সেও এক প্রদোষকাল। আগের দিন ঠিক একই সময়ে আমাদের আরো কয়েকজন বন্ধু দেখে গেছেন তাঁকে। পরদিন আমরাও কয়েকজন চেষ্টা করলাম তাঁকে দেখার। কিন্তু চা পানের মোহে দেরি হয়ে গেল একটু। পেরিয়ে গেল দর্শনার্থীদের নির্ধারিত সময়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বারান্দায় আরো অনেক রোগীর উত্কণ্ঠিত আত্মীয়স্বজন, সহমর্মীদের ভিড়। ওরই মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর অবস্থার খবরাখবর জানতে জানতে শুধু মনে হতে লাগল, সত্যি-সত্যিই প্রদোষে এক প্রাকৃতজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। এ তো লেখাই বাহুল্য, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সার্বিক অর্থেই আমাদের প্রদোষকাল চলছে এখন। আর তিনি সেই প্রদোষকালের প্রাকৃতজনই বটে; যাকে ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একুশে পদক দেয়া হলেও তার উদ্দেশ্য ছিল বোধকরি যতটা না তাঁকে সম্মানিত করা, তারও বেশি নিজেকে সম্মানিত করা, নিজেকে জাতে তোলা। ওই দিন তাঁর নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে অবস্থানের ১৫তম দিন চলছিল। আর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এরও দুদিন আগে। দু-দুটি পক্ষ চলে গেলেও একুশে পদকদাতা এ রাষ্ট্র তখনো নিবিড় ঘুমে। তাঁর চিকিত্সার জন্য অনুদান দেয়া হোক, এমন দাবি বা অনুরোধ অবশ্য কেউই করেননি। রাষ্ট্রের কাছে তেমন কোনো প্রত্যাশাও বোধকরি ছিল না কারো। তবে তার পরও রাষ্ট্রকে এজন্য চিরদিন অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কেননা সংকটকালে প্রতিটি পরিবারপ্রধানকে যেমন, তেমনি রাষ্ট্রকেও যান্ত্রিকভাবে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ রাষ্ট্র যাকে তার অন্যতম সম্মানজনক স্বীকৃতি দিয়েছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শায়িত সেই মানুষটি সম্পর্কে তার কোনো মাথাব্যথাই আর দেখা গেল না! একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এসব দিয়ে কী লাভ, রাষ্ট্র যদি সেই ব্যক্তির কোনো খোঁজই না রাখে?

তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতজনের মতোই মৃত্যুর দিকে হেঁটে যেতে হলো তাঁকে— শওকত আলীকে! যিনি শুধু কি আগুনে পুড়তে পুড়তে বিশুদ্ধ হয়ে চলা একজন কথাসাহিত্যিকই, নাকি গভীর গভীরতর আদর্শবাদী মানুষও একজন? বিয়ের পর পরই স্টুডিওতে গিয়ে স্ত্রী শওকত আরার সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। টিকাটুলির ‘বিরতী ভিলা’য় তাঁর ছিমছাম ঘরে দেখেছি, দেয়ালে ছবিটি সযত্নে টাঙিয়ে রেখেছেন। হাসতে হাসতে বলে উঠেছিলেন, ‘আমার নামও শওকত, ওর নামও শওকত!’ তখন তো তাঁর কেবলই সবকিছু ভুলে যাওয়ার সময়! কত কিছু ভুলে যেতেন তিনি, কিন্তু বিয়ে করার সেই ঘটনাবহুল সময়টাকে আর ছবি ওঠার এ স্মৃতিকে মনে হয় তিনি কখনো ভোলেননি। ভুলতে শুরু করেছিলেন তিনি বোধকরি অনেক আগে থেকেই। মনে আছে, বোধহয় ১৯৯৯ সালের দিকে দৈনিক জনকণ্ঠ অফিসে পরিচয়ের প্রথম দিনেই বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু আজকাল উপন্যাস ঠিক লিখতে পারছি না। কেন জানো? চরিত্রের নাম ভুলে যাই। ধরো, একটা নামে লিখতে শুরু করেছি, ২০-২২ পাতা লিখতে না লিখতেই সে নাম আরেকটা হয়ে যায়!’ ঘটনাটাকে আমলেই নিইনি, এ রকম তো আমাদেরও হয়, লিখতে গিয়ে অসাবধানতায় অন্তত আমার এসব মাঝে মধ্যেই হয়। কিন্তু বিষয়টা যে গুরুতর, তা টের পাই আরো কয়েক বছর পরে। বইমেলা থেকে বের হয়ে আসছি তখন, হঠাত্ দেখলাম তিনি একা একা কিছু একটা খোঁজাখুঁজি করছেন। কাছে গিয়ে স্বাগত জানানোর পরও মনে হয় ঠিক চিনতে পারলেন না; তবে বোধহয় কেউ তাঁকে চিনতে পেরেছে বুঝে আশ্বস্ত হলেন, কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আচ্ছা, বাংলা একাডেমির বইমেলার গেটটা কোনটা বলতে পার?’

