কুম্ভকর্ণের সঙ্গে রিপ ভ্যান উইঙ্কলের অমিলই সব, মিল একটাই ঘুমের মিল। সীতা হরণকারী রাবণের ছোট ভাই কুম্ভকর্ণ, দেহটি অতিকায় হলেও ন্যায়পরায়ণ। রাবণের বিরুদ্ধে স্ত্রীহারা রামের যুদ্ধে কুম্ভকর্ণ অপহরণকারীর বিরুদ্ধেই লড়েছে।

দেবরাজ ইন্দ্র কুম্ভকর্ণের ব্যাপারে ঈর্ষাপরায়ণ।

কুম্ভকর্ণের প্রার্থনায় তুষ্ট ব্রহ্মা তার জন্য দুটি উপহার সামনে রেখে যেকোনো একটি বেছে নেয়ার সুযোগ দেন। একটি উপহার ইন্দ্রাসন, অন্যটি নিদ্রাসন।

ইন্দ্রাসন পছন্দ করলে ইন্দ্রের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাবে। সুতরাং ইন্দ্র ব্রহ্মার স্ত্রী সরস্বতীর সাহায্য চাইলে সরস্বতী কুম্ভকর্ণের জিহ্বায় চেপে বসলে তার মুখ দিয়ে ইন্দ্রাসনের বদলে নিদ্রাসন বেরিয়ে এল। ইন্দ্রের কূটচাল সফল হলো। কুম্ভকর্ণ টানা ছয় মাস ঘুমিয়ে একবার জাগেন। আহার ও অন্যান্য কাজ শেষ করে যখন আবার ঘুম দেন—এক টানা ছয় মাস।

আমেরিকার কুম্ভকর্ণ খুবই সাদামাটা মানুষ। ঘুমের প্রতিযোগিতায় রামায়ণের কুম্ভকর্ণ তার কাছে নেহায়েতই নস্যি। সেই কুম্ভকর্ণের নাম রিপ ভ্যান উইঙ্কল। রিপ টানা কুড়ি বছর ঘুমিয়েছে। একটানা সময়ের হিসাবে তা কুম্ভকর্ণের ৪০ গুণ।

ওয়াশিংটন আরভিং

রিপ ভ্যান উইঙ্কলের আগে তার স্রষ্টা ওয়াশিংটন আরভিংয়ের কথা বলে নিই। তার মা-বাবা স্কটল্যান্ড থেকে অভিবাসী হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বসতি স্থাপন করেন। এখানেই ওয়াশিংটন আরভিংয়ের জন্ম ৩ এপ্রিল ১৭৮৩ সালে। বাবা ব্রিটিশ নেভির পেটি অফিসার ছিলেন। ১১ ভাইবোনের একজন ওয়াশিংটন।&dquote;&dquote;

মা আমেরিকান বিপ্লবের নেতা জর্জ ওয়াশিংটনের নামের বড় অংশটুকু ছেলের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। ১৭৮৯ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর ছয় বছর বয়সী আরভিং ওয়াশিংটন তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

ছাত্র হিসেবে অমনোযোগী ও অনিয়মিত আরভিং ১৪ বছর বয়সে বিকালে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নাটক দেখতে চলে যেতেন। শহরে ইয়েলো ফিভারের প্রকোপ দেখা দিলে তাকে কিছুকাল টেরিটাউন ও পরে জোন্সটাউনে থাকতে হয়। জোন্সটাউনের ক্যাটস্কিল পার্বত্য অঞ্চল তার রিপ ভ্যান উইঙ্কলের প্রেক্ষাপট রচনা করে।

তিনি আইনের পাঠ নিলেও কখনো চর্চা করেননি। তার প্রেমিকা মাতিলদা হফম্যান যক্ষ্মায় মৃত্যুবরণ করলে শোকাহত আরভিং আর বিয়ে করেননি। লন্ডনে চলে আসেন এবং টানা ১৭ বছর ইউরোপে অবস্থান করেন। সেকালের ইউরোপীয় ও আমেরিকান সেরা সাহিত্যিকদের প্রায় সবাই তার ভক্ত ছিলেন। এডগার এলেন পোর মতো বড় লেখকও তার কাছে প্রশংসাপত্রের জন্য এসেছেন। তার সানিসাইডের বাড়িতে চার্লস ডিকেন্স বেড়াতে আসেন।

