চিকিৎসায় ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার অ্যাংলো-স্যাক্সন সময়কার একটি প্রধান বৈশিষ্ট। প্রায় এক হাজার বছরের বেশি পুরনো ওল্ড ইংলিশ হারবাল বইটিতে কয়েকটি মূল উপাদান ছাড়া ভারতীয় আয়ুর্বেদের চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে এর অনেকখানি মিল পাওয়া যায়।
রাসায়নিক পদ্ধতিতে পরীক্ষাগারে তৈরি করা ঔষধ ব্যবহারের পরিবর্তে রোগবালাই নিরাময়ের জন্য প্রাকৃতিক ভেষজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীলতা শুধু যে প্রাচ্যদেশগুলোতেই প্রচলিত ছিল তা নয়।
বরং পশ্চিমা ও ইউরোপের দেশগুলোতেও এ ভেষজ চিকিৎসার বহুল ব্যবহার ছিল। শতবর্ষী পুরনো ওল্ড ইংলিশ হারবাল বইটি থেকে অন্তত এমনটাই জানা যায়।
প্রাচীন লাতিন পাঠ্য অনুসারে শরীরের গন্ধ দূর করতে প্রথাগত ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে হোয়াইট ওয়াইন বা সাদা মদে সবুজ ডাঁটা সিদ্ধ করে মিশ্রণ তৈরি করে খেলে তা বেশ উপকারে আসে।
কটন এমএস ভিতেলিয়াস সি (তৃতীয় খণ্ড)-এর সচিত্র এ বইটি চতুর্থ শতকে লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয় এবং এতে বুকের ব্যথা থেকে শুরু করে সাধারণ সর্দি-কাশিসহ সব ধরনের রোগ প্রতিরোধকারী ঔষধি গাছের বিশদ বর্ণনা রয়েছে। কয়েক শতক ধরে বইটি লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরির মহাফেজখানায় রয়েছে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মৌলিক পদ্ধতি ও ধারণার সঙ্গে এ বইটির অনেকাংশে মিল রয়েছে।
কটন এমএস ভিতেলিয়াস সি-ই (তৃতীয় খণ্ড) হলো প্রাচীন ইংরেজ ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে লেখা একমাত্র বই, যা এখনো টিকে আছে। চতুর্থ শতকের বেশ কয়েকজন লেখকের ধন্যবাদ পাওনা এজন্য যে, তাদের লেখাগুলো একত্রে সংকলন করে এ সংগ্রহটি মুদ্রিত করা হয়েছে। এ বৃহৎ গ্রন্থখণ্ডটির সময়ের ভারে বিবর্ণ হলদে হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলো ব্রিটিশ লাইব্রেরির আধুনিকায়নের আওতায় একই সঙ্গে অনলাইনে ও ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সহজলভ্য করা হয়েছে।
প্রচলিত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানা ও বোঝার জন্য শত শত বছর ধরে মৌলিক পাঠ্য হিসেবে প্রাচীন সংস্কৃত সুশ্রুত সংহিতা অথবা চরকা সংহিতা অনুসরণ করা হয়েছে। সেখানে ৭০০-এর উপরে উদ্ভিদের বর্ণনা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে আদা লবঙ্গ দারচিনি চন্দন প্রভৃতি। চরক সংহিতা অনুসারে, পেঁয়াজ পরিপাকের জন্য খুবই উত্কৃষ্ট, হূদযন্ত্র, চোখ ও হাড়ের জোড়ার জন্য ভালো। অধিকন্তু শিকড় আর কন্দসহ থেতো করা রসুন, পেঁয়াজ ও বুকের দুধ নাকে লাগালে তা হেঁচকি ও শ্বাসকষ্ট দূর করতে সাহায্য করে। এমএস ভাল্যায়াথানের লেখা দ্য লিগ্যাসি অব চরক (২০০৩) অনুসারে, চরক সংহিতায় উল্লিখিত প্রতিষেধকগুলো আর রসুনের রস যেকোনো ধরনের বাতুলতা বা পাগলামি এবং মহিলাদের জননেন্দ্রিয়ের প্রদাহ উপশমে বেশ কাজে দেয়।
রসুনের গুণ বা উপকারিতা নিয়ে কটন এমএস ভিতেলিয়াস সি (তৃতীয় খণ্ড)তে বেশ জোরালো আলোচনা করা হয়েছে। অন্য সব ভেষজ উদ্ভিদ থেকে রসুনকে অন্যতম ও চমৎকার ঔষধি হিসেবে লেখকরা বর্ণনা করেছেন। বইটির নির্দেশনা অনুসারে, মহিলাদের জরায়ুর ব্যথানাশের জন্য একখানা রসুন থেতো করে সেখানটায়, উপরিভাগে একটু হালকা আবরণ লাগালে তা দ্রুত ব্যথা কমতে সাহায্য করে।
ব্রিটিশ ঔষধিশালা এবং ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে লেখা এ বইটির একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো যে, এতে পাতায় পাতায় প্রয়োজনীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের ছবি দেয়া আছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির এ প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক অ্যালিসন হাডসনের দেয়া তথ্য অনুসারে, এ বইয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন— একটি উদ্ভিদের নাম বিভিন্ন ভাষায় লিখে দেয়া হয়েছে; কোন কোন রোগের চিকিৎসায় উদ্ভিদটি ব্যবহার করা যাবে এবং উদ্ভিদটি