মানুষের এই মনে রাখা, এই ভুলে যাওয়া, আবারো ভুলে যাওয়া ঘ্রাণের মতো মনে পড়ার বিহ্বলতা শওকত আলীকে অনেক আগে থেকেই অনেকের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু তিনি হার মানেননি। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, তিনি নিজেই এ ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন। আর তাঁর ওই সচেতনতা তাঁকে করে তুলেছিল নতুন এক অনন্য মানুষ। যারা অল্প-বিস্তর তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন, তারা জানেন, এত কিছুর পরও তিনি ছিলেন আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক মানুষ। ২০১২ সালে তাঁকে উত্সর্গ করা ফিকশন ‘মৃত্যুগন্ধী বিকেলে সুশীল সংগীতানুষ্ঠান’ নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁর বিরতী ভিলায়। যাওয়ার আগে টেলিফোনে বেশ কয়েকবার তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে; টেলিফোন সবসময় ধরা হয় না বলে তিনি তাঁর মোবাইল নাম্বার দিয়েছেন, দিনক্ষণও ঠিক করেছেন, কবে দেখা হবে। সেই প্রথম ও শেষ তাঁর বাসায় যাওয়া। দরোজা খুলে দিলেন, জানালাম— আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল, আজ বিকালে আসার কথা ছিল। মনে হলো, সেটা তিনি মনে করতে পারলেন না। তবে সাদরেই ঘরে বসালেন আমাদের। অনেকক্ষণ কথা হলো। তবে মনে হলো, তিনি ঠিক চিনতে পারছেন না। ওই যে মাঝে মধ্যে আমাদেরও যে রকম হয়, কেউ এসে চিরচেনা ভঙ্গিতে কথা বললে বুঝতে পারি, নিশ্চয়ই এ পূর্বপরিচিত, অথচ আর ধরতেই পারি না সে কে, ঠিক তেমনি করে তিনিও বুঝলেন, এরা তাঁর চেনা, অতএব তাঁর নিজের মনে করা বা না-করায় কী আসে যায়! তবে কথাবার্তায় তাই অপরিচয়ের কোনো দ্বিধাই দেখা গেল না। তিনি আত্মমগ্ন হয়ে একসময় বললেন, ‘আমি কিন্তু ছড়া লিখি। সেগুলোও ছাপব কোনো এক সময়ে। ওইগুলো লিখেছি চাঁদ সরকার নামে। আমার মা আমাকে চাঁদ নামে ডাকতেন...’

সেই চাঁদ এখন তাঁর মায়ের মতোই গত ২৫ জানুয়ারিতে আকাশের চাঁদ হয়ে গেল!

