জওহরলাল নেহরু স্ত্রী কমলা নেহরুকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন ১৯৩৪ সালে। কমলা তখন কলকাতার এক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তখন থেকেই তারা কন্যা ইন্দিরাকে বিশ্বভারতীতে ভর্তির স্বপ্ন দেখছিলেন। এদিকে তখন তিন বছর পুনের পিউপিল’স ওউন স্কুলে পড়ে ১৯৩৪ সালে ইন্দিরা ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেছেন। সে বছর জুলাইয়ে ইন্দিরা গেলেন শান্তিনিকেতন। ইন্দিরা এখানে ছিলেন মোটে এক বছর, ১৯৩৪-৩৫। তবে শান্তিনিকেতনের জীবনই তাকে শান্তি দিয়েছিল, এ অভিজ্ঞতা তিনি সবসময় মনে রেখেছেন। অনেকগুলো ছবি আর বাবাকে লেখা তার চিঠিতে তখনকার শান্তিনিকেতনের জীবনের চিত্র পাওয়া যায়। সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাকে যে সংগ্রাম করতে হয়েছিল, তাও জানা যায় সেসব চিঠিতে। ঘুম থেকে উঠতে হতো ভোর ৪টায়, ঘরে কোনো ফ্যান ছিল না, নিজের কাপড় নিজেকেই ধুতে হতো, ঘর পরিষ্কারও করতে হতো। সেখানে ক্লাস হতো গাছের তলায়, পছন্দের বিষয় বাছাই করে নেয়ার স্বাধীনতা ছিল। আরো ছিল উৎসব, সফরে অংশ নেয়া। এর মধ্যে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলেন মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুর সঙ্গে। পৌষমেলায় নাগরদোলায় চড়েছিলেন বাবা জওহরের সঙ্গে। ইন্দিরা বিশ্বভারতীতে থাকার সময় নাচ শিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নাটকে তিনি মণিপুরী নাচ নেচেছিলেন।

ইন্দিরা এতদিন আনন্দ ভবনে মায়ের কাছে সকালে খেতেন ব্রাউন ব্রেড, মাখন, ফল। শান্তিনিকেতনে জুটত ডাল আর পুরি। ভোর ৬টার সময় সেই পুরি আর ডাল যে খাওয়াটা বেশ কঠিন কাজ তা পিতা জওহরলালও কিছুটা মেনে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে তার থাকা-খাওয়ার আলাদা ব্যবস্থা করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু জওহরলাল মেয়েকে চিঠিতে লিখলেন যে এমন করলে কোনো সহপাঠীই ইন্দিরার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইবে না। আর শান্তিনিকেতনের অধ্যাপকরাও অপমানিত বোধ করবেন। যেকোনো পরিবেশে মানিয়ে নিতে হবে। মিশতে হবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে। জওহরলাল চিঠিতে আরো লিখছেন, পড়াশোনা করার সময় শিক্ষার্থীদের উচিত কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে কিছুদিন থাকা। এতে শ্রম ও বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ধারণা হবে। তাই বিকল্প হিসেবে শান্তিনিকেতনের আশ্রমজীবনের কঠোরতার মধ্যে কিছুদিন দিনযাপন করুক ইন্দিরা—এমনটাই চাইছিলেন জওহরলাল।

ইন্দিরা বাবার কথার অবাধ্য হননি। শিগগিরই সাধারণ শাড়ি পরে খালি পায়ে শান্তিনিকেতনের সহপাঠীদের সঙ্গে মিশে গেলেন। নিজের ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে সুযোগ থাকলেও কখনো সেগুলো সমাধানের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যাননি। শান্তিনিকেতনের বড় মেয়েদের দল নতুনদের খুব একটা পাত্তা দিত না। এমনিতে ইন্দিরা ছিলেন লাজুক, মিতভাষী। তবে বন্ধু জুটে গিয়েছিল অনেক। নানা জায়গায় ঘুরতে গেলেন। গঙ্গার তীরে পুরনো মন্দির তার খুব ভালো লেগেছিল। জওহরলালকে উচ্ছ্বসিত হয়ে চিঠি লেখেন ইন্দিরা।


কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মায়ের চিকিৎসার জন্য তার সঙ্গে জার্মানি যেতে হলো ইন্দিরাকে। এ ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরার জন্য আফসোস করে কারাগারে থাকা জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সেই চিঠির কথাগুলো ছিল মোটামুটি এ রকম—খুব ভারাক্রান্ত হূদয়ে আমরা ইন্দিরাকে বিদায় দিয়েছি। সে ছিল এখানকার বড় সম্পদ। আমি তার দিকে খেয়াল করেছি এবং আপনি যেভাবে তাকে বড় করেছেন সেটা ভেবে মুগ্ধ হয়েছি। এখানে সব শিক্ষক এক বাক্যে তার প্রশংসা করেছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সে খুব জনপ্রিয় ছিল। আশা করি দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে এবং ইন্দিরা আমাদের এখানে ফিরে আসবে।

ইন্দিরা পরিণত বয়সে তার ওপর রবি ঠাকুর ও শান্তিনিকেতনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন—শান্তিনিকেতনে আমি শিখেছিলাম চারপাশে যা-ই ঘটুক না কেন কীভাবে নিজের মতো, নিভৃতে বাঁচতে হয়। রবি ঠাকুর তার মধ্যে শিল্প ও কবিতার প্রতি আকর্ষণ জাগিয়েছিলেন।

১৯৩৬ সালে মা কমলাকে হারালেন ইন্দিরা। এরপর বেশ ভেঙে পড়েন তিনি। মায়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়া ইন্দিরাকে সময় দেয়ার মতো সময় নেহরুর ছিল না। কংগ্রেস আর রাজনীতি নিয়ে তাকে ব্যস্ত হতে হয়েছে। তার মনে হয়েছিল, এমন সময়টা ইন্দিরার বিদেশে থাকাটাই ভালো। সেখানেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। ইন্দিরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অপশনও দেয়া হয়েছিল। তিনি ইংল্যান্ডকেই বেছে নেন। অবশ্য বান্ধবহীন প্রবাসজীবন নিয়ে তিনি আশঙ্কায় ছিলেন।

লন্ডনে ইন্দিরা থাকতেন ২৪ ফেয়ারফ্যাক্স এভিনিউতে। পুনের পুরনো বন্ধু শান্তা গান্ধীর সঙ্গে একটি অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করতেন তিনি। এলাহাবাদের পারসি যুবক ফিরোজ তখন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়ছেন। তিনি ইন্দিরার মা কমলার বড় ভক্ত ছিলেন। তার সূত্রেই জড়িয়েছিলেন কংগ্রেসের কার্যক্রমে। আনন্দ ভবনে ছিল তার নিয়মিত যাতায়াত। কমলা যখন ইউরোপে চিকিৎসাধীন তখনো ফিরোজ তার পাশে ছিলেন। এবার এ দূর প্রবাসে আরেকবার ফিরোজ ইন্দিরার জীবনে হাজির হলেন। ফিরোজ এ সময় ছিলেন ইন্দিরার একেবারে বিপরীত চরিত্রের মানুষ। আড্ডাবাজ, মুখর মানুষ। ইন্দিরা শান্তাকে ফিরোজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘বিশেষ বন্ধু’ হিসেবে। ফিরোজ দুই তরুণীকে নিয়ে গেলেন এক ক্যাফেতে। রাতের খাবারও তারা একসঙ্গে খেলেন। ঘটনাটি ইন্দিরার মনে দাগ কেটেছিল। কারণ তিনি জানতেন ফিরোজ ছোটখাটো কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছিলেন।


ফিরোজ ইন্দিরাকে ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করালেন। নেহরু পরিবারে সংগীতের চল ছিল না। তাই ইন্দিরার জন্য এ ছিলেন নতুন অভিজ্ঞতা। ফিরোজের সঙ্গে দারুণ সময় কাটছিল ইন্দিরার। কিন্তু এবার লন্ডন ছাড়ার সময় হলো। যেতে হবে ব্রিস্টলের ব্যাডমিন্টন স্কুলে, উদ্দেশ্য অক্সফোর্ডে ভর্তির প্রস্তুতি। নেহরু লন্ডনের বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করেই ইন্দিরার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রগতিবাদী, বামধারার এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন মিস বিয়েত্রিচ বেকার। এখানে ইন্দিরার সহপাঠী ছিলেন পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট ইংরেজ সাহিত্যিক আইরিশ মারডক। তিনি স্কুলে ইন্দিরার স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন—

সে ছিল অসাধারণ সুন্দরী এবং হালকা-পাতলা গড়নের মেয়ে। মনে হতো তাকে যেন বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তার মর্যাদাবোধ ছিল প্রবল। আমরা সবাই বুঝতাম তার মন ভালো নেই, সে নিজের দেশে ফিরে যেতে চায়। স্কুল তার ভালো লাগত না। এজন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না; ভারতে বড় হওয়া একটি মেয়ে এই ইংলিশ বোর্ডিং স্কুলে আটকে আছে। এমনটা কারোরই ভালো লাগার কথা নয়। আমরা জানতাম, কিছুদিন আগে তার মা মারা গেছে এবং বাবা ভারতের কারাগারে বন্দি।

১৯৩৭ সালে লন্ডনের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন্দিরা অক্সফোর্ডের সমারভিল কলেজে ভর্তি হলেন। স্কুলজীবনের মতো এখানেও তার ভালো লাগেনি। অক্সফোর্ড শহর তার ভালো লেগেছিল। কিন্তু ভারতে ফিরে আন্দোলনে জড়াতে চাইছিলেন। নেহরু অবশ্য চাইছিলেন মেয়ে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করুক।

অক্সফোর্ডে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা ইন্দিরার ভালো নয়। তাদের অফার করা বিষয় রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস নাকি অর্থনীতি কোনটা পড়বেন সেটা মনস্থির করতে পারছিলেন না।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা শোনা যাচ্ছিল। অক্সফোর্ডে রাজনৈতিক-মতাদর্শিক নানা তত্পরতা শুরু হয়। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছিল বামপন্থীদের আধিপত্য। তারা ইউরোপের একনায়কতান্ত্রিক নানা প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছিল। ইন্দিরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হলেও সরাসরি কখনো সংগঠনে যুক্ত হননি। এ সময় অক্সফোর্ডে তার এক বামপন্থী সহপাঠী স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, ইন্দিরা খুবই আত্মমর্যাদাবোধ ও রাজনীতিমনস্ক মানুষ ছিলেন কিন্তু সরাসরি কোনো সংগঠনে জড়াননি। তার মন ছিল ভারতের রাজনীতিতে। তিনি অক্সফোর্ডে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন মজলিশে যোগ দেন। লেবার পার্টির ইয়ুথ উইংয়েও যোগ দেন।

অক্সফোর্ডে থাকার সময় অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণন ও জুলিয়ান হাক্সলি তাকে তাদের বাসায় দাওয়াত দিয়েছিলেন। ফিরোজ প্রতি সপ্তাহে লন্ডন থেকে অক্সফোর্ডে আসতেন ইন্দিরার সঙ্গে দেখা করতে। মাঝে মাঝে তারা দুজন মিলে সতিশ কালেকারের রুমে যেতেন, সেখানে বৈপ্লবিক ভারতীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা জমায়েত হতেন। ইন্দিরা মাঝে মাঝে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে যেতেন অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির লেকচার শুনতে।

ইন্দিরা অক্সফোর্ডে ল্যাটিন ভাষা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এর কিছুদিন পর পিতা নেহরুর সঙ্গে ঘোরেন ইউরোপের কয়েকটি দেশ। প্রাগে তার প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি। তার ফুসফুস আক্রান্ত হয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ থাকতে হলো বুদাপেস্টের হাসপাতালে। এ সময় ব্যাহত হয় অক্সফোর্ডের শিক্ষাজীবন। সমারভিলের অধ্যক্ষ ইন্দিরার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। তিনি নেহরুকে লিখলেন শীতকালটা ইন্দিরার অক্সফোর্ডে থাকা ঠিক হবে না। নিজের অসুস্থতা, বিশ্বযুদ্ধের দামামা আর ভারতের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে পিতা নেহরুকে রাজি করালেন এবং অক্সফোর্ড ছেড়ে ভারতের দিকে রওনা হলেন।

নিজের আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার বিষয়টিকে কখনো তেমন পাত্তা দেননি ইন্দিরা। জেনেভা আর শান্তিনিকেতন ছাড়া অন্য সব স্কুলের পড়াশোনা তার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল। তার বিশ্বাস ছিল সমারভিল কলেজ, অক্সফোর্ডের চেয়ে তার বাবার চিঠিতে বেশি কিছু শিখেছিলেন।

 

এসএম রশিদ: লেখক