এই বাড়িতে একটা খুন হওয়া দরকার।

আজ ১২ জানুয়ারি। ৮ তারিখ ছিল মকর রাশির জাতিকা শিলার ১৮তম জন্মদিন। আগামীকাল থেকে সে আর কিশোরী নয়। ভোট দেয়ার অধিকার থাকবে তার।

হাতের রেখায় ভাগ্য, জন্মতারিখের হিসাব-নিকাশে নক্ষত্রের অবস্থানে তিথিলগ্নে জীবন—এসব জ্যোতিষী ঘষটানিতে শিলার কোনো আস্থা নেই। কৌতূহল আছে। যদিও শিলা জানে এবং বোঝে, কৌতূহলের মধ্যে থাকে প্রশ্ন আর প্রশ্ন এগিয়ে নিয়ে যায় লক্ষ্যের সত্যকে বুঝতে, অর্জন করতে।

বাসায় একটি বহুল প্রচারিত, সব বিক্রি হয় কিনা তার মূল হিসাব পত্রিকার সম্পাদক ও পরিচালনা পর্ষদ জানে, দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়, সেখানে প্রতিদিন ছাপা হয় রাশিফল। এ পত্রিকা থেকেই শিলা জেনেছে, সে মকর রাশির জাতিকা।

আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলো পাঠকদের প্রায় সবকিছু শেখাতে ও দেখাতে চায়। রাশিফল, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, অমর বাণী, সুডোকু, শব্দজট, অল্প কাপড় পরা নায়িকার ছবি, বিজ্ঞান, মোবাইলের বাজার, খেলাধুলা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, ধর্ষণ ইত্যাদি নিয়মিত ছাপা হয়। লক্ষ্য, কাগজের কোন বিষয়টি কোন পাঠক ‘খায়’ সে হিবাব মাথায় রেখেই কাগজ ছাপানো হয়। ব্যবসা করাই আসল, কাগজের কোনো আদর্শ নেই বললেই চলে।

জন্মদিনে বান্ধবী রিয়ার কাছ থেকে পাওয়া নতুন ডায়েরির ১ জানুয়ারির পাতায় কিছুক্ষণ আগে নিজেরই লেখা ‘এই বাড়িতে একটা খুন হওয়া দরকার’ কথাটি শিলা কয়েকবার পড়ে। বারবার যেদিক থেকেই পড়া হোক না কেন, পড়া এক বিশেষ অর্জন, যা মানুষকে পৌঁছে দেয় জ্ঞানচর্চার শেকড়ে, বুদ্ধিকে শাণিত করার পথ দেখায়, কথাটির সম্পূর্ণ চেহারা হয়ে ওঠে কখনো রক্তমাখা, কখনো মায়াপীড়িত, কখনো অপরাধ চিত্রিত। কেন ওই মায়া? শিলা সে ব্যাখ্যা জানে। মা ও বাবার করুণ মুখ, ঠাণ্ডা চোখ, যেন কিছুক্ষণ আগে খুন হয়েছে, গায়ের রক্তভেজা জামা বা শাড়ি শিলার সামনে ভেসে ওঠে। দুজনকেই পরিপ্রেক্ষিতের সামনে অসহায় মনে হয়। এই দুঃসহ, দুর্বহ প্রেক্ষাপট তৈরি করার পেছনে আসলে কে দায়ী, তার মা নাকি বাবা? মা কেন যে সুন্দর হলো? মায়ের প্রতি বাবার নিষ্ঠুরতা দিন দিন বাড়ছে। শিলার মা-বাবা তো প্রেম করেই বিয়ে করেছিল। সেদিনও, শিলা স্পষ্ট মনে করতে পারে, মা আফসানা আলী হাসতে হাসতে, মুখে তখন সুখস্মৃতির ছায়া পড়েছিল, বলেছিল: ‘তোর বাবা খুব রোমান্টিক, রুচিশীল মানুষ ছিল। যখনই বিয়ের আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত, কোনো না কোনো ফুল আনত, বেশি আনত, যদি পাওয়া যেত রজনীগন্ধা। আমার প্রিয় ফুল।’ বলার পর মা একট কষ্টকর দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং ফিসফিস কণ্ঠে বলে: ‘কবে যে তোর বাপকে রাতে নাকের ওপর বালিশ চেপে মেরে ফেলি।’

