২০০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ডিনারের সময় আলজেরীয় ইসলামপন্থী ও আফগান জিহাদের অভিজ্ঞ যোদ্ধা আব্দুল্লাহ আনাসের সঙ্গে ফরাসি পণ্ডিত মারিয়াম আবু জোহাবের পরিচয় ঘটে। একপর্যায়ে কথাবার্তা আফগানিস্তান প্রসঙ্গে মোড় নেয়। আরবিতে কথা বলছিলেন মারিয়াম আবু জোহাব। তিনি তখন দেশটিকে ভালোবাসার কথা বলেন। আনাসের কৌতূহল বেড়ে ওঠে। ১৯৮০-এর দশকে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে গিয়েছিলেন কিনা জানতে চান আনাস। ওখানে বেশ উল্লেখযোগ্য একটা সময় কাটানোর কথা জানালেন তিনি। ‘কিন্তু আফগানিস্তানে কী করছিলেন আপনি? আপনি কি সাংবাদিক?’ জানতে চাইলেন আনাস। দেখলেন, মাথা নাড়ছেন মারিয়াম। হেঁয়ালিময় ফরাসি নারীর কথার অর্থ উদ্ধারে আরো কয়েকটা প্রশ্নও করা হলো। ওখানে কি তিনি কর্মী বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছিলেন? জানতে চাইলেন আনাস। স্পষ্টতই আমোদিত অভিব্যক্তিতে বারবার নেতিবাচক উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ‘তাহলে আফগানিস্তানে কী করছিলেন আপনি?’ মরিয়া হয়েই শেষে জানতে চান আনাস। ‘জিহাদ,’ হাসিমুখে জবাব দেন মধ্যবয়সী এ নারী।

এ কথোপকথনের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে তার পরিহাসময় উত্তর নিজের উগ্রপন্থী অতীত-গ্লানির সঙ্গে তখনো যুঝে চলা আনাসকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। ‘তিনি এতটাই ঝাঁকি খেয়েছিলেন যে, খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া আর সাহসে কুলোয়নি। স্রেফ চেয়ার আঁকড়ে বসে আলোচনা শুরুর অপেক্ষা করেছেন।

এটাই মারিয়াম জানেন, আফগান বন্ধুদের ভালোবেসে দেয়া নাম, কৌতূহল উসকে দিয়ে শ্রোতাদের হতচকিত করে দেয়ার প্রথম ঘটনা ছিল না। এমন নয় যে, তিনি গোপনীয়তাপ্রিয় ছিলেন। স্রেফ তার অতীত জীবনগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি থেকে অন্যদের বিরত রাখার একটা বিশেষ গুণ ছিল তার। কারণ ১ নভেম্বর, ২০১৭ ক্যান্সার তার জীবন কেড়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত বিড়ালের মতোই একাধিক জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

 

নতুন দিগন্তের আকাঙ্ক্ষা

১৯৫২ সালে উত্তর ফ্রান্সের একটি গ্রাম হন-হার্গিসে জন্মগ্রহণকারী মারিয়াম আবু জোহাবের আসল নাম ছিল মেরি-পিয়েরে ওয়াকম্যান। ছোটখাটো এক শিল্পপতি পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। বড় হয়েছেন ক্যাথলিক পরিবেশে। নিজ পরিবেশে এক ধরনের রুদ্ধতার বোধ থেকেই বেশ গোড়ার দিকে নতুন নতুন দিগন্তের প্রত্যাশী ছিলেন তিনি। প্যারিসে পাড়ি জমানো ছিল এই লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ। ১৭ বছর বয়সে এন্ট্রান্স পাস করে বিখ্যাত ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ (সায়েন্সেস-পো নামেই বেশি পরিচিত) ভর্তি হন এবং এখান থেকেই তিন বছর পর গ্র্যাজুয়েশন করেন।

২০ বছর বয়সে তার ভেতর স্বল্প খরচে ভ্রমণের ঝোঁক দেখা যায়। ১৯৭২ সালে আন্তঃইউরোপ ট্রেন টিকিট কিনে বড় ভাইয়ের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী সফর করেন। পরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন মেরি-ফ্রান্স মোরিগটের কাছে স্বীকার গিয়েছিলেন যে, ইতালীয় পুলিশ দুই ভাইবোনকে পার্কে ঘুমোতে দেখে অল্প সময়ের জন্য আটক করেছিল। মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন ওরা। কিন্তু টিকিটগুলো তখনো বৈধ ছিল। তো আবার পথে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একাই ফিরে যান ওয়ার-শতে।

