জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ

অনুবাদ: জি এইচ হাবীব

(একত্রিংশ কিস্তি)

হোর্হে লুইস বোর্হেস ও আর্জেন্টিনার সাহিত্যের জন্ম (শেষাংশ)

নানা তত্ত্বমূলক টেক্সটে ও কিছু গ্রন্থ বা লেখক সম্পর্কিত বিভিন্ন ভূমিকায় কিংবা প্রবন্ধে বোর্হেস অনুবাদের প্রশস্তি গেয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজেও একজন সক্রিয় অনুবাদক ছিলেন।

{ইতোমধ্যে উল্লিখিত অনুবাদগুলো ছাড়াও আমরা পাই: ‘El Ulises de Joyce’ (১৯২৫); ‘Las dos maneras de traducir’ (১৯২৬); পল ভ্যালেরি সম্পর্কিত প্রস্তাবনা El cementerio marino (নেস্টর ইবারা অনূদিত, ১৯৩১); ‘Lawrence y la Odisea’ (১৯৩৬); ‘Walt Whitman; Canto a mí mismo’ (১৯৪২); ‘Sobre el doblaje’ (১৯৪৫); ‘Cansinos-Asséns y Las mil y una noches’ (১৯৬০); ‘Las mil y una noches’ (১৯৮০); ‘El Traductor’ (১৯৮৫)}

কয়েকটি বই সম্পূর্ণ অনুবাদ করেছিলেন তিনি, যেমন, উইলিয়াম ফকনারের ওয়াইল্ড পাম্স্, ভার্জিনিয়া উলেফর অরল্যান্ডো এবং আ রুম অব ওয়ান’স ওউন আর কাফকার মেটামরফসিস; তবে তার বেশির ভাগ অনুবাদই ছিল বিভিন্ন সাময়িকী ও সংকলনের জন্য করা অপেক্ষাকৃত ছোট রচনা।

{বোর্হেস জার্মান, ফরাসি ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন। যেসব লেখকের রচনা তিনি অনুবাদ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্স কাফকা, আন্দ্রে জিদ, ভিলিয়ার্স ডি লাইল অ্যাডাম, হার্ট ক্রেন, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, রুডইয়ার্ড কিপলিং, হারম্যান মেলভিল, ইউজিন ও’নীল, এডগার এলান পো, কার্ল স্যান্ডবার্গ, ওয়ালেস স্টিভেন্স, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ওয়াল্ট হুইটম্যান। তিনি প্রাচীন ইংরেজি থেকেও অনুবাদ করেছেন: Beowulf, The Seafarer প্রভৃতি। যেসব রচনা সংকলনে বোর্হেস লিখেছেন, সেখানে অন্যদের অনুবাদে অন্য ভাষার লেখা হিস্পানিতে অনূদিত অবস্থায় রয়েছে।}

সেই সংকলনগুলো আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, তিনি কেবল একটি ব্যক্তিগত কাজই নয়, বরং একটি ক্যানন (canon) সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, ‘বিধি’ হিসেবে শব্দটির উৎসগত অর্থেই। Inquisiciones (১৯২৪) থেকে শুরু করে Otras Inquisiciones (১৯৫২) পর্যন্ত তার প্রবন্ধের বইগুলো, অথবা তিনি এককভাবে বা আদলফো বিয়য় কাসেরাসের সঙ্গে যৌথভাবে যেসব সংকলন তৈরি করেছিলেন, সেসবে নমুনাস্বরূপ কিছু অনুবাদ রয়েছে।

{Antología de la literatura fantástica (১৯৪০), Cuentos breves y extraordinarios (১৯৫৫), Libro del cielo y del infierno (১৯৬০), Libros de los seres imaginarios (১৯৬৭), Libro de sueños (১৯৭৬)}

পাঁচমিশেলি এসব সংগ্রহ, যেগুলো ইংরেজি, ইতালীয়, জার্মান, চৈনিক, লাতিন বা অন্যান্য সাহিত্যের বিভিন্ন বিচিত্র খণ্ডাংশ একত্র করেছে, সেগুলো তরুণ ও বৃদ্ধ সব সাহিত্যিকের কাছে এ বিষয়টি তুলে ধরেছে যে, সাহিত্য সর্বজনীন ও চিরন্তন। সেগুলো ফ্যান্টাস্টিক ঘরানার প্রতি পাঠকের রুচিকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং বিশেষ করে যেসব গল্পে গল্প কীভাবে বলতে হয়, তা বলা হয়েছে, সেগুলোর দিকে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু বোর্হেসের ব্যাপারটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তার প্রজন্মের লেখকেরা যেমন— আদলফো বিয়য় কাসেরাস, সিলভিনা ওকাম্পো, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, হোসে বিয়াংকো, মানুয়েল মুজিকা লাইনেস, হুলিও কোর্তাসার— সবাই অনুবাদক ছিলেন এবং আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে বিশেষ রূপদানকারী জাতীয় সংকীর্ণতামুক্ত (কসমোপলিটান) ক্যাননে তারা অবদান রেখেছেন। আর এ ধরনের প্রান্তিক সাহিত্য সম্পর্কিত তত্ত্ব গঠন, কল্পনা ও সেটাকে সমর্থন জোগানোর ব্যাপারে বোর্হেসের একটি সহজাত ক্ষমতা ছিল। বোর্হেসের প্রবন্ধ, কবিতা ও ফিকশন বিখ্যাত সব অনুবাদকের নামের প্রতিধ্বনিতে পরিপূর্ণ: সন্ত জেরোমে, উলফিলা, শ্রদ্ধেয় বিডি, জর্মন নোটেকর, মার্টিন লুথার, আন্তোনিও গ্যালান্ড ও এডওয়ার্ড লেন।

{এদের সবার কথাই বক্ষ্যমাণ অনুবাদক যুগে যুগে গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে।}

 সেখানে উল্লিখিত হয়েছে জিওফ্রে চসার, স্যামুয়েল জনসন, টমাস ডি কুইন্সি ও উইলিয়াম মরিসের অনুবাদকর্মের কথা; বোর্হেসের ফিকশনেও দেখা যাবে সেসব চরিত্রের অধিবাস, যারা অনুবাদ করেন (পিয়েরে মেনার্দ, জেমস আলেকজান্ডার নোলান, মার্সেলো ইয়ারমলিনস্কি, জারোমির হালদিক, এমিল শেরিং) এবং যারা অনুবাদ পাঠ করেন ও নানা অনুবাদের মধ্যে তুলনা করেন। এ কেবল নেহাত কিছু অমিতাচারী উদ্ধৃতির একটি জাল নয়; এ কেবল স্রেফ পাণ্ডিত্য নয়। অনুবাদ যে ভূমিকা পালন করেছে, লেখকেরা তাদের পূর্বসূরিদের সঙ্গে বিচিত্র যেসব উপায়ে পারস্পরিক সম্পর্কে যুক্ত হয়েছেন এবং বর্তমানের টেক্সটের সঙ্গে মিশ্রিত হওয়া অতীতের টেক্সটের প্রতি এটি বিশ শতকের পাঠক হিসেবে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

 

পরবর্তী পর্ব: ‘আফ্রিকার সাহিত্যে অনুবাদ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়’