কী দিয়েছেন শওকত আলী আমাদের? এ উপমহাদেশের মানুষ সুদীর্ঘকাল ধরে গেছে নানা ধর্মীয় উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, যত না পরকালের জন্য আকুতি, যত না ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বের প্রতি বিশ্বাস, তারও বেশি দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাই এ জনপদের মানুষকে বারবার ঠেলে দিয়েছে নতুন ধর্মীয় জাগরণের দিকে। মানুষের জীবনযাপনকে নিরন্তর নির্মাণ করার মধ্যে দিয়ে এই যে সত্যের অনুসন্ধান, তাতে তিনি কোনো বিশেষ ধর্মের দিকে পক্ষপাতিত্বও করেননি। আর এভাবেই রচিত হয়েছে তাঁর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, যা অনেকের কাছেই শওকত আলীর সেরা সাহিত্যকর্ম। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, বিভিন্ন সাহিত্যিকের ভাষাশৈলীতে যেখানে একটু পান থেকে চুন খসলেই আমরা ‘ভাষার কৃত্রিমতা’ আবিষ্কার করে ফেলি, সেখানে শওকত আলীর এ কৃত্রিম ভাষাবিন্যাসে দাঁড় করানো উপন্যাসটি কি এক দুর্দমনীয় ঘোরে আমপাঠককে পর্যন্ত আকৃষ্ট করে থাকে। যতদূর মনে পড়ে, রাহেল রাজীবের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে এ ব্যাপারে শওকত আলী স্পষ্টতই জানিয়েছিলেন, ত্রয়োদশ শতকের সেই সময়টাকে ধরতে তাঁর কৃত্রিম একটি ভাষার আশ্রয় নেয়ার বিকল্প ছিল না। তিনি সংস্কৃতের মধ্যে সেই বিকল্প খুঁজে নিয়েছেন। সমালোচকরা ইনিয়েবিনিয়ে নানা যুক্তি টেনে এনে বলেছেন, প্রদোষে প্রাকৃতজনের ভাষা কৃত্রিম; আর শওকত আলী সোজাসাপ্টা বলেছেন, ‘তারা পণ্ডিত, আমি লেখক।’ এই যে বলা, লেখকের পৃথক অস্তিত্ব উপলব্ধি করা, ভাষাবোধকে নতুন করে জাগ্রত করা এবং এসব উপলব্ধি-অনুভবকে তীব্রভাবে প্রকাশ করা, তা যেকোনো নতুন লেখককেই সাহস জোগায়। তাঁকে কাহিনীর ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে উত্সাহিত করে। তাঁর মনে এ বোধ সঞ্চার করে, ব্যাকরণ মেনেই লিখতে হবে বটে, কিন্তু ঠিক কোন বিন্দুটিতে গিয়ে ব্যাকরণকে অমান্য করতে হবে, কতটুকু অমান্য করতে হবে, তার উপরেই নির্ভর করে তিনি আলাদা, নতুন কোনো লেখক হয়ে উঠতে পারলেন কিনা। এতে কোনো সংশয় নেই, শওকত আলী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ইতিহাসভিত্তিক বা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার প্রচলিত ফর্মকে তিনি অস্বীকার করেছিলেন। তবে সরল কিন্তু অপ্রচল ও পরিমিত সেই অস্বীকৃতিকে কেউই অস্বীকার করতে পারেননি। কৃত্রিম এক ভাষাশৈলীর ফাঁদে ফেলার পরও প্রদোষে প্রাকৃতজন যে পাঠকপ্রিয়তা পেল, তার কারণ নিহিত রয়েছে এ উপন্যাসের পিঠোপিঠি বাক্যগুলোর মধ্যবর্তী শূন্যতার অসম্ভব গতিময়তার মধ্যে, তার কারণ নিহিত রয়েছে কাহিনীর পরতে পরতে ভরে দেয়া নির্লিপ্ততা, উদ্বাস্তুতা ও নিরুপায়তার মধ্যে।

কী করে পেয়েছিলেন শওকত আলী এ গতিময়তা, নির্লিপ্ততা, উদ্বাস্তুতা ও নিরুপায়তা, যা প্রদোষে প্রাকৃতজনকে করে তুলেছে এত অনন্য? এ উপন্যাসের পেছনে কাজ করেছে তাঁর একাত্তরের স্মৃতি— যখন মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছে, নিরাপদ আশ্রয় নিতে সবকিছু ফেলে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে জীবন দিচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই। এই যে সময়, তা তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘যাত্রা’য় এসেছে একভাবে, আর প্রদোষে প্রাকৃতজনে এসেছে আরো বহুস্তরস্পর্শী ভাবনা পেরিয়ে। একাত্তরকে দেখতে দেখতে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কতবার আর কতকাল ধরে এ দেশের মানুষ এভাবে বারবার নিজেদের ঘর ছেড়েছে? কেন ছেড়েছে? এ দেশের প্রাকৃত মানুষ কতবার বহিরাগত শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ ও সংগ্রাম করেছে? এভাবে প্রাচীন সংগ্রামের ভূমি পরিভ্রমণ করতে করতে তিনি খুঁজে পেয়েছেন মিত্রানন্দ, বসন্ত দাস, শ্যামাঙ্গ, লীলাবতীদের। একটি বা দুটি ধর্ম নয়, তিন-তিনটি ধর্মাবলম্বী প্রাকৃতজনের সঙ্গে এ উপন্যাসে পরিভ্রমণ করেছেন শওকত আলী। প্রতিটি ধর্মের প্রতি সমান গুরুত্ব দেয়া, আবার তাদের ভাঙনের চিহ্ন এবং ইঙ্গিতগুলো রেখে দেয়া, জনজীবন ছেঁকে তাদের নিজস্ব ছাঁচে প্রতিস্থাপন করা, পাঠককেও তার ধর্মবোধ থেকে বিযুক্ত রাখা— যাতে সে নিবিড়ভাবে নিবিষ্ট হয়ে যেতে পারে প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে, এতসব কর্মযজ্ঞ চালাতে হয়েছে শওকত আলীকে তাঁর এ উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে।