পরের বছর স্থলপথে ভারতে আসেন তিনি। এ সময়ই (১৯৭৩-৭৪) আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং সেই সঙ্গে ভারতের লক্ষেৗ শহর আবিষ্কার করেন। এ শহরের প্রতিই বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। তার প্রশংসনীয় ভাষাগত দক্ষতা অন্য পর্যটকদের তুলনায় এসব সমাজের সঙ্গে ঢের গভীরভাবে মেশার সুযোগ করে দিয়েছিল। বলা দরকার, রাজনীতি বিজ্ঞানের পাশাপাশি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশনসে (ইসারকো) হিন্দি, উর্দু ও আরবি পড়েছেন তিনি এবং ফার্সি, পশতু ও পাঞ্জাবি শিখেছেন। ১৯৭৫ সালে প্যারিসের গ্রেট মস্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ইসলাম ধর্মে দীক্ষাও এমনি মেলামেশায় সাহায্য করেছে। স্বঘোষিত শিয়া হওয়ার পর মেরি-পিয়েরে মারিয়াম নাম গ্রহণ করেন।

একটা শাটলকক বোরকার আড়ালে কষ্টকর ও বিপজ্জনক যাত্রার ভেতর দিয়ে তিনি আফগানিস্তান সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞান লাভ করেন।

মধ্য ১৯৭০ দশকের ফ্রান্সে তার ধর্মান্তর কিছুটা অস্বাভাবিকই ছিল। যদিও সেই সময়ের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী শিয়াবাদের অতীন্দ্রিয়বাদী ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এদের ভেতর ছিলেন বিখ্যাত কোরিওগ্রাফার মরিস বেইয়ার্ত। ১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে ইতালীয় সুফি গুরু নুর আলি এলাহির মাধ্যমে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি।

ধর্মান্তর তাকে আদি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে থাকলে সেটা তার স্বামী এক তরুণ সিরীয় নাজেম আবু জোহাবের কাছেও উদ্বেগজনক ছিল। সেক্যুলার মানসিকতার মধ্যবিত্ত সুন্নি পরিবারের এ তরুণের সঙ্গে দামাসে মারিয়ামের প্রথম দেখা হয় এবং ১৯৭৬ সালে তাদের বিয়ে হয়। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, স্ত্রীর ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারটা বরং উদ্বেগজনকই ছিল। গোটা পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে রাজনৈতিক আলোড়নের সেই সময়ে অবশ্য কেবল আধ্যাত্মিক ব্যাপারস্যাপারগুলো নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছিলেন না তিনি।

 

সীমান্তবিহীন তত্পরতা

মধ্য ১৯৭০ দশকে মারিয়াম আবু জোহাব দামাসে থিতু হওয়ার সময় তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগন্তুক ছিলেন না। এর পাঁচ বছর আগে ফরাসি ঔপন্যাসিক ও সাবেক ফরাসি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আঁদ্রে মালরোর পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সমর্থনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড’ গড়ে তোলার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন তিনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হলেও তিনি পাকিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্বাঞ্চলে মাওবাদে অনুপ্রাণিত বেশ কয়েকজন ফরাসি বুদ্ধিজীবীর পাশাপাশি কিছুদিন কাটিয়েছিলেন।

মাওয়ের খুদে রেড বুকের প্রতি এ তরুণদের অত্যুত্সাহের অংশীদার না হলেও সারা জীবনই নিপীড়িতের পক্ষেই থেকে গেছেন তিনি। ধর্মীয় নিবেদনের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেয়ে বরং এর সহযাত্রী এক ধরনের বিপ্লবী অঙ্গীকার ছিল সেটা। শিয়া ইসলামের প্রতি তার দুর্বলতার জোরালো অতীন্দ্রিয়বাদী উপাদানের পাশাপাশি নান্দনিক ও জ্ঞানসংক্রান্ত দিকও ছিল। হাজার হোক, তার লাইব্রেরির বেশকিছু বই থেকে যেমন প্রমাণিত হয়, ফরাসি রাজনীতি ও সমাজকে পাল্টে দেয়া সেই ক্ষণ, ১৯৬৮ সালের মে মাসের সন্তান ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে বাঙালিদের পক্ষে দাঁড়ানোর পর পরই ফিলিস্তিনি সংগ্রামের সক্রিয় সমর্থকে পরিণত হন তিনি। ১৯৭৫ সালে দামাসে থিতু হওয়ার আগে প্রথমবারের মতো বৈরুত সফর করেন। এখানে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনার গোড়ার দিকে একজন সমর্থক ইসসাম সারতায়ির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। তিনি সারতায়ির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার ছিলেন কিনা স্পষ্ট নয়। তবে ১৯৮৩ সালের এপ্রিলে আবু নিদাল উগ্রপন্থীদের হাতে সারতায়ি নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিল।

মারিয়াম আদৌ ‘ড্রইংরুম অ্যাক্টিভিস্ট’ ছিলেন না। গোটা বিশ্বকে গ্রস্ত করা সহিংসতার মোকাবেলা করেছেন তিনি। ১৯৮৩ সালের বসন্তে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার পর অল্প সময়ের জন্য প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের আরাফাতপন্থী উপদলের সঙ্গে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। সপ্তাহ দুয়েক আবু মুসার নেতৃত্বাধীন ফাতাহর সিরীয়পন্থী উপদলের বিরুদ্ধে বেকা উপত্যকায় লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন। সায়েন্সেস-পোর এক সাবেক সহপাঠী এলিজাবেথ পিকার্ডের কাছে এ পর্বের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এলিজাবেথ এ সময় সিরিয়ায় হাফেজ আল-আসাদের ‘সংশোধনবাদী আন্দোলন’ নিয়ে পিএইচডি করছিলেন।

কুখ্যাত ফিলিস্তিনি উগ্রপন্থীদের সঙ্গে মারিয়াম আবু জোহাবের ঘনিষ্ঠতা বিভিন্ন ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার নজর কেড়ে নেয় (১৯৮০ ও ১৯৮২ সালের মাঝামাঝি সময় প্যারিসে ইহুদি রেস্তোরাঁ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একাধিক হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। ফিলিস্তিনি সন্ত্রাস পরের বছরগুলোয় সমগ্র ইউরোপজুড়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে ছিল)। এমনকি ফ্রান্সের নেতৃস্থানীয় সন্ত্রাসবিরোধী বিচারক জাঁ-লউ ব্রুগেয়ারি তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিলেন। পরে তিনি দাবি করেন যে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে জানাশোনা ছিল বলেই তাকে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়নি।

 

শিনোগাইয়ের গড়ে ওঠা

১৯৭০ দশকের গোড়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার করা বেশির ভাগ সংকটের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষক ছিলেন মারিয়াম আবু জোহাব। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে আফগান মুজাহিদিনদের সঙ্গেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে শুরু করলেও আগের চেয়ে বেশি করে ফিলিস্তিনি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।

কয়েক দশক ধরে চালু বিভিন্ন গুজব সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদিনদের পক্ষে তার সামরিক তত্পরতায় জড়িত থাকার কথা জানায়। মধ্য ১৯৮০-এর দশকে ফরাসি সাময়িকী অ্যাক্টুয়েলে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এমনকি তিনি দক্ষিণ আফগানিস্তানে একদল আফগান যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও আভাস দেয়া হয়েছিল। এসব গুজব তার কিংবদন্তিকে ইন্ধন জোগালেও অপ্রমাণিত থেকে গেছে। তিনি আফগানদের পক্ষে তাদের সঙ্গে লড়াই করে থাকলে নিশ্চয়ই সেটা সেখানে নিজের এবং তার সংগঠনের অবস্থানকে বৈধ করার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী ও ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় মুজাহিদিন কমান্ডারদের আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমেই হয়ে থাকবে। ১৯৮২ সাল থেকে একটি ফরাসি অলাভজনক সংস্থা আফ্রেনের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে জড়িত থেকে অসুস্থ ও আহতদের চিকিত্সাসেবা দিয়েছেন তিনি। নারীদের মাঝে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতার বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং স্থানীয় স্কুলগুলোর চাহিদা জানতে সেগুলো সফর করেছেন। পরবর্তীতে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়া আফ্রেনের আরেক স্বেচ্ছাসেবী এরিক লাভেতুর ভাষ্যমতে, শিশুদের প্রতি তার দুর্বলতা ও নারী বিষয়ে তার উদ্বেগ তার ব্যক্তিত্বেরই মৌলিক উপাদান ছিল। কথিত উগ্রপন্থার চেয়ে তার রোমান্টিক দিকটাই আফ্রেনের অভিজ্ঞ সদস্যরা মনে রেখেছেন।