মা বাবাকে কিংবা বাবা মাকে খুন করতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, আমিই বাবাকে খুন করলাম অথবা মাকে। আমার বুদ্ধিটা কিছুটা সচেতন হওয়ার পর থেকে দেখছি, তখন আমার বয়স হবে চার কি সাড়ে চার, মাকে যে কথাটি গালিগালাজের সঙ্গে বাবা বেশি বলে, তা হলো: ‘সুন্দর মুখ, বুক, ফিগার আর পাছা দেখাইয়া হারামজাদি আর কয়দিন? যখন সব চুপশাইন্না বেলুন হইব, তখন তোরে কুত্তাও চাটব না।’ আমি বাবার ওইসব কথার মধ্যে ‘ফিগার’ এবং ‘কুত্তাও চাটব না’ বলতে বাবা কী বোঝাত, বুঝতাম না। আরো একটু, মানে আট-দশ বছর বয়স হওয়ার পর মনে প্রশ্ন আসত: ‘মায়ের সুন্দর হওয়াটা কি তার অপরাধ?’ আমার বয়স যত বেড়েছে এবং যতবার মাকে অকথ্য গালিগালাজ বাবা করেছে এবং করে যাচ্ছে, ততবার আমার মনে হয়েছে, বাবা হেরে যাওয়া একজন মানুষ। ইদানীং গালিগালাজের সাথে একটা কথা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বাবা বলে: ‘তোরে খুন না কইরা আমার শান্তি নাই। ছুরি কিনছি, বিষ কিনব।’ আমি ক’দিন আগে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, ‘মানুষ কি সুন্দরকে ভালোবাসে নাকি তাকে ক্রমাগত নষ্ট করে?’ নিজের প্রশ্নের উত্তর এই কম বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকেই দিয়েছি: মানুষ সুন্দরকে নষ্ট আর নোংরা করে, সৌন্দর্যের বিপুল ভার মানুষ নিজেই বেশিক্ষণ বহন করতে পারে না।’

আর্ট কলেজের ছাত্রী শিলা দেখেছে, সাদা ক্যানভাসের ওপর নীল কালির দু-তিনটি ফোঁটা দেয়ার পর সাদা ক্যানভাস যত কথা বলতে থাকে, যত শিল্পসৌন্দর্য তৈরি হয়, তাতে তার সহপাঠী রেহানা তৃপ্ত নয়, আনন্দিত নয়, ওই নীলের পাশে অথবা নীলের মধ্যে লাল রঙ মেশায়। মনে হয়, মানুষ লাল রঙ বেশি পছন্দ করে। লালে বিপ্লব ও খুনের প্রতীক বেশি।

২.

একটি লিখিত কথা বারবার পড়লে, পড়াটা অধ্যয়নের মাত্রা পায়। আমরা জানি, ‘অধ্যয়ন’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই আমাদের চিন্তা ও চেতনায় ‘ ধ্যান’-এর চিত্র দেখা দেয়। আমরা এখনো জানি না, শিলার মনে তার লেখা ও পড়া কথাটি কখন ধ্যানের স্তরে পৌঁছবে। আর ধ্যানগ্রস্ত মানুষ কখন কী করে তা অন্যরা জানে না। অন্যরা ওই ধ্যানস্থ মানুষের হঠাৎ খোলা এবং হঠাৎ বন্ধ করা চোখের মধ্যে শুধু ব্যাখ্যা করে যাওয়া এক রহস্যের বয়ান নিজেদের কথায় বলে যায়, শুনে যায় এবং মুগ্ধতার আবেশ শেষ হলে কখনো যুক্তি দিয়ে বিচার করে, কখনো করে না।

৩.

মধ্যরাত।

পহেলা জানুয়ারির পাতায় এক আশ্চর্য জলছাপ। হালকা নীল ঢেউ, সমুদ্রের দিগন্তরেখা থেকে সূর্য উঠছে। একটি উড়ন্ত শঙ্খচিল সূর্যের মাঝখানে। দুটোই প্রাণবন। উদয় আর উড়ে যাওয়া জীবনকে নতুনের দিকে যেতে বলে। চিলটা কি একটি মাছকে শিকার করতে সকালবেলা ঢেউয়ের উপরে উড়ছে?