অনেকেরই মনে আছে, এ উপন্যাসটির দিকে ইঙ্গিত করেই বাংলা সাহিত্যের এক জনপ্রিয় শক্তিমান লেখক মন্তব্য করেছিলেন, কেউ যখন তাকে ইতিহাস শেখানোর চেষ্টা করেন, তখন তা তার কাছে সাহিত্য পদবাচ্য কিছু মনে হয় না। আয়রনি হলো, সমালোচকরা প্রদোষে প্রাকৃতজনের গায়ে ঐতিহাসিক উপন্যাসের ছাপ বসিয়ে দিলেও শওকত আলী নিজে একে তেমনভাবে চিহ্নিত করতে রাজি হননি। কারণ তাঁর কাছে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক সময়ের একটি পর্যায়কে ধরে লেখা উপন্যাস— এটি কিছুতেই ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, কারণ তিনি সময় বা ঘটনার প্রামাণিক কোনো কিছু নিয়ে এতে কাজ করেননি, ঐতিহাসিক কোনো চরিত্রও এতে নেই। তিনি কালের গহ্বর থেকে তুলে এনেছেন একদল প্রাকৃত মানুষকে— ইতিহাসের বাস্তবতায় তেমন একদল মানুষের অস্তিত্ব থাকলেও ব্যক্তি হিসেবে তাদের কারো পৃথক উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। লক্ষ্মণ সেনের মন্ত্রী হলায়ূধ মিশ্রের সংস্কৃত ভাষায় লেখা গ্রন্থ ‘শেখ শুভোদয়া’র খণ্ডিত অংশ পেয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে তিনি মুসলমানদের এ দেশে আসার কিংবা থাকা-খাওয়া ইত্যাদির বিবরণ আত্মস্থ করেছেন বটে, তাদের সঙ্গে ওই সময়ের এদেশীয় মানুষদের মিথস্ক্রিয়ার পাঠ নিয়েছেন বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে দাঁড় করিয়েছেন নিজের কাহিনীর শরীরেই। 

আর তাই প্রদোষে প্রাকৃতজনে দেখি, শওকত আলীর নারীদের নারীত্বই যেন একটি ধর্মে পরিণত হচ্ছে। চৈত্রের এক ভয়ানক খরাদাহে আত্রেয়ী নদীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক গৃহস্থের বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছিল মৃিশল্পী শ্যামাঙ্গ। গৃহস্থের কন্যা শ্যামাবতী শ্যামাঙ্গকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করত আর লীলাবতী ছিল তার সখী। রাজার এক অমাত্যের সঙ্গে বিয়ে হলেও লীলাবতীকে ঘরে নিতে রাজি ছিল না সে। লীলাবতীকে তাই থাকতে হচ্ছিল বাবার বাড়িতেই। লীলাবতীর সঙ্গে শ্যামাঙ্গের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে সে। তবে স্ত্রীকে ঘরে তুলতে রাজি না থাকুক, অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক মেনে নেবে কেন লীলাবতীর স্বামী? তাই লীলাবতীকে নিয়ে এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়ানোর দুর্দিন নেমে আসে শ্যামাঙ্গের জীবনে। ওদিকে প্রাকৃত মানুষদের অনিশ্চিত, অভাবক্লিষ্ট জীবনে মুক্তির আস্বাদ নিয়ে আসে বহিরাগত তুর্কি মুসলমানরা। বৌদ্ধরা তখন ক্ষমতাচ্যুত, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে সংঘাতে রক্তাক্ত। কি বৌদ্ধ, কি ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্মেরই নিম্নবর্গের মানুষের জন্যই বোধকরি মুক্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আসে এ যবনের ধর্ম। লীলাবতী চায় যবন হয়ে যেতে, কিন্তু শ্যামাঙ্গ রাজি হয় না তাতে। তাদের দুজনের কথাবার্তা খেয়াল করার মতো। লীলাবতী বলছে, ‘শ্যামাঙ্গ, চলো আমরা ওদের ধর্ম গ্রহণ করি।’ তার উত্তরে শ্যামাঙ্গ বলছে, ‘এই ধর্ম আমাদের মৃত্তিকার ধর্ম লীলাবতী! এই ধর্ম পরিত্যাগ করলে আমরা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্যুত হব।’ লীলাবতীকে আবার বলতে শুনি, ‘আমি তোমার পুত্তলিটি নই শ্যামাঙ্গ, আমি জীবন্ত নারী—আমার স্বামী চাই, সংসার চাই, সন্তান চাই—ঐগুলিই আমার ধর্ম, অন্য ধর্ম আমি জানি না, আমাকে তুমি প্রকাশ্যে বিবাহ করো।’ এভাবে ঐশ্বরিক ধর্মকে বারবার অস্বীকার করার ইহজাগতিক যে ভিত্তি গড়ে ওঠে, তাই যেন শওকত আলীর এ উপন্যাসের গতিময়তাকে করে তোলে অপ্রতিহত।

