২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নাটোর জেলা ট্রেজারিতে পাওয়া যায় রুপার ফ্রেমে বাঁধাই করা এক তরুণীর ছবি। বেশ পুরনো আমলের ফ্রেম। ছবির তরুণীর সাজপোশাকও আগের দিনের, তবে তার আভিজাত্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ছবির এক কোণে লেখা আছে ‘ইন্দুপ্রভা দেবী’। নাটোর প্রশাসনের তৎকালীন কর্মকর্তারা আরো খোঁজখবর করে নিশ্চিত হলেন, ছবির নারী নাটোরের রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা দেবী—দিঘাপাতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের কন্যা।

ইন্দুপ্রভা দেবীর এ ছবি যখন উদ্ধার হয়, তখন নাটোর জেলা প্রশাসন স্থানীয়ভাবে তল্লাশি চালাচ্ছিল রাজপরিবারের বেহাত হওয়া জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্য। উত্তরা গণভবনে একটি সংগ্রহশালার মাধ্যমে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করা ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে জেলার ট্রেজারিতেও তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ তল্লাশিতে রাজপরিবারের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। বড় এক সিন্দুকের ভেতর পাওয়া যায় একটি ট্রাংক। এ ট্রাংকের ওপর লেখা ছিল ‘ইন্দুপ্রভা দেবী’। ট্রাংকটির ভেতর পাওয়া গেল আরেকটি ট্রাংক। পুরনো দিনের রাজপরিবারের কোনো রহস্য যে এতে লুকিয়ে আছে, সেটা নিশ্চয়ই উপস্থিতরা বুঝতে পারছিলেন। এমন কাজে যুক্ত ছিলেন প্রশাসনের যে কর্মকর্তারা, তারা নিশ্চয়ই সেদিন দারুণ রোমাঞ্চের স্বাদ পেয়েছিলেন! ট্রাংকের ভেতরে থাকা ট্রাংকটি খোলার পর বের হলো ইন্দুপ্রভা দেবীর হাতে লেখা কাব্যগ্রন্থ, ১০ খণ্ড ডায়েরি, একটি আত্মকথা, রাজকীয় কলম, দোয়াত, সিলমোহর, হাতির দাঁতের গহনাসহ আরো কিছু ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র। ট্রাংকে আবার ছিল এক গোপন কুঠুরি, সেই কুঠুরিতে পাওয়া গেল রাজকুমারীকে লেখা তার স্বামী মহেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর প্রেমপত্র—একটি-দুটি নয়, ২৮৫টি। বিয়ের আগে ও পরে তিনি চিঠিগুলো লিখেছিলেন। ২০১৮ সালের ৫ মার্চ ট্রাংকটি থেকে ইন্দুপ্রভা দেবীর এসব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্থানীয়ভাবে জেলা প্রশাসনের চালানো অভিযানে সংলগ্ন গ্রামবাসীদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় রাজবাড়ির সিন্দুক, রাজপরিবারের ছবি এবং আরো অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। ইন্দুপ্রভা দেবীর আত্মকথাটি নাটোর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাজকুমারী ইন্দুপ্রভার আত্মকথা শিরোনামে ২০১৮ সালের অক্টোবরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

এবার ইন্দুর পরিচয় একটু ঘেঁটে দেখা যাক। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে নাটোর শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দিঘাপাতিয়ার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন দয়ারাম রায় (১৬৮০-১৭৬০)। দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি (বর্তমানে উত্তরা গণভবন নামে বিখ্যাত) নাটোর শহর থেকে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মুর্শিদকুলী খাঁ দয়ারামকে ‘রায়-রায়ান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তার চতুর্থ বংশধর রাজা প্রমথনাথ রায়ের ছিল চার পুত্র ও এক কন্যা। এই চার পুত্র ছিলেন প্রমোদনাথ রায়, বসন্তকুমার রায়, শরত্কুমার রায় ও হেমন্তকুমার রায়। আর একমাত্র কন্যা ছিলেন ইন্দুপ্রভা দেবী। পূর্ব বাংলার আরো অনেক জমিদার পরিবারের মতো এ পরিবারটিও স্থানীয় সমাজ-সংস্কৃতিতে অনেক অবদান রেখেছিলেন। ১৯১০ সালে শরত্কুমার রায় তার ভাই প্রমোদনাথ রায়ের দান করা জমিতে বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘দিঘাপাতিয়া রাজগণ তাঁদের মহত্ত্ব ও জনকল্যাণের জন্য খ্যাত ছিলেন। বিশেষ করে রাজশাহী জেলা এ পরিবারের কাছে ঋণী এ কারণেই যে তাঁরা ওই এলাকায় কতিপয় পাবলিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।’ (নাজিমউদ্দীন আহমেদ, বাংলাপিডিয়া)

দয়ারাম রায় যে প্রাসাদ ও আনুষঙ্গিক ভবন তৈরি করেছিলেন, সেগুলো ১৮৯৭ সালের বিরাট এক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর প্রমোদনাথ রায় পুরো প্রাসাদ কমপ্লেক্স পুনর্নির্মাণ করান।

ইন্দুপ্রভা দেবীর জন্ম ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে; ১২৮৮ বঙ্গাব্দে। ইন্দুপ্রভা দেবী তার আত্মকথার শুরুতেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: ‘আমার জীবন অতি চমৎকার। ইহা দ্বারা নভেল বা নাটক রচনা করা যায়। আমাদের বাড়ী রাজশাহীর মধ্যে দিঘাপাতিয়া গ্রামে। আমরা ৫ ভাইবোন। আমি শৈশবে পিতৃহীন। শুনিয়াছি আমার পরে আরও একটি ভাই হইয়াছিল। কিন্তু সে জন্মমৃত। এখন সর্ব্বাপেক্ষা আমিই ছোট। আমার ৪ দাদা।’ এই আত্মকথা থেকে জানা যাচ্ছে, ইন্দুপ্রভার বয়স যখন দুই বছর দুই মাস, তখন তার বাবা মারা যান। এখানে আরো একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, রাজশাহী অঞ্চলকে সে সময় রামপুর নামে ডাকা হতো। ইন্দুপ্রভার লেখায় রামপুর নামটিই ব্যবহূত হয়েছে। যা হোক, অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে পরিবারে ইন্দু কিছুটা একা হয়ে পড়েন। ‘আমি বাবার বড় আদরের ছিলাম। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর একমাত্র অবহেলার পাত্র হইলাম।’ ইন্দুর ভাইয়েরা লেখাপড়া করতেন রাজশাহী বা রামপুরে। আর ইন্দু থাকতেন নাটোরের দিঘাপাতিয়ার রাজবাড়িতে। ছোটবেলায় কিছুদিন ইন্দু মা’র সঙ্গে কলকাতায় সাতপুকুরের বাসায় ছিলেন। সেখান থেকে নৌপথে রাজশাহী ফিরেছিলেন। যদিও কেন সে সময় তারা কলকাতায় গিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ইন্দু কোনো ধারণা দিতে পারেননি। কলকাতায় তারা মাস ছয়েক ছিলেন। ‘তারপর কেন জানি না মা-দিদির সঙ্গে আমিও কলিকাতায় সাতপুকুরের বাসায় আসিয়া থাকিলাম।...কিছুদিন পর নৌকা পথে আমরা সেখান হইতে রওনা হইয়া জানি না কোন পথ দিয়া দিঘাপাতিয়া ঘুরিয়া রামপুরে দাদাদের নিকট আসিলাম এবং কাছেই একটা ভিন্ন বাসায় থাকিলাম।’

ইন্দুপ্রভাব আত্মকথার ভাষা এবং বিবরণী সাবলীল। কোথাও অতিকথন নেই। পুরো লেখায় সেভাবে কোনো ছন্দপতন নেই। আত্মকথা পড়ার সময় পাঠক ক্লান্ত হবেন না, বরং রাজপরিবারকে নিয়ে লেখা কোনো গল্প পড়ছেন বলেই মনে হবে। ইন্দুপ্রভার লেখা অকপট। ১২০ বছরের কিছু আগে লেখা আত্মকথায় বাঙালি কিশোরী ইন্দুপ্রভা তার প্রেম নিয়ে যে বিবরণী লিখেছেন, তা সাহিত্য রসে সিক্ত এবং সাহসী। জীবনের আত্মসমালোচনা করেছেন নির্দ্বিধায়; এখানে তার প্রবল ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যায়।&dquote;&dquote;

নিজের বড় হয়ে ওঠার সময় ইন্দু পারিবারিক স্নেহ থেকে কিছুটা বঞ্চিত হয়েছিলেন। মায়ের স্নেহ সেভাবে পাননি। সেই কলকাতায় যাওয়ার সময়েই তিনি লিখেছিলেন, ‘জন্মাবধি কখনও মা চিনি না। বরাবর দিদির কাছেই ছিলাম। এখন দিদি যাওয়ায় বড় কষ্ট হইল। তাহাতে আবার মাও প্রায় সর্ব্বদা সামান্য কারণেও বকিতেন।’ এরপর আরো লিখেছেন, ‘জন্মাবধি আমি প্রায় সর্ব্বদাই চাকরাণীদের কাছেই থাকিতাম। কেহ বড় যত্ন করিত না। কেবল মাঝে মাঝে দাদাদের ও দিদির একটু আদর পাইতাম। কখনও উপযুক্ত সঙ্গী পাই নাই। অনবরত চাকরাণীদের কাছে থাকিয়া ও চাকরাণীদের মেয়েদের সঙ্গে খেলা করিয়া হূদয়ের ঘোর অবনতি হইল। হিংসা, দ্বেষ, রাগ, আবদার ইত্যাদি নীচতায় হূদয় পূর্ণ হইল। সর্ব্বদা দোষ করিলে মিথ্যা বলিতাম ও নানা প্রকার দুষ্টামি খেলা খেলিতাম। যদিও পারিতাম বটে, কিন্তু তাহাতে কিছুই ফল হইতেছিল না।’

ইন্দুর বাবা তাদের এক আত্মীয়ের পুত্রের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে গিয়েছিলেন। ইন্দু সে কথা জ্ঞান হওয়ার পর থেকে জেনে এসেছেন। ইন্দুর বাবা সেই ছেলেকে তাদের বাড়িতে রেখে লেখাপড়া শেখার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। ইনিই মহেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। ‘ছেলেবেলা হইতে লোকমুখে সমস্ত শুনিয়া তাঁকেই স্বামী বলে মনে করিতাম এবং যদিও তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়ীতেই থাকিতেন ও দেখা হইত, তবুও লজ্জায় কখনও কথা বলি নাই।’ কিন্তু ইন্দুর মা জানালেন, তিনি সেই পাত্রের বড় ভাইয়ের সঙ্গে ইন্দুকে বিয়ে দেবেন। ‘বাবার মৃত্যু পর আমার নির্দ্দয়া জননী তাঁকে দেখিতে পারিতেন না এবং তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে (লিখিত মরিতে ইচ্ছা করে) আমার বিবাহ দিতে ইচ্ছা করেন।’&dquote;&dquote;

কিন্তু মায়ের এ ইচ্ছাকে কোনোভাবেই মেনে নেননি ইন্দু। নিজের বয়স যখন ১০-১১ তখন তিনি লিখছেন, ‘তখন আমার বয়স ১০/১১ বৎসর। হূদয় ফুটোন মুখ। পূর্ব্বের স্মৃতি নূতন হইয়া হূদয়ে জাগিল। তাঁহার মন কেমন না জানিয়াও নীরবে অযাচিতভাবে তাঁর চরণে অত্মসমর্পণ করিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম, তিনি ভিন্ন আর কাহারও হইব না, যদি মা জোর করিয়া অন্যের সঙ্গে বিবাহ দিবার চেষ্টা করেন, তবে আমি আত্মহত্যা করিব।’

আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে বাঙালি কিশোরী ইন্দুপ্রভা যেভাবে তার প্রেমের বর্ণনা দিয়েছেন, তা আগ্রহী পাঠককে রীতিমতো চমকে দেবে। ‘সর্ব্বদা তাঁকে দেখিবার জন্য ভয়ানক ইচ্ছা হইত। সর্ব্বদা দেখিলেও পিপাসা মিটিত না। এতদিন হূদয় বালিকার ন্যায় চিন্তা শূন্য ছিল। এখন হইতে বড় অন্যমনা হইলাম ও দিন-রাত্রি কেবল তাঁহারই চিন্তা করিতাম। কিসে দেখা হইবে, সেই চেষ্টা করিতাম। আমার নির্দ্দয়া জননী তাঁকে দেখিলেই অকারণে সর্ব্বদা বকিয়া কষ্ট দিতেন। সেজন্য তিনি বড় এ বাসায় আসিতেন না। আমার হূদয়ে ইহাতে বড় আঘাত লাগিত। কিন্তু কিছু উপায় ছিল না। কেবল মায়ের উপর হইতে ক্রমে আমার ভালোবাসা লোপ পাইতে লাগিল।’ তবে যেহেতু মা ইন্দুকে বড় ভাইদের বাসায় যেতে দিতেন এবং সেখানে তিনি তার প্রেমিককে দেখতে পেতেন, তাই মায়ের প্রতি রাগ-অভিমান কিছুটা কমেছিল। এদিকে দিনে দিনে ইন্দুর প্রেমও যেন পরিণত হচ্ছে: ‘ক্রমে আমি পাগল হইতে লাগিলাম। আর লোকলজ্জা বড় মানিতাম না। সর্ব্বদা দেখার জন্য উত্সুক থাকিতাম ও চেষ্টা করিতাম।...যাইতে আসিতে বা স্নান করিতে তাকে দেখিতে পাইয়া আনন্দে অধীর হইতাম; যখন গাছের আড়াল হইতে তাঁকে দেখিতাম।’ এমন সময় ইন্দু আবার কিছুদিনের জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। এবার বড় ভাইয়ের স্ত্রী, যিনি পরিবারের বড় রানী, তার সঙ্গে ইন্দুর সখ্য গড়ে উঠল। তার কাছেই মন খুলে তিনি তার প্রেমের অনুভূতির কথা জানালেন এবং প্রতিদানে সেই ভাবি বা বড় রানী মানবপ্রেমের নানা রহস্য ইন্দুকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সম্ভবত শরীরের প্রেম নিয়ে সেটাই ছিল ইন্দুর প্রথম আনুষ্ঠানিক পাঠ। ইন্দু লিখছেন, ‘প্রত্যেক দিনের ঘটনা রানীর কাছে গল্প করিতাম এবং তাহাতে আনন্দ দ্বিগুণ হইত। রানীও বড় দাদার কথা কিছু আমাকে বলিত। আমি এ পর্যন্ত কখনই তাঁকে (প্রেমিক, হবু স্বামী) স্পর্শ করি নাই। সে সুখ কেমন, জানিতামও না। কেবল দেখিয়াই সুখী হইতাম। বিবাহের জন্যও তাড়াতাড়ি ছিল না। ভাবিতাম, দেখিয়াই তো পরম সুখ হয়, আবার ইহা অপেক্ষায়ও কোন সুখ বেশি থাকিতে পারে?’ তা যে থাকতে পারে, সে অভিজ্ঞতা ইন্দুর কিছুদিন পরই হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতাও তিনি লিখে রেখেছেন, ‘একদিন দাদাদের সঙ্গে আলিপুরের বাগানে বেড়াইতে যাইতেছি; তিনিও সেই গাড়িতেই আছেন। আমি মহাসুখী, ঘন ঘন দুজনের সতৃষ্ণ চক্ষু মিলিত হইতেছে। ইতিমধ্যে ঝাঁকি লাগিয়া গাড়ির মধ্যস্থ খাবার জিনিসের পাত্রটা পড়িবার উপক্রম হইল। অমনি চকিতে তিনি ও আমি সেটা একত্রেই ধরিলাম। দুজনের হস্তে স্পর্শ হইল। সেই প্রথম জীবনের মধ্যে স্পর্শ। বিদ্যুতের মত সেই স্পর্শ সুখ সর্ব্বাঙ্গে ব্যাপ্ত হইল। সে সুখ এত তীব্র যে ভালো করিয়া তার আস্বাদ পাইলাম না। শিহরিয়া উঠিলাম। তাঁর কী ভাব হইল জানি না। কিন্তু দুজনাই চমকিয়া হাত সরাইয়া দুজনের প্রতি অতৃপ্ত পিপাসা ও নির্ম্মল প্রেমপূর্ণ নেত্রে চাহিয়া বসিয়া রহিলাম।’ এ ঘটনা খুব সম্ভবত ইন্দুর ১১ বছর বয়সের।&dquote;&dquote;

এই প্রেমে মাঝে মাঝে হাস্যরসেরও উদ্রেক হতো। সেটাও ইন্দু নিপুণভাবে তার আত্মকথায় তুলে ধরেছেন। একবার তার ভাইদের ভূত দেখার শখ হয়েছিল। এজন্য তারা ভূত ডেকে আনার নানা আচারবিধি পালন করতেন। এজন্য সবাই মিলে চক্রে বসে চোখ বন্ধ করতেন। আর সেই সুযোগে ‘আমরা দুজনে খুব তাকাতাকি ও হাসাহাসি করিতাম।’

এ সময় ইন্দু ১২ বছরে পা দেন। আর তার বড় ভাইয়ের বয়স তখন ২০। নিয়মানুযায়ী ২১ বছর বয়সে তিনি জমিদারির সিংহাসনে বসবেন। সেজন্য পরিবারে এক ধরনেই তোড়জোড় চলছিল। ১৩০০ বঙ্গাব্দে ইন্দুর বড় ভাই সিংহাসনে বসলেন। এ সময় দিঘাপাতিয়ার রাজবাড়িতে বেশ বড় ধরনের উৎসব হয়েছিল। ‘ঈশ্বরের কি আশ্বর্য্য লীলা। রাজাদের রাজ্য প্রাপ্তির আগে ছেলে হইলে নাকি সে ছেলে অসিদ্ধি হয় এবং পরে রাজ্য পায় না। সেই ভাগ্যক্রমে ঠিক এই সময়ে রানী গর্ভবতী হইল। সকলই আনন্দময়। আমাদের আনন্দের সীমা রহিল না। মাঘ মাসে মহা ধুমধামে দাদা রাজ্য পাইলেন। কত থিয়েটার, সারকাস, যাত্রা, বাইনাচ ইত্যাদি হইল। অসংখ্য অগণ্য আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি পূর্ণ হইয়া গেল। এই রূপে মাসাবধি সে উৎসব চলিল।’

পরিবারের বড় ছেলে জমিদারির দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর শুরু হয়ে গেল ইন্দুর বিয়ের তোড়জোড়। ইন্দু তখন ১৩ বছরে পা দিয়েছেন। বড় ভাই বাবার ঠিক করে রাখা এবং ইন্দুর পছন্দের মহেন্দ্রর সঙ্গেই বিয়ে দেবেন। কিন্তু মা চাইছেন অন্য পাত্র। ১৩ বছরের ইন্দু একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—বিয়ে করলে মহেন্দ্রকেই, নতুবা মরণই তার আরাধ্য। বড় রানীকে নিজের সংকল্পের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, ‘আমি অটল, অচল ও ভয়শূন্য! স্থিরভাবে রাণীকে বলিলাম যে কার সাধ্য অন্যের সঙ্গে বিবাহ দেয়। যদি মা নিতান্তই সে চেষ্টা করেন তবে নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করিব। এই বলিয়া আমি মরার উপায় অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। আমার সম্বলের মধ্যে কাছে ছিল একখানি ক্ষুদ্র ছুরিকা। মনে করিলাম তাহাতেও যদি কাজ শেষ না হয়, তবে হলদে করবীর ফল খাইব। হলদে করবীর ফল যে বিষ তাহা আগেই সন্ধানে সন্ধানে জানিয়া রাখিয়াছিলাম।’ যা হোক, নানা ঝামেলার পর মহেন্দ্রর সঙ্গেই ইন্দুর বিয়ে ঠিক হলো। আয়োজন শুরু হয়ে গেল। লক্ষণীয়, এই আয়োজনের অংশ হিসেবেই ইন্দু হিন্দু নারীর পোশাক পরা শুরু করলেন। তার কথায়, ‘আমি এতদিন ধরিয়া পুরুষের মত কাপড় পড়িতাম।...এতদিন মাথায় কাপড় দেওয়ার যোগাড় ছিল না। এখন হইতে রীতিমত হিন্দু রমণী হইলাম।’ মহা ধুমধাম ও নানা আচারবিধি অনুসারে ইন্দুপ্রভার বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।&dquote;&dquote;

বিয়ের কিছুদিন পর ইন্দুর বড় ভাই বোনকে বছরে ৬ হাজার টাকা আয়ের জামিদারি দান করেন। বিয়ে থেকে তার আর্থিক নিরাপত্তা সব বিষয়েই বড় ভাই প্রমোদনাথ রায় ছোট বোনের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ইন্দুপ্রভা দেবী বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের সাক্ষী। তিনি লিখেছেন, তার বয়স যখন তিন বছর, তখন একটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই হিসেবে সালটি ছিল ১৮৮৫। ইন্দুপ্রভার প্রিয় বড় ভাই প্রমোদনাথ রায় ১৮৯৭ সালের ১০ জুন নাটোরের ডোমপাড়া মাঠে তিন দিনব্যাপী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের এক অধিবেশনের আয়োজন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এ অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। অধিবেশনের শেষ দিন অর্থাৎ ১২ জুন ১৮ মিনিট দীর্ঘ এক ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা ইন্দু তার আত্মকথায় লিখেছেন: ‘এই সময় দিঘাপাতিয়াতে মহা সভা হয়। নানা দেশ-বিদেশ হইতে বড় বড় ভদ্রলোক, সম্ভ্রান্ত লোক এবং রাজারা আসিতে লাগিলেন।...সিংহ দালান আরও উত্কৃষ্ট রূপে সুসজ্জিত করিয়া দাদা অভ্যাগতদিগকে থাকিতে দিলেন...সভা ভঙ্গ হইলে রাত্রে আবার বড় দাদা সকলকে একত্রে খাওয়াইবেন। বৈকালে কেহ সভায় গিয়াছে, কেহ যাইতেছে। সেদিন ২৯ জৈষ্ঠ এবং মুসলমানদের মহরমের শেষ। তাহারা গোওড়াঁ লইয়া বেড়াইতেছে এবং খেলিতেছে। রাণীরা সকলে তাই দেখিতে দিদির পুরাতন ছাতে গিয়াছে। আমি তখন পাক করিতেছিলাম, তাড়াতাড়ি শেষ করিয়া যাইব, মনে করিতেছি। এমন সময় ভয়ানক ভূমিকম্প আরম্ভ হইল। আমি তাড়াতাড়ি লতাকে লইয়া খোলা স্থানে গিয়া দাঁড়াইলাম।...চারদিকে ঘোর কোলাহল এবং কান্নাকাটি হইতে লাগিল।...প্রায় ১০/১৫ মিনিট ধরিয়া অনবরত পৃথিবী রেল গাড়ীর মত দুলিতে ও কাঁপিতে লাগিল। চারদিকে উচ্চ উচ্চ পুরাতন দালান সমস্ত হুড়মুড় করিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতে লাগিল।’&dquote;&dquote;

এ ভূমিকম্পের পর ইন্দুরা টিনের ঘরে থাকা শুরু করেন। বড় ভূমিকম্পের পর আরো কয়েক দিন কয়েকবার ভূমিকম্প হয়েছিল। তাই মানুষের মনে আতঙ্ক কাটেনি। সেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প প্রসঙ্গে ইন্দুর কথা: ‘এমন ভূমিকম্প আর দেখা দূরে থাক কেহ কখনও শুনিও নাই। চারদিক হইতে খবর আসিতে লাগিল কোথায় মাটি বসিয়া গিয়াছে, কোথায় জল, কোথায় পাথর এবং কোথায় বালি ও কয়লা উঠিয়াছে। নাটোরের রাজাদের বাড়ী অনেক ভাঙ্গিয়াছে এবং তাদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।’

ভূমিকম্পের পর রাজা প্রমোদনাথ রায় তাদের ভেঙে পড়া জমিদারবাড়ি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর ধরে বিদেশী প্রকৌশলী ও চিত্রকর্মশিল্পী আর দেশী মিস্ত্রিদের দিয়ে একর জমির ওপর এই রাজবাড়ি পুনর্নির্মাণ করেন।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের কিছুদিন পর ইন্দুপ্রভা দেবী প্রথম সন্তানের মা হন। কিন্তু ছেলেসন্তান না হওয়ায় পরিবারের লোকজন বেশি খুশি হতে পারেননি, ‘ছেলে না হইয়া মেয়ে হওয়ায় প্রায় সকলেই দুঃখিত হইল।’ সন্তান জন্মের পর ইন্দুপ্রভা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। কয়েক বছরের এ অসুস্থতা তাকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল। কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব তাকে সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। তিনি অতীত পেছনে রেখে জীবনকে সার্থক করতে চাইলেন; শুরু করলেন সেলাই, শিল্পকর্ম এবং অংক শেখা। সারা দিনের জন্য তিনি রুটিন তৈরি করে নিয়েছিলেন। পুরো দিনের কর্মসূচিতে থাকত বাগানে বেড়ানো, ছবি আঁকা, সেলাই, অংক শেখা, সাহিত্য পাঠ। এ সময়েই তিনি দিনলিপিও লেখা শুরু করেছিলেন।