ল্যারি দুবোয়স। অনুবাদ: শওকত হোসেন

চলচ্চিত্র নির্মাণে অন্তর্দৃষ্টির জন্য যতটা নয়—যদিও রোমান পোলানস্কি একজন মেধাবী পরিচালক ছিলেন আর থাকবেনও—নিজ বাড়ি ম্যানশন হাউজের হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খোলার কারণেই প্লেবয় সাময়িকী তাদের গৃহীত সাক্ষাৎকার সিরিজে তার সাক্ষাৎকার এখানে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই সময় দুই বছরের বেশি বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর হুজুগের বিষয়বস্তু, পোলানস্কির স্ত্রী শ্যারন টেট এবং তার বন্ধুদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যেন একটি উন্মাতাল দশকের বহু জঘন্যতম বৈশিষ্ট্যগুলোকেই প্রতীকায়িত করেছিল: যৌনতা, মাদক, হিপ্পি, দুষু্ব ধর্মগুরু এবং হলিউডি অতিরঞ্জন। নিজের চলচ্চিত্রে বীভৎস বিষয়ের দিকে পোলানস্কির ঝোঁক এবং কথিত অবক্ষয়মুখী জীবনযাত্রা তাকে নিয়ে গুঞ্জন কমানোয় সামান্যই কাজে এসেছে, তাই এ সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর ব্যাপকভাবে পাঠ করা হয়েছিল।

তিনি এবং প্লেবয় যৌথভাবে ম্যাকবেথ নামে ছবি নির্মাণ করছিলেন বলেই পোলানস্কি প্লেবয়কে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছিলেন। ছবিটি সমালোচকদের চোখে সফল হলেও বাণিজ্যিকভাবে মার খেয়ে যায়; তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কখনই আলোচনার ইচ্ছা ছিল না তার। কিন্তু পত্রিকার সম্পাদক ফিশার ফ্রিল্যান্স তরুণ সাংবাদিক ল্যারি দুবোয়সকে এ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দুবোয়স একজন ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল শ্রোতা, অনিবার্য প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। বেশ কয়েক সপ্তাহ বিভিন্ন বিষয়ে টোকা দেয়ার পর হঠাৎ করেই পোলানস্কি তার স্ত্রী এবং করুণ ঘটনার কথা বলতে শুরু করেন এবং চলতি গুজব থেকে সম্পূূর্ণ ভিন্ন একটা চিত্র উঠে আসতে শুরু করে। এ বিষয়ে এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বলার সময় দুবোয়স এক প্রতিভাবান, অস্থির মন—এবং দশক সম্পর্কে —মূল ধারার দেখা পান।

রোমান পোলানস্কির প্রথম ফিচার ফিল্ম নাইফ ইন দ্য ওয়াটার (তিনি এর সহলেখকও) ১৯৬৩ সালের সেরা বিদেশী চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে ছবির পরিচালককে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।

নাইফ-এর সব সহিংসতাই ছিল চরিত্রগুলোর মনোজগতে, কিন্তু পোলানস্কির পরের দুটি ছবি (্এগুলোরও সহলেখক ছিলেন তিনি) এমন কিছু তুলে ধরেছে, যা কারো কারো চোখে ভয়ংকর মৃত্যু দৃশ্যের প্রতি অসুস্থ বিকার মনে হচ্ছিল। রিপালশনে এক সুন্দরী বেলজিয়ান তরুণীর (ক্যাথেরিন দানিউব) উন্মত্ত পাগলামি প্রেমিককে হত্যার দিকে নিয়ে যায় এবং কাল-দে-সাক এক দুর্বল হিজড়া এবং তার জমকালো পোশাকের স্ত্রীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বাড়িতে আশ্রয় নেয়া দুজন অপরাধীর এক ধরনের অশুভ রসবোধের কাহিনী তুলে ধরেছে। সমালোচকদের ভেতর নিজের কিছু মিত্র রেখেছিলেন তিনি, যারা নাইফকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, কিন্তু অন্যরা ভীতিকর বিষয়ের প্রতি তার দুর্বলতা হজম করতে পারেননি। টাইম কাল-দে-সাককে ‘ত্রাসের এক ভীতিকর কমেডি’ হিসেবে দেখেছে। ‘ফ্রেমের পর ফ্রেমে বিপদ যেন চোখের আড়ালেই ছিল, শেষে দর্শকের মনে হয় কেউ বুঝি একটা কেউটে সাপ নিয়ে ওত পেতে আছে, যাকে সে দেখতে পাচ্ছে না।’ কিন্তু জুডিথ ক্রিস্ট অভিযোগ করেছেন, ছবিটি সম্পূর্ণই ‘বমির উদ্রেক দমানোর সময় যারা হাসতে পারে তাদের জন্য।’

পুরনো হরর ছবির নিরীহ প্যারোডি দ্য ফিয়ারলেস ভ্যাম্পায়ার কিলার্স-এ কিছুটা ব্যতিক্রমের পরপর পোলানস্কি ম্যানহাটানে আধুনিককালের উইচক্র্যাফটের ওপর ইরা লেভিনের বেস্ট সেলিং উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ রোজমেরি’জ বেবি’র (বর্তমান অনুবাদকের অনুবাদে ঝিনুক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত) মাধ্যমে সাসপেন্সের কিঞ্চিৎ বাইরের সীমান্তের দিকে এগিয়ে গেছেন। মিয়া ফ্যারো এবং জন ক্যাসাভেট অভিনীত ছবিটি সমালোচক ও বক্সঅফিস—দুদিক থেকেই বিপুলভাবে সফল ছিল।

ব্যক্তিজীবনের অল্প বয়সেই সাসপেন্স ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পোলানস্কির মোকাবেলার শুরু। আট বছর বয়সে এক নািস নির্যাতন শিবিরে মারা যান তার মা। এর অল্প পরেই তিনি কুখ্যাত ইহুদি গেটো ক্রাকো থেকে পালিয়ে বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করে যুদ্ধের সময় বেঁচে যান। একদিন এক জার্মান সৈনিক নিশানা অনুশীলনের সিদ্ধান্ত নিলে পোলানস্কির মাথার ওপর দিয়ে বুলেট ছুটে গিয়েছিল, আড়াল নিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন তিনি। এরপর তার বয়স যখন ১৬, এক ঠগ আরেকটু হলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে যাচ্ছিল তাকে।

পোল্যান্ডের লোদজে অবস্থিত মর্যাদাবান স্টেট স্কুল অল ফিল্মিং থেকে পাস করার পর, পোলিশ সরকার নাইফ ইন দ্য ওয়াটারের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তাকে বিশ্বের দরবারে পাঠিয়েছিল। দ্রুতই নিজেকে সেলিব্রিটি বলয়ের সফলতম ব্যাচেলর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি এবং ১৯৬৮ সালে সুন্দরী আমেরিকান অভিনেত্রী শ্যারন টেটকে বিয়ে করেন। বিভিন্ন ফিল্মের সেট এবং লন্ডন ও লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে অত্যন্ত দ্রুত যাতায়াতের কারণে ১৯৬৯ সালের ৯ আগস্ট রাত পর্যন্ত তারা জেটসেট দম্পতি হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠেন, কিন্তু তারপর শ্যারন টেট এবং তার তিনজন বন্ধু—ভয়টেক ফ্রিকোয়স্কি, পুরুষের হেয়ার স্টাইলিস্ট জে সাব্রিং ও অ্যাবিগেইল ফোলগার—এবং কেয়ারটেকারের সঙ্গে দেখা করতে আসা ১৮ বছরের তরুণকে পোলানস্কির লস অ্যাঞ্জেলেসের ভাড়া বাড়িতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সংবাদপত্র এ ঘটনাকে ব্যাপক প্রচারণা দিয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী পাইকারি হত্যাকাণ্ডে পরিণত করে।

বেশ কয়েক মাসজুড়ে চলতি তত্ত্ব ছিল যে খুনগুলো ‘ধনী হিপ্পিদের’ কেউ করেছে, মিস টেট ও পোলানস্কি ওদের ভেতর ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ এলএর কয়েক মাইল দূরে একটা পরিত্যক্ত র্যাঞ্চ থেকে চার্লস ম্যানসনকে তার তরুণ ও পলাতক মেয়েদের পরিবারসহ গ্রেফতার করলে এ তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়। এক দীর্ঘ ও বিপুল প্রচারিত বিচারের পর ম্যানসন ও তার অনুসারীদের দুজনকে হত্যাকাণ্ডের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং পোলানস্কির নামও বিভিন্ন খবর ও গুজবের কলাম থেকে উধাও হয়ে যায়। রোজমেরি’স বেবি নির্মাণের তিন বছর এবং হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পর, শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ-এর শুটিং শেষ করে তিনি নিজ সম্পর্কে, তার ছবি এবং তার জীবন সম্পর্কে ল্যারি দুবোয়সকে সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হয়েছিলেন। দুবোয়স নিজের অভিজ্ঞতার বলছেন—

‘‘রোমান পোলানস্কি মানুষের মনে জোরালো, প্রায়ই স্ববিরোধী অনুভূতি সৃষ্টি করেন। তার বন্ধু-বান্ধব, নারী এবং পেশাগত সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটালে প্রায়ই ‘ইশ, লোকটাকে আমার কি ভালো লাগে’ ধরনের মন্তব্যে প্রকাশিত তার সম্পর্কে এক ধরনের হতাশাব্যঞ্জক দোদুল্যমানতায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন আপনি। এর চেয়ে ভালো করে বলতে পারছি না। এ সাক্ষাৎকারের প্রলম্বিত মেয়াদে এমন সব মুহূর্ত ছিল, যখন আমি পোলানস্কির পক্ষে লড়াই করতে পারতাম, আবার এমনও সময় গেছে যখন তার সঙ্গে—কিংবা এ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য দায়িত্বে থাকা সম্পাদকের সঙ্গে—যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করেছে, আবার এমনও মুহূর্ত ছিল যখন মন থেকেই এদের কারো সঙ্গে দেখা না হলেই ভালো ছিল ভেবেছি। ২৪ ঘণ্টার টেপবন্দি কথোপকথন আদায়ের জন্য প্রায় আড়াই মাস পোলানস্কির পিছে লেগে থাকার সময় শেষ পর্যন্ত সেটা আমি পেয়েছি, আমার বিরক্তি গভীর হয়েছে।

আমার স্মৃতি এ অ্যাসাইনমেন্টের সূচনা পর্যন্তই বিস্তৃত বলা যায়, তবে তার বিভিন্ন ছবি এবং তার স্ত্রী ও তার বন্ধুদের হত্যাকাণ্ডের পর খবরের কাগজ থেকে পোলানস্কির এক ধরনের ভঙ্গুর, সম্ভবত ভীতিকর চরিত্রের ইমেজই মনে ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো। নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি উচ্চাভিলাষী নির্বাহীর মতো রুক্ষ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিচ বয়ের মতোই ভীতিকর। তার মেজাজ প্রফুল্ল, আশাবাদী। প্রায় অস্বস্তি জাগানো পর্যায়ে সোজাসাপ্টা মানুষ। নিজেকে মেধাবী, সিরিয়াস লোকজনে ঘেরাও রাখতে পছন্দ করেন।&dquote;&dquote;

‘কেবল নারীতেই তার একমাত্র খাঁটি আনন্দ। এক্ষেত্রে নিজের ইমেজের প্রতি তিনি সুবিচারই করেন। তার অন্যান্য ব্যক্তিগত অভ্যাসের মধ্যে তিনি প্রায় বিষাদময়ভাবেই নিয়মনিষ্ঠ। নিয়ম ধরে ব্যায়াম করেন। তার খাদ্য তালিকায় আছে হুইট জার্ম, দই এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার। কদাচিৎ এক গ্লাস মদ বা বিয়ারের চেয়ে বেশি পান করেন। সিগারেট খাওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে বন্ধুবান্ধবদের সবক দেয়ার বেলায় তিনি ব্যতিক্রম নন।

‘‘এখন সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষ হওয়ার পর আমাদের বহু মতদ্বৈততার ভেতর একটি অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে। অটোমোবাইলের ভয়ংকরতম ড্রাইভার তিনি। ফরাসি ছুটির দিনে তার সঙ্গে সেন্ট ট্রোপেজের আশপাশে একটা এক্সকে-ইতে ঘণ্টায় ১১০-১২০ মাইল বেগে ছুটে বেড়ানো মোটেই প্রীতিকর ভাবিনি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পর্কে আমার ধারণা ব্যাখ্যা করতে গেছি যখন, তিনি স্রেফ বলেছেন: ‘আপনাকে বুঝতে হবে: আপনার কাছে যেটা ঝুঁকি মনে হয়, আমার কাছে ঝুঁকি মনে না-ও হতে পারে।’ অনওয়াকিবহাল কেউ হয়তো তার পটভূমি সম্পর্কে সব ধরনের অর্থ এবং কোনো গুপ্ত অদৃষ্টবাদিতা বের করে বসতে পারেন। কিন্তু আমি প্রসঙ্গ বাদ দিয়েছি, কারণ যথারীতি তিনি যা মনে করেন সেটাই বুঝিয়েছিলেন, বেশি কিছু না।

‘সবশেষে এটা উল্লেখ করা দরকার, এ সাক্ষাৎকারের একটি অংশ আছে যেটা আদায় করতে লড়াইয়ের দরকার পড়েনি। এক রোবরার সন্ধ্যায় একবারে বিরান ফার্মহাউজের পোর্চে বসেছিলাম, চারপাশে মাইলকে মাইলজুড়ে কেবল ফরাসি পল্লী এলাকা। হঠাৎ করেই দ্বিধার সঙ্গে শ্যারন এবং তার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুললাম। টানা ২ ঘণ্টা বাড়তি কোনো অনুরোধ-উপরোধ ছাড়াই সহজ ভাষায় এবং তার স্বাভাবিক বিরতি বাদে নিজের কাহিনী বলে গেলেন তিনি। নিশ্চয়ই নিমেষে পুরো ব্যাপারটা সেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, সব প্রকাশ করতে চেয়েছেন। যখন শেষ করলেন, মনে হয় ভালো বোধ করেছেন তিনি। আমি অবর্ণনীয়ভাবে বিষণ্ন বোধ করেছি। সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ তোলার আগে আমাদের দুজনেরই দিন দুই পেরিয়ে গিয়েছিল। এখনকার মতো তখনো একটা প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে যাওয়া কঠিন ছিল। তো শেষ একটা কথা: টেপ  রেকর্ডার বন্ধ থাকার সময় আগাগোড়া পোলানস্কি আমাকে বলে গেছেন কাগজের বুকে তার ব্যক্তিত্বকে তর্জমা করা অসম্ভব, কেননা শব্দের চেয়ে বরং বেশি করে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেই তার অপ্রতিরোধ্য জোরালো এবং প্রফুল্ল স্বভাব প্রকাশ করে থাকেন। তিনি অনেকটা চলচ্চিত্রের মতো, বলেছেন তিনি; বোঝার জন্য তাকে দেখতে হবে। আমার মনে হয় ভুল বলেছেন তিনি। আমার মনে হয় পাঠকরা তার সম্পর্কে নিজস্ব প্রেমময় দোদুল্যমানতা গড়ে তুলতে পারবেন।’

 

প্রশ্ন: আপনার ছবিগুলো বীভৎসতার গুরু হিসেবে আপনাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে। এর প্রতি আপনার দুর্বলতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

উত্তর: কেন এটা পছন্দ করি জানি না। কেউ কেন বক্সিং খেলতে বা লিখতে পছন্দ করে? আমি চিত্রনির্মাতা, ছবি তৈরি করি। আপনি আমাকে নিজের মনোবিশ্লেষণের কাজ করতে বলছেন, কিন্তু এটা আমার এতটুকু আগ্রহ জাগানোর মতো কিছু নয়।

প্রশ্ন: আমরা আপনাকে নিজের মনোবিশ্লেষণ করতে বলছি না—আমাদের শুধু আপনার ছবিগুলোর মাধ্যমে প্রকাশিত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলুন।

উত্তর: ঠিক আছে। আমি বীভৎসতায় আচ্ছন্ন নই, বরং চাপের মুখে মানুষের আচরণেই বেশি আগ্রহী, যখন তারা স্বস্তিতে থাকে না, দৈনন্দিন পরিস্থিতি যেখানে তারা প্রচলিত রেওয়াজ এবং সমাজের নীতিনৈতিকতাকে সম্মান করতে পারে। আপনি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে সত্যি কিছু জানতে পারবেন, যখন তাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়া হবে, যেখানে সভ্য মূল্যবোধগুলো তার পরিচয়, এমনকি খোদ সত্তাকেই বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়। একদিক থেকে নাইফ ইন দ্য ওয়াটার ছিল এ বিষয়ে আমার সূক্ষ্ম নজির। আমি তিনজন মানুষকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলেছি, যা ইয়টে তাদের বন্দিত্ব এবং দুজন পুরুষের ভেতর প্রতিযোগিতা তাদের চাপের মুখে ফেলেছে। এক দিক থেকে কাল-দে-সাক-এও একই পরিস্থিতি ছিল, যেখানে লোকে তাদের অভ্যস্ত উপায়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছিল না। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর আগে ডোনার পাস গ্রুপ নিয়ে একটা ছবির কাজ করছিলাম। ১৮৪৭ সালে সিয়েরা নেভাদায় আটকা পড়েছিল ওরা। এটা খুবই আগ্রহ জাগানো কাহিনী, কারণ ওই দেশের সূচনায় অগ্রগামীদের মোকাবেলা করা সমস্যার লাক্ষণিক হওয়া ছাড়াও এটা সভ্য মানুষের এমন অবস্থায় পর্যবসিত হওয়া তুলে ধরেছে, যেখানে বেঁচে থাকতে হলে পরস্পরকে খেয়ে নেয়ার মতো ভীষণ মারাত্মক নৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তবে আমি আপনার মাংস খাবো বলে মনে হয় না। বরং এর চেয়ে মারাই যাব মনে করি। আপনি মারা যাওয়ার পর আপনাকে খেয়ে নেয়াটা নৈতিকভাবে ভ্রান্ত কিছু বলে নয়, আমি স্রেফ আপনার মাংস গিলতে চাইব না বলে। আপনি কি আমার মাংস গিলবেন?

প্রশ্ন: কে জানে? যা-ই হোক, চিন্তার প্রতি আমার সাংস্কৃতিক ঘৃণা সম্ভবত বমি করতে বাধ্য করবে।

উত্তর: সেটা কেবল শুরুতে, বন্ধু।

প্রশ্ন: আপনি কি নিজের জন্য উত্তর খোঁজেন নাকি আপনি আগেই বুঝে গেছেন ভেবে দর্শকদের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলায় বাধ্য করতেই বিভিন্ন চরিত্রকে চাপের মুখে ফেলেন?

উত্তর: কোনোটাই নয়। এটা আমাকে স্রেফ মুগ্ধ করে। আপনাকে যখন কিছু মুগ্ধ করে, আপনি সেটা নিয়ে কথা বলেন। আর ছবি তৈরি এটা নিয়ে কথা বলার আমার কায়দা।

প্রশ্ন: কী কারণে চাপে থাকা চরিত্রেই আপনি বেশি মুগ্ধ, যারা চাপে নেই, তাদের বাদ দিয়ে?

উত্তর: অনেক সময় নিজেকে এসব প্রশ্ন করি না বলে অবাক হই, কিন্তু করি না। করলে হয়তো জবাবটা জানতে পারতাম, কিন্তু এর দরকার মনে করি না। আমি এ রকমই। সম্ভবত ছোটবেলায় চাপের মুখে লোকে কেমন আচরণ করে দেখার প্রচুর সুযোগ পেয়েছিলাম বলেই। আমি প্রায়ই ভাবি: আপনি যার সঙ্গে প্রচুর ভোদকা পান করেছেন, অনেক মজা করেছেন, একদিন সকালে তার দরজায় হাজির হয়ে যদি বলেন, ‘আমাকে লুকিয়ে রাখো। নািসরা তাড়া করছে’, তখন সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে? এখন আপনার সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে। কিন্তু আমি যা সৃষ্টি করি, সেখানে যুদ্ধের ভূমিকা কতখানি, বিচার করা কঠিন। আমি যার ভেতর দিয়ে এসেছি, তাতে আচ্ছন্ন হয়ে আছি মনে করি না। যুদ্ধের সময় আমি ছোট ছিলাম, ছোটরা প্রাণোচ্ছ্বল হয়। আপনি যা-ই সৃষ্টি করুন না কেন, সেটা আপনার ভেতরের লাখ লাখ বিষয়েরই সমষ্টি, বালক বয়সে, তরুণ হিসেবে আপনি কী পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছেন, কী পড়েছেন, সিনেমায় কী দেখেন, আপনার চেনাজানা লোকজন—এসবই আমার আবেগীয় জীবনকে প্রভাবিত করেছে। যেমন আমার তারুণ্যের অন্যতম গভীর অভিজ্ঞতা ছিল অব মাইস অ্যান্ড মেন ছবিটা দেখা। আমার সঙ্গে রয়ে গেছে সেটা। আমি সেই বিশালদেহী, সুদর্শন মানুষটা আর তার বন্ধু এবং তাদের বন্ধুত্বের কথা না ভেবে পারিনি। এবং আমি ভেবেছি আমি চিত্রনির্মাতা হলে নিশ্চয়ই এ লাইনে একটা কিছু করতাম, অবিচার, অসহিষ্ণুতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কিছু। আমি সেটা করেছি। এসব উপাদান আমার ছবিতে ছড়িয়ে থাকে।

প্রশ্ন: তাহলে কেন রোজমেরি’স বেবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেটা অন্ততপক্ষে কুসংস্কারকেই উদযাপন করেছে কিংবা জনপ্রিয় করেছে?

উত্তর: ফ্যান্টাসি উপভোগের জন্য আপনার কুসংস্কারাচ্ছন্ন হতে হবে, তা নয়। আমার সঙ্গে কিছুটা দীর্ঘ সময় কাটালে আপনি দেখবেন, অপ্রাকৃত কোনো কিছুতেই আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। এটা স্রেফ সহজ ব্যাখ্যার খোঁজে থাকা এমনিতে উপলব্ধিতে অক্ষম মানুষের জন্য বিশেষ কিছু ঘটনার এক ধরনের ফ্যাশনেবল বিনোদনমাত্র। জীবন সম্পর্কে আমার দর্শনের ক্ষেত্রে আমি ভূমিসংলগ্ন মানুষ, খুবই যৌক্তিক এবং বস্তুবাদী মানসিকতার, অকাল্টে এতটুকু আগ্রহহীন। কেবল ভালো সিনেমার প্রতি দুবর্লতাই আমাকে এ ছবি নির্মাণে বাধ্য করেছে। প্যারামাউন্টের হেড অব প্রডাকশন্স বব ইভান্স আমাকে ফোন করে প্রকাশের আগেই বইটির গ্যালিপ্রুফ পড়ার অনুরোধ জানালে দারুণ সাসপেন্সে ভরা প্লট নিয়ে ওটাকে ছবির পক্ষে দুর্দান্ত উপকরণ বলেই মনে হয়েছিল।

প্রশ্ন: সাসপেন্স আপনার ছবির আরেকটা হলমার্ক। কোন জিনিসটা একে আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে?

উত্তর: আমি আছি নাটকের কাজে আর সাসপেন্স তো নাটকেরই মূল কথা। আমার ছবিগুলো অপ্রত্যাশিত এবং অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সঙ্গে সম্পর্কিত। জীবনও আমার কাছে এ রকমই। বাইরে কী ঘটবে, সেটা কখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না আমরা। নিজের জীবন আমি সাসপেন্সের ভেতর দিয়ে কাটাই না, কিন্তু গল্পকে তা কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলায় সিনেমায় অবিরাম অপ্রত্যাশিতকেই পছন্দ করি। এরপর কী হবে, দর্শককে সেটা আন্দাজ করার সুযোগ না দেয়াই আসল।

মনে আছে, ছয় বছর বয়সে আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু মাটির করোটি বানিয়ে চোখের জায়গায় কাচ বাসিয়ে সেটাকে দেয়ালে বসিয়ে ভেবেছিলাম ঘরে ঢুকলেই ভয়ে আঁতকে উঠবে কেউ। ক্যান্ডি পেপারে শয়তানের জিভ বানিয়ে ওটার পেছনে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালানোর কথাও মনে আছে। এসব জিনিস আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছে, কিন্তু কোনো অতিপ্রাকৃত বা অদ্ভুত কারণে নয়, কেবল মুখোশ তৈরির শোবিজনেসের ব্যাপারটাই আমার মনে ধরেছিল। নাটকীয়তা ও অপ্রত্যাশিতর প্রতি আমার দুবর্লতা সবসময়ই আমার কাছে এতটাই স্পষ্ট ছিল যে নিজেকে কখনো কারণ জিজ্ঞেস করতে যাইনি। নিশ্চয়ই এটা নিয়েই জন্মেছিলাম।

প্রশ্ন: তার পরও রুচি আর চাতুর্যের প্রশ্ন থেকে যায়। কোনো কোনো সমালোচক বলেছেন, আপনি পর্দায় মাত্রাতিরিক্ত সহিংসতায় মেতে উঠেছেন।

উত্তর: আমি চাতুর্যের সঙ্গেই সেটা করেছি। অন্যরা আবছাভাবে করেছেন। গল্পের জন্য জরুরি জিনিস তুলে ধরতে তারা ভীত। আমি জোরবা দ্য গ্রিক-এর গলা কাটার ভেতর দিয়ে শেষ হওয়া গির্জা প্রাঙ্গণের দৃশ্যের ক্রমেই বেড়ে ওঠা টেনশনের কথা কোনো দিনই ভুলব না, দুর্ভাগ্যক্রমে পর্দার নিচের কিনারে সেটা ঘটেছে। আমার কাছে ওটাই ছিল ছবির শেষ, কারণ পরিচালক ছেঁটে ফেলেছিলেন। নিজের কাপুরুষতা তুলে ধরেছেন তিনি। আপনি যদিও এমন কৌতুক বলেন যেখানে চার হরফের শব্দটির উচ্চারণের দরকার আছে, তাহলে সেটা আপনাকে বলতেই হবে। খালি এটা বললেই চলবে না, ‘মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরল সে, তারপর ডট.ডট.ডট.ডট।’ এর চেয়ে অন্য কোনো গল্প বলাই ভালো। সহিংসতা দেখানো একই ধরনের পরিস্থিতি, তাই না?

প্রশ্ন: কিন্তু সমালোচকরা বলতে পারেন যে সহিংসতার গ্রাফিক উপস্থাপন পর্নোগ্রাফিরই শামিল, কেবল সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ক্ষতিপূরণ তো করেই না, বরং যারা দেখেন তাদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

উত্তর: এরা পর্দার দৃশ্যের কারণে সহিংসতা ঘটতে পারে বলে নিজেদের ভুল বোঝান। রাস্তার টোকাইদের কাছে সহিংসতার কারণ জানতে চাওয়া উচিত ওদের, তাহলে আরো বেশি আলোকিত হতে পারবেন। আমার চোখে, যখন পর্দায় সহিংস কিছু ঘটতে দেখি, আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাই। আমার মনে হয়ে এটাই বেশির ভাগ মানুষের প্রতিক্রিয়া। মানুষকে ব্যক্তিজীবনে সহিংস আচরণে প্ররোচিত করার মতো পর্দায় সহিংসতার অস্তিত্ব থেকে থাকলে সেটা সহিংসতার হলিউডি ধারণা। ওয়েস্টার্ন ছবিতেই মন্দ লোকরা ৯০ মিনিট ধরে আপনাকে এত বেশি জ্বালাতন করে যে শেষ পর্যন্ত ভালো মানুষ যখন চমৎকারভাবে তাকে নিকাশ করে, আপনি স্বস্তি এবং আনন্দ বোধ করেন। তো তরুণ মনে যে ভাবনা তৈরি হয়, সেটা হলো কেউ বেশি খারাপ হলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে সরিয়ে দিতে পারেন। এটাই ‘পরিষ্কার’ কায়দায় হত্যাকাণ্ড, মুভি রেটিং কর্তৃপক্ষের সমর্থন পাওয়া হত্যা যারা এর আসল অর্থ ধরতে পারেননি। আমার কাছে এটাই অনৈতিকতা।&dquote;&dquote;

কিন্তু আপনি যন্ত্রণাকর, বাস্তবভিত্তিক উপায়ে স্রোতের মতো রক্ত বেরিয়ে মানুষকে ধীরে, ভীতিকরভাবে মরতে দেখালে—কারণ খুব বিরল ক্ষেত্রেই মানুষ নিমেষে প্রাণ হারায়—পর্দায় সেটা প্রত্যক্ষ করে বাস্তব জীবনে এতে জড়িত হওয়া থেকে দূরে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। সাহিত্যের দিকে চোখ ফেরান। আপনাকে অচেতন করার জন্যে বাইবেলই যথেষ্ট। আবার শলোকভ যখন অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য দোন উপন্যাসে রাশিয়ার নৃশংসতার কথা বলেন, তিনি পরম বিশদভাবে বর্ণনা করেন এবং কেউই কখনো এর সমালোচনার কথা ভাবতে যাবেন না, কারণ সাহিত্য এভাবেই বিকাশ লাভ করেছে, অথচ সিনেমা নতুন বিষয়, ঢের বেশি বাণিজ্যিক জিনিস, অন্ততপক্ষে অ্যাংলোস্যাক্সন দেশগুলোয় এর ওপর সীমা আরোপ করা হয়েছে, ফলে এটা ঠিকমতো বিকশিত হতে পারেনি। বরং সিনেমা জীবন ও মৃত্যুর কপট, প্রলেপ দেয়া চিত্র আঁকতেই প্ররোচিত হয়েছে।

প্রশ্ন: গত দুই বছর আপনি খবরের কাগজে বিপুল এবং সরস জায়গা পাওয়া সত্ত্বেও আপনার স্ত্রী এবং তার বন্ধুদের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নীরবতা পালন করে এসেছেন। এখন কি আপনার বক্তব্য জানাতে চান?&dquote;&dquote;

উত্তর: এটা বন্ধুদের সঙ্গে আলাপের মতো কোনো বিষয় নয়, তবে একবারের জন্য এর আদ্যোপান্ত উল্লেখ করতে চাই। ওই সময়টা নতুন করে নির্মাণের চেষ্টায় ভীষণ সমস্যা হয় আমার, তবে এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলার আছে। আমার কাছে খুবই মূল্যবান কিছু হারিয়েছি আমি এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ যারা, তাদেরই একই রকম মনোভাব হবে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটার সময় খবরের কাগজগুলো গলা মিলিয়ে বলে উঠেছিল ‘হ্যাঁ, আলবৎ, এভাবেই তো জীবনযাপন করতেন তিনি, নিজের ছবিতে তিনি এসবই সৃষ্টি করেছেন, এবং এই তো তার পরিণাম।’ এটাই ছিল প্রথম বিস্ফোরণ। টাইম সাময়িকী বলেছিল, ‘এটা পোলানস্কির মানবীয় চরিত্রের অন্ধকার ও বিষণ্ন দিকের অনুসন্ধানী ছবির মতোই ভয়ংকর একটা দৃশ্য।’ কমিয়ে বললেও এ ধরনের লেখার সস্তা ও মামুলিত্বে বিস্মিত হয়েছি। ওদের শিরোনামের কথা মনে আছে: ‘মরদেহ ছাড়া আর কিছু না।’ খবরের কাগজ যেভাবে আগে থেকেই উত্তেজনা সৃষ্টিকারী একটা কিছুকে উত্তেজকে পরিণত করেছিল, এটা অসুস্থকর।

এটা আমার হূদয়ের খুব কাছের এমন একটা বিষয়, যেটা সম্পর্কে অন্য যে কারো চেয়ে আমি বেশি জানি। অনেক আগে থেকেই জানি, কোনো সাংবাদিকের পক্ষেই ১০০ ভাগ সত্যি তুলে ধরা অসম্ভব, কিন্তু সাংবাদিকের ইচ্ছা ও অবহেলার কারণে সত্যি কি পরিমাণ বিকৃত হতে পারে, সেটা বুঝিনি। আমি কেবল ঘটনার ব্যাখ্যার কথা বোঝাচ্ছি না; বাস্তবতার কথাও বলছি। শ্যারন এবং হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন বাস্তবে অপরাধমূলক ছিল। খবরের কাগজ পড়ার সময় নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি! নিহতদেরই তারা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে। আমি সত্যি পত্রিকাকে ঘৃণা করি। সবসময় করতাম না। কিন্তু পত্রিকাই ঘৃণা করতে বাধ্য করেছে।&dquote;&dquote;

ওইসব নিবন্ধের কয়েকটি! পিজ্যান্ট থেকে: ‘শ্যারন টেটের যৌন অনাচার: যৌনতা, ধর্ষকাম, তারকা।’ বিশেষ করে অন্তঃস্বত্তা একজন মহিলার সীমিত যৌন উত্তেজনার দিক থেকে অবিশ্বাস্য! পত্রিকা যেন হঠাৎ করেই ম্যাসোশিজম, স্যাডিজম, সুইসাইড, উইচক্র্যাফট, রিচুয়াল, ড্রাগ অ্যাবিউজ এবং ন্যাক্রোফিলিয়া শব্দঅলা নতুন একটা অভিধান হাতে পেয়েছিল। কল্পনাযোগ্য সবকিছু ঢেলে দিয়েছে তারা। একটা সাময়িকী তো অন্য চারজন নিহতসহ শ্যারনের একটা ছবি ছাপিয়েছে, শ্যারন নাচছে, ওর পেছনে শ্যাম্পেইনের বুদ্বুদের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে ওরা। খোদার গজব পড়ুক ওদের ওপর! নিহতদের দুবার হত্যা করা হয়েছে: একবার ঘাতকদের হাতে, দ্বিতীয় দফা পত্রিকার হাতে।

প্রশ্ন: কেন, আপনি কী মনে করেন?

উত্তর: জানি না। সত্যিই জানি না। মনে হয় কোনো ধরনের অসন্তোষ, কোনো ধরনের তিক্ততা, ঈর্ষার কারণে; আপনাকে বলতে দিন, বহু সাংবাদিক এবং অসাংবাদিক তাদের দাবি মোতাবেক ‘ব্যক্তিগত’ বর্ণনা লিখে ভালো পয়সা কামিয়েছেন। আমি আপন মনে ভেবেছি ওসব ক্ষতিকর রচনার লেখকরা কি হত্যাকারীদের চেয়ে ভালো মানুষ ছিল? আমার মনে হয় না। স্রেফ ভিন্ন প্রকাশভঙ্গি ব্যবহার করেছে ওরা। আপনি বলুন, পত্রিকাকে এমন নিন্দুকে পরিণত করল কোন জিনিসটা?&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: প্রশ্নের অবকাশ নেই যে পত্রিকার একটা বিশেষ অংশ ঘাতকদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটেছে, কিন্তু বৈধ খবরের কাগজগুলো নিহত ও ঘাতকদের ভেতর কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা জানতে আরো গুরুতর এবং দায়িত্বশীল প্রয়াস চালিয়েছে। এটা কি যৌক্তিক এবং বোধগম্য ছিল না?

উত্তর: হ্যাঁ, হয়তো। কিন্তু তারা সবাই হত্যাকাণ্ডে ‘মজা’র খোঁজ করেছে, এটা অর্থহীন ছিল এবং তারপর আমার ছবিকে হত্যাকাণ্ডের উপমায় পরিণত করেছে। এবং তারা সবাই যৌক্তিক মোটিভ থাকতেই হবে বিশ্বাস করেছে, ফলে ‘হত্যাযজ্ঞের দিকে চালিত করা উদ্দাম অনুষ্ঠান’-এর মতো নিবন্ধের মাধ্যমে আমাদের অপবাদ দিয়েছে—একটা পত্রিকার খবরের এটাই শিরোনাম ছিল—জে সাব্রিং এবং ভয়টেকের সঙ্গে বিশেষ অজ্ঞাত মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক। এসব রচনা আমাকে একটা গল্পের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, এক লোক তার বন্ধুকে বলছে, ‘কল্পনা করো, ২ ইঞ্চি পুরু স্টিক, স্পিনা আর ফ্রেঞ্চফ্রাইসহ প্যাতে দে ফোই গ্রাস, চকোলেট পুডিং আর কফি—সবকিছুই মাত্র ২৫ সেন্ট,’ তখন তার বন্ধু বলছে, ‘এটা অসম্ভব। কোথায়?’ উত্তর, ‘কোথায়, তা তো বলিনি, আমি বলেছি, কল্পনা করো।’

হলিউডের বাসিন্দা এক দম্পতি আছেন, জো হাইমস ও এল্ক সোমার। ভদ্রলোক সম্ভবত লেখক, আর মহিলা বোধ হয় অভিনেত্রী। অথচ তারা দুজনই আমাদের জীবনযাপনের ধারা, আমরা কাদের সঙ্গে মেলামেশা করি আর আগে হোক বা পরে এই করুণ ঘটনা আমাদের ওপর নেমে আসার কথা তাদের জানা ছিল বলে নিবন্ধ বিক্রি করছিলেন। বিস্ময়কর! জীবনে একবারই তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। একবার! কিন্তু ছাপার হরফের জাদুকরী একটা কিছু আছে, তো গড়পড়তা পাঠক বলেন, ‘বেশ, ওরা যেহেতু ছেপেছে, নির্ঘাত সত্যিই হবে।’ তো খবরের কাগজ এ ধরনের জিনিস এত বেশিবার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমন নিশ্চয়তার সঙ্গে তুলছিল যে এমনকি আমাদের বন্ধুদের অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন। তারা হয়তো একটা কিছু পড়ার পর বলে উঠতেন, ‘এটা তো আমাদের জানা ছিল না।’ তখন আমিও বলেছি, ‘আমারও না।’&dquote;&dquote;

হত্যাকাণ্ডের পর লোকে পত্রিকায় যা কিছু পড়েছে, তাতে প্রশ্ন না করে পারেননি: যৌন উন্মাদনা, আচার আর মাদক গ্রহণের ফাঁকে কাজ করার সময় পেতেন কখন তারা? কেমন করে সাড়ে তিন বছরে আমি চারটি ছবি নির্মাণ করলাম? শ্যারন কীভাবে তার থেকে বেশি ছবি করতে পারল? জে সেব্রিং ব্যবসা চালাত কীভাবে? অ্যাবেগেইল ফোলগার ছিলেন সমাজকর্মী, সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে কাজ করতে ওয়াটসে যেতেন, কাজ শেষে স্পিড রিডিং ক্লাসে যেতেন। রাত ১১টায় ফিরে আসতেন হতক্লান্ত হয়ে, পরদিন সকাল ৬টায় ফের জেগে ওঠার আগে আচার এবং যৌনক্রীড়ার সময় ছিল কোথায়। আর ভয়টেক ছবিতে একটা কিছু মেলানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছিলেন। ওকে আমার নির্মাণাধীন ডলফিনের ওপর একটা ছবিতে কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এটা নিয়ে দারুণ উত্তেজিত ছিলেন তিনি, এ বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। টাইম

 সাময়িকী বলেছে, তার নাকি ‘ভয়ংকর সব সম্পর্ক ছিল, এমনকি পোলানস্কিরও যাতে আপত্তি ছিল।’ এসব জিনিস তারা পায় কোথায়? আপনার কাছে জানতে চাই। তারা এসব কোথায় পায়?

 

প্রশ্ন: সম্ভবত লস অ্যাঞ্জেলেসের আশপাশে ‘ধনী হিপ্পি’ হিসেবে আপনাদের এবং আপনাদের বহু বন্ধুর খ্যাতি থেকে, যাদের জীবনযাপন বিভিন্ন পার্টি, মাদক আর যথেচ্ছ যৌনতা এবং এ ধরনের ব্যাপার ঘিরে আবর্তিত হয়।

উত্তর: আমরা সবাই পাপী, প্রমোদবাদী, না? তাতে কি দুর্ঘটনাটা মানুষের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠা উচিত? খবরের কাগজ কীভাবে একে ব্যাখ্যা হিসেবে মেনে নিতে পারল? তারা সবাই অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। আমার জীবনের একটা সুখী, নির্দোষ সময় ছিল এটা। মানুষের ঘরে, সৈকতে কিংবা পাহাড়ে অসংখ্য পার্টি চলেছে, শ্যারন প্রায়ই ডিনার তৈরি করত, আমাদের অসাধারণ বন্ধুবান্ধব ছিলেন, যারা আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমরা তারাভরা আকাশের নিচের উষ্ণ পরিবেশে বসতাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম নয়তো গান শুনতাম—ছবি, যৌনতা, রাজনীতি কিংবা যা-ই হোক। আমরা একে অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি, একে অন্যের সাফল্যে সুখী ছিলাম, দারুণ সুন্দর এবং আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন ছিল। জীবন এত বিলাসবহুল হতে পারে জানা ছিল না। সবসময় হোটেলের কামরা আর সংগ্রামের ব্যাপার ছিল, এখন এই জীবন আমি ভালোবেসেছিলাম, জায়গাটা ভালোবেসেছি, মানুষকে ভালোবেসেছি, কাজকে ভালোবেসেছি। আমার মেইডকে সপ্তাহে ২০০ ডলারের বেশি বেতন দিচ্ছিলাম, সম্ভবত কোনো পোলিশ শ্রমিকের ছয় মাসের আয়ের সমান। প্রাচুর্য আর আরাম আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। শ্যারন এবং আমার বিশাল সম্ভাবনা ছিল। আমরা চিরকালের মতো লস অ্যাঞ্জেলেসেই থিতু হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এক ধরনের বিচিত্র, সুখী স্বপ্ন ছিল সেটা। কিন্তু এখানে উত্তেজনাকর, ভীতিকর বা অনৈতিক কিছুই ছিল না।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: সেব্রিং ও ফ্রিকোওস্কির মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা শোনা গেছে।

উত্তর: এসব একেবারেই বাজে কথা। তারা যেটা করেছেন, সেটা হলো নিজেদের ব্যবহারের জন্য কারো কাছ থেকে হয়তো একটা পট কিনেছেন।

প্রশ্ন: তখন পত্রিকায় ফ্রিকোওস্কি এবং অ্যাবিগেইল বেশ কয়েক মাস আপনার বাড়িতে ছিলেন বলে জোর দেয়া হয়েছিল, এমনকি আপনি ঘরে না থাকলেও এবং সেব্রিং সবসময়ই আশপাশে থাকতেন বলে মনে হয়েছে। এ দিয়ে বোঝানো হয়েছিল, এটাই বিচিত্র কিছু যে ঘটছিল তার প্রমাণ।

উত্তর: জে প্রায়ই বেড়াতে আসতেন, কিন্তু তিনি কখনই বাড়িতে থাকেননি। আমরা দূরে থাকলে বা শ্যারন লন্ডন থেকে আমার আগেই লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে এলে বাড়িঘরের দিকে খেয়াল রাখার জন্য ভয়টেক এবং গিব্বির থাকাটা যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হয়েছিল। আমরা দুজনই তার সঙ্গে কেউ থাকলে স্বস্তি বোধ করতাম। তো একে মোটেই বিচিত্র কিছু বলা যায় না। সেন্ট ট্রোপেজে কীভাবে লোকজন আমার বাড়িতে আসে, আপনি দেখেছেন। এও দেখেছেন যে এটা অনেকটা কলেজের ভ্রাতৃসংঘের মতোই নিরীহ ধরনের।

প্রশ্ন: খবরে যে অকাল্ট আচারের কথা বলা হয়েছিল, সে ব্যাপারে কী বলবেন—আপনি রোজমেরি’জ বেবি পরিচালনার পর যেসব কাহিনী গতি পেয়েছিল?

উত্তর: আপনি কী চান আপনার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করি? আগেও যেমন বলেছি, আমি স্রেফ অকাল্টকে অস্বীকারই করি না, এটা আমার যৌক্তিক, বস্তুবাদী জীবন দর্শনের সঙ্গে এতটাই বেমানান যে, এসব আভাসের প্রতিবাদ করেছি। এবং শ্যারন—তারা ওর ওপর যেসব চাপিয়ে দিচ্ছে—অকল্পনীয়। মৃত্যুর পর ওকে দানবে পরিণত করেছে তারা। সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে নিরীহ, পছন্দের মানুষকে পরিণত করেছে দানবে। ওর চারপাশের সবার, সবকিছুর প্রতি মায়ার প্রতিমূর্তি ছিল ও—মানুষ, পশুপাখি, সব। ওর ভেতর মন্দ কিছুই ছিল না। অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিল ওর। ওর চরিত্র বর্ণনা করা কঠিন। স্রেফ যারপরনাই ভালো ছিল ও, সীমাহীন ধৈর্যশক্তি নিয়ে আমার দেখা সবচেয়ে দয়ালু মানুষ। আমার সঙ্গে বসবাস করতে পারাটাই তার ধৈর্যের প্রমাণ। কারণ আমার কাছাকাছি থাকা নির্ঘাত বিপত্তির মতোই ছিল। কখনো মেজাজ খারাপ করতে দেখিনি ওকে, কখনো গম্ভীর হতো না। স্ত্রী হওয়ার ব্যাপারটা ও উপভোগ করত। পত্রিকা এবং জনগণ ওর দৈহিক সৌন্দর্যের কথা জানত, কিন্তু ওর মনটাও ছিল সুন্দর। এবং এটা কেবল বন্ধুরাই জানতেন। ১৯৬৬ সালে শ্যারনের সঙ্গে আমার পরিচয়ের আগে আমার যৌন জীবনের বিপরীতে প্রেমের জীবন অসফল এবং কষ্টকর ছিল এবং আমি আমার স্বাধীনতাকে আগলে রাখতাম। আমার প্রথম বিয়ে ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন: কী রকম?

উত্তর: আমি পোল্যান্ড ছাড়ার পর বিভিন্ন সংকটে পড়ে তরুণ ও উদ্দীপনায় ভরপুর অবস্থায় প্যারিসে ঘুরে বেড়ানোর সময় অল্প সময়ের জন্য এক পোলিশ অভিনেত্রীকে বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু বিশেষ কারণে এটা নিয়ে কথা বলা ঘৃণা করি। কথা বলাটা কষ্টকর বলে নয়, বরং সেটা ভীষণ ব্যর্থ ছিল বলে। ও নিয়ে কথা না বলি। ঠিক আছে?

প্রশ্ন: ঠিক আছে। বলছিলেন ১৯৬৬ সালে শ্যারনের সঙ্গে আপনার পরিচয় হওয়ার কথা।

উত্তর: দ্য ফিয়ারলেস ভ্যাম্পায়ার কিলার তৈরির সময়, ছবিতে ওর একটা ভূমিকা ছিল, বলতে পারেন প্লেবয়ের জীবন কাটাচ্ছিলাম আমি, বিয়ের চিন্তা মাথায় ছিল না। আমার প্রথম বিয়ের অল্প কয়েক মাস বাদে, গোটা জীবন অনেকটা যাযাবরের মতো কাটিয়েছি আমি। যুদ্ধের ভেতর স্যুটকেসের ওপর বসে বড় হয়েছি। আমার আট বছর বয়সে মাকে নির্যাতন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এর অল্প কয়েক মাস পরে বাবাকেও। আমার মনে হতো যেকোনো ধরনের পারিবারিক বন্ধন, বাড়ির মতো যেকোনো কিছুর শেষ হয় ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে। কিন্তু শ্যারনকে বারবার দেখার পর এক ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিষয়টি টের পাই। শুরুর দিকে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ও ছিল ভীষণ বুঝদার, কৌশলী ও চালাক। আমার আশপাশে থাকার সময় আমাকে রীতিমতো সহজ, স্বাভাবিক করে তুলত ও, এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে আমাকে গ্রাস করতে যাচ্ছে না। ওর একবার বলা একটা কথা মনে আছে, ‘আমি পুরুষকে গিলে নেয়া সেই মেয়েদের কেউ নই।’ কথাটা সত্যি ছিল। শেষ পর্যন্ত, ও আমার লন্ডনের বাড়িতে এসে ওঠে এবং আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করি। শুরু হয় এক নতুন আবেগীয় অ্যাডভেঞ্চার। দুই বছর পরে বুঝতে পারি বিয়ে করতে চাইছে ও। আমাকে কখনই কথাটা বলেনি, একটা কথাও না। শেষে আমিই বললাম, ‘আমরা এবার তাহলে বিয়ে করে ফেলি,’ এবং তাই করলাম। ততদিনে এ ব্যাপারে আর মোটেই ভীত ছিলাম না।

শ্যারনই আমার জীবনের প্রথম নারী, যে আমাকে সত্যিকার অর্থে সুখী করে তুলেছিল। আমি আক্ষরিক অর্থেই সুখে থাকার সচেতনতার কথা বোঝাচ্ছি। খুবই বিরল একটা অবস্থা এটা। অদ্ভুতভাবেই ওর মৃত্যুর এক কি দুই সপ্তাহ আগে একটা মুহূর্তের কথা মনে আছে, যখন আমি ভাবছিলাম এবং সত্যি ভাবছিলাম: ‘আমি একজন সুখী পুরুষ!’ এটা এমন একটা অনুভূতি ছিল, যেমনটা এর আগে কখনই বোধ করিনি। কারণ আমার সুখ থেকে সবসময়ই একটা কিছু অনুপস্থিত ছিল, ছোটখাটো কিছু, সবসময় যার সামঞ্জস্যতা আনতে হতো। মনে আছে ভাবছিলাম—এবং এখানে সম্ভবত আমার মধ্য ইউরোপীয় পটভূমি কাজ করতে পারে—মনে আছে ভাবছিলাম: ‘এটা টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকা অসম্ভব।’ সহসা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ভাবছিলাম যে এমনই অচলাবস্থা বজায় রাখা যায় না; আমার মনে করুণ কিছু ছিল না, কিন্তু ভয় হচ্ছিল। একজন বাস্তববাদী হিসেবে, এ ধরনের অবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না।

প্রশ্ন: হত্যাকাণ্ডের খবর আপনার কাছে কীভাবে গেল?

উত্তর: আমি আমাদের লন্ডনের বাড়িতে বন্ধু অ্যান্ডি ব্রন্সবার্গ এবং মাইকেল ব্রাইনের সঙ্গে দ্য ডে অব দ্য ডলফিনের চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছিলাম। একটা দৃশ্য নিয়ে পায়চারী করতে করতে কথা বলছিলাম, হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আমার এজেন্ট ফোন করেছিল। সে বলল: ‘রোমান, একটা বাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।’ আমি বললাম, ‘কার বাড়িতে?’

‘তোমার বাড়িতে।’ এবং তারপরই হড়বড়িয়ে বলল, ‘শ্যারন মারা গেছে, ভয়টেক, জে ও অ্যাবিগিলও।’

প্রশ্ন: তারপর?

উত্তর: আমি শুধু বলছিলাম, ‘না, না, না, না।’ প্রথমেই মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড় ধসে পড়েছে বা এমন কিছু। বললাম, ‘কীভাবে?’ ও বলল, ‘জানি না, জানি না।’ লাইনের অন্য প্রান্তে ও কাঁদছিল। আমিও কাঁদছিলাম আর বলছিলাম এটা পাগলামি। শেষে ও বলল ওদের হত্যা করা হয়েছে। কিছু সময় পরে আরেক বন্ধু আমাদের বাড়িতে এলে আমরা বাইরে কিছুক্ষণ রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি। ফিরে আসার পর ওরা ডাক্তার ডাকে, ডাক্তার আমাকে ইঞ্জেকশন দেয়ার পর আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

প্রশ্ন: শ্যারনের সাড়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে না থেকে ঠিক তখনই লন্ডনে কীভাবে ছিলেন আপনি?

উত্তর: শ্যারন লন্ডনে একটা ছবিতে কাজ করার সময় বেশ কয়েক মাস ধরেই ওই চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছিলাম আমি। অন্তঃসত্ত্বা ছিল বটে ও, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। চিত্রনাট্যের কাজ শেষ করতে পারলে একসঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে  ফেরার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। কিন্তু চিত্রনাট্যের কাজটা শেষই হচ্ছিল না। ততদিনে এয়ারলাইন অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার একটা বিশেষ সময়ের পর বিমানে উঠতে না দেয়ায় শ্যারনের পক্ষে ওড়া আর সম্ভব ছিল না। তো জাহাজে করে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও। অনেক বেশি সময় লাগে বলে আমি জাহাজে যেতে পারিনি। চিত্রনাট্যের কাজ শেষ হলেই প্লেনে যাওয়ার কথা ছিল আমার। ও লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছানোর অল্প কয়েক দিন পরেই সেটা হওয়ার কথা ছিল।

ও লন্ডন ছাড়ার পর শ্যারনকে কিউইটু জাহাজে তুলে দিই। আমরা লাঞ্চ করেছি। অতিথিদের জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার ঘোষণা দিলে পরস্পরকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত এসে পড়ে—আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্ত, কারণ শেষবারের মতো আমাদের দেখা ছিল সেটা, কিন্তু আমরা জানতাম না। ওইদিন শেষ বিকালে জাহাজে ওকে ফোন করার কথা মনে আছে। প্রুডেন্স নামে আমাদের নতুন কুকুরটার কথা বলছিল ও। কুকুরটা জাহাজে ভীষণ খুশিতে আছে, বলেছিল ও, ওর রাবারের বলটা কেবিনের ভেতর একবারের জন্যও গড়ানো থামায়নি। এরপর রোজ টেলিফোনে কথা বলেছি আমরা। লাগামছাড়া বিল উঠেছিল। ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টা আগে, শেষবার ফোন করার সময়—শুক্রবার ছিল সেটা—আমাকে একটা বিড়ালছানা পাওয়ার কথা বলে ও, আইড্রপারের সাহায্যে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে ওটাকে। ওটা ভীষণ বুনো হওয়ায় লোকজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে বলে একটা বাথটাবে রেখেছে ইত্যাদি। এমনই সব তুচ্ছ  মুহূর্ত দিয়ে জীবন তৈরি হয়ে একে মূল্যবান করে তোলার ব্যাপারটা সত্যি অদ্ভুত। ওই ফোনের শেষের দিকে বলেছিলাম, ‘সোমবার আসছি আমি।’ সোমবার বলতে হওয়ায় বিরক্ত ছিলাম, কারণ আমার আসার তর সইছিল না ওর। কিন্তু হতচ্ছাড়া চিত্রনাট্যের কাজ চলছিলই। তো ওকে বলেছিলাম, ‘সোমবার আসছি আমি, কাজ শেষ হোক বা না হোক।’ ওটাই ছিল আমাদের শেষ কথা।

প্রশ্ন: ওর মৃত্যু মেনে নিতে কতদিন সময় লেগেছিল আপনার?

উত্তর: অনেক দিন। প্রথমে প্রতিক্রিয়া ছিল আতঙ্ক। একেবারে বিচ্ছিন্ন, মনোযোগ দিতে পারছেন না, আসলে কী ঘটেছে বোঝার পক্ষে সবকিছু মেলাতে পারছেন না। আপনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না। ও আর অন্যরা আর বেঁচে নেই, সেই বাস্তবতা উপলব্ধিতে আসছে না। শূন্যতা থেকে ওদের অস্তিত্বকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া ওই ক্ষীণ মুহূর্তটুকু ধরতে পারিনি। এরপর দেখা দিয়েছিল চরম শোকের একটা সময়, সেটা তদন্তের মতোই লম্বা ছিল। কোনোভাবে এ দুটি জিনিস সমান্তরালে চলেছে। কয়েক মাস কিছুই ভাবিনি এবং তারপর অপরাধের ব্যাপারটা মীমাংসা হলো যখন, হঠাৎ করেই আমার ঘোর কেটে গেল। এরপর এল অনীহা আর প্রত্যাহারের একটা সময়। আমি সুইজারল্যান্ডে চলে গেছি, একদল বন্ধুর সঙ্গে স্কি শুরু করেছি, আপনারা যাদের বলছেন প্রমোদবাদী। আমার জন্য চমৎকার ছিল ওরা। দয়ালু, কৌশলী, ভদ্র কিন্তু আমি কেবল অনীহার কারণেই কাজটা করতে পেরেছিলাম।

এবং বিপুল স্কিইং ও সামাজিক জীবনের পর কাজে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। হত্যাকাণ্ডের পর পরই সবাই আমার কাঁধে চাপড় দিয়ে কাজে ফিরে যাওয়ার কথা বলছিল। কাজ আমাকে ভুলে যেতে সাহায্য করবে। জীবন অর্থপূর্ণ করে তুলবে। কিন্তু তখন এমনকি নিজেকে সামলে উঠতে পারিনি। স্ট্যানলি কুবরিকের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টা মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিশ্চিত সবাই আপনাকে কাজ করার কথা বলছে। মনের এ অবস্থায় আপনি কাজ করতে পারবেন না। তবে একটা সময় আসবে, যখন সহসা আপনার মনে হবে, “আমাকে এটা থেকে বেরিয়ে কাজ করতেই হবে”।’ এবং সুইজারল্যান্ডের ওই সময়টার পর ঠিক তাই ঘটেছে। আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন, আমাকে প্রশ্ন করছেন এবং মনে হচ্ছে এসবই দুই সপ্তাহ আগে ঘটেছে। তো এটা আমার পক্ষে এক ধরনের পরীক্ষা।

প্রশ্ন: আপনার শোকের সময়টা জেঁকে বসার পর ওই রাতে ওখানে না থাকার ব্যাপারে কেমন মনে হয়েছিল?

উত্তর: ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগেছি, এখনো ভুগছি, ওখানে থাকলে আমাদের বন্ধুরা যেমন ভেবে থাকেন, তার বিপরীতে ঘটনাটা ঘটত না। ওদের ধারণা ওখানে থাকলে এখন আর আমি এখানে থাকতাম না।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন শ্যারন ও অন্যদের ঘাতকদের হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন?

উত্তর: আমার ধারণা ঘটনাটা ঠেকাতে পারতাম। কেউ আমাকে ভীতি প্রদর্শন করতে পারত বলে মনে হয় না। মনে হয় ঘটনাটা ঠেকাতে পারতাম।

প্রশ্ন: হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সময় পুলিশ কি আপনাকে জেরা করেছিল?

উত্তর: নিবিড়ভাবে। আমার উপস্থিতি ওদের কাজে আসবে ভেবে লস অ্যাঞ্জেলেসেই ছিলাম। সত্যি বলতে কি এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্ধুদের পাশাপাশি পুলিশই ছিল সেরা। পত্রিকার বিপরীতে পুলিশ ছিল বাস্তববাদী, তবে খাঁটি অনুভূতি নিয়ে মানুষ। নিজেদের কাজে ডুবে ছিল ওরা এবং আমি ওদের ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিগত সমস্যার সবদিকই দেখার সুযোগ পেয়েছি। দারুণ মানুষ ছিল ওরা। ওদের কথা প্রচুর আন্তরিকতার সঙ্গেই ভাবি।

প্রশ্ন: টেটরা আপনাকে কোনোভাবে দায়ী করেছেন বলে মনে হয়নি?

উত্তর: না। তারা সবসময়ই আমার পাশে ছিলেন। আমাদের বন্ধুদের তারা চিনতেন, জানতেন আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে পত্রিকা মিথ্যা কথা বলছে।

প্রশ্ন: অপরাধীর পরিচয় জানার আগ পর্যন্ত নিজের জীবন সংশয় বোধ করেননি?

উত্তর: অমন অবস্থায় নিজের জীবনের কথা ভাবতে যান না আপনি। সে বা তারা হাজির হবে বলে আশা করছিলাম। এক প্রিয় বন্ধু রোজমেরি’স বেবির শিল্প নির্দেশক ডিক সিলবার্টের সঙ্গে সৈকতে ছিলাম আমি। তিন মাস আমার মা, বাবা ও ভাই ছিলেন তিনি—স্ত্রী বলব না। আমি সারাক্ষণ ছিলাম চিন্তামগ্ন। বেচারা। আমি ওখানে থাকায় পড়শীরা সবাই প্রতিবাদ করছিলেন। পত্রিকার খবর পড়ে বিশ্বাস করেছিলেন তারা, ভেবেছিলেন হয়তো তাদের মহল্লায় কোনো ধরনের কেলেঙ্কারি বা খুনখারাবি ঘটবে। কিন্তু কিছু ঘটলেও নিজেকে রক্ষা করতে তৈরি ছিলাম।

প্রশ্ন: ঘাতকরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?

উত্তর: নীতিগতভাবে আমি মৃত্যুদণ্ডবিরোধী।

আমি মনে করি এটা রহিত হলে দুনিয়াটা আরো ভালো জায়গা হয়ে উঠবে। মৃত্যুদণ্ডকে আমি নৈতিক ভাবি না, কারণ আমাদের কারো জীবনাবসান ঘটানো উচিত না।

প্রশ্ন: এর আগে বলেছেন যে যুদ্ধের সময় আপনার অভিজ্ঞতা আপনাকে পারিবারিক বন্ধন ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে শেষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মোটামুটি দুই বছরের কিছু বেশি সময় পর সেগুলোকে কি সুখকে সবসময় ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে বলে আরেকটা শিক্ষা মনে করেন?

উত্তর: আপনি শিক্ষা কথাটা উল্লেখ করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত, এখানে শিক্ষা নেয়ার কিছু নেই। স্রেফ কিছু নেই। এটা রীতিমতো অর্থহীন, নির্বুদ্ধিতা, নিষ্ঠুরতা ও উন্মত্ততা। এটা নিয়ে কথা বলার মূল্য আছে কিনা, তাই নিশ্চিত নই। শ্যারন আর অন্যরা মারা গেছে। যা ছিল, আমি তা আর ফিরিয়ে আনতে পারব না।

প্রশ্ন: তার পরও আপনি মানিয়ে নেয়ারই আভাস দিচ্ছেন। আপনাকে যথেষ্ট সুখী পুরুষ মনে হয়।

উত্তর: আপনি কীভাবে আমাকে এমন কিছুতে সন্দেহ করতে পারলেন? আমি কীভাবে সুখী হতে পারি? আপনাকে সুখী করার জন্য একটা কিছু থাকতেই হবে।

প্রশ্ন: আপনি আপনার কাজ, বন্ধুবান্ধব আর নারীদের নিয়ে উপভোগ করছেন বলে মনে হয়।

উত্তর: কিছু কিছু জিনিস আছে আমাকে আনন্দ দেয়, এমনকি সন্তুষ্টিও। কিন্তু আমাকে সত্যিকারের সুখী করে তোলার মতো কিছুই নেই। এখন আর নয়।

প্রশ্ন: তাহলে আপনাকে সচল রাখছে কী?

উত্তর: নিজেকেই এ প্রশ্ন করছি আমি। মানুষের ভেতর কোন জিনিসটা বস্তুত তাকে সবকিছু ভুলিয়ে দিয়ে সচল রাখে? আমি জানি না। আমার চেয়েও নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডির অভিজ্ঞতা নিয়ে বহু মানুষ আছেন, তারাও জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। শোকের কিছুকাল কেটে যাওয়ার পর কোনোভাবে হয়তো তারা জীবনযাত্রার ধারা বহাল রাখেন। কিন্তু আপনাকে বলছি, নিজেকে আমি চিনি এবং একটা কিছু খোয়া গেছে বলে অনুভব করি। আমার আর আগের মতো একই আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন নেই। কেন জানি না। এ জিনিসটা বেশ কিছুদিন ধরেই আমাকে পীড়া দিচ্ছে। নিশ্চয়ই কোনোভাবে শ্যারনের মৃত্যুর সঙ্গে এটা সম্পর্কিত, কিন্তু আবার অংশত সবসময় যে স্বপ্ন দেখে এসেছি, সেটা এরই মধ্যে অর্জন করে ফেলার বাস্তবতার কারণেও।

প্রশ্ন: বলতে চাইছেন চিত্রপরিচালক হিসেবে ব্যাপক সাফল্য লাভ করার পর এখন আগের মতো তাড়িত বোধ করেন না?

উত্তর: ঠিক তাই। বছরের পর বছর ছবি তৈরিই আমার মূল তাড়না ছিল। আমি ছবি তৈরির স্বপ্ন দেখতাম এবং হঠাৎ করেই এখন আর সেই অদম্য তাগিদ বোধ করছি না। রোজমেরি’স বেবি তৈরির জন্য হলিউডে যাওয়ার পরই এই লক্ষণ টের পাই। প্রথম দিন মঞ্চে ওঠার সময় ৭০ জন লোক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল; নাইফ ইন দ্য ওয়াটারের শুটিংয়ের জন্য লোকেশনে যাওয়ার প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। তখন আমার পেটের ভেতর সেই অনুভূতি হয়েছিল, যেটা আপনাকে আগের রাতে ঘুমাতে দেয় না। এখন হলিউডেই ছিলাম আমি, আমার বাস্তবতার চেয়ে বরং স্বপ্নেই যার বেশি অস্তিত্ব, যেখানে সবকিছু আমার হাতে তুলে দেয়া হবে, তার দোরগোড়ায়, কিন্তু এতটুকু রোমাঞ্চ বোধ করিনি। স্রেফ মনে হয়েছে দিনের কাজ করতে যাচ্ছি—আমার ভালো লাগার কাজ, কিন্তু সেখানে কোনো রোমাঞ্চ নেই। বুঝতে পারছেন?

প্রশ্ন: হ্যাঁ। কিন্তু তাহলে কীভাবে আপনার সেরা কাজটা বের করে আনলেন? নাকি পারেননি?

উত্তর: কাজটা ভালো ছিল, কিন্তু আমার সেরা কাজ নয়।

প্রশ্ন: কিছু লোক আপনার ছবির চেয়ে বরং আপনার প্লেবয় ইমেজের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হওয়ার ব্যাপারটা কি আপনাকে বিরক্ত করে?

উত্তর: আমার তো মনে এটা দারুণ ব্যাপার।

প্রশ্ন: আপনি কাঙ্ক্ষিত কোনো নারীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আপনার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই মনে হলে সেটা কি আপনার পুরুষ অহমে আঘাত দেয়? আপনার বেলায় এমন হয়েছে কখনো?

উত্তর: মনে হয় একবার হয়েছিল, অনেক বছর আগে। না, এটা আমাকে আদৌ বিরক্ত করে না। যতক্ষণ না আমার সঙ্গে খেলতে চাইছে।

প্রশ্ন: কেমন করে ছবি নির্মাণে এলেন?

উত্তর: যুদ্ধের পরপর শিশুশিল্পী হিসেবে রেডিওতে সম্প্রচারের একটা কাজ পাই। সেটার সুবাদে থিয়েটারে একটা সফল নাটকে মূল চরিত্র পেয়ে যাই। একজন শিশুর পক্ষে এটা বিরাট ব্যাপার ছিল। পরে অভিনয় স্কুলে ভর্তির চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সুবিধা করতে পারিনি। প্রফেসরদের কেউ কেউ আমাকে চিনতেন, আমাকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মনে করতেন তারা। আমি এমনিতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থীর চেয়ে ভিন্ন ছিলাম। ...তাই তারা ভেবেছিলেন আমাকে ছাঁচে ফেলা কঠিন হবে। সেজন্য খোদাকে ধন্যবাদ, কারণ তাহলে পোল্যান্ডের কোনো প্রাদেশিক থিয়েটারেই থিতু হয়ে মাসে হাজার যোয়তে (ইউরোর আগে পোলিশ মুদ্রা) বেতনেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। বাবা একটা প্লাস্টিক কোম্পানির মালিক ছিলেন তখন, সরকার সেটাকে ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ মনে করত বলে ছবিতে তেমন সম্ভাবনা দেখিনি, তার মানে ছিল আমার রাজনৈতিক পটভূমি সেরা নয়, তাই লোদজের স্টেট স্কুল অব ফিল্মিংকে অসম্ভব স্বপ্নের মতো মনে হতো, কারণ বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ছিল। এবং আপনার রাজনৈতিক পটভূমি ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: লোদজের পাঠ্যক্রমে ডিপ্লোমার জন্য পাঁচ বছর সময় দরকার। প্রায়োগিক শিক্ষার বদলে পড়াশোনার পেছনে অতটা সময় খরচ করা কি পোষাত?

উত্তর: যখন খতিয়ে দেখেন, তখন সিনেমার জন্য পাঁচ বছর লেখাপড়া কতটা সুবিধাজনক বুঝতে পারেন আপনি। সম্পাদনা,  ক্যামেরা পরিচালনার মতো সব বাস্তব প্রশিক্ষণ ছাড়াও শিল্পকলার ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, সংগীত, অপটিকস, চিত্রপরিচালনার তত্ত্ব—যদি তেমন কিছুর অস্তিত্ব থাকে—বিষয়ে কোর্স আছে। ওখানে পড়াশোনার পঞ্চম বছরে আপনাকে ডিপ্লোমার ছবি তৈরি করতে হয়। ২০ মিনিট দৈর্ঘ্যের হতে পারে সেটা। আমারটার দৈর্ঘ্য ছিল ২৫ মিনিট এবং বাজেটের চেয়ে বেশি খরচের। ওরা আরো জোরে দৌড়ানোর জন্য চিৎকার করছিল। ছবির নাম ছিল হোয়েন অ্যাঞ্জেলস ফল, পাবলিক টয়লেট পরিচালক এক বয়স্ক মহিলাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি। এসব ছাড়াও নিজেদের ছবির পাশাপাশি স্কুলে অগুনতি ছবিও দেখেছি আমরা।

প্রশ্ন: পশ্চিমের ছবিসহ?

উত্তর: প্রায় সবকিছু।

প্রশ্ন: নাইফ ইন দ্য ওয়াটার  ছবিটা কবে নির্মাণ করেন?

উত্তর: ১৯৬০ সালে। তবে অনেক সময় নিয়েছে ওটা। আমরা চিত্রনাট্য লেখার পর সরকারের ফিল্ম ব্যুরো প্রত্যাখ্যান করে। তো আমি ফ্রান্সে চলে যাই, দুই বছর পরে ফিরে আসার পর রাজনৈতিকভাবে ভালো সময় ছিল সেটা, তো আবার ওটা দাখিল করি, তারা সেটা গ্রহণ করে খুবই স্বল্প অর্থ বরাদ্দ দেয়—অবশ্যই সেটা ছাড়িয়ে গেছি আমি।

প্রশ্ন: প্যারিস ছেড়ে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

উত্তর: আকস্মিকভাবেই ঘটনাপ্রবাহ ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল। ১৯৬৩ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভালে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। নাইফ ইন দ্য ওয়াটার প্রদর্শিত হচ্ছিল ওখানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে খুবই জনপ্রিয় দেশ ছিল, তো ওখানে যাওয়াটা আমার স্বপ্ন ছিল। 

 

[সংক্ষেপিত। এ সাক্ষাৎকারটি ‘দ্য প্লেবয় ইন্টারভিউ’ শিরোনামের একটি সাক্ষাৎকার গ্রন্থের অংশ।]