নারীর এ অনুভূতির অভিন্ন এক অনুরণনই আমরা ফিরে আসতে দেখি আলাদা প্রেক্ষাপটে এবং নতুন এক বিন্যাসে শওকত আলীর ট্রিলজির একটি পর্বে— ‘দক্ষিণায়নের দিন’ উপন্যাসে। রাখীকে আমরা দেখি সাধারণ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নিরুদ্দেশে যাওয়া সেজানের সন্তানকে গর্ভে নিয়ে পথে পথে হাঁটতে। একটু দীর্ঘ মনে হতে পারে, কিন্তু তা পড়লেই বোধকরি নারী সম্পর্কিত এক অখণ্ড শওকত আলীকে খুঁজে পাই আমরা:

রাখীর এখন শুধু সন্তানের জন্য অপেক্ষা, এপ্রিল এখনো দূরে। কিন্তু এই অপেক্ষাতেও রাখীর ক্লান্তি নেই, শূন্যতা নেই, নিঃসঙ্গতা নেই।

একেকদিন মিছিল দেখে রাস্তায় নেমে পড়ে। কোনোদিন য়ূনিভার্সিটি গেটের কাছে, কোনোদিন গুলিস্তানের মোড়ে, কোনোদিন প্রেসক্লাবের সামনে। আর হাঁটে রাখী। শীতের বাতাস টাল খেয়ে যায়, দালানে দালানে ধাক্কা লেগে। রাখী তখন মনে মনে ছেলেকে ডাকে। বলে, দেখ, এখানে আমি হেঁটেছিলাম—তুইও হাঁটিস এখান দিয়ে, এখানে দাঁড়িয়ে আমি মিছিল দেখেছিলাম—তুইও দেখিস এইখানে দাঁড়িয়ে, সেজানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল এখানে, এই গাছতলায়—তুইও এখানে দাঁড়াস, আর এই যে রাস্তাটা, এই রাস্তায় সেজান মিছিল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল—তুইও এই রাস্তা দিয়ে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাস, হ্যাঁ রে, পারবি তো?

উপন্যাসটির সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানেন, এ রাখী আসলে ঊনসত্তরের পথ দিয়ে হেঁটে যায়, তার স্মৃতিজুড়ে থাকে সেই উত্তাল দিনগুলোর এক রাজনৈতিক সংগঠক সেজান, যার ঘ্রাণ মিশে আছে তার মনে, তার শরীরে। সেজানের এ উপস্থিতি-অনুপস্থিতি বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঊনসত্তরের শহীদ আসাদের কথা। আসাদ ছাড়া আর কে-ইবা এত আবেগে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল ঊনসত্তরে ছাত্রসমাজকে আর চলে যেতে পেরেছিল গ্রামে সাধারণ কৃষকদের জাগিয়ে তুলতে? শওকত আলী তাঁর নিজের মনের মধুরিমা দিয়ে যেন সেই আসাদকেই নির্মাণ করেন এ উপন্যাসে। সেজান নামের এ রকম অসংখ্য আসাদ তখন গ্রামে চলে যায়, ছড়িয়ে পড়ে, মানুষকে জাগিয়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে হারিয়ে যায়। শওকত আলীর এ উপন্যাস মহাকালের সম্পদ বলেই তাতে আসাদের উত্তরসূরির প্রতীকী উপস্থিতি খুঁজে পাই, যে রয়ে যায় রাখীর ভেতর— প্রচণ্ড অসুস্থতায় যে রাখী সেজানকে রেখেছিল আগলে, সেই রাখীর স্মৃতিতপ্ত প্রতিজ্ঞার ভেতর।

