[রাজনীতিকে সংকীর্ণ অর্থে কংগ্রেস না মুসলিম লীগ, লেবার না টোরি, ডেমোক্র্যাট না রিপাবলিকান বিবেচনা না করে যদি শাসনের দর্শন হিসেবে ভাবা যায়, তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শ্রেষ্ঠ রাজনীতি সম্পৃক্ত ভাষণটি দিয়েছেন ইংরেজিতে, এ বাংলাদেশেই ৯৪ বছর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে। এর একটি শিরোনামও আছে: The Rule of the Giant, তিনি বলেছেন, প্রকৃতির শক্তিসমূহের গোপন কথা যেহেতু মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়ে গেছে, সম্পদ ও ক্ষমতার এমনই অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি ঘটেছে যে এর বিশালত্বের কাছে মানুষের ভেতরের পাশবিকতাও ত্রস্ত হয়ে রয়েছে। প্রবৃদ্ধির যাতনা যে পৃথিবীকে সংকটে ফেলেছে তিনি তার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। দানবীয় অনুপাতের সমরযন্ত্রের ক্রমবর্ধমান দাবি মেটাতে গিয়ে আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ভয়াবহ রকম বিশাল অংকের অর্থ, কর্পোরেট রাজনীতির ভয়ংকর চিত্র—রবীন্দ্রনাথের আগে এভাবে কেউ দেখাননি। এ ভাষণের অনূদিত অংশ বিশেষ প্রকাশ করা হলো।

সেবার রবীন্দ্রনাথ ৭-১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথের ঢাকা সফরের সংবাদ ছাপানো নিয়ে আনন্দবাজার ও বসুমতির মধ্যে ভীষণ প্রতিযোগিতা চলেছে। সে সময়ের পূর্ববঙ্গে বসুমতিই বেশি জনপ্রিয় ছিল। তিনি ঢাকায় কার অতিথি হবেন তা নিয়ে রমেশচন্দ্র মজুমদার ও তার বিপক্ষ দলের মধ্যে বাদানুবাদ হয়েছে। ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ‘রাজনৈতিক’ দৃষ্টিকোণ থেকে সবাইকে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করেছেন। গোপালচন্দ্র রায়ই প্রথম ‘ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, তার কিছু বিবরণী বিতর্কিত। আগ্রহী পাঠক যথার্থ বিবরণ পেতে প্রশান্তকুমার পালের রবীন্দ্রজীবনী নবম খণ্ড দেখতে পরেন। —আ রা ]


অন্যায় পৃথকভাবে দৃশ্যমান এবং অনুভব করার মতো। কিন্তু অন্যায়গুলোর প্রায়ই একটি সাধারণ উৎস লুক্কায়িত এবং একইভাবে উপেক্ষিত রয়ে যায়। এ কালে অনাচারের আদি উৎস বলে আমি যা কিছু বিবেচনা করি এখানে তা বর্ণনার চেষ্টা করছি।

অমানবিক বিষয় নিয়ে গঠিত যে সত্য তা ভালো কিংবা মন্দ কোনোটার আওতায়ই আসে না। এ সম্পর্কে যা কেবল বলা যায় তা সময় ও পরিসরে বিদ্যমান। এ অস্তিত্বের বাস্তবতা এমন মানদণ্ডে বিচার করতে হয় যাকে গোনা যায়, পরিমাপ করা যায় এবং ওজন নেয়া যায়। কোনো বল বা সত্তার পরিমাণ কিংবা অধিষ্ঠানকাল নিয়ে যে মূল্য প্রকাশিত হয় তা দিয়ে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিষয়টির বিচার করা যায় না। পরিশুদ্ধতার একটি আদর্শে এর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত আর সে অনুযায়ীই আমরা ভালো কিংবা মন্দ বিবেচনা করি। প্রকৃতির শক্তিগুলোর গোপন কথা যেহেতু মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়ে গেছে, সম্পদ ও ক্ষমতার এমনই অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি ঘটেছে যে এর বিশালত্বের কাছে মানুষের ভেতরের পাশবিকতাও ত্রস্ত হয়ে রয়েছে।