গজনি, যাবোল ও কান্দাহার প্রদেশে প্রচুর যাতায়াত করেছেন তিনি। অথচ বেশির ভাগ ফরাসি স্বেচ্ছাসেবী উত্তর আফগানিস্তান কিংবা পশ্চিমে হেরাতের আশপাশে কাজ করেছে। তিনি যাদের সাহায্য করছেন, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে প্রয়োজনীয় তহবিল ফরাসি সরকারের তরফ থেকে না আসার প্রতি জোর দিয়েছেন। জাকাত ও সদকার অধীনে দেয়া উপহারের মতো ছিল সেসব।

আফ্রেনে পাঠানো তার মিশন-রিপোর্টগুলো অনন্য এবং প্রায়ই যুদ্ধে লিপ্ত আফগানিস্তানের আর্থসামাজিক গতিময়তার বাঙ্ময় সাক্ষ্য। যদিও সেসব রাজনৈতিক উদ্বেগ নিয়েই সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিসরলীকরণ প্রয়াসী। তিনি বিশদভাবে কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাঘাত ঘটার কথা তুলে ধরেছেন এবং নিজের তথ্যদাতাদের ভেতর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনও লিপিবদ্ধ করেছেন (যাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে নারী শিক্ষার প্রতি অনুকূল মনে হয়েছে)। সেক্যুলার শিক্ষা বাস্তবিক উধাও হয়ে যাওয়া একটা দেশে মাদ্রাসার ইতিবাচক ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

চলাফেরাকে সীমিত ও গ্রীষ্মের তাপকে আরো অসহনীয় করে তোলা শাটলকক বোরকার আড়ালে কষ্টকর ও বিপজ্জনক সফরের ভেতর দিয়ে আফগানিস্তান সম্পর্কে নিবিড় ধারণা লাভ করেন তিনি। লিবারেশনের সাবেক সংবাদদাতা জাঁ-পিয়েরে পেরিন ১৯৮৩ সালের গ্রীষ্মে রেজিস্তান মরুভূমির সীমানা বরাবর বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং এক সফরে তার সহযাত্রী হয়েছিলেন। তার সাহস আর সহনক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে গেছেন তিনি। ‘খুবই কষ্টকর যাত্রা ছিল সেটা। উটের পিঠে, মোটরবাইকে আর হেঁটে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু এর সবই সহ্য করেছেন তিনি। আমার চেয়ে বেশি করেই’— স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। অবশ্য অজেয় ছিলেন না তিনি: পেরিন যেভাবে স্মরণ করছেন, পাথুরে পথে দীর্ঘ যাত্রা তাকে ক্লান্ত করে তুলেছে। তাপের অত্যাচারে জ্ঞান হারিয়েছেন তিনি।

পেশাদারিত্ব দেখা দেয়ার আগে অতীতে পরিণত হওয়া মানবিক সহায়তার কালের সঙ্গে এসব তত্পরতা সম্পর্কিত। কাজের গোপনীয় ধরন আর টেলিযোগাযোগের অনুপস্থিতি স্বেচ্ছাসেবীদের নিঃসঙ্গতাকেই জোরালো করেছে (আফ্রেনে সাধারণত স্বেচ্ছাসেবীদের যাতায়াত খরচ মেটালেও তারা বেতনভোগী ছিল না)। আফ্রেনের অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা এতিয়েনে গিলি স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানে পা রাখার পর দু-তিন মাস ওদের সঙ্গে আর কোনোই যোগাযোগ থাকত না।’ এমনিভাবে সম্পূর্ণ মিশে যাওয়ার ফলে আফগান, বিশেষ করে পাখতুনদের সঙ্গে মারিয়াম আবু জোহাবের বন্ধনই জোরালো হয়ে উঠেছিল। অনেক সময় অপ্রত্যাশিতভাবেই ওদের প্রতি তার দুর্বলতার প্রতিদান দেয়া হতো। শিনোগাই নামেও পরিচিত ছিলেন মারিয়াম জান। পশতু ভাষায় এর মানে ‘সবুজ চোখের রূপসী’। আফগান জিহাদের সময় পাখতুন কমান্ডারদের কাছ থেকে পাওয়া বহু বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে প্রায়ই রসিকতা করতেন তিনি।