লীলাবতী আর রাখীকে পাশাপাশি রেখে শওকত আলী নারীর যে স্পষ্ট আদল তুলে ধরেন, তাদের ধর্ম হিন্দু নয়, ইসলাম নয়, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্ট নয়— মানুষের উত্তরাধিকার সৃষ্টি করে চলে তারা, প্রজন্মের বাহক তারা; তাই বলে তাদের নিছক সন্তান জন্মদানের আধার ভাবার মতো প্রচলিত ধারণাও নয় তা। শওকত আলী আসলে বলতে চান, ধর্মজ লোকাচার ও ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের নতুন এক গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় ‘নারী’ নামের এ ধর্মাবলম্বীরা। এমন ইঙ্গিত দিতে তাঁর সমস্যাও হয় না, কারণ আদর্শবাদী মানুষ হওয়ার পরও তাঁর মূল আগ্রহের জায়গাটি হলো, পরিবর্তনের ধারাকে খুঁজে ফেরা। এক সাক্ষাত্কারে তিনি খোলাখুলিই বলেছেন, এভাবে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া, এটিকে তিনি ঠিক সমর্থন করেন না। তবে সময়টা তখন ষাটের দশক। সমাজে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তন আসছে, চিন্তাচেতনায়ও পরিবর্তন আসছে। তাঁর নিজের আশপাশের অনেককেও তিনি দেখেছেন সেই পরিবর্তনকে সমর্থন করতে, ধারণ করতে। বলেছেন তিনি, শুধু বিবাহিত হলেই দৈহিক সম্পর্ক আর বিবাহিত না হলে তা হবে না, এমন চিন্তাভাবনা তখন অনেকের কাছেই পুরনো সংস্কার হয়ে উঠছে। তিনি শুধু সেই চিন্তার পরিবর্তনকে, জীবনযাপনের পরিবর্তনকে ধরেছেন। সমর্থন করেননি। যতদূর মনে পড়ছে, নূর কামরুন নাহারকে দেয়া এ সাক্ষাত্কারে তিনি এমনও বলেছিলেন, রাখীর পরিবর্তন কিন্তু ভালো হয়নি। তবে সততার সঙ্গে তিনি সেই জীবনবোধকেই তুলে ধরেছেন, ষাটের দশক যাকে অনিবার্য করে তুলেছিল। আদর্শবোধকে লালন করার পরও এই যে নির্লিপ্ত অবস্থান নেয়া, তা অনেক সাহিত্যিকের পক্ষেই সম্ভব হয় না, বড় বেশি জাজমেন্টাল হয়ে ওঠেন তারা। কিন্তু শওকত আলী তা হননি, আর তাই তাঁর হাত দিয়ে আমরা পেয়েছি প্রদোষে প্রাকৃতজন ও ট্রিলজি— ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’ ও ‘পূর্ব রাত্রি পূর্বদিন’-এর মতো উপন্যাস। ঊনসত্তরকে ‘চিলেকোঠার সিপাই’য়ের মধ্যে দিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেভাবে দেখেন, শওকত আলীর এ ট্রিলজির সঙ্গে সেই দেখার একটি অন্যতম পার্থক্য হলো, শওকত আলী ষাটের দশকের মধ্যবিত্তের পরিবর্তনটিকেই বড় করে দেখেছেন, আর সেই পরিবর্তন শুধু তাঁর বিপ্লবমুখিনতাকে ঘিরে নয়; উচ্চবিত্ত হওয়ার স্বপ্নকে ঘিরেও মধ্যবিত্ত যে কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, তাও তিনি নগ্ন করে তুলে ধরেন তাঁর ট্রিলজিতে। আবার তাঁর আরো তিনটি উপন্যাস— ‘ওয়ারিশ’, ‘দলিল’ ও ‘উত্তরের খেপ’— এগুলোও ট্রিলজির আবহ ছড়ায়, দেশভাগের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে দেশভাগের শিকার মানুষগুলোর জীবনকে রচনা করেন তিনি বিচ্ছিন্ন কাহিনীর মধ্যে দিয়ে। যে মধ্যবিত্তকে এখন আমরা দেখি, অর্থনৈতিকভাবে অনেক প্রসারিত, ভিত্তি অনেক গভীর প্রোথিত কি সমাজে কি রাজনীতিতে, সেই মধ্যবিত্তের তখন ষাটের কিংবা সত্তরের দশকে কেবল উত্থানকাল; তাই এ মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক উচ্ছৃঙ্খলা আর সাংস্কৃতিক বৈকল্যই যেন তখন বড় বেশি চোখে পড়ত, যেমন করে চোখে পড়ে শওকত আরীর ‘পিঙ্গল আকাশ’ উপন্যাসেও। এখনো এ অবস্থার খুব বেশি হেরফের হয়নি বটে; কিন্তু মধ্যবিত্ত এখন শ্রেণীকাঠামোর সবচেয়ে বিস্তৃত অংশ, তাই ভারসাম্যও অনেক বেশি; অন্য শ্রেণীগুলোকেও তাই কখনো কখনো মনে হয় এর মুখাপেক্ষী।

