সব দেশেই পৌরাণিক পাখি ও প্রাণী নিয়ে কম-বেশি চর্চা হয়। গরুড় ভারতীয় পুরাণের পাখি, অন্যদিকে এ পাখি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ফিনিক্স বা হোমা পাখি ইরানে সম্মানিত। এর বাইরেও আরো কিছু পাখি নিয়ে আলাপ করা যাক।
বাংলার
বহুল প্রচলিত উপকথার ঝুঁটিওয়ালা পাখি ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমী। এ পাখিদ্বয় অতিশয় বিবেচক, দূরদর্শী ও পরোপকারী। কিন্তু তারই উপকার করবে, যাকে তারা উপকারের যোগ্য মনে করে। এ বিচক্ষণ পাখিদ্বয় জন্মান্ধ এবং তাদের দৈবদৃষ্টি সক্রিয় করার জন্য উপকারগ্রহীতার কাছ থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত প্রয়োজন হয়। তারা কোনো ব্যক্তিকে তার ভবিষ্যৎ বলার সময় সেই ব্যক্তি একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বরে গান শুনতে পায়। সেই সুরের সঙ্গে তরঙ্গায়িত হয় ভবিষ্যৎ অনুভূতি বা স্বজ্ঞা।
দুই
মাথা ও দীর্ঘ লেজবিশিষ্ট পৌরাণিক পাখি গান্দাবেরুন্দা (বেরুন্দা), যার
অপরিমেয় এবং শক্তিশালী ঐন্দ্রজালীয় শক্তি আছে। বলা হয়ে থাকে, এ পাখি হাতিকেও ঠোঁটে করে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেতে পারে। দক্ষিণ ভারতের মাদুরাই শহরের প্রাচীন মুদ্রায় এ পাখির প্রতিকৃতি পাওয়া যায় যেখানে তার ঠোঁটে একটি সাপ দেখা যায়। কর্ণাটকের চেন্নাকেশব মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞের একটি ধারাবাহিক চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। পুরো চিত্রায়ণটি বর্ণনা করলে অনেকটা এমন দাঁড়ায়—এক বিশাল অজগর হরিণকে গিলে খাচ্ছে, পাশে একটি হাতি। হাতিটি হত্যা করছে অজগরকে, হাতিটিকে আক্রমণ করেছে একটি হিংস্র সিংহ। এই সিংহকে ধ্বংস করেছে শিব তার শরভ মূর্তিতে আবির্ভূত হয়ে। এরপর শরভকে ধ্বংস করে গান্দাবেরুন্দারূপী নৃসিংহ।
গল্পটা অনেকটা এ রকম—দানব হিরণ্যকশিপুকে বিষ্ণু তার নৃসিংহ অবতার ধারণ করে হত্যা করেন। কিন্তু হিরণ্যকশিপুকে মৃত্যুর পর তার রক্তের স্বাদ গ্রহণ করেও নৃসিংহ বিষ্ণুর রূপে ফিরে যায় না। নৃসিংহের তর্জন-গর্জনে দেবতারা বিব্রত বোধ করেন এবং তারা বিষয়টি শিবকে অবহিত করেন। শিব নিজেকে শরভে রূপান্তরিত করেন। শরভ হলো মানব, সিংহ ও পাখির শক্তি ও আকৃতিতে তৈরি এক মহাশক্তি। শিব এ রূপ ধারণ করেন নৃসিংহকে পরাস্ত করতে। কিন্তু নৃসিংহও কম নয়, সে নিজেকে গান্দাবেরুন্দায় পরিণত করে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য। গান্দাবেরুন্দার দুই মাথা, কৃষ্ণ বর্ণের পালক, তীক্ষ দাঁত আর বিরাটাকার জ্বলন্ত ডানা। গান্দাবেরুন্দা ১৮ দিন ধরে শিব-শরভের সঙ্গে যুদ্ধ করে। বেরুন্দা শিব-শরভকে যুদ্ধে হত্যা করে এবং নিজেও বিস্ফোরিত হয় অতিরিক্ত শক্তি আত্মস্থ করতে না পেরে।
১৫১০
সালে বিজয়নগরের সম্রাট গান্দাবেরুন্দার পরিগ্রহণ করেন। এ পাখি মহীশুরের ওয়াদিয়ার রাজবংশের রাজকীয় প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়েছিল ৫০০ বছর আগে। আছ্যুত দেব রায়া প্রথম শাসক হিসেবে মুদ্রায় গান্দাবেরুন্দার প্রতিকৃতি ব্যবহার করেন। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরের ভাস্কর্য এবং তাম্রশিল্পে এ প্রতিকৃতি দেখা যায়। বর্তমানে এটা কর্ণাটকের দাপ্তরিক প্রতীক।
এবার
আসা যাক বৈদিক সময়ে হোমা পাখির কথায়। সে এক অবাক করা পাখি। সে পাখি বাতাসে ভেসে বেড়ায়, বাতাসেই তাদের মিলন হয়, বাতাসে ডিম পাড়ে, ডিম মাটি স্পর্শ করার আগে বাতাসেই ফোটে এবং ছানা উপরের দিকে উড়ে গিয়ে মায়ের সঙ্গে যোগ দেয়। এ পাখিরা কখনো মাটি স্পর্শ করে না। পারস্য, তুরস্কের এবং সুফি কবিদের কাছে হোমা স্বর্গের পাখি রূপে সমাদৃত।
বৈদিক
সাহিত্যে পর্বত থেকে পাখিদের সোম বৃক্ষ নিয়ে আসার কথা পাওয়া যায়। গ্রিক ও পারসিক ভাষায় ‘হ’ এবং ‘স’-এর অদল-বদল হয়েছে। যারা সিন্ধু নদের তীরে বসবাস করত, পারসিকরা তাদের বলত হিন্দু। হয়তো এ কারণে সোমা পাখিই সম্ভবত পৌরাণিক হোমা পাখি। পারস্যের পুরাণ মতে, এ পাখি কারো ওপর দিয়ে উড়ে গেলে এবং পাখির ছায়া সে মানুষের ওপর পড়লে তিনি একদিন শক্তিশালী রাজা হবেন। এই ধারণায় বিশ্বাসের কারণে মহীশুরের শাসক টিপু সুলতান তার সিংহাসনে হোমা পাখির প্রতিকৃতি যুক্ত করেছিলেন।
পৌরাণিক
হংস বা রাজহংস পবিত্রতা, ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে সংযোগ ও আত্মিক জ্ঞানের উৎসের উপস্থাপনা করে। হংসের বাস হিমালয়ের মানস সরোবরে। বৃষ্টি তাদের একেবারেই পছন্দ নয়। হিমালয়ে বৃষ্টিপাত শুরু হলেই তারা স্থলভূমিতে নেমে আসে এবং এখানে বৃষ্টি শুরু হলে আবার দ্রুত হিমালয়ের মানস সরোবরে প্রস্থান করে। তাদের ধৃতরাষ্ট্রীর সন্তান বলা হয়। বাল্মীকি রামায়ণ অনুসারে ধৃতরাষ্ট্রী কাশ্যপ ও তাম্রার কন্যা। হংস শুরুতে ছিল সাদা ও কালো রঙ মিশ্রিত হলেও পরে বরুণ দেবের আশীর্বাদে তারা ধবধবে শ্বেতহংসে পরিণত হয়; বরুণ নিজে একবার রাবণের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে হংসের রূপ ধারণ করেছিলেন। স্বর্গে দেবতারা একবার জড়ো হয়েছিলেন এক যজ্ঞের জন্য এবং তখন রাবণের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তারা বিভিন্ন পাখির রূপ ধারণ করেছিলেন। হংসরা মুক্তা খায় এবং তারা জল থেকে দুগ্ধকে আলাদা করতে পারে। নল ও দয়মন্তীর উপাখ্যানেও হংস অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।
মহাভারতে
পাওয়া যায় নবগুঞ্জরের চরিত্র, এ চরিত্রটি সৃষ্টি হয় নয় রকমের পশু ও পাখির সমন্বয়ে। ত্রিপদবিশিষ্ট মোরগের মস্তকধারী এ প্রাণীর পাগুলো হাতি, বাঘ ও হরিণ বা ঘোড়ার; চতুর্থ অঙ্গটি হলো উঁচু করে রাখা মানুষের হাত এবং এ হাতে ধরা আছে পদ্ম বা একটি চক্র। নবগুঞ্জরের ঘাড়
ময়ূরের, ষাঁড়ের কুঁজ, সিংহের কোমর ও সর্পের লেজ—এসব মিলিয়ে নবগুঞ্জরের সৃষ্টি।
ওড়িশার
পটচিত্রের খুব পরিচিত একটি মোটিফ হলো এই নবগুঞ্জর। এ প্রাণীকে বিষ্ণুর একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একদা পাহাড়ের ওপর যখন অর্জুন ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তখন নবগুঞ্জর এসে হাজির হয় এবং তার রূপ দেখে অর্জুন ভয় পেয়ে যান, একই সঙ্গে সেই বিচিত্র রূপ তাকে বিস্মিতও করেছিল। আতঙ্কিত অর্জুন তীর-ধনুক তাক করেন তাকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু অর্জুন পরমুহূর্তে বুঝতে পারেন এ হলো বিষ্ণুর রূপ। তাই তিনি তার অস্ত্র মাটিতে ছুড়ে ফেলে নবগুঞ্জরকে প্রণতি জানান।
চকোর
পাখি জ্যোত্স্না পান করে বেঁচে থাকে। ভরা জ্যোত্স্নায় চকোর চাঁদকে ভালোবেসে অশ্রু বিসর্জন করে। চাঁদের জন্য তার ব্যর্থ প্রেম চকোরকে কাঁদায় জ্যোত্স্নার উদ্ভাসিত আলোয়। মহাভারতে কুচেলা যখন কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে যায় তখন পথিমধ্যে চকোরার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তী সময়ে সে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়।
চকোরকে
সৌভাগ্যের প্রতীক বলে বিশ্বাস করা হয়। চন্দ্র দেবতা ও চকোরের মিলন ভারতীয় পৌরাণিক উপাখ্যানে অনেক ভালোবাসার গল্পের জন্ম দিয়েছে।
চাতক
পাখির গল্পটি আবার একটু ভিন্ন। কী এক অভিমানে পৃথিবীর জল পানে তার তীব্র অনীহা। কেবল বৃষ্টির সজীব জল সে পান করতে আগ্রহী। চাতকের কণ্ঠ কর্কশ। চাতক মেঘের সঙ্গে কথা বলে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য যেন বৃষ্টির সজীব জল পান করে সে তৃপ্ত হতে পারে। ঘুঘু পাখির চেয়েও খানিকটা ছোট এ পাখি সাদা, হলদে এবং কালচে রঙের দীর্ঘ লেজবিশিষ্ট। মাথার উপরের অংশে ঝুঁটির মতো আছে, যেটা দেখতে অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকানো। কালিদাস ও আদি শংকরাচার্যের লেখায় চাতক পাখির কথা এসেছে।
চাতক ও চকোর প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল— বৃষ্টির জল ও চাঁদের আলো; তাদের গল্প আমাদের প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মানেকা
গান্ধী
: ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও লেখিকা