পাখতুনদের সঙ্গে রোমান্স এবং পূর্ব ও দক্ষিণ আফগানিস্তানের কিছু মুজাহিদিন কমান্ডারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রায়ই তাকে অন্ধ করে তুলত বলে সমালোচকরা মনে করেছেন। বহু ফরাসি সাংবাদিক, সাহায্যকর্মী ও কূটনীতিকই বিখ্যাত মুজাহিদ কমান্ডার আহমেদ শাহ মাসুদের তারিফ করেছেন। ২০০১ সালে এক বোমা বিস্ফোরণে তিনি প্রাণ হারান। পানশিরের সিংহ নামে পরিচিত মাসুদ ফ্রান্সে আফগান চে গুয়েভারা না হলেও কবির আত্মা নিয়ে আলোকিত মানুষ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। মারিয়াম আবু জোহাব তাকে ঘিরে থাকা কল্পকথাগুলোকে বরাবরই পশ্চিমাদের খোরাক বিবেচনা করেছেন। তিনি বরং জালাল উদ্দীন হাক্কানির মতো পাখতুন অধিনায়কদেরই পছন্দ করতেন। তাকে সবসময় বীর বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। আফগান তালেবানকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে মুক্ত সমাজকর্মী হিসেবে উল্লেখ করার পর ওদের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গিও ফ্রান্সে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তালেবানদের একটা প্রাচীনপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপিত করার বদলে তিনি তাদের আফগান সমাজের প্রচলিত অভিজাতদের (খান ও মালিক) বিরুদ্ধে দরিদ্র ও তরুণ অংশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের উত্থানকে বৈষম্যের সূতিকাগার মনে করা শহরের বিরুদ্ধে গ্রামের বিদ্রোহ মনে করতেন।

১৯৯৬ সালে আফ্রেনের জার্নালে প্রকাশিত তালেবানদের উত্পত্তিসংক্রান্ত গোড়ার দিকের টেক্সটগুলোয় সমাজিক স্তর হিসেবে শ্রেণীর কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা না হলেও তার বিশ্লেষণে জোরালোভাবেই সেটা উপস্থিত ছিল। এ দৃষ্টিকোণ তার লেখালেখিকে মার্ক্সবাদী না হলেও চলমান সমাজবিজ্ঞানের সমালোচকে পরিণত করে। বেশকিছু বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরই, বিশেষ করে পাকিস্তানে উপদলীয় সংঘাত নিয়ে তার লেখায় শ্রেণীস্তরের গুরুত্ব বিশেষভাবে দেখা দিতে শুরু করেছিল।

পাকিস্তানের ধর্মীয় রাজনীতির অর্থ উদ্ধার

মারিয়াম আবু জোহাবের হূদয়ে আফগানিস্তানের একটা বিশেষ জায়গা থাকার পরও বেশ আগেই পাকিস্তানের সঙ্গে সজীব একটা সম্পর্ক নির্মাণ করেছিলেন তিনি। এটা তাকে ১৯৮০-এর দশকে এ অঞ্চলে সক্রিয় অন্য সব সাহায্যকর্মী থেকে আলাদা করেছে। আফগানিস্তানসংক্রান্ত বিশ্বস্বীকৃত পণ্ডিত হয়ে ওঠার আগে জাইলস ডোরোনসোরো আফ্রেনের হয়ে কাজ করেছেন। তার ভাষ্যে: ‘পাকিস্তানি সমাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম আমরা। সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে খানিকটা বিতৃষ্ণও বটে। পেশোয়ারে থাকার সময় আমরা স্রেফ সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানে পৌঁছতে ব্যাকুল ছিলাম। কিন্তু চোস্ত উর্দু ও পশতু জানতেন তিনি। পাকিস্তান সম্পর্কে অনর্গল কথা চালিয়ে যেতেন। কেবল পেশোয়ার সম্পর্কে নয়, বরং দেশের আরো অনেক এলাকা সম্পর্কেও, যা সে সময়ে সত্যিই মৌলিক কাজ ছিল।’

বেশ আগে যুুক্তরাজ্যে তরুণ ছাত্র হিসেবে এক এক্সচেঞ্জ প্রগ্রামের সুবাদে পাকিস্তানিদের সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু করে কেন্টে পরপর তিনটি গ্রীষ্ম কাটান তিনি। এখানেই তার কৌতূহল তাকে স্ট্রবেরি উত্পাদক পাকিস্তানি অভিবাসীদের সঙ্গ দিতে চালিত করেছিল। অ্যাডভেঞ্চার সম্পর্কে তার খেয়ালি ধারণা, অদম্য কৌতূহল ও আধিপত্যের ভুল অংশে থাকা মানুষগুলোর প্রতি অটুট সহানুভূতি পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্ককে অনুপ্রাণিত করে। এমনকি পরবর্তী বছরগুলোয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতায় রূপ নেয়। তেমনি উর্দু ও এর সাহিত্যের প্রতি তার দুর্বলতাও নাইয়ার মাসুদের ছোট গল্প সংকলন ইত্রে-ই-কাফুর-এর তার অসামান্য ফরাসি অনুবাদে উঠে এসেছে।

বিশেষত তার জীবনের শেষ ১৫ বছরে প্রকাশিত সব রচনার কথা মাথায় রাখলে পাকিস্তানসংক্রান্ত গবেষণায় তার অবদান লক্ষণীয়। তার একাডেমিক প্রকাশনাগুলো প্রায়ই বিভিন্ন সম্পাদিত সংকলনে স্থান পাওয়ায় তার বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রাকে অনুসরণ করা সবসময় তেমন সহজ কাজ নয়। তবে ফরাসি পণ্ডিত অলিভার রয়ের সঙ্গে লেখা ইসলামিস্ট নেটওয়ার্কস: দ্য আফগান পাকিস্তান কানেকশন একটি মূল্যবান ব্যতিক্রম। ২০০৪ সালে প্রকাশিত এ বই গোটা পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে সক্রিয় বিভিন্ন ইসলামিস্ট দল ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সম্পর্কে তার অতুলনীয় জ্ঞানই তুলে ধরেছে।

 

 

রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও ইসলামিক স্টাডিজের মিলনকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তার একাডেমিক রচনাবলি ব্যাপক প্রসঙ্গকে আলিঙ্গন করেছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি তার মনোযোগ আকৃষ্ট করা প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। তিনি তার মাস্টার ডিগ্রির থিসিস এ দলের উদ্দেশ্যে উত্সর্গ করেন। এটা তার প্রগতিশীল ঝোঁকেরই আরেকটি লক্ষণ ছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় অবশ্য পাকিস্তানে প্রকাশ্য বলয়ে ইসলামের অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। প্রত্যক্ষ না হলেও শ্রেণীভিত্তিক বিশ্লেষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি তার বহুমুখী কর্মকাণ্ডের একটি সাধারণ যোগসূত্র ছিল। সামাজিক বৈষম্য, আধিপত্যের কাঠামো, শ্রেণী সংঘাত, সীমিত সম্পদের জন্য ক্ষমতার লড়াই ও ‘হতাশা’র (‘দমিতদের’ অনুপ্রেরণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বহু রচনায় তার ব্যবহার করা আবেগীয় ছবক) দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে পাকিস্তানি ধর্মীয় রাজনীতির চরিত্র উপলব্ধি করেছেন তিনি। তা সেটা সুন্নি আজনবি কিংবা ঝাংয়ে শিয়া সর্দারদের সঙ্গে আধিপত্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত আগন্তুকই হোক, কিংবা মালিক বা ফেডারেল পদ্ধতিতে শাসিত গোত্রীয় এলাকায় চ্যালেঞ্জ জানানো ‘গ্রাম্য দরিদ্র’ জনগণই হোক।

পাঞ্জাবে তার মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড মূলত সিপহি-ই-সাহাবার মতো সুন্নি আধিপত্যবাদী দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। দক্ষিণ পাঞ্জাবে তিনিই প্রথম এ দলটির সামাজিক উত্পত্তি নিয়ে গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাপত্র, বিশেষ করে ঝাংয়ে আর্থসামাজিক শ্রেণী সংঘাত ও গোত্রীয় সহিংসতা সম্পর্কিত এথনোগ্রাফিক গবেষণা ধ্রুপদী রচনায় পরিণত হয়েছে।

ইসলামি আন্দোলনসংক্রান্ত রচনার জন্যেই সুপরিচিত মারিয়াম আবু জোহাব পাকিস্তানে দ্বাদশবাদী শিয়া ধর্মীয় জীবনযাত্রারও আগ্রহী পর্যবেক্ষক ছিলেন। এক্ষেত্রে তার অবদান দেশে ধর্মীয় বিদ্যার প্রচার থেকে শুরু করে মুহররমের আচারের চমত্কারিত্ব এবং প্রাণশক্তির প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করেছিল। বিশ্বের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠীর আবাস হলেও পাকিস্তানকে যাপিত শিয়া মতবাদের গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই অগ্রাহ্য করে আসা হয়েছে। তার ৪০ বছরের ভৌগলিক ও ভাষাগত দৃষ্টিকোণ শিয়া ধার্মিকতার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পার্থক্য ও উদ্ভাবন চিহ্নিত করায় অনন্যভাবে সক্ষম করে তুলেছে। সেই সুবাদে মুহররমের ইরাকি ও ইরানি আচার এবং এ দুটো দেশকে সংযুক্তকারী শিক্ষার নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার পরিচিতি তাকে বিরল তুলনামূলক অন্তর্দৃষ্টি যুগিয়েছে।

পাকিস্তানি সমাজসংক্রান্ত তার রচনা মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ ও বহুমুখী অভিজ্ঞতা এবং বিশেষত বিগত দুই দশকে বিদেশী, এমনকি পাকিস্তানি পণ্ডিতদের কাছেও দুর্গম হয়ে ওঠা ফাতার মতো অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিতির ওপর ভিত্তি করেও গড়ে উঠেছে। জীবনের শেষ কটি বছরে ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক ব্যাঘাতের কারণে পাকিস্থানের ফাতা অঞ্চলে দেখা দেয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে ভাবিত ছিলেন তিনি। গোত্রীয় এলাকাগুলোয় যাওয়ার উপায় ছিল না বলে বাইরে থেকেই, বিশেষ করে উপসাগরীয় পাখতুন ডায়াসপোরা মারফত এসব পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় পা বাড়িয়েছেলেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফাতা থেকে আগত অভিবাসীদের সঙ্গে তার ফিল্ডওয়ার্ক তাদের স্বদেশীয় অঞ্চলে উদীয়মান সামাজিক গতিময়তা উপলব্ধির ক্ষেত্রে প্রধান উপায় ছিল।

উপসারগীয় অঞ্চলের পাখতুন অভিবাসীরা তার সর্বশেষ রচনার প্রধান বিষয় হয়ে থাকলেও সামরিক তত্পরতার কারণে ফাতাহ থেকে জোরজবরদস্তি বিতাড়িত জনগণের জন্যও উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। এটা আবার তাকে করাচিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এ শহরের প্রতি তেমন একটা দুর্বলতা ছিল না তার। তবে বছর পরিক্রমায় এখানেও তিনি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। বহু স্থানীয় দেওবন্দি ও শিয়া ধর্মযাজক ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনতেন এবং তার রচনার গভীর ও নিরপেক্ষ চরিত্রের কারণে সমানভাবে সম্মান করতেন।

তার কাজের মূল বিষয় থেকে বহু দূরের হলেও করাচির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন তার নজর এড়িয়ে যেতে পারেনি। যারা পাকিস্তানি মধ্যবিত্তদের বিকাশের ওপর লেখালেখি করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম ছিলেন। কেবল এখানে বসবাসরত পাখতুনদের বেলায়ই নয়, বরং বৃহত্তর দিক থেকে খোদ শহরের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন ছিল এটা।

ফাতাহর (অথবা আরো ব্যাপকভাবে পাকিস্তানি পাখতুনদের মাঝে) সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর একটি সামগ্রিক মোনোগ্রাফে তার নতুন গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই এটা নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। এ অবস্থায়ই অসুস্থতা তাকে কেড়ে নেয়।

 

এক উদার শিক্ষক

মারিয়াম আবু জোহাব প্রতিভাবান ও উদার শিক্ষক ছিলেন। কখনো নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক এবং ছাত্রদের পাকিস্তানি ও আফগান রাজনীতির গোলকধাঁধায় পথ দেখাতে গিয়ে ক্লান্ত হননি। তিনি ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস ও ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মতো নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে লেকচার দিয়েছেন। প্রায়ই সেগুলো এ অঞ্চলে পাশ্চাত্য হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনামূলক ছিল। বহু বছর ধরে তিনি ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান আফ্রায় অনুবাদকের কাজ করেছেন। এখানে তার একজন কন্ট্যাক্ট স্মৃতিচারণ করেছেন: ‘পাকিস্তানি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সাক্ষাত্কারের সময় প্রায়ই তাদের উদ্দেশে তিনি রীতিমতো বক্তৃতা দিয়ে বসতেন বলে প্রটেকশন অফিসাররা বিরক্ত বোধ করতেন। ব্যক্তিবিশেষের হাবভাব উপলব্ধি ও সেগুলোকে প্রেক্ষিত অনুযায়ী পুনঃস্থাপিত করার সত্যিই প্রতিভা ছিল তার।’

