গত শতকের শুরুতে বুদাপেস্টে জন্ম নেয়া হাঙ্গেরি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক আর্থার কোয়েসলার তার জীবনে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিপদ সম্পর্কে খুব গভীরভাবেই জেনেছিলেন। লাগামহীনভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার মনও এ নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল— এ ছিল মানবাত্মায় এ ধরনের শাসনের অবক্ষয়ী প্রভাব। তিনি লিখেছেন, ‘ক্ষমতা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন এর বিপরীতটাও সমান সত্য হয়ে ওঠে— নির্যাতন তখন এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্ভোগকারীকেও দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে, তবে তা ঘটে আরো নিখুঁত, আরো ট্র্যাজিক পন্থায়।’
কোয়েসলার যদি সঠিক হয়ে থাকেন, কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার নিজেদের পাশাপাশি তাদের সমালোচকদেরও শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ হতে বাধ্য করবে। তা হলে তুরস্কের সাহিত্যমহলের দুশ্চিন্তার আরো একটি কারণ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ‘উদারপন্থি গণতন্ত্রের’ অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে আমরা ছুটে যাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগানের পার্টি একেপির ক্ষমতাসীন অভিজাত মহল বরাবরই একটি সত্য অস্বীকার করে আসছে যে, কেবল অবাধ নির্বাচনই গণতন্ত্রকে স্থায়ীরূপ দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এর জন্য আরো অনেক কিছু চা-ই: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা, নারীর অধিকার এবং সংখ্যালঘুর অধিকার এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ও স্বাধীন গণমাধ্যম। এসব জরুরি বিষয় নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল ব্যালট বাক্স বড়জোর ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনত্রাসনের’ পথই শুধু খুলে দেয়, আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হলো, শেষ পর্যন্ত তা কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার কারণে দুইশরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এটা যেমন মর্মান্তিক, তেমনি বিরাট একটা ভুল। এর ফলে সবকিছুই শোচনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু উদার ও গণতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে যারা একেপি সরকারকে উত্খাতের সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সবার আগে মাঠে নেমেছিল, তারাই এবার সবার আগে এ সরকারের শায়েস্তার মুখোমুখি হলেন, আর সরকারের চাপে
নীরব হতে বাধ্য হলেন। এটা তুরস্কের অসংখ্য পরিহাসময় ঘটনার একটি মাত্র। এ দেশে এখন ১৪০ জনেরও বেশি সাংবাদিক জেলে। সাংবাদিকদের জেলে পোরার ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশে পরিণত হয়েছে তুরস্ক। এমনকি এ বিষয়ে চীনকেও পিছে ফেলে দিয়েছে। বন্ধুবান্ধব আর সহকর্মীরা নির্বাসনে, কালো তালিকাভুক্ত, না হয় গ্রেফতার হয়ে জেলে বন্দি। দেশটির প্রখ্যাত বহুভাষাবিদ ও নারী লেখক নেকমেয়ি আলপে তার ৭০তম জন্মদিন পালন করলেন জেলের ভেতরে; ঔপন্যাসিক আসলি এরদোয়ান, ঔপন্যাসিক আহমেত আলতান, স্কলার মেহমেত আলতান, উদারতাবাদী কলাম লেখক সাহিন আলপে, ধর্মনিরপেক্ষ পত্রিকা কামহুরিয়েতের প্রধান সম্পাদক মুরাত সাবুনকু এবং তার সাহিত্য সম্পাদক তুরহান গুনে— বন্দি লেখক ও সাংবাদিকদের এ তালিকা ভীতিপ্রদ হয়ে উঠছে। গভীর আশঙ্কার কথা হলো, আমরা সবাই জানি, যেকোনো দিন এ তালিকা, এমনকি আরো দীর্ঘ হয়ে উঠতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মূলধারার লেখকরা এরই মধ্যে বেশ বাজে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন, যেকোনো সময় সরকারের আক্রোশে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা, এটা আংশিক হলেও সত্য।’ তবে আমরা যা জানি না, যারা নিজেদের ‘মুক্ত’ বলে ভাবছি, চলমান এই দমন অভিযান তাদের ওপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলছে। একজন সমালোচক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, “এসব লেখক যদি ‘ভেতরে’ থাকেন, তাহলে অন্য লেখকদের পক্ষে কীভাবে বলা সম্ভব, তারা এর ‘বাইরে’ আছেন!”