মানুষ মিলিয়নের হিসাবে সম্পদ আহরণ করার এবং সাম্রাজ্যবাদী বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। পরিশুদ্ধতা ও সত্যের প্রমিত মানের চেয়ে পরিমাণের মাত্রা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। মহত্ত্বের বেদি দখল করে নিয়েছে বৃহত্তের প্রতিমাপূজা। মানুষের বিশ্ব যেহেতু ব্যক্তিত্বের বিশ্ব, এ অপচিত্রকরণ যদি সহ্য করা হয়, তাহলে তা মানুষকে তুচ্ছ বস্তুতে পরিণত করবে এবং বস্তুকে ধূলিতে।

জীবনের একটি বিশেষ লয় রয়েছে, জীবন নিজের জন্য যে পরিবেশ সৃষ্টি করে তার ছন্দ সেই লয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। নতুবা পুরোটাই পরিণত হয় বিষম সুরের সংগীতে, সেখানে আকস্মিক মত্ততায় ভিন্ন সময়ে ভিন্নতর বেখাপ্পা ধ্বনির সৃষ্টি হয়। ফলে যিনি সংগীতের পরিতৃপ্তি প্রত্যাশা করেন তাকে শুনতে হয় হইচই আর আত্মমহিমা প্রতিষ্ঠার স্বৈরশক্তির কাছে আত্মপ্রকাশ নীরবতায় পর্যবসিত হয়।

বর্তমান যুগে মানবসমাজের প্রবণতা যখন স্ফীত হয়ে অতিবর্ধিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া, সেখানে অতিকায় আকারের ভার আধ্যাত্মিক সমন্বয়ে বাধা না হয়ে পারে না। সম্ভবত এক বা একাধিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে অভিযোজিত। কিন্তু মূল লক্ষ্য—যা আসলে ব্যক্তিত্বের যথাযথ প্রকাশ—তা বিস্মৃত হয়ে যায়, ফলে মানুষের দৃষ্টি আপতিত হয় সোনার ডিমের ওপর এবং বিপন্ন পাখি জীবনের দাবি জানিয়েও পরিত্রাণ পায় না। যে ছুরি তাকে হত্যা করে সুনিপুণ তার দক্ষতা, যে হাত ছুরি চালনা করে তা যথার্থ কুশলী, আর এ বিস্ময়কর কীর্তিতে জনতা আনন্দে উদ্বেল—দক্ষ যন্ত্রের বিজয় এবং তার চালকের পারদর্শিতায়। ‘কিন্তু পাখিটার কী হলো? পূর্ণাঙ্গ মানুষ কোথায়—সেই ব্যক্তি?’ উচ্ছ্বসিত আত্মতুষ্ট মানুষের সামনে এ প্রশ্ন ছুড়ে দিতে সাহস লাগে। এ ধরনের প্রশ্ন সেকেলে মনে হয়, পাখির জন্য উদ্বেগের ব্যাপারটা বড্ডো পুরনো ফ্যাশনের এবং ভাবাবেগপূর্ণ; আর গৌরবময় আধুনিক হয়ে উঠে বড় ছুরি এবং এর জটিল প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি।

মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরো আকাঙ্ক্ষা যোগ করে এগোয়—এটি একটি গাণিতিক প্রক্রিয়া। জ্বালানির জন্য এর যে ক্ষুধা, আগুন ধীরে ধীরে নিভে যাওয়াতে এর কোনো মর্মযাতনা নেই। আমাদের দেহের জন্য পোশাক চাই। শরীর যেহেতু ওয়্যারড্রব নয়, একটি জীবন্ত সত্তা, পোশাক অবশ্যই যথেষ্ট হালকা ও নমনীয় হতে হবে, যাতে জীবনের সঞ্চরণের সঙ্গে সহজে নড়াচড়া করা যায়। কিন্তু পোশাক যদি হয় ভারী, ধাতব শেকল জড়ানো, তাহলে তা বিশেষ উৎসবে বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগতে পারে কিন্তু তা জীবনের সব কাজে লাগবে না। এ পোশাকে দুর্দান্ত দেখাবে, যিনি এ পোশাক পরবেন, তার ক্ষমতা প্রকাশিত হবে, তরুণ অন্তরে এ পোশাকধারীর প্রতি ভক্তি জাগবে। কিন্তু সর্বদাই এ পোশাক জীবনের ওপর মৃত্যুর ভার নিয়ে অবস্থান করবে। একইভাবে যে সমাজ রাজনীতি, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা ও বিনোদনে অতিকায় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে, তা সমাজের জীব ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে শিকলবন্দি করে ফেলে, আধ্যাত্মিক প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে, অবিরাম নিজের গোর খনন করে চলে যদিও কিছু সময়ের জন্য মনে হয় বিজয়ের সৃঙ্গে অবস্থান করছে।

অহংকারী বিশালত্ব জীবনের সারল্যের সীমারেখা ডিঙিয়ে যেতে সবসময়ই চেষ্টা করে, এটা বড্ড বাড়াবাড়ি। অপ্রয়োজনীয়তার আধিক্য একে শুষে নেয়—যেমন আগাছা-আবর্জনা বেড়ে উঠে প্রয়োজনীয়টির শ্বাসরোধ করে গুরুত্বহীন করে তোলে। বিবিধ বিষয় নিয়ে যে শিক্ষা অতিভারে বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে—সত্যিকারের সংস্কৃতির বদলে তা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ মুদ্রিত বিষয় সর্বক্ষণ মানুষের সামনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, সৃজনের উর্বর ভূমি হরেক রকম আবর্জনার স্তূপের নিচে সমাহিত হচ্ছে। বাণিজ্যের বিস্তার অস্বাভাবিক ও অতিশয়—এর ব্যস্ততা অতিরিক্ত উৎপাদনে এবং পৃথিবীর অনিচ্ছুক বৃক্ষ খনন করে উৎপাদনের উদ্বৃত্তের ঝড়ো প্লাবন সৃষ্টিতে। জীবনের সৃষ্টিশীলতার সময় ও শক্তির একটি বিশাল অংশ সরিয়ে নিয়ে যায় অন্তহীন পৌনঃপুনিক উৎপাদনের জড়বুদ্ধিজাত কাজে। জীবনের ছন্দের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সংগতিহীন গতি ও শক্তির যন্ত্র থেকে আহরিত উৎপাদন ব্যবস্থা আত্মহননের সার্বক্ষণিক একটি প্রক্রিয়া চালু করে রেখেছে।

যন্ত্রের সঙ্গে জীবনের এ অনন্ত প্রতিযোগিতায় যন্ত্র ভিন্নভাবে সময়ের হিসাব করে, জীবন আঘাত পায় ও অপদস্ত হয়। নিজেদের কাজ সঠিকভাবে করার জন্য আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সুনির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন। খুব দ্রুত যদি আমাদের দেখতে হয়, আমরা আসলে দেখতে পাই না। আমাদের মন তার পর্যবেক্ষণ ও সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার মতো পর্যাপ্ত সময় যদি না পায়, তাহলে সত্যিকার ভাবনা উপস্থাপন করতে পারে না। কিন্তু আধুনিক সংস্থাগুলোর চাকা সময় ও পরিসরের মধ্যে ঘুরপাক খাইয়ে আমাদের টেনে আনে কেবল আমাদের অন্তর্গত কৃপণ সত্তাকে পরিতৃপ্ত করার ফলাফলের জন্য, যে সত্তা সংখ্যা ও পরিমাণ ভক্ষণ করতে পছন্দ করে।

একটা সময় ছিল যখন লড়াই এবং মুনাফাকারীর পেশা প্রশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, আর বাকি সব মানুষ তাদের মানব ব্যক্তিত্বের চর্চায় পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত। কিন্তু যোগাযোগের বিজ্ঞানভিত্তিক সুযোগ এত বেড়ে গেছে যে সব বস্তুজগতে এর বিজয় ছড়িয়ে পড়েছে—লড়াইয়ের মাঠ এবং মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রেও সীমাহীন হয়ে পড়েছে। সেজন্য আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার সংস্থাগুলো দেশের সব জনগণের সম্পদের বড় অংশ আদায় করে নিচ্ছে। তার মানে যা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় তা সরু এক কোণে আর্তনাদ করছে—এটা মানবিক। বাইরে থেকে তা দৃষ্টি আকর্ষক একটি দৃশ্যপট তুলে ধরে: সংস্থাগুলোকে সমরূপ এবং যথাযথভাবে গড়ে তোলা যায়। যদি পর্যাপ্ত রসদ হাতে থাকে, তাহলে এগুলোকে অসাধারণ বৃহদাকৃতির করে তোলা সম্ভব।

দানবীয় অনুপাতের সমরযন্ত্রের ক্রমবর্ধমান দাবি মেটাতে গিয়ে আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ভয়াবহ রকম বিশাল অংকের অর্থ। সে কারণেই আমাদের টাকা বানানোর যন্ত্র বহুগুণিত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, এর বিনিময়ে তাল রাখার জন্য প্রয়োজন সমান্তরাল সংস্থা, যা সামরিক শক্তি বৃদ্ধির গাধার দৌড়ে চাবকাবে ও চেঁচাবে। শয়তান নিজেই মানুষের নিয়তি নিয়ে যে কত বড় কৌতুক করে যাচ্ছে, গুণের নামতার দেবদেবীর জন্য আমাদের যে নব্য প্রগতি, তা সেই কৌতুকের প্রক্রিয়াটি দেখার সুযোগই দিচ্ছে না। শয়তানের জটিল প্রক্রিয়ায় আবেগের অন্ধত্বের সঙ্গে যোগ হয় বিজ্ঞানের ধূর্ততা। আজকের এ পৃথিবীতে সে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এবং এভাবে ভয়ংকর হাস্যোদ্রেককর উপায়ে জীবন্ত মূল্যবোধের উপাদানগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে।

এ জাঁকালো প্রদর্শনীর বিনোদন থেকে যে মনকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা প্রয়োজন তা আমরা করতে পারি না। কল্যাণের জন্যই হোক কী অকল্যাণের জন্য মানুষের প্রতিযোগিতা খুব কাছাকাছি এসে গেছে। মানুষের ইতিহাস যদি শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রহসন হিসেবে প্রমাণ করতে চায় তাহলে আমরা যারা ভারতে আছি, আমাদের এতে অংশগ্রহণ করতে হবে, যদি তা না হয় যে ভাঁড় বিশাল এক একটা থাপ্পড় মারছে এবং অন্য ভাঁড় যার লালচে গাল এ আঘাতের শব্দের অনুনাদ সৃষ্টি করছে, সে ভূমিকায় নামতে হবে। এখন থেকে আমাদের সব সমস্যাই বৈশ্বিক সমস্যা। যখন আমাদের ঘরের ছাদ আগুনে পুড়ছে এ কথা বলতে পারা আমাদের জন্য প্রবোধ হবে না যে রাস্তার অন্য পারে আমাদের যে প্রতিবেশী তার বাড়ি থেকে আগুনের উত্পত্তি হয়েছে।

বৃহৎ-এর ভক্তরা কেমন সহজভাবে মানবিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে, তাদের মোহগ্রস্ততা স্বয়ংক্রিয়তার প্রতি বিনীত প্রণতি নিবেদন করার ট্র্যাজিক মানসিকতা গড়ে তোলে, আমরা আশঙ্কাজনকভাবে এ রূঢ় সত্যের অনুবর্তী হয়ে পড়েছি। অপ্রয়োজনীয় সামরিক রসদ উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জোর খাটিয়ে বিপুল অংকের অর্থ ছিনিয়ে নিতে হয় ক্ষুধার্ত ও পীড়িতের কাছ থেকে, জমিনের চাষীর কাছ থেকে লাঙল-বলদ বিক্রি করে যাদের এ অর্থের জোগান দিতে হয়।

এ জটিলতা সমাজ ব্যবস্থার প্রাকৃতিক অভিকর্ষ কেন্দ্র বহু দূরে ঝুঁকে পড়ায় বাইরের বেস সৃষ্টি করতে বাধ্য করে, যে ঠেস নিজেরাই অকার্যকর। একটি জীবন্ত সমাজে দ্বন্দ্ববহুল শক্তিগুলো অলিখিত প্রথা মেনে তাদের ভারসাম্য রক্ষা করে—যে প্রথা প্রতিযোগিতার স্মৃতিতে প্রণালি হিসেবে বিরাজ করে।

গড়পড়তা বুদ্ধিমত্তার মানুষের কাছে সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুধাবনের ক্ষেত্রে কখনই এত জটিল হওয়া উচিত নয়। পরিতৃপ্তির এ পন্থা এবং ভেতরের অপূর্ণ গর্তে সব দুরাচার আশ্রয় পেয়ে যায়। কারণ তা মানুষের গোটা মানসের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আমাদের একালের আইনি বিধানের বহুমাত্রিকতা ও প্রযুক্তিগত চরিত্র কেবল এটাই প্রমাণ করে যে আধুনিক সমাজের কাজে বিষয়গুলো ধরে রাখতে বিশেষজ্ঞের সাহায্যে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে শেকল ও স্ক্রু ব্যবহারের কী বিস্তৃত ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হয়।

এর বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ অর্থহীন, তার এ প্রাণহীনতার প্রতি চরম আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে আমাকে যা আঘাত করে তা হচ্ছে বিজ্ঞ আইনজীবীদের সেবা সরকার নামের যান্ত্রিক সংস্থাটির জন্য নিশ্চিত করা থাকে আর যন্ত্রণা ও ক্ষতিতে সংবেদনশীল জীবন্ত ব্যক্তিসত্তাকে ফেলে রাখা হয় তাদের নিজস্ব হতদরিদ্র কৌশলের কাছে—আইনি পথের হূদয়বিদারক গোলকধাঁধাঁ ভেতর দিয়ে পরিক্রমণ শেষে তারা যেন আইনের তন্তুজাল ভেদ করে গোটা সত্তা নিয়ে বেরিয়ে আসে। যখন বলা হয় আইনের অভ্যুদয়ের আগে সবাই সমান ছিল আমাদের অবশ্য জানতে হবে এ প্রশংসা কেবল ঈশ্বর প্রদত্ত সূর্যালোকের জন্য সংরক্ষিত থাকবে—সূর্যালোক বিশ্বজনীন বলেই নয়, কারণ এটা খুব সরল, এটাকে ব্যাখ্যা করতে পেশাজীবী ব্যাখ্যাদাতার প্রয়োজন হয় না, আবার পর মুহূর্তেই আর একজন পেশাজীবী ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে বিচারের আসনে বসা পেশাজীবী জজকে সাহায্য করেন, যে বিজ্ঞ জজ শেষ পর্যন্ত জ্ঞানগর্ভে উপসংহারে পৌঁছেন যে সৌরালোক বিতরণের প্রশ্নে কোনো উপসংহারে পৌঁছা সম্ভব নয়। আসলে সুবিচার লাভে অনিশ্চয়তা এই কঠিন ও জটিল পদ্ধতি এবং কৌশলগত খুঁটিনাটির অনিবার্য পরিণতি, আর তা আইনের আদালতকে করে তুলেছে লাইসেনসবিহীন জুয়ার আখড়ায়, যেখানে অধিকাংশ সময় সাফল্যের সম্ভাবনা ধনীদের দিকেই ঝুঁকে থাকে।

সভ্যতা কখনো এত সরল হতে পারে না, যারা এটা কল্পনা করতে পারেন না, আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন তা হলে কী করা উচিত? এ প্রশ্ন এর উত্তর থেকে যা আশা করে তা হচ্ছে নির্জনতাকে স্পর্শমুক্ত রেখে কেমন করে একটি পথ তৈরি করা যায়—তা অবশ্যই আমার জানা নেই। কিন্তু আমি জানি সে কাল খসে গেছে, যে তার নৈতিক ভূকম্পনের মাধ্যমে মৃত দ্রব্যের সংস্পর্শকদের সতর্কবাণী দিয়ে গেছে যে এ বাধা সরাতে হবে এবং নতুন জীবনের রথ বিজয় তোরণের মধ্য দিয়ে যাতে অতিক্রম করতে পারে সে পথ খোলা রাখতে হবে।

আমাদের ব্যক্তিত্ব আমাদের নিজস্ব সৃজনক্ষেত্র। আর এর উত্কর্ষ সাধন করতে হলে আমাদের জানতে হবে সব ধরনের শিল্পকলায় ক্ষমতা প্রদর্শন বড় অশ্লীল বিষয়, একজন শিল্পী তার সৃষ্টিতে সত্যিই বিনয়ী হবেন। তিনি কাজের উপকরণ এবং কাজের প্রক্রিয়ায় সমস্যার প্রদর্শনীকে ঘৃণা করেন। যে মেধা যথার্থ ঐক্যে দ্রব্যকে রূপান্তরিত করে এবং যে শক্তি দ্রব্য একত্র করে ও কাজে লাগায় তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে।

প্রাগৈতিহাসিক কালের আদিম শিল্পকলায় প্রায় সব ছবিতেই যে প্রাণীর জীবন উপস্থাপিত হয়েছে আমরা তা লক্ষ্য করেছি। তাতে সেকালের মানুষের অন্তরের পূর্ণ স্পর্শ এ বিষয়ে তাদের তীব্র আগ্রহেরই প্রকাশ— কোনো বিশেষ প্রাণীকে তাদের দেবী বানিয়ে তার মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষের তল্লাশের চেষ্টা করত। তার কারণ মানুষ তখনো প্রাণীকে সম্পূর্ণ ছাপিয়ে উঠেনি। সে যে মানুষ এ নিয়ে তার গঠিত সচেতনা জাগেনি। প্রাণী হিসেবে মানুষের চেয়ে অন্যান্য প্রাণীর অধিকতর উত্কর্ষ ছিল। আমাদের নির্মম পর্বে আমরা সগর্বে নিজেদের সিংহ কিংবা ষাঁড়ের মতো কল্পনা করতাম; সুতরাং যারা মানুষ তাদের চেয়ে ভালো ছিলাম। মানুষের বেড়ে ওঠার প্রাথমিক পর্বে এ প্রাণিজ মানসিকতা অস্তিত্বের লড়াইয়ে তাদের শক্তি জুগিয়েছে। উচ্চতর শারীরিক দক্ষতার জন্য আদিম মানুষের প্রাণিভক্তি আজ যন্ত্রে স্থানান্তর করা হয়েছে, আর আধুনিক মানুষ নিজেকে সংকুচিত করে যান্ত্রিক উত্কর্ষে রূপান্তরিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দূরের সেই কালে যখন মানুষ নিজেকে মহান কোনো প্রাণী হিসেবে কল্পনা করত, তখনো তার সামনে যে ভবিষ্যৎ তাতে ছিল বর্ণ ও সংগীতে পরিপূর্ণ বিস্তীর্ণ ভূমি। আর যখন সে মানুষ অসীম ভক্তিভরে কল্পনা করে সে কেবল কোনো এক দক্ষ যন্ত্রের উপচক্র আর তার সামনে বিশাল দরবার কক্ষ, যেখানে মৃত্যুরাজ মৃতহূদয় পুতুলের নৃত্যোৎসব করেন।

আমাদের অবশ্যই সংগঠন থাকবে। এসবের কাজ আমাদের উদ্দেশ্য সাধনে শক্তি প্রয়োগকে সহজ করে দেয়া। এসব আমাদের হাতিয়ার এবং মানুষ হচ্ছে এসব হাতিয়ার তৈরির জীব। বর্ম ও অস্ত্র ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা ছিল সীমিত, ব্যবহার ছিল সীমিত সময়ের জন্য। তার পরও দেখা যেত যারা এসব পরিহার করেছে, শেষ পর্যন্ত তারা জয়ী হয়েছে।