প্রদোষে প্রাকৃতজনে মানুষের ধর্মের যে পরিবর্তনশীলতা দেখি, দক্ষিণায়নের দিন নামের ত্রয়ী উপন্যাসে এসে সেই পরিবর্তনশীলতাকে দেখি রাষ্ট্র ও শ্রেণীর দেয়ালে ধাক্কা দিতে। শওকত আলী যেন প্রকারান্তরে বলেন, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আর সাধনাই মূল, তাই প্রকৃতিতে বারবার নতুন নতুন রূপে এ পরিবর্তনশীলতাই অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে এ পরিবর্তনের পথে দ্বন্দ্ব আর পিছুটান তাঁকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষতও করে। প্রদোষে প্রাকৃতজনেই তো দেখি এমন ক্ষতবিক্ষত মৃিশল্পী শ্যামাঙ্গকে— একদিকে সে পূর্বপুরুষের সংস্কারকে মহামূল্যবান মনে করে, অন্যদিকে তার শিল্পীসত্তা তাকে সেসব অস্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করে। তার মনে পড়ে, ‘গৌড়ীয় রীতি কোনো রীতি নয়, এ হলো রীতিভঙ্গের রীতি, জগতের সত্য রূপটি, শাশ্বত রূপটি সে রীতিতে ধারণ করা যায়, সেটিই গৌড়ীয় রীতি।’ সে দ্বিধান্বিত হয়, যেমন দ্বিধান্বিত থাকে প্রতিটি শিল্পমানস। লীলাবতীকে সে বলে, বাইরে থেকে ঘুরে এসেই নতুন ধর্মে দীক্ষিত হবে সে, যবন হয়ে যাবে। কিন্তু তার আর ফেরা হয় না, মৃত্যু এসে কেড়ে নেয় তাকে। নতুন এক ধর্ম, তার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে দেখি নীরবে এ কথাও ঘোষিত হচ্ছে— তরবারিই মূল। আবার ট্রিলজিতেও মানুষকে মুক্তি খুঁজতে দেখি নানা রূপে— শ্রেণীসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে, শ্রেণী অবস্থান পরিবর্তনের সাধনার মধ্যে দিয়ে। দেখি, নতুন এক সময় আসছে। 

অবশ্য, শেষ পর্যন্ত শওকত আলী নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনেরই রূপকার। এমনকি আদিবাসীরাও খুব সহজে উঠে আসে তাঁর লেখায়। বোধকরি তিনিই আমাদের শক্তিমান প্রথম লেখক, যিনি বারবার এ দেশের এসব অবহেলিত জনপদের মানুষের কাছে ফিরে গেছেন, তাদের জীবনযাপন আর সুখদুঃখকে অবলোকন করেছেন নিবিড়ভাবে। ধর্ম, জাতীয়তা আর শ্রেণী অবস্থানের বিভিন্নমুখী ধারাকে কাটাছেঁড়া করার মধ্যে দিয়ে নিজস্ব একটি স্বর তৈরি করে নিয়েছেন তিনি, হয়ে উঠেছেন আমাদের এক শক্তিমান প্রাকৃতমানুষ; একদঙ্গল মধ্যবিত্ত— চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় মধ্যবিত্তপ্রেমী লেখকের মধ্যে একমাত্র প্রাকৃতপুরুষ।