‘খুন আর শিকারের মধ্যে পার্থক্য কী? খুব একটা পার্থক্য নেই। প্রতিজ্ঞা আর দৃঢ়তা একসঙ্গে না হলে খুন বা শিকার করা যায় না।’ শিলা নিজেকে কথাটা বলে ভাবতে থাকে: ‘যদি আমি খুন করি আমাকে ‘‘প্রতিজ্ঞা ও দৃঢ়তা’’ আমার ব্যক্তিত্বে অর্জন করতে হবে।’

পাতাটির মাঝখানে শঙ্খর ঈষৎ বাঁকানো ঠোঁটের নিচে লাল কালিতে লেখা কথাটির ‘দরকার’ কেটে শিলা লিখল ‘উচিত’। যদি সত্যি খুনটা হয়, আমরা যারা দিন আনি দিন খাই অবস্থার মানুষ, খবরের কাগজে ছাপা লেখা দেখে এখনো মনে করি, সব কথা সত্য, ‘এই বাড়িতে একটি খুন হওয়া উচিত’ পড়ে কথা বলার একটি বিষয় পাওয়া গেল বলে, কথার পর কথা বলে যেতে যেতে একসময় হয়তো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারি: ‘খুন করার মধ্যে একটি হিংসা আছে, বিজয়ী মনোভাব আছে, বিশেষ রাজনীতি আছে, টাকার ভাগ আছে, রিপুকে শান্ত করার এক রকমের চিকিৎসা আছে, প্রতিশোধের আপাত জয় আছে। আরো অনেক কিছু আছে, থাকুক। মনস্তত্ত্ববিদরা, গোয়েন্দারা অনেক মোটিফের মেটাফর জানে।’

শিলা জানে, যদি হত্যাটা হয়, তদন্ত করার সময় ডায়েরিটা পুলিশের হাতে পড়লে প্রধান আসামি হবে শিলা।

কথা পুরনো: খুন বোধ সব প্রাণীর মধ্যেই কমবেশি আছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই একজন খুনি বাস করে। তবে মানুষের মধ্যে এই বোধ যত আছে, অন্য প্রাণীর মধ্যে ততটা নেই। মানুষ অনেক পরিকল্পনা করে, ছক এঁটে, যেকোনো বস্তুকে অস্ত্র বানিয়ে তা দিয়ে খুন করতে পারে। খুন করার ব্যাপারে মানুষের প্রতিভা ঈশ্বরতুল্য।

কত অবলীলায় একটি পিঁপড়েকে, যে পিঁপড়ে তথাকথিত ভালো মানুষটির পায়ের বা হাতের পাশ দিয়ে মুখে খাবার নিয়ে হয়তো যাচ্ছিল, মানুষটি তাকে ডলে পিষে মেরে ফেলে। একটা পাখি নারকেল গাছের বাঁকানো পাতার ওপর বসে আছে নিশ্চিন্তে, হয়তো অপেক্ষা করছে সঙ্গী পাখিটির জন্য, শিকারি তাকে গুলি করল এবং রক্তাক্ত পাখিটাকে দেখে বিজয়ীর হাসি হাসল। আবার শিকারে ব্যর্থ হলে পাখিটাকে গাল দেয়, ‘শালা উড়ে গেল।’ নিজেকেও গাল দেয়, যেন শিকারি হতে না পেরে যতপরনাস্তি দুঃখিত।

 খুনির চেহারা অনেক রকম হতে পারে। খবরের কাগজে অথবা সিনেমায় শিলা দেখেছে অনেক খুনির চোখ, মুখ ও তাদের আচরণ, চলাফেরা, কথাবার্তা সুন্দর, কুিসত ও মায়াপূর্ণ। ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনি’ খবরের কাগজে এ রকম শিরোনাম যতবার শিলা পেয়েছে, খবরগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছে। কেন ওই খুনি ঠাণ্ডা মাথার? কী কী কাজ বা কী কী পদক্ষেপ খুন করার আগে খুনি নিয়েছিল, যার জন্য তাকে বলা হলো, ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনি।’ অনেক চিন্তা করে শিলা একটি কনক্লুশনে পৌঁছেছে: ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনিরা খুব মেধাবী হয়। তাদের কাজের নিপুণতা প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। যারা খুন করে ধরা পড়ে না, তারা বেশি মেধাবী। যারা অনেকদিন পর ধরা পড়ে, তাদের মেধা একটু কম।’ আমরা জানি না, শিলা ঠাণ্ডা মাথার খুনি হবে কিনা।

৪.

এই বাড়িতে কে খুনি হতে পারে? বাড়ির বাসিন্দা তিনজন ছাড়া কাজের বুয়া আছে একজন। শিলা সম্ভাব্য খুনির চেহারা মনে করে, প্রথমে লিখল মা। কিছুক্ষণ পর মা কেটে লিখল বাবা। বাবার নিরীহ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। কেটে দিল বাবা শব্দটি। কিছুক্ষণ পর লিখল নিজের নাম। ঘণ্টাখানেক পর নিজের নামও কেটে দিল। সবগুলো নাম এমনভাবে কাটল, ওই কাটাকাটি দেখে কিছুতেই কেউ বুঝতে পারবে না, কী লেখা হয়েছিল। লেখাগুলোকে কালি দিয়ে যেভাবে খুন করা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ধরনে কাটাকাটিগুলোকে মিলিয়ে একটি ছবিও এঁকে ফেলেছে আর্ট কলেজে পড়া শিলা; তাতে বলা যায়, শিলা ঠাণ্ডা মাথার একজন খুনি হতে পারে।&dquote;&dquote;

সব শিল্পীই এক রকম সুন্দর খুনি, এই খুনিদের মানুষ ভালোবাসে। আমরা জানি না, আর্ট কলেজে পড়া শিলা ক্লাসে ও বাসায় যেসব ছবি আঁকে, সেগুলোর মধ্যে কোন খুনির মুখ সে দেখে।

লাল কালির বলপয়েন্ট হাতের কাছে ছিল, কালো বা নীল কালির কলম থাকলে তাতেই কথাটি ‘এই বাড়িতে একটা খুন হওয়া উচিত’ লেখা হতো। তবে লাল ওই বাক্য যত বাগিবতণ্ডা ধারণ করে আছে, অন্য কালি ততটা ধারণ করতে পারত না। লাল = রক্ত, রক্ত = লাল, লাল = বিপ্লব। বিপ্লবে জন্ম হয় নতুনের এবং মৃত্যু হয় অনেকের।

‘রঙ এক আশ্চর্য বিস্ময়। মানুষের মনকে রঙ বিবিধ পর্বে বিভাজিত করে। রঙের প্রভাবে মানুষ আনন্দিত হয়, উত্তেজিত হয়, বিষণ্ন হয়।’ ক্লাসে আর্ট কলেজের একজন শিক্ষক কথাটি বলেছিলেন। শিলা খাতায় লিখে রেখেছিল। মনে পড়ল।

৫.

পাশের ঘরে বাবা কাশেম আলীর ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর শিলার বন্ধ দরজার বাধা মানছে না। ‘হারামজাদি, এখন রাত ১২টা বাজে, কার সাথে ছিলি, নাঙের সাথে?’ শিলা নাঙ শব্দটির অর্থ জানে না। তবে অনুমান করে, অর্থ হতে পারে খারাপ প্রেমিক। হতে পারে, নারীর গোপন পুরুষ।

থাপ্পড়ের শব্দ এল। ‘কুত্তি।’ মা আফসানা আলী কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতে মা বলল, ‘শো শেষ করে আমরা চাইনিজে গেছি, তাই দেরি।’

মায়ের কান্নার শব্দ আসছে না। আসছে ফোঁপানির শব্দ। আবার ‘মাগি’, ‘বেশ্যা’, ‘হারামজাদি’ শোনা গেল। সঙ্গে বাবার চিৎকার।

শিলা অনেকদিন মাকে অভিনয় করা ছেড়ে দিতে বলেছে। মা মেয়ের কথা শুনে বলেছে, ‘সবকিছু ছাড়তে পারি, কিন্তু অভিনয় ছাড়তে পারব না। তোর বাবাও তো অন্য দলের অভিনেতা ছিল। একদিন টিভিতে দুজন অভিনয় করতে গিয়ে পরিচয় হলো, ধীরে ধীরে আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করলাম।’ কথাগুলো মেয়েকে বলে আফসানা তাকায় অন্যদিকে, মুখে কষ্টের বলীরেখা দেখা যায়। শিলা বলেছে, ‘আমার ভয় হয় কবে বাবা তোমার মুখের ওপর অ্যাসিড মারে। মা তুমি এত সুন্দর কেন।’ ‘আমি তো আমাকে গড়িনি’—ম্লান হেসে বলে মা।

হালকা হলুদ পাপড়ির ওপর সকালের প্রথম রোদ পড়লে পাপড়ি থেকে এক লাবণ্য ঝলকায়, আফসানার চামড়ার রঙ ওইমতো। মুখের আকার কিছুটা ওভাল। বেশ বড় চোখ খাড়া নাকের ওপর পরিমিত। ঠোঁট পুরুষকে ডাকে। উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। যেকোনো শিক্ষিত মানুষ, নারী হোক, পুরুষ হোক, আফসানাকে দেখলে মনে মনে বলতে পারে: ‘ঈশ্বর তাকে তৈরি করেই বিশ্রামে গেছেন।’ আর প্রতিদিন খেটে খাওয়া গরিব মানুষ, লেখাপড়া করার সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া মানুষ তাকে দেখলে বলতে পারে, ‘মিয়েলোকটা পরীর মতো।’

৬.

অভিনেতা আর অভিনেত্রীর বাস্তব জীবন কত প্রকার রঙ-বেরঙে চিত্রিত, তার কিছু হিসাব মেকআপ পারসন জানে। তাদের লাবণ্য আর সৌন্দর্যেরও মেকআপ দরকার হয়। আফসানার কাছে খুব পরিচিত, ভদ্র একজন মেকআপ পারসন সহজভাবে, সহজ কৌতূহলে জানতে চেয়েছিল: ‘যারা সুন্দর তারা বেশি সাজে কেন?’ তার জিজ্ঞাসার উত্তর ছিল: ‘মানুষ প্রায় সবকিছুতে সবসময় অতৃপ্ত। সুন্দরের কি শেষ আছে? মানুষ সবসময় তুলনার মধ্যে থাকে বলে সাজে, আয়নায় দাঁড়ায়, নিজেকে দেখে, মুখে রঙ মাখে।’ মেকআপ পারসনের হাতের ব্রাশ আফসানার ডান দিকের গ্রীবায় তখন। আফসানার চোখ ছিল আয়নায়। চোখে অতৃপ্তি। ক্লান্ত। প্রতি রাতে প্রয়োজনমতো ঘুম হয় না।

হবে কীভাবে? কাশেম আলী মানুষটা কামুক। আফসানার মিনস্ট্রেশনের সময়ও তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করেছে। আফসানা দেখেছে, তার স্বামী তার গভীরে মিলিত হওয়ার আগে কামসূত্রের কলাগুলো শিল্পীতভাবে তার ওপর চর্চা করে, কখনো পশুর মতো হনন করে না। কানো কোনো রাতে কাশেম আলী, ঘরের দুটো বাতি জ্বেলে আফসানাকে বিভিন্ন পজিশনে বসিয়ে, দাঁড় করিয়ে, হাঁটিয়ে, শুইয়ে, নিজে নগ্ন না হয়ে বৌয়ের সৌন্দর্য দেখেছে এবং কখনো কখনো চুমু দিয়েছে, উরুতে, গ্রীবায় এবং কখনো কখনো। আফসানা জানতে চেয়েছিল, ‘এ রকম করার কারণ কী?’ এমন উত্তর দিয়েছিল কাশেম আলী, শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসহ মনোবিজ্ঞান পড়া আফসানা অবাক হয়ে তার স্বামীর চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল: ‘তোমার সৌন্দর্যকে আমি ভালোবাসি, বোকা হই, শিশুর মতো করি।’

৭.

আফসানা আলী সুখী প্রেমিকার অভিনয় করছে। নাটকটি প্রতি সপ্তাহে দুদিন মঞ্চস্থ হচ্ছে।

‘রঙ এমনভাবে দাও, আয়না যেন বলে, আফসানা আলী জীবনের আনন্দ কাকে বলে, সুখ কাকে বলে কখনো জানেনি, চোখ এমন রঙে রঞ্জিত করো, দেখে যেন সব দর্শক বোঝে, ওই বড় বড় চোখ দুটি কখনো, কোনোদিন স্বপ্ন দেখেনি। মঞ্চে মিসেস আলী কষ্টপীড়িত প্রেমিকা, বোন বা বান্ধবী কিংবা রাস্তায় ঘোরা নারী, ঘর নেই তার, ওই রকম করে তাকে আঁকো। এক বোকারাই রঙের বহুবিধ বিন্যাসে বিশ্বাস করে।’

আফসানা মেকআপ পারসনকে তার কথাগুলো বলেনি।

৮.

ভোর হয়ে আসছে। পাড়ার তিনটা মসজিদ থেকে আজান হলো। মাইক থেকে আসা আজানের পবিত্র তীব্র শব্দে কয়েকটি কাক পাখা ঝাপটায়, ওড়ে না।

শিলা ঘর থেকে বের হয়ে রান্নাঘরে যায়। ফল কাটার ধারালো ছুরিটা নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজের প্রতিবিম্বকে স্থির চোখে দেখে। নিরীক্ষণ করে। একবার প্রতিবিম্বের চোখের ওপর, একবার বুকের ওপর, একবার মাথার ওপর ধারালো ছুরিটা চেপে ধরে। কাচ শক্ত। ছুরি কাচের পুরুত্ব ভেদ করতে পারে না। আয়নায় দেখা নিজের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছুরিটা বারবার চালিয়ে অনুশীলন করতে থাকে। ক্রিকেটারদের মতো শ্যাডো প্র্যাকটিস আর কি। প্রস্তুতির পর হত্যার মাঠে কী করবে সেটা আমরা জানি না।

শিলা যখন আয়নার ওপর থেকে ছুরিটা তোলে, দেখা যায়, আয়নার যেখানে চোখ, বুক আর মাথা ছিল, সেসব জায়গায় ছোট ছোট দাগ, সামান্য ক্ষত। খুন করার সময় মা অথবা বাবার কোন জায়গায় একবার ছুরিটা মারলে দ্বিতীয়বার আর মারতে হবে না। শিলার মনে হয়, ‘গুগলে সার্চ দিলে কি খুন করার বিশেষ কৌশল অর্জন করার প্রশিক্ষণ নেয়া যাবে, দীক্ষা নেয়া যাবে?’

ক’দিন আগে ছুরিটা নিয়ে, তখনো ডায়েরির পাতায় খুন করার কথাটা লেখেনি, খুন করার কথা অনেকবার মনে হয়েছে, বাবার পেছনে পেছনে শিলা গিয়েছিল, নিজের মধ্যে একটা ভয় কাজ করার কারণে বাবাকে ছুরিটা মারতে পারেনি। বাবা ঘুরে যখন মেয়ের হাতে ছুরি দেখেছে, ‘মামণি ছুরিটা ধুয়ে ফল কাটিস’ স্বর স্নেহের, বলেছিল।

শিলার ঘুম পাচ্ছে। ছুরিটা হাতে নিয়ে মা-বাবার ঘরের দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। যে ঘর থেকে আগে বের হবে, তাকেই খুন করবে শিলা। নিজের চিন্তাকে সাহসী করে তুলতে পারছে না। খুব ঘুম পাচ্ছে। নিজের ঘরের বাথরুমে গেল। প্রস্রাব করল। মুখে পানি দিয়ে ফিরে এল ম-বাবার ঘরের দরজার সামনে।

মা-বাবার ঘর থেকে দুজনের হাসির শব্দ আসছে। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলছে বাবা। চুমুর শব্দ এল। ‘বাবা কি মায়ের সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে দেখছে, কামড়াচ্ছে, মা হাসছে কেন, লোকটাকে ঘৃণা করছে না কেন, নাকি মায়ের সৌন্দর্য দিয়ে বাবা নিজেকে খুন করছে?’ শিলার প্রশ্নের উত্তর হাতের ছুরিটা জানে না।