পারসি ফিরোজ
গান্ধীর সঙ্গে
ইন্দিরার বিয়ে
নিয়ে সেকালে
কম আলোচনা
হয়নি। যদিও
নেহরু পরিবারের
উচ্চশিক্ষা, তাদের
রুচিশীলতা ও
অগ্রসর চিন্তাভাবনার
বিবেচনায় এমন
বিয়ে আশ্চর্যজনক
কিছু মনে
না হলেও
খোদ নেহরু
বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছিলেন। এখানে
অনেকে ধর্মের
কথা টেনে
আনেন, তবে
ধর্মীয় পার্থক্য
এখানে নারাজির
কারণ ছিল
না। সামাজিক,
পারিবারিক ও
কিছু ব্যক্তিগত
বিষয় বাধা
হয়েছিল। যদিও
সেসব অতিক্রম
করে ইন্দিরার
সঙ্গে ফিরোজের
বিয়ে ঠিকই
হয়েছিল। কিন্তু
এর মাঝে
বহু ঝড়
বয়ে গেছে
তাদের ওপর
দিয়ে।
জওহরলাল নেহরুর
ডায়েরি থেকে
জানা যায়,
১৯৪১ সালের
২৭ এপ্রিল
দেরাদুন জেলে
তার সঙ্গে
ইন্দিরার দেখা
হয়। ইন্দিরা
এ সময়
ফিরোজের সঙ্গে
তার বিয়ের
কথা তোলেন।
কিন্তু আদতে
এ কথা
আরো আগে
শুরু হয়েছিল।
১৯৩৮ সালে
ইন্দিরা অক্সফোর্ড
থেকে ফিরেছিলেন
এবং সে
সময়েই ফিরোজের
বিষয়ে জওহরলালকে
জানান। নেহরু
এ সময়
ইন্দিরাকে আরো
সময় নিয়ে
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নেয়ার পরামর্শ
দিয়েছিলেন। ইন্দিরার
ছোট ফুপু
কৃষ্ণা নেহরু
হাতিসিং তার
স্মৃতিচারণে এ
সম্পর্কে বলেন,
‘জওহরলাল
তাকে চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত নেয়ার
ক্ষেত্রে সময়
নিতে বলেছিলেন,
যেন ভারতে
থাকাকালীন ইন্দিরা
স্থানীয় তরুণদের
সঙ্গে মিশতে
পারেন। কিন্তু
ইন্দিরা তার
সিদ্ধান্ত স্থির
করে ফেলেছিল।
তাই সে
আমার ও
ন্যানের (বিজয়লক্ষ্মী
পণ্ডিতের ডাকনাম
ন্যান) সঙ্গে
কথা বলে।
ন্যান প্রথমত
এ বিয়েতে
অসম্মতি জানায়।
এক্ষেত্রে সে
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি
ইত্যাদি বিষয়েই
গুরুত্ব দিয়েছিল।’
মজার ব্যাপার
হলো, নেহরু
পরিবারে এ
ধরনের বিয়ের
ইতিহাস রয়েছে।
খোদ কৃষ্ণা
নেহরু জৈন
ধর্মাবলম্বী রাজা
হাতিসিংকে বিয়ে
করেছিলেন। বিজয়লক্ষ্মীর
স্বামী রঞ্জিত
সীতারাম পণ্ডিত
ছিলেন একজন
গুজরাটি। তারা
উভয়েই ছিলেন
অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট।
কৃষ্ণা হাতিসিংয়ের
মতে, ইন্দিরার
বিয়েতে তাদের
অসম্মতির কারণ
ছিল মূলত
ঐতিহ্য ও
সংস্কৃতিগত। ফিরোজের
পারিবারিক অবস্থান
নেহরুদের মতো
অভিজাত ছিল
না। ফিরোজের
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি
ছিল না।
এমনকি ছিল
না কোনো
নিয়মিত রোজগার।
কৃষ্ণা হাতিসিং
বলতে চান,
এ বিয়ের
ক্ষেত্রে নেহরুর
আপত্তির কারণ
ছিল ফিরোজের
বেড়ে ওঠা
এবং পরিবারের
রীতিনীতির সঙ্গে
নেহরু পরিবারের
পার্থক্য। নেহরু
পরিবার পশ্চিমা
শিক্ষা ও
সে ধারায়
অভ্যস্ত। কিন্তু
জওহরলালের মা
সাত্ত্বিক হিন্দু
পরিবারের মেয়ে
ছিলেন। কৃষ্ণা
লিখেছেন, ‘বাবা
(মতিলাল নেহরু)
বলতেন, একজন
কাকে বিয়ে
করবে সেটা
ততক্ষণ সমস্যা
তৈরি করে
না, যতক্ষণ
দুজনের পারিবারিক
অবস্থান এক
রকম থাকে।’
প্রচলিত একটি ধারণা, ফিরোজ গান্ধীর নাম ফিরোজ খান এবং তিনি মুসলিম ছিলেন। কিন্তু আদতে ফিরোজ মুসলিম ছিলেন না। তিনি ছিলেন পারসি। জরথুস্ত্রের ধর্মের অনুসারীরা এককালে পারস্য ছেড়ে ভারতে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। এরাই ভারতে পারসি নামে পরিচিত। ১৯৩৮ সালে অক্সফোর্ড থেকে ভারতে এসে ইন্দিরা যখন জওহরলালকে ফিরোজের কথা বলেন, তখন জওহরলাল বিষয়টি পছন্দ করেননি। তার একটি কারণ ফিরোজের সামাজিক অবস্থান, আরেকটি ইন্দিরার নিজস্ব মানসিকতা। ইন্দিরা তার প্রথম জীবনে অন্তর্মুখী ছিলেন। অক্সফোর্ডে নতুন বন্ধু তৈরিতে তার তেমন আগ্রহ ছিল না। তিনি একমাত্র ফিরোজের সঙ্গেই মিশতেন। নেহরু তাই চেয়েছিলেন ইন্দিরা আরো সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক। পাশাপাশি ১৯৩৮-এর নভেম্বরে নেহরু পরিবার রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়ে সময় দেয়ার মতো পরিস্থিতিতে ছিল না।
ইন্দিরা-ফিরোজের
বিয়ে সম্পর্কে
নানা কথা
প্রচলিত আছে।
যেমন একটি
হলো, এ
বিয়ের জন্য
মহাত্মা গান্ধী
ফিরোজকে দত্তক
নিয়েছিলেন। আদতে
এর কোনো
ঐতিহাসিক ভিত্তি
নেই। মহাত্মা
গান্ধী এ
বিয়েতে সমর্থন
করেছিলেন, কিন্তু
ফিরোজের নামের
গান্ধী অংশটি
মোহনদাস করমচাঁদের
নাম থেকে
আসেনি। ফিরোজের
বাবা ফারেদুন
জাহাঙ্গীর গান্ধী।
নামের প্রথম
অংশ পারসি
এবং ভারতে
বহুকালের অবস্থানকালে
কর্মের হিসেবে
গান্ধী (ব্যবসায়ী,
দোকানি অর্থ
প্রকাশক) পদবি
যুক্ত হয়েছিল।
তবে এ
কথা ঠিক,
বিয়ের আগে
ইন্দিরা ও
ফিরোজ উভয়ে
মহাত্মা গান্ধীর
সঙ্গে দেখা
করে বিয়ের
সম্পর্কে সমর্থন
চেয়েছিলেন। এমনকি
ফিরোজ গান্ধী
নিজে নেহরুর
সঙ্গে দেরাদুন
কারাগারে দেখা
করার চেষ্টা
করেন। কিন্তু
কারাগার কর্তৃপক্ষ