আমাদের ফিকশন দরকার— কম নয়, বরং বেশি— বিশেষ করে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার সময়ে। তবে আমাদের ফিকশন এসব ঘটনার বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত থাকবে ভাবলে তা বোকামিই হবে। আরব বসন্তের পর থেকে আমি বেশ কয়েকটি অস্থিতিশীল দেশ, বিশেষ করে মিসর, পাকিস্তান, লিবিয়া, তিউনিসিয়ার অনেক লেখকের সঙ্গে আলাপসালাপ করেছি। আমরা সবাই জানি, আপনি যদি এসব দেশের একজন ঔপন্যাসিক হয়ে থাকেন, আপনার রাজনীতিবিমুখ হওয়ার মতো বিলাসিতার সুযোগ থাকবে না। আর শিল্পের প্রতিটি শাখাই কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে অবক্ষয় আর নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিতে থাকে। আর বিশেষ করে ফিকশন এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঝুঁকিতে পড়েই— কবিতার চেয়ে গদ্যের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি। অগণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে এই দুই ধাঁচের লেখালেখির ভাগ্যে কী ঘটতে পারে— ‘সাহিত্যের প্রতিরোধ’ নামের একটি গদ্যে তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন জর্জ অরওয়েল। একজন কবি স্বৈরশাসকের কালেও টিকে যেতে পারেন, অনেক সময়েই অনাহত থাকতে পারেন বলে মনে করেছিলেন অরওয়েল। তবে গদ্য লেখকের পক্ষে তার ‘সৃজনশীলতাকে হত্যা’ না করে তার চিন্তার লাগাম টানতে পারেন না বলেই তার অভিমত। জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়া যেখানেই স্বৈরাচারী শাসনের আবির্ভাব ঘটেছে, সেখানে কীভাবে সাহিত্য রসকষহীন হয়ে দিন দিন শুকিয়ে মরেছে, অরওয়েল তার খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করেন। পর্যবেক্ষণ শেষে ভবিষ্যতের লেখকদের তিনি হুঁশিয়ার করেন: ‘কবিতা হয়তো কর্তৃত্ববাদী শাসন সয়ে উঠতে পারে, আর কিছু কিছু শিল্প কিংবা আধা-শিল্প মাধ্যম, যেমন স্থাপত্য স্বৈরশাসকের কাছে সুবিধাজনক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু গদ্য লেখকদের জন্য নীরবতা কিংবা মৃত্যুর মাঝ থেকে কোনো একটাকে বেছে নেয়ার সুযোগ নেই। ’
নীরবতা অদ্ভুত জিনিস। থিকথিকে, আঠালো বস্তু, আপনার মুখের ভেতর যত বেশি সময় ধরে রাখবেন, ততই তা পচেগলে উঠবে। যেমন মাড়ী আপনি সচেতন হওয়ার আগেই পচে ওঠে। আর তা রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বহন করে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই নীরবতা সঙ্গ ভালোবাসে। নীরব থাকা বেশি সহজ, যখন অন্যরাও একই পথ অবলম্বন করে। নীরবতা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ঘৃণা করে। নীরবতা নিঃসঙ্গতাকেও অপছন্দ করে।
অন্যদিকে গদ্যের সেইসব জিনিস দরকার পড়ে— তুরস্কের মতো মেরুকৃত আর সামষ্টিক এক সমাজে যেসব বিষয় এরই মধ্যে অর্জন করা কঠিন বলে প্রতীয়মান হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, নারী লেখকদের জন্য চ্যালেঞ্জটাও বড়। কারণ, তাদের আসলে এখনো কন্যা, না হয় স্ত্রী, আর না হয় মা হিসেবেই গণ্য করা হয়। একাই ভাবতে পারে এবং লিখতে পারে এমন একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে তাকে এখনো ততটা বিবেচনা করা হয় না। তুরস্কে, শ্রেণী ও সম্পদের পাশাপাশি বয়স ও লিঙ্গপরিচয় ভেদ-বিভেদের সবচেয়ে মোটা দাগটাই টেনে দেয়। আর নারী লেখকরা সমাজের চোখে ‘বুড়ো’ হওয়ার আগেই শ্রদ্ধা আদায়ের লড়াই করে চলে, আর তাই তারা ডিসেক্সুয়ালাইজড ও ডিফেমিনাইজড, অন্তত যতক্ষণ না সেই সময় আসে, যখন আপনি নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক বাকোয়াজি আর মর্যাদাহানির শিকারে পরিণত হতে থাকেন, আর তা দিন দিন আরো তীব্র হয়।