে না। তবু বেঁচে থাকার সংগ্রাম অব্যাহত থাকে এ কারণে যে, মানুষকে একটা আশ্রয় খুঁজে নিতে হয়, ব্যবস্থা করতে হয় রুটিরুজির। তার পরের সংগ্রামটা হয় নিজের সঙ্গে নিজেরই— নতুন এক ভূখণ্ডে আমার শিকড় গজাবে তো? যে শিকড় একবার ছিঁড়ে যায়, মানে ভণ্ড রাজনীতি যখন তা উপড়ে ফেলে, সেই শিকড় আর গজায় কোথাও? গজায় না, তবে চেষ্টা তো থাকেই।
এমন এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আলী ট্রাক চালায় ঢাকা থেকে সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি রুটে। দিনাজপুর শহরে পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে আজকের যুবক হায়দার আলীর জন্ম হয়েছিল। ব্যক্তিগত কিছু কারণে দিনাজপুর শহর ছেড়ে এসে সে ঢাকাতেই এখন থাকছে প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে। পাকচক্রে একদা তাকে মালসামানা নিয়ে তার স্মৃতির এলাকা উত্তরবঙ্গে যেতে হয়। সময়টা হবে আশির দশকের মাঝামাঝি। আরিচা পার হয়ে (তখনো যমুনা ব্রিজ তৈরি হয়নি) তার ট্রাক ছুটছে। সঙ্গে তার হেল্পার গফুর। ট্রাক পার হচ্ছে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সর্বশেষে দিনাজপুরে থামছে তার ট্রাকটা। এই সুদীর্ঘ যাত্রার ভেতর দিয়ে আমাদের হায়দার আলী স্মৃতি রোমন্থন করছে। সে না চাইলেও তাকে স্মৃতিরা টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূর-অতীতে— ব্যাপারটা এমন। পেশাগত কারণে উত্তরবঙ্গে তার এই যাত্রা (খেপ) সংঘটিত হলেও শিকড়ে ফিরে যাওয়ার তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না-থাকলেও, স্মৃতিরা দোলা দিয়ে যাচ্ছে তাকে। গল্পটা এভাবেই শুরু।
এবার আমরা হায়দার আলীর পরিবারের ইতিবৃত্ত জানতে পারি। তার পিতামহ সৈয়দপুরে এসেছিলেন জলপাইগুড়ি থেকে, আসানসোল থেকে মাতামহ। বিহারি না হলেও পহেলা তাদের সৈয়দপুরের বিহারি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য তখন এই দুই পরিবারের ভেতরে কোনো পরিচয় ছিল না। দুই পরিবারই পৃথক পৃথকভাবে কালক্রমে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসে এবং সৈয়দপুর-দিনাজপুর এলাকায় স্থির হতে চেষ্টা করে তারা। কিন্তু নতুন পরিবেশে ব্যবসাপাতি গড়ে তোলা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! হায়দার আলীর পিতামহ দিনাজপুর শহরে ট্রাকের ব্যবসা চালু করতে চেষ্টা করে আর তার মাতামহ রংপুর শহরে সওদাপাতির দোকান গড়ে তোলার কাজে হাত দেয়। এগুলো চেষ্টামাত্র— প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো রকমে ঢোকার চেষ্টা। বাজারে টিকে থাকার ব্যাপারটা তো আরো বড়! তাই অর্থকষ্টই নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়ায় এই দুই পরিবারের ক্ষেত্রেই। এরই মাঝে পাকচক্রে হায়দার আলীর পিতা সবদর আলী আর তার মাতা নিশাত বানু পরিণয়ে আবদ্ধ হয়। নিজেরা শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও তারা