তাকে সে
অনুমতি দেয়নি।
এদিকে ইন্দিরা
গান্ধী তার
ফুপুদের প্রভাবিত
করার চেষ্টা
করেন। বিজয়লক্ষ্মীর
নেতিবাচক মত
শুনে ইন্দিরা
কৃষ্ণা হাতিসিংয়ের
সঙ্গে দেখা
করেন। এ
সম্পর্কে স্মৃতিচারণ
করতে গিয়ে
কৃষ্ণা লিখেছেন—
ইন্দিরা এরপর
বোম্বে এসে
আমাদের সঙ্গে
কিছুদিন থাকল
এবং তার
সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলল। রাজা
ওকে বলেছিল,
সে যদি
ফিরোজকে এতটাই
পছন্দ করে,
তবে বিয়ের
ক্ষেত্রে তার
এগিয়ে যাওয়া
উচিত। আমার
মত আমার
ভাইয়ের (জওহরলাল) মতোই ছিল।
আমি তাকে
বলেছিলাম, জীবনের
এ সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো যেন
না করে।
উত্তরে সে
আমার উদাহরণই দিয়েছিল।
‘তুমি আর
রাজাভাই’,
সে বলল,
‘একজন আরেকজনকে মাত্র ১০
দিন ধরে
চিনতে এবং
তোমরা বিয়ের
সিদ্ধান্ত নিলে।
চিট্টি [তামিল
ভাষায় ‘ফুপু’],
ফিরোজকে আমি
বহু বছর
ধরে চিনি
এবং ভালো
করে জানি।’
অর্থাৎ ফিরোজকে
বিয়ে করার
ক্ষেত্রে ইন্দিরা
মনে মনে
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নিয়েই ফেলেছিলেন।
জওহরলাল কিংবা
কৃষ্ণার ‘আরো
ছেলে দেখা’র
পরামর্শ সম্পর্কে
ইন্দিরার মত
ছিল, ‘আমি
আরো অনেক
ছেলে দেখেছি।
আর কেন
দেখব? তাছাড়া
আমি ফিরোজকে
বিয়ে করতে
চাই।’ ওদিকে
এ সময়
নেহরুর সঙ্গেও
ইন্দিরার মতানৈক্য
দেখা দেয়।
এ সম্পর্কে
একসময় ওরিয়ানা
ফাল্লাচির সঙ্গে
সাক্ষাত্কারে ইন্দিরা
গান্ধী বলেছেন,
‘সে
সময়ে আমাদের
মধ্যে অনেক
ঝগড়া হতো।
আসলে আমরা
দুজনে একই
রকম দৃঢ়চেতা
মানুষ। আমরা
কেউই হাল
ছাড়তে চাইনি।
আমার বিশ্বাস,
এ কারণে
আমাদের জীবনে
প্রবহমানতা ছিল।
সংকটগুলো না
থাকলে আমাদের
জীবন সাধারণ
ও একঘেয়ে
হতো।’
জওহরলাল ১৯৪১
সালের ডিসেম্বরে
কারাগার থেকে
মুক্তি পান।
এ সময়
ইন্দিরা বিয়ের
জন্য চাপ
দিতে থাকেন।
বৈশ্বিক রাজনীতি
ও দেশের
অবস্থার কারণে
তারা অনাড়ম্বর
অনুষ্ঠান করতে
চাইলেন। কিন্তু
সে রকম
কোনো কিছু
ঠিক করার
আগেই এদের
এনগেজমেন্টের খবর
প্রকাশিত হলে
হিন্দু ও
পারসি মৌলবাদীরা
ক্ষেপে ওঠে
এবং নানা
হুমকি দিতে
আরম্ভ করে।
অবস্থা এত
খারাপ হয়,
নেহরু একটি
গণবিবৃতি দিতে
বাধ্য হন।
বিবৃতিতে তিনি
বলেন, ‘আমি
মনে করি,
বিয়ে মূলত
পাত্র-পাত্রীর
ইচ্ছায় হওয়া
উচিত এবং
সেখানে পরিবার
আংশিকভাবে প্রভাব
রাখতে পারে।
বাবা-মা
যদিও উপদেশ
দেবেন, কিন্তু
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
পাত্র-পাত্রীর...যখন
ইন্দিরা ও
ফিরোজ একে-অন্যকে
বিয়ে করতে
চাইল, আমি
তাদের সিদ্ধান্ত
স্বেচ্ছায় মেনে
নিয়েছি এবং
তাদের প্রতি
আমার আশীর্বাদ
থাকবে।’
নেহরু পরিবারের
অন্যান্য বিয়ের
ক্ষেত্রেও মহাত্মা
গান্ধীর মত
নেয়া হয়েছিল।
ইন্দিরার বিয়ে
নিয়ে তিনিও
প্রচুর হুমকিভরা
চিঠি পেয়েছেন।
তাই তিনি
বলেছিলেন, ইন্দিরা-ফিরোজের
বিয়েটা মহা
ধুমধামে করা
হোক, যেন
এটি সবাই
দেখে এবং
একটি উদাহরণ
হয়ে থাকে।
বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের
বিয়ে হিন্দু
রীতিতে হলেও
কৃষ্ণার ক্ষেত্রে
তা সম্ভব
হয়নি। ইন্দিরার
বিয়ে নিয়ে
তাই সবার
আগ্রহ ছিল।
কিন্তু খুব
বড় করে
বিয়ের অনুষ্ঠান
করা সম্ভব
হয়নি। কৃষ্ণা
হাতিসিং স্মৃতি
থেকে লিখেছেন:
মার্চের এক
উজ্জ্বল দিনে
বিয়েটা হয়েছিল। ইন্দিরার পরনে
ছিল ছোট
ছোট রুপালি
ফুল এমব্রয়ডারি করা হালকা
গোলাপি একটা
শাড়ি। শাড়িটি
তার বাবার
হাতে কাটা
সুতো থেকে
বোনা। জেলে
থাকার সময়
তিনি সুতো
কেটেছিলেন। অলংকারের বদলে সে
ফুলের গহনা
পরেছিল, যা
কিনা কাশ্মীরি রীতি। সে
শান্ত ছিল,
কিন্তু চোখেমুখে উত্তেজনা লুকাতে
পারেনি।
বৈদিক রীতিতে
হওয়া এ
বিয়ের লগ্নে
নেহরু নিজে
ইন্দিরাকে নিয়ে
শামিয়ানায় আসেন।
ফিরোজ সেখানে
তার পরিবার
নিয়ে উপস্থিত ছিল। উত্তর
ভারতের রীতি
অনুসরণে ফিরোজের পরনে ছিল
খাদি শেরোয়ানি ও চুড়িদার। বর-বধূ
পবিত্র অগ্নির
সামনে বসেছিল। কনের বিপরীতে ছিলেন তার
পিতা ও
পিতার পাশে
একটি শূন্য
আসন। কমলা
নেহরুর স্মৃতিতে আসনটি খালি
রাখা হয়।
বিয়ে নিয়ে
যত মত-অমত
থাকুক না
কেন, হিন্দু
রীতি অনুসারে
জওহরলাল তার
কন্যা ইন্দিরার
হাত নিজে
ফিরোজ গান্ধীর
হাতে রেখে
সম্প্রদান করেন।
পিতা-কন্যার
মধ্যে যে
সংকট তৈরি
হয়েছিল তা
বেশি দিন
টিকে থাকেনি।
কাশ্মীরে হানিমুন
করতে গিয়ে
জওহরলালকে ইন্দিরা
লিখেছিলেন, ‘তোমাকে
যদি এখান
থেকে একটু
ঠাণ্ডা বাতাস
পাঠাতে পারতাম!’
কাশ্মীরের আবহাওয়া
নিয়ে পিতাকে
পাঠানো এ
টেলিগ্রামের জবাবে
নেহরু লিখেছিলেন,
‘ধন্যবাদ,
কিন্তু তুমি
তো আম
পাচ্ছ না।’
উল্লেখ্য, এলাহাবাদের
আম ইন্দিরার
খুব পছন্দ
ছিল।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক