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এ ধরনের অপবাদ-আঘাতের বড় একটা অংশই আসবে নতুন সাংস্কৃতিক অভিজাতদের মাঝে অবস্থান করা লোকজনের কাছ থেকে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে সুবিধাবাদী ‘সাংবাদিক’ আর ‘লেখকের’ আবির্ভাবের মতো দুঃখজনক আর কিছু নেই। এদের অনেকে হলেন সেই সব ব্যক্তি, যারা তাদের আকাঙ্ক্ষার অনুপাতে তেমন সফলতা পাননি। আর তারা এখন এ বিপর্যয়ের সময়ে সুযোগ নিতেই সদাতত্পর। তাদের আশা, মই বেয়ে দ্রুতই উপরে উঠে যাবেন। আর বাকিরা হলেন নবিশ লেখক বা লেখক যশোপ্রার্থী, যারা এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা আর বিশৃঙ্খলতার ফায়দা লুটতে ব্যাকুল। তুরস্কে এ ধরনের একটি দল আবির্ভূত হয়েছে, যারা প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে তাদের সহযোদ্ধা ও সতীর্থদের গ্রেফতারের দাবি জানায়, আর তাদের বাসনা যখন পূর্ণ হয়, তা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে থাকে।
এ সুবিধাবাদী প্রতিক্রিয়ার বাইরেও, আমার মনে হয়, বুদ্ধিবৃত্তিগত ও শিল্পগত স্বাধীনতা হারিয়ে তুরস্কের লেখকদের মধ্যে মূলত চার ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাবে। প্রথমে, বি-রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া— স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফসেন্সরশিপের পথে যাওয়া। এটা আসলে আমাদের নিজস্ব কল্পনার ভেতরে পলায়নেরই শামিল। নাজি পার্টির উত্থানের আগে ভিয়েনার জীবন নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা ‘গতকালের পৃথিবীতে’ স্টেফান জুইগ লিখেছিলেন, ‘তুমি সব ভুলে গিয়ে, আমি মনে মনে বললাম, তোমার মনে আর তোমার কাজের ভেতরে লুকিয়ে পড়ো, সেই জায়গায়, যেখানে তুমি কেবল তোমার জীবনযাপন করবে, কেবল নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসটুকুই ফেলবে, সেখানে তুমি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক নও, ওই নারকীয় খেলার জাদুদণ্ড নও, এখানে তোমার যে যুক্তিই থাকুক, তা উন্মাদ হয়ে যাওয়া বিশ্বে কিছুটা হলেও কাজে আসবে।’ যারা এ পথের কথা বলে, তারা বেশির ভাগ সময়ই অরাজনৈতিক বিষয়-আশয় পছন্দ করে। প্রেম ও হূদয়ভঙ্গের নিরাপদ গল্প বুনে চলে তাদের কলম। আর এরই মধ্যে আমাদের জানালার বাইরে জগত্টা আরো অমঙ্গল আশঙ্কায় ভরে উঠবে। সহকর্মী আর বন্ধুবান্ধবরা সমস্যার মুখে পড়ে যাবে। কিন্তু আমরা আমাদের বইয়ের স্তূপের নিচে মাথা লুকিয়ে রাখব। সৃজনশীলতার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা দেখাতে গিয়ে সৃজনশীলতাকে দমিত করে চলে যে শক্তি, তার চাপে আতঙ্কে ডুবে থাকব।
তার পর বলতে হয়, অতি-বুদ্ধিবাদের পথ— বিষয়ের চেয়ে শৈলীর পরিবর্তনে জোর দেয়া। এ পথে যারা এগিয়ে যান, তারা অনেক তির্যক বা লুকোচুরিময় কৌশল গ্রহণ করে লেখালেখিতে। ধরা যাক, তারা কথা বলে, তবে যা কহতব্য নয় তা বলে না, তাদের বাক্য হয়ে উঠে অতি-দীর্ঘ, তাদের বর্ণনা হয়ে উঠে অতিবেশি বিমূর্ত, যেন তাদের কখনো কোনো স্বৈরশাসককে কখনো সরাসরি স্বৈরশাসক বলতে না হয়।