তাদের সন্তান হায়দার আলীকে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে পারে শেষ পর্যন্ত। হায়দার আলী যখন কলেজে ভর্তি হয় তখন ১৯৭০-এর নির্বাচন চলছে। সে কলেজ পর্যায়ে থাকতে থাকতেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং সে গেরিলা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। এদিকটা থেকে বলা যায় যে, এই অভিবাসী পরিবারটির দ্বিতীয় পুরুষ অর্থাত্ হায়দার আলী কোনো না কোনোভাবে পূর্ব পাকিস্তান নামের নতুন ভূখণ্ডটায় আত্মীকৃত হয়েছিল। তা না হলে সে বাঙালির জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতো না কোনোক্রমেই।
দেশভাগের পর সৈয়দপুর-দিনাজপুর এলাকায় বিহারি অভিবাসীদের আধিক্য দেখা দেয়। ১৯৬৯ সালে যখন বাঙালির জাতীয়তাবাদের আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে, তখন মুক্তিকামী বাঙালিদের (স্থায়ী বাসিন্দা ও অভিবাসী) সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় বিহারিদের মতপার্থক্য। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তৈরি করার জন্য পাকিস্তানের শাসকরা ১৯৪৭-এর আগে থেকেই যে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল, তা যে অন্তঃসারশূন্য তা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা ততদিনে ধরতে পারলেও এ ভূখণ্ডের অভিবাসী বিহারিরা সেই অন্তঃসারশূন্যতাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। সৈয়দপুর-দিনাজপুর এলাকায় বাঙালি আর বিহারিদের ভেতরের মতপার্থক্য শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়, যার নগ্ন প্রকাশ আমরা দেখি ১৯৭১-এর প্রথম দিকে, বিশেষত এপ্রিলের মাঝামাঝি যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা ভেঙে পড়ে। এর ফলাফল হিসেবে আমরা দেখি, ১৪ এপ্রিল ১৯৭১-এ বিহারিদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় হায়দার আলীর পিতা সবদর আলী এবং একই সময়ে তার মাতা নিশাত বানু গুম হয়ে যায়। নিজেদের জন্মস্থান থেকে ভেসে আসা এই মানুষ দুজন পূর্ব পাকিস্তান নামক নতুন ভূখণ্ডে আশাহত হয়েও বেঁচে থাকতে পারত, কিন্তু তা না হয়ে এ উপমহাদেশের অমীমাংসিত রাজনীতির শিকার হয়েছে তারা। পরিতাপ এখানেই।
হায়দার আলীর পিতা সবদর আলী এবং তার মাতা নিশাত বানু যে পূর্ব পাকিস্তান নামের নতুন ভূখণ্ডে শিকড় বসানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, সে সম্পর্কে শওকত আলী আমাদের একটা ধারণা দেন বটে। তাই আমরা দেখি, বহুত ঝড়ঝাপটার পরও (১৯৫০ সালের দিকে) নিশাত বানু সংসার সাজিয়ে বসেছে, সবদর আলী আয়রোজগার বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং তারা তাদের একমাত্র সন্তান হায়দার আলীর পড়াশোনায় বিনিয়োগ করছে। শওকত আলী লিখছেন: ‘নিশাত মুর্গির সংখ্যা বাড়ায়—পাটনাই ছাগলের বাচ্চা কেনে দুটো, সেলাইয়ের কাজ জুটিয়ে আনে। তার এমন ঝোঁক চেপে যায় যে সংসারের আয় সে বাড়াবেই।...নিজের সঞ্চয় সোনার বালা দু’খানি সে স্বামীর হাতে তুলে দিতে যায় (পৃষ্ঠা: ৭৫)’।