কোথায় পাওয়া যাবে; কেমন করে সংগ্রহ করতে হবে বা দাওয়াই কেমন করে প্রস্তুত করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। হাডসন তার এক ব্লগে লিখেছেন, যেসব উদ্ভিদ বিষাক্ত কামড় থেকে সেরে উঠতে সাহায্য করে, সেগুলো সাপ বা কাঁকড়ার চিত্রসহকারে সন্নিবেশ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সাপের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহূত মিষ্টি পুদিনাকে সর্প উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর পাশে একটি সাপের ছবিও জুড়ে দেয়া হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এ-জাতীয় উদ্ভিদের আশপাশে সাপের আনাগোনা থাকে।
বইটিতে কিছু উদ্ভিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো আমরা সাধারণত সবজি হিসেবে ব্যবহার করি। এ-জাতীয় উদ্ভিদগুলো খুব সহজেই পাওয়া যায়, যেমন— বাঁধাকপি, মৌরি, পুদিনা প্রভৃতি।
সালফার বা গন্ধকচূর্ণের সঙ্গে ভিনেগার ও পুদিনা পাতার রস মিশিয়ে তা মুখে লাগালে তা খুব সহজেই ব্রন দূর করে। তবে মিশ্রণটি খুব হালকাভাবে লাগাতে হবে। বাঁধাকপি শরীরের ফোলা কমাতে বা গেঁটে বাতের প্রতিকারক হিসেবে বেশ ফলপ্রসূ। প্রাণীর চর্বির সঙ্গে মৌরিদানা মিশিয়ে খেলে তা শ্বাসকষ্ট, কাশি, মূত্রথলিতে ব্যথা প্রভৃতি উপশম করে।
হাডসন আরো লিখেছেন যে, দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে বইয়ে উল্লিখিত ঔষধি উদ্ভিদগুলোর ব্যবহার নিয়ে যেমন বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি বইয়ে দেয়া ছবিগুলো দেখে অরণ্য থেকে এসব উদ্ভিদ ও প্রাণী চিহ্নিত করে খুঁজে বের করাটাও সহজ কথা নয়। বইয়ে এক জায়গায় ফলসহ স্ট্রবেরি গাছের ছবি দেয়া হয়েছে, কিন্তু সে লাল ফলগুলোর সঙ্গে এখনকার স্ট্রবেরির কোনো রকম মিল বা সাদৃশ্য নেই। অন্য এক পাতায় বানরের ছবি নিয়েও এ রকম বৈসাদৃশ্য রয়েছে। বইয়ের ছবিতে বানর উল্লেখ করা হলেও দেখলে মনে হয় যেন এটা একটা হাতি। হাতির দাঁতের সঙ্গে ওটার দাঁতগুলোর বেশ মিল দেখা যায়।
হাডসনের বিবৃতি অনুসারে বইটিতে বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে অনেক পৌরাণিক কাহিনীও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ পৌরাণিক কাহিনীগুলো দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে উদ্ভিদগুলো ব্যবহারে নির্দেশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন— তিনি ম্যানড্রেকের উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘বলা হয় যে, ম্যানড্রেক রাতে উজ্জ্বলভাবে জ্বলে এবং এটা অপবিত্র কোনো কিছু হতে দূরে পালিয়ে যায়।’ বইয়ে ম্যানড্রেকের একটি আঁকা ছবিও দেয়া আছে, পুরাকাহিনীমতে যেটির গঠন দেখতে প্রায় মানবদেহের মতোই শুধু হাত ও পায়ের বদলে ওখানটা থেকে শিকড় বেরিয়ে এসেছে। আর মাথার বদলে জুড়ে দেয়া হয়েছে একগুচ্ছ পণ্যরাজি। ম্যানড্রেক তোলার জন্য হাডসন এক অভিনব পদ্ধতির কথা বলেছেন। ম্যানড্রেকটির চারপাশটা খোঁড়ার জন্য লাগবে শাবল, এটি তুলতে লাগবে হাতির দাঁতের তৈরি যন্ত্র। টেনে তুলতে সাহায্যকারী হিসেবে লাগবে একটি কুকুর এবং ম্যানড্রেকটি তুলতে হবে এক নিমেষে কোনো রকম সময়ক্ষেপণ না করেই।
কয়েক শতক ধরেই দ্য ওল্ড ইংলিশ হারবারিয়ামটি অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ডে প্রায় অব্যবহার্য হয়ে আছে। এর পেছনে নানা কারণও রয়েছে। প্রথমত, এটি একটি লাতিন বইয়ের অনুবাদ, যে কারণে বইয়ে উল্লেখ করা ঔষধি উদ্ভিদগুলো ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জগুলোয় সহজলভ্য কিনা, তা সঠিক করে বলা যায় না। দ্বিতীয়ত, এ রকম ভিনদেশী চিকিৎসা প্রথা অ্যাংলো-স্যাক্সনরা ব্যবহার করত কিনা বা করতে জানত কিনা, তাও ভালো রকম প্রশ্নের অধীন।
সুতরাং এদিক থেকে বলা যায় যে, এ ধরনের বর্ণনা বা রূপায়ণ ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বইটির আরো একটি মূল উদ্দেশ্য হলো দ্য ওল্ড ইংলিশ হারবারিয়ামটিকে অ্যাংলো-স্যাক্সন ও মধ্যযুগের ইউরোপীয় চিকিৎসা পদ্ধতি বা আরোগ্য বিধানচর্চার মূলধারায় নতুনত্বের সঙ্গে আরো ইতিবাচক প্রেক্ষাপটের উপস্থাপন করা।