সত্যিকার অর্থেই তিনি ক্লাসরুমে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তার নিবিড় জ্ঞান ভাগাভাগি করে নিতেন। ইনালকোয় পশতু সাহিত্য, পাকিস্তানি ইতিহাস, দক্ষিণ এশীয় সুফিবাদ ও ডায়াসপোরীয় সম্প্রদায়ের মতো নানা বিচিত্র বিষয়ে ক্লাস নিয়েছেন। এখানে পাকিস্তান বিষয়ে এক নতুন প্রজন্মের ফরাসি পণ্ডিতদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। সায়েন্সেস-পোয় বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যীয় বিশেষজ্ঞদের (যেমন জাইলস কেপেল ও এলিসে ম্যাসিকার্ড) সঙ্গে পড়িয়েছেন। এখানে তিনি বহু তরুণ পণ্ডিতকে আরববিশ্ব বা তুরস্ক সম্পর্কে বিশেষায়ণে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

ছাত্ররা তার প্রত্যক্ষ এথনোগ্রাফিক বিদ্যা সংগ্রহের ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়ে যেত। এভাবে কাওয়ালি ঐতিহ্যের ওপর কোনো লেকচার হয়তো প্যারিসে নুসরাত ফতেহ আলি খানের সাক্ষাত্কার গ্রহণের স্মৃতিচারণ কিংবা দরগাহ সংস্কৃতির ওপর কোনো ক্লাস পর্যবসিত হতো সম্প্রতি কোনো সফরের সময় পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা তবররুক ভাগাভাগি করায়।

মারিয়াম আবু জোহাব প্রথাবিরোধী শিক্ষক ছিলেন। সায়েন্সেস-পোর তার একজন সাবেক ছাত্র স্টেফানি ল্যাখো সৌদি আরবে রাজনৈতিক ইসলামসংক্রান্ত স্বনামখ্যাত বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, ‘তার ক্লাসগুলো মামুলি ইউনিভার্সিটি সেমিনার ছিল না। আবেগ দিয়ে কথা বলতেন তিনি এবং প্রায়ই কাঠামো নিয়ে মাথা ঘামাতে যেতেন না। আমি যতদূর জানি, তিনি আমার ফিল্ডওয়ার্ক করার ইচ্ছাকে চাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এতদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন যে, কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে মিশে গেছেন।’

স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলেও শিক্ষাদান অব্যাহত রেখেছেন তিনি। এখন আর পাকিস্তানে যেতে পারছিলেন না বলে সেখানকার বন্ধুবান্ধবদের ধর্মীয় আচারের (বিশেষ করে পাক্কি শাহ মারদানের মুহররমের, যার প্রতি জীবনের শেষ দিকের বছরগুলোয় তার বিশেষ মুগ্ধতা গড়ে উঠেছিল) ছবি তুলতে বলতেন, যাতে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। এটাই তার শেষ জিহাদ ছিল— স্রোত ঠেকানোর সংগ্রাম এবং আরো কিছুদিন শিক্ষার মিশন পরিপূর্ণ করে তোলা।

এ যুদ্ধ সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে শেষযাত্রার জন্য নিখুঁতভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। ইরাকি শহর নাজাফে নিজের দাফনের ব্যবস্থা করে হাসিমুখে বন্ধুদের কাছে শিয়া উগ্রপন্থীরা এসে তাকে শেষ আবাসে নিয়ে যাওয়ার আশার কথা বলেছিলেন। তার প্রিয় বিষয়বস্তু নিয়ে গবেষণা করবে, এমন তরুণ পণ্ডিতদের তহবিল জোগানোর লক্ষ্যে একটি ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে তার আমৃত্যু সম্পর্ককে স্থায়ী করে তুলবে, এমন বেশকিছু কল্যাণ প্রকল্পেও চাঁদা দিয়েছেন। পাকিস্তানে এসব দান অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনে যোগ হবে।

এমনি মাপের যোদ্ধাকে নিরস্ত্র করতে সত্যিই মৃত্যুর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন।

 

সূত্র: হেরাল্ড ও স্ক্রলইন