ব্রিটিশরা যেখানে আমেরিকান লেখকদের হেয় করতে পছন্দ করতেন, সেখানে প্রবল নিজস্ব সত্তা নিয়ে আরভিং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি রাষ্ট্রের উচ্চপদে দায়িত্বও পালন করেন। ২৮ নভেম্বর ১৮৫৯, ৭৬ বছর বয়সে হূদরোগ তার মৃত্যু হয়। তার সমাধির এপিটাপ লিখেন কবি হেনরি ওয়ার্ডওয়ার্থ লংফোলো।&dquote;&dquote;

বহু বিচিত্র বিষয়ে তিনি লিখেছেন। প্রভাবিত করেছেন ইংরেজি ভাষার ইউরোপীয় ও আমেরিকান লেখকদের।

রিপ ভ্যান উইঙ্কল

উত্তর আমেরিকার ক্যাটস্কিল পাহাড় ঘেরা পাদদেশের গ্রামটিতে সবুজের মেলা, নদীতে পাহাড়ের ছায়া। গ্রামের মানুষ সবাই মিলে যেন একটিই পরিবার। একজন অন্যজনের খুব কাছের, চেনাজানা। দেশটা তখনো গ্রেট ব্রিটেনের একটি প্রদেশ।

এই ক্যাটস্কিলের একটি বাড়িতে সরল, সাদামাটা ও সবার বন্ধুসুলভ একজন মানুষ রিপ ভ্যান উইঙ্কলের বাস। নিজে কিছু না হতে পারলেও সে সাহসী খানদান ভ্যান উইঙ্কলের বংশধর। তবে সে নিজের পিতৃকুলের বৈশিষ্ট্য পায়নি, পেয়েছে মাতৃকুলের। অনুগত একজন ভালো মানুষ আবার ধাঁচটা স্ত্রৈনই বলতে হবে। বউয়ের কথায় উঠবস করতে হয়।

ঘরের ভেতর এই মানুষটি মোটেও স্বস্তিতে নেই। অবিরাম বকবক আর বকাঝকা তাকে শুনতেই হচ্ছে। এটাও তো প্রশ্ন যে সংসারের পুরুষ প্রধান হিসেবে রিপের তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা নেই, স্ত্রী তো দেখছেই মানুষটা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে পাড়াপড়শিদের এটা-ওটা উপকার করে, গুলতাপ্পি মেরে বেশ দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।

গ্রামের অন্য বউরা তাকে যথেষ্ট পছন্দ করে। সুখে-দুঃখে তারা রিপকে কাছে পায়, ফরমায়েশ দেয়ার আগেই গায়ে পড়ে তাদের কাজ করে দিত। যে কাজ তারা তাদের স্বামীকে দিয়ে করাতে পারত না, রিপ বিনা বাক্য ব্যয়ে তা করে দিত। কার জমির ভাঙা বেড়া মেরামত করতে, কার ডিম মামলেট করা কড়াই ফুটো হয়ে গেছে সারাতে হবে— রিপ এসব করার জন্য বসেই থাকে। বলে, চিন্তা করছ কেন, আমি তো আছি।

এ বউরা নিজেরা যখন সান্ধ্য আলাপে বসে, ঘুরেফিরে মানুষটার কথা তুলবেই। এমন ভালো মানুষ অথচ দেখো তার ঘরে এত অশান্তি। আসলে বেগম ভ্যান উইঙ্কলই সব নষ্টের গোড়া।&dquote;&dquote;

শিশুদের সঙ্গে শিশুদের মতো হয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করতে তার জুড়ি নেই। তাদের সঙ্গে হাততালি দেয়, দুই আঙুলে তুড়ি বাজায়, শিস দেয়, হাঁস-মোরগ-শিয়াল-ছাগলের ডাক দেয়, নিজে ঘোড়া কিংবা গাধা সেজে শিশুদের পিঠে চড়িয়ে চার হাত-পায়ের ওপর ঘুরে বেড়ায়। একটু হলে কেঁদে চোখ ভাসায়—এমন সব শিশু রিপকে পেলে কান্না ভুলে যায়। তাদের অনুরোধ শোনামাত্র রিপ কোনো না কোনো গল্প বলতে শুরু করে। চাঁদের বুড়ির গল্প, ইঁদুর, সিংহ আর বাঘের গল্প, দেও-দানো আর পরীর গল্প—একটার পর একটা বলে যেত। শিশুদের মুগ্ধ করার মতো মজার কিছু জাদুও তার জানা ছিল।

খেলার সময় সব দলই তাকে চাইত। ভারসাম্য আনতে সে কতক্ষণ এই দলে, তো কতক্ষণ ওই দলে—এভাবে তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে।

কেবল শিশুদের নয়, বুড়োদেরও বন্ধু রিপ ভ্যান উইঙ্কল। রোদেলা বিকালে খোলা মাঠে হাত ধরে তাদের হাঁটাত, গল্প করত, এমনকি যাদের শরীরে কোনো যন্ত্রণা আছে, তাদের হাত-পা টিপে গা মালিশও করে দিত। এমন মানুষকে কোন বুড়ো না ভালোবাসবে! দুঃখী মানুষ, কষ্টে থাকা মানুষ, অচল ও নিঃসঙ্গ মানুষ সবারই চাওয়া, রিপ কোথায়? রিপ আসছে না কেন?

ক্যাটস্কিল পাহাড় ঘেরা গ্রামের সবার প্রিয় মানুষ রিপ ভ্যান উইঙ্কল। কিন্তু নিজের বাড়িতে, কী অদ্ভুত ব্যাপার, রিপ ভ্যান উইঙ্কল একজন ভিন্ন মানুষ। কোনো সাংসারিক কাজকর্মের ধারেকাছে নেই। একেবারে কুড়ের বাদশা। বাড়িতে খাওয়া, ঘুমানো আর গান গাওয়া ছাড়া তার আর যেন কোনো কাজই নেই। বেগম ভ্যান উইঙ্কল কিছু বললে সে এমন ভান করত যেন কিছুই শোনেনি। কাপড়গুলো নেড়ে দাও কিংবা ওষুধগুলো কিনে আনো কিংবা লাকড়িটা কেটে দাও—স্ত্রীর এসব কথা শোনার পর রিপ তার প্রিয় কুকুর উলফকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। বাজার করতে বললে, কামাই করতে বললে অসুস্থতার ভান করে পড়ে থাকত। অথচ দিন-রাত কাজ করতে করতে তার স্ত্রীর প্রাণ ওষ্ঠাগত। বেগম ভ্যান উইঙ্কলের কথা শুনতে শুনতে এক সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত।&dquote;&dquote;

একটা সংসারে হাজারটা কাজ। হাঁড়ি-বাসন মাজা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, বাচ্চকাচ্চা সামলানো—বেগমকে সাহায্য করার মতো একজন মানুষও নেই, তার জীবনটা এতই অসহনীয় হয়ে পড়েছিল যে রিপকে সে প্রাণভরে প্রতিক্ষণে অভিশাপই দিত। রিপ এ অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে উঠত। স্ত্রী হঠাৎ এসে যখন রিপের গুষ্ঠি উদ্ধার করত, তখন সবাই এ মেয়ে মানুষটির চিৎকার-চেঁচামেচিটা বড় করে দেখত, কেউ রিপকে দোষী মনে করত না। কেউ এগিয়ে এসে বেগমকে সান্ত্বনাও দিত না।

তাতে আরো তেড়ে আসত বেগম।

রিপের বউকে দেখে বন্ধুরা তাকে বলত, ‘শিগগির পালা, ওই উন্মাদিনী আসছে।’ তখন রিপ কোথাও না কোথাও লুকিয়ে পড়ত।

তার আলস্য ও উদাস্য পরিবারে দুর্যোগ ডেকে আনে। পৈতৃক খামারের ব্যবসা লাটে ওঠে। ছেলেমেয়েগুলোকে দেখলে যে কেউ এতিম ভাববে, এগুলোরও গোল্লায় যেতে বেশি দেরি নেই।

বেগম তাকে বলে ভবিষ্যতের কথা ভাবো।

রিপ ভাবে কিসের আবার ভবিষ্যৎ। স্ত্রীর অবিরাম গঞ্জনা আর সইতে না পেরে বন্দুক আর প্রিয় কুকুর উলফকে নিয়ে রিপ বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে সেই ক্যাটস্কিল পাহাড়ের দিকে। এ পাহাড় নিয়ে অনেক অবিশ্বাস্য কথা তার কানে পৌঁছেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, সূর্য তখন অস্তপাড়ে। তার কানে পৌঁছল কে যেন তাকে নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু কে? একি বিভ্রম, একি মায়া? একি কেবল শোনার ভুল। তার চোখে পড়ল খাটো ও বুড়ো একজন মাথায় অতিকায় পিপে নিয়ে এগিয়ে আসছে। বরাবর সদয় রিপ নিজেই তার পিপে কাঁধে নিয়ে বুড়োকে সহ পাহাড়ি একটি সমতলে পৌঁছল। চোখে পড়ল বিচিত্র রঙের পোশাক পরা সাত-আটজন; কোমরে বেল্ট, হাতে চুরি। মাথায় সাদা টুপিতে মোরগপুচ্ছ। সবাই বুড়োর মতোই বাজে মেজাজের—তারা রিপের কাছ থেকে পিপে ছিনিয়ে নিয়ে সরু গবলেটে ঢেলে খুব আয়েশ করে তরলটা পান করে খেলায় মেতে রইল। এতটা পথ পিপের বোঝা বয়ে ক্লান্ত রিপের তখন ভীষণ তেষ্টা। কিন্তু পান করার পানি কোথায়?

রিপ ভাবল চুপি চুপি পিপের একটু পানীয় খেলেও তো চলত।&dquote;&dquote;

পানীয়টা এমনই সুস্বাদু যে এক পাত্রে প্রাণ ভরে না। পিপি থেকে ঢালছে আর কয়েক চুমুকে শেষ করছে। এর মধ্যে রাজ্যের ঘুম তাকে আর উঠে দাঁড়াতে দিল না।

রিপ ভ্যান উইঙ্কল তখন গভীর ঘুমে।

রিপ ঘুম থেকে জেগে উঠল পাখির কিচির মিচিরে। ভোরের আলো তার চারপাশ মাতিয়ে রেখেছে। চোখ কচলে বুঝতে চেষ্টা করে সে কোথায়। এখানটাতেই সেই পিপে বুড়ো দাঁড়িয়েছিল। বন্দুকটা কোথায়? তার এত প্রিয় ঝকঝকে সেই বন্দুক। এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা বন্দুক পেল বটে, কিন্তু অনেক পুরনো এবং ভীষণ মরচে পড়া। উলফ কোথায়? রিপ যেমন করে প্রিয় কুকুরটাকে ডাকতেন, সেভাবে। কয়েকবার ডাকল, কিন্তু উলফের সাড়া নেই। রিপ উঠে দাঁড়াল বটে কিন্তু তার হাড়গোড়েও মনে হয় মরচে ধরেছে, দাঁড়াতেই বেশ কষ্ট হলো। মুখে হাত বুলিয়ে দেখে গালভর্তি বিশাল দাড়ি। পাহাড়ি পথে নামতে শুরু করল। রিপ বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু সেদিন যখন পাহাড়ের প্রান্তে কেবল পৌঁছল, তখন দূরের গ্রামটিকে চোখ পড়লে আনন্দে চোখ ভিজে গেল। রাতে ভীষণ খিদে ও ক্লান্তি দ্রুত তার ঘুম এনে দিল। ঘুম ভাঙল ঠিক পরদিন ভোরে। রিপ গ্রামে ঢুকল। ঠিক করল গিয়েই প্রতিবেশী বন্ধুদের সেই খিটিমিটি পিপে বুড়ো আটজন বিচিত্র মানুষের কথা শোনাবে। কিন্তু গ্রামটাকে তার মনে হচ্ছে অচেনা। একজন মানুষও তাকে জিজ্ঞেস করছে না ‘কী খবর রিপ রাতে কোথায় ছিলে?’

নিজের বাড়ির দরজায় এসে একেবারে থ—জানালায় অচেনা মুখ। সে ভাবছে এখনই বেগম ভ্যান উইঙ্কল এসে খিস্তিখেউড় শুরু করবে। কী জবাব দেবে, তাও ঠিক করে নেয়। কিন্তু চুপচাপ ভেতরে ঢুকে মনে হয় এ কোথায় এল। এমন খাঁ খাঁ করছে কেন? সরাইখানাটা কোথায়? যখন তার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করল, রিপ ভাবল এটা নিশ্চয় সেই পিপের পানীয়র প্রভাব।

দু-একজন যারা এগিয়ে আসছে, অবাক চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে—‘তুমি কে হে বাপু, তুমি কোত্থেকে এ গায়ে এসে হাজির হলে? সং সেজেছ নাকি?’

কেউ বলছে, এ শালা ধড়িবাজ। কেউ বলছে গুপ্তচর। কেউ জিজ্ঞেস করল, কাদের ভোট দিলে: ফেডারেল না ডেমোক্র্যাট?

সে কাঁদো কাঁদো হয়ে তাদের বোঝাতে চেষ্টা করল, তোমরা ভুল করছ। আমি দূরের কেউ নই, এ গায়ের মানুষ। আমাকে সবাই চেনে।

‘বেশ নাম বলো কে কে চেনে? তাদের ডেকে তোমাকে শনাক্ত করতে হবে।’

নিকোলাস ভেডডার আমাকে চেনে।

তার কথা শুনে সবাই থ। নিকোলাস তো ১৭ কি ১৮ বছর আগে মারা গেছে।

তাহলে ব্রম ডাচার কোথায়?

সে তো যুদ্ধের আগে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। শুনেছি স্টোনি পয়েন্টে গোলাবর্ষণের সময় মারা গেছে।

স্কুল মাস্টার ভ্যান ব্রুমেল কোথায়?

যুদ্ধে গিয়েছিল, জেনারেল হয়েছে, এখন কংগ্রেসের সদস্য।

এসব কী হচ্ছে? আমার পরিচিত জনরা কেউ নেই? তোমরা কেউ রিপ ভ্যান উইঙ্কলের নাম শোনোনি?

কেন শুনব না, ওই তো গাছে হেলান দিয়ে আছে আমাদের রিপ ভ্যান উইঙ্কল।

হতবুদ্ধি অবস্থায় গাছের দিকে এগিয়ে গেল, ভাবল, আমি কি তাহলে আমি নই?

কান্নাভরা চোখে বলে উঠল, এ গ্রামে একজনও আসল রিপ ভ্যান উইঙ্কলকে চিনতে পারবে না?

বুড়ো দু-একজন উল্টো জিজ্ঞেস করল—ওই যে কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেমেয়ের দায়িত্ব পালন না করা মানুষটি, যার বউ সারা দিন খিটমিট করত আর গ্রামের সবাই তার গুণগান করত সেই লোকটি। সে তো ক্যাটস্কিল পাহাড়ে না অন্য কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।

সে সময় শিশু কোলে এগিয়ে আসছিল এক নারী। শিশুকে বলছিল, কেঁদো না রিপ, বুড়ো আমাদের কিছু করবে না।

নারীর অঙ্গভঙ্গি ও স্বর বুড়োর পরিচিত মনে হলো, এগিয়ে এসে নাম জিজ্ঞেস করতে বলল, জুডিথ। আর বাবার নাম জিজ্ঞেস করতে বলল, রিপ ভ্যান উইঙ্কল। বন্দুক আর কুকুর নিয়ে বের হয়েছিল, কুকুর ফিরে এসেছে, কিন্তু বাবা ফেরেনি। কেউ বলল, আত্মহত্যা করেছে, কেউ বলে অন্যরা তাকে মেরে ফেলেছে।

বুড়ো জিজ্ঞেস করে, তোমার মা কোথায়?

জুডিথ বলল, বাবা চলে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে মা মরে গেল।

বুড়ো কাঁদতে শুরু করল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আমি তোমার হতভাগ্য বাবা রিপ ভ্যান উইঙ্কল। কিন্তু এ গ্রামে কেউ আমাকে চিনতে পারছে না।

ভিড় ঠেলে এক বুড়ি এগিয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি আমাদের রিপ ভ্যান উইঙ্কল। ২০ বছর পর তোমাকে দেখলাম। কোথায় ছিলে এত দিন?

রিপ যখন তার ক্যাটস্কিল কাহিনী শোনাল বুড়ো পিটার বলল, তোমার কথা অবশ্যই গাঁজাখোরি গপ্পো নয়। আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছি। আমার বাবাও ক্যাটস্কিল পাহাড়ে এমন পোশাক পরা মানুষকে বল খেলতে দেখেছে। ক্যাটস্কিলে কত আজগুবি ঘটনা যে ঘটে!

বাবাকে পেয়ে জুডিথ খুশি। গ্রামবাসীরও এ অজানা বুড়োকে নিয়ে সন্দেহ ঘুচল। মেয়ে বাবার শুশ্রূষা করে তাকে সুস্থ করে তুলল, ছেলেটা রিপ ভ্যান উইঙ্কল টু খামারে কাজ করে। নাতিটা রিপ ভ্যান উইঙ্কল থ্রি।

স্ত্রী বেগম ভ্যান উইঙ্কলের কথা মনে পড়লে রিপ একটু ব্যথিত হয়। মেয়ের চেষ্টায় রিপ গ্রামের মূল ধারায় মিশে যায়। মুরুব্বি হিসেবে গ্রামে তার আসনটিও পাকা হয়।

রিপ ভ্যান উইঙ্কলের কুম্ভকর্ণ-ঘুম কুড়ি বছর মেয়াদের। এর চেয়ে বেশি সময় ঘুমিয়েছেন নসসের সাধু এপিমেনিডেস। ‘লাইভস অ্যান্ড অপিনিয়নস অব এমিনেন্ট ফিলসফার্স’ গ্রন্থে ঐতিহাসিক ডায়োজেনেস ল্যার্টিয়াস উল্লেখ করেন, এপিমেনিডেস ছিলেন ক্রিটে দ্বীপের একজন রাখাল। একবার তার পালের একটি মেষ দলছুট হয়ে পড়লে তিনি মেষের পেছনে ছোটেন। ছুটতে ছুটতে মাউন্ট আইডার একটি গুহাতে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগে উঠে আবার তিনি মেষের পেছনে ছোটেন, কিন্তু খুঁজে পাননি। পিতার খামারে ফিরে গিয়ে দেখেন খামারের মালিক অন্য একজন। তিনি তার ছোট ভাইকে চিনতে পারেন, তিনি অনেক বুড়ো। হিসাবনিকাশ করে বের করেন তিনি আইডা পর্বতের গুহায় টানা ৫৭ বছর ঘুমিয়েছেন। এ কাহিনীটি তৃতীয় শতাব্দীর।

খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের গল্প ‘সেভেন স্লিপার্স অব ইফেসুস’-এ লিখিত হয়েছে ২৫০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট দেসেউসের নির্যাতন এড়াতে তখনকার কিছুসংখ্যক মানুষ গোপন স্থানে বিস্ময়কর এক ঘুমের কবলে পড়েন। ২০০ বছর পর যখন তাদের ঘুম ভাঙে সম্রাট, তখন দ্বিতীয় থিওডোসিয়াসের আমল। ঘুমজাগা মানুষ বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করল গোটা সাম্রাজ্য খ্রিস্টানদের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

‘পিটার ক্লস’ নামের একটি জার্মান রূপকথাতে পিটার তার হারানো ছাগলের খোঁজে বেরিয়ে জঙ্গলের ভেতর কিছু লোককে মদ্যপান করতে দেখে নিজেও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কয়েক চুমুক খায় এবং ঘুমিয়ে পড়ে। যখন ঘুম ভাঙে, দেখা যায় তার বয়স কুড়ি বছর বেড়ে গেছে। জার্মানির আরেক বংশীবাদক বাড়ি ফেরার পথে ৫০ বছর একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তালমুদের কাহিনীটা এমন: হনি মাগেল (হনি দ্য সার্কেল মেকার হিসেবে পরিচিত) একজন বৃক্ষ রোপণকারীকে জিজ্ঞেস করল, ক্যারব গাছ কেন লাগাচ্ছ? এ গাছ বড় হতেই তো সত্তর বছর লেগে যায়। এ গাছের ফল তো ভোগ করতে পারবে না। কথা বলতে বলতে হনি মাগেল ঘুমিয়ে পড়ল। পাথর চারদিক দিয়ে তাকে ঘিরে রাখল। যখন ঘুম ভাঙল, দেখল ঠিক ওখানে বড় হয়ে ওঠা একটি ক্যারব গাছ আর এটাও জানল তার একজন নাতিও আছে।

রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো ঘুমিয়ে বছরের পর বছর পার করে দেয়ার কাহিনী পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার লোককাহিনীতেও পাওয়া যায়।