একটা সময় ছিল যখন শান শওকত ও ক্ষমতার প্রতি মানুষের অন্তর্গত ভালোবাসা রাজা ও শাসকশ্রেণীর সামরিক গৌরবের চমত্কারিত্বে প্রাতিনিধিক সন্তুষ্টি লাভ করত। তখন মানুষ তার সম্পদের বহিঃপ্রকাশ তার মন্দিরে, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখতে শুরু করে। তার বৈভব তীর্থ খুঁজে পায় সাধারণ আনন্দ-উল্লাসে এবং ধনবান সামাজিক জীবনে। মাথা ঘুরিয়ে দেয়া প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত বিলাসিতার বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে সঠিকভাবে মানুষের সামাজিক জীবনচর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল—আর সেখানেও জীবনের পরিপূর্ণতা। তারা কখনো কখনো রাজা ও তার প্রতিনিধিতে স্বৈরশাসনের শিকার হতো, মন্বন্তর কিংবা প্লাবনের মতো তারা এ স্বৈরাচারকে গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান করত, তাদের নিজেদের ভেতর থেকে স্বৈরাচারের অভ্যুদয় ঘটত না। এতে তাদের ভোগান্তি হতো, কিন্তু কখনো এর সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্ব ছিল না। এভাবেই রাজবংশের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাদের সামাজিক জীবনকে টিকিয়ে রেখেছে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহুগুণিত বহুমস্তক অমানব স্বৈরাচারের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

সমাজ যখন জীবন্ত অবস্থায় বিরাজ করে নৈতিক মূল্যবোধই হয়ে ওঠে এর সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। সুতরাং আদর্শ পরিস্থিতিকে আধ্যাত্মিক গুণাবলিসম্পন্ন সবচেয়ে ভালো মানুষ জনগণের প্রণতি লাভ করে থাকে। যারা এ প্রণতি প্রদান করেন, কাজটা কখনো তাদের খাটো করে না। বরং মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে তারা এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু আজ অগণিত সংখ্যক সেবাদাস অযোগ্যজনের জন্য, মুনাফাখোরের জন্য এবং যারা জানে কেমন করে তাদের মিথ্যেকে নিখুঁত সেলাই কাপড়ে ঢেকে রাখা যায় তাদের জন্য জীবন ক্ষয় করে চলেছে। এ অগণিত মানুষ একেই সভ্যতা কল্পনা করে এসেছে এবং জেনেছে এটাই ভালো।

প্রাচ্যের দাসানুদাসবৃত্তিতে সমর্পিত মানুষরা সেসব আধুনিক কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, যা এ কালের প্রগতির নির্দেশক। তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী শোষকের গাড়ির জোয়াল হওয়ার জন্য প্রস্তুত আর বিশ্বাস করে যে বোঝা তারা বহন করছে, তা তাদের কল্পনার স্বর্গে তা লাভ হিসেবে রূপান্তরিত হচ্ছে। যখন আমি বলি আমি একজন প্রতিক্রিয়াশীল তারা সন্দেহ করে, সেসব গোড়া রক্ষকশীলদের একজন সূর্যকে তার সময়মতো কাজ করে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করে, কারণ সূর্যের সময় তাদের ঘড়ির সময়ের সঙ্গে মেলে না—যে ঘড়িতে শতাব্দীর পর শতাব্দী চাবি দিতে তারা ভুলে গেছে। কিন্তু যারা আমাকে জানেন, তারা জানেন যে আমি এ অর্থহীনতার আনুগত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, মৃত ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে, সব সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে লড়েছি, যা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উন্নাসিকতাকে বাড়িয়ে চলে। আমার বিশ্বাস জীবনে; কেবল তখনই যখন জীবন প্রগতিশীল; আমার বিশ্বাস প্রগতিতে, কেবল তখনই যখন প্রগতি জীবনের সঙ্গে একই ছন্দে গাথা। অমানবের ও বৃদ্ধ সংস্কারের নিগড়ে অতিকায় কিছুর দাসত্বের বিরুদ্ধে আমি স্বাধীনতার প্রচারণা চালাই। যুক্তি বিজ্ঞানের বিকাশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হতে আমি নারাজ, কারণ যে দানব জীবনকে গিলে খায় আমি কখনো তার পক্ষে দাঁড়াইনি, কিন্তু আমি দাঁড়িয়েছি সাধারণ মানুষের পক্ষে, যারা বৃহৎ সমষ্টির বিরুদ্ধে লড়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে।