গিলার্মো পাররা। অনুবাদ: শওকত হোসেন

দি অরিজিন্স অব পোস্টমর্ডানিটিতে পেরি অ্যান্ডারসন বলতে চেয়েছেন, আধুনিকতা ও উত্তর আধুনিকতা...‘দুটোই কালের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রের চেয়ে বরং দূরপ্রান্তে জন্ম নিয়েছে: ইউরোপ কিংবা আমেরিকা নয়, বরং হিস্পানিক আমেরিকা থেকেই এগুলোর আবির্ভাব...’ প্রাথমিক এ বক্তব্যের পর অ্যান্ডারসন বিশ শতকের দ্বিতীয় অংশে ফ্রেডেরিক জেমসনের শিল্প-সংস্কৃতির তালাশ সম্পর্কিত আলোচনায় অগ্রসর হয়েছেন। একটি প্রসঙ্গ জেমসনের হাতে তাত্ত্বিক রূপ পায়নি বলে অ্যান্ডারসন উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় প্রভাব বলয়ের প্রান্তে সাংস্কৃতিক বিকাশ: ‘জেমসনের কাজের আওতা এ অক্সিডেন্টাল সীমা অতিক্রম করে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, সেটা করতে গিয়ে মূলে উত্তর আমেরিকার ব্যবস্থাকে আদর্শ করে অযথাযথভাবে একটি সমরূপ সাংস্কৃতিক বিশ্বকে তুলে ধরে মোটামুটি রূপ দেয়া হয়েছে কিনা।’ আজিজ আহমেদ তার ইন থিয়োরি; ক্লাসেস, নেশন্স, লিটারেচার (ভার্সো, ১৯৯৪) গ্রন্থে জেমসনের এ সমালোচনা চমত্কারভাবে তুলে ধরেছেন। এ ‘উত্তর আমেরিকার ব্যবস্থা’র সীমা পেরোনোর প্রয়াসে উত্তর আধুনিকতাসংক্রান্ত সাহিত্যিক ডিসকোর্স কবি রোকে ডাল্টন (এল সালভাদর, ১৯৩৫-১৯৭৫) এবং রোবার্তো বোলানিওর (চিলি, ১৯৫৩-২০০৩) মরণোত্তর প্রকাশিত উপন্যাসকে বিবেচনায় নিতে পারে।

১৯৭৬ সালে কোস্টারিকায় প্রথম প্রকাশিত ডাল্টনের একমাত্র সমাপ্ত উপন্যাস প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...[পুওর লিটল পোয়েট দ্যাট আই ওয়াজ] এখনো অগোচরেই রয়ে গেছে। স্বয়ং ডাল্টন বিপ্লবী তত্পরতায় নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট থাকা সত্ত্বেও বিগত ‘বুম’ যুগের অন্যতম প্রধান টেক্সট এ উপন্যাসটি ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে একটি পথ নির্মাণের চেষ্টা করেছে। ২০০৪ সালে স্পেনে বেরোনো বোলানিওর বিশাল এবং অসমাপ্ত উপন্যাস ২৬৬৬ বহু পাঠক ও কলম্বিয়ার ঔপন্যাসিক সান্তিয়াগো গাম্বোয়ার মতো সতীর্থ লেখকের প্রশংসা পেয়ে আসছে। সান্তিয়াগো গাম্বোয়া ক্যাম্বিও সাময়িকীতে উপন্যাসটিকে ‘...আমরা যারা একথা বিশ্বাস করি, তাদের প্রত্যেকের লড়াই করার মতো (করা উচিত) একটি পরিখা’ বলে উল্লেখ করেন। তার আরেক দীর্ঘ উপন্যাস লোস ডিটেক্টিভস সালভায়েস (স্ট্রাউস অ্যান্ড গিরো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্য সেভেজ ডিটেক্টিভস নামে প্রকাশিত) থেকে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে বোলানিওর ২৬৬৬ টেক্সটের পক্ষে কবিতাকে মূল চিন্তা হিসেবে ব্যবহার করে ডাল্টনের বোহেমিয়ান মহাকাব্য প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...’র কাঠামো এবং অন্য কিছু বিষয়ের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। উপন্যাসে বোলানিওর আত্মজৈবনিক বিভিন্ন মোটিফ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করলে দুটি উপন্যাসের সম্পর্ক সম্ভবত অংশত ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে (কিংবা ১৯৭৪-এর গোড়ার দিকে) স্যান সালভাদরে এ দুজনের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের ফলে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এ সময় ডাল্টন বিভিন্ন গোপন সেফ হাউজে থাকতেন এবং বোলানিও সালভাদর আয়েন্দের বিরুদ্ধে কুখ্যাত অভ্যুত্থানের সময় প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে জেল পালিয়ে মেক্সিকোয় ফিরছিলেন।

ডাল্টন আজ একজন বিতর্কিত চরিত্র হয়ে আছেন। রাজনৈতিক ফেরারি এবং সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালে নিজ দেশে যুগান্তকারী এ বুদ্ধিজীবী এখন এল সালভাদরের তর্কসাপেক্ষে বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক। তার রাজনৈতিক উগ্রতা এবং কবিতা সাধারণত যুগপৎ পাঠ করা হলেও তার শেষ ও সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বই—পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন খণ্ডে বিন্যস্ত (পত্রিকার খবরের বিভিন্ন অংশের সংযুক্তিসহ)—বিশাল আধা আত্মজৈবনিক উপন্যাসের সব খণ্ডই রাজনৈতিক স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।

ডাল্টন এল সালভাদরে সতীর্থ গেরিলাদের হাতে নিহত হন। তাকে সিআইএর চরের পাশাপাশি বিপ্লব বাস্তবায়ন করার চেয়ে বরং তাত্ত্বিক রূপদানে অতি আগ্রহী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী বলে অভিযুক্ত করেছিল তারা। প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...’র  শেষ খণ্ড ১৯৬৪ সালে এল সালভাদরের কারাগার থেকে তার পলায়নের ওপর ভিত্তি করে রচিত। জনৈক বিখ্যাত তরুণ কবি স্যান সালভাদরে গ্রেফতার হওয়ার পর জনৈক সিআইএ এজেন্ট তাকে জেরার সময় উগ্রবাদ বর্জন করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতামুক্ত সাহিত্যে মনোযোগ দিলে নানান সুযোগ ও আরাম-আয়েশের প্রতিশ্রুতি দেয়ার মুহূর্তে উপন্যাসের অপার্থিব এবং জবানবন্দির মতো পৃষ্ঠাগুলো তৈরি হয়। কবি এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এবং অংশত ভূমিকম্পের কল্যাণে কারাগারের বাইরে এক পাহাড়ে অলৌকিকভাবে পালিয়ে মৃত্যুকে ফাঁকি দেন। উপন্যাসের শেষ খণ্ডে উল্লেখ করা এসব ঘটনা ডাল্টনের নিজের উত্তাল জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত, যেসব ঘটনা তার অসাধারণ কবিতার সঙ্গে মিলে তাকে তার প্রজন্মের লাতিন আমেরিকান ও ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের ভেতর কিংবদন্তিসম ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। এ বইয়ের নায়ক শেষ পর্যন্ত ডাল্টনের মতো হাভানার উদ্দেশে স্যান সালভাদর থেকে পালিয়ে যান। কাহিনী বয়ান করেন সেখান থেকেই।

এটিকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম পরিচিত কবির একটি উপন্যাস বিবেচনা করলে বইটিকে এক ধরনের অস্বস্তিকর (নাকি এটা স্রেফ অজ্ঞতার কারণে?) নীরবতা ঘিরে রেখেছে বলেই মনে হয়। প্রায় যেন কিছু পাঠক কিংবা সম্পাদক মধ্যদুপুরে শোরগোলময় বারে শুরু হওয়া ডাল্টনের বিশাল বোহেমিয়ান মহাকাব্যটিকে তার আগের রচনা থেকে এক ধরনের অবোধ্য বিচ্যুতি বলেই মনে করেছেন হয়তো। স্যান সালভাদরের ইউসিএ এদিতোরেস বইটির মুদ্রণ চালিয়ে গেলেও এল সালভাদরের বাইরে এটির নাগাল পাওয়া দুষ্কর। এটাও বইটির অস্পষ্টতায় থাকার আরেকটি কারণ হতে পারে। গিলার্মো ক্যাব্রেরা ইনফান্তের ত্রেস ত্রিস্তেস টাইগ্রেস (১৯৬৮) যেমন ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে হাভানার সাহিত্যিক ও সংগীতের গোপন জগৎ তুলে ধরেছিল, তেমনি ডাল্টনের বইটি আমাদের ওই একই দশকের স্যান সালাভাদরের উজ্জ্বল ছবি জোগায়। তরুণ লেখকদের একটি বিপ্লবী প্রজন্মের নান্দনিক, রাজনৈতিক ও যৌন তাড়নার উদ্বেগ প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা সালভাদরীয় স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহার করেছেন ডাল্টন।

স্যান সালভাদরে ১৯৬০-এর দশকে এবং হাভানায় ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে, এই মোট দুই দফায় প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...সাকল্যে এক দশক ধরে রচিত হয়েছে। ১৯৬৪ সালে ডাল্টন তার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বন্দি হওয়ায় রচনায় ব্যাঘাত ঘটে। ১৯৭৩ সালে কিউবা থেকে শেষবারের মতো এল সালভাদরে ফেরার সময় উপন্যাসকে দুই দশকে বিস্তৃত কণ্ঠস্বর, বয়ান এবং নান্দনিকতার সম্মিলনে বিস্তৃত করে যবনিকা টানেন তিনি। উপন্যাসটিক ক্যাব্রেরা ইনফ্রান্তে, কোর্তাসার ও লিসামা লিমার মতো ব্যক্তিদের রচনার মতো একই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রেক্ষাপটে পাঠ করা যেতে পারে। স্যান সালভাদরে শেষ এ বিরতির সময়ই মোটামুটি রাজনৈতিক নিরিখে নান্দনিকতার উদ্বেগ বিসর্জন দেয়ার মুহূর্তে তরুণ বোলানিওর সঙ্গে ডাল্টনের পরিচয় হয়। বয়সের ফারাকের কারণে দুজন কবির এ সাক্ষাৎকে এক ধরনের গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে ডাল্টনের সঙ্গে পরিচয় বোলানিওর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ১৯৯৮ সালে স্পেনের সাময়িকী ল্যাটারালের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে এ কথা প্রকাশ করেন তিনি:‘[...] এখানে সতীর্থদের হাতে নিহত সালভাদরীয় কবির ব্যাপারটা রয়ে গেছে। রোকে ডাল্টনের ঘাতকদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে আমি এল সালভাদরে ছিলাম। ১০ জন কমান্ড্যান্টের ভেতর চারজনই ছিল লেখক। ওদের দুজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। একজনের নাম সিয়েনফিউগো এবং আরেকজনের নাম আমার মনে নেই। বহু লেখকের সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছিল...

‘১৯৭৩ সালে চিলি যাওয়ার পথে আমি লাতিন আমেরিকার গোটা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল সফর করি। এরা আমারই সমবয়সী ছিল: বিশ, বাইশ, তেইশ কিংবা কিঞ্চিৎ বড়। ম্যানুয়েল সোর্তো ওদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। গেরিলাদের নিয়োজিত সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। নিজের জীবন বিপন্ন করে ছবি বানাতেন, দুনিয়াজুড়ে সেসব দেখানো হয়েছে। ভীষণ নীতিবান মানুষ ছিলেন। তবে এমনকি নিজেকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, রোকে ডাল্টনকে হত্যার নির্দেশদাতাদের অন্যতম সিয়েনফিউগোর ভেতর কিছুটা সাহিত্যিক বৈরিতা কি ছিল না?

কেন? তিনি কি বাজে কবি ছিলেন?&dquote;&dquote;

না, সিয়েনফিউগো বাজে কবি ছিলেন না, তবে রোকে ডাল্টনের তুলনায় তার কিছুই ছিল না। আমার মনে হয়, ডাল্টনকে ওরা মূলত পিতৃহত্যার ভান করা শিশুদের ঢঙেই হত্যা করেছিল। কিন্তু সাহিত্যিক না হয়ে ওই সময় হত্যাটা ছিল আক্ষরিক। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আক্ষরিক। তাছাড়া তাকে ওরা ঘুমের ভেতর হত্যা করে। ঘুম থেকে জাগায়নি। ওরা তাকে হত্যা করতে যাচ্ছে, তিনি জানতেনই না। রোকে ডাল্টন সশস্ত্র বিপ্লবের বিরুদ্ধে ছিলেন বলে দিনভর বিতর্ক করেছে ওরা। কমান্ড্যান্টরা বলছিল যে বিপ্লব শুরুর এটাই উপযুক্ত সময়। একমত হতে পারেনি ওরা। রোকে ডাল্টন ঘুমাতে চলে গেছেন। কমান্ড্যান্টরা বিতর্ক চালিয়ে গেছে। বলেছে, ‘ওকে হত্যা করতেই হবে।’ যেন ডাকাতদের কোনো দল। ওরা বলেছে, ‘চলো ঘুমন্ত অবস্থাতেই ওকে মেরে ফেলি, ও একজন কবি তো, কষ্ট পাবে না। ওরা আক্ষরিকভাবে এ কথাই বলেছিল। [...]’

 ডাল্টন এবং বোলানিও, এরা দুজনই অনেকটা জয়েসের মতোই নিজেকে লেখালেখিতে নিবেদনের জন্য মানসিক ও বস্তুগতভাবে একজন মানুষকে কিসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তার বর্ণনা দিয়ে শিল্পী হওয়ার সংগ্রামের কথা লিখেছেন। প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...র চতুর্থ খণ্ডের এক পর্যায়ে আমরা জনৈক তরুণ লেখকের দিনলিপিতে শামানের কাব্যিক কৌশল জাগিয়ে তোলার মতো একটা উপন্যাসের আশা তুলে ধরা এ ভুক্তির দেখা পাই:

‘আমার উপন্যাসকে হতে হবে অস্বস্তিকর এবং শুদ্ধকারী। শামানের চিত্কারে চাগিয়ে ওঠা তীব্র জ্বরের অনুসন্ধানী, যে শরীর থেকে ঘাম ও মূত্রের মাধ্যমে রোগ শুষে আনবে এবং হতাশার ভেতর দিয়ে বের করবে আত্মার অসুখ।’

বোলানিওর মাস্টারপিস ২৬৬৬-এ একটি শুদ্ধকারী বয়ান সৃষ্টির প্রয়াস সুস্পষ্ট। এর চতুর্থ পর্ব লা পার্তে দে লোস ক্রিমেনেস এক দশকেরও আগে উত্তর আধুনিক মেক্সিকোর শহর সিউদাদ হুয়ারেসকে আক্রান্তকারী নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দিকে নজর ফিরিয়ে বোনো ফন আর্চিমবোল্ডি নামের নিভৃতচারী জার্মান লেখকের কাল্পনিক বিশ্বকে অতিক্রম করে যায়। উপন্যাসের এ অংশের অবিচল, পত্রিকাসুলভ বয়ান আমাদের বিকৃত নারী শিকারের অন্তহীন তালিকার সঙ্গে পরিত্যক্ত মরুভূমির গভীর খাদ এবং শহরের আবর্জনার ভাগাড়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করে। ২৬৬৬-এর সান্তা তেরেসা শহরটি (সিউদাদ হুয়ারেসের কাল্পনিক ভাষ্য) অজানা উৎস এবং বৈশ্বিক ব্যাপ্তির অশুভের ভয়ংকর ঘূর্ণিপাকের ভূমিকা গ্রহণ করে। হত্যাকাণ্ডের অন্তহীন ধারাবাহিকতা লাতিন আমেরিকার চলমান সহিংসতার উপমায় পরিণত হয়।

২৬৬৬-এর শেষ পর্বে ১৯৩০-এর দশকে গ্রামীণ জার্মানিতে শুরু হয়ে মেক্সিকোতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় সমাপ্ত কাল্পনিক লেখক আর্চিমবোল্ডির জীবনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। মেক্সিকোয় সান্তা তেরেসোর হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে তার ভাস্তেকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ২৬৬৬-এর অন্যতম আকর্ষণীয় পর্বটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাশান সীমান্তে ঘটছে। তরুণ আর্চিমবোল্ডি তখন সেনাবাহিনীর ডিটাচমেন্ট ত্যাগ করে রাশান পল্লী এলাকার আধা পরিত্যক্ত শহরে আশ্রয় নেন। তার গা-ঢাকা দেয়ার ওই কুঁড়ের চিমনির পেছনেই লুকোনো মস্কোর এক আভা গার্দে রাশান কবির জার্নালের দেখা পান তিনি। ওই দিনলিপি ছিল ১৯০৯ সালে জন্ম নেয়া এক ইহুদি কবির; ১৯৩০-এর দশকে স্তালিনের শুদ্ধি অভিযানের সময় ধীরে ধীরে সোভিয়েত বিপ্লবের সঙ্গে ক্রমবিচ্ছিন্নতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

বোলানিওর দীর্ঘ দুটি উপন্যাসই লাতিন আমেরিকার বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতার সমালোচনায় পরিণত হয়েছে, যারা বিশ্বায়নকে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন এবং যারা বিপ্লবী বিশ্বাসের দাবি করেন, যারা সবসময় তাদের ঘিরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু দুঃস্বপ্নসুলভ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারেন না। উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই প্রায়ই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়কে বাড়িয়ে তুলতেই সাহায্য করে। বোলানিও সুস্পষ্টভাবেই সবসময় সমালোচক, বদলেয়ারীয় পর্যবেক্ষক থেকে গেছেন এবং বিপ্লবী আনুগত্য এড়িয়ে গেছেন; যার একমাত্র বিশ্বাস মিলবে কবিতায়, খোদ বই সৃষ্টির ক্রিয়ায়।

১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে কবিতা থেকে শুরু করে প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...র আত্মজৈবনিক ও অরাজক বোহেমিয়া পর্যন্ত বিপ্লবের ঝাণ্ডাবাহী এবং কাব্যিক আভা গার্দের ভেতরের টানাপড়েন ডাল্টনের রচনার কেন্দ্রীয় বিষয়...তার উপন্যাসের চতুর্থ পর্বে জনৈক তরুণ লেখক শিল্পকলা ও রাজনীতির ভেতর লক্ষ করা বিভেদের কথা বলছে:

‘আমি বিশ্বাস করি, আমার মতো যারা সবচেয়ে তীব্র প্রমাণসহ আজকের বিশ্বের জটিলতা নিয়ে চিন্তাভাবনা ছাড়া আর কিছুই করে না (এটা মেধা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে কিনা), তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য এক ধরনের রাজনীতি থাকা উচিত...এ বিশ্বের পরিবর্তন বিপ্লবীদের হাতেই অর্জিত হবে। আমিন।’

ডাল্টন নিজের জীবনে ইউটোপীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস ধরে রেখেছেন (এমনকি এক ধরনের জটিল কায়দায় হলেও), অন্যদিকে তার উপন্যাস এবং বেশির ভাগ কবিতা বিপ্লবী ধ্যান-ধারণায় শিল্পীর স্থানের পরস্পর বিরোধিতার সন্ধান করেছে। বোলানিওর দুটো প্রধান উপন্যাস প্রায়ই বিপ্লবী প্রবণতাকে স্রেফ আরেকটা বিশ শতকীয় কল্পকাহিনী হিসেবে উন্মোচন করে একে ধ্বংস করে দিচ্ছে বলে মনে হয়। সিউদাদ হুয়ারেসের হত্যাকাণ্ডের বিবরণী দেয়া তার নির্মম চতুর্থ পর্ব ২৬৬৬ সূচনাকারী শার্ল বোদলেয়ারের এপিগ্রাফের প্রলয়বাদী স্বরকেই পূর্ণতা দিয়েছে।

‘ক্লান্তিকর মরুভূমির&dquote;&dquote;

মাঝে ভীতির মরুদ্যান।’

এসবই আরো গভীর বিশ্লেষণের দাবিদার দুজন কবি সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা। তবে আমি বলতে চাই, স্যান সালভাদরে উত্তাল মধ্য ৭০-এ ডাল্টন ও বোলানিওর সংক্ষিপ্ত সেই সাক্ষাতের কাছে ফিরে না গিয়ে ২৬৬৬ উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। বিপ্লবী পরামর্শক এবং সতীর্থ ভবঘুরের মতোই বোলানিও নিজের কবিতাকে আপেক্ষাকৃত বুর্জোয়া রূপ উপন্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে বদলাতে চেয়েছিলেন। দুজন কবিই বুঝতে পেরেছিলেন যে উপন্যাসকে বিনির্মাণ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুক্তিদায়ী প্রভাব ও আদর্শিক অরাজকতাসহ বহুধা উদ্দেশ্যে সম্প্রসারণ করা যায়। ২৬৬৬ ও প্রোব্রেসিতো পোয়েতা কিউ এরা ইয়ো...লাতিন আমেরিকায় কবির অস্তিত্বের অর্থহীনতা স্বীকার করে, যে ব্যর্থতা উপন্যাসের ধরনের অরোপিত সম্মিলিত ক্রিয়ার মাধ্যমে খাটো করা যেতে পারে।

এ দুই লেখকের ভেতর আরেকটি সংযোগ হলো, যেটা এর নিজস্ব নিবন্ধ দাবি করে, নিকানোর পাররার (১৯১৪) ‘প্রতিকবিতা’র প্রতি তাদের পক্ষপাত। পাররার প্রশংসায় বোলানিও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, ডাল্টনও একইভাবে চিলির এ কবির নিজের শিল্পকর্মের প্রতি সমীহহীন দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রদ্ধা করতেন। ওদের দুজনের কাছেই পাররার সংশয়বাদী, পরিহাসময় কবিতা ক্লান্তির বিরুদ্ধে সাহিত্যকে কীভাবে এক ধরনের ক্যামোফ্ল্যাজ হিসেবে খাড়া করা যেতে পারে তার মডেলের কাজ দিয়েছে। বোদলেয়ার উনিশ শতকে যেমন করেছিলেন, সেভাবেই পাররার পোয়েমাস ই অ্যান্টিপোয়েমাস (১৯৫৪) তার বেশির ভাগ সতীর্থের কবিতা সম্পর্কিত ধারণার এক ধরনের বিপ্লবী সমালোচনা তুলে ধরে। পাররা পরিহাসমূলক সারল্যে দুর্জ্ঞেয় এবং বারোক ধারণা থেকে আলঙ্কারিক বিচ্ছেদের প্রস্তাব রেখেছেন। এ ধরনের অবস্থান ডাল্টন ও বোলানিওর বিস্তৃত উত্তর আধুনিক উপন্যাসে যে কেউ লক্ষ করবেন। পাররার উপলব্ধি মতে, কবিতা কবিকে এক ধরনের বাস্তব কিন্তু প্রতিদিনের ভাষার বিদ্রোহী প্রয়োগে ফিরিয়ে দিতে লৌকিকতার ব্যবহার করতে পারে। এভাবে মানুষ একটি সুস্পষ্ট পথে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে মোকাবেলা করা বিভিন্ন অসম্ভাব্যতা থেকে সাহিত্যকে তৈরির সুযোগ দেয়। সময়ে সময়ে সমাবেশকে সমীহ করা হয় কিন্তু সবসময়ই কবির ভিন্ন মতের অবস্থান থেকে পরিশুদ্ধ হয়।

‘আমিই ব্যক্তি।&dquote;&dquote;

কিন্তু না। আমি আমার কাজে ক্লান্ত হয়ে গেছি,

আগুন আমাকে অস্বস্তি দেয়,

আমি আরো কিছু দেখতে চাই,

আমিই ব্যক্তি।

আমি নদী বিধৌত এক উপত্যকায় গিয়েছি।

যা চেয়েছি ওখানেই পেয়েছি,

এক বুনো শহরে এসে হাজির হয়েছি,

একটা গোত্র,

আমিই ব্যক্তি।

ওদের ওখানে কিছু কাণ্ড ঘটাতে দেখেছি,

পাথরের গায়ে ছবি এঁকেছে ওরা,

আগুন জ্বেলেছে, আগুনও জ্বেলেছে ওরা!

আমিই ব্যক্তি।

আমি কোথা থেকে এলাম জানতে চেয়েছে ওরা।

আমি জবাবে বলেছি, হ্যাঁ, আমার কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই।

আমি উত্তরে বলেছি, না, তখন থেকে।

বেশ।

তারপর নদীতে পাওয়া একটা পাথর আঁকড়ে ধরে

ওটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছি,

ওটাকে ঘষেছি,

ওটা থেকেই নিজের জীবনের খানিকটা তৈরি করেছি।’

(‘সলিলোকিও দেল ইন্দিভিদুও’)

বোলানিও কখনই এল সালভাদরে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিপুলভাবে লেখালেখি করেননি, তবে এটা স্পষ্ট বলেই মনে হয় যে ডাল্টনের মৃত্যু তাকে ব্যক্তিগত ও নান্দনিকভাবেই প্রভাবিত করে থাকবে। ওই একক ও ভয়ংকর ঘটনাটি হয়তো তার পক্ষে সতর্কবাণীর কাজ দিয়ে ছিল যে কবিতা এক ধরনের ঝোঁক, যাকে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ডাল্টনের হত্যাকাণ্ড তাকে হয়তো একক নৈতিকতা বা কৌশল আরোপকারীদের বিরুদ্ধে কবিতার তুলে ধরা চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এ কারণেই তারা দুজনই আজকের মেরুকৃত পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক। কারণ তারা এমন কাব্যিক উপন্যাসের প্রস্তাব রেখেছেন, যার প্রকরণ সহজাতভাবেই গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সব শেষে, রোবার্তো বোলানিওর প্রধান দুটো উপন্যাসের তর্জমা হয়তো রোকে ডাল্টনের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অলক্ষে থাকা মাস্টারপিসের ইংরেজি তজর্মার পথ খুলে দিতে পারে বলেই আশা করা যেতে পারে।