আমরা আরো লক্ষ করি, যখন ১৩-১৪ এপ্রিল ১৯৭১-এ পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী সৈয়দপুর-দিনাজপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙে ফেলেছে, দিনাজপুর শহরের মানুষজন পশ্চিমে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোয় পালিয়ে যাচ্ছে দলে দলে তখন সবদর আলীর আর পা চলছে না! শিকড় না গজাক, শিকড় বিস্তারের প্রক্রিয়া তার কাছে আনন্দঘন ছিল বৈকি! ফলে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী দোসর কতিপয় বিহারিদের হাতে সে অপরিণামদর্শিতায় খুন হয়ে যায়। দিনের পর দিন তার লাশ পড়ে থাকে সদর দরজায়। বিহারিরা কোথায় নিয়ে যায় হায়দার আলীর মাতা নিশাত বানুকে তা আর জানা যায় না। হয়তো তাকেও খুনই করা হয় শেষ পর্যন্ত।
প্রথম জেনারেশনের অভিবাসী সবদর আলীর ভেতরে কিছুটা হলেও নিরাসক্তি ছিল, নৈর্ব্যক্তিকতা ছিল। সমাজবিজ্ঞান বলছে যে, জন্মভূমি ত্যাগের অব্যবহিত পর অভিবাসীদের মনে নানা ধরনের ট্রমা তৈরি হতেই পারে। প্রচণ্ড ট্রমার কারণে অনেক অভিবাসীর ভেতরে মনোবৈকল্য দেখা দেয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। জলপাইগুড়ি থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা সবদর আলীর বেলাতে এমন হতেই পারে। তার পরও সবদর আলীর ভেতরে টিকে থাকার জন্য অসম্ভব এক প্রাণশক্তি দেখি আমরা।
এবার যেটা বলার তা হলো এই যে, প্রথম জেনারেশনের অভিবাসীদের এই নিরাসক্তি দ্বিতীয় জেনারেশনের অভিবাসীদের ভেতরে কিছুটা হলেও সঞ্চালিত হতে পারে। হায়দার আলীর ক্ষেত্রে তা ঘটে থাকবে। হায়দার আলীর ব্যক্তিগত ট্রমার সূচনা ঘটে যখন বিহারিরা তার চোখের সামনে তার পিতা সবদর আলীকে খুন করে নির্মমভাবে এবং তার মাতা নিশাত বানুকে তুলে নিয়ে যায়। কাজেই মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আলী যখন যুদ্ধ শেষে ফিরছে বাংলাদেশে, সে আর শূন্যতার ভেতরে নিজেকে বসাতে পারছে না। উপরন্তু প্রথমে বিহারিরা তাদের মিশন রোডের বাসাটা দখল করে বসে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে দখল চলে যায় জনৈকের কাছে এবং তখন আর হায়দার আলীর থাকার কোনো জায়গা থাকে না। প্রথম জেনারেশনের অভিবাসী সবদর আলী ও নিশাত বানুর মতো করে দিনাজপুর শহরে হায়দার আলী ভাসতে থাকে তখন। দুঃখজনক বিষয় হলো যে, নিজেদের বাসা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে তার আর কোনো উদ্যোগও থাকে না। বাড়ি উদ্ধার করাটা তার কাছে ঝামেলা বলে প্রতিভাত হয়। এটা হায়দার আলীর নিরাসক্ততার প্রথম প্রকাশ।
বলে রাখা প্রয়োজন যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হায়দার আলীর বিয়ে হয় মরিয়ম নামে দিনাজপুর শহরের এক বাঙালি পরিবারে, তাদের একজন সন্তান হয় (মিঠু), মরিয়ম অপরিণামদর্শীর মতো তার খালাতো ভাইয়ের প্রেমে পড়ে, হায়দার আলী ও মরিয়মের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে মরিয়মের আগ্রহতেই এবং হায়দার আলী দিনাজপুর শহর ছেড়ে ঢাকায় চলে গিয়ে ট্রাক চালানো শুরু করে। হায়দার আলীর দ্বিতীয় নিরাসক্তের প্রমাণ হিসেবে বলা যায় যে, সে তার আর মরিয়মের ভেতরে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে তার নিজের শীতলতাকে (প্রথম নিরাসক্ততা) দায়ী করলেই যেন ভালো হতো! শওকত আলী তেমনটা আমাদের বলেছেনও বটে। পরবর্তী সাত বছর সে আর দিনাজপুর শহরে যায়নি, খবরও রাখেনি নিজের পুত্রের। এটা তার তৃতীয় নিরাসক্ততা। তাছাড়া সে নিজেকে ধ্বংস হতেও দিয়েছে। সাত বছর পর হায়দার আলী দিনাজপুর শহরে গেলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার সাবেক স্ত্রী মরিয়ম। সেই মুহূর্তে মরিয়ম তার নিজের দখলে থাকা মিশন রোডের বাসাটা হায়দার আলীকে বুঝে নিতে বলে এবং তাদের সন্তান মিঠুর দায়দায়িত্ব পালনে তাকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানায়। প্রসঙ্গত, মরিয়ম ধনী পরিবারের মেয়ে। কাজেই হায়দার আলীর কাছ থেকে সে অর্থসাহায্য চায়নি। সে চেয়েছে যে মিঠু তার পিতাকে ফিরে পাক, হায়দার আলী ফিরে পাক তার পুত্রকে। কিন্তু এর দুটোর একটা না করেই হায়দার আলী ঢাকায় ফেরত চলে যায় (যদিও মিঠুর জন্য তার মায়া হয় খুব)। কেন? এটা তার চতুর্থ নিরাসক্ততা। বোধ করি, এ ধরনের নিরাসক্ততাগুলোর পেছনে তার বিবিধ ট্রমাই দায়ী। ট্রমা মানুষের স্বাভাবিক আচরণকে ব্যাহত করতে পারে।
তারপর যা ঘটে, হায়দার আলী ঢাকায় ফিরে যায়। তার সাবেক স্ত্রী দিনাজপুর শহর নিবাসী মরিয়ম স্বামীর হাতে নিগৃহীত হয় বারংবার এবং সম্পর্কজনিত জটিলতায় সে আটকেই থাকে, বেরোতে পারে না। দিনাজপুর শহরের ট্রাক ড্রাইভার উল্টা কালু তেমনই ট্রাক চালায়। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জুলকারনাইন আগের মতোই ব্যথিত হয় তার ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণে, শাপশাপান্ত করে সবাইকে। জুলকারনাইন মনে করে যে তারা, মুক্তিযোদ্ধারা, সসম্মানে দেয়ালে ঝুলছে ছবির মতো আর চারদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবে হায়দার আলী এবং তার আশপাশের কারোর জীবনে কোনো পরিবর্তন হয় না, অপরিবর্তনীয় এক চক্রের ভেতরে পড়ে থাকে তারা সবাই।
শওকত আলীর উপন্যাস ‘উত্তরের খেপ’-এর লেখনশৈলী নিয়ে কিছু কথা বলার আছে। শওকত আলীর লেখনীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো যে, তিনি গল্প বুননে পারদর্শী (উদাহরণত, প্রদোষে প্রাকৃতজন, দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত এবং পূর্বদিন পূর্বরাত্রি)। এবারো তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দেশভাগ, বাঙালির জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা যেমন ইতিহাসের বিষয়, তেমনি এসব বড় ঘটনার ফাঁকে কোনো ব্যক্তিমানুষের অবস্থান মনোজাগতিক পর্যবেক্ষণ দাবি করে। কাজেই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে অঙ্গীভূত করে মানুষের মনোজগেক চিত্রায়িত করতে গেলে লেখকের ভেতরে বিভিন্ন ছবি এবং বিকল্প ছবি চলে আসবেই। একজন লেখকের কাজ তখন ফিল্টার করা এবং উপন্যাসের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিক্রিয়াটা কী হতে পারে তা বুঝে নেয়া। যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিক্রিয়াকে সাহিত্যমান দেয়াটা কঠিন কাজ বৈকি! সাহিত্যে মানুষের জীবন তো বইপুস্তকের অনড় পাতা নয়! সেখানে মানবিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারাটা তাই জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। মানবিক অবস্থানের যুক্তিগ্রাহ্যতা অনুসরণ করে এভাবে একজন লেখক পাতার পর পাতা লিখে চলেন, চরিত্ররা বারবার ঘুরেফিরে আসে সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে। এটা নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ। শওকত আলী আবারো সেই দুরূহ কাজটা করে দেখিয়েছেন, যাকে বলে ‘খুঁতহীন পরিভ্রমণ’। তার চরিত্ররা সে কারণে উপন্যাসের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যৌক্তিক আচরণ করেছে। এ ধরনের সাম্যঞ্জস্যপূর্ণ চরিত্র-চিত্রায়ণে আমরা অনেকেই ব্যর্থ হয়ে থাকি।
দ্বিতীয়ত. শওকত আলীর উপন্যাস ‘উত্তরের খেপ’-এ প্রকাশের ভাষাবিষয়ক কোনো ওভারটোন নেই। ফলে পাঠক খুব সহজেই তিনি যা বলতে চাইছেন তার ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। বরং তার কাব্যিক বর্ণনা পাঠককে তখন আপ্লুত করবেই। তার কাব্যিক বর্ণনার একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে এখানে:
‘পথের দুধারে জলাভূমি— ডোবায় পাট পচানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাঁশের প্রকাণ্ড ফ্রেমে জাল মেলে রাখা। পচা পাটের গন্ধে বাতাস ভারী— সেই সঙ্গে আবার আমিষের গন্ধ মেশানো। ডাইনে বাঁয়ে শূন্য ক্ষেত খাঁ খাঁ করছে। যথাসময়ে আমন লাগাতে পারেনি গেরস্ত। পথের পাশে দু-একটি অশথগাছ, পাখি ল্যাজ দোলাচ্ছে টেলিফোনের তারে। এই একই দৃশ্য দেখছে সে এ বছর। পূর্বে দেখেছে। এখন পশ্চিমেও দেখছে। সেই একই রকম আবাদি জমিতে খাবলা খাবলা ফসল, ন্যাংটো কাদা মাখা ছেলেরা পানি সেচে চলছে মাছের আশায়। এক ঠ্যাংগা বক দাঁড়িয়ে আছে কলমি দামের ওপরে— পাখি উড়ে যাচ্ছে— আর বাতাস আর শূন্যতা, খাঁ খাঁ করছে সমস্ত চরাচরে। বন্যায় সমস্ত কিছু ধুয়েমুছে সাফ (পৃষ্ঠা: ৩৫)।’
এ ছবি আবহমান বাংলাদেশের, যা নিয়ে কাব্য করা যায়, মুগ্ধ হওয়া যায়। আমরা খুশি হই এ কারণে যে, নদীপথে উত্তরবঙ্গ ঢোকার পরে নগরবাড়ী থেকে সিরাজগঞ্জে যাওয়ার পথে ঠিক এমনই ভূ-প্রকৃতি আমাদের চোখে পড়বে। কোনো একটা পরিবেশকে ঠিকঠাক চিত্রায়ণ করতে গেলে এমন বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনার প্রয়োজন আছে বৈকি!
তৃতীয়ত. এ উপন্যাসে তাকে নিজের অর্থাত্ একজন লেখকের আবেগকে সংযত করতে দেখেছি বারবার। প্রসঙ্গত, বিহারিদের হাতে হায়দার আলীর পিতা সবদর আলীর নির্মমভাবে খুন হয়ে যওয়া এবং তার মাতা নিশাত বানুর গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকে তিনি দুম করে শেষ করে দিলেন। বন্দুকের গুলির আঘাতে মাটিতে পড়ে গিয়ে খাবি খাচ্ছে সবদর আলী আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে তা দেখে আর্তচিত্কার দিয়ে উঠল তার স্ত্রী নিশাত বানু। তখন মাটিতে পড়ে যাওয়া সবদর আলীর দুপা যন্ত্রণায় দাপাদাপি করছে। আমাদের এটুকুই কেবল বলছেন শওকত আলী। তারপর? লেখকের নির্মোহ কলম আর কিছু বলে না আমাদের। গুম হয়ে যাওয়ার পর নিশাত বানুর কী হয়েছিল তাও আমাদের অজানা থেকেই যায় শেষতক। পরে তাকে কি খুন করা হয়েছিল? নাকি তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? আমরা এসবের কিছুই জানি না। একটা ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। তবে আমরা অসঙ্গায়িত একটা স্পেস পেয়ে যাই তখন, যেখানে চিন্তার স্বাধীনতায় বিবিধ পছন্দ আমরা আঁকড়ে ধরি। পাঠকের নিশ্চয় মনে পড়বে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাদল বা রাজাকারদল এভাবে বিস্তর মানুষকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের ভবিতব্যে কী ঘটেছিল তা আর জানা যায়নি। শওকত আলীও তেমন নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিশাত বানু সম্পর্কে আর কিছু বলেন না। নির্মোহ বর্ণনার এমন আরেকটা উদাহরণ দেয়া যায় এখানে। উপন্যাসের শেষটায় প্রিয় শহর দিনাজপুর ফেলে, সন্তান-সাবেক স্ত্রী-বন্ধুবান্ধব ফেলে ঢাকা ফিরে যাচ্ছে হায়দার আলী। ব্যস! আর কোনো কথা নেই লেখকের দিক থেকে! তখন আমরা ভেবে নিচ্ছি হায়দার আলীর বেদনার দিকটা। আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, তখন তার মুখমণ্ডলের রেখাগুলোয় কতটা দুঃখ আঁকা ছিল। এসবই ধরে নেয়ার বিষয়। শওকত আলী নিশ্চয় চেয়েছেন যে ধোঁয়াশাটা থাকুক, থেকেছেও। এবং সেই ধোঁয়াশার ভেতরে ঘুরে মরছে পাঠক। মৃত্যু, গুম হয়ে যাওয়া অথবা বিদায় সম্পর্কে শওকত আলীর নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বিস্মিত করে!
‘উত্তরের খেপ’ নামক উপন্যাসে উত্তর জনপদের প্রান্তিক মানুষদের জীবন আবারো দরদ দিয়ে, পরম যত্ন নিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন শওকত আলী। তবে পরিশেষে বলতেই হয়, শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ও ‘উত্তরের খেপ’ নামক উপন্যাস দুটি বিচ্ছিন্ন কোনো কাজ নয়। ভিন্ন কালের প্রেক্ষিতে উত্তর জনপদের সৈয়দপুর-দিনাজপুর এলাকার মানুষদের তিনি এ দুটি উপন্যাসে চিত্রায়ণ করেছেন। মানুষগুলো সবাই প্রাকৃতজন— ক্ষুদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক, মোটর গ্যারেজের মেকার, মুদি দোকানদার, চা-দোকানদার, বেকার, চালচুলোহীন। মধ্যবিত্তিক দৃষ্টিতে তাদের চোখে পড়ে না মোটেই। এ মানুষগুলোই ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতীর উত্তর পুরুষ। চেনা যাচ্ছে এবার?
আরো বলতে হয়, শওকত আলীর উপন্যাসের চরিত্ররা সবাই উত্তরবঙ্গের ভূ-প্রকৃতির মতোই ঊষর, কুয়াশাচ্ছন্ন, উদাসীন, অপরিণামদর্শী, পরিবর্তনহীন, যদিও তারা সংগ্রামী ক্রান্তিকালে। ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ীই তো মানুষের মনন তৈরি হয়, অপরাপর ভূ-প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে প্রতিতুলনায় তা ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক! এখানেই মানুষের জীবনচিত্রায়ণে শওকত আলীর মুনশিয়ানা। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ও ‘উত্তরের খেপ’ এজন্যই আমাদের মুগ্ধ করে রাখবে।