আবার এমন লেখকরাও আছেন, যারা নিজেদের নতুন এক রাষ্ট্রীয় পরিবেশে নিজেকে সত্যি হোঁচট খেয়ে পড়তে দেখবেন, এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বলে। ক্ষমতা, অবিচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াইরত পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করবেন। তবে তাদের শিল্পের হয়তো উত্থান ঘটতে থাকবে, সাড়া জাগাবে, কিংবা তাদের শিল্পের মধ্যে অনেক খামতি থাকবে— বলতে গেলে, সরকারের চাপের কারণে নয়, বরং তাদের গল্পটা যে শিল্পরূপ দাবি করে অতি বেশি রাজনীতি হয়তো তাকে বিসর্জন দিয়ে বসবে।
সর্বশেষ ও চার নম্বর পথ হলো, স্যাটায়ার। তীক্ষ্ন ব্ল্যাক হিউমার। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে নিয়ে এবং যে সমাজ বারবার ভয়ে অতি কাতর, সে সমাজকে নিয়ে মশকরা চলে— এবং মশকরা চলে আমাদের নিজেদের নিয়ে, মানে লেখক শিল্পীদের নিয়ে, যারা প্রতিদিনই আগের দিনের তুলনায় একটু বেশি পরিমাণে আমাদের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালায়। এ পরিস্থিতিতে আর কোনভাবে আরো ভালো সাড়া দেয়া সম্ভব? তবে তুরস্কে হিউমার একটি বিপজ্জনক কৌশল। সে কারণেই বিস্ময়কর নয় যে, যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের মধ্যে এমনকি দেশটির অন্যতম কার্টুনিস্ট মুসা কার্ট রয়েছেন।
এ চারটি পথই আমাদের সামনে খোলা রয়েছে। তবে আমরা ছোট ছোট খোপে নিজেদের ভাগ হয়ে যেতেই দেখছি। আর এসব খোপের দেয়ালগুলো কাচের, স্বচ্ছ। এমনকি দীর্ঘদিনে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বেও ফাটল ধরেছে। অস্থিশীলতায় ডুবে থাকা বিভিন্ন দেশের লেখকরা রাজনীতি নিয়ে লিখতে ও কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনটা আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রতিটি দিন আমাদেরকে সাধারণ ও জরুরি মুহূর্তের মধ্যে, একঘেয়ে ও উজ্জীবিত দশার মধ্যে, ‘ভেতর’ ও ‘বাহির’ জগতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংস্কৃতিজগতে মোটা দাগে সাধারণীকরণের তীব্র ওঠাপড়া কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, সমাজের এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের সহমর্মিতার কীভাবে সেতু গড়ে তোলা হবে, যখন জনপ্রিয়তাপন্থী নেতাদের হাতের পুতুল হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে তারা ওঠেপড়ে লেগেছে?— প্রতিদিনই আমাদের এসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। আর তুরস্কের কথা বিবেচনা করলে, তা বেশকিছু দিক দিয়ে ব্যাপক হতাশার কারণ হয়ে ওঠে। এ আসলে আরো অনেক বড় একটা প্রবণতার অংশমাত্র। জাতীয়তাবাদ, একা থাকার ঝোঁক, গোষ্ঠীবাদিতা— একের পর পর এক এসব আবেগতাড়িত ঢেউ আছড়ে পড়ছে ইউরোপের দেশগুলোতে, আর এ ঢেউ ছড়াতে ছড়াতে এবার যুক্তরাষ্ট্রের গায়েও লেগেছে। তীব্র দেশপ্রেম আর বিদেশী বিদ্বেষ— দুইয়েরই উত্থান ঘটছে। উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠার যুগ এটা— আর উদ্বেগ থেকে ক্রোধে আর ক্রোধ থেকে আগ্রাসনে রূপ নেয়ার মধ্যে এক পা দূরত্বমাত্র। কোয়েসলার আর জুইগ যদি আজো বেঁচে থাকতেন, তারা হয়তো সময়ক্ষেপণ না করে এ নেতিবাচক উপসর্গগুলো ঠিকই চিহ্নিত করতেন।
এলিফ শাফাক। ভাষান্তর: